বিষাদনীড়ে মায়াতরী পর্ব-১০+১১+১২

0
356

বিষাদনীড়ে মায়াতরী [১০]
প্রভা আফরিন
_

রাতের নির্জনতায় কান পেতে শোনা যায় দূর থেকে ভেসে আসা চেনা-অচেনা শব্দ। ঘুটঘুটে আধারের ওপর ধূসর চাদর মেলে মেঘলা আকাশটি গুরুম গুরুম শব্দ করে চলেছে। সেই ধূসর চাদরের ফাঁক গলে থেকে থেকে এক চোখ ধাঁধানো উজ্জ্বল আলো উঁকি দিয়ে তড়িৎ মিলিয়ে যাচ্ছে। সেই সঙ্গে প্রবাহিত উত্তাল হাওয়া প্রকৃতিকে আন্দোলিত করে ছড়িয়েছে অস্থিরতা। শ্রাবণের উত্তাল বৃষ্টিমুখর রাতে রবিউল খন্দকার আশ্বিনের দুপুরের মতো নিশ্চুপ হয়ে আছেন। খোলা জানালা দিয়ে আসা দমকা হাওয়া ওনার ভেতরে কোনো প্রফুল্লতা সৃষ্টি করছে না। তবে অন্ধকারে ভীষণ আরামবোধ করছেন। কিছুক্ষণ পর জুলেখা হারিকেন হাতে ঘরে ঢুকলো। জানালার কপাট বাতাসের দাপটে বারি খাচ্ছে বারবার। সে খাটের পাশে হারিকেন নামিয়ে রেখে জানালা বন্ধ করে দিল। রবিউল খন্দকার খাটে লম্বা হয়ে শুয়ে গম্ভীর গলায় ডাকলেন,
“জুলেখা?”
“হু?”
“বাত্তি বুজাইয়া দেও।”

জুলেখা হারিকেন নিভিয়ে দিল। ঘর ছেয়ে গেল প্রকৃতির সবচেয়ে রহস্যময় রঙে। যে রঙে চর্মচক্ষু দ্বারা বাস্তবিক কোনোকিছু দেখা না গেলেও মনের ভেতরটা ঝকঝকে রূপে দেখা যায়। দুজন দূরত্ব রেখে খাটে পাশাপাশি শুয়ে আছেন। কিছুটা সময় পর রবিউল খন্দকার বললেন,
“ঠান্ডা রাইতে এত দূরে হুইছো ক্যান? কাছে আহো।”

জুলেখার মনে হলো ভুল সে শুনেছে। অন্ধকারে দেখার ভ্রম হয়, তার কী শোনারও ভ্রম হলো? স্বামীর কাছ থেকে এমন নরম স্বরে কাছের আসার আহ্বান কত বছর আগে পেয়েছিলো মনে করতে পারল না। দ্বিধায় পড়ে জুলেখা চুপ রইল। কিছুক্ষণ পর রবিউল খন্দকার নিজেই হাত বাড়িয়ে তাকে কাছে টানলেন। একদম বুকের সঙ্গে জড়িয়ে ধরলেন। জুলেখা বিমূঢ় হয়ে গেল। রবিউল খন্দকার জুলেখার পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে খুব ধীর স্বরে বললেন,
“আমাগো বিয়ার কথা মনে আছে তোমার?”

হঠাৎ বিয়ের কথা কেন উঠলো জুলেখা ভেবে পেল না। তবে কেন জানি কথা বলতে ইচ্ছে করল না। রবিউল খন্দকার উত্তরের অপেক্ষাও করলেন না। বললেন,
“আব্বা ম’রার পর আমি মাত্র সংসারের হাল ধরছি। সবদিক সামলাইয়া উঠতেই সবাই বিয়ার জোর দিল। আশেপাশে মাইয়ার খোঁজ লাগাইলো। মায়ের বাড়ির আত্মীয়ের সংযোগে তোমার খোঁজ আইলো। গরীব ঘরের সংসারী মাইয়া। আমার মায়ের মনে লাইগ্যা গেল। আমারও আপত্তি করার কারণ আছিলো না। উনিশ বৎসর আগে এই বাড়িত আইলা তুমি। করবীর বয়স তহন মাত্র সাত। ভাইজানের বিয়াতে সবচেয়ে বেশি খুশি যদি কেউ হয় তয় হেইডা করবীই। বাচ্চা মানুষ, আব্বার কথা জলদিই ভুইলা নতুন ভাবীরে নিয়া মাতলো। কিন্তু কেডা জানতো? করবীর লইগ্যা ভাবী আনতে গিয়া আসলে তার ভবিষ্যত নিজের হাতে নষ্ট করছিলাম।”

রবিউল খন্দকারের বুকের মাঝে জুলেখা হঠাৎ কেঁপে উঠলো। ক্ষীণ গলায় বলল,
“এই সময় এডি ক্যান কইতাছেন?”

রবিউল খন্দকার আধারেই জুলেখার ঠোঁটে আঙুল দিয়ে কথা বলা থেকে নিবারণ করলেন। বললেন,
“তোমার আমার প্রথম সন্তান হিমাদ, আমাগো আদরের ধন। কিন্তু আমার প্রথম সন্তান কে জানো?”
একটু থেমে দীর্ঘশ্বাসের সঙ্গে বললেন,
“জানো। জানো বইলাই সহ্য করতে পারো নাই। আমার কলিজার টুকরা করবী, যারে আমি জন্ম থাইকা আদর-যত্নে লালন পালন করছি। যারে কোলে নিয়া আমি সন্তানের স্বাদ পাইছি। আব্বা আর ভাইজান দুইজনের স্নেহ দিয়া বড় করছি। ফুলের টোকাও দেই নাই। সেই হিসাবে তো করবীই আমার প্রথম সন্তান। তার মুখের দিকে চাইলে মনের কোন এক গোপন দ্বার ভাইঙ্গা মায়া, টান, মমতা, আহ্লাদের ঝর্ণা ছোটে। আমার মনেও এত ভালোবাসা আছে, এত দরদ আছে সে কোলে না আইলে জানতামই না। সে আইজ আর দুনিয়ার বুকে নাই। ভাইজানের উপরে অভিমান কইরা, এক বুক কষ্ট, যন্ত্রণা, আক্ষেপ নিয়া মাটিতে সারাজীবনের মতো লুকাইছে। শেষবারের মতো তার মুখটা দেখার সৌভাগ্য আমার হয় নাই। জুলেখা, তুমি কী আমার যন্ত্রণা বুঝতে পারতাছো? আমার প্রথম সন্তানের মুখ আমি শেষবারের মতো দেখতে পাই নাই। আমার এই আফসোস কী দিয়া মিটবো কও তো?”

