Home "ধারাবাহিক গল্প বকুলের মালা শুকাবে বকুলের মালা শুকাবে পর্ব-১০

বকুলের মালা শুকাবে পর্ব-১০

0
528

#বকুলের_মালা_শুকাবে—১০
#শার্লিন_হাসান

“প্রিয়তমার হাতে খু ন ও মঞ্জুর।”

কথাটা বলে ও বেরিয়ে আসে রুম থেকে। রাগিনী অভিদের যাওয়া দেখছে একনজরে।

বাইরে আসতে ফাহমিদা সিদ্দিকী অভিদকে বলেন, “এতো আয়োজন করে, ওকে কী একবারে পাঠিয়ে দিবে?”

মায়ের কথায় অভিদের ভ্রু দ্বয় প্রসারিত হয়ে আসে। ও কথার পৃষ্ঠে কথা লাগায়, “তুমি কোনটা করলে খুশি হবে?”

“আমি তোমার ভালো এবং পরিবারের ভালো দুটোর হিসেব করে চাইব, এই মেয়ে আমার বাড়িতে না আসুক। বিয়েতে, ছেলেমানুষের কিছু হয়না। কিন্তু সারাজীবন যার সাথে থাকবে সে যদি স্বস্তি না দেয় তাহলে বৃদ্ধ বয়সে গলায় ফাঁ স লাগানোর মতো হাঁস ফাঁস করে বাঁচতে হবে। সেজন্য সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।”

“আর পরেরজন যদি এরচেয়েও জঘন্য হয়?”

“হবেনা।”

মায়ের কথায় অভিদ কেবল ক্রুর হেঁসে জায়গা ত্যাগ করে। ছেলের রহস্য মাখানো কথায় ফাহমিদা সিদ্দিকীর কপাল কুঁচকে আসে। তিনি আকাশ কুসুম ভাবনায় পড়ে যান। ছেলে কী সিদ্ধান্ত নিতে চলেছে? সত্যি এই অপয়া, অলক্ষুণে, বেয়া দব ধানিলংকা মেয়েটাকে একবারে বিদায় করে দিবে? যদি তাই হয়, তাহলে ফাহমিদা সিদ্দিকী মনে মনে ঠিক করেন, একটা খাসি দান করবেন মাদরাসায়। তার ছেলের জীবনটা বেঁচে যাবে এরকম বেয়াদব মেয়ের হাত থেকে।

বাইরের রান্না বান্না ক্রমশ এগিয়ে শেষের দিকে। অভিদ সেসব দেখভাল করে ভেতরে আসে। সোফায় বসে,গভীর ধ্যাণে মগ্ন হয়ে যায়। বিশেষত রাগিনী। একনাম্বারের গাদ্দার একটা মেয়ে। এই মেয়ে নিয়ে বাকি জীবন কীভাবে যে কাটাবে সে!

ভাবনার মাঝে অভিদের চোখ পড়ে সামনে। রাগিনী নিচে এসেছে। এতোসব আয়োজনের তদারকি দেখে প্রশ্ন মনে এক্কাদোক্কা খেলতে থাকে। ও অভিদের সামনে এসে জিজ্ঞেস করে, “এতোসব আয়োজন কিসের?”

“বিদায়ের আয়োজন।”

“কার বিদায়?”

“তোমার।”

রাগিনীর মাথায় জেনো আকাশ ভেঙে পড়লো। তাহলে কী ওই চৌধুরী বাড়িতে আবার তাকে ফিরে যেতে হবে? কিন্তু ও তো সময়ের অপেক্ষায় আছে। কিছুতেই চৌধুরী বাড়িতে যাবেনা সে। নিজের রাগটা কিছুটা দমিয়ে রেখে বলে, “আমি চৌধুরী বাড়িতে যাচ্ছিনা। শুনে রাখুন আপনি।”

তখন ফাহমিদা সিদ্দিকী মোক্ষম যুক্তির সঙ্গে জবাব দেন, “তা, এখানে থেকে আমাদের আর অভিদের জীবন ধ্বংসের পরিকল্পনা করছ নাকি? তোমার মতো অপয়া,অলক্ষুণে বেয়া দব মেয়েকে রাখলে আমার সব এমনিতেই ধ্বংস হয়ে যাবে। আমার ছেলে তোমাকে আর চাচ্ছেনা। কথা বুঝো না তুমি?”

