#বৃষ্টিশেষে_প্রেমছন্দ
#মুমুর্ষিরা_শাহরীন
৪৪.
বর্ষার গগন শরতের ন্যায় স্বচ্ছ। পেজা তুলোর ন্যায় শুভ্র মেঘের উড়াউড়ি তাতে। প্রকৃতি বিলাচ্ছে ঠান্ডা বৃষ্টি হাওয়া। রাহুল আর নয়ন একসাথে যাচ্ছে গুলশানের বড় আভিজাত্যপূর্ণ রুহুল হকের বাড়িতে। রুহুল হকের করুণ আবদার বিয়েটা যেনো এই বাড়ি থেকেই করা হয়। কিন্তু রাহুল কোনোমতেই রাজি নয়। রুহুল হক তখন বললেন অন্তত আজকের জন্য এসো। দুপুরের খাবারটা খেয়ে চলে যেয়ো। রাহুল বিয়ের আগে আর কোনো ঝামেলা চাইছে না। তাই অগ্যতা তাকে যেতে হচ্ছে সাথে একাকীত্ব দূর করতে নয়নকেও বগলদাবায় করে নিয়ে ছুটে চলেছে। রিক্সা দিয়ে যেতে যেতেই রাহুল খুব প্রফুল্লতার স্বরে বলছিলো,
‘জীবনে এই প্রথম বোধ হয় আমি যা চেয়েছি তা পাচ্ছি। বুঝলি নয়ন? আমার খুব খুশি লাগছে। এতোটা খুশি আমি এ জীবনে কক্ষনো হইনি।’
‘তাই? তাহলে চল এই খুশিতে একটা দারুণ কাজ করে ফেলি। আমিও বিয়ে করে ফেলি।’
রাহুল মজার ছলে নয়নের পেটে গুতা দিয়ে বলল, ‘পছন্দের কেউ আছে?’
‘আছে তো। প্রথমদিনই দিল কাইরে নিছে তোর শালী। চল না বন্ধু, একসাথে শুভ কাজটা সেড়ে ফেলি।’
রাহুল চোখ গরম করে তাকালো। ব্যাপক মাত্রায় রাগ দেখিয়ে বলল, ‘শালা! নজর ভালো কর। আমার কলিজার বোন লাগে।’
‘কলিজার বোনরে তো বিয়ে করতাছো।’
‘নাহ, কলিজাকে বিয়ে করছি আর টায়রা আমার কলিজার বোন।’
নয়ন গালে হাত দিয়ে বলল, ‘আমি প্রথমে ভেবেছিলাম তোর আর নিভার মধ্যে গিট্টু আছে।’
রাহুল হাত নাড়িয়ে মাছি তাড়াবার ন্যায় বলল, ‘নারে! তুই সবসময় বেশি ভাবিস। ওর আর আমার মধ্যে খুব ভালো বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। কিন্তু আপসোস আমার সেই খুব ভালো বন্ধুটাকেই আমার এতো খুশির খবরটা দিতে পারছি না।’
‘হুম’ বলে নয়ন চুপ হয়ে গেলো। রাহুল আবার বলল,
‘নাম্বারটা নিয়ে রাখার উচিত ছিলো বুঝলি? বড্ড বড় ভুল করে ফেলেছি।’
,
দুপুরের জবরদস্ত খাওয়া দাওয়ার পর রুহুল হক একা রাহুলকে নিজের ব্যক্তিগত লাইব্রেরি রুমে ডাকলেন। রাহুল চোখ মুখ শক্ত করে গিয়ে দাড়ালো। রুহুল হক চেয়ারে বসতে বললেন। নির্বাকে রাহুল চেয়ারে বসলো। রুহুল হক কাশলেন, পানি খেলেন এরপর অনেক্ক্ষণ সময় নিয়ে বললেন,
‘তো কি ভাবছো?’
রাহুল ভ্রু কুচকে জানতে চাইলো, ‘কোন বিষয়ে?’
‘বিয়ে করছো। কিন্তু বউকে খাওয়াবে কি? বউকে রাখবে কোথায়? ব্যাচেলর বাসায় তো আর রাখতে পারবে না।’
রাহুল বাকা হেসে বুকে হাত ভাঁজ করে কথা শুনতে লাগলো। রুহুল হক গলা ঝেড়ে বললেন,
‘আমার ব্যবসায় বসো। আর কতদিন..’
