#বিষ_করেছি_পান(৩৮)
(কপি করা নিষেধ)
প্রথমবার কল হতেই রিসিভ করে ছানোয়ার।
— রিতী?
— বাবা!
— কোথায় তুমি? ফোন তুলছিলে না কেনো? টেনশন হয়না বাবার? কাল থেকে ফোন দিচ্ছি। তোমার রুমমেট রাও ফোন তুলছে না। ঠিক আছো তো?
— হ্যা বাবা আমি ঠিক আছি। তোমরা ভালো আছো?
— হ্যা। ক্লাসে গিয়েছিলে?
— হ্যা।
— রাতে খেয়েছো?
— হ্যা।
— এখন কি করছো?
পাশেই সোহাগ এসে দাঁড়ায়। ফোনের কাছে মুখ নিয়ে বলে,
— সংসার করছে।
রিতী তৎক্ষনাৎ সোহাগের থেকে সরে দাঁড়ায়। ছানোয়ার প্রশ্ন করতে করতে উত্তেজিত হয়ে পড়ে,
— কে? কে কথা বললো? রিতী তুমি কোথায়? ছেলের ভয়েজ এলো কোথা থেকে?
— বাবা..বাবা.. ঐতো ফোনে। ফোনে। রাইমা আপু নাটক দেখছে।
— নাটকের ভয়েজ এতোটা দৃঢ় শুনাবে নাতো। কই এখন তো শব্দ পাচ্ছিনা।
— আমি দূরে সরে দাঁড়িয়েছি তো।
সোহাগ আবার রিতী পাশে এসে দাঁড়ায়। মাথা ঝুমিয়ে বলে, — হ্যা শ্বশুরবাবা।
— ঐতো.. আবার।
রিতী সোহাগের দিকে চোখ রাঙিয়ে বারান্দা থেকে দৌড়ে ভেতরে আসে। পেছন পেছন সোহাগ ও আসে।
— বাবা বললাম তো নাটকের আওয়াজ।
— সত্যি তো?
— হ্যা। মিথ্যা হবে কেনো? আমি কি তোমাকে মিথ্যে বলি বাবা?
— না। তোমার রুমমেটকে ফোনটা দাও তো। কথা বলি।
— ইসস বাবা! তুমি কেনো কথা বলবে কারণ ছাড়া? এমন করলে কি মনে করবে?
সোহাগ রিতীর দিকে এগোতে এগোতে বললো,
— দাও কথা বলি।
রিতী আবার অন্যদিকে সরে গেলো। ছানোয়ার কে বললো,
— বাবা আমার পড়া আছে। আমি রাখি?
— তোমার মার সাথে কথা বলো।
— মার সাথে কাল বলে নিবো। এক্সাম আছে বাবা। এখন পড়ি?
ছানোয়ারকে কিছু বলার সুযোগ না সোহাগ ফোন কেড়ে নেয়। কল কেটে বিছানায় ঢিল ছুড়ে। টুপ করে কল কাটতেই রিতী চেঁচিয়ে উঠে,
— এইই.. সমস্যা কি আপনার? দেখছিলেন না বাবার সাথে কথা বলছিলাম?
— সত্য কথাতো আর বলছিলে না। সব মিথ্যা কথা।
— তো আমি কি এখন বলবো যে আমি শ্বশুর বাড়ি এসেছি? শ্বশুরীর হাতের আদর খাচ্ছি, শ্বশুরের দোয়া নিচ্ছি, ননদিনীর ভালোবাসা নিচ্ছি।
— স্বামীরটা ইগনোর করছি। তাইতো?
রিতী মুখ ঘুরিয়ে দাঁড়ায়। স্বামী মাই ফুট! এরকম একটা ভঙ্গি। সোহাগ মৃদু হাসে। রিতীর মুখ বরাবর দাঁড়ায়। রয়ে সয়ে প্রশ্ন করে,
— আমাকে অপছন্দের কারণটা কি?
— পছন্দ অপছন্দ কোন ব্যপার না। আমলেই নেই না।
— সেজন্য বুঝি এতো সহজেই নিজের জীবনের সাথে জড়িয়ে নিলে? আমি তো ছিলাম ভাসা ভাসা। গভীরে টানলো কে? আমার ঘরে আসা, শ্বশুর শাশুড়ি, আত্ত্বীয় স্বজন, এবাড়ির কোনায় কোনায় নিজের অস্তিত্ব রাখা হচ্ছে! এতো সহজেই আপন করা হচ্ছে? তুমি কি চাও পিরীতি?
সোহাগের কথায় রিতীর পায়ের রক্ত মাথায় উঠে যায়। ধাক্কা দিয়ে বিছানায় ফেলে দিয়ে তার দিকে তেড়ে যায়। রাগে দুঃখে অন্ধ হয়ে গেছে পিরিতি। সোহাগের গলা চেপে ধরে। প্রচন্ড জোরে চাপ দেওয়াতে কাশি উঠে। কাশতে কাশতে রিতীকে ছাড়াতে চেষ্টা করে।
— আমার সাথে এতো কিছু করে এখন বলা হচ্ছে আমি কি চাই তাইনা? তোর সব জুলুম ভুলে চলে গিয়েছিলাম তবুও তুই আমায় শান্তি দিলিনা। ভার্সিটিতে গিয়ে তোর এই খুমাটা ঠিকই আমাকে দেখালি। সবার সামনে জড়িয়ে ধরে আমাকে কালারিং করে দিলি। জোর করে তুলে এনে তোর ঘরের দায়িত্ব তুলে দিলি।দুনিয়াকে জানিয়ে আবার বিয়ে করলি। বাধ্য হয়ে তোর ঘরে প্রতিটা রাত থাকতে হচ্ছে আমাকে। এর পরেও তুই বলবি আমি কি চাই? আর কতভাবে কষ্ট দিবি তুই আমাকে। আমার শরীরটাই যদি তোর প্রয়োজন হয় সেটাও তো গ্ৰহণ করছিস না। দু দুটো রাত কেটে গেছে শরীরটাই যদি লাগতো তোর আমি এখনো অক্ষত থাকতাম না। আমার ভেতরটা জ্বালিয়ে জ্বালিয়ে ছাই করে দিচ্ছিস তুই। প্রতিনিয়ত এক অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ এর দিকে তাড়িয়ে নিচ্ছিস। আমার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যাচ্ছে। আমি দূর্বল হয়ে পড়ছি। আমার বেঁচে থাকার ইচ্ছে টা চলে যাচ্ছে। মুক্তি চাই আমি। প্লিজ মুক্তি চাই আমি।
