Home "ধারাবাহিক গল্প বকুলের মালা শুকাবে বকুলের মালা শুকাবে পর্ব-১৩+১৪

বকুলের মালা শুকাবে পর্ব-১৩+১৪

0
558

#বকুলের_মালা_শুকাবে—১৩
#শার্লিন_হাসান

রাগিনীর হিংস্রতা দেখে বাকি সবাই স্তব্ধ প্রায়। গৃহকত্রী লাকি বেগম একরাশ ক্ষোভ নিয়ে বলেন, “একটু পর কাস্টমার আইব। তৈরি থাহিস।”

রাগিনী ঘর কাপিয়ে চিৎকার করে বলে, “তোদের সব কয়টাকে পুলিশে দেব আমি। আর যে জানো য়ার আমায় এখানে বিক্রি করেছে তাকেও খু ন করব। দুটি দিন দেখ শুধু, আমার সাথে বাড়াবাড়ি করার পরিণাম কতটা ভয়াবহ টের পাবি।”

“ওমালো, হেতি দেহি আমারে ডর দেহায়। হোন মা** এই লাকিরে আইজ অব্দি কোনকেহ পুলিশে দিবার পারিনাই। তোই কোনহানকার কোন বাল লো?”

রাগিনী জবাব দিলোনা। শান্ত হয়ে খাটে বসে পড়ে। তাকে চুপ দেখে বাকিরা সবাই ঘর থেকে বের হয়ে যায়। এমনকি গৃহকর্ত্রী লাকিও। রাগিনী আশেপাশে কিছু খোঁজার চেষ্টা চালায়। কিন্তু কীভাবে এই পরিবেশ থেকে বেরুবে সে ভেবে পাচ্ছেনা। কোন পথই খুঁজে পাচ্ছেনা। ও উঠে দরজার কাছে আসে। যেটা বাইরে থেকে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে ইতোমধ্যে। রাগিনীর অনুভব হয়, সে মাঝ সমুদ্রে পানির প্রবল স্রোতে হাবুডুবু খাওয়া এক সাঁতারু। যার কাছে বেঁচে ফেরার প্রচন্ড ইচ্ছা সঞ্চিত আছে কিন্তু শক্তি নেই।

নতুন কাস্টমার এসেছে লাকির কাছে। সে টাকা রেখে রাগিনীর ঘরটায় নিয়ে যাওয়ার আদেশ করে এক মেয়েকে। মেয়েটাও সায় জানিয়ে, কাস্টমারকে নিয়ে রাগিনীর ঘরের দরজার সামনে আসে। বাইরে থেকে তালা খোলার শব্দ আসতে রাগিনীর ষষ্ঠী ইন্দ্রিয় সজাগ হয়ে যায়। ও উঠে দরজার সামনে আসে। তার কাছে এটাই পালানোর শেষ সুযোগ মনে হয়। লাকির আদেশ পালন করা মেয়েটি, যেইনা দরজা খোলে ওমনি চোখেমুখে কিছু দেখতে পায়না। রাগিনী মেয়েটার চুল টেনে ধরে চোখেমুখে ভয়ংকর আঘাত করে। এক ছুটে দৌড় লাগায়। কেউ কিছু বুঝে উঠার আগে পাগলের মতো গেটের কাছাকাছি আসতে আরো দু’টো মেয়ে দৌড়ে গিয়ে তাকে ধরে। কিন্তু তারা দু’জনের কেউই পারেনা তার সাথে। তার বর্তমান শক্তিটা খুব হিং স্র এবং পাগল পাগল রকমের। জেনো কোন মানসিক রোগী যখন পাগলামি শুরু করে তখন তার পাগলামির কাছে সবকিছু হার মানে। কোন শক্তি তাকে বেঁধে রাখতে পারেনা। রাগিনীর ক্ষেত্রেও তাই। ও ডানে-বামে তাকায়না। সোজা দৌড়াতে থাকে অনিদ্দিষ্ট গন্তব্যে। সেই বস্তি এবং অপবিত্র এলাকাটা বোধহয় একটু বেশই বড়। গলির পর গলি জেনো আসল রাস্তাটাই তার থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।

ওইদিকে লাকী ক্ষুব্ধ। লোক লাগিয়ে দিয়েছে রাগিনীর পেছনে। অন্যদিকে তাঁদের কাস্টমার চটে আছে। বিরক্ত নিয়ে বলে, “আমার পতিতা কই? ওই মেয়েটা পালালো কেন?”