রুহুল হককে থামিয়ে রাহুল বলল, ‘আমার ব্যাপারে আপনার না ভাবলেও চলবে। আমার ব্যাংকে চাকরি হয়েছে। সামনের মাস থেকে জয়েনিং। আর কিছু বলবেন?’
রুহুল হক অবাক হয়ে বললেন, ‘কবে হলো?’
‘পরসু খবর পেয়েছি।’
‘বাহ! একবার জানানোর প্রয়োজন মনে করলে না?’
‘কতকিছুই তো জানেন না। সবাই কি আপনাকে সবকিছু জানিয়ে করছে? এ পৃথিবীর সবকিছু কি আপনার জানা?’
রুহুল হক থতমত খেয়ে স্থিত হলেন। ছেলেটা বড্ড বড় হয়ে গেছে। কি সুন্দর মারপ্যাঁচ দিয়ে কথা বলা শিখেছে! রুহুল হকের ভাবনার মাঝেই রাহুল উঠে চলে যেতে লাগলো। দরজার বাইরে পা রাখার আগেই রুহুল হক বলে উঠলেন,
‘শোনো? আমি ইচ্ছে করে আকিদাকে বিয়ে করিনি।’
রাহুল পেছন ঘুরে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল, ‘যেভাবেই হোক করেছেন তো? আমার মায়ের মৃত্যুর চল্লিশ দিন হওয়ার আগেই এই মহিলাকে বিয়ে করে এনেছেন। দিনটা আজও আমার চোখের সামনে ভাসে।’
রুহুল হক ভাবলেশহীন গলায় বললেন, ‘তবুও তোমার জানা দরকার। বিয়ে করছো। এখন বড় হয়েছো। সবকিছু জানার দরকার আছে তোমার।’
রাহুল পকেটে হাত দিয়ে দাড়ালো, ‘হঠাৎ আজই কেনো মনে হলো আমার সবকিছু জানার দরকার?’
‘জানি না। তবে কতকাল আর মনে মিথ্যে গল্প পুষে রাখবে। সত্যিটা জানার দরকার না তোমার?’
রাহুল বুকে হাত ভাঁজ করে দাঁড়িয়ে গম্ভীর গলায় বলল, ‘বলুন।’
রুহুল হক হতাশ নিঃশ্বাস ফেললেন। শূন্যে তাকিয়ে করুন গলায় বললেন,
‘তুমি তো জানো তোমার মায়ের দু’কূলের কেউ নেই। শুধু ছিলো এক হতদরিদ্র খালা। সেই খালাও আমাদের বিয়ের পর পরই ইন্তেকাল করেন। শুধু রইল খালু। তোমার মায়ের আপন জন বলতে ছিলো সেই খালুই। আকিদা ছিলো তোমার মায়ের সেই খালাতো বোন।’
রাহুলের চোখ ছানাবড়া হয়ে গেলো। এই কথা তার অজানা ছিলো। সে অবিশ্বাস্য গলায় বলল, ‘তাই নাকি? সত্যি?’
‘হুম। তোমার মায়ের মৃত্যুর পর তোমার মায়ের গ্রামে গিয়েছিলাম গরিব দুঃখীদের খাওয়াতে। মনে আছে তোমার? সেইখানেই ঘটলো বিপত্তি। সেইদিন রাতে ঝুম বৃষ্টি ছিলো। প্রবল বর্ষন মাথায় নিয়ে আমি রাতে পৌছুলাম তোমার মায়ের খালার বাড়ি। তোমার মায়ের খালার বিয়ে হয়েছিলো পাশাপাশি বাড়িতে। সেই সূত্রে একই গ্রামে থাকা। আমি যখন ওই বাড়িতে পৌছুলাম। দেখলাম চারিপাশে কান্নার রোল। বাড়ি হালকা পাতলা সাজানো। পাঁচ-ছয় জন মানুষ। সেইদিন নাকি আকিদার বিয়ে ছিলো। আমি আশ্চর্য হয়ে গেলাম। তোমার মা মারা গেছে কিছুদিন হয়েছে। এই অবস্থায় বিয়ে কীভাবে করতে পারে? পরে শুনলাম আকিদার বাবার টাকার অভাব। মেয়ের ভরণপোষণ চালানোর মতোও ক্ষমতা নেই তার। মেয়ে বিয়ে দিবে কিন্তু বরপক্ষের যৌতুক মেটাতে পারেনি বলে বর বিয়ের আসর ছেড়ে চলে গিয়েছে। আমাকে দেখেই