উত্তর জুলেখার জানা নেই। বৃষ্টিময় শীতল পরিবেশে তার গরম লাগছে। স্বামীর প্রশস্ত বুকে মাথা রেখে সে ঘামছে। এই অন্ধকার তার কাছে ছমছমে মনে হচ্ছে। মন বলছে এমন কিছু হবে যা সে চাইছে না অথচ তার দিকেই ধাবিত হচ্ছে। রবিউল খন্দকার আবার বললেন,
“তয় পরে বুঝলাম তার মুখ না দেইখা ভালো হইছে। যার ম’রনের সংবাদ আমারে ভঙ্গুর কইরা দিছে তার নিথ’র মুখটা সহ্য করতে পারতাম না। এই জগতে সন্তান শোকের চেয়ে নিষ্ঠুর অনুভূতি আর হয় না। কিন্তু তার তো এমন পরিণতি হওয়ার কথা আছিলো না! খন্দকার বাড়ির মাইয়া অভাবে জীবন কাটাইছে, না খাইয়া থাকছে, সবশেষে বিনাচিকিৎসায় ম’রছে। এমন পরিণতি কী হওয়ার কথা আছিলো জুলেখা?”

“আপনে এইসব কথা আমারে ক্যান হুনাইতাছেন? ঘুমাইবেন না?”
জুলেখা ঢোক গিলে বলল। রবিউল খন্দকার হাসলেন। জুলেখা সেই হাসির ক্ষীণ শব্দ শ্রবণ করে শিউরে ওঠে।

“করবী শালুগঞ্জ ছাইড়া খিলানচর গেছিলো ক্যান মনে আছে?”

“মহসিনরে বিয়া কইরা গেছে। ভালা পাত্র বিয়া না কইরা ফতুর বিয়া করলে চরেই তো যাওন লাগব।”

“যার চোক্ষে বড়ো হওয়ার স্বপ্ন, ডাক্তার হওয়ার ইচ্ছা। তার কী তহন বিয়া করার কথা আছিলো?”

জুলেখা আর কোনো উত্তর দিতে পারল না। এরপরের কথাগুলো সে শুনতে চাইছে না। একদমই না। রবিউল খন্দকারও চুপ করে গেলেন। উৎকণ্ঠায় নিমজ্জিত জুলেখা ভাবল এসব নিয়ে আর কথা হবে না। কিন্তু অনেকটা সময় পর রবিউল খন্দকার আবার বলতে লাগলেন,
“করবী চরে যাওয়ার কিছুদিন পর তোমার পেটের মইদ্যে আমাগো তৃতীয় সন্তান ম’রল। আমিই তারে দুনিয়ায় আহনের আগে বিদায় দিলাম, মনে আছে?”

জুলেখা হু হু করে কেঁদে উঠলো। ছাড়া পেতে চেয়েও রবিউল শক্ত বাঁধন থেকে মুক্তি পেল না। ভয়ার্ত গলায় বলল,
“এইবার চুপ করেন। আর কইয়েন না। ভুল করছিলাম। আমি আর হুনতে চাই না।”

“তোমারে হুনতে হইবো। আমার অনাগত বাচ্চাটা ক্যান মরল তার দায় তো এড়াইতে পারবা না। একলা আমার ভুলে না, তোমার দোষেই তারে দুনিয়া ছাড়তে হইলো। যদি আমার করবীডারে না খেদাইতা, যদি হিংসা না করতা আমার আরেকটা পোলা-মাইয়া এই বাড়িত হাইস্যা খেইল্লা থাকত। তয় আমি ওইসব কথায় আর ফেরত যাইতে চাই না। জুলেখা তুমি কী জানো তুমি একটা খু’নি?”

জুলেখা থরথর করে কাঁপছে। রবিউল খন্দকার তার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,
“করবীর পাঠানো চিঠিটা যদি না লুকাইতা আমি ঠিক সময় গিয়া তারে উদ্ধার করতে পারতাম। দুইজন না হোক অন্তত একজন বাঁইচা ফিরতো। কিন্তু আমি গিয়া কাউরে পাইলাম না। একজন ভাইস্যা গেল আরেকজন আমার অপেক্ষায় চরেই কব’র হইলো। এই ম’রার দায় কার? কার লইগ্যা দুইডা প্রাণ অকালে, বিনাচিকিৎসায় ম’রল? ক্যান পালি এতিম হইলো? কার লইগ্যা আমি সারাজীবন অপরাধবোধে ডুবলাম?”

জুলেখা দুইহাতে রবিউল খন্দকারের গলা জড়িয়ে ধরে। বারবার বলতে থাকে,
“আমি ইচ্ছা কইরা করি নাই। আমারে মাফ করেন। আমি ইচ্ছা কইরা করি নাই। বিশ্বাস করেন, করবী ম’রুক আমি চাই নাই।”

রবিউল খন্দকার গ্রাহ্যই করলেন না সেই কান্না। জুলেখাকে পরম আদরে বুকে নিলেন। কপালে সিক্ত চুম্বন করে বললেন,
“কাইন্দো না। কেউ তো তোমারে ফাঁ’সি দিতাছে না। ওইবার পোলাপাইনের মুখ চাইয়া তোমারে রাখতে পারছি, একঘরে থাকতে পারছি। এইবারও পারমু। ছাইড়া দিলে তো মুক্তি। আমি তো তোমারে মুক্তি দিমু না। কিন্তু তুমি যে খু’নি এইডা কোনোদিন ভুইলো না। আমি ভুলতে দিমু না। আমি যেমন খু’নের যন্ত্রণা ভোগ কইরা আইতাছি এত বছর তোমারও তাই ভোগ করা উচিৎ।
আমাগো বাচ্চাডা হইলে এতদিনে পালির মতোই বড়ো হইতো, কও? মাঝে মাঝেই ঘুমের ঘোরে আবছা বাচ্চাগো কান্দনের আওয়াজ পাইতাম। মনে হইতো আমার বাচ্চাডা দুনিয়াতে না আহনের দুঃখে কানতাছে। নিজেরে তহন কী যে পাপি, নিকৃষ্ট, অসহায় লাগতো! রাইতের পর রাইত আমি ঘুমাইতে পারি নাই। তয় এহন ওই বাচ্চাডা আমার স্বপ্নে দেখা দেয়। আমার চাইরধারে ঘুরঘুর করে। ছোটাছুটি করে আর হাসে। আর কান্দনের আওয়াজ পাই না। কী যে ভালো লাগে! জানো ওই বাচ্চাডা কার মতো দেখতে? একদম পালির মতো। আমার না হওয়া সন্তান পালির মইদ্যে ফেরত আইছে। তার মুখের দিকে তাকাইলে আমার আত্মা ঠান্ডা হয়। কিন্তু এইহানেও তোমার বিস্তর সমস্যা। নিজের পেটের ছাড়া আমার একটা সন্তানরেও তুমি সইহ্য করতে পারো না।”