লাকি থতমত খেয়ে বলে, “বেয়া দব বেটাছোড়া। চিইন্তা কইরবেন না। আপনার লাই আরো সুন্দরী পাঠাইতাসি। ঘরে যান খালি।”

“আমি ওই মাইয়াটারে চাই। ওর মতো এতো সুন্দরী এই পতিতালয়ে নাই।”

মেয়েগুলোর মুখে অমাবস্যার ন্যায় অন্ধকার নেমে গেলো। লাকী মৃদু হাসার চেষ্টা করে বলে, “কী যে বলেন। আপনের চোক্ষে সমেইস্যা আছে ডানে বামে তাকান। সুন্দরীদের মেলা বুইঝছেন।”

লোকটার কী জেনো হলো লাকীকে বলে, “আমি আগামী কাল আসবো। ওই মেয়েটাকে রেডি রাখবি বিনিময়ে যত টাকা চাবি দিবনে। ওই মাইয়ারে আমার ভালো লাগছে।”

লাকীর চোখেমুখে লোভের ঝলক। সম্মতি জানায়, “আপনে কাইল রাইতের দিকে আইয়েন। মাইয়ারে রেডি রাখমু। সারা রাইত ওই মাইয়া আপনের সেবা করব।”

লোকটা খুশি হয়ে যায়। যাওয়ার সময় বলে যায়, “আমার নাম, আশরাফ। বাকী পরিচয় পরে দিমু।”

★★★

থানায় মিসিং ডায়েরি করেছে অভিদ সিদ্দিকী। আজকের দিনের মধ্যে রাগিনীকে তার চাই চাই। তার জন্য যত টাকার প্রয়োজন সে দিতে রাজী। চৌধুরী পরিবারে শোক আর মান সন্মান হারানোর ব্যাধি চরম ভাবে গ্রাস করেছে। মেয়ের এমন কর্মকান্ডে রাসেল চৌধুরী প্রচন্ড ক্ষুব্ধ। কুসুমকলিকে একটু পরপর বকাঝকা করে চলেছেন। কেনো মেয়েকে সঠিক শিক্ষা দেননি। শান্তিসুধা তার থেকে এক কাঠি উপরে। তিনি ছেলেকে শাসিয়ে বলে,
” জন্মের পর ডাস্টবিনে রেখে আসতি। এমন দয়া দেখিয়ে জারজ সন্তান আমাদের পরিবারে আনার কী দরকার ছিলো। ওর মা তো ছিলো এক প তিতা। মেয়ে ও ওইরকম বেয়াদব হয়েছে।”

মূহুর্তে চৌধুরী বাড়িতে নিরবতা নেমে গেছে। সবার মুখটা থমথমে হয়ে আছে। কুসুমকলির চোখে অশ্রু টলমল করছে। যে সত্য তিনি মেনে নিয়েছেম তাতেও যে মিথ্যের ছাপ ছিলো সেটা তিনি বুঝেছেন রাগিনী যখন একটু একটু করে বড় হচ্ছিলো। ওনার নিজের কোন সন্তান ছিলোনা। হয়নি কোনদিন সেজন্য রাগিনীকে সেসময় আগলে নিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু এর কয়েক বছর গেলে যখন সত্যিটা পরিষ্কার বাকী পথটা আর শান্তিপূর্ণ কাটেনি। রাগিনীর শৈশব আর কৈশোর পুরোটাই বি ষ হয়ে উঠেছিলো।

পুরোনো সব কথা তোলে পরিবেশটাকে আরো বেশি বিভ্রান্ত করে তোলেছেন শান্তিসুধা। কিন্তু তার কাছে তার পরিবারের সন্মান আর সুখই আসল। এরকম একটা মেয়েকে নিয়ে নিজেদের সন্মান খোয়ানো আর মাথা ব্যাথা বাড়ানোর কারণ আছে বলে মনে হয়না। ওনার ছোটো ছেলের নাতিপুতিরাই ভালো। রাসেল কী এক মেয়ে পালছে। তার মান সন্মান কিছুই বাদবাকি রাখেনি।

নিরব নিস্তব্ধতার মাঝে পরিবেশ আবারো চঞ্চল হয়ে উঠে। যখন অভিদ সিদ্দিকীর আগমন ঘটে। রাসেল চৌধুরী মেয়ের জামাইকে দেখে এগিয়ে আসেন। জিজ্ঞেস করেন, “রাগিনীর খোঁজ মিলেছে?”

