#বৃষ্টির_রাতে
#রূবাইবা_মেহউইশ
(২)
বাইরের হিম শীতল বাতাসে বসার ঘরের ভেতরে থাকা প্রত্যেকেরই শরীরের পশম দাঁড়িয়ে গেছে। ভেতরে ভেতরে গা শিরশির করছে মেহতাবের। একটু আগেই সে ভয়ে কতগুলো মিথ্যে বলেছে এই জাদরেল টাইপ লোকগুলোর সামনে। মেয়েটার ভাইগুলো একটার চেয়ে একটা দানবের মত। সবচেয়ে ছোট মেহজাব না কি যেন নাম বলল সেটা তো আরও বেশি বেয়াদব। শালা হারামি এসেই বলে কিনা, “দেখতেই তো লুচ্চা লাফাঙ্গা মনে হচ্ছে আমার বোনের সাথে কি সম্পর্ক!”
মানে এমনও অসভ্য হতে পারে ছেলে তাও কিনা বয়সে তার চেয়ে অনেক ছোট। আর পটল বেকুবটাও বলে কিনা, “আমার বস মানুষ বালা মাইয়াগো লগে সম্পর্ক রাখে না।” এটা বলে সে কি বোঝাতে চাইলো আমার ওই ভেতরের সমস্যা আছে! এই শীত শীত আবহাওয়াতেও যেন হুট করেই গা আগুনের মত গরম হয়ে গেল তার। সে এক প্রকার ধমকেই বলল, “কি বলছিস এসব পটল? মেয়েদের সাথে সম্পর্ক থাকবে না কেন আমি কি গে নাকি ইম্পোটেন্ট!”
“না মানে বস….”
পটল কিছু একটা বলতে চাচ্ছিলো কিন্তু সোহরাব থামিয়ে দিলো। সে জানতে চাইলো সুপ্রভাকে কোথায় পেল মেহতাব আর তাদের পরিচয় কতদিনের?
“পরিচয় আজকেই মানে ওই যে বৃষ্টিতে সে তার বড়দা ভাই না কাকে যেন বলছিলো বিয়ে করবে না। বাড়াবাড়ি করলে আত্মহত্যা করবে তা শুনেই আমি বুঝেছি এই মেয়ে বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে এসেছে। তাই আর দেরি না করে পটলকে বললাম গাড়িতে তোল এর পরিবারের কাছে নিয়ে যাই।” কথাটা বলেই মেহতাব আবারও বোকা বনে গেল। সুপ্রভার ভাইরা এমনভাবে তাকিয়ে আছে যেন এখুনি তাকে ভস্ম করবে। মেহতাব ভীতু নয় কিন্তু চার চারজন নওজোয়ানের সামনে সে একদম পোনামাছ সে । তাকে তো দু আঙ্গুলের মাঝে রেখে চাপা দিলেই কিসসা খতম৷ ভাবতেই গা শিউরে উঠেছিলো৷ তখনি বসার ঘরে এসে উপস্তিত হয় মরিয়ম শিকদার। সোহরাব বসা থেকে উঠে এগিয়ে গেল মায়ের কাছে।
“তুমি আসলা ক্যান আম্মা! রাত অনেক হইছে ঘুমাও গিয়া।”
মরিয়ম শিকদার মাথা নেড়ে বললেন, “ঘুম নাই চোখে তুই বোস। এই ছেলে নাম কি তোমার? ”
প্রশ্নটা মেহতাবের উদ্দেশ্যে করলেন।
“মেহতাব।”
“আরেহ এতো দেখছি আমার ছেলেদের নামের সাথে একদম মিল। দেখতেও মিল আছে অনেক হঠাৎ কেউ দেখলে ওগো ভাই মনে করবো তোমারে তা নামের আগে পরে কিছু নাই?”
“ইয়ে মানে মেহতাব মীর ।”
” তুমি কি কাজ করো, বাড়িতে কে কে আছে তেমার, প্রভারে চিনো কবে থাইকা?”