জুলেখা এতক্ষণে যেন কথাগুলোর মানে ধরতে পারল। রবিউল খন্দকার তাকে প্রচন্ড শক্তি দিয়ে দেহের সঙ্গে চেপে ধরেছেন। জুলেখার দম বন্ধ হয়ে আসে। সে ছাড়া পেতে হাঁসফাঁ’স করে। রবিউল খন্দকার হিসহিসিয়ে বললেন,
“আমার সন্তান আমার কাছে ফেরত আইছে। আবার তারে হিংসা করতে শুরু করছো তুমি? পালির মুখের দিকে চাইয়া কী তোমার একবারও নিজের পেটের বাচ্চাডার কথা মনে পড়ে না? মাইয়ারা হইলো মায়ের জাত। যেমন আমার মা। তয় কিছু কিছু মাইয়া জা’নোয়া’রের জাত। আর জঙ্গলের জা’নোয়ার শিকার করা খন্দকারগো পুরান ঐতিহ্য।”

রবিউল খন্দকারের থা’বা জুলেখার সহ্যের সীমা ছাড়ায়। স্বামী হওয়ার সুযোগে বন্ধ ঘরে খুব গোপন একটা শা’স্তি জুলেখাকে দিতে পারেন। আঘা’তগুলো এমন এমন স্থানে কাল’সিটে ফেলবে যার কথা সে মুখ ফুটে কাউকে বলতে পারবে না। দেখাতেও পারবে না। এই নারী এখনো এতটা নির্ল’জ্জ হতে পারেনি। শুধু মুখ বুজে সয়ে যাবে। বাইরে বৃষ্টির তেজ বাড়ছে। বারান্দার চালাঘরের ওপর ঝমঝমিয়ে শব্দ হচ্ছে। সে শব্দের মাঝে জুলেখার আর্ত’নাদ বিলীন হয়ে যায়।
______________

স্কুল ছুটির পর বান্ধবীদের থেকে পালিয়ে চিত্রা ছুট লাগালো নদীর পাড়ে। কাল বিকেলে সেই যে লোকটার সামনে থেকে বিদায় নিয়েছিলো এরপর আর অস্থিরতা কমেইনি। নরম গলায় কথা বললে কাজ হয় না বলে মিথ্যা হুমকিটা সে অনেক সাহস করে দিয়েছিলো। যদিও এমন কিছু করবে না সে। বাড়ি ফিরেও মনটাকে স্থির করতে পারেনি। মনে হচ্ছিলো সময়টা দ্রুত কেটে যাক। দ্রুত আসুক আজকের এই সময়টা।
চিত্রা নদীর পাড়ে গিয়ে হতাশ হলো। দূর থেকে দূর অবধি ঘাটে কাউকে দেখা যাচ্ছে না। লোকটা কী তবে তার কথা রাখলোই না? এতটা অবহেলা! রাগে দুঃখে চিত্রার চোখে পানি চলে আসে। মুখ লাল হয়ে যায়। ঠিক তখনই গাছপালার আড়ালে কাউকে ঘাপটি মেরে থাকতে দেখে সে। দৌড়ে গিয়ে শার্ট ধরে টেনে বার করল আড়াল থেকে। রনি ভড়কে যায়। পুরোনো, মলিন শার্টটা ফড়ফড় করে কাধের কাছে ছিড়ে যায় অনেকটা। রনি আশেপাশে নজর বুলিয়ে অবাক গলায় বলল,

“কী করলেন এইডা? আমার একটামাত্র ভালা শার্ট আছিলো।”

চিত্রা চোখের পানি নিয়ে রাগি গলায় বলল,
“বেশ করেছি। আরো ছিড়ব। আজ থেকে খালি গায়ে থাকবেন আপনি।”

রনি দুইহাতে শার্ট আগলে বিড়বিড় করল,
“নাউজুবিল্লাহ!”

চলবে…

বিষাদনীড়ে মায়াতরী [১১]
প্রভা আফরিন
_

বালুতীর ঘেঁষে হাটছে চিত্রা। দুপুরের উত্তপ্ত সূর্যটা পশ্চিমে হেলে পড়েছে। নদীতে প্রবাহিত হাওয়ার স্রোতে তার চুল, ওড়না অবাদ্ধতা করছে। এরচেয়েও বেশি অবাদ্ধ হতে চায় চিত্রার চঞ্চল হৃদয়। ইচ্ছে করে পৃথিবীটা নিজের মতো করে সাজিয়ে নিতে। যেখানে প্রেম ছাড়া কোনো ঋতু থাকবে না। ভালোবাসার ভেদাভেদ থাকবে না। সকল কুটিলতা যেখানে স্বকীয়তা হারাবে। প্রেম, ভালোবাসা, বন্ধন থাকবে চির অম্লান, সূর্য সদৃশ তেজস্বী। এমন পৃথিবী কী হয়? নিজের মনের মাঝে অবশ্যই হয়। কিন্তু অন্যের মন তা চাইবে কেন? তাই তো জগত এত বিচিত্র। চিত্রা তার খেয়ালি চিন্তায় ইতি টেনে গোমড়া মুখে পিছনে তাকালো। রনি তার থেকে দূরত্ব নিয়ে হাটছে। দেখে মনে হচ্ছে কোনো চো’র চু’রি করে মুখ লুকিয়ে হাটছে। চিত্রা হাটা থামিয়ে বিরস মুখে বলল,

“আপনাকে কী আমার পাহারাদার হওয়ার জন্য ডেকেছিলাম?”

“মানে?”

“পেছনে পেছনে হাটছেন কেন? পাশাপাশি আসুন।”

“দোহাই লাগে, এইরকম আবদার করবেন না। আপনে আইতে কইছেন, আইছি। এহন লগে লগে হাটলে শালুগঞ্জের কারো চোখে যদি পড়ে আপনের বদনাম হইবো।”

চিত্রা ভ্রু উঁচিয়ে ব্যঙ্গ করে বলল,
“আমার বদনামের এত চিন্তা করেন তাহলে আমার মনের চিন্তা কেন করেন না?”