“না, চেষ্টা চলছে।”

“তুমি বোসো।”

অভিদ সোফায় বসে। কুসুমকলি নাশতার ব্যবস্থা করেন। তার জন্য গরম গরম কফি নিয়ে আসেন। এতো চিন্তার মাঝেও তিনি জামাই আপ্যায়ন করতে ভোলেননি। অভিদ সিদ্দিকী কফিতে চুমুক দিতে দিতে জিজ্ঞেস করে, “কিছু মনে করবেননা, আমার মনে হয় রাগিনীর মানসিক সমস্যা আছে। হয়ত সেটা খুব গুরুতর রকমের। বা ও কোনকিছু নিয়ে ট্রমায় আছে। ওর ব্যবহার আর অতিরিক্ত রাগ কিংবা মাঝেমধ্যে মেজাজ শান্ত হয়ে যাওয়াটা ভালো কিছুর সংকেত দেয়নি। পরিবার হিসেবে আপনাদের চোখে পড়েনি কখনো?”

কুসুমকলি বিরক্ত হোন। এই এক রাগিনী তার মাথাটা পাগল করে দিচ্ছে। আজকে কয়েকদিন ধরে এই মেয়ের আলাপআলোচনা বাঁধে আর কোন কথাই আসছেনা পরিবারে। কিন্তু জামাই মানুষ অভিদ সিদ্দিকী তার কথাকে অসন্মান করা যায়না।

তিনি জবাব দেন, “ও সবসময় পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত ছিলো। মাঝেমধ্যে রাগত খুব কমই নিজেকে প্রকাশ করত। একটু চাপা স্বভাবের ছিলো।”

“কিন্তু ওর ব্যবহার তো সেটা বলছেনা।”

“তাহলে কীরকম ছিলো, তুমিই বলো।”

জবাব দেন, শান্তি সুধা। অভিদ মৃদু হাসার চেষ্টা করে বলে, “একটু রাগচটা আর কিছুটা চঞ্চল। চড়ুই পাখির মতো উড়তে চাইতো কিন্তু উড়ত না।”

“এসব তোমার মন গড়া ভাবনা। আসল কথায় আসি, আমার নাতনির খোঁজ পাব না?”

“সাধারণ মানুষের খোঁজ পাওয়া সহজ কিন্তু কোন মানসিক রোগীর না।”

বিকট শব্দে কল বাজে কুসুমকলির। তিনি কল রিসিভ করতে ওপাশ থেকে ফাহমিদা সিদ্দিকী এবং আফিয়া সিদ্দিকী বলেন, “আপনাদের পাগল মেয়ে জেনেশুনে আমাদের ছেলে কাছে বিয়ে দিয়েছেন তাইনা? কী ভেবেছেন মেয়ের পাগলামি আমরা ধরতে পারব না। ব্যবহার যে কু ত্তা র চেহারার চেয়েও খারাপ ছিলো সেটাতে প্রমাণ হয়েমযায় মেয়ে যে পাগ ল। জেনেশুনে আমার ছেলের জীবন নষ্ট করে দিলেন?”

“আপনি মুখ সামলে কথা বলুন।”

“আপনার মুখ আপনি সামলে রাখুন। মেয়ে যেমন বেয়াদব মা তার থেকে কম না। একটুও নত হয়না। দোষ স্বীকার করেনা। খারাপ মহিলা একটা।”

আফিয়া সিদ্দিকীর কথায় কুসুমকলি রাগে ফোন ছুঁড়ে মারতে সেটা সুইচড অফ হয়ে যায়। সবাই বাকরুদ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে তার দিকে। তিনি ডানে-বামে তাকিয়ে রুমে চলে আসেন। ব্যপারটা নিয়ে মাথা ঘামায় রাসেল চৌধুরী। বউয়ের রাগ দেখে তিনি উঠে আসেন রুমে। কুসুমকলি মাথা চেপে ধরে বলেন, “এরকম কল ঙ্ক বাড়িতে তোলার আগে ভাবোনি? আসলেই সত্যি পা প বাপকে ছাড়েনা। পাপের ফল ভোগ করতে হবেনা! দেখো কেমন মজা।”