কান্নায় ভেঙে পড়ে রিতী। হাত দুটো নরম হয়ে আসতেই ছাড়িয়ে নেয় সোহাগ। রিতীর কান্না দেখে দম বন্ধ হয়ে আসছে সোহাগের। তার কারণে রিতী কষ্ট পাচ্ছে। একসময় সে তো এটাই চাইতো। রিতীর কষ্ট দেখে ভালো লাগতো। কিন্তু আজ ভালো লাগছে না। মায়া ভরা চোখ দুটো থেকে গড়িয়ে যাওয়া জল সোহাগ বিন্দু মাত্র সহ্য করতে পারছেনা। সোহাগের ক্ষমতাও নেই এই জল গড়িয়ে পরা বন্ধ করবার। কারণ সে রিতীকে মুক্তি দিতে পারবেনা। দু দুবার বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছে তারা। এতো সহজে এই বন্ধন ছুটাতে পারবেনা। রিতীর হাত দুটো মুঠোয় চাপ দিয়ে থমথমে গলায় সগোক্তি করে।
— তোমার ভবিষ্যৎ আমি পিরিতী। এই বাড়ি তোমার আপনালয়। আমার মা বাবা তোমার পরিবার। তুমি চাও বা না চাও তোমার কোন মুক্তি নেই।
— আপনার বাড়ি আমার মতো মেয়ের সপ্ন। আপনার মা বাবার মতো ভালো শ্বশুড় শাশুড়ি আমার জন্য নেয়ামত। কিন্তু আপনি আমার জন্য অভিশাপ।
— যেদিন থেকে তুমি আমার বউ হয়েছো সেদিন থেকে আমি তোমার সাথে খারাপ ব্যবহার করিনা পিরিতি। ভবিষ্যত এও করবোনা। আমি ভুল ছিলাম। আমার মস্তিষ্ক বিকৃতি ধরনের ছিলো। ট্রাস্ট মি। বউ বউ ই হয়। তুমি আমার বউ। তুমি আমার সব। আমার আর কিছু চাইনা। তোমাকে পেয়েছি আমার সব পাওয়া হয়ে গিয়েছে। একবার ট্রাস্ট করে দেখো। আমি কখনোই তোমাকে কষ্ট দিবোনা।
— আপনি নিজেই আমার জন্য এক পৃথিবী কষ্টের। কিসের জন্য আপনার কাছে থাকবো আমি? কি আছে আমাকে দেবার মতো আপনার?
— কি চাই তোমার? শুধু একবার বলো আমি সব দেব তোমাকে।
— কিচ্ছু দিতে পারবেন না। আমাকে স্ত্রী করার কোন যোগ্যতা নেই আপনার। কোন দিক দিয়ে সুখ দিবেন আমাকে? একটা মেয়ে একজন স্বামীর কাছে যা চায় তার কিছুই নেই আপনার। না আর্থিক,না শারীরিক,না মানসিক! কোন দিক থেকেই আমাকে তুষ্ট করতে পারবেন না। বাপের হোটেলে বসে কতদিন? বাপের সাথে কাজ করতেন সেই যোগ্যতাটাও তো আপনার নেই। মূর্খ কথাকার। আমার জন্য নিজেকে হেফাজত না করে শরীরটা ভোগ করিয়েছেন কত মেয়ে দিয়ে। শুধু কি একটা মেয়েই কলঙ্কিত হয়? ছেলেরা হয়না? আপনার এই সৌন্দর্যে অদৃশ্য কালি পড়ে গেছে যা আমাকে আর আকর্ষন করেনা। যখনি আপনার ছোঁয়া পাই তখনি আমার মনে হয় আমি কয়েকজনের ব্যবহৃত ছুড়ে ফেলা নোংরা একটা ব্যক্তির ছোঁয়া পাচ্ছি। আমি নিজেকে হাজার চেষ্টা করেও মানিয়ে নিতে পারি না। আপনার ব্যবহার, আপনার চরিত্র, আপনার চালচলন, কার্যকলাপ , আপনার জগণ্য স্মৃতি সব কিছু আমাকে বিষিয়ে রাখে। আমি কিছুতেই মানসিক শান্তি পাইনা। আমার হাঁসফাঁস লাগে।যখন মনে হয় আমি বিবাহিত আর আমার স্বামী সকলের ঘৃণীয় ঐ বখাটে সোহাগ আমি মরতে মরতেও বেঁচে থাকি। আমার আপনাকে সহ্য হয়না। আমি পারিনা।
সোহাগ মাথা নিচু করে আছে। এতো নিম্নস্তরে সোহাগ নিজের জায়গা তৈরী করেছে! অথচ সে সবসময় ভাবতো তার জাগয়া উঁচু স্তরের একটা দামী চেয়ারে। যার আছে কাড়ি কাড়ি টাকা। আশেপাশে সুন্দরী মেয়ের আনাগোনা। বিলাশবহূল জীবন যাপন। দামী দামী মদ যার অভিজাত্য। এতো বড় স্তরের লোক হয়েও মিশেছে নিচু স্তরের মানুষের সাথে। তাদের জীবনের স্বাদ ও ভোগ করেছে। নিজেকে পরিচিত করেছে নিরহংকার একজন করে। অথচ সে এসবের কিছুই না। তার কিছুই নেই। রিতী তাকে আজ তার আসল স্থানটা আঙুল তুলে দেখিয়ে দিলো। এতোটা অক্ষম যে যা নিয়ে এতো বড়াই যেখান থেকে আসে এতো এতো টাকা যার উত্তরাধিকার একমাত্র সে, যে চেয়ার একমাত্র তার সে চেয়ারে বসায় যোগ্যতা টুকুও তার নেই। খাদে পড়ে আছে সে। সেখান থেকে উঠার সামর্থ্য নেই। যার প্রতি মেয়েরা নিমেষেই আকর্ষিত হয়, বিছানায় যাবার জন্য একপায়ের উপর খাড়া থাকে আজ সে পারছেনা তার স্ত্রীকে আকর্ষণ করতে। পারছেনা স্ত্রীকে সুখী করতে। নিজেকে ব্যর্থ একজন পুরুষ মনে হচ্ছে। অক্ষম একটা ব্যক্তিত্ত্ব সে। নিজেকে খুব তুচ্ছ মনে হচ্ছে। পাশেই বসে ঢুকরে কাঁদছে পিরিতি। জীবনে কখনো কাউকে সোহাগ এভাবে কাঁদতে দেখেনি। এতোটা কাঁদাচ্ছে সোহাগ রিতীকে? এতোটা জগণ্য স্বামী সে? ফ্যালফ্যাল করে রিতীর দিকে দেখছে। বউটার কান্না তাকে এতো কষ্ট দিচ্ছে!