এত এত প্রশ্ন শুনে সোহরাব মাকে থামতে বলল। ছেলেটা প্রভার পরিচিত না বরং একটা ভুল বোঝাবুঝিতে ছেলেটা সাহায্য করেছে। মরিয়ম শিকদার খুশি হয়ে গেলেন কথাটা শুনে। ছেলেদের বললেন ছেলেটাকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আসিস আর না হয় আমাদের বাড়িতে আজ রাতটা থাক।
শীতের মধ্যেও মেহতাবের ঘর্মাক্ত অবস্থা। কি পরিবাররে বাবাহ্! তাদের বাড়ির মেয়েকে বাড়ি ফিরিয়ে দিয়েছে কোথায় আদর আপ্যায়ন করে যেতে দেবে তা না একেকজন একেকটা কথা বলে বলে তার হার্টবিট বাড়িয়ে দিচ্ছে। এখন মনে হচ্ছে যতদ্রুত এ বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়া যায় ততোই মঙ্গল। মেহতাব আবারও বলল, “আমার যেতে হবে এবার।”
সাথে সাথেই তৈয়াব উঠলো বসা থেকে সে বলল, “চলো।”
“আমরা একাই যেতে পারবো গাড়ি আছে সাথে।”
তৈয়াব বলল, “বাড়ি পৌছে দিতে যাচ্ছি না গেইট পর্যন্ত যাবো। ভদ্রতা বলেও তো কিছু আছে।” মেহতাব আর কিছু না বলাই সমীচীন মনে করলো। পটল, মেহতাব আর তৈয়াব গেইটের দিকে পা বাড়াতেই সুপ্রভা দোতলা নিচে এলো। তাকে দেখতেই তার মা বলল, ” ছেলেটাকে ধন্যবাদ দিয়েছিস?”
“কিসের ধন্যবাদ!” ভারী রুক্ষ শোনালো তার কণ্ঠস্বর। মরিয়ম শিকদার ধমকে উঠলেন, “বেয়াদব মেয়ে একটা ছেলে ঝড় বৃষ্টির মধ্যে তোকে সহীহ সালামত পৌঁছে দিয়ে গেল। একদম ভাইয়ের মত কাজ করেছে ছেলেটা।”
“ভাইয়ের মত! মাই ফুট,,,,রাত বিরাতে জোরজবরদস্তি করে মেয়েদের গাড়িতে তোলে সে কিনা আবার ভাইয়ের মত, ফালতু পারভার্ট একটা!”
শেষের শব্দটা খুব করে কানে লেগেছিলো মেহতাবের। সে বের হতে হতেই একবার পেছন ফিরে তাকালো মেয়েটার দিকে তারপর নিঃশব্দে বেরিয়ে গেল। তৈয়াব অতি ধুরন্ধর সে মেহতাবকে এমনিতেই যেতে দিলো না। তার ফোন নম্বর আর গাড়ির লাইসেন্স এর কপি থেকে ফোনে ছবি তুলে রাখলো, ঠিকানাটাও জেনে রাখলো। পাশের এলাকার স্থানীয় ছেলে শুনে তার ভাবনা কিছুটা সহজ হলো।
রাত দুইটা বারো; মেহতাব বাড়ির সামনে এসে গাড়ি থামাতেই দেখলো তার আব্বা হাতে টর্চ নিয়ে গেইটের কাছে। এলাকায় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়েছে ঝড়ে তা এ বাড়ির আশপাশের অন্ধকার দেখেই বোঝা গেল। তাদের জঙ্গলে বাড়িতে রাতের পুরো সময় বৈদ্যুতিক আলো জ্বালানো থাকে সবসময় নইলে অন্ধকারে বড়রাও বের হওয়ার সাহস করে না। এখন বৃষ্টি নেই তবুও গাছের ডাল, পাতা থেকে টপটপ করে ফোটায় ফোঁটায় পানি ঝরছে। মেহতাব গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়াতেই তার বাবা টর্চের আলো ফেলল তার মুখে। হাতে পরা ঘড়িটা উঁচু করে ধরে বলল, “রাইত বাজে দুইটা বিশ আমার আব্বাজান বাড়ি ফিরছেন এহন। তা আরেট্টু দেরি কইরা আইতেন আর নয়তো সক্কালেই আইতেন।”
“আব্বা শোনেন মানে হয়েছে কি রাস্তায় একটা মেয়ে বিপদে পড়েছে।”
“আর তারে আপনে উদ্ধার করে আসছেন। তা কই দেখি মেয়েটা।”
“বাড়িতে দিয়ে এলাম তো তাই দেরি হয়ে গেল।আব্বা আপনি ঘরে যান এই কাঁদার মধ্যে কেন দাঁড়িয়ে আছেন?”