“মুখ সামলে কথা বলো তুমি। আমার মেয়ে আমার ঘরের লক্ষী ছিলো। ও আসার পর থেকে আমার ব্যবসায় যে উন্নতি হয়েছে সেটা তার আগের পাঁচ বছরেও হয়না। একটা কথা মাথায় রাখবে, মেয়েরা কখনো বোঝা হয়না তারা হয় নেয়ামত। আমার নেয়ামতের এই হাল করার পেছনে সম্পূর্ণ দায়ী তুমি। না তাকে সুস্থ শৈশব দিয়েছ আর না সুস্থ কৈশর। অবশ্য তাকে তাড়াতে সে কী মাথা ব্যাথা তোমার। ষোলো তেই পরের ঘরে দিয়ে দিয়েছি। শান্তি হয়নি তোমার?”

“পরের ঘরে গিয়েও তো জ্বালাচ্ছে অপয়াটা। ফিরলে ওর মুখও দেখতে চাইনা আমি।”

রাসেল চৌধুরী জবাব দেননা। কুসুমকলি কাঁদতে আরম্ভ করেন। বউয়ের প্যানপ্যান শোনার বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই রাসেল চৌধুরীর তিনি রুম পরিত্যাগ করেন।

অভিদ সিদ্দিকী সবার থেকে বিদায় জানিয়ে বেরিয়ে যায়। ভীষণ রকমের আফসোস কাজ করছে তার। কেনো রাগিনীকে একটু দেখে রাখলো না। মান সন্মান সব তো শেষ করে দিয়েছে মেয়েটা। এমন পা গল কেন? কারোর কথা না ভাবুক, নিজের সেফটির কথাও ভাবলো না! এ কেমন রকমের পা গল! কেথায় গেলে সন্ধান মিলবে এই পাগল মেয়েটির
ঠিক কোথায় গেলে খুঁজে পাবে তাকে। নাকি আর কোনদিন দেখা হবেনা তাদের। তবে কী এই দেখাই শেষ দেখা? অভিদ মানতে পারছেনা। মনটা ভীষণ কু ডাকছে। ও নিজের গাড়িতে বসে স্তব্ধ হয়ে যায়। এমন কেন মনে হচ্ছে আর কখনো মেয়েটির দেখা মিলবে না।
তবে কী এই দেখাই শেষ দেখা, এই প্রেমের স্মৃতির বাহক কী শুধু সে একাই।( প্রশ্নবোধক)

#চলবে

#বকুলের_মালা_শুকাবে—১৪
#শার্লিন_হাসান

একটি সরকারি হসপিটালের সামনে এসে স্থির হয়ে দাঁড়ায় রাগিনী। চোখ তুলে নেমপ্লেটের দিকে তাকায়। বেশিক্ষণ তাকাতে পারেনি, রোদের তেজে চোখ নামিয়ে নিতে হয়েছে। এই মূহুর্তে একটুখানি পানি খেতে ইচ্ছে করছে তার। কিন্তু এই শহরে তো পানিরও দাম আছে। তার কাছে তো টাকা নেই পানি কিনে খাওয়ার। ডানেবামে তাকিয়ে হসপিটালের সামনে রোডের অপজিটে থাকা দোকানের দিকে এগোয় ও। দোকানে কিছুটা ভীড় থাকায় রাগিনী ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে এককোনায় গুটিশুটি মেরে দাঁড়ায়। এক লোক সিগারেট জ্বালায়। যাওয়ার সময় রাগিনীর মুখের সামনে ধোঁয়া গুলো ছেড়ে যায়। মূহুর্তে কেশে উঠে রাগিনী। কেবল লোকটার চোখের দিকে দৃষ্টিপাত করে। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে দোকানের ভীড় কমতে ও দোকানীর কাছে গিয়ে বলে, “আমাকে একটু পানি দেওয়া যাবে? আমার খুব তৃষ্ণা পেয়েছে।”

রাগিনীর কথায় লোকটা খ্যাটখ্যাট করে বলে, “আপনের কাছে পানি কিনার টেহা আছে?”