কান্না থেমে এসেছে রিতীর। একটু পর পর ফুঁপিয়ে উঠছে। শরীরটা বসে থাকতে সায় দিচ্ছেনা। ফ্লোরটাও অনেক ঠান্ডা লাগছে। এতোক্ষণ কান্না করে মনটাকে অনেক টা হাল্কা লাগছে। নিজের রাগটা আজ পুরোপুরি সোহাগের উপর উগলে দিয়েছে। বিষন্নতা কেটে গেছে। রিতী মুখ তুলে সোহাগের দিকে তাকায়। সোহাগ রিতীর দিকেই তাকিয়ে আছে। চোখ দুটো ছলছল করছে। একি সোহাগ কাঁদছে! রিতী একটু নড়েচড়ে বসে। সোহাগের মুখোমুখি হয় যাতে ভালোভাবে দেখতে পারে। সোহাগের গাল বেয়ে টুপ করে জল গড়িয়ে পড়লো। রিতী যেনো ঐ জল দেখে শান্তি পেলো। খুব ভালো লাগলো। তার থেকে বেশি ভালো লাগলো সোহাগের অপরাধী মুখখানা দেখে। করুণ ভেজা চোখে তাকিয়ে আছে রিতীর দিকে। আজ বুঝি বেশি হার্ড করেছে রিতী সোহাগকে? ভেবেই রিতীর মনে খুশির জোয়ার বয়ে গেলো। সোহাগ নিজের অপরাধ বুঝতে পেরেছে। অনুভব করতে পেরেছে। রিতীর জন্য মনের কোঠায় জায়গা তৈরি করেছে। নিজের গ্যাং ছেড়েছে। আজকাল বাড়ীর ছেলে হয়ে গিয়েছে। যতটুকু সম্ভব পিরিতি পিরিতি করেই দিন কাটিয়েছে। এসব কিছু রিতীর অজানা নয়। জানতে পারা কঠিন কোন বিষয় ও নয়। শুধু যে সোহাগ রিতীর জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিলো তা কিন্তু নয়। রিতীর ও মাঝে মাঝে স্বামীকে দেখার বড্ড সাধ জাগতো। হুজুকের বশে আড়াল থেকে সোহাগকে কয়েকবার দেখেছিলো। সোহাগের উৎসুক চেহারা, ভারাক্রান্ত দেহ সবটাই রিতীর চোখে ধরা পড়েছে। রিতী জানে একবার সে সোহাগের সাথে নিজেকে জড়িয়েছে। জেনে শুনে বিষ পান করেছে। এর থেকে নিস্তার নেই। রিতী এও জানে সোহাগের সাথে তার সংসার হবার সম্ভাবনা নেই। থাকলেও খুবই কম। তাই সে সোহাগ আর তার পরিবারের সবটা মেনে নিয়েছে। নিজের ইচ্ছেতেই আছে। যতক্ষন এ বাসায় থাকবে ততক্ষন ই তার সংসারের সময় চলবে। এরপর আর কোনদিন তার স্বামীর ঘরে সংসার হবে কিনা সে জানে না। তাই যতক্ষন এই সুযোগ পাচ্ছে ততক্ষন বাড়ির বউ হয়ে থাকছে। রিতী সোহাগের চারচোখ এক হয়ে আছে। কেউ চোখ নামিয়ে নিচ্ছে না। ঘরময় পিনপতন নিরবতা। মাঝে মাঝে দু একবার রিতীর ফুপানোর আওয়াজ ভেসে আসছে। সোহাগের এমন রুপ রিতীকে আন্দোলিত করছে। রিতী জানে সোহাগ তার কাছে ক্ষমা চাইবে। রিতী তখন পারবেনা আর সোহাগকে ক্ষমা না করে থাকতে। সে সময়টার অপেক্ষাতেই আছে। ঘন্টা খানেক পর সোহাগ চোখ দুটো মুছে নেয়। বিছানা থেকে উঠে দাঁড়ায়। রিতীর সামনে উঠে আসে। নিজেকে শক্ত রেখে বলে,
— আমি কখনো নিজেকে ছাড়া অন্য কারো কথা ভাবিনি। যেহেতু তুমি আমার অর্ধাঙ্গিনী আমার অর্ধেক অংশ তাই আজ আমি প্রথমবারের মতো তোমার কথা ভাবলাম। কাল সকালে খেয়ে দেয়ে চলে যেও। ড্রাইভার তোমাকে পৌঁছে দিবে।
সোহাগ এটুকু বলেই আর থামলো না। হন হন করে ঘর থেকে চলে গেলো।
রিতী আকষ্মিক এমন সিদ্ধান্তে চমকালো। ভড়কালো। অবাক হলো। সোহাগকে ডাকার চেষ্টা করলো। গলা থেকে আওয়াজ বেরোলো না। ঠায় বসে রইলো।
চলবে,
লাবিবা তানহা এলিজা ~
#বিষ_করেছি_পান(৩৯)
(কপি করা নিষেধ)
রিতী ড্রয়িংরুমে এসে সোহাগ কে আর পেলো না। মেইন দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখতে পেলো শ্বাশুড়ি কে। রিতীর দিকেই তাকিয়ে আছে। রিতী দৌড়ে কাছে গেলো। ব্যস্ত ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করলো,
— আম্মা আপনার ছেলে আসছিলো নিচে।
— বাইরে চলে গেছে।
— কোথায়?
সোহাগী উত্তর দিলো না। রিতীর হাত ধরে এনে সোফায় বসলো। রিতীকেও বসালো। রিতী এখনো তাকিয়ে আছে শ্বশুড়ির পানে। সোহাগী হাঁসফাঁস করছে। চিন্তায় মুখটা একটুখানি দেখাচ্ছে। রিতী অবস্হা দেখে ডাকলো,
— আম্মা?
— বউমা? তুমি নাকি কাল চলে যাবা?
— আমি তো বলিনি আম্মা।
— আমার পোলায় কি কইলো এইডা? আম্মা? ও আম্মা? তুমি আমার পোলারে ভালোবাসো না? জোর করি বিয়া করছো না? আমার পোলারে মাইনা নিছো না? বিয়ার পরের রাইতে আমার পোলা বাড়িত থাইকা বাইরাইয়া গেলো কেন? ও আম্মা? আমরা তো তোমার ভরসায় আছিলাম। তুমি কেন চইলা যাবা?
উত্তেজনায় গা কাঁপছে সোহাগীর। রিতী হাত দুটো মুঠো করে ফ্লোরে বসে পড়ছে। চোখে মুখে আতঙ্ক! রিতী কি উত্তর দিবে?
— আম্মা! আমার পোলা তোমার স্বামী! স্বামী কি চিনো? বুঝো স্বামী মানে কি?