“আমার চিন্তা করতে হইবো না আপনার। কালকা সকালের ট্রেনে চট্টগ্রাম ফেরত যাইবেন আপনে। এই পোটলা তুই হারামজাদা অর লগে বাইর হইয়া অর মতোই রঙ দেখাইতাছোছ। কালকা ধরমু তরে।”
“খালু আমার কোন দোষ নাই। বিষ্টিতে গাড়ি খারাব হইছে, বসে গাড়ি ঠিক করতে দেরি করছে আবার কয় মাইয়ারে ধর্মের বইন কইয়া ধরতে বাড়ি দিয়া আইবো।”
কাঁদো কাঁদো গলায় পটল সবিশ্লেষণে সবটা বলে দিতেই চোখ বড় বড় করে তাকালো মেহতাবের বাবা। ছেলেটা বাড়ি এসেছে দুদিন হলো অথচ তিনি দু দিনে ছেলেটাকে দেখেছেন মাত্র একবার। তাও কিনা গাড়ির চাবির জন্য বাপকে খুঁজেছিলো। ঘরের বড় সন্তান সে এতদিন পর বাড়ি এসেছে কোথায় বাপ, মা ভাই বোনকে সঙ্গে নিয়ে কিছু সময় কাটাবে তা না! হতাশায় মুখটা ছোট হয়ে এলো আফছার মীরের। ছোট বেলা থেকো আচরণে শান্ত ভদ্র ছেলেটা চার বছরে পুরোপুরি বদলে গেছে। এজন্যই তিনি চাননি ছেলে বড়লোক নানার বাড়িতে গিয়ে উঠুক৷ কিন্তু ছেলে আর তার মা পড়াশোনার নামে ছেলেটাকে চট্টগ্রামে পাঠিয়ে দিলো। আফছার মীর আর কিছু না বলে বাড়ির ভেতর ঢুকলেন। মেহতাবও আবার গাড়িতে বসে গাড়িটা গ্যারেজে ঢোকালো। পটল গিয়ে গেইট তালা দিলো৷ এত রাতে যে আজ আর খাওয়া জুটবে না তা মনে পড়তেই মেহতাবের পেটে খিদে চড়ে গেল। অতি সন্তর্পণে নিজের ঘরে ঢুকে পোশাক পাল্টে লুঙ্গি আর টিশার্ট পরে বিছানায় বসলো। কপাল তার খুব একটা মন্দ নয় মা ভাত নিয়ে ঘরে এসেছে।
“ভালো হবি না তুই? নিজেও বকা খেলি সাথে তোর জাহিল বাপের বকায় আমাকেও শামিল করলি।”
“স্যরি মা, বুঝতে পারিনি এমন কিছু হবে। আর তুমি কেন বাবাকে এমন বলছো আমার কিন্তু খারাপ লাগে।”
“বেশি কথা না বলে হা কর।” মাছুমা বেগম খাবার ছেলের মুখের সামনে ধরলেন। মেহতাবও আর কিছু না বলে খাবার খেয়ে নিলো। পটলকে খাবার দিয়েছে কিনা তা জিজ্ঞেস করতেই মাছুমা জানালেন পটলও খাচ্ছে। খাওয়া শেষ হতেই মা চলে গেলে মেহতাবও মোম নিভিয়ে শুয়ে পড়লো। কালই এসেছে চট্টগ্রাম থেকে আর আসতেই গাড়ি নিয়ে সারাদিন বাড়ির বাইরে ছিলো। এই গাড়ি নিয়েও কম ঝামেলা হয়নি তার জীবনে৷ সে কিসসা অন্য আরেকদিন বলবো।
ভোরের আলো ফুটতেই মাছুমা বেগম চিৎকার চেঁচামেচি করে নুড়ি আর পটলকে ডাকতে লাগলেন। কাল মাঝরাত অব্ধি ঝড়বৃষ্টিতে গাছের ছোট, মাঝারি প্রায় সব আমই পড়ে গেছে। বাড়ির সবচেয়ে অলস কাজের ব্যক্তি নুড়ি আর তাকে জাগাতেই বেশি চেঁচাতে হয় মাছুমার৷ বাপের বাড়ি থেকে এই অকর্মা কাজের লোকটি ইচ্ছে করেই এনেছিলো মাছুমা। নুড়ির ঘর সংসার বলতে কিছু নেই। বিয়ে হয়েছিলো তার স্বভাব দোষেই তা টিকেনি বাড়িতে এক বৃদ্ধা মা আছে সেও অন্যের বাড়িতে কাজ করে খায়। নুড়ির বকবকে স্বভাবের জন্য তাকে কেউ কাজে রাখতে চায় না। মাছুমার মনে হলো সে