বকুলের বাস্তবতা পর্ব-১১ এবং শেষ পর্ব

0
656

#বকুলের_বাস্তবতা
#পর্ব_১১(সমাপ্ত)
#লেখক_দিগন্ত
সময় অনেকটা এগিয়ে এসেছে।জীবন কখনো কারো জন্য থেমে থাকে না।আব্দুল চাচার মৃত্যুর পর আমাদের কারো জীবনও থেমে নেই।দেখতে দেখতে পেরিয়ে গেছে দুই বছর।

আবীর এখন একজন ডাক্তার।আমার ডাক্তারি পড়াশোনাও সমান তালে চলছে।আদৃতা এখন বিজনেস সামলাচ্ছে।শায়নকে ভুলে এখন সে রুদ্র নামের একটি ছেলেকে বিয়ে করে নিয়েছে।রুদ্র আদৃতারই বন্ধু ছিল।বন্ধুর থেকে বেশি একতরফা প্রেমিক ছিল।শায়নের মিথ্যা প্রেমে জন্য হয়তো কখনো সত্য প্রেমটা দেখতে পায়নি।

শায়নও এখন তার বাবার বিজনেসের দায়িত্ব নিয়েছে।লোকে বলে দাঁত থাকতে কেউ দাঁতের মূল্য দেয়না।কথাটা হয়তো ঠিকই বলে।শায়ন এখন আদৃতাকে ফিরে পেতে চায় কিন্তু সেটা তো আর সম্ভব না।শিলারও নাকি বিয়ে হয়ে গেছে।

ময়না ম্যাডামও আবার বিদেশে ফিরে গেছেন।সব মিলিয়ে এখন পরিস্থিতি অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে এসেছে(হয়তো)

এরমধ্যে একদিন একটা কঠিন সত্য সবার সামনে আসে।আবীরের মা-বাবা,আব্দুল চাচা কারো মৃত্যুই স্বাভাবিক ছিল না! খু*ন করা হয়েছিল তাদের।আর এই খু*ন করিয়েছিল শায়নের বাবা শাহিন।

ঘটনাটা এমনি এমনি সামনে আসে নি।আব্দুল চাচাকে যেই ট্রাকটা ধা*ক্কা দিয়েছিল তার ড্রাইভার এতদিন বিদেশে ফেরারি ছিল।কিছুদিন আগেই দেশে ফিরে আছে এবং সৌভাগ্যবশত আবীরের নজরে আসে।আবীর তাকে ধরে পুলিশের হাতে তুলে দেয়।

এখন পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদেই একপ্রকার সে স্বীকার করেছে যে সেই আব্দুল চাচাকে ইচ্ছে করে ধা*ক্কা দিয়েছে এবং এর আগেও আবীরের মা-বাবার মৃত্যুর পেছনেও তার হাত ছিল।

এসব কাজ সে করেছে শুধুমাত্র শাহিন চৌধুরীর কথায়।পুলিশ শাহিন চৌধুরী মানে শায়নের বাবাকে গ্রেফতার করে।তার কাছ থেকে সকল সত্য জানতে পারে।তিনি স্বীকার করেন যে, ব্যবসায়িক কারণে তিনি এসব করিয়েছেন।

শাহিন চৌধুরীর শাস্তি হয়।এরপর কয়েক মাস চলে যায়, একদিন শায়ন আসে আমাদের বাড়িতে।আমাকে ডাকাডাকি করে।আমি আসলে বলে,
-“আমার মা খুব অসুস্থ।তোমাকে দেখতে চাইছে একবার চলো প্লিজ।”

যদিও আমার যাওয়ার কোন ইচ্ছে ছিল না কিন্তু যেতে হলো।হাজার হোক উনি আমার জন্মদায়িনী মা।দশ মাস দশ দিন আমায় গর্ভে ধারণ করেছেন।উনি যতোই আমার সাথে খারাপ ব্যবহার করুন আমি ওনার অসুস্থতার কথা শুনে না করতে পারলাম না।

