#বিষ_করেছি_পান(৪৭)
(কপি করা নিষেধ)
বাঁধনের চোখ দুটো জ্বলছে। মরিচের ছোঁয়া লাগেনি। আগুনের আঁচ ও লাগেনি। সচ্ছ চোখ জোড়া একফোঁটাও জল ফেলেনি। তবুও কেনো যে জ্বলছে… কারণ থাকলেও জ্বলার কারণ নেই। তবুও জ্বলছে। বাঁধনের একপাশে বসে আছে তার মা আরেকপাশে বসে তার বাবা। ঠিক ছোট্ট বেলা যেমন বসত। জজের কথায় চোখ তুলে বাঁধন। চোখ ঘুরিয়ে তাকাতেই দৃশ্যমান হয় সুমির মুখটা। হুইলচেয়ার বসে আছে শূণ্য দৃষ্টিতে। কোন মায়ামনীই এখন এই মেয়েটাকে দেখলে চোখের জল ছেড়ে দিবে। ইমোশন আটকে রাখতে পারবেনা। আলতো হাতে বাঁধনের মুখটা ঘুরিয়ে সামনে করে দেয়। এই হাতের মালিক ঝিমা। তার ছোট্ট বোন। বাঁধনের আজ নিজেকে বড্ড অমানবিক মনে হচ্ছে।একটা মেয়েকে বিয়ে করলো। তার দায়িত্ব নিলো। যেই মেয়েটা পা হাড়ালো সেই ছুড়ে ফেলে দিলো! বাঁধনের যদি একই অবস্থা হতো তাহলে কি সুমির মতোই তাকে ছুড়ে ফেলা হতো? কাবিনের টাকা উসুল করে যত ই দেক,এটা কি ছুড়ে ফেলা নয়? বাঁধনের ধৈর্য্য ক্ষমতা কমে আসছে। বার বার মনে হচ্ছে সে কোন অপরাধ করছে। এতো লোকের ভিড়ে দম হারিয়ে ফেলছে। একটু ফাঁকে হুইল চেয়ারে বসা মেয়েটা তাকে নিচু মানুষ হিসেবে প্রমাণ করেছে। বাঁধন উঠতে গিয়েও উঠতে পারছেনা। ছটফট করে যাচ্ছে। হটাৎ ঘাড়ে ঠান্ডা ছোঁয়ায় শান্ত হয়ে বসে। হাতটা শার্টের কলার গড়িয়ে ভেতরে কাঁধ ছুইয়েছে। ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে গলার নরম জায়গাটার উপর এসে থেমেছে। কানে ফিসফিস শুনতে পায়,
— নিয়তি আগে থেকেই লিখে রাখা হয়েছে। এতে তোমার কোন হাত নেই বাঁধন ভাই। যা হচ্ছে তাই হবে। মনকে শান্ত করো। আমি আছি তোমার পাশে।
হাতটা সরিয়ে নিতে চাইলে বাঁধন সরাতে দেয়না। নিজ গলায় চেপে রাখে যতক্ষন না সাইনের জন্য পেপারস এগিয়ে দেওয়া হয়। বাঁধন একবারো সুমির দিকে তাকায় না। সেই শূন্য দৃষ্টিতে তাকালেই আর সইটা করার ক্ষমতা পাবেনা। ঝটপট সইটা করে চেয়ারে সোজা হয়ে বসে। ফের চেপে ধরে ছুটির হাত। বাকিটা সময় ওভাবেই বসে থাকে। মেশিনে টাকা গুণা হচ্ছে। গুনে গুনে দশলাখ টাকা বীণার ব্যাগ থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। এই দশলাখ টাকা কম পরিশ্রমে ঘরে আসেনি। ফাও ফাও একটা মেয়েকে দিতে হচ্ছে বলে বীনার বুকে ব্যথা শুরু হয়েছে । তাড়াতাড়ি এখান থেকে যেতে হবে। ফর্মালিটিজ ফুলফিল করে বাঁধনকে নিয়ে উঠে পড়ে। কোর্ট থেকে বাইরে এসে মুখোমুখি হয় সুমির পরিবারের। সুমির মা এগিয়ে এসে বলে,
— মাফ করে দিবেন আপা। বিয়েটা নিয়ে অনেক সমস্যার মুখে আমাদের প্রতিনিয়ত মুখোমুখি হতে হয়েছে ।
বীণা জোর পূর্বক হেসে বলে,
— এতো টাকা ডাললাম তবুও তো আপনার অবাধ্য মেয়ের পা দুটো ফিরিয়ে আনতে পারলাম না। আমার কপালটাই খারাপ আপা। তা না হলে স্বামী সন্তানের রক্ত পানি করা টাকা গুলো এভাবে হাইজ্যাকার নিয়ে যায়?
সুমি জোর গলায় বলে,
— মা উনাদের টাকা গুলো ফিরিয়ে দাও। আমার কোন টাকা চায়না।
বীণা সুমির মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে,
— রাগ করোনা মা। তোমাকে তো আমিই পছন্দ করে বউমা করেছিলাম! ভাগ্য খারাপ হলে যা হয়। মধ্যবিত্ত মানুষ আমরা তাই বলে তোমার হক তো মেরে খাবো না।
বীণা চলে যায়। সুমির চোখ গড়িয়ে জল পড়ে। ছুটি সুমির চোখ মুছে দিয়ে বলে,
— নিবে না কেনো আপু? তোমার যা প্রাপ্য তা এক কড়িও ছাড়বেনা। যতদিন তোমার হাতে টাকা গুলো থাকবে ততোদিন দেখবে তোমার প্রয়োজনীয় সব তুমি পাচ্ছ। ভালোভাবে বেঁচে আছো। ভুলেও টাকাগুলো হাতছাড়া করবে না।
সুমি মুচকি হাসে বাঁধনের দিকে তাকিয়ে। বাঁধন নিশ্চুপ,নিরুত্তাপ।
— দোষী তুমি নও বাঁধন। শান্ত হও। আমার জন্য চিন্তা করোনা। আমি ভালো থাকবো। দোয়া করি তুমিও ভালো থাকো। আমার খুব ভালো লাগছে এটা দেখে যে তুমি তোমার ভরসার হাত পেয়ে গেছো। এই হাত কখনোই ছেড়োনা।
বাঁধনের হাতের মুঠোয় ছুটির হাত এখনো আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা। সেদিকেই নজর সুমির। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এই সাপোর্ট টুকু বাঁধন কে কতোটা স্বস্তি দিয়েছে সুমি খুব ভালোভাবেই দেখেছে। বাঁধন ছুটির দিকে একবার দেখলো। আরেকবার দুটো হাতে মিলিত স্থানে নজর বুলালো। ছুটির দৃষ্টিও সেদিকে। বাঁধন হাত ছাড়লোনা। সুমিকে কিছু বললোও না। উপর নিচ মাথা ঝুমিয়ে ছুটিকে নিয়ে বড় বড় পা ফেলে প্রস্থান করলো।
বাঁধনের বাড়িতে সুনশান নিরবতা পালন হচ্ছে। এই নিরবতা একদিনো টিকলো না। হটাৎ ই আমেজে পূর্ণ হলো। ঝিমা বললো বাড়িতে নাকি মেহমান আসবে। শুক্রবারের দিন মেহমান আসতেই পারে ভেবে বাঁধন মাথা ঘামালো না। নিচতলা থেকে পোলাও এর দারুন স্মেল আসছে। কিছুক্ষণ পর রোস্টের স্মেলটাও মিশেল পাওয়া যায়। ক্ষীরের স্মেলটা নাকে লাগতেই বাঁধন জোরে শ্বাস টানে। মন মেজাজ কোনোটাই ভালো না। কে আসবে বাঁধন জানেনা। উঠেও দেখার চেষ্টা করলোনা।ওভাবেই মরার মতো পড়ে রইলো।
আধঘন্টা পরে বীনা এসে বাঁধনের কাঁধ ঝাকাচ্ছে।
— এই বাঁধন! উঠ বাবা। উঠ। মেহমান এসেছে তোর সাথে দেখা করতে চাইছে। উঠ বাবা।
— কে এসেছে মা?