তাকে ঠিক করে কাজ করাতে পারবে তাই আগ বাড়িয়ে এনেছিলো কয়েক বছর আগে। মন্দ না, করছে কোনমতে কাজকর্ম। সকাল সকাল এখন তাকে আর পটলকে নিয়ে গেলেন বাগানে আম কুড়াতে৷ বাড়ির সামনের দিকে ফুল, ফল আর কাঠ গাছে অনেকটা জায়গা জঙ্গলের মতন৷ কিন্তু পেছনের আম, জাম, কাঁঠাল লিচুর গাছে বিশাল এক বাগান। আগে এই বাগানের ফলমূল অর্ধেকের বেশি যেত পাড়ার লোকের ভোগে কিন্তু বছর দুই হলো পুরো বাড়ি আর বাগান মিলিয়ে দেয়াল দিয়েছে আফছার মীর। এখন সব বাগানেই পড়ে থাকে যতক্ষণ না নিজেরা গিয়ে কুড়ায়। মায়ের চেঁচামেচিতে ঘুম উবে গেছে মেহতাবের। আড়মোড়া ভেঙে বিছানা ছাড়লো। ঘাড়ের ওপর তোয়ালেটা রেখে ঘর থেকে বেরিয়ে বেসিনের সামনে গেল। পেছন থেকে মাইশা বলল, “বাড়ি কেন আসো ভাইয়া? মায়ের জন্য তো এখানে সকালে একটু ঘুমাতেও পারো না।”
বোনের কথা কানে যেতেই মেহতাব হাসলো। ব্রাশ নিয়ে তাতে পেস্ট লাগাতে লাগাতে বলল, “সারাবছর পিচফুল থাকার মাঝে আনন্দ নেই মাঝেমধ্যে এই মায়ের গলার ঝংকার শুনলে মনটা বেশ সতেজ থাকে।”
“উফ, এখানে কিসের সতেজতা! আমার এসএসসিটা শেষ হলেই আমি নানাবাড়ি চলে যাবো। এই বাড়িতে আর না।”
বিরক্তি ঝরে পড়ছে মাইশার গলায়। আজ তো শুধু আম আর নুড়ি খালার জন্য এছাড়াও মা রোজ কোন না কোন কারণে সবার ঘুম ভাঙায় এই সকালেই। মেহতাব স্মিত হাসি দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। হাঁটতে হাঁটতে প্রথমে বাড়ির পেছনে বাগানটা এক নজর দেখলো। সত্যিই এবার আম গাছের প্রায় বেশিরভাগ আম পড়ে গেছে। বাগানের শেষেই তাদের বড় পুকুরটা কিন্তু এখন দেয়ালের জন্য সেখানে রাস্তা দিয়ে যেতে হয়। ব্রাশ করতে করতেই সে আবার পা বাড়ায় গেইট পেরিয়ে রাস্তার দিকে৷ সূর্যের সোনালি আলো পাতার ফাঁকে উঁকি মেরে চোখে, মুখে লাগছে খুব করে। রাস্তা দিয়ে হেঁটে পুকুরের কাছে যেতেই কানে এলো চুড়ির রিনিঝিনি আওয়াজ৷ মেহতাব জানে এই আওয়াজের উৎস আর উৎপত্তিকারীনি কে! সে না ফিরেই বলল, “পেছনে পেছনে আসছিস কেন?”
“সামনে থেকে ধরতে না পারলে পেছনেই আসতে হয়।”
“এসব ফালতু কথা কে শেখায়!”
“যেই শেখাক তুমি কাল এসেছো অথচ একটাবারও দেখা করলে না কেন?”
এবার মেহতাবকে ফিরে তাকাতেই হলো। সে ভ্রু,যুগল কুঁচকে কিছু সময় তাকিয়ে থেকে বলল, “তোর স্বভাব পাল্টাবে কবে?”
“কোন স্বভাব!” অবাক হয়ে প্রশ্ন করলো আয়না।
“এই যে ছ্যাচড়ার মত আমি আসছি শুনেই নতুন জামা, চুড়ি, টিপ সব লাগিয়ে ঋতুপর্ণা সেজে আসিস। লোকে যে এসব দেখে মন্দ বলে তা কি জানিস না?”
“লোকে কিছুই বলে না। তুমি বললেই লোকে বলবে। বলো তো কিছু। ”
“ফুপু কেমন আছে?”
“বাড়ি গিয়ে খোঁজ নিয়ে আসো।”
“সকাল সকাল এভাবে বাড়ি থেকে না বের হলেও পারতিস। বাড়ি যা।”
“তোমার বাড়ি!”