আর এটাই বোধহয় আমার জীবনের সবথেকে বড় ভুল ছিল।শায়ন আমাকে গাড়িতে করে নিয়ে যায় অনেক দূরে কোথাও।আমি যায়গাটা ঠিক চিনতে পারি না।শায়নকে জিজ্ঞাসা করলেও সে কিছু বলে না।আমি চিৎকার করার চেষ্টা করি কিন্তু ব্যর্থ হই।শায়ন আমার মাথায় বন্দু*ক তাক করে চুপ থাকতে বলে।ভয়ে আমার গলা শুকিয়ে যায়।

মনে মনে আল্লাহকে ডাকতে থাকি।এখন তিনি ছাড়া আর কেউ আমাকে বাঁচাতে পারবেন না।শায়ন একটা নিরিবিলি রাস্তায় এসে গাড়ি থামায়।তারপর আমাকে গাড়ি থেকে নামতে বলে।আমি চুপচাপ গাড়ি থেকে নেমে যাই।শায়ন আমার মাথায় ব*ন্দুক ধরে বলে,
-“তুই আমার অনেক ক্ষ*তি করেছিস।তোর জন্য আমি আদৃতাকে পাইনি, আমার বোন আবীরকে পাইনি।আমার বাবার জন্য যদিও তুই দায়ী ছিলি না কিন্তু তবুও তুই এসেই যখন এত গণ্ডগোল হয়েছে তখন নিশ্চয়ই তুই আমাদের জন্য অ*পয়া।আমি আমার সৎ মাকে মানে শায়লা চৌধুরীকে নিজের মায়ের মতো ভেবেছি।তবুও তিনি মৃত্যুর আগে শেষবার তোকে দেখতে চাইছে।আমি নাহয় তার নিজের ছেলে নই কিন্তু শিলা তো নিজের মেয়ে।একবার তো শিলার খোঁজ নিতে চাইল না।আমার আর কিছু সহ্য হচ্ছে না।তোকে কষ্ট না দিয়ে আমি শান্তি পাবো না।আজ তোকে তিলে তিলে মা*রব আমি তুই শুধু দেখে যা।”

কথাটা বলে আমার উপর ঝা*পিয়ে পড়ে শায়না।আমি চিৎকার করতে থাকি কিন্তু কেউ সাহায্য করতে এগিয়ে আসে না।আমি শায়নকে অনুরোধ করে বলি,
-“প্রয়োজনে আমাকে মে*রে ফেলুন তবুও আমার এতবড় সর্ব*না*শ করবেন না।আমি শুধু আমার আবীরের।অন্য কেউ আমাকে স্পর্শ করলে সেটা আমি সহ্য করতে পারবো না।”

শায়ন আমার কোন কথা শুনল না।তার নোংরা হাত দিয়ে আমাকে কলু*ষিত করে দেয়।

এরপর পৈ*শাচিক হাসি হেসে বলে,
-“এতক্ষণে আমার গায়ের জ্বা*লা মিটেছে।দেখি এবার তুই লোকসমাজে কিভাবে মুখ দেখাস।”

শায়ন এই নিরিবিলি রাস্তায় আমাকে একা ফেলে চলে গেল।আমি এই ছিন্নভিন্ন অবস্থায় জমির মধ্যে পড়ে আছি।শরীরে বিন্দুমাত্র জোর নেই।জা*নোয়ারটা আমার অবস্থা একেবারে খারাপ করে দিয়েছে।সীমাহীন যন্ত্রণা অনুভব করছি আমি।তবে সেসব যন্ত্রণাকে ছাপিয়ে যাচ্ছে আমার সম্ভ্রম হারানোর আর্তনাদ।

একজন স্ত্রীর কাছে তার স্বামী ছাড়া অন্য কারো স্পর্শ যে কতটা বেদনাদায়ক সেটা অন্য কেউ অনুধাবন করতে পারবে না।আজ আমার খুব লজ্জা করছিল নিজের উপর।আবীরের কথা খুব করে মনে পড়ছিল।