— তোর বাবার একটা বন্ধু আছেনা? ঐযে ছাদে মাল ছাড়া। চুল নেই আর। ওর শালীর পরিবার।উঠ বাবা। তাড়াতাড়ি আয়।
— উনারা কেনো এসেছেন?
প্রশ্নটা করে বাঁধন আর উত্তর পেলো না। তার আগেই বীনা রুম থেকে প্রস্থান করেছেন।
ড্রয়িংরুমে এলাহি কান্ড। ছয়জন এসেছেন। বাঁধন গিয়ে পাশে দাড়াতেই বীনা বলে — আমার ছেলে বাঁধন।
বাঁধনকে মহিলা পুরুষ সবাই মিলে একের পর এক প্রশ্ন করতে থাকে। ভাবগতিতে বাঁধন যা বোঝার বুঝে নেয়। বাকিটাও পরিষ্কার হয় যখন সর্বো বয়স্ক একজন বলে,
— ছেলে মেয়ে দুজনকেই মানাবে। লেনদেনের বিষয়টা তবে ক্লিয়ার করে নেই কি বলুন বেয়াই সাহেব?
বাঁধন তৎক্ষনাৎ জিজ্ঞাস করে,– এসব কি বাবা?
বীণা ইশারা দিয়ে বলে,– চুপ।ঘরে যাও।
— মা?
— তোমার সাথে পরে কথা বলছি। লোকজনের সামনে মাথা হেড করোনা আমাদের।
দশভরি গহনা নগদ বিশলক্ষ টাকা। এতোটাকা কেনো যৌতুক দিতে চাইছেন উনারা? মেয়ে নাকি বোঝা দূর করতে চাইছেন? আর মা বাবা যৌতুক নিচ্ছেন? এতো তাড়াতাড়ি বিয়ে কিসের? ভদ্রলোকদের সামনে কিছু বলতেও পারছেনা। রাগে ফুস ফুস করছে। হন হন করে কিছু না বলেই প্রস্থান করে। সিঁড়িতে ছুটির সাথে ক্রস হয়। হাতে খালি জগ নিয়ে পানি নিতে এসেছে। আগামীকাল একটা পরিক্ষা আছে। বেচারা পড়তে পড়তে কোমড় লেগে গেছে। একহাতে কোমড় চেপে ধরেই সিড়ি বেয়ে নামছে। সারাবছর না পড়লে যা হয় আরকি। ভেবেই বাঁধন আবার উপরে উঠতে থাকে। দু পা এগিয়ে আবার তাঁকে থামতে হয় ভদ্রমহিলার কথাতে। ছুটিকে ডেকে নিয়ে জিজ্ঞেস করে,
— আপা আপনার মেয়ে? মাশাআল্লাহ পুতুলের মতো সুন্দর। এতো সুন্দর মেয়ে আত্ত্বীয়ের মাঝেই থাকতে আমারা কিনা এদিক ওদিক খুঁজে মরছি?
বীণা হেসে বলে,
— আমার মেয়ে না আপা। তবে আমার মেয়ের থেকে কম না। আমার বান্ধুবী রুম্পার মেয়ে। ঝিমার সাথেই পড়ে। এখানে থেকেই পরিক্ষা দিচ্ছে।
— নাম কি তোমার মা?
— ছুটি।
— ভালো নাম কি?
— বলবোনা।
ছুটির ত্যাড়া উত্তর। বীণা চোখ মুখ দেখেই বুঝে গেছে ছুটির রাগ।এই মেয়ে ‘ ক’ বলতেই ‘ কলা একটি মিষ্টি ফল’ পুরোটাই বুঝে যায়। খুবই চালাক! ছুটিকে বলে,
— যাও পানি নিয়ে যাও। বই রিভাইস শেষ?
ছুটি মাথা নাড়ায়। না শেষ হয়নি। মহিলা বলে,
— আরে পড়বে ক্ষন। একটু দাঁড়াক না। এই ছবি তুলে নাও তো একটা। তোমার ছেলেকে দেখাবো। বিয়ের জন্য যদি এবার না বলে আমার নাম পাল্টে রেখো।
বাঁধনের এবার আর সহ্য হয়না। ধুপ ধাপ করে নিচে নেমে আসে। ছুটিকে ধমকে বলে,
— পড়া নেই? দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কি করছিস এখানে? যা এখান থেকে।
ছুটি সাথে সাথে দৌড় দেয়। বাঁধনের বিনয়ের সাথে বলে,
— বেয়াদবি নিবেন না আন্টি। ছুটি এখনো ছোট। মাত্র এস এস সি দিচ্ছে। ওর বিয়ে হতে হতে আরো ছয় সাত বছর পর। গার্ডিয়ান ছাড়া ছবি নেওয়া আমার মনে হয়না ঠিক হবে।
— কি বলো বাবা! ছোট! আজকালকার মেয়েরা বারো তেরোতেই বাইরে নজর চলে যায়। প্রেম ভালোবাসা করে ঘর ছাড়ে। বাবা মা ছাড়ে। এতো বড় মেয়ে কিভাবে ছোট হয়?
— আপনার মেয়েও সেরকম কিছু করেছিলো বুঝি? সেজন্য ই এতো যৌতুক!
মহিলার মুখটা থমথমে হয়ে যায়। বাঁধন ফিচেল হাসে।
— গায়ে গতরে বড় হলেই হয়না আন্টি। পরিপূর্ণ বয়সটাও হতে হয়। বিয়ে সংসার বোঝার মতো মানসিকতা ও থাকতে হয়। দেশে আইন টাইন ও কিছু আছে ভুলে যাবেন না।
বলেই বাঁধন বেড়িয়ে যায়।
সন্ধ্যায় বীণা বাঁধনকে বলতে এলে এলে বাঁধন প্রচুর রিয়েক্ট করে বসে।
— পেয়েছোটাকি? একবার এভাবে ধুপ দাপ বিয়ে করিয়ে তোমার শখ মেটেনি? ডিভোর্স হতে না হতেই আবার বিয়ের জন্য উঠে পড়ে লেগেছো? তাও আবার একটা ক্যারেক্টারলেস মেয়ের সাথে। সেই মেয়েটাও বোধ হয় বয়স হয়নি। কেনো করছো এসব যৌতুকের লোভে?
— কিসের যৌতুক?মেয়ে বিয়ে দিবে কিছু পাঠাবেনা সাথে?এমনিতেই শুধু শুধু দশলাখ টাকা খুইয়ে গেছে আমার সেদিকে তোমার হুস আছে? ডিভোর্স হয়ে গেছে ঝামেলা শেষ এবার তাড়াতাড়ি বিয়ে করো। নাতির মুখ দেখাও আমাকে।ছোট সময় ওসব ভুল একটু আধটু হয়েই থাকে। আর এই মেয়ের এখন উনিশ বছর কোন সমস্যা হবে বলে আমার মনে হয়না।
— মা তুমি আর কথাই বলোনা। ছুটিটা কেও ছাড়লেনা। তুমি কি ছুটির গার্ডিয়ান? ওর বিয়ের কথা তুমি কিভাবে আলাপ করতে পারো?