“থাপড়ে একদম ঠিক করে দেবো।” চোখ-মুখে রাগের আভা ফুটিয়ে তুলল মেহতাব। সে জানে এবার মেয়েটা মুখ ফুলিয়ে ফুঁপিয়ে ফুপিয়ে বাড়ি যাবে। তাছাড়া যতক্ষণ সুযোগ পাবে তার পেছনেই পড়ে থাকবে। কত বড় হয়ে গেল মেয়েটা অথচ এখনো সেই আগের মত তার কাছে আসতে চায়। মেহতাবের খারাপ লাগে। একটা মাত্র ফুপুর একমাত্র মেয়ে আয়না। কত ভালোবাসে তাকে কিন্তু সেই’বা কি করে! সে তো বোনের বাইরে কখনোই অন্যচোখে দেখে না তাকে। অবশ্য সে চেষ্টা করেনি তা না। মা- বাবা বলেছিলো দ্যাখ আয়না ঘরের মেয়ে। তুই একটু মানিয়ে নিলেই তোদের সুন্দর একটা সংসার হতে পারে। কিন্তু মেহতাবের মন আয়নাকে নিয়ে কোন ভাবনাই আনতে পারে না। তার আর পুকুরের দিকে যাওয়া হলো না। বাড়ি ফিরে মুখ হাত ধুয়ে বেরিয়ে গেল বন্ধুদের সাথে। মাইশাকে বলে গেল, “মাকে বলিস বাজারেই নাশতা করবো বন্ধুদের সাথে।”
চলবে
#বৃষ্টির_রাতে
#রূবাইবা_মেহউইশ
(৩)
ঝরঝরে এক রোদেলা সকাল ঘুলঘুলির ফাঁক, ফোকরে ঢুকে রাজত্ব করছে সুপ্রভার চোখে মুখে। রাতের শীতলতায় জাঁকিয়ে আসা ঘুমটা দুষ্ট মিষ্টি রোদের হুটোপুটি খেলায় বিরক্ত হয়ে চোখের পাতা ত্যাগ করলো৷ টিকটিক করতে থাকা দেয়াল ঘরিতে আধো আধো চোখ খুলে তাকিয়েই চিৎকার করে উঠলো সুপ্রভা। কথা ছিলো আজ খুব ভোরে উঠে সে যাবে তার বান্ধবী টিয়ার কাছে। টিয়া পাখির আগামী সপ্তাহে বিয়ে আর সেই বাহানাতেই তো সে হোস্টেল থেকে বেরিয়েছে। বড়দা ভাই আর মায়ের জন্যই তাকে অতদূরে থেকে পড়াশোনা করতে হচ্ছে৷ নইলে এত সুন্দর, সবুজ রাজ্য ছেড়ে ঢাকা শহরের মত ধূলির রাজ্যে সে ভুল করেও পা ফেলতো না। মনে মনে সে দিন গোনে আর দুটো বছর তারপরই অনার্সের পাট চুকিয়ে বাড়িতে বসত গাড়বে৷ যদিও ততদিনে হয়তো এ বাড়ির বসত তার উঠে যাবে। শ্বশুর বাড়ির আঙিনা অপেক্ষা করবে তার জন্য কিন্তু তার তো খুব করে ইচ্ছে হয় এই গ্রাম, এই ভূমিতে আরো কিছুটা সময় স্বস্তির শ্বাস ফেলতে। কিসব আজাইরা ভাবনা বড়দা ভাইয়ের ঢাকায় থেকে পড়াশোনা করলে বড় কোন শহুরে পরিবারে বিয়ে দিতে পারবে। একটা মাত্র বোনকে শহরের সবচেয়ে দামী, বড়লোক আর শিক্ষিত পরিবারে বিয়ে দিতে পারবে। আদৌ কি এমনটা সম্ভব! বিয়ে হলো নসীবের লেখা। আল্লাহ তা’য়ালা যেখানে, যে পরিবারে এবং যার সাথে লিখেছে তার সাথেই হবে। পড়াশোনা সে ঢাকায় করুক কিংবা সিলেটে বিয়ের জন্য সেই স্ট্যাটাস কোন কাজে আসবে না। চোখ কচলাতে কচলাতে বিছানা ছাড়লো সুপ্রভা তখনি কানে এলো ভাবীর ডাক, “প্রভা, জেগেছিস? প্রভা দরজা খোল তোর ভাইয়া ডাকছে।”
আড়মোড়া ভাঙতে ভাঙতে এসে দরজা খুলল সুপ্রভা। পরনে তার পাঞ্জাবীর মত ঢিলেঢালা কূর্তা আর লুঙ্গির মত ঢোলা প্লাজো। ঘুমের ধরণ তার কোনকালেই ভালো ছিলো না আর তাই ঘুম থেকেই উঠলেই লম্বা, সিল্কি চুলগুলোও ঠিক কাকের বাসার মত হয়ে থাকে। আজও ব্যতিক্রম নয় এ অবস্থা থেকে। এলোমেলো চুল দু হাতে মুড়িয়ে ঘাড়ের ওপর রেখে সে ভাবীকে জিজ্ঞেস করলো কেন ডাকছে?