“আপনের মনের চেয়েও আমার জানের চিন্তা বেশি। আপনের দেখা পাওনের পর থাইকা জান হাতে লইয়া ঘুরতাছি।”

চিত্রা হেসে ফেলল। মনে পড়ে গেল রনির সঙ্গে তার প্রথম সাক্ষাতের দিনটা। চৈত্রের নাভিশ্বাস ওঠা গরমে খুবই সাদামাটা একটি দিনে চিত্রা এনাম চাচার সঙ্গে মামাবাড়ি থেকে ফিরছিলো। বড়ো যাত্রীবাহি নৌকায় তখন একাধিক যাত্রীর মাঝে গরমে ঘেমে-নেয়ে চিত্রার বেহাল দশা। গলা শুকিয়ে খরখরে। সঙ্গে খাবার পানি নেই। এনাম চাচা মাঝির সঙ্গে নৌকার গলুইতে বসে আড্ডা দিচ্ছিলো। চিত্রার অবস্থান অপরদিকে। এত যাত্রী ডিঙিয়ে সেখানে যাওয়ার ইচ্ছে তার হলো না । সে বারবার নদীর ঝকঝকে পানি দেখে ঢোক গিলছিলো। একবার ভাবলো আজলায় ভরে নদীর পানিই খেয়ে নেবে। পরমুহূর্তে পানিবাহিত রোগের কথা মাথায় আসতেই ইচ্ছেতে লাগাম টানলো। হাঁসফাঁ’স লাগতে শুরু হলে সে কিছুটা এগিয়ে ছইয়ের বাইরে এলো। তপ্ত কিরণে চোখ রাখা দায় হলেও মাঝ দরিয়ায় প্রবাহিত হাওয়ায় আরাম অনুভব হলো খানিক। চিত্রা মাথার কাপড় ফেলে নদীর দিকে ঝুকে বসে। আজলায় পানি তুলে ঘর্মাক্ত মুখে, ঘাড়ে ছিটিয়ে নেয়। রোদের তাপে তুলোয় ন্যায় পেলব, সুন্দর মুখখানি র’ক্তলাল হয়ে আছে। সে ওড়নার একাংশ দিয়ে ভেজা মুখ মুছে নিতেই একজন বলে উঠলো,
“আপনের কী অসুস্থ লাগতাছে? পানি খাইবেন?”

চিত্রা মুখ তুলে তাকায়। সূর্য রশ্মিতে চোখ ধাঁধিয়ে উঠলে সে পিটপিট করে চোখের ওপর হাত মেলে ধরে। দৃষ্টিতে ধরা দেয় শুকনো দেহের শ্যামোজ্জ্বল এক পুরুষ। গালে, থুতনিতে দাড়ির ছিটেফোঁটা অস্তিত্ব। চোখের নিচে কালি। দেখে ছিপছিপে এক কিশোর মনে হলেও কন্ঠ ভরাট। তার নির্লিপ্ত দৃষ্টি চিত্রার দিকে। চিত্রা দ্বিধান্বিত কন্ঠে বলল,
“আমাকে কিছু বললেন?”

“আপনেরে দেইখা দুর্বল মনে হইতাছে। ছটফট করতাছেন, ঢোক গিলতাছেন। আমার কাছে পানি আছে, চাইলে দিতে পারি।”

“দিলে ভালো হয়।”

রনির এগিয়ে দেওয়া এক বোতল পানি চিত্রাসহ এক বৃদ্ধা ও তার নাতনিও গলা ভিজিয়ে নিল। এনাম দূর থেকে দেখে এগিয়ে এসে বলল,
“চিত্রা মা, তোমার পানি তিরাস লাগছে?”

“এখন জেনে কি করবেন? যান, গিয়ে মাঝির সঙ্গে সংসার করেন। এই জনমে তো আর বিয়ে-শাদি করবেন না। তাই যেখানে সেখানে দিন দুনিয়া ভুলে ভ্রাম্যমান সংসার পাতেন।”

চিত্রাকে গাল ফুলাতে দেখে এনাম ফোকলা হাসল। আঙুল দিয়ে ইশারা করে দূরের ঝাপসা সবুজ এক গ্রামের সীমানা দেখিয়ে বলল,
“ওই যে শালুগঞ্জ দেহা যায়। আরেকটু সবুর করো, আইয়া পড়ছি।”

চিত্রাকে ছইয়ের ভেতর একটু খোলামেলা স্থানে বসিয়ে এনাম আবারো নৌকার মাথায় চলে গেল। রনি তার থেকে একটু দূরে ছইয়ে বাধা বাশ ধরে দাঁড়িয়ে আছে। চিত্রার ফোলা গালের লাল আভার দিকে তাকিয়ে সে আনমনেই বলে উঠেছিলো,
“চৈতালির চিত্রা ফুল।”

চিত্রা সেই নিচু স্বরের নিমজ্জিত সম্বোধন স্পষ্ট শুনতে পেয়েছিলো। রনির প্রতি তার ভালোলাগার শুরুটা হয়তো সেখানেই ঘটে। সেই প্রথম চিত্রার মনে হলো তার নামটা ভীষণ সুন্দর। এত সুন্দর নাম সে আগে শোনেইনি। আর না কেউ এত মোহময় সম্বোধন তার ষোড়শী জীবনে উপহার দিয়েছে। রনির সঙ্গে তার দ্বিতীয়বার দেখা হয় নিজের বাড়িতেই। জানতে পারে তার আব্বার মিলের নতুন কর্মচারী সে। সেখান থেকেই লোকটা একটু একটু করে তার মনোযোগ কাড়ে। সাধারণ ভালোলাগা আকর্ষণে রূপ নেয়। বিপরীত লিঙ্গের প্রতি এই আকর্ষণ যে আদি থেকেই চলে আসছে। চিত্রাও সেই মানবীয় সহজাত স্বভাবের নিয়ন্ত্রণ কিংবা অবজ্ঞা করেনি। সংগোপনে চেপে রাখেনি। উঁচু-নিচু, ভালো-মন্দ, সমাজ-সংসারের সব ভেদাভেদ ভুলে হৃদয়ের আহ্বানে অনুভুতিকে আশকারা দিয়ে গেছে। একসময় তা ফুলে ফেঁপে ভালোবাসার অবাদ্ধ যাত’নায় রূপ নিতেই রনির প্রতি সমর্পিত হয়েছে।

চিত্রা বাতাসের সঙ্গে রিনরিনে এক হাসি ছড়িয়ে রনির চোখে তাকালো। এখন অবশ্য লোকটার স্বাস্থ্যের উন্নতি হয়েছে। চোখের নিচের কালি হালকা হয়েছে। চিত্রার কাছে সে সুদর্শন পুরুষ। রনি তার হাসি দেখে চোখ ফিরিয়ে নেয়। এই মেয়েটার হাসি সুন্দর বলতে মানা নেই। মেয়েটাও তা জানে বলেই বোধহয় ইচ্ছে তার সামনে এভাবে হাসে। সে বলল,

“বেলা পইড়া আইতাছে। আমারে কামে যাওন লাগবো। কতহন খাড়ায় থাকবেন?”

