#বিদায়_বেলা
#পর্ব_১
#ইশরাত_জাহান
আজ ত্রিশ বছরের সংসার থেকে বিদায় নিচ্ছেন কুসুম বেগম।ত্রিশ বছর আগে বিয়ের বন্ধনে জড়িয়েছিলেন তিনি শরীফ আহসানের সাথে।কুসুম বেগমের দুই সন্তান।এক ছেলে এক মেয়ে। ছেলে বিয়ে করে পারি জমিয়েছে বিদেশে।ছেলে বউ নাতি নাতনী সবাই ওখানে থাকে।মেয়ের বিয়ে দিলো আজ দুইদিন।সন্তানদের দায়িত্ব পালন করলেন আজ তিনি।বিদায় নেওয়ার একটাই কারণ।মুক্তি চায় সে।ত্রিশ বছরে সহ্য করেছে অনেক কিছু।শুনতে হয়েছে তাকে অনেক কথা।মানা যায় সবকিছু।যদি তার আপন মানুষটি মানে তার স্বামী ঠিক থাকতো।তার স্বামী তো তাকে সম্মান দিতে শিখলেন না।
চলে যাই পূরণ স্মৃতিতে,
~~~~ত্রিশ বছর আগে ১৯৯৩ সাল তখন চৌদ্দ বছর বয়সের কিশোরী ছিলেন কুসুম বেগম।যশোর শহরে তার বাড়ি।ক্লাস এইটে পড়ে সে।বোন আছে তার বিয়ে হয়ে যায়।বাবা মুদির দোকান দেয়।
কুসুম বেগম দেখতে বেশ সুন্দরী ছিলেন।লম্বা চুল মাথা ভর্তি।ধবধবে ফর্সা ছিলেন চিনি।
প্রায় এদিক ওদিক থেকে বিয়ের সম্মন্ধো আসতো।একদিন এক প্রতিবেশী প্রস্তাব দেন,
_ঢাকায় বিশাল বড় বাড়ি আছে তাদের আফা।টাকা পয়সার কোনো অভাব নাই।ছেলে ইঞ্জিনিয়ার,তার মায় চায় ভালো মনের মেয়ে।ঘরের কাজ কাম পারবে।সবাইরে সম্মান করবে।দেখতে সুন্দরী হবে।তার ছেলে তো রূপের পাগল।কোনো যৌতুক নিবে না।ছেলের মা আমার কাকাতো বোন।
মহিলার কথাগুলো শুনে ভালো লাগে কুসুম বেগমের বাবা মায়ের।তাদেরকে আসতে বলে।কুসুম বেগমকে দেখে পছন্দ হয়ে যায় শরীফ আহসানের মায়ের।তিনি কুসুম বেগমকে পুত্রবধূ করতে চান।মায়ের মুখের ওপর কথা বলতে পারেন না শরীফ শেখ।তার ভালো লাগেনি এত ছোট মেয়েকে বিয়ে করার জন্য।সাথে মেয়েটি কালচারাল না।কিন্তু মুখ বুজে থাকলো।তার মা তার দুনিয়া।মা যেখানে যা করতে বলে তিনি তাই করে।এক কথায় মাম্মাস বয়।
খুব বেশি ঘাটাঘাটি না করেই বিয়ে হয়ে যায় শরীফ আহসান এবং কুসুম বেগমের।বিয়ের শেষ করে বিদায় নিয়ে শশুর বাড়ির দিকে রওনা দেন কুসুম বেগম।সারা রাস্তা কান্নাকাটি করেন।কান্না করতে করতে হেস্কি চলে আসে তার।পাশেই বসে ছিলেন শরীফ আহসান।কুসুম বেগমের কান্নাতে কোনো প্রতিক্রিয়া নেই তার।সে তার মত বাইরের প্রকৃতি দেখছে।
শশুর বাড়িতে ফিরতে দশ ঘন্টার বেশি সময় লাগলো কুসুম বেগমের।ভাঙ্গা রাস্তা আবার যশোর থেকে ঢাকার দূরত্ব অনেক।গাড়ি থেকে নেমে বাড়ির দিকে তাকালো।বিশাল বড় বাড়ি।বাড়ির সামনে বাগান।বাড়িটি ভিন্ন রঙের ঝাড়বাতি ও ফুল দিয়ে সাজানো।কুসুম বেগমকে মিষ্টি খাইয়ে ঘরে ঢুকালেন তার শাশুড়ি।অনেক নিয়ম কানুন পালন করে বাসর ঘরে ঢোকানো হলো কুসুম বেগমকে।তাকে ঘরে নিয়ে যায় তার ননদ আর বড় জা।জা বলে দিলো সব নিয়ম,
_শুনো মেয়ে স্বামী আসলে পা ধরে সালাম করবা।স্বামী যদি বলে তোমার কি চাই?বলবা আপনার ভালোবাসা আর সোহাগ।তারপর এই ধুধের গ্লাস তার সামনে আগায় দিয়ে বলবা খান আপনি।তুমি এমনে ঘোমটা দিয়ে বসো।তোমার স্বামী আসবে এখনই।এসেই তোমার ঘোমটা নিজের হাতে উঠাবে।আমরা তাইলে যাই।
বলেই বিদায় নেন তারা।তার দশ মিনিট পর ঘিরে প্রবেশ করে শরীফ আহসান।শরীফ আহসান এসে কুসুম বেগমকে ইগনোর করে আয়নার ওয়াশরুমে গেলেন।তারপর জামা কাপড় বদলে আয়নার সামনে দাড়িয়ে নিজেকে ঠিক করছিলেন।কুসুম বেগম দেখলো কিছুক্ষণ।ভাবলো,ওরা তো বলেছিলো এসেই ঘোমটা ওঠাবে।কিন্তু কঠাচ্ছে না কেনো?তাই সে নিজেই গেলো শরীফ আহসানের সামনে।শরীফ আহসান দেখলেন।কপাল কুঁচকে জিজ্ঞাসা করলেন,
_কি চাই?