রিতী হাত দুটো ছাড়িয়ে নিলো। টেবিল থেকে পানির গ্লাসটা হাতে নিলো।
— আম্মা আপনি পানি খান। নেন পানি নেন।
সোহাগীর মুখের সামনে ধরে। রিতীর হাতেই সোহাগী গলা ভেজায়। একটু ধীর স্থির হয়। ফের বলে,
— আমার পোলা যা কইলো তা কি সত্যি? আল্লাহ না করুক সব যেনো মিথ্যা হয়। আমরা মুসলমান ঘরের মেয়ে। আমাদের কাছে স্বামী হলো আবরণ। মহামূল্যবান অলংকার। মায়ের পরে যদি কারো পায়ের নিচে জান্নাত হতো তাহলে সেই জায়গায় স্বামীকেই বসানো হতো। বিয়ের পর স্বামীই একটা মেয়ের পরিচয়। সুখ। স্বামীর ঘর ই নিজের ঘর। সেই ঘর ছাড়ি তুমি চলে যাবা আম্মা? আমারে শ্বাশুড়ি না ভাবি বন্ধু ভাবী কওতো আম্মা তোমাদের মধ্যে কি প্রবলেম হয়ছে? আমি ছাড়া কে আছে তোমার বড় শুভাকাঙ্ক্ষী কওতো আম্মা? খুলে কও নয়তো বুঝবো কেমনে?
রিতী কি বলবে বুঝে উঠতে পারছে না।তার শ্বশুর শ্বাশুড়ি এদের মন মানসিকতা এতো ভালো কেনো? এতো সহজ সরল জন্য ই বুঝি ছেলেটাকে ভালোভাবে মানুষ করতে পারেনি? শ্বাশুড়ি কে কি বলবে তার ছেলের কির্তীকলাপের জন্য তাকে কাছে টানতে পারছেনা? ভীষণ কষ্ট পাবে মহিলা। মা তো! রিতী সে সমন্ধে কিছু বলেনা।
— না না আম্মা। তেমন কিছু হয়নাই। আপনার ছেলে একটুতেই রেগে গেলো আমার উপর। তেমন কোন কারণ নেই।
রিতীর কথা শুনে সোহাগী মুচকি হাসে। আয়েশ করে সোফায় বসে বলে,
— আমারে বোকা পাই ও না। তোমার শ্বশুরের ঘর করতাছি ত্রিশ বছর হয়লো। আমার সব ই জানা। উনি আমারে পছন্দ করতো কিন্তু আমি করতাম না। সন্ডা পন্ডা লোক ছিলো। আমিতো প্রথমে মানতেই পারিনাই। পরে আস্তে আস্তে বুঝলাম মানুষ টা খারাপ না। ভালোবেসে ফেললাম। লোকটাও আমারে এতো ভালোবাসে যে আমার জন্য সব করে। আমি তারে যা যা বলতাম তাই করতো। বিয়ের পর আমরা পড়াশোনা শেষ করলাম। তোমার শ্বশুর ব্যবসায় ঢুকলো। বাজে অভ্যাস গুলো একেবারে ছাড়লো তারপর সোহাগরে জম্ম দিলাম। আগে কিন্তু নেই নাই। আমার শ্বশুড়ী আমারে সব শিখায়ে দিতো। পোলা বড় করলাম এইযে পোলার বউও আনলাম এখনো আমার সুখ এক রত্তি কমেনাই। মাঝে মাঝে তোমাদের জন্য টেনশন হয় এই যা। এই ত্রিশ বছরে তোমার শ্বশুর আমারে এতো সুখ দিছে যা ধারণা করতে পারবা না। যেদিন থেকে আমি তারে মন থেকে মানি নিছি সেদিন থাইকা আমিই মানুষটার বস। ঘাড় ত্যরামি যতই করুক সোজা সব আমার কাছে আসিই হয়। সোহাগ টা হয়ছে একদম তার বাপের মতো। বাপ মায়ের কথা মানবো না। কিন্তু বউ পাগলা। যেদিন আমার পোলা কইলো তোমার কথা! তারে ফাঁদে ফালায়ে বিয়ে করছো সেইদিন ই বুঝছি তুমিই তারে ঠিক করতে পারবা। আমার তো ভাবছিলাম আমি কোনদিন পোলার বউয়ের মুখটাও দেখতে পারমুনা। পোলা আমার বিয়ে শাদী সংসার পছন্দ করেনা। আম্মা মেয়ে মানুষের হাতে অনেক ক্ষমতা। একটা মেয়ে মানুষ একসাথে অনেক গুলা পুরুষ মানুষেরে পরিচালনা করার ক্ষমতা রাখে। সেখানে তোমার মতো বুদ্ধিমতী আমার একটা ত্যাড়া পোলারে কেনো সোজা করতে পারবানা? আমার সোহাগ তোমারে এতো ভালোবাসে দেখো তুমি যা বলবা তাই মেনে নিবো। একটুও অবাধ্য হবোনা। মান অভিমানের পালা ছেড়ে আমার পোলারে আপন করে নাও আম্মা। ধৈর্য ধরো। দেখবা তুমিই পৃথিবীর সব থেকে বেশি সুখী হবা।
— আপনি ঘরে যান আম্মা। আব্বা ঘরে। আপনি যান।
— তোমার আব্বায় ঘুমায়। একা একা কি বসে থাকবা? পোলাটা কখন না কখন ফেরে দরজা তো খোলা। তুমি কি কাল আসলেই চলে যাবা?
— আমি বলি নাই আম্মা। এইটা আপনার ছেলের রাগের কথা। উনি এতোরাতে কোথায় যেতে পারে আম্মা?
সোহাগীর মুখটা কালো হয়ে যায়। মা সে। ছেলের হাব ভাব চাল চলন রগে রগে চেনা। নতুন বউটার সামনে মান ইজ্জত যেনো খোয়া না যায়। মনে মনে দোয়া পড়লো। তবে সেই দোয়া কবুল হলোনা। শেষ রাতের দিকে সোহাগ ঠিকই বাড়ি ফিরলো।
রিতী সোহাগী সোফায় বসেই গল্প করে সোহাগের জন্য অপেক্ষা করছিলো। সোহাগ এসেই রিতীর পা ধরে বসে গেলো। উদ্ভ্রান্ত চেহারা। চুলে ধুলো লেগে আছে। দাঁড়িও ধুলোতে সাদা হয়ে গেছে। চোখ দুটো লাল টকটকে রক্তের ফুলকির মতো লাগছে। মুখ থেকে ভুস ভুস করে মদের গন্ধ বেরোচ্ছে। সোহাগের এ রুপ দেখে রিতী ভয় পেয়ে গেলো। মদের গন্ধ পেটে যেতেই নাড়িভুঁড়ি মোচর দিয়ে উঠলো।সোফা ছেড়ে উঠে দু পা পিছিয়ে গেলো। সোহাগ হামাগুড়ি দিয়ে রিতীর পা টেনে ধরলো। সোহাগীর দিক তাকিয়ে চিৎকার করে উঠলো।
— আম্মা?