“যতক্ষণ মনে চায়।”

“তাইলে আমি গেলাম।”

বাতাসে পাট পচার গন্ধ ভেসে বেড়াচ্ছে। এই সময় পাটের সোনালি আঁশ ছাড়ানো হয়। পুকুর, বিলের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় পাট পচার গন্ধ নাকে লাগে। সেই গন্ধেই হোক বা রনির কথায়, চিত্রার মুখ কুচকে গেল। রনি অবশ্য গেল না। তার বিনীত ভাব দেখে মনে হচ্ছে সে চিত্রার অনুমতি চাইছে। চিত্রা বলল,

“আচ্ছা যাবেন। তার আগে আরেকবার আমাকে সেই প্রথমবার বলা নামটায় ডাকুন। তাহলেই চলে যাব।”

“আমি আপনেরে আগেও কইছি ওইডা খেয়ালে কইয়া বইছি। আপনে যেরকম আবেগ নিয়া হুনছেন আমি তত আবেগ নিয়া কই নাই। মুখখান ফুলের মতো টকটকা লাল হইছিলো দেইক্ষা কইছিলাম। তহন আমি জানতাম না আপনে কার মাইয়া।”

চিত্রা রে রে করে ছুটে এসে একেবারে রনির মুখোমুখি দাঁড়ালো। কোমড়ে দুইহাত রেখে বলল,
“জানলে কী করতেন? আপনার এত অহংকার কেন বলুন তো? কি এমন রূপ, গুন আছে আপনার যে বারবার আমায় পায়ে ঠেলছেন? জানেন কত ছেলে আমাকে শুধু চোখের দেখা দেখার জন্য দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসে?”

“সমস্যা তো এইখানেই। আপনে সুন্দর, অসম্ভব সুন্দর। সবাই আপনেরে পাত্তা দেয়, আপনের দেখা পাইতে চায়, সান্নিধ্য চায়। খন্দকার বাড়ির মাইয়া বইলা আপনের আলাদা কদরও আছে সবখানে। একমাত্র আমিই আপনের দিকে মুগ্ধ নজরে চাইতে পারি না। যদি আমার অবস্থান ভালা হইতো বোধকরি আমিও আপনের পিছনে ঘুরতাম। কিন্তু আমার জীবনের সংগ্রাম চোখের আকর্ষণ থাইকাও বেশি। আপনের আব্বা জানলে আমার কী হাল হইতে পারে হেই আন্দাজও আমার আছে। তাই হয়তো আমার অতো সাহস হয় না। এইডাই আপনের চোখে লাগছে। সবার চোখে মুগ্ধতা দেইখা অভ্যাস, আমার মুখ ফিরাইয়া নেওয়া হজম করতে পারেন নাই। তাই আমার দিকে মনোযোগ দিছেন। আমিও যদি শুরুর দিন থাইকা মুগ্ধ হইতাম তাইলে আপনের এত মনোযোগ পাইতাম না।”

চারপাশ সুনসান, নিস্তব্ধ। নদীও শান্ত। মাথার ওপর একঝাক শঙ্খচিল ডানা ঝাপটে উড়ে গেল। চিত্রার চোখ থেকে টুপ করে দুফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ে। নিমেষহীন দৃষ্টিতে এক আকাশ অভিমান জমেছে। সে যাওয়ার আগে জেদ করে তীর থেকে একমুঠ বালি তুলে রনির গায়ে ছুড়ে মা’রল। বলে গেল,
“নিষ্ঠুর মানুষ, কোনোদিন আমার চোখের সামনে আসবেন না। কক্ষনো না।”
______________

এনাম হিমাদকে সিগারেট খেতে দেখে ফেলেছে। এরপর থেকেই বাড়ির অবস্থা থমথমে।

পালিকে রাস্তা চেনানোর জন্য প্রথম কয়েকদিন রবিউল খন্দকার তাকে স্কুলে নিয়ে গিয়েছেন। এখন যান না বলেই পালির সাইকেলের পেছনে আরেকটা সাইকেল নিয়ে এনামকে পিছু পিছু যেতে হয়। তাকে জোর পাঠায় মেহেরুন বানু। মেয়েটাকে একা ছাড়তে ভয় পান তিনি। মাঝ রাস্তায় যদি পড়ে গিয়ে পা ভেঙে বসে তখন! পালির নিজের ওপর বিশ্বাস জন্মেছে। তার মনে হয় নদীর পানি যদি হাটাচলার মতো শক্ত হতো সে পানির ওপরও সাইকেল চালিয়ে যেতে পারতো। নানিকে বলেছে এনাম মামার আসার দরকার নেই। তবুও পিছু নেয়। এতে পালি ভীষণ বিরক্ত। হিমাদ ভাইয়ের সঙ্গে অবশ্য তার ভাব হয়েছে। এই ভাবের কারণটি অবশ্য হিমাদের স্বার্থমূলক। নিজের গোপন কর্মটি দেখে ফেলার পরই হিমাদ একটু খেয়ালে রাখে তাকে। এই মেয়ে যদি কাউকে বলে বসে! তবে শেষ রক্ষা হলো না।