“আপনার থেকে এসবের কিছু জানতে চেয়েছি আমি? নাকটা একটু ছাঁটাই করে নিবেন, প্রয়োজনের থেকেও একহাত বেশি লম্বা আপনার নাক। সেজন্যই যেখানে সেখানে ঢুকে যাচ্ছে।”

“বেয়া দব। মুখ সামলে কথা বলো।”

অভিদের ধমকে রাগিনী রেগে ফুঁসে ওঠে। তেড়ে এসে অভিদের কলার ধরতে গেলে, অভিদ ওর হাত চেপে ধরে সাইডে বসিয়ে দেয়। রাগিনী আবারো তাকে হিংস্রতা নিয়ে আক্রমণ করতে চায়। অভিদ ওর দু-হাত ধরে ফেলে। বলে, “সাবধান, সবসময় সব জায়গায় সব চলেনা রাগিনী।”

ফাহমিদা সিদ্দিকী মুখ লুকিয়ে কেঁদে ওঠেন।

“এরকম বেয়া দব মেয়ে আমি আমার জীবনেও দেখিনি। শেষমেশ এই বেয়াদ ব মেয়েকে ছেলের বউ করতে হলো। কথার কোন রকমের ডক-পদ নাই।”

“হোয়াট ইজ ডক-পদ?”

রাগিনীর কথায় আফিয়া সিদ্দিকী জবাব দেন, “সুরত নাই।”

“ঠিক আপনাদের মতোই।”

হেঁসে জবাব দেয় রাগিনী। ফাহমিদা সিদ্দিকী এবং আফিয়া সিদ্দিকী এবার তেলে বেগুনে জ্বলে ওঠে। বিশেষত আফিয়া সিদ্দিকী। তিনি রাগিনীকে উপর নিচ পরখ করে বলেন, “তোমার তো নাকটা বেশি লম্বা না। একটু বোঁচা বোঁচা। ফর্সা কিন্তু চেহারায় মায়া কম।”

মূহুর্তে রাগিনীর দম্ভে আগুন লেগে যায়। আজ পর্যন্ত কেউ, তার সৌন্দর্যের ত্রুটি বের করেনি। কেউনা। কখনোই না। কিন্তু এক বিয়ের উছিলায় নিজের কথাবার্তাকে কতটা নিচে নামাতে হয়েছে সাথে অন্যের কথাও শুনতে হচ্ছে। কিন্তু সে তো ছেড়ে দেওয়ার পাত্রি না। হেঁসে হেঁসে জবাব দেয়, “এই বোঁচা নাক আর মায়াহীন চেহারা দেখেই আপনাদের ছেলে আমায় জোর করে বিয়ে করেছে। ভাবছি, নাক উঁচু আর চেহারায় মায়া হলে আপনাদের ছেলে না জানি, খু ন হওয়ার জন্য নিজের গলায় নিজেই ফাঁ’সি বেঁধে ফেলত। দেখুন, আমার সৌন্দর্যের ত্রুটির জন্য আপনাদের ছেলেটা বেঁচে গেলো।”

ওদের ঝগড়া ঝাটি দেখে অভিদের মাথা গরম হয়ে যায়। সব এক রকমের। রাগিনীর মুখে লাঘাম নেই তারউপর তার মা ফুফিও একদম শুরু করেছে। ও বিরক্ত হয়ে রাগিনীকে টেনেটুনে রুমে এনে দরজা লাগিয়ে দেয়। চোখমুখ লাল হয়ে আছে। দেখে বুঝা যায় প্রচুর রেগে আছে ও।
রাগিনী প্রচন্ড বিরক্ত হয়ে তেড়ে এসে অভিদের কলার চেপে ধরে বলে, ” শালা নিমকহারাম কোথাকার। যেইনা আমার স্বাদ নেওয়া শেষ ওমনি, ছেড়ে দেওয়ার কথা ভাবছিস?”

“তুমি তাহলে আমার হয়ে থেকে যেতে চাও?”

“কারণ?”