সোহাগী উঠে দাঁড়ালো। রিতী কখনো এসব পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়নি তাই ভীষণ ভয় পেয়েছে সোহাগী বুঝতে পেরে সোহাগকে ধরতে গেলো। কিন্তু আটকাতে পারলোনা। সোহাগ একেবারে মুখ থুবড়ে রিতীর পায়ে পড়লো। পা দুটো জাপটে ধরেই চিৎকার করে উঠলো।
— তুমি কোথায় যাবে না পিরিতি। প্লিজ আমাকে ছেড়ে যেও না। আমি সরি। সব কিছুর জন্য আমি সরি। আমি আর তোমাকে হার্ড করবো না। তুমি যা বলবে তাই শুনবো । আমি তোমাকে কিছুতেই আলাদা হতে দিবো না। কিছুতেই না।
সোহাগ পাগলের মতো করছে। রিতীর শাড়ীর কুঁচি নামিয়ে ফেলছে। রিতী কোন মতে ধরে আছে। কলিজা যেনো শুকিয়ে মরে গেছে। নিভু নিভু আওয়াজে রিতী ডাকলো,
— আম্মা! আপনার ছেলেকে সরান.. না….
সোহাগ আরো জোরে চেপে ধরলো।
— কেনো সরাবে? সরাবে না? আমি ছাড়বো না। পিরিতি তুমি চলে গেলে আমার কষ্ট হয়। আমি তোমাকে কতটুকু চাই তুমি জানোনা? আমাকে কি একটু কম ঘৃণা করা যায়না? ট্রাস্ট মি তোমাকে দেখার পর থেকে আমার কাউকে মনে ধরে না। বিয়ের পর থেকে আমি তোমার হয়ে গেছি। কোন মেয়ের ধারে কাছে যাইনা। তুমি ছাড়া আমার কাউকে লাগবেনা। আমার তুমি হলেই চলবে। প্লিজ আমাকে ঘৃণা করোনা। আমি ভূল করেছি। তখন তো তুমি ছিলে না। আমি তোমাকে অনেক কষ্ট দিয়েছি। আমি আর একটুও কষ্ট দেবো না। তোমার যা চাই সব তোমার কাছে হাজির করবো। একটুও খারাপ আচরণ করবো না। প্লিজ একবার ট্রাস্ট করো। আমি আর বখাটেপানা করবোনা। তোমার সব অভিযোগ মাথা পেতে নিবো। সব ঠিক করে দেবো। প্লিজ…
রিতীর যেনো জান বেরিয়ে গেলো। ওক ওক করে বমির ঢেকুর উঠতে লাগলো। সোহাগীকে ডাকলো,– আম্মা?
সোহাগী দৌড়ে গিয়ে কাজের লোককে ঘুম থেকে তুলে নিয়ে এলো। সোহাগকে রিতীর থেকে টেনে নিয়ে এলো। হাত সরিয়ে নেবার সময় সোহাগ আঁকড়ে ধরতে গিয়ে রিতীর পায়ে আচড় কেটে দিলো। রিতী আহ করে উঠে সোফায় বসে পড়লো। বাকি কাজটুকু কাজের লোকটাই করে দিলো। রিতী পা চেপে ধরে সোফায় মাথা এলিয়ে ঠোঁট চেপে কাঁদতে লাগলো। কান্না কমে এলে গালে কারো ছোঁয়া অনুভব করলো। রিতী চোখ খুলে তাকালো। রমিজউদ্দিন কে দেখেই নড়েচড়ে বসলো। রমিজউদ্দিন এর হাতে টিস্যু। টিস্যু দিয়ে রিতীর চোখের পানি মুছে দিচ্ছিল। পাশেই চোখ পড়লো বাড়ির বাকি দের। সবাই জেগে গেছে। ছোট ননদটা রিতীকে বললো,
— ভাবী। ভাইয়ার পক্ষ থেকে সরি।
রিতী ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো।
— মামনী ভাবী ভয় পেয়েছে। আমাদের রুমে নিয়ে যাই?
সোহাগী রিতীর দিকে তাকালো। রমিজউদ্দিন জিজ্ঞেস করলো,
— এখন সোহাগ ঠিক আছেনা?
— হ। গোসল করিয়ে খাইয়ে দিয়ে আসছি। বউমাকে ডাকে।
— বউমা যাও মা। ব্যান্ড ছাড়া রাস্তার পচা খেয়েছিলো বোধহয়, কতটুকু খেয়েছিলো বুঝতে পারছি। তাই পাগলামো করেছে। রুমে যাও। আশাকরি আর সমস্যা হবেনা। ভয় পেও না।
রিতীর শরীর সায় দিচ্ছে না। মনের ভেতর কি হচ্ছে সেই একমাত্র জানে। দীর্ঘশ্বাস বার বার পুনরাবৃত্তি ঘটছে। দাঁতে দাঁত চেপে ধরে।
— এই মুসিবত ঝামেলা থেকে আমাকে স্বাভাবিক জীবনে ফেরাও আল্লাহ!
দুটো দিনেই হাঁপিয়ে গেছে। এই বাড়িতে এই অসভ্য লোকটার সাথে কিভাবে দিনের পর দিন কাটাবে ভেবে পায় না।রিতীকে সাহায্য করলো ননদরা। হাত ধরে দরজা অব্দি পৌঁছে দিয়েই যে যার ঘরে চলে গেলো। রিতী দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে। দরজা লাগিয়ে দরজায় পিঠ লাগিয়ে দাঁড়ায়। বিছানার একপাশে সোহাগ শুয়ে আছে। গলা অব্দি কম্বল টানা। ঘুমিয়েছে?
হয়তো তাই। ক্লান্ত হয়ে আছে। এতো পাগলামি করে…! রিতী মনে মনে বলে, — ‘সোহাগ! আপনাকে আমার আরও বাজিয়ে দেখার আছে!’
সোহাগের পাশেই উল্টো ঘুরে শুয়ে পড়ে রিতী।কম্বলটা গায়ে টেনে নেয়। শরীরটা দূর্বল লাগছে। তবে ঘুম আসছে না। মনের ভেতর হাজারো অস্থিরতার আনাগোনা। আচমকা খোলা কোমড়ে সোহাগের হাতের ঠান্ডা স্পর্শ পেতেই কেঁপে উঠে রিতী। পেছন ফেরার আগেই নিজের সোহাগ চেপে আসে রিতীর দিকে। অর্ধখোলা পিঠ সোহাগের ঠান্ডা বুকে লাগতেই হাত বাড়িয়ে সোহাগকে ছোঁয় রিতী। সোহাগের গা খালি। গোছলের পরে কিছু পরেনি। তার উপর ঠান্ডা! রিতী আমতা আমতা করে বলে,
— সোহাগ! ঘুমাননি?