অবুঝ কুসুম বেগম।তখন জা যেগুলো বলতে বলেছিলো এখন সে তাই বললো।
_আপনার ভালোবাসা আর সোহাগ।
ক্ষিপ্ত হলো শরীফ আহসান।এটুকু মেয়ের আবার এসব চায়।রাগ না দেখিয়ে বললেন,
_এসব পাবে না তুমি মেয়ে।আমি তোমাকে ভালোবাসতে পারবো না।আমার সাথে ফালতু কথা বলার চেষ্টা করবে না।আমি এসব পছন্দ করি না।
মাথা কাত করে সম্মতি জানায় কুসুম বেগম।সব ঠিক আছে,কিন্তু ঘোমটা এটা কখন ওঠাবে।এটা তো গুরুত্বপূর্ণ কথা।তাই বললো,
_ঘোমটা তো ওঠান মুখ থেকে।
_কেনো তোমার হাত কি ক্ষয় হয়েছে?
_না,আসলে আপুরা বলে গেলো আপনি ওঠাবেন।
_নিজে নিজে করে নেও।এসবে আমাকে ডাকবে না।বলেছিনা একবার।
অদ্ভুত লাগল কুসুম বেগমের কাছে। এ কেমন বিপদ।সে তো বলেছিলো প্রয়োজনীয় কথা ছাড়া কথা না বলতে।এটা কি প্রয়োজনীয় নয়?কিছু বললো না সে।রাতে ওই সাজেই খাটের এক কোনায় ঘুমিয়ে পড়ে তারা।
এরপর থেকে অনেক অবহেলা সহ্য করেছে কুসুম বেগম।যেখানে তার ভাসুর জা,ননদ নন্দাই মিলে আনন্দ ফুর্তি করে সেখানে তিনি একা একা দিন গুনতে থাকে।কখন সব ঠিকঠাক হবে।
বিয়ের বছর না পেরোতেই কুসুম বেগমের শাশুড়ি মারা যায়।শাশুড়ির মৃত্যুর আগে তিনি বলে যান,
_আমার এই সংসার দেখে এখন থেকে তোমার আর বড় বউমার।তোমরা দেখে রাখবে আমার গোছানো সংসার। পারলে নিজের মত আবার গুছিয়ে নিও।আমি মনে হয় বেশিদিন থাকবো না।কেমন জানি মনে হয় আজকাল।অদ্ভুত সপ্ন দেখি।
কুসুম বেগম সম্মতি দেয় শাশুড়ির কথায়।তারপর থেকে দেখতে থাকেন এই সংসার।কিন্তু তাকে কে দেখবে?কেউ দেখে না তাকে।মা বাবাকে মনে পড়ে খুব।কিন্তু দেখতে যেতে পারে না।তারাও আসে না এখানে।শাশুড়ি মা মারা যাওয়ার পর থেকে অবহেলা আরো বেড়ে গেলো কুসুম বেগমের।শরীফ আহসানের এই অবহেলা চোখে এড়ায়নি কুসুম বেগমের বড় জায়ের।সুযোগ যেনো লুফে নিলেন।বাড়ির যত কাজকর্ম আছে তাকে দিয়েই করতেন।মুখ বুঝে কাজগুলো করতো সে। মাকে অনেকবার বলেছে।লাভ হয়নি।মায়ের কথা,
_জায়েরা এমন হয় মা।তুই নাহয় করলি একটু কাজ। এ এমন খারাপ কি? কত বড় বাড়িতে সংসার করার ভাগ্য পেয়েছিস তুই।
মায়ের মুখের উপর কিছু বললো না কুসুম বেগম।
শাশুড়ি মারা যাওয়ার পর শুধু অবহেলা নয় শাসনও বেড়ে গেছে তার।নিজের চাহিদা মেটানো ছাড়া আর কোনো মুহূর্ত কাটাতো না শরীফ আহসান।কেউ কোনো নালিশ করলে বকাঝকা করতেন কুসুম বেগমকে।
এর ভিতর কুসুম বেগম মা হবার অনুভূতি পায়।তিনি প্রেগনেন্ট হন।কুসুম বেগমের প্রেগনেন্ট অবস্থায় একদিন বাড়িতে অনুষ্ঠান হয়।সমস্ত রান্না বান্না তাকেই করতে হয়। প্রেগনেন্সির তখন পাঁচ মাস।কাজ যে করতে পারতো না এমন না। তবে ভারী কাজগুলো সহ্য হতো না তার।মাথা ঘুরে আসে রান্না করতে করতে। ওত বড় বড় ডেকে রান্না করা।তাও আবার চুলার আগুন। তাপ সহ্য হয় না তার।এজন্য মাংসে লবণ অতিরিক্ত হয়ে যায়।খেতে তিতা হয়।মেহমান কেউ তা খেতে পারে না।এই অপরাধে ঐদিন কুসুম বেগমকে সবার সামনে গালে ঠাস করে চর মারেন শরীফ আহসান।কষ্টে তিনি চলে আসতে চায় বাবার বাসায়।কিন্তু তখনও তার মা বলে,
_তুই কয়দিন পর মা হবি।সন্তান আছে টির গর্ভে।সন্তানের কথা ভেবে সংসার কর মা।দেখবি তোর সন্তান হলে সব ঠিক হবে।
ওইদিন ও কিছু বললেন না কুসুম বেগম।মুখ বুঝে সব সহ্য করেন।
চলবে,