ভাবী মিরা বলল, “তুই প্রত্যেকবার বায়না ধরিস সুনীল কাকার হোটেলে বসে পরোটা, মিষ্টি নাশতা করবি কখনো তো নিয়ে যায় না। এবার তোর ভাইয়ের মতিগতি বদলে গেছে৷ বলছে তোকে সাথে নিয়ে ওখানে নাশতা করবে তৈরি হয়ে আয়।”
“আমাকে সাথে নিয়ে যাবে!”
“হ্যাঁ”
“বাড়িতে নিয়ে আসবে না নাশতা?”
“তুই তো গিয়েই খেতে চাস?”
“মতলব কি?”
সন্দিহান মুখে প্রশ্ন করলো সুপ্রভা। মিরা থতমত খেয়ে গেল তার প্রশ্নে। মতলব একটা আছে বৈকি তাই আজকের ভিন্ন এক আয়োজন করেছে সোহরাব সাথে মেহরাবও যুক্ত। চার ভাইয়ের মধ্যে এই দুই ভাই মাত্রাতিরিক্ত চতুর৷ সৌহার্দ্যকে নিয়ে কিছু কথা খোলাসা করতে চায় সোহরাব। বোনকে নিয়ে তার আদর -আহ্লাদে কখনো কমতি ছিলো না কিন্তু এখন এই সৌহার্দ্য সম্পর্কে জানার পর থেকেই তার ভাবনায় লাগাম পড়েছে। সেই সাথে মায়েরও একটা সিদ্ধান্ত নেওয়া আছে। কিন্তু বোনটা তার বড্ড একরোখা আর জেদি। খুব সম্ভব বাড়ির সবার আদরের পরিমাণটাই তাকে বিগড়ে দিয়েছে।
মিরা তাড়া দিয়ে চলে গেল। সুপ্রভার ঘরের ভেতরেই বাথরুম থাকায় সে মুখ হাত ধুয়ে পোশাক বদলে তৈরি হলো। মিনিট দশেকের মাঝেই সে তার বড়দার সামনে হাজির হলো৷ সোহরাব হাতে দুটো নতুন কলম নিয়ে ভালো করে চেক করলো। একটা সই করার জন্য আরেকটা বলপেন নিলো। তার আড়তে প্রয়োজনের লেখালেখির উদ্দেশ্যে। আজ বোনকে নিয়ে বেশ খানিকটা সময় তার বোনকে দিতে হবে ভেবে কিছু কাজ তৈয়াবকে বুঝিয়ে দিয়েছে। আজকের আকাশ মেঘহীন ঝলমলে তাই দিনের কাজগুলো সে স্বাচ্ছন্দ্যে করতে পারবে বলে আশা করছে। সুপ্রভা ডাকলো, “বড়দা ভাই , নাশতা বাড়িতেই করবো।”
“কেন রে মনা তোর জন্য তো আমি নয়াগঞ্জে খবর পাঠিয়েছি সুনীল কাকার হোটেলে। তোর পছন্দের নাশতা করবো আমরা দুজন সেখানে।”
সুপ্রভা বলতে চাচ্ছিলো সে টিয়ার কাছে যাবে একটু পর কিন্তু বড়দা ভাইয়ের মুখটাতে তাকিয়ে আর ইচ্ছে হলো না বলার। এই মানুষটা বড্ড ভালোবাসে তাকে। সে শতভাগ নিশ্চিত এতোটা ভালো তাকে বাবা কিংবা মা কেউই বাসে না। বিয়ের বারো বছরেও বড়দার ঘর আলো করে একটা ফুটফুটে শিশু আসলো না বলেই কিনা কে জানে সবচেয়ে ছোট এই বোনটাকে সে সন্তানের মতোই আদর, শাসনে বড় করছে৷ মিরাও তেমনই ননদকে ছোট, বোন, বাচ্চা মনে করে সবরকমেই যত্ন নেয়। সুপ্রভা আর কথা না বাড়িয়ে বের হলো ভাইয়ের সাথে। মেজদা ভাই বাবার সাথে ব্যবসায়িক কাজে যাবে। সেজদা ভাইও নিজ কাজে ব্যস্ত বাকি রইলো ছোট ভাই মেহজাব। সে আজ পড়াশোনা রেখে একদম ফ্রী সকাল সকালই। তাই বড়দার কাছে আবদার করলো সঙ্গে যাওয়ার। মায়ের কাছে অনুমতি নিয়ে তিন ভাই বোন অটোরিকশায় চড়ে চলে গেল নয়া গঞ্জের বাজারে সবচেয়ে নামকরা হোটেলে। নিজেদের এলাকার বাজারে এত ভালো হোটেল নেই বলেই সোহরাব সেই হোটেল থেকেই মন্ডা, মিঠাই আর নানা ধরনের মিষ্টি খাবার কেনে৷ রুটি, পরোটা, মাছ – মাংসও পাওয়া যায় সেখানে। মোটকথা সুনীল কাকার বিশাল দোকানটার একপাশে হোটেল অন্যপাশে মিষ্টান্ন ভাণ্ডার। ভোরে আকাশটা যত পরিষ্কার ঝকঝকে ছিলো এখন আর তা নেই। একটু একটু করে মেঘ জড়ো হচ্ছে যেন নয়া গঞ্জের আকাশটায়। সুপ্রভারা যখন নিজেদের গ্রাম দয়া গঞ্জ ছেড়ে নয়া গঞ্জে পৌঁছুল ততক্ষণে আকাশের রোদ ঢাকা পড়েছে ছাইরঙা মেঘের আড়ালে।