— উহু।
— আপনি বমি করেছেন। দূর্বল শরীর। ঘুমিয়ে পড়ুন।
— উহু! আমাকে দাও… তোমার উষ্ণতা।
— সোহা…গ !
রিতীর শরীরের ভাঁজে ঢুকে যায় সোহাগ। অসহ্য শিহরণে জাগিয়ে তুলে রিতীকে। আর পার পায়না রিতী। সোহাগের মুখখানা আঁজলা ভরে কম্বলের নিচ থেকে টেনে তুলে ঠোঁটে ঠোঁট মিলিয়ে দেয়। দমবন্ধ কর একটা সময় পার করে সোহাগকে ছেড়ে জোরে জোরে শ্বাস নেয়। সোহাগ রিতীকে নিজের সাথে মিশিয়ে নিয়ে গলায় মুখ ঢুবায়। ছোট ছোট আদরে ভরিয়ে তোলে রিতীকে। সুখের ব্যথায় আহ! করে মৃদু চিৎকার করে উঠে রিতী। তৎক্ষণাৎ সোহাগ ব্যস্ত হয়ে পড়ে রিতীকে নিয়ে। গালে ঠোঁট ঘেঁষে অস্থির কন্ঠে জিজ্ঞেস করে,
— ব্যাথা পেয়েছো জান? সরি জান। আর ব্যথা দিবো না জান।
সোহাগের অস্থিরতায় পুলকিত হয় রিতী। আড়ালে মুখ লুকিয়ে মৃদু হাসে। সোহাগ এমন ভাবে রিতীকে আদর করছে যেনো কোনো বিড়াল ছানাকে আদর করছে। একটু শক্ত করে ধরলেই ব্যথায় নুইয়ে যাবে।তবে কি সত্যি সত্যিই বখাটে টা প্রেমে পড়লো? রিতী খিলখিল করে হেসে উঠে। আপন করে নেয় সোহাগকে।
চলবে,
লাবিবা_তানহা_এলিজা~
#বিষ_করেছি_পান(৪০)
(কপি করা নিষেধ)
ঘুম থেকে উঠতে উঠতে দেড়ি হয়ে গেলো। ঘড়িতে এগারোটা তেরো। রিতী তাড়াহুড়ো করে ফ্রেশ হয়ে কিচেনে চলে এলো। ব্রেকফাস্ট তো সেই সকালেই সবাই করে নিয়েছে। ডাইনিং এ ঢাকা দেখে রিতী দম ফেললো। তাদের দুজনের খাবার নিশ্চয় রেখে দিয়েছে। শ্বশুরবাড়িতে ঘুমাও আর না ঘুমাও। সকাল সকাল ঠিকই উঠা চাই। আদিযুগ থেকে এ নিয়ম চলে আসছে। রিতীর লজ্জা লাগছে। দুদিন ও হয়নি শ্বশুরবাড়িতে। এখনি ব্রেকফাস্টে থাকতে পারলো না?
সোহাগী রিতীকে দেখে বললো,
— উঠেছো আম্মা? সোহাগ উঠেছে?
— না আম্মা।
— আচ্ছা ঘুমাক। বসো। খেয়ে নাও।
— আমাকে ডাকলেন না কেনো আম্মা? দেড়ি হয়ে গেলো উঠতে।
— ডাকবো কিরে? ঘুমাইতে গেছো কখন! যে সকাল সকাল উঠবা?শোন আমি তোমার তেমন শাশুড়ি না। ঘুমানোর সময় ই তো এখন। এই বয়সে আরাম করবা নাতো কোন বয়সে করবা? যতদিন আমি আছি সংসারের দিক তোমার নজর দিতে হবো না। আমার পোলারে সময় দেও। লেখাপড়া করো। বড় চাকরি করো। তাতেই আমরা সবাই সন্তুষ্ট।
রিতী খাওয়া বাদ দিয়ে একমনে তাকিয়ে থাকে। বাবা মায়েরা এমন কেনো? তারা সব সময় সন্তানকে উপরে দেখতে চায়। শ্বশুড়ীরা যদি নিজেদের শাশুড়ি না ভেবে মা ভাবতো তাহলে হয়তো আমাদের দেশের মেয়েরা সংসার ধর্ম পালন করতে গিয়ে নিজেদের সপ্নকে পায়ে পিষে ফেলতে হতো না।
সোহাগী খেয়াল করলো। রিতীকে কেমন জানি লাগছে। ভালোভাবে নজর দিয়ে পরক্ষনেই চোখ ফিরিয়ে নিলো। রিতী শুধু ফ্রুটস খাচ্ছে। জুসের গ্লাসটাও ছুয়ে দেখেনি। সোহাগী মুচকি হেসে রিতীর কপালে হাত রাখলো।কপাল, গা গরম। সোহাগী মধুর কৌটাটা এনে রিতীর মুখে একচামচ দিলো। রিতী টুপ করে গিলে নিয়েই বললো,
— আম্মা,আমি মধু খাইনা।
— আরেক চামচ খাও। টেস্ট তো খারাপ না। সয়ে যাবে।
টেবিল ফ্যান টা ছেড়ে দিয়ে রিতীর ঘোমটা খুলে দিলো।
— আম্মা কি করছেন?
— তোমার আব্বা এখন বাসায় আসবেনা। দেখি চুল গুলো শুকিয়ে দেই। ঠান্ডা লেগে যাবে। এমনিতেই গা গরম। ঘরে গিয়ে ওয়ার্ডোবের উপর দেখবে মেডিসিন বক্স আছে। একটা ইসোনিক্স আরেকটা নাপা খেয়ে নিবা। ইনশাআল্লাহ শরীর খারাপ করবেনা। মাথা ব্যথা করছে আম্মা?