— আমার কথা রুম্পা কোনদিন ফেলবেনা।
— পরের মেয়ের চিন্তা না করে নিজের মেয়ের চিন্তা করো। পারলে তোমার মেয়ের বিয়ে দাও। ছুটির থেকে বয়সেও বড়,বোঝদার ও বেশী।
ঝিমা বলে,
— আমাকে নিয়ে কেনো পড়লে তুমি ভাইয়া?
— মার পাগলামো তে সায় দিচ্ছিস কেনো?
— আমি কি বলবো? তোমার এতো লাগছে কেনো ভাইয়া? আজ হোক কাল হোক বিয়েতো তোমার হবেই। ফুল পাত্রী পাবার সম্ভাবনা খুবই কম। এতো রিয়েক্ট করছো কেনো? নাকি ছুটিকে নিয়ে মায়ের ব্যাপারটা সহ্য করতে পারছোনা?
আসল জায়গায় হাত দিয়ে দিয়েছে ঝিমা। বাঁধন কিছু না বলে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে ফোন আর ওয়ালেট নিয়ে বাড়ি ছাড়ে।
চলবে,
#বিষ_করেছি_পান(৪৮)
(কপি করা নিষেধ)
— পরিক্ষা কবে শেষ তোর?আর কয়টা আছে?
— হু?
রিতীর ডাকে ছুটি হুস ফেরে। এতোক্ষন সে হোটেলের প্রত্যেকটা ডেকোরেশন পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে ছুয়ে ছুয়ে পরখ করছিলো। মুখ থেকে একটাই কথা বেরিয়ে আসে
” কি সুন্দর!”
রিতী হেসে বলে,
— আমার শ্বশুর বাড়ি এর থেকেও সুন্দর।
— সত্যিই? কবে যাবো দেখতে?
— যাবিনা।
— কেনো?
— আমি যাবোনা তাই।
— কেনো?
— পড়াশোনা শেষ করবো। তারপর শ্বশুরের কোম্পানিতে বসবো। কাজ বাজ সব বুঝে নিবো। বিষয় আশয় সবটাই বুঝে নিবো। তারপর আমি হয়ে যাবো কোটিপতি। টাকার উপর শুয়ে পুরো জীবন কাটিয়ে দিবো।
— আর তোমার সংসারের সপ্ন? সেটা পূরণ করবেনা? কি বলছো আপু? আমি খালামনি হবোনা?
— সেসবের দায় কি আমার?
— বাবা কোনদিন দুলাভাইকে মেনে নিবে না।
— আমি কি করবো? এসব তাঁদের বিষয়। আমার আপাতত লক্ষ্য আমার শ্বশুরের সম্পত্তি রক্ষা করা। যেভাবেই হোক তার পরবর্তী প্রজন্মের কাছে আমি পৌঁছে দিবো। এর বাইরে যদি আমার কিছু পাওয়ার থাকে পাবো নয়তো আমার এতেই চলবে।
ছুটি চোখের পলক ফেলে। অবাক হয়ে বলে,
— আপু তুমি কি তাহলে লোভী হয়ে গেলে?
রিতী ছুটির কথায় হো হো করে হেসে উঠে। মাথায় গাট্টি মেরে বলে,
— লোভ কি রে? ঐ একটু খানি লোভ সবাই করে। আমিও করেছিলাম। পেয়েছিও। আধো আধো। পুরোটা না। এখন লোভ করলাম একটা ধরা দেয় যদি অন্যটা তাহলে আমি কি করবো বল?
— তোমার কিসের লোভ আপু?
— তোর যাতে লোভ আমারো তাতে লোভ।
মিনিট খানেকের মধ্যেই ফুঁপিয়ে উঠে ছুটি। রিতীর বুকে হামলে পরে।
— আমি আবার প্রেমের বীষে নীল হতে যাচ্ছি আপু। আগের বার তেমনটা মনে হয় বুঝে উঠতে পারিনি। এবার আর আমি বাঁচবো না আপু। আমি বাঁচতে চাইলেও পারবোনা। আমাকে মাফ করে দিও।
— কান্না থামা। আগেই বলেছিলাম দূরে থাক।শুনলিনা।
— তুমি তাও যতক্ষন চাও ততোক্ষন ই পাও। মনের মতো করে দুলাভাইকে ভালোবাসো । আমি তো শূণ্য আপু। কেনো এতো যন্ত্রনা? বউ হতে গেলে সংসার করতে গেলে কি লাগে আপু? বয়স কোন ফ্যাক্ট? মন মানসিকতা কি আমার নেই? কাজ বাজ করতে করতেই তো মানুষ শিখে ফেলে। আমি কেনো পারবোনা?
— তো কি রিস্ক নিতে চাস? বলে দে তাহলে। ভালোবাসলেই এনাফ আর যদি মান্য করার ইচ্ছা থাকে আর কিছুই ইমপর্টেন্ট না।
— সেজন্য ই তো এতো গুলো কথা শুনতে হলো।
— বলেছিলিস?
— আমি আমার ভেতরে আর রাখতে পারিনি আপু। চিরকুট লিখে বালিশের পাশে রেখে আসছি। সেজন্য বাঁধন ভাই আমাকে অন্যভাবে বুঝিয়ে দিলো আমি ছোট। আমার বয়স হয়নি। বিয়ে সংসার এসবের মনমানসিকতা তৈরী হয়নি। প্রেম করতে চায় ক্যারেক্টারলেস মেয়েরা।
— বাঁধন ভাই তাহলে জেনে গেছে তোর মনের কথা।
— হ্যা। জেনেই তো এসব বললো।
ওয়াসরুমের দরজা খোলার শব্দে ছুটি ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়। উদোম গায়ে সোহাগকে দেখে বেশ লজ্জা পায়। সোহাগ ছুটিকে দেখেই টেনে ডাকে
— ছুট্টি…রা..নী!!
রিতী টি শার্ট টা সোহাগের দিকে ছুঁড়ে দেয়।
— টি শার্ট পড়ো। তোমার ছুটি রাণী লজ্জা পাচ্ছে।
সোহাগ হো হো করে হেসে উঠে। ছুটির সামনে দাঁড়িয়ে টি শার্ট পড়তে পড়তে বলে,
— দেখলে ছুট্টি রাণী? তোমাকে বাধলাম বলেই আজ সাতদিন তোমার বোন আমার সাথে। সেদিনের জন্য আমি একটু অনুতপ্ত নই বুঝলে?
ছুটি রিতীর দিকে তাকিয়ে বলে,
— আপু তুমি সুন্দর হয়ে গেছো।
— শুকিয়ে নাকি কাঠ হয়ে গেছি তোমার দুলাভাই বলে। সারাদিন এত্তো এত্তো খাওয়ায়।
— হয়েছিলে তো কিছুদিন আগে। এখন সুন্দর লাগছে।
সোহাগ ফোড়ন কাটে।
— শ্বশুর আব্বা কে বলো আমার কাছে মেয়েকে একেবারে দিয়ে যেতে। আদর খাইয়ে এমন সুন্দরী বানাবো.. আকাশের চাদটাও হিংসে করবে।
— তুমি খুব ভালো আছো তাইনা আপু?
— হোটেল ছাড়ার আগ পর্যন্ত।
রিতী সোহাগকে মুখের দিকে তাকিয়ে ছুটির চোখ আবার ভিজে উঠে। সোহাগ ছুটির সামনে বসে বলে,
— তোমার তো দেখি কপাল খুলতে চলেছে। বাঁধন ভালোই সিরিয়াস। কান্না চলে কেনো তবে?