“দোস্ত আর কত পড়বি তুই? ব্যাংকে চাকরি পেয়ে গেছিস এখন তো বিয়ে করে একটা সুন্দরী বউ নিয়ে আয়৷ চাচী তো দেখি প্রায়ই আমার মায়ের কাছে আসলেই বলে একটা বউ থাকলে ভালো হতো।” রিমন বলল মুরাদকে আর মুরাদ পরোটা ছিঁড়ে মুখে দিয়ে গপগপ করে গিলছে তো গিলছেই। তার কান নেই বন্ধুদের কথায়। সে খাওয়া পাগল মানুষ খাওয়ার সময় কোন আলাপ তার পছন্দ নয়। পাশেই বসে সুমন আর তাসিনও খাচ্ছিলো। তারা মুরাদকে এক নজর দেখলো কিন্তু বিশেষ কোন ভাবান্তর নেই তাদের। রিমনের রাগ হলো খুব তা দেখে। মুরাদের মা খুব করে ধরেছে রিমনকে যেন সে আর বাকি বন্ধুরা মিলে মুরাদকে বিয়ের জন্য রাজী করায়। মুরাদের পরিবারে মা আর সে ছাড়া তৃতীয় কোন ব্যক্তি নেই। মুরাদ অনার্স কমপ্লিট করেই ব্যাংকে চাকরি পেয়েছে তার খালুর জোরে। এরপরই সে মাস্টার্সেও এডমিশন নিলো। কিন্তু তার মা নিজের একাকীত্বের পর্দা সরাতেই ছেলের বউ ঘরে আনতে চায়। মুরাদ তা নিয়ে মোটেও মুখ খোলে না। আজ সব বন্ধু একসাথে হওয়ার কথা শুনেই মুরাদের মা রিমনকে বলেছে আজ তোমরাই বলো কিছু একটা। রিমন উদ্দোগ গ্রহণ করলেও বাকিরা গা করছে না। শুধু তাসিন একটু মজা করে বলল, “তুই যতোটা উত্তেজনা দেখাচ্ছিস মনে হচ্ছে বিয়েটা মুরাদকে নয় তুই নিজেই করবি।”
তাসিনের খাওয়া শেষ সে উঠলো হাত ধুতে। হোটেলের মূল গেইটের ডান দিকে বেসিন আছে লাগোয়া। তাসিন পেছনে ফিরে রিমনকে ক্ষেপাতে ক্ষেপাতে সামনে আগাচ্ছিলো। দরজার ঠিক কাছাকাছি আসতেই হঠাৎ কারো সাথে ধাক্কা লাগলো। বেখেয়ালে তাসিন থাকলেও সামনের মানুষটি খেয়ালি দৃষ্টিতেই সামনে আগাচ্ছিলো বলে ধাক্কাটা গুরতর লাগেনি৷ তাসিনের ডান হাতের বাজুতে সামনের মানুষটির মাথা লেগেছে। অল্পতেই সংগাত সামলে নিলেও ভয়ে চিৎকার করে উঠেছিলো মানুষটি আর তাই হকচকিয়ে সামনে তাকায় তাসিন। মেঘলা আকাশটা ঝপাৎ করে ঢেলে দিলো মেঘভাঙা বৃষ্টি। তাসিনের মনে হলো পূর্বপরিকল্পিত এই ধাক্কা। যেন কাল রাতের বর্ষণের স্মৃতিচারণ করাতেই আজ তীব্র রোদকে ঢেকে এই বৃষ্টির আগমন। সামনে থাকা মেয়েটি কি তাকে চিনতে পেরেছে! কথাটা মনে করতেই মনে পড়লো কাল মেয়েটির বলা শেষ শব্দ৷ তাকে পারভার্ট বলেছে, ফালতু আখ্যা দিয়েছে। রুমঝুমে বৃষ্টির মন মাতানো আবহাওয়াও বিরক্তিতে বিষাক্ত লাগছে তার। কত সুন্দর মুখশ্রীর লিলিপুট সাইজ মেয়েটার মুখের ভাষা বিষের মত জ্বলন্ত! তাসিন কিছু বলতে যাবে তার আগেই সামনে থেকে একজন বলল, “আরে মেহরাব যে!”