— একটু একটু।
— বক্সে মুভ ও পাবা। লাগিয়ে শুয়ে আরেকটু ঘুমাবা। লাঞ্চে ডেকে দিবোনি। তাড়াতাড়ি খাওয়া শেষ করো।
সোহাগী তাড়া দিয়ে খাইয়ে রিতীকে উপরে পাঠিয়ে দিলো। সিড়িতে দাঁড়িয়ে রিতী আরেকবার সোহাগীকে দেখে নিলো। রুম্পার কথা মনে পড়ছে রিতীর। রুম্পাও এমনটাই করে। রিতী চটপট রুম্পা আর সোহাগীর মিল অমিল খুঁজতে লাগলো। দুই মিনিট তল্লাসী দিয়ে তাদের মধ্যে শুধু একটা অমিল খুঁজে পেলো। রুম্পা রিতীর উপর চিল্লিয়ে চিল্লিয়ে যত্ন নেয় আর সোহাগী নরমভাবে কথা বলে যত্ন নেয়। রুমে গিয়ে রিতী দরজা লাগিয়ে দিলো। বিছানায় সোহাগ নেই। নিশ্চয় উঠে গেছে।রিতী ড্রেসিং টেবিলের দিকে এগোলো। চুলে চিরুনি করে বেণী করে নিলো। মেডিসিন নিলো। ঘাড় ঘুড়াতেই সোহাগের চোখে চোখ পড়ে গেলো। উদাম গায়ে সোহাগ রিতীর দিকে এগিয়ে এলো। শুধু থ্রী কোয়ার্টার পরা। রিতী চোখ নামালো না। সোহাগের বুক পিঠ হাত পা চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখতে লাগলো। ফর্সা লোমশ শরীরে নতুন পুরোনো দু ধরনের দাগ। নতুন দাগ মানে রিতীর নখের আঁচড় খামচির দাগ। এখনো লাল টকটকে হয়ে আছে। পুরোনো দাগ গুলো গভীর।কালচে বর্ণ ধারণ করেছে। সোহাগ সামনে এসে রিতীকে দুহাতে আগলে নেয়। রিতীও সোহাগের কাঁধে মাথা রাখে যাতে পিঠের দাগ গুলোও পর্যবেক্ষন করতে পারে। এগুলো তো কাটা দাগ। শরীর কাটা লম্বা দাগ কিভাবে হবে? নিজে নিজে কি একাই শরীর কেটেছে? ছুড়ি কাচি দিয়ে এরকম ক্ষত করা পসিবল নয়। তাহলে? মাথায় চাপ দিতেই রিতীর মনে পড়ে যায় তার পাও তো কেটেছে কাচ দিয়ে। সেম দাগ! তাহলে মদের বোতল গুলো যে ভেঙ্গে সারা ঘর ছড়িয়ে ছিলো একারণেই! রাগ জেদের বশে সোহাগ নিজেকে কষ্ট দিয়েছে? কেনো? রিতীর জন্য? রিতী কি বলেছে মদ খেতে? সে তো মদ সহ্য ই করতে পারেনা। কাল রাতেও তো মদ খেয়ে এসেছে। তারপরেও কিভাবে এলাও করলো সে? রিতীর নিজের উপর নিজেরই এখন রাগ হচ্ছে। ধাক্কা দিয়ে সোহাগকে সরিয়ে দিয়ে বিছানায় যায়। কম্বলে মুখ ঢেকে চোখ বন্ধ করে। এদিকে সোহাগ ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে। কি হলো? এইতো জড়িয়ে ধরেছিলো। আবার এরকম কেনো করলো?
— পিরিতি? এই বউ?
রিতী জবাব দিলো না। সোহাগ গিয়ে নিজেও কম্বলের নিচে ঢুকে পড়লো। ঠান্ডা শরীরের ছোঁয়া লাগতেই রাতের মতো আবারো রিতী থরথর করে কেঁপে উঠলো।
— এই পিরিতি? কি হয়েছে বউ?
রিতী ঘাড় ঘুরে তাকালো। সোহাগের চোখে চোখ রেখে প্রশ্ন করলো,
— আপনার তৃষ্ণা মিটে গেছে? এবার নিশ্চয়ই আমার মুক্তি মিলবে?
রিতীর দুই চোখ দিয়ে রাগ ঝড়ে পড়ছে। হুট করে কেনো এতো রেগে গেলো সোহাগ বুঝতে পারলো না। চোখ বন্ধ করে সোজা হয়ে শুলো।
— তুমি নিশ্চয় পানি নও ?
রিতী নিজের রাগ কে সংযত করে নিলো। ক্রোধ কন্ঠেই বললো,
— আমি রক্তে মাংসে গড়া মানুষ। বিশ্বাস করুন। আমি কোন পানি নই আবার জুস ও নই। হাতের খেলনাও নই।
— তুমি আমার বউ। এ বাড়ির বউ। আমার তৃষ্ণা যদি এতোটাই ভাসা হতো তাহলে তোমাকে পাবার জন্য এতোটা মরিয়া কখনোই হতাম না। সোহাগ কখনো সামান্য কিছুর জন্য নিজের ধাচ, ঐশর্য্য, অহংকারকে মাটিতে নামায় না। আমার এ তৃষ্ণা কখনোই কমবে না ।এটা আমি বুঝে গেছি। বরং আরো বেড়ে যাচ্ছে। সেজন্য ই তুমি আমার বাড়িতে আছো। অনান্য মেয়েদের মতো হোটেলে বা রিসোর্টে নয়। আমার থেকে আর তোমার মুক্তি মিলবে না। হাজার দূরে গেলেও আমার শিকলে ঠিকই বাঁধা থাকবে।
সোহাগ রিতীকে নিজের দিকে টানলো। আদুরে গলায় ডাকলো,
— আসো বউ বুকে আসো।
রিতী নড়লো না। শক্ত হয়ে থাকলো। সোহাগ জোরে টান দিতেই রিতী ছিটকে গেলো। বিছানা থেকে নেমে কোমড়ে হাত দিয়ে দাঁড়ালো। রুমের এদিক সেদিক চোখ বুলাতে লাগলো। কোমড় বেঁধে তল্লাসী লাগালো। সোহাগ উঠে বসলো। আশ্চার্য হয়ে গেলো।
— আরে কি করছো? কি খুঁজছো তুমি? পিরিতি? এভাবে গোছানো রুমটা উল্টা পাল্টা করছো কেনো?
রিতী পাত্তা দেয়না। যা ভেবেছিলো তাই। ঘরের মিনি ফ্রিজটা একদম খালি পড়ে থাকলেও কাবার্ডের ব্যাক সাইড আর আলমারির দুই পার্ট একদম খালি নয়। ঔষধের শিশির আকার থেকে বড় বড় কাঁচের বোতল। রাগে মাথা ফেটে যাচ্ছে রিতীর। উত্তেজনায় একটা বোতল ফ্লোরে ছুঁড়ে দিলো। টুকরো টুকরো হয়ে নীল পানির সাথে কাচ ফ্লোরে ছড়িয়ে গেলো। সোহাগ লাফিয়ে উঠলো। আরেকটা বোতল ছুড়ার আগেই
” ডোন্ট ডোন্ট! পিরিতি!” বলে ছুটে আসলো। রিতীকে আটকে দিয়ে বোতল কেড়ে নিলো।
— এসব কি করছো? পাগল হয়েছো? এভাবে ছুঁড়ে দিচ্ছো? তুমি জানো একেকটা বোতলের দাম কত?