আকিদা ঘরে দরজা বন্ধ করে ফাঁস দিতে গেলো। আমি তড়িঘড়ি করে দরজা ভেঙে ঘরে ঢুকে দেখি গলায় উড়না পেচিয়েছে। আমি আকিদাকে বাঁচালাম। হতভাগা আমি তখনও জানতাম না এসব ছিলো সাজানো নাটক। আকিদাকে বাঁচানোর পর আকিদার বাবা কান্নাকাটি শুরু করে দিলো তার মেয়েকে বিয়ে করার জন্য। আমি অবাক হয়ে গেলাম। আমি কোনোমতেই বিয়ে করবো না। তখন পাশ থেকে সেই চার-পাঁচটা লোক বলে উঠল, বিয়ে করতে হবে। কুমারী মেয়ের গায়ে হাত দিছেন আবার বিয়ে করবেন না। আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম। আমি তো আকিদাকে বাঁচাতেই কোলে করে নামিয়েছি। ওরা কোনো কথাই শুনলো না। তিলকে তাল বানাতে উঠে পরে লাগলো। বলল, ‘পাঁচগ্রাম এক করবে। আমাকে জেলে পাঠাবে।’ আমার ভয় লাগলো। চোখের সামনে ভেসে উঠলো তোমার মুখটা। আমি জেলে গেলে তোমার কি হবে? তোমার ভবিষ্যতের কি হবে? তুমি তখনো তোমার মায়ের মৃত্যুর ঘোর কাটিয়ে উঠতে পারো নি। এমন অবস্থায় আমার কিছু হয়ে গেলে তোমাকে কে দেখবে? ওদের চেচাঁমেচিতে আশেপাশে আরো কিছু লোক জড়ো হলো। ব্যাপারটা অনেক জটিল হয়ে গেলো। দুজন লোক আমাকে দুটো ঘুষি পর্যন্ত মেরে দিলো। আকিদা প্রথম থেকে খুব ভালো মেয়ে ছিলো। তোমাকেও খুব আদর করতো। আমি ভাবলাম আকিদাকে বিয়ে করলে তোমার খেদমত করারও মানুষ হবে। শেষে না পেরে আমাকে বাধ্য হয়ে বিয়ে করতে হলো। কিন্তু কে জানতো ভালো মানুষীর আড়ালে যে দুই বাপ বেটি এতো বড় ছক কষে রেখেছিলো। আমি পরে বুঝতে পেরেছিলাম ওরা কোনোদিন তোমার মায়ের ভালো চায়নি। তোমার মায়ের ভালো ওরা সহ্য করতে পারতো না। ওদের ইচ্ছা ছিলো প্রথমেই আকিদার সাথে আমার বিয়ে দেওয়ার। বিশ্বাস করো আমি ইচ্ছে করে বিয়েটা করিনি।’
পুরো কাহিনি শুনে রাহুল ব্যঙ্গাত্মক হেসে বলল, ‘এই গল্পগুলো যে বানোয়াট নয় তার কি প্রমাণ?’
রুহুল হক দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, ‘বিশ্বাস করা না করা তোমার ব্যাপার। তবে আজ বলতে দ্বিধা নেই আমি তোমার মাকে এখন অবধি ভালোবাসি। প্রচন্ড ভালোবাসি।’
রাহুল অবাক হলো। ভিষণ মাত্রায় অবাকতার সাথে সহসা মনটা হালকা হলো। হঠাৎই সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এই মানুষটাকে বাবা বলে সম্বোধন করতে ইচ্ছে করলো। কিন্তু করা হয়ে উঠলো না। কিছু একটা চেপে ধরলো যার কারনে গলা দিয়ে শব্দ বেরুলো না। ও তাড়াতাড়ি নয়নকে নিয়ে চলে গেলো।
_______________________________
জামিলুর রেজাকে সারাদিন বুঝিয়েও লাভ হলো না। তারা বিয়ের তোড়জোড় শুরু করে দিয়েছে। ক্লান্ত হয়ে বিছানায় বসে পরলো টিকলি। তখন প্রায় শেষ হয়ে যাওয়া অপরাহ্ন। আকাশের দূর সীমানায় ভেসে উঠেছে হলুদ দাগ। জোরালো বাতাস। টিকলি