” মেহরাব না মাহতাব।”
“ওহ, ভুলে গেছি৷ একইরকম অনেকটা। তা এখানে কেন বউ নাশতা বানায়নি আজ? নাকি কাল রাতের জন্য সত্যিই কোন ঝামেলা হয়েছে?”
সোহরাবের কথা শুনে তাসিন একটা ফাঁকা ঢোক গিলল। কাল রাতে সে বিপদে পড়ার ভয়ে নিজেকে বিবাহিত বলেছিলো৷ আর এই মিথ্যেটা বলতে হয়েছিলো সামনে থাকা সুন্দরী লিলিপুটের জন্য৷ মেয়েটা দেখতে যত সুন্দর আচরণে ঠিক ততোটাই বদ। তাসিন আর সোহরাবের কথার মাঝেই রিমনও এলো হাত ধুতে। সে তাসিনকে ডাকলো, “তাসিন! তুই না বাড়িতে মিষ্টি নিবি বলেছিলি অর্ডার দিয়েছিস?”
কথাটা বলে তাসিন খেয়াল করলো সুপ্রভা, সোহরাব আর মেহজাবকে৷ কিছু জিজ্ঞেস করতে উদ্যত হতেই মেহজাব প্রশ্ন করলো তাসিনকে, “আপনি না কাল বললেন আপনার নাম মাহতাব?”
চোখা চোখে তাকালো সুপ্রভা আর বিড়বিড় করলো, “এ্যাই ছেমড়া লাফাঙ্গা তাতো এর চেহারা দেখলেই বোঝা যায়।”
“হ্যাঁ আমি মাহতাব। তাসিন মাহতাব মীর।”
সোহরাব বুঝতে পারলো তাসিন হয়তো ছেলেটার ডাকনাম৷ সে ঘাটাতে চাইলো না তাই বলল, “এই হোটেলের পরোটা মিষ্টি আমার বোনের খুব পছন্দ তাই আজ নিয়ে এলাম এখানে৷ তুমিও নাশতা করতে এসেছো? চলো আমাদের সাথে বসো।”
সোহরাব ভদ্রতা প্রকাশ করতেই তাসিনকে আমন্ত্রণ জানালো। তাসিনও জানালো তার নাশতা হয়ে গেছে৷ সুপ্রভারা একটা টেবিলে বসলো। ততক্ষণে তাসিনের বন্ধুরা সবাই নাশতা শেষ করে টেবিল ছেড়ে এসেছে। হাত ধুয়ে বিল মিটিয়ে তাসিন তার গাড়ির দিকে গেল৷ বন্ধুরাও গেল সাথে কিন্তু সবারই মুখ চলতে থাকলো৷ সবার এক প্রশ্ন ঘটনা কি! হোটেলের দরজার কাছে গিয়ে বৃষ্টি দেখে তাসিন অবাক হলো৷ সকালে কেমন রৌদ্রজ্বল সময় আর এখনই এমন আকাশ ভেঙে বারিধারা! হঠাৎ করেই মনে হলো মেয়েটাই একটা কুফা। সে এলো বলেই এমন বৃষ্টির শুরু৷ বন্ধুরা সবাই গাড়িতে উঠে বসতেই তাসিন বলল, “আয়নার জন্য কি করা যায় বলতো?”
“বিয়ে কর।”
চলবে