ছুটি ডানে বায়ে মাথা নাড়ায়। পরমুহূর্তেই ডুকরে কেঁদে উঠে। রিতী ছুটির কাঁধ ধরে আছে। এইটুকু বয়সে এতোটা কষ্ট একমাত্র বোনের সামনেই প্রকাশ করে। এবার এড হয়েছে সোহাগ। এদের কাছেই মনের যত কথা উগলে দিতে দুবার ভাবতে হয়না। বাকি সবাই করে সুযোগ এ সদ্ধ্যবহার।
— এভাবে কাঁদলে হবে? ছুট্টি রাণী! তোমাকে রাণী বলি কি এমনি এমনি? রাণীর মতো পছন্দের জিনিস কে নিজের করে নাও।
— বাঁধন ভাই আমাকে…. আমাকে… আমি আর কখনো ভালোবাসার দাবী নিয়ে দাঁড়াতে পারবোনা দুলাভাই। আমি যেমন চুপিসারে তাঁকে আমার হবার আহ্বান জানিয়েছি তিনি তেমন ভাবেই কৌশলে আমাকে আমার জায়গাটা দেখিয়ে দিয়েছে। এরপরেও যদি আমি মুখোমুখি হই সেটাতে প্রকাশ পাবে আমার নির্বুদ্ধিতা। আমি যে আরো অযোগ্য হয়ে উঠবো। তাকে ভালোবাসি মুখে বলার সুযোগটাও হারালাম। আমি আর সে বাসায় যাবোনা। পরের একটা পরিক্ষাই এখানে থেকেই দিবো।
— তা দাও কিন্তু আমার মনে হয় তোমার একবার সরাসরি ভালোবাসার দাবী নিয়ে তার সামনে দাঁড়ানো উচিত। ভালোবাসায় আত্মসমর্পণ করা উচিত। যদি আত্মসম্মানের ভয়ে দূরে সরে থাকো তাহলে কখনো ভালোবাসা পাবেনা। প্রয়োজন হলে জোর করবে। পায়ে ধরবে। তবুও মানানোর চেষ্টা করো।
রিতী বাঁধা দেয়।
— কি বলছো এসব ওকে? হিতে বিপরীত হবে।
— হলে হবে। এমনিতেই চুপ থাকলে যে বাঁধন ওকে ভালোবাসবে সেটা তো আর না? ছুটি রাণী! ভেবে দেখো। একবার হারিয়েছিলে। ভাগ্য ভালো থাকায় আবার তোমার সুযোগ এসেছে। এবারো কি ছেড়ে দিবে? যদি তাই চাও তাহলে এতো কান্না কিসের? বাঁধনকে পেতে হলে এটাই তোমার সুযোগ। এরপর কি আবার ঢাকা আসতে পারবে? কতদিন পর আসবে? ততোদিন কি বাঁধন ব্যাচেলর থাকবে?
— তাই বলে গিয়ে ছেচড়ামো করবে? বাঁধন ভাই এক ধমকে বসিয়ে দিবে। থাপড়িয়ে কানের গোড়া লাল করবে।
— সমস্যা নেই তো। আমি করিনি ছেচডামো? মাইর খাইনি তোমার হাতের? তো ওও খাবে।
শেষ পরিক্ষাটা রিতীর কাছে থেকে দিলেও তাকে আবার বাঁধনের মুখোমুখি হতে হবে। ছানোয়ার আসবে নিতে। সোহাগ বার বার ছুটিকে বলছে বাঁধনের সাথে কথা বলতে। ছুটি সাহস পাচ্ছিলোনা। তবে এবার মনের মধ্যে সাহস সঞ্চার করে ই যাচ্ছে। রিতীও হলে চলে যাবে। হিযাপটা বেঁধে নিয়ে লাগেজটা দরজা অব্দি এগিয়ে আসে। বিনে মদের বোতল দুটো রাখতেই কচ করে উঠে। রিতী উঁকি দিয়ে এক পলক দেখেই নাক ছিটকে উঠে।
— আপু দুলাভাই আবার মদ খাওয়া শুরু করেছে?
— ছাড়লো কবে যে শুরু করবে?
— তাই বলেন এখানেও খাবে তোমার সামনে। আর তুমি সেটা এলাও করলে?
— যারা আসক্ত তাঁদের একটু হলেও খেতে নয়। নেশা উঠলে হুস থাকে না। আমি বলেছি আস্তে আস্তে ছেড়ে দিবে।
সোহাগের মুখটা গোমড়া হয়ে আছে। চোখে টলমল করছে জল। রিতীর কাছে গিয়ে অসহায় হয়ে বলে,
— না গেলে হয়না? এখান থেকেই ক্লাস করতে পারো। হলে যাবার দরকার হবেনা।
— অনেক দূর। সম্ভব কি? টিউশন আছে রেগুলার।
— টিউশন ছেড়ে দাও। কত টাকা লাগবে আমি দিবো আর কষ্ট করতে হবে না।
— আছে! রোজগার করে আমাকে টাকা দেবার ক্ষমতা?
এই একটা কথাই যথেষ্ট। সোহাগকে আশা ছেড়ে দিতে হলো। আর সম্ভব না।
বাঁধনকে ছাদে দেখেই ছুটি সিড়ির দরজা লাগায়। এক বুক সাহস নিয়ে বাঁধনের সামনে দাঁড়ায়। বাঁধন ছুটি কে দেখে চেয়ারে সোজা হয়ে বসে। বাঁধনকে দেখেই উপচে আসতে চাইছে চোখের জল। আজকাল একটুতেই বেরোতে চায়। ছুটি কন্ট্রোল করতে পারেনা। বাঁধনের দৃষ্টি সেই চোখে। চোয়াল শক্ত করে নির্লিপ্ত ভাবে তাকিয়ে আছে। বাঁধন গলা খাঁকারি দিয়ে উঠতেই সোজা প্রশ্ন করে,
— বাঁধন ভাই আপনি কি সত্যিই বিয়েটা করবেন?
— করবো।
— মেয়েটা ভালো না। আগে প্রেম ছিলো।
— আমার মতো আগে বিয়ে তো হয়নি! অবিবাহিত মেয়ে আমার কপালে জুটবে না।
— কেনো? আমি আছিনা? আমাকে চোখে পড়ে না? ভালোবাসি আপনাকে। আপনি কি বোঝেন না?
— চোখের পানি মুছ ছুটি। আমি তোর জন্য না।
— কেনো না? আপনার মতো ভালো মানুষ কে আছে দেখান দেখি? আপনার মতো দায়িত্ব নিতে কজন পারে শুনি?আমি জানি আমি কখনোই আপনার কাছে থাকলে অসুখী হবোনা।
— আমি চাইনা তুই আমার কাছে থাক। ইভেন কেউই চায়না। সবার আগে তোর পরিবার ই চাইবেনা। আমার সাথে তোর যায়না ছুটি। তোকে ছোট থেকেই ঝিমার পাশে স্থান দিয়ে এসেছি। মনের পাশে না।
— এখন দিতে কি সমস্যা?