“থেকে যেতে কারণ লাগেনা।”

রাগিনী এবার থামে। কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে, “আমার সময় হলে আমি নিজেই চলে যাব।”

“আমি এখনি বিদায় করে দিতে চাচ্ছি।”

“তার মানে আমার দেহটা আপনার মূল আকর্ষণ ছিলো?”

“ঠিক তা নয়।”

“তাহলে?”

“আমার সারাজীবন এবং পরিবারের কথা ভেবে তোমায় বিদায় দিতে চাচ্ছি।”

“শুনে খুশি হলাম। ধন্যবাদ।”

“থাকো, আসি আমি।”

রাগিনী ওর কলার পুনরায় চেপে ধরে। চোখ রাঙানি দিয়ে বলে, “ছেড়েই যেহেতু দিবি,তাহলে আমাকে গভীর ভাবে স্পর্শ করলি কেন? এখন আমি ইউজড।”

“সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার কারণ দেখছিনা। আর স্পর্শ সেটা কবুল বলার পর থেকেই আমার অধিকার হয়ে গেছে। শুধু বাসর দেরিতে হয়েছে। কিন্তু সব কিছু হিসেব করে দেখলাম, তোমার সাথে আমার আসলেই যায়না। যেটা আমার আগে বোঝা উচিত ছিলো। সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ হয়েছিলাম কিন্তু বুঝিনি এটা মোহ ব্যতীত কিছুইনা।”

“আমি ছেলেমানুষ পছন্দ করিনা, বিশ্বাস করিনা। সত্যি, আমার হৃদয়ের মানুষটা ব্যতীত আর কেউই আমার মন মতো হয়নি। কেউনা। তাহলে কেন মাঝপথে আমার জীবনটাকে ছন্ন ছাড়া করে নষ্ট করলেন? এতো যখন শরীরের মোহে পড়েছেন, তাহলে পতিতালয়ে যেতেন। ওখানে আমার থেকেও সুন্দরীর অভাব নেই। শুধু শুধু আমার জীবন নষ্ট করলেন কেন?”

“কিন্তু পরে হলেও, তুমি থাকবে না আমার কাছে। তাহলে আগে বিদায় করলে সমস্যা কী?”

রাগিনী জবাব দিলোনা। একটু হাসলো কেবল। অভিদ সিদ্দিকী মৃদু বিরক্তি নিয়ে বলে, “রেডি হও, তোমার পরিবার আসবে একটু পর।”

“হচ্ছি।”

কথাটা বলে ও একটা জামা বের করে হাতে নেয়। অভিদ রুম থেকে বেরিয়ে যেতে রাগিনী নিজের ফোনটা হাতে নেয়। একটা আইডিতে মেসেজ করে। কিন্তু কোনরকম রেসপন্স পাচ্ছেনা ও। বিরক্তিতে নাক-মুখ কুচকে নিয়ে আরেকটা আইডিতে মেসেজ দিয়ে রেখে দেয়। চলে যায় তৈরি হতে।

দুপুর দু’টোর সময় চৌধুরী পরিবার আসে সিদ্দিক পরিবারে। ফোন কলে যাই ঝগড়াঝাঁটি হয়েছে,ফাহমিদা সিদ্দিকী এবং কুসুমকলির। সামনাসামনি দুজনই মিলে গেছে। একে অপরকে জড়িয়ে ধরে, খোঁজ খবর নিয়েছে। ফাহমিদা সিদ্দিকী খুব খুশি, কারণ আসল আপদ বিদেয় হচ্ছে তার বাড়ি থেকে। এর থেকে বড় খুশিত খবর আর কীই বা হতে পারে।

কুসুমকলি, শান্তি সুধা এবং রাগিনীর ফুফি মাহিন চৌধুরী যায় রাগিনীর রুমে তার খোঁজে। এসে দেখে রুম ফাঁকা। মাহিন গিয়ে অভিদকে জিজ্ঞেস করে, “রাগিনীকে ডেকে দাও।”

“বেরোয়নি, রুমেই আছে। ”

“কই নেই তো।”

অভিদ হাতে কাজ রেখে মাহিনের সাথে রুমে আসে। সাজানো-গোছানো সবকিছু আগের মতো পড়ে আছে শুধু কোথাও নেই রাগিনী মেহেরজান।

#চলবে