“নাই।”

“তাইলে অন্য খানে যান যেনে ফিরিতে পানি দেয়। আমার দোকানে কোন ফিরি টিরি নাই।”

রাগিনী জবাব দিলোনা। ভেতরটায় প্রচুর রক্তক্ষরণ হচ্ছে। আহারে মানুষ! সামান্য পানির জন্য এমন করে কেউ? মানুষ তো মানুষকে এমনিতেই পানি দেয়। আর এই লোক! রাগিনী দোকান থেকে বেরিয়ে আসে। বাকী দোকানে যাওয়ার ইচ্ছে হলোনা তার। যদি একই রকম ব্যবহার করে তাহলে, পানি খাওয়ার প্রতি আর ইচ্ছে হবেনা। এভাবেই ম রতে হবে। সেজন্য সে আবারো হসপিটালের সামনে আসে। সরকারি হসপিটাল যেহেতু পানির টিউবয়েল বা ট্যাপ থাকার কথা। রাগিনী সেটা খোঁজা আরম্ভ করে। কিন্তু বাইরে কোন ট্যাপ বা টিউবয়েলের দেখা পায়নি। ওর প্রচন্ড কষ্ট হচ্ছে। এই জগতটাকে সে প্রচন্ড ঘৃ ণা করে। অসম্ভব রকমের ঘৃ ণা যেটাকে বলে। কিন্তু এখানে পানির দামটাও যে এতোটা চওড়া জানা ছিলোনা। এখানে যে টাকা ছাড়া এক পাও চলা যায়না সেটা সে টের পাচ্ছে। কী বি শ্রী অবস্থা। তৃষ্ণার ক্লান্তিতে শরীর কেমন জেনো করছে তবুও একফোঁটা পানির সন্ধান পাচ্ছেনা ও।

হসপিটালের গেটের সামনে দাঁড়িয়ে রয় কিছুক্ষণ। লোক আসা যাওয়া করছে একের পর এক। রাগিনী অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে একজন ভদ্রমহিলার আসা পরখ করে। গেট পেরিয়ে তার কাছে আসতে রাগিনী তাকে সালাম দেয়। ভদ্রমহিলা সালামের জবাব দিতে রাগিনী তার দিকে তাকিয়ে বলে, “আন্টি, একটা হেল্প করবেন প্লিজ?”

“বলো কীভাবে হেল্প করব?”

“আমাকে একটু পানির ব্যবস্থা করে দিবেন? খুব তৃষ্ণা পেয়েছে। আমার কাছে টাকা নেই।”

মহিলার কী জেনো হলো। রাগিনীর দিকে একপলক তাকিয়ে ব্যাগ থেকে পঞ্চাশ টাকার একটা নোট বের করে এগিয়ে দিয়ে বলে, “আপনার নাতিটা অসুস্থ ,পানি খেয়ে তার জন্য দোয়া করিও।”

“দুঃখিত, আমি কোন ফকির নই। আপনার কাছে কেবল একটু পানি চেয়েছি দানের টাকা না।”

কথাটা বলে ও সরে আসে। মহিলা ওর যাওয়ার দিকে তাকিয়ে বলে, “পানি খাওয়ার টাকা নাই, দয়া দেখিয়ে দিলাম এখন আবার ভাবের চোটে টাকাই নিচ্ছেনা। বুঝিনা এরকম বেয়াদব মেয়েমানুষ কোথা থেকে আসে।”

রাগিনীর কান্না পাচ্ছে খুব। এই দুনিয়া বুঝি এতো টা নিষ্ঠুর! ব্যস্ততায় কেউ কারোর দিকে তাকাচ্ছেও না। কে মরলো কে বাঁচল তাতে কারোর কিছু যায় আসেনা। কী অদ্ভূত!