— ছেলেদের বিয়ের বয়স কখন জানিস?২১ বছর। সঠিক বয়সে বিয়ে করলে তমালের মতো আমারো একটা সন্তান থাকতো। তোকে মানাতো তার জেঠাতো বা মামাতো বোন হিসেবে। আরেকটু সহজ করে বলি তোর বাবা আর আমার তেরো বছরের ডিফারেন্স। বড় ভাই ছোট ভাইয়ের নরমালি এমন ডিস্টেন্স ই থাকে। সঠিক বয়সে বিয়ে করার দরুন তোরা এতো বড় বড়। বুঝতে পারছিস আমি কি বলছি? তোর আর আমার গুনে গুনে পনেরো বছরের ডিফারেন্স। যে ডিফারেন্সে আমি তোর বাবাকে কাকা ডাকি তার থেকেও বেশি।
— বয়স ই সব বাঁধন ভাই?
— না । আরো অনেক ব্যাপার আছে। আমাকে তুই ভালোবাসিস ভাইয়ের মতো ভালোবাস। এতে কেউ বাধা দিতে আসবেনা। এখন যদি তুই আমাকে লাইফ পার্টনার হিসেবে ভালোবাসিস তাহলে কে তোকে সাপোর্ট দিবে? সবার আগে তোর বাবাই তো বাগড়া দিবে। সমাজে কোন চোখে দেখবে? আমার মা যে রুপধারী… তাকে তো চিনিস। জায়গা হবে তোর এই বাড়িতে?সব থেকে বড় কথা আমিই তো মানতে পারবো না। তোর প্রতি আমার একটা সফট কর্ণার আছে সেটা তো আমি অস্বীকার করছি না। তাই বলে আবেগে তো গা ভাষাতে পারিনা। একটা হাঁটুর বয়সী কিশোরী মেয়েকে বিয়ে করে তার জীবন নষ্ট করার মতো নিচু লোক আমি না। আবেগে গা ভাসানোর সময় তোর। আমিতো তোর মতো হতে পারিনা।
— এটা আমার আবেগ না।
— কাকা আসলে বাড়ি চলে যা। দু তিন টা বছর সময় দে। যখন বুঝতে শিখবি তখন নিজেই হাসবি এসব ছেলে মানুষীর কথা ভেবে।
— আমি ছেলেমানুষী করছি না। তুমি আমার আবেগ না বাঁধন ভাই। কোনদিন ছিলে না। আমি তোমাকে ভালোবেসেছি। একটু একটু করে হৃদয়ে জায়গা দিয়েছি। কম বয়স বলে যে আমার মনে শুধুই আবেগ জম্মাবে ভালোবাসা জম্মাতে পারবেনা তা তো না।
— বড্ড কথা শিখেছিস ছুটি। কান্না কাটি থামিয়ে যা নিচে যা।
— তোমার পায়ে পড়ি বাঁধন… আমাকে ফিরিয়ে দিওনা। একবার তোমাকে হারিয়ে ফিরে পেয়েছি। আমি আবার হারাতে পারবোনা । আমার ভীষণ কষ্ট হয়। আমি তোমাকে ছাড়া থাকতে পারছি না। সত্যি করে বলতে পারবে? তুমি আমাকে নিয়ে একটুও অন্যরকম কিছু ফিল করোনা?
— তুই তো কথা বুঝার মানুষ না ছুটি… যা নিচে যা এক্ষুনি। কেউ জানতে পারলে আমাদের ফ্যামিলির বন্ডিং এখনি নষ্ট হয়ে যাবে । দোষারোপ করা হবে তোর বাবা মাকে। বুঝার চেষ্টা কর ছুটি। নিচে যা।
ছুটি বাঁধনের পা জড়িয়ে হাউমাউ করে কেঁদে উঠে। বাঁধন নড়ে না। রাগ করতে চেয়েও পারে না। বাঁধন খেয়াল করে তার চোখ ও ভিজে উঠছে। ছুটির ক্ষমতা দেখে বাঁধন শুকনো হাসে। কি তেজ এইটুকু মেয়েটার! বাঁধনের মতো শক্ত পোক্ত মনটাকে ও নাড়িয়ে দিয়েছে। অস্থিরতার কারণ হয়েছে। বুকে ব্যথার সঞ্চার করেছে। চোখে জল এনে ছেড়েছে। তবে এই সব কিছুর উর্ধ্বে যেটা আছে সেটাতো বাঁধন এড়িয়ে যেতে পারেনা। কিশোরী বয়সে সবাই টুকটাক এমন ভুল করে। ছুটি যখন বড় হবে তখন নিশ্চয় এই আবেগটা আর থাকবেনা। এখন ছুটিকে পশ্রয় দিলে অনেক বড় ভুল হয়ে যাবে। পরবরর্তীতে মনে হতেই পারে যে একটা বুড়ো লোকের সাথে নিজের জীবনটা জড়িয়ে মস্ত বড় এক ভুল করে ফেলেছে। চলার পথে হাজার হাজার ছেলের সাথে হাত মেলাবে। নিত্য নতুন যুবকের রশ্নিতে নিজেকে আলোকিত করতে চাইবে। বাঁধা হবে এই অসম সম্পর্ক টা। তিক্ততা ছুঁইয়ে যাবে রন্ধে রন্ধে।এক পর্যায়ে বেরিয়ে আসার জন্য জান প্রাণ দিয়ে ছুটাছুটি করবে। প্রতি মুহূর্তে ই মনে হবে এই সম্পর্ক আমাদের দুজনের জন্য না। বাঁধন নিজে ছুটিকে স্টেশন অব্দি এগিয়ে দেয়। ছুটি হয়তো দু একদিন কান্নাকাটি করবে তারপর নিশ্চয় তার জীবন রাঙাতে নতুন কেউ এসে হাত ধরবে। অসম সম্পর্ক হবার সমতা খোঁজার চেয়ে অন্ধ হয়ে পথ চলা সহজ।
চলবে,
#বিষ_করেছি_পান(৪৯)
(কপি করা নিষেধ)
বাঁধনের জীবনে একেরপর এক অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটেই চলেছে। জীবনে নারী ঘটিত বিষয় গুলো অন্তরীক্ষে খুব গভীরেই আঘাত হানে। সুমির সাথে ডিভোর্স হলেও তাঁদের সম্পর্কটা স্বাভাবিক। কোথাও যেনো একটা বন্ধুতের দেখা পায়। বাঁধনের কাছে মাঝে মাঝে ই মনে হয় সুমি নামের মেয়েটা তার জীবনের একটা ঝড়। তারপর ই ভাবে দোষ টা কার? কারোনা। বাস্তবতা মেনে নিতে হয়। ছুটির সংস্পর্শে এসে বাঁধন যেনো এই বাস্তবতার কাছে আরো বেশী পরিচিত হয়। ছুটি নামক কিশোরী তার হৃদয়কে দেহ থেকে ছুটির ব্যবস্থা করে গেছে। বড্ড কষ্টে আঁকড়ে রাখলেও ছুটানোর জন্য ক্রমশ চেষ্টা করে যাচ্ছে সুমি। সুমির মতামত ছুটি বাঁধন কে ভালোবাসে। আবেগ ভেবে ভুল না করে ছুটিকে তার জীবনে জায়গা দেওয়া উচিত। উত্তরে বাঁধন হেসে উঠে। সুমির কথাকে হালকা বিদ্রুপ ও করে।
” ছুটি! পাশের বাসার ফুটফুটে মেয়েটি যখন জম্ম নিলো…তখন আমি ক্লাস নাইনে পড়ি। আমার চোখে তখন রঙিন আকাশের আনাগোনা। বান্ধুবী তমাকে ঘিরে প্রথম ভালোলাগার পরিচিতি। বাড়ী ফিরে শুনি কলোনীতে আগমিত নতুন অতিথি! আর সেই অতিথি…. দুরন্ত কিশোরী মেয়ে আলোচ্য ছুটি!”