— আমার থেকেও বেশী?
— এটা কি ধরনের প্রশ্ন?
— যে ঘরে আমি আছি তোমার স্পর্ধা কি করে হয় এখনো এসব সে ঘরে রাখার?
— আমি.. আমি এক্ষুনি সরাচ্ছি।
— এই কাঁচ গুলো দিয়ে শরীরে ক্ষত করেছো তাইনা? হাজারটা মেয়ের ক্ষত নিয়েও স্বাদ মেটেনি এখন কাঁচের ক্ষত নেওয়া হচ্ছে। আমি ছাড়া কারো রাইট নেই আঘাত দেওয়ার।
রিতী সোহাগের উপর রিতীমতো চিল্লাচ্ছে। চোখ মুখ দুটোই লাল হয়ে উঠেছে। সোহাগ দরজার দিক ছুটলো। হাসানকে জোরে জোরে ডাকতে লাগলো।
— এই হাসান। হাসান! ঐ বেটা তোদের আমার রুম পরিস্কার করতে বলছিলাম। এই তোদের পরিষ্কার? তাড়াতাড়ি এগুলো সরা এখান থেকে।
কাজের লোক গুলো দৌড়ে এলো ঝাড়ু বেলচা নিয়ে। ঘরে ঢুকেই রিতীকে দেখে ঢুক গিললো। রিতী শাড়ির আঁচল কোমড়ে গুঁজে ভয়ঙ্কর রাগ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। রিতীকে অবাক করে দিয়ে আরো ছয় সাতটা বোতল কাপড়ের কাবার্ড থেকে বের করে নিলো। সোহাগ তাড়া দিলো,
— আরো কোথাও থাকলে এক্ষুনি সব বের করে নে। নয়তো তদের ভাগ্যে আর মাল জুটবেনা।
রিতীর বুঝতে বাকি রইলো না। সোহাগ যে একা খায়না। জনদরদী হয়ে এদের পেটেও ঢুকায়। সোহাগের দিকে তাকিয়ে দাঁত কটমট করে বললো,
— সরিয়ে কি লাভ? গিলা তো আর বাদ দিবে না।
সোহাগ দাঁতে কামড় দিলো।দু হাত ক্রস করে কানে ধরলো।
— সরি! আর খাবো না। কোনদিন খাবো না। প্রমিজ! তোমার কসম! না আল্লাহর কসম। সরি।
রিতীর আর ঘুম হলো না। আঁচল ছেড়ে মাথায় দিয়ে হন হন করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো। সোহাগ মনে মনে আওড়ালো — ঘূর্ণিঝড়!!
লাঞ্চের সময় রিতী চুপচাপ খেয়ে উঠলো। রাগ এখনো কমেনি। একদিকে এবাড়ির লোকের মাথায় তুলে রাখা আরেক দিকে নিজের পরিবারের চিন্তা। তার উপর সোহাগ টা অন্যরকম আচরণ করছে। রিতী যাই বলছে তাই মানছে। কেনো এসব? তাকে আটকানোর জন্য এতো চেষ্টা! এক লোকমা করে মুখে তুলছে আর রিতীর দিকে তাকাচ্ছে। নতুন নতুন প্রেমে পড়লে যে চেহারার ভাবভঙ্গি হয় সোহাগকে ঠিক সেরকম দেখাচ্ছে। রিতীর রাগ ও পড়ে যাচ্ছে। এরকম করলে কার না রাগ পড়বে? সোহাগ উঠে যাবার সময় টাওয়েলে হাত মুছার সময় রিতীর পেছনে দাঁড়ায়। একটু নিচু হয়ে মুখটা রিতীর কানের কাছে নিয়ে আসে। ফিসফিসিয়ে বলে,
— তোমার এই জল্লাদপানা আমাকে একদম সময় জ্ঞান ভুলিয়ে দিচ্ছে। বিয়ে করতে না করতেই দুই বছর পর টেনে নিয়ে গেছে। নতুন সংসারের স্বাদ না পেয়ে একদম পুরান সংসারের স্বাদ পাচ্ছি। তবুও ভালো লাগছে। তোমার এই ডাইনি লুক টা আমার দারুন লেগেছে। তুমি যতই চেচাও আমার ততোই ভালো লাগে। এতো ভালো লাগবে জানলে আরো আগেই তুলে নিয়ে আসতাম । তাহলে মনে হয় আরো জল্লাদপনা দেখতে পারতাম। তুমি যাই করোনা কেনো আমার তাই ভালো লাগে। এতো কেনো ভালো লাগে? পাগল হয়ে যাবো আমি। পিরিতি…! ইস…স! হায়রে….!
রিতী উল্টো দিকে মুখ করে হাতে মুখ চেপে ফিক করে হেসে দেয়। ডাইনিং এ শ্বশুর শাশুড়ির সামনে। তাই কোনভাবে চেপে যায়। সোহাগ বাড়ি থেকে বেরোচ্ছে না। রিতী সোহাগের থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করছে। বাগানে নেমে ননদদের সাথে গল্প করছে। এদিক ওদিক হেঁটে হেঁটে দেখছে। সন্ধ্যার পরেও ননদদের সাথেই আছে। ননদরা রিতীকে চেপে ধরেছে। কোথা থেকে লাল টকটকে একটা বেনারসী এনে সুন্দরভাবে রিতীকে পরিয়ে দিয়েছে। খোঁপায় বেলীর মালা গুঁজে দিয়ে ঠোঁট দুটো শুধু লাল টকটকে করে রাঙিয়েছে। বেলীর মালায় হাত রেখে রিতী জিজ্ঞেস করে,
— এসব কোথায় পেলে?
— তোমার জন্য অর্ডার করা হয়েছিলো। মাত্র দিয়ে গেলো যে।
— ওয়াও.. কি সুন্দর! কে অর্ডার করেছে? তোমরা? সবাই খিলখিল করে হেসে বললো,
— না। আমাদের বস।
— বস!
সবাই রিতীকে ধরে ছবি তুলতে লাগলো। রিতীও অনেক রকম পোজ দিলো। ডিনারের আগ পর্যন্ত রিতী একদম ঘর মুখো হচ্ছেনা না জানি তার কোন অকাজ আবার চোখে পড়ে রিতীর মাথা আবার খারাপ হয়। তাই এড়িয়ে যাওয়াই শ্রেয়। কিন্তু তার এই এড়িয়ে যাওয়াতে একজনের যে কি সুবিধা টা হলো! সে জানতেই পারলো না তার জন্য ঘরে ঠিক কি সারপ্রাইজ তৈরী হচ্ছে।
চলবে,
লাবিবা তানহা এলিজা ~