না জানি আবীর একমুহূর্তে আমায় কিভাবে হন্যে হয়ে খুঁজছে।

আমি শরীরের সবটুকু শক্তি লাগিয়ে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলাম।কিন্তু আবার ব্যর্থ হলাম।একসময় চেষ্টা করাই ছেড়ে দিলাম।জীবনে তো আর কিছু বাকি নেই আমার।বাঁচার ইচ্ছা যেটুকু ছিল সেটুকুও আর নেই।

আমার জীবনে সুখ বরাবরই ক্ষণস্থায়ী।এবারও তার অন্যথা ঘটল না।আবীরের সাথে দুই বছরের সংসার জীবনে যখন এতো সুখী ছিলাম তখনই আমার বুঝে নেওয়া উচিৎ ছিল বকুলদের জীবনে সুখ আসে না।বকুলদের বাস্তবতা সুখ নয় বরং কষ্ট।

বকুলের দৃষ্টি যায় ধান দিয়ে গড়িয়ে পড়া শিশিরের উপর।শিশিরের ফোটাগুলো যেন আজ বকুলকে নিয়ে তাচ্ছিল্য করছিল।কেন এত বোকা তুই বকুল ফুল এত বোকা কেন? ভালোমানুষির জন্য আজ এরকম ফল ভোগ করতে হলো তোকে।আমি চাইনা আর কোন বকুল এত বোকা হোক।এখনকার পৃথিবীতে টিকে থাকতে হলে কঠিন হতে হয়।এত সহজে কাউকে বিশ্বাস করতে নেই।

সময় যত এগিয়ে যাচ্ছিল আমি ততোই দূর্বল হয়ে যাচ্ছিলাম।উঠে দাঁড়ানোর শক্তি আমার মধ্যে ছিল কিন্তু ইচ্ছে ছিলনা।উঠে দাঁড়িয়ে কোথায় যাব আমি? আবীরের কাছে? আমি যে আর আবীরের যোগ্য নই।আবীর কি সব জেনে আমায় আবার কখনো আপন করে নেবে? হয়তো না।

আমার চোখ দিয়ে নোনাজল গড়িয়ে পড়ছিল বৃষ্টির পানির মতো।শেষে আমি একটা সিদ্ধান্ত নিলাম এভাবে পড়ে থাকব না।আমাকে ঘুরে দাঁড়াতে হবে।আমার প্রতি হওয়া অন্যায়ের শাস্তি ঐ শায়নকে দিতেই হবে।

নাহলে যে অপরাধীরা পার পেয়ে যাবে।আমি কখনো সেটা হতে দেবো না।নিজের সর্বশক্তি দিয়ে উঠে দাঁড়ালাম।

ছেড়া শাড়িটা কোনরকমে গায়ে জড়িয়ে নিলাম।আমার পুরো শরীরের অবস্থা ক্ষতবিক্ষত।শ*য়তানটা যাওয়ার আগে আমার পেটে খুব জোরে লা*থি মে*রেছিল এখনো তার ব্যাথা বিদ্যমান।হাঁটতে অনেক কষ্ট হচ্ছিল আমার কিন্তু আমি দমে যাইনি কষ্টের কাছে।

বাস্তবতা বকুলদের যতই অসহায় করে দিক না কেন বকুলরা যখন লড়াকু হয়ে ওঠে তখন বাস্তবতাও আমাদের কাছে হেরে যায়।আমার আজ খুব করে ইচ্ছা হলো অতিমানবী হওয়ার।

আমি রাস্তা দিয়ে হেটে যাচ্ছিলাম।গন্তব্য কোথায় সে জানিনা।এই স্থানটা আমার কাছে একেবারেই অচেনা।রাস্তায় কোন জনমানব নেই।থাকবেও বা কি করে শায়ন যে আমাকে শহর থেকে অনেক দূরে জঙ্গল পেরিয়ে নিয়ে এসেছে।আমার নজর গেল অনেক দূরে একটি বাড়ির দিকে।আমি নিজের গন্তব্য খুঁজে পেলাম।ঐ বাড়িটাতে গেলে হয়তো কোন একটা আশ্রয় পেতে পারি।

আমি নিজের শরীরের সবটুকু শক্তি দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বাড়িটার সামনে যাই।