রাগিনী রাস্তা দিয়ে হাঁটা ধরে। গন্তব্য তার জানা নেই। জীবনের প্রতি বিষাদ অনেক আগেই জন্মেছে। বাঁচার ইচ্ছে কতশত বার হারিয়েছে। এই দুনিয়াটা তার জন্য না। মোটেও না। পরিবারের মানুষগুলো এক একজন বিষা ক্ত সা পের চেয়ে কম না। আর যার সাথে বিয়েটা হলো, সে হলো বড় এক স্বার্থ লোভী। কেবল তার দেহটাকেই প্রাধান্য দিয়েছে। ভোগ করা শেষে বিদায় করতে মরিয়া হয়ে পড়েছে। আর যাকে কেবল হৃদয় দিয়ে ভালোবেসেছে, সে তাকে টালার বিনিময়ে বিক্রি করেছে। আহারে জীবন! এরকম জীবন রেখে কী হবে? কোনো মূল্য আছে কী এই জীবনের? কেবল সবাই ব্যবহার করেই গেলো।

★★★

কেটে গেছে চারটা দিন। গোধূলির আলো তখন ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে। সিদ্দিকী বাড়িটার উঠোন জুড়ে এক অদ্ভুত নীরবতা। এসএসসি পরীক্ষার পর, অভিদের কয়েক দিনের ছুটি যেন চোখের পলকে ফুরিয়ে গেছে। সামনে আসছে এইচএসসি পরীক্ষা।
দাপ্তরিক দায়িত্বে ফেনীতে পদায়িত অভিদ সিদ্দিকী কয়েক দিনের ছুটিতে এসে বিয়েটা করেছিলো
সেই ছুটি কাটিয়ে পুনরায় কর্মস্থলে ফিরতে হচ্ছে।
অভিদ সিদ্দিকী বারান্দার রেলিংয়ে হাত রেখে একবার চারপাশে তাকাল। এই বাড়ি, এই পরিচিত আঙিনা, সন্ধ্যার বাতাসে ভেসে আসা বকুল ফুলের গন্ধ সবকিছুই তার ভীষণ আপন। সবকিছু আগের মতো ঠিকঠাক হলেও বুকজুড়ে অদ্ভুত এক শূন্যতা লেপ্টানো কিন্তু দায়িত্বের ডাক মানুষকে বেশিক্ষণ এক জায়গায় থিতু হয়ে থাকতে দেয় না।
আগমন হয় আফিয়া সিদ্দিকী,ফাহমিদা সিদ্দিকী,বোন আদিবা এবং ভাই আয়ান সিদ্দিকী। ছেলেকে মনমরা দেখে ফাহমিদা সিদ্দিকী বলেন,
“মেয়েটার তো খোঁজ মিলেনি। ও তো এই পরিবারে থাকতে চায়না। তুমি শুধু শুধু ওর জন্য মন খারাপ করছ। তারচেয়ে কাজে মন দাও। এরপরে ছুটিতে আসলে আমি তোমার ফুফি মিলে কিছু একটা করব তোমার জন্য।”

ইনিয়েবিনিয়ে কথাটা বলেন ফাহমিদা সিদ্দিকী। অভিদ মায়ের দিকে একটু অবাক হয়েই তাকায়। কিছু একটা করব মানে! কী বুঝাতে চাইছে, মা। রাগিনীকে সত্যি ফিরবে না? অভিদ কী তাকে স্যরি আলার সুযোগ পাবেনা? আরেকটু যত্ন করে সংসার গোছানো হবেনা? রাগিনীকে তার মতো উড়তে দিয়ে, তার উপর মেঘের মতো ছায়া দেওয়া হবেনা? অভিদ খুব অনুতপ্ত। সবার আগে রাগিনীকে বোঝা উচিত ছিলো তার। অতঃপর বিয়ে-শাদি। খুব বড় ভুল আর অন্যায় করেছে সে।

আয়ান আর আদিবার দিকে তাকিয়ে অভিদ কেবল বলে, “আম্মার খেয়াল রেখো। আসি।”

বাড়ির সামনে কালো গাড়িটা অপেক্ষা করছে। চালক ইতোমধ্যে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র গুছিয়ে রেখেছে। অভিদ ধীর পায়ে বাইরে আসে। মুখে কোনো রকম আবেগের প্রকাশ নেই, কিন্তু চোখের গভীরে লুকিয়ে আছে বিষাদে ঘেরা মৃদু বিষণ্নতা।

অভিদের গাড়িটি সড়কে এগিয়ে চলতেই, অভিদের হঠাৎ মনে পরলো রাগিনীর সঙ্গে সেই আকস্মিক সাক্ষাতের স্মৃতি। কর্মসূত্রে তার পদায়ন ছিল ফেনীতে, কিন্তু এসএসসি পরীক্ষার সময় প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের জন্য তাকে কুমিল্লায় পাঠানো হয়েছিল।