বাঁধনের হাসি থামে। শুকিয়ে আসে জিহ্বা। পানির বোতল টেনে ঢকঢক করে জল খায়। তবুও সুমি বাঁধনকে ছুটির কথা মনে করিয়ে দিতে ভুলে না। বাঁধন সুমির সাথে আর যোগাযোগ করে না। যদিও মাঝে মাঝে ফোন দেওয়া হয় বাঁধন সুমির মধ্যকার আলোচ্য ছুটি।
বাঁধনের বিয়ের ডেট ফিক্সড হয়ে গেছে। মন থেকে নামটা মুছে নি ছুটির। মনের উপর জোড় খাটিয়ে বাঁধন শান্ত রাখে নিজেকে। নিজ থেকেই মার থেকে চেয়ে নেয় হবু স্ত্রীর ফোন নাম্বার। প্রথম কথপোকথন এই মেয়েটাকে ভালো লাগেনা। তবে সময় আছে। ভালো লাগতেও পারে। দিনে পাঁচ ছয় মিনিটের বেশি কথা হয়না। এর ই মধ্যে একদিন রাতে মেয়েটি কল দিয়ে কান্নাকাটি করে। বাঁধন কে জানায় তার আগের স্বামী তার লাইফে ফিরে আসতে চায়। নিজেদের মধ্যকার সব ভুল ত্রুটি মিটমাট হয়ে গেছে। ভালোবাসার জোরে তারা এক হতে চায় যদি বাঁধন একটু সাহায্য করে।
বিয়ে সংক্রান্ত এসবে বাঁধনের এবার বাঁধ ভাঙে। পেয়েছেটাকি সবাই? বাঁধনের কোন চাওয়া পাওয়া নেই? সবাই সবার মতো বাঁধনকে চালিয়ে নিচ্ছে। কেউ ইগনোর করছে, অভিমান করছে, নিজের ইচ্ছা চাপিয়ে দিচ্ছে, ভালোবাসা জাহির করছে আবার একজন সাহায্য ও চেয়ে বসেছে তাও নিজের ক্ষতির মাধ্যমে। বিয়ের কথা সবাই জানাজানি হয়ে গেছে। বাঁধনের কি মিনিমাম মান সম্মান টুকুও নেই? সব ভেঙ্গে গুড়িয়ে দিতে ইচ্ছে করছে। রুমের অবস্থা নাজেহাল করে ছেড়েছে। বাবা মা বোন কেউই বাঁধনকে আটকাতে পারছে না। বীণা কারণ জিজ্ঞাসা করতেই বাঁধন জানায়,
— এই বিয়ে হবেনা। এক্ষুনি কমিটমেন্ট ব্রেক করো ফোন লাগিয়ে। আমি কোন হাতের পুতুল নয় যে সবাই এক এক করে আমাকে এইভাবে হেনস্তা করে যাবে। আমার চাওয়া পাওয়ার গুরুত্ব কে দেয়? কেউ লোভে পড়ে আমাকে নাচাচ্ছে,কেউবা নিরবে আমাকে দোষী বানিয়ে রেখেছে,কেউ চায় আমাকে জেলে পুরতে,কেউ চায় ব্যবহার করতে।
— আব্বা কি বলছো এসব?
— তুমি মা আর একটা কথাও বলবেনা। একবার তোমার কথায় পুকুরে ঢুবেছি আরেকবার ঝাপ দিতে চাইনা। আমার লাইফ আমার ডিসিশন। আমার যদি কোনদিন মনে হয় আমি কাউকে বিয়ে করতে চাই তবেই আমি বিয়ে করবো। তুমি আর আমার ব্যপারে নাক গলাবেনা।
ঘটনা আকষ্মিকে তবধা খেয়ে বসে পড়ে বীনা। ঝিমা কল ধরিয়ে দেয়। বিয়েতে না করে দেয়। কিন্তু মেয়ের ফ্যামিলি মানতে চায়না। কোনভাবেই আগের স্বামীর কাছে তারা মেয়েকে পাঠাবে না। বাঁধনের কাছেই মেয়ে বিয়ে দিবে। একদিন দুইদিন তিনদিনের দিন মেয়েকে জোর করে নিয়ে বাঁধনের বাড়িতে উপস্থিত হয় এলাকার সন্ডাপান্ডা লোক নিয়ে। বীণা ভয়ে চুপসে যায়। বাঁধন মেয়ের বাড়ির সামনে না বলার পরেও তারা বাঁধনকে বোঝাতে থাকে। সাথে যোগ হয় বীণা। ভয়ে ভয়ে বলে,
— ” বাবা বিয়েটা করে নে প্লিজ।”
— ” তারপর নিশ্চয় বউকে সারাজীবন পাহারা দিবো বসে বসে যাতে কারো হাত ধরে না পালিয়ে যায়?
বাজখাই গলায় বকে ঝেকে রেগে মেগে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়। বহু কষ্টে মাস খানেক পর ছেলেকে বাড়ি ফেরাতে সক্ষম হয়। তারপর আর কেউ কখনো বাঁধনকে জোর করেনি। তবে মুখে অনেকবারই বলেছে।
ছুটির সাথে দেখা হয় বাঁধনের মাস চারেক পরে। দেখে প্রথমে মুখটা চেনা যায়নি। ছানোয়ারকে দেখে সিউর হয়েছে। ছুটিকে হসপিটালে নিয়ে আসা হয়েছে। বাঁধন ও এসেছে। এক্সিডেন্টের পর ব্যথাগুলো মাঝে মাঝেই চাড়া দিয়ে ওঠে। একেবারে নিস্পত্তি হবার উপায় খুঁজতেই আজ বাঁধন হসপিটালে। ছানোয়ার বলে ছুটির স্কুল থেকে প্রত্যয়ন পত্র নিতে এসেছে। এসেছে যখন ছুটিকে একটু ডাক্তার ও দেখিয়ে যেতে চায়। মেয়েটা খেতে চায়না। পেটে গ্যাস হয়েছে। দিন দিন শুকিয়ে যাচ্ছে। কদিন পর তো রক্ত শূন্যতাও দেখা দিবে। বাঁধন ভালোভাবে খেয়াল করে। সত্যিই ছুটি অনেক শুকিয়ে গেছে। মলিন চেহারা প্রাণোচ্ছল ভাবটা ঢাকা পড়েছে। বাঁধনের নিজেকে এই মুহূর্তে অপরাধী মনে হয়। আর কেউ না জানুক সে জানে তার জন্য ই আজ ছুটির এই অবস্থা। বাঁধন ছুটির সাথে কথা বলতে চায়। অনেক কথাই বলে। কিন্তু ছুটি ফ্যালফ্যাল করে বাঁধনের দিকে তাকিয়ে থাকে। হুস হতেই চোখ নামিয়ে নেয়। অবাধ্য মনটা আজো বেহায়া পনা দেখাতে উঠেপড়ে লেগেছে। অন্যের মানুষটাকে দেখার মতো পাপ ছুটি করতে চায়না। যদি ছুটি অপয়া হয়! তাহলে যে অন্যের সংসারে নজর লেগে যাবে। ছুটি চায় বাঁধন ভালো থাকুক। কোন প্রকার সম্পর্ক না থাকলেও এই মানুষটার নাম ছুটির মোনাজাতে উঠে আসে। ডাক্তার দেখিয়ে যখন বিদায়ের পালা বাঁধন তখন ছুটিকে প্রশ্ন করে ঝিমার সাথে কেনো যোগাযোগ রাখে না? ছুটির জন্য ঝিমা মাঝেমাঝে কান্নাকাটি করে। আর চুপ থাকেনা ছুটি। ঝিমার কথা মনে পড়তেই ছুটির বুক কেঁপে উঠে। পায়ের স্লিপার দিয়ে মাটি খুঁড়তে খুঁড়তে যাবার আগে বাঁধন কে বলে যায়,