কিন্তু বাড়ির সামনে যেতেই শরীর অবশ হয়ে যায়।জ্ঞান হারিয়ে পড়ে যাই।

জ্ঞান ফিরতেই দেখতে পাই বাড়িটাতে তালা দেওয়া।যেটুকু আশা ছিল সেটুকু আর অবশিষ্ট নেই।আমি পা চালাতে লাগলাম রাস্তা দিয়ে।দেখি সামনে যদি কিছু ব্যবস্থা হয়।

একটা গাড়ি আসতে দেখে দাঁড় করালাম।গাড়ি থেকে নেমে এলো শায়ন।আমার সব আশা শেষ হয়ে এলো।শায়ন এসে কোন কথা না বলে সোজা ব*ন্দুক বের করে আমার উপর একটার পর একটা গু*লি চালাতে লাগল।চারটা গু*লি আমার শরীর ভেদ করে যায়।আমি লুটিয়ে পড়ি মাটিতে।শেষবারের মতো সুন্দর পৃথিবীটাকে দেখে নেই।আবীর কি ভালো থাকবে আমাকে ছাড়া? আবীরের কথা খুব মনে হচ্ছিল চোখ বন্ধ হওয়ার আগ পর্যন্ত আগে আমি শুধু আবীরের কথাই ভাবছিলাম।

শেষবারের মতো একবার ঘৃণাভরা দৃষ্টিতে দেখে নেই শায়নকে।অনেক কষ্ট উচ্চারণ করি,
-“ভা…লোবাসি তোমাকে আবী…”

আমার কন্ঠ থেকে যায়~~~~~~~~

____________
বকুল বলে চিৎকার করে ঘুম থেকে উঠে পড়ে আবীর।আজ ১০ টা বছর চলে গেছে তার বকুলকে ছাড়া।পাশের ঘর থেকে ছুটে আসে বকুল।

-“কি হয়েছে বাবা আমায় ডাকছিলে?”

আবীর পরম মমতায় মেয়েটাকে কাছে টেনে নিয়ে বলে,
-“না।”

বকুলকে হারানোর পর এই মেয়েটাকে অনাথ আশ্রম থেকে এনে দত্তক নিয়েছে আবীর।উদ্দ্যেশ্য বকুলের স্মৃতি বাঁচিয়ে রাখা।এই মেয়েটার মধ্যে বকুলকে খুঁজে পায় আবীর।মেয়েটার স্বভাব চেহারা অনেকটা বকুলের মতোই।

বকুল উঠে চলে যায় নিজের রুমে।আবীর বকুলের(আবীরের স্ত্রী) ছবি হাতে নিয়ে বলে,
-“কেমন আছ তুমি বকুল? নিশ্চয়ই ভালো।আমাকে কষ্ট দিয়ে তো ভালো থাকবেই তুমি।কিন্তু কোন চিন্তা করোনা তোমাকে ছাড়া আমি মোটেও খারাপ নেই।বেশ ভালোই আছি।”

কথাগুলো বলতে গিয়ে কেঁদেই দেয় আবীর।বকুলের মৃত্যুর কয়েকদিন পর নর্দমা থেকে তার প*চা গলা দে*হ উদ্ধার করা হয়।বকুলের মৃত্যু আবীরকে পাগলপ্রায় করে দেয়।গোটা পৃথিবীটা তার কাছে মিথ্যা মনে হয়।

তদন্তের পর পুলিশ শায়নকে ধ*রতে পারে।শায়নের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়েছে।জেলে প*চে ম*রছে সে।

এসবের মধ্যে আবীরও আজ অব্দি এখনো শান্তিতে থাকতে পেলো না।অশান্তিতেই চলে যাচ্ছে তার জীবন।বকুলের বাস্তবতার কাছে আদতে হেরে গেছে আবীর।বকুলের শরীরের মৃত্যুর সাথে আবীরের আত্নারও মৃত্যু ঘটেছে।এখন সে শুধু বেঁচে আছে বকুলের স্মৃতিগুলো নিয়ে।
(সমাপ্ত )