সেদিন রাগিনীদের পরীক্ষাকেন্দ্রের দায়িত্বে ছিল অভিদ সিদ্দিকী। পরীক্ষার শেষ ঘণ্টা বাজার সঙ্গে সঙ্গেই পরীক্ষার্থীদের ভিড় উপচে পড়ছিল কেন্দ্রের প্রধান ফটকে। দায়িত্ব শেষ করে সেও ফিরছিল নিজের গন্তব্যের উদ্দেশে।
সকাল থেকেই আকাশের মুখ ভার ছিল। পরীক্ষা শেষ হতে না হতেই নেমে এলো মুষলধারে বৃষ্টি। কেন্দ্রের সামনে সৃষ্টি হলো ছাত্রছাত্রী ও অভিভাবকদের ছোটখাটো ঢল। কেউ ছাতা মাথায় তড়িঘড়ি করে এগিয়ে যাচ্ছে, কেউ আবার গাড়িতে আশ্রয় খুঁজছে। চারপাশজুড়ে কেবল বৃষ্টির অবিরাম শব্দ আর মানুষের ব্যস্ত পদচারণা। পথ এগিয়ে যেতে যেতে গাড়ির জানালা দিয়ে সেই দৃশ্যগুলোই নির্বিকার দৃষ্টিতে দেখছিল অভিদ সিদ্দিকী ।

ঠিক তখনই তার চোখে পড়ল একটি মেয়ে। বয়সে তরুণী, পরনে স্কুলের ইউনিফর্ম। বৃষ্টিতে সম্পূর্ণ ভিজে গেছে সে। সাদা-নীল পোশাকটা পানির ভারে গায়ের সঙ্গে লেপ্টে আছে, অথচ সেদিকে তার কোনো খেয়াল নেই। মাথা সামান্য নত করে কী এক গভীর চিন্তায় ডুবে রাস্তা ধরে হাঁটছিল মেয়েটি। চারপাশের কোলাহল কিংবা দ্রুতগামী যানবাহন কোনো কিছুর প্রতিই যেন তার মনোযোগ ছিল না।
হঠাৎ অভিদের গাড়ির সামনের চাকা রাস্তার জমে থাকা নোংরা পানিতে পড়ে গেল। ছিটকে ওঠা কাদামিশ্রিত জল সরাসরি গিয়ে পড়ল মেয়েটির গায়ে। অপ্রস্তুত হয়ে থমকে দাঁড়াল সে। যেন এক মুহূর্তে ভাঙল তার চিন্তার জগৎ। বিস্ময় আর বিরক্তিতে মুখ তুলে গাড়িটার দিকে তাকিয়ে দাঁত চেপে বলে উঠল
“বাইনচোত!”

বৃষ্টির গর্জনের মাঝেও শব্দটা স্পষ্ট ভেসে এলো অভিদের কানে। মুহূর্তের জন্য সে ভ্রু তুলে তাকাল, তারপর গাড়ির ভেতর এক অদ্ভুত নীরবতা নেমে এলো। এরকম গালি শুনে স্তব্ধ হয়ে যায় ড্রাইভার এবং অভিদ সিদ্দিকী। অভিদ ড্রাইভারের মুখের দিকে তাকিয়ে বলে, “গাড়িটা থামান।”

ড্রাইভার আদেশ পালন করে গাড়ি থামায়। অভিদ সিদ্দিকী এইঝুম বৃষ্টিতে গাড়ি থেমে নেমে মেয়েটার সামনে এসে দাঁড়ায়। তাকে দেখে রাগিনীর মাঝে কোনরকম পরিবর্তন আসেনি উল্টো বলে, “চোখ কী পকেটে রেখে গাড়ি চালান, নাকি মেয়েমানুষ দেখলে হ্যারেসমেন্ট করতেই হবে যেকোন উপায়ে।”

“কোন কলেজ থেকে এসএসসি এক্সাম দিচ্ছো?”

এরকম ব্যক্তিগত প্রশ্নে রাগিনী আরো চটে যায়। তারউপর সোজা তুমি সম্বোধন। রাগিনী নিজের সমস্ত রাগ উগলে দিয়ে বলে, “মায়ের দোয়া প্রাইমারি কলেজ থেকে পরীক্ষা দিচ্ছি।”

#চলবে