পালিকে স্কুল থেকে নিয়ে আসার পথে হুট করেই রাস্তায় তাকে কয়েকজন ছেলের সঙ্গে ধোঁয়া ছাড়তে দেখে ফেলে এনাম। হিমাদ নিজেও এনাম চাচাকে দেখে ভড়কে যায়। তবে চাচার সঙ্গে পালিকে দেখে তার মনে ধারণা জন্মায় পালিই বোধহয় জানিয়ে দিয়েছে। ঘটনা রবিউল খন্দকারের কানে পৌঁছাতে সময় লাগল না। শুনে তিনি ব্যথিত হলেন। একটামাত্র ছেলে এই বয়সেই বখে যাচ্ছে! অবশ্য এর দোষ রবিউল খন্দকার নিজের কাধেই নিলেন। ছেলে-মেয়েরা ছোট থেকেই ওনাকে ভয় পায়। তবুও মেয়ের সঙ্গে ওনার যেমন ভাব, ছেলের সঙ্গে তা খুবই কম। হিমাদও একটু দূরে দূরে থাকে। কার সঙ্গে মেশে, কী করে সেদিকে খেয়াল রাখা উচিৎ ছিল। এই ছেলেটাকে নিয়ে ওনার অনেক আশা। খন্দকার বংশে এখনো কেউ অনার্স-মাস্টার্সের গন্ডিতে পা দেয়নি। ওনার ইচ্ছে হিমাদ বড় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বে। এভাবে তাকে নষ্ট হতে দিতে পারেন না। এলাকার ছেলেপেলেরা সব নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তাদের সঙ্গে মিশে হিমাদ সিগারেট ধরেছে। দুইদিন পর আরো বড়ো কিছুও ধরতে পারে। তিনি ঠিক করলেন হিমাদের ম্যাট্রিকের রেজাল্ট বের হলে তাকে আর গ্রামেই রাখবেন না। শহরে নিয়ে ভালো কলেজে ভর্তি করিয়ে দেবেন। থাকবে হোস্টেলে। সিদ্ধান্তের কথা বাড়িতে জানাতেই জুলেখার কান্নার রোল উঠলো। মেহেরুন বানুও মুখ কালো করলেন। কিন্তু রবিউল খন্দকারের সিদ্ধান্ত বদল হলো না।

হিমাদ দুইদিন ভয়ে তটস্থ ছিল। মনে হতো এই বুঝি আব্বা এসে রাগারাগি করবে। কিন্তু তেমন কিছুতো হলোই না উল্টে রবিউল খন্দকার খুব ঠান্ডা মাথার নিজের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানালেন। হিমাদ খুব কষ্ট পেল। সে ভেবেছিল ম্যাট্রিকের পর পড়ালেখা ছেড়েই দেবে। সেখানে তাকে কোন অচেনা শহরে রেখে আসবে! তার সব রাগ গিয়ে পালির ওপর পড়ে। সেই রাগেই সন্ধ্যায় পালি যখন তার কাছে ছুটে এলো, হিমাদ প্রচন্ড জোরে ওর গালে পাঁচ আঙুলের ছাপ বসিয়ে দিলো। সামলাতে না পেরে পালি মেঝেতে ছিটকে পড়ে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো।

চলবে…

বিষাদনীড়ে মায়াতরী [১২]
প্রভা আফরিন
_
শুক্রবারের দুপুরে খন্দকার বাড়ি জমজমাট। পাড়া-প্রতিবেশীরা মিলে মেঝেতে পাটি বিছিয়ে বসে টিভির ভলিউম জোরে দিয়ে সিনেমা দেখে। দেখতে দেখতে বিকেল গড়ায়। কখনো হাসে, কখনো কাঁদে, আবার কখনো হৃদয়ঘটিত, প্রেমময় মুহূর্তে লজ্জায় মুখ ঢাকে। পালির টিভির প্রতি ভীষণ ঝোক। মামী আশেপাশে না থাকলেই সে টিভি জুড়ে, ভলিউম কমিয়ে একেবারে সম্মুখে বসে দেখে। বসার ভঙ্গিটা এমন যে পারলে চব্বিশ ইঞ্চির ভারী টিভিটা কোলে উঠিয়ে নেয়। তাকে সঙ্গ দেয় এনাম। জুলেখা আশেপাশে না থাকলে তারা একজন আরেকজনকে ডেকে আনে টিভির ঘরে। লুকিয়ে এমন কাজ করার মাঝেও একটা উৎকন্ঠামূলক আনন্দ আছে। পালি সেটা খুব উপভোগ করে।

বাড়ির বড়ো উন্মুক্ত ঘরটায় টিভি রাখা। বাইরে বসেও অনায়াসে দেখা যায়। সাথেই মেহেরুন বানুর শোবার ঘর। পালি যখন ওনার চোখ ফাঁকি দিয়ে বের হয় মেহেরুন বানু টের পান। তবে কিছু বলতে গিয়েও পারেন না। মেয়েটার কোনো খেলার সাথী নেই। সারাদিন একা একাই এটা-ওটা করে বেড়ায়। স্বভাবে দুরন্তপনা নেই। দুষ্টুমি, রা’গ-জে’দ, হাসি-কান্না সবটাই ধীরস্থির। মেহেরুন বানু ওকে শাসন, ধম’ক দিতে গিয়ে প্রতিবারই থমকে যান। এক জীবনে মাকে নিয়ে করবীর হাজারটা অভিযোগ ছিল। মা তাকে খুব একটা স্বাধীনতা দিতে চাননি। না দিতে চাওয়াটাই করবীকে আরো বেশি জেদি স্বভাবের করে তুলেছিল। বাইরের জগতে বিচরণ করার প্রতি আকৃষ্ট করেছিল। চিত্রাও অনেকটা তাই। পালির ক্ষেত্রে এই কাজটি তিনি করতে চান না। নিজের কঠোর স্বভাবে লাগাম টানেন। মেয়েটার নরম স্বভাব কেটে যাক এটা তিনি চাইছেন না। তারচেয়ে বরং দৃষ্টিসীমার মাঝেই স্বাধীনভাবে উড়ুক।

আজ সিকান্দারও এসেছে খন্দকার বাড়িতে। গত একমাস ঘুরেফিরে আবারো সে গ্রামে ফিরেছে। এবারও তার সঙ্গে একটা মুড়ির পোটলা রয়েছে। তবে সেটা আড়াইশো গ্রাম ওজনের। তার পকেটের টাকা যত কম থাকবে মুড়ির পোটলার আকারও তত ছোটো হবে। সিকান্দার আজ তেল, পেয়াজ, নুন চায়নি এ বাড়ি থেকে। তাহলে অন্যদের ভাগ দিতে হবে। পরিমাণ কম থাকায় আজ সে কাউকেই মুড়ির ভাগ দেবে না বলে ঠিক করেছে। সিকান্দার মুখ ভরে মুড়ি নিয়ে টিভিতে চোখ রাখে। দুজন নর-নারী একে অপরের গা ছুঁয়ে গানের সাথে নাচছে। নারীটির পরনের পোশাক কিছুটা খোলামেলা। গানের তালে পা দোলাতে দোলাতে যখন বিরতি শুরু হল সিকান্দার বলল,
“টাউনের মাইয়াডির শরম-লজ্জা কম। শইল বাইর কইরা ঘুরাঘুরি করে। এইবার রেলগাড়ি কইরা টাউনে গেছিলাম। কী যে অবস্থা! একটা মাইয়ারও কাপড় ঠিক নাই। পুরুষগো লগে শার্ট-প্যান্ট পিন্দা বিড়ি টানে, ঢলাঢলি করে।”