— যেদিন থেকে আপনার বিয়ে হয়ে গেছে সেদিন থেকে আমি আর ঝিমার সাথে যোগাযোগ রাখার জরুরী বোধ করিনি। ওকে বলে দিবেন আমাকে যেনো ক্ষমা করে দেয়। আমি আমার কথা রাখতে পারিনি। প্রিয়মানুষ হয়ে ওকে সবসময় সঙ্গ দেবার কখনো আলাদা না হবার কমিটমেন্ট রাখতে পারিনি। আমাদের পথ আলাদা হয়ে গেছে। আপনার স্ত্রীর মাঝে যেনো আমাকে খোঁজে নেবার চেষ্টা করে।
ছুটির উত্তরে অনেক টা জ্ঞানশূন্য মাথায় দাঁড়িয়ে থাকে বাঁধন। ছুটির শেষ অবয়ব পর্যন্ত হড় হামেশায় তাকিয়ে থাকে। এসবের মাঝে ঝিমাও আছে? ঝিমা জানতো? ঝিমা কি ছুটিকে একসাথে রাখার জন্য প্রমিজ করেছিলো? এরজন্য ঝিমা বাঁধনকে এড়িয়ে চলে? ছোট বোনটার মুখে কতদিন ভাইয়া ডাকটা শুনেনা বাঁধন। চোখের সামনে থেকেও অচেনা মানুষ হয়ে থাকে। এটাযে বাধনকে কতোটা পোড়ায় তা একমাত্র বাঁধন ই জানে। ঝোঁকের মুখে বাঁধনের মনে হয় ছুটিকে আটকাতে হবে। ছুটিকে ছাড়া তার চলবেনা। তৎক্ষনাৎ বাড়ি ফিরে। বীণাকে বলতে গিয়েই বাঁধনের ঘোর কাটে। কি করতে যাচ্ছিলো সে? বীণাকে বলেছে একটা মেয়েকে সে পছন্দ করে। তা শুনেই বীণা খুশিতে প্রায় কেঁদে ফেলেছে। আল্লাহর দরবারে হাত তুলে বলে,
— আল্লাহ আমার দিকে মুখ তুলে এতো দিনে তুমি তাকিয়েছো। আমার ছেলের মেয়ে পছন্দ হয়েছে। এবার তাকে ঘরে তুলে আমার সংসার তার হাতে তুলে দিতে পারবো। শেষ বয়সে নাতি নাতনির মুখ দেখতে পাবো। এর থেকে খুশির সংবাদ আর কি হতে পারে?
বাঁধন আর বলতে পারেনা ছুটির নামটা। ছুটিকে নিয়ে সাহসী পুরুষের দৌড় এখানেই থেমে যায়। ঝিমাকেও বলতে পারেনা ছুটির কথা।ছুটির নামটি নিলে ঝিমা যে দুঃসাহসী হয়ে উঠবে তা বাঁধনের অজানা না। মাঝখান থেকে ছুটির জীবনটা ভরে উঠবে নানা রকম জটিলতায়। ডিভোর্সী, অসম, পারিবারিক ভাবে যেখানে ভাই বোন পরে পরিচয় দেওয়া হয় সেখানে বিয়ে নামটাই বিষাক্ত হয়ে উঠে। বাঁধন ম্যাচিউর। না পারবে ছুটিকে নিয়ে পরিবার থেকে আলাদা হতে আর না পারবে পরিবার সমাজকে এই মুহূর্তে মানাতে। যেখানে রিতীই এখনো আনমেরিড লেখা পড়া করছে। আরো আরো প্রবলেম মস্তিষ্কে একের পর এক জায়গা করে নিতে থাকে। বাঁধনের ছটফটানি বাড়তে থাকে। মাথা থেকে সব ঝেড়ে ফেললেও জানতে ইচ্ছে করে ছুটি ভালো আছে?
সুমির সাথে বাঁধনের আবার যোগাযোগ হয়। সুমিকে প্রশ্ন করে,
— ছুটি কেমন আছে?
— আমি কিভাবে জানবো ছুটি কেমন আছে?
— আমি জানি ছুটির সাথে তোমার ভালোই যোগাযোগ আছে।
— তা আছে বটে।আমি হুইল চেয়ারে বসেই যেনো জীবনে এগিয়ে যেতে পারি সেজন্য ছুটি আমাকে ভীষণ সাপোর্ট দেয়।
— তুমিও তো পারো ছুটিকে একটু সাপোর্ট দিতে। ছুটি ভালো নেই সুমি। ওকে আমার হয়ে একটু ভালো রাখার চেষ্টা করো।
বাঁধনের দিকে তাকিয়ে থেকে সুমি প্রাণখোলা হাসে। এ হাসি থামার নাম নেয়না। বাঁধন কে যেনো সেইদিন হাসিটার উত্তর দিয়ে দেয়।
— ছুটি ভালো আছে। এখন ভীষণ ভালো আছে। কিছুদিন আগে এতোটাও ভালো ছিলোনা। কেনো খারাপ রেখেছিলে ওকে?
— কি করবো? ও যেভাবে ভালো থাকতে চায় তাই কি দিবো? তুমি বলো।
— নাহ। সেটা ঠিক হবেনা। জীবন কারো জন্য পিছিয়ে থাকে না। তুমি ভীষণ ম্যানেজেবল। আমি হলে পারতাম না।
সুমির মতামত শুনে মুচকি হাসে বাঁধন। সুমি আরো বলে,
— ছুটি একদিন সব বুঝতে পারবে। তখন এই একটুখানি পাগলামির জন্য লজ্জা পাবে। তুমি তার লজ্জাটা এড়িয়ে যেও। তোমাদের ফ্যামিলির বন্ডিং ভালো। দূরে থেকেও একসাথে থাকা হবে। স্বাভাবিক সম্পর্ক বিলং করা খুব জরুরি ।
রিতীর সামনে এক বক্স ব্রেকফাস্ট। স্যান্ডুইচ, ব্রেড, ভেজিটেবল, মাটন কারি। এতো এতো খাবার যে কেনো পাঠায় রিতী বুঝেনা। নিজে তো কাবার করতে পারেনা রুমমেট দের সাথে নিয়েই শেষ করে। সোহাগ ও যেনো একটু বেশিই পাঠায়। দৈনন্দিন অরুচিকর খাবার খেয়ে খেয়ে যখনি বলে আর পারছিনা তখনি হুটহাট টেস্ট চেঞ্জ করার জন্য খাবার পাঠিয়ে দেয়। রুমমেট রা সব সোহাগের দলে । দুলাভাই বলতেই পাগল। কিভাবে যে এদের ফ্যান বানিয়েছে সেই জানে। আজতো এমন একজন কে দিয়ে খাবার পাঠিয়েছে যেই কিনা একদিন তার নামে উল্টা পাল্টা বাবাকে নালিশ করে অসুস্থ বানিয়ে দিয়েছিলো ।এতো এতো পাগলামি এতো ভালোবাসা রিতী কবে না ডুবে মরে যায়। পাগলটা দেখা না করেই চলে গেছে। রিতী ফোনে কল করে সোহাগকে। রিসিভ হতেই অভিমানী গলা ব্যক্ত হয়।
— দেখা না করেই চলে গেলে যে?
— ঐ একটু ব্যস্ত ছিলাম।
— আচ্ছা! তো কি এতো ব্যস্ততা শুনি।
সোহাগ হাসে। মাথা চুলকিয়ে বলে,
— তোমার থেকে না । প্রয়োজন ছিলো আর কি।
— তাহলে তোমার সাথে আগামী পনের দিন আমার কোনো দেখা সাক্ষাৎ হচ্ছেনা।
— মানে কি?
— রাতের ট্রেইনে বাড়ি যাচ্ছি। যেতেই হবে। অনেক মাস যাইনা।
— এই একদম না। রাতে ট্রেইনে কেনো কেনো? বাসে যাও। রাতের বেলা ট্রেইন সেফ না।
— কত লোক যাতায়াত করছে.. আমার টিকেট কাটা হয়ে গেছে। আটটায় ট্রেইন। হয়তো তোমার সাথে এভাবে কথাও বলতে পারবোনা। সময় করে আমিই ফোন করবো। এখন রাখি গোছগাছ করতে হবে।
সোহাগকে কিছু না বলতে দিয়েই ফোন কেটে ব্রেকফাস্ট শেষ করে গোছগাছের কাজে লেগে পড়ে।
স্টেশনে গাড়ির বুগি নাম্বার খোজতে এদিক ওদিক চলছে রিতী। মেলাতে পারছেনা তাই দাঁড়িয়ে পড়ে। হুট করে কেউ হাত থেকে টিকেটটা টেনে নেয়। রিতী চমকে আরে… বলে পেছন তাকাতেই চুপ হয়ে যায়।
— ঝ বগি তাইনা? ঐদিকে তো। চলো।
লাগেজটা একহাতে নিয়ে আরেকহাতে রিতীর হাতটা পুরে নেয়। ভিড়ের মধ্যে একপ্রকার যুদ্ধ করেই উঠে। সিট নাম্বার বের করে রিতীকে বসিয়ে দিয়ে লাগেজ উপরে তুলে দেয়। মিনিট খানেক পরেই গাড়ি চলতে শুরু করে। সোহাগের নামার কোন তাড়াহুড়ো দেখা যায় না। রিতী মুচকি হাসে। বোরিং জার্ণিটা তার কতো আনন্দের হতে যাচ্ছে ভেবেই আকাশে ডানা মেলতে ইচ্ছে করছে। মিনিট পাঁচেক পর সোহাগের কোমড়ে রাখা হাতে নিজের হাত গলিয়ে দেয়। আলতো ভাবে মুঠো পুড়ে নেয় হাত। এভাবেই একের পর এক স্টেশন পার হতে থাকে । দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে পা লেগে যায়। অভ্যাস না থাকলে ঘন্টার পর ঘন্টা দাঁড়িয়ে থাকা অসম্ভব।রিতী উঠে দাঁড়ায়। ইশারায় সিট দেখিয়ে বলে,
— বসো এখানে।
— তুমি বসো। আমি দাঁড়িয়ে যেতে পারবো।
— বসতে বলছি বসো।
— কোমড় ধরে গেছে?
— বসো।
সোহাগ প্যান্টটা একটু উপর দিক উঠিয়ে বসে পড়ে। উফফ একটু যেনো ভালো লাগছে বসতে পেরে। কিছুক্ষণ বসেই আবার উঠে পড়বে ভাবে। সে সুযোগটা আর পাওয়া হয়না। দু উরুতেই জায়গা করে নেয় রিতী। আশেপাশে সবাই ঝিমুচ্ছে দেখে গলা জড়িয়ে নেয় সোহাগের। দাঁড়িতে হাত বুলায়। সোহাগ হালকা হেঁসে কোমড় জড়িয়ে নেয়।
— তুমি যাবে বললেনাতো।
— একা ছাড়তে ভয় হয়।
— এর পর কি করবে তাহলে?
— আল্লাহ স্কলারশীপটা যেনো না পায় আমার বউ। আমিন।
আকাশের দিকে হাত তুলে কাঁদো কাঁদো ফেস করে বলে সোহাগ। রিতী দেয় পিঠে দু চারটে কিল। দুষ্টু হেসে বলে,
— শয়তান।
— সিরিয়াসলি দোয়া দিলাম।
— দোয়া দিলে এই দোয়া করো তোমার বউয়ের সপ্ন যেনো পূর্ণ হয়।
— বিদেশ গিয়ে কি লাভ? সেইতো বসবে আব্বার অফিসেই।
— তুমি জানো আব্বার ক্লাসিফিকেশন কি? কোন ইউনি থেকে স্টাডি কমপ্লিট করেছে? আমাকেও তো তার যোগ্য হতে হবে। ভাবছি পিএইচডি ও কমপ্লিট করে আসবো।
— আরেকটা বিয়ে করবো।
— সোহাগ..!
— কথা বলো না চুপ থাকো।
রিতী আর কিছু বলতে পারলো না। গাল ফুলিয়ে টম বানিয়ে রাখলো। এই বুঝি কেঁদে দিবে ভাব। সোহাগ দেখলেও কিছু বললোনা। সে যেনো রিতীকে কাদাতেই চায়।
রিতীকে নিতে এসেছে তমাল আর ছুটি। সোহাগকে দেখেই ছুটি মুখ ঘুরিয়ে নেয়। তমালের সাথে কথা বললেও ছুটির সাথে কথা বলেনা সোহাগ। রিকশায় তুলে দেবার সময় ছুটির হাতে হাজার টাকার নোট গুঁজে দেয়। সীনা টান টান করে বলে,
— আমি কিন্তু তোমার রাগ ভাঙাতেই এতোদূর এসেছি ছুটি রাণী। আমার একমাত্র রাণী আমার থেকে এভাবে মুখ ফিরিয়ে রাখবে সেটা কিভাবে মেনে নিতে পারি?
— আমি রাণী হলে আপু কী? দাসী?
— উহু! বিবি। সহধর্মিণী।
— দুলাভাই আমি আপনার সাথে মোটেই রাগ করেই আছি। আপনার হাজার টাকাতে কি আমার আত্মসম্মান আমি ফিরে পাবো? নাকি বাঁধন ভাইকেই ফিরে পাবো?
— বাহ! কি তেজ! এর জন্যই বলে যার জন্য করি চুরি সেই বলে চুর। আরে আমি বুদ্ধিটা দিয়েছি জন্য ই তো বেঁচে গেছো। ঐযে বলেনা আশায় বাঁচে চাষা! তোমার ও সেরকম অবস্থা হতো। ভাই বেঁচে গেছো নতুন করে কাউকে বেঁছে নাও।
— সেইতো।
— কলেজে কাউকে পছন্দ হলো?
— না।
— তা হবে কেনো? কি খেয়ে যে বুড়ো দেখে তোমার প্রাণ ফাটে আল্লাই জানে।
— আপনি খাইয়েছেন না যত খাবার রেস্টুরেন্টে।ঐসব খেয়ে।
— রাগ কমাও রাণী। বউটাকে রেখে যাচ্ছি খেয়াল রেখো। আমি যেমন রেখে যাচ্ছি তেমনি যেনো ফিরে পাই। শুকনো চেহারা একদমি সহ্য করবোনা। মনে থাকবে শালাবাবু?
তমাল দাঁত বের করে হাসে। আপাতত সে কোণ খেতে ব্যস্ত। সোহাগ দু হাতে দুটো ধরিয়ে দিয়েছে। ঘাড় নাড়িয়ে জানায় — থাকবে।
— বাবাকে কিছু বলোনা কেমন?
— একদম না।
চলবে,