সিকান্দার আশেপাশে উপস্থিত সকলের মনোযোগ কাড়তে সক্ষম হয়েছে। চামেলি পালির চুলে তেল দিয়ে দিচ্ছিলো। থেমে বিস্ময়ে বলল,
“হাছা নাকি?”

এনাম মাছি তাড়ানোর ভঙ্গিতে হাত নেড়ে বলল,
“হুর! মিছা কতা। কয় বছর আগেই না গেলাম। এইরম কিছু তো দেহি নাই।”

“কই গেছিলা এনাম ভাই?” সিকান্দার জানতে চায়।

“কমলাপুর ইস্টেশন।”

“আরে মিয়া ওইহানে এইরম পাইবেন? বড়োলোকের মাইয়ারা কি ইস্টেশনে বইয়া থাকবোনি? হেগো নিজেগো গাড়ি থাহে।”

“তে তুমি বড়োলোকি যায়গায় গেলা কেমনে হুনি?”

এনামের তাচ্ছিল্য গায়ে মাখল না সিকান্দার। আয়েশ করে পা ভেঙে বসে বলল,
“ইস্টেশনে কুলিগিরির কাম লইছিলাম কয়দিনের লইগ্যা। পরে এক বড়োলোক বেডার লগে দেহা। হেইতানি নাকি কোন গেরামে জায়গা কিনতাছে ফ্যাক্টরি বানাইতো। আইয়া গেছে ফাই’স্যা। লগে তিন তিনডা ব্যাগ। মালিকেরা যেমুন হয় আরকি। নিজের ছুডু ব্যাগটাও বহন করে না। পরে আমারে কইলো এক্কেরে বাড়ি পর্যন্ত আউগ্যাইয়া দিতে। টেহা বাড়াইয়া দিবো। আমিও ঢাকা শহর দেহার সুযোগ হাতছাড়া করলাম না। কিন্তু গিয়া যা দেখলাম, আল্লাহ রে আল্লাহ! আগে জানলে জিন্দেগীতে যাইতাম না।”

সিকান্দার থেমে চারিদিকে চোখ বুলিয়ে নিলো। তার সন্তুষ্ট হাসি সকলের মনোযোগ নিজের দিকে ধরে রাখার গৌরব প্রকাশ করল। চামেলি কৌতুহল ধরে রাখতে না পেরে জিজ্ঞেস করল,
“থামলেন ক্যান? কী দেখলেন গিয়া?”

“খাড়াও কইতাছি।” সিকান্দার আরেক মুঠ মুড়ি চিবিয়ে নিলো। এরপর বলল,
“গিয়া দেহি মালিকের বাড়ির যুবতী মাইয়ারা ঠোঁটে দামী বিড়ি গুইজ্জা, হাতে লালপানি লইয়া এট্টুনি কাপড় পিন্দা ঘুরতাছে।”

আধ হাত মেপে দেখায় সিকান্দার। মহিলারা ছি ছি করে মুখে আঁচল চেপেছে। এনাম বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলাচলে। এদিকে পালি শুধু হা করে কথা গিলছে। এত সুন্দর করে কাহিনি বানিয়ে বলায় সিকান্দারের ইচ্ছে হলো নিজের পিঠ চাপড়ে বাহবা দেয়৷ এমন সময় মেহেরুন বানু উপস্থিত হলেন। ধমক দিয়ে বললেন,
“মজলিশ বহাইলে টিভির কি দরকার? টিভি বন্ধ কইরা দেই?”
অতঃপর মজলিশে ভাঙন পড়ল। মেহেরুন বানু পালির দিকে তাকিয়ে বললেন,
“তেল দেওয়া শেষ কইরা চিত্রার কাছে যা।”

তেল দেওয়ার পর চিত্রার ঘরে যাওয়ার কথা থাকলেও পালি গেল না। সে গেল সিনেমা শেষে বইখাতা নিয়ে একেবারে শেষ বিকেলে। কিন্তু চিত্রা ঘরে নেই। তাকে পাওয়া গেল পুকুরপাড়ে। ঘাটের শেষ সিড়িতে পা ডুবিয়ে, গালে হাত দিয়ে বসে আছে। চিত্রা গত এক সপ্তাহ স্কুলে যায়নি। সারাদিন মনমরা হয়ে বাড়িতে বসে থেকেছে। এমনিতেই হিমাদের ঘটনা ও রবিউল খন্দকারের সিদ্ধান্ত নিয়ে বাড়ির সকলের মন বিক্ষিপ্ত। এরমাঝে চঞ্চল মেয়েটির হুট করে চুপসে যাওয়া বিশেষ কারো ভাবনায় আসেনি। মেহেরুন বানু অবশ্য বেশ কয়েকবার জিজ্ঞেস করেছেন কোনো সমস্যা হয়েছে কিনা। চিত্রা ভালো লাগছে না বলে এড়িয়ে গেছে। আজ সিনেমা দেখার সময়ও সে ঘর ছেড়ে বের হয়নি।

“এই বুবু, তোমারে সারাবাড়ি খুঁজি আমি, আর তুমি এইখানে?”

পালি চিত্রার পাশে বসেছে। চিত্রা মলিন হাসি দিয়ে তার গাল টেনে দিলো। বলল,
“আমাকে কেন খুঁজছিস?”

“আমাকে অঙ্ক পড়াবে আসো। কিছুই বুঝি না। অঙ্ক স্যার অনেক রাগি। খালি বেত দিয়ে মা’রে।”

“ভাইয়ার কাছে যা।”

পালি আঁতকে ওঠে। হিমাদের কাছে পড়তে যাওয়া তো দূর সে সামনেই যাবে না। তাকে দেখলে হিমাদ ভাই এমনভাবে তাকায় যেন গিলে নেবে। আর সেদিনের চ’ড়টা বারবার মনে পড়ে যায়। পালি মাথা নেড়ে বলল,
“তুমি পড়াও।”

“পরে পড়বি। রাত হওয়া দেখ। আধার কীভাবে ধীরে ধীরে আলোকে জড়িয়ে ধরে সেই সৌন্দর্য দেখ।”

পালি চিত্রার উদাসী স্বরের কোনো কথাই বুঝলো না। তবে সে তার হাতের বাধন থেকে সরেও গেল না। চিত্রা চুপচাপ তাকিয়ে রইলো শেষ বিকেলের ম্লান হতে থাকা আকাশের দিকে। একসময় পাখিদের কলরব কমে এল। পুকুরপাড়ের জলঝোপ থেকে ব্যাঙ ডাকছে। ধীরে ধীরে জেগে উঠছে নিশাচর প্রাণীরা। ঝিঝি পোকার অক্লান্ত শব্দে চিত্রা মন খারাপের সুর শোনে। পুকুরের জলে মেশে বেদনার রঙ। চারিদিকে এত হাহাকার কেন? নাকি তার দৃষ্টিতেই হাহাকার? পরদিন চিত্রা স্কুলে গেল স্বাভাবিক মনে। ছুটির পর বাড়ি আসার পথে হুট করেই দেখা হল রনির সঙ্গে। চিত্রা মুখ ঘুরিয়ে চলে যেতে নিলে রনি ডাকে,
“আপনের কী আজ অনেক তাড়া?”

অবাদ্ধ হৃদয়ের চাপে পড়ে চিত্রাকে থামতে হল। এই কন্ঠস্বর যে তার অন্তঃস্থলে কাঁপন ধরায়। কিন্তু সে কথা বলল না। এই লোক তার অনুভুতিতে আঙুল তুলেছে। তাকে পরোক্ষভাবে রূপ নিয়ে দম্ভ করা মেয়ে বলেছে। যে চোখের ভাষাই চেনে না তাকে হৃদয় চেনাবে কেন?
রনি মাথা নত করে এসে সামনে দাঁড়ালো। বলল,
“আপনে আমার উপরে রাগ কইরা আছেন?”

“তো আপনি চাইছেন খুশিতে নাচবো?”

“আস্তাগফিরুল্লাহ, খোলা রাস্তায় নাচবেন ক্যান?”

চিত্রার রাগ চিড়চিড় করে বাড়ছে। মুখ গরম হয়ে লাল বর্ণ ধারণ করছে। সে খেকিয়ে বলল,
“আজাইরা আলাপ করতে আসছেন? আপনার কাজ নেই? আব্বা কী আজকাল টাকা দিয়ে বেকার পালন করছে?”

রনির মাথা আরো নত হল। মিনমিন করে বলল,
“আপনে এতদিন আহেন নাই ক্যান?”

চিত্রা ভ্রু কুচকে তাকিয়ে রইলো রনির অবনত মুখের দিকে। এই একটি কথার অনেকগুলো মানে হয়। চিত্রা ব্যঙ্গ করল,
“কেন? আমার বিরহে রাস্তায় ঘুরেছেন নাকি?”
“একটা কথা কইতে খুঁজছি।”
“কী কথা?”

রনি জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে বলল,
“যার হাসি সুন্দর তারে কানলে সুন্দর লাগে না।”

“নিচে কী হ্যাঁ? আমার চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলুন। আমাকে অসুন্দর লাগলে আপনার কী?”

“আমার লইগ্যাই আপনেরে কান্দা লাগছে। আমার লইগ্যাই অসুন্দর লাগছে।”

চিত্রার কান্না পেয়ে গেল। চোখের পানি আটকানোর আপ্রাণ চেষ্টা করে ভেজা গলায় বলল,
“তাহলে আমাকে আর কখনোই সুন্দর লাগবে না। আপনার বিরহে যে আমায় সারাজীবন কাঁদতে হবে।”

“আপনের বয়সটা আবেগের। তাই…”

“হ্যাঁ আপনি তো বুড়া, দাদার বয়সী। এখন আমায় জ্ঞান দেবেন তাইতো?” চিত্রা কিড়মিড়িয়ে ওঠে।

“এত রাগ ক্যান আপনের?”

“যখন আচরণে মধু ঝরেছে তখন তো চোখে পড়েনি।”

“আপনে রাইগা আছেন। আমি আর কিছু কমু না।”

দুজনে নিরবে দাঁড়িয়ে থাকে অনেকটা সময়। আকাশে মেঘ জমেছে। গুরুম গুরুম আওয়াজ বর্ষণের আহ্বান জানাচ্ছে। চিত্রার মনের বরফ গলে গেছে রনিকে দেখেই। যাকে সমস্ত ধ্যানজ্ঞান দিয়ে বসেছে তার প্রতি কী করে রাগ করে থাকবে সে? এক সপ্তাহের অভিমানে একটু তো কাজ হয়েছে। নারীর অভিমানী মুখ যদি পুরুষের হৃদয়কে আন্দোলিত না করতে পারে তবে সেখানে অনুভুতি ফিঁকে। সে পুরুষ হৃদয় ছুঁতে জানে না। রনিকে কী ছুঁয়েছিল? নয়তো সে তার অপেক্ষায় ছিল কেন? চিত্রা আবেগ গিলে বলল,

“এতদিন যেমন আমার অপেক্ষায় রাস্তায় দাঁড়িয়ে থেকেছেন। পরেও যেন তেমন দেখি।”

“প্রত্যেক দিন কাম ফালাইয়া আইলে আপনের আব্বা আমারে ঘাড় ধাক্কা দিয়া কামেরতে বাইর করব। তাছাড়া এইডা ঠিক না। কারো নজরে পড়লে রক্ষা নাই। আপনে একটু বোঝার চেষ্টা করেন। আমি তো খালি কান্দানের লইগ্যা মাফ চাইতে আইছিলাম।”

“আমি মাফ করিনি।”

রনি দিশেহারা হয়। চুলে এলোমেলো আঙুল চালিয়ে বলে,
“কোন ঝামেলায় পড়লাম? আমার এহন নদীতে ঝাপ দিতে মন চাইতাছে।”

চিত্রা মিষ্টি হাসে। বাতাসে ভালোবাসা ছড়িয়ে বলে,
“আমি তো আপনাকে নিয়ে প্রেমের নদীতে ঝাপ দিতে চাই। সেই নদী তো আপনার চোখে পড়ে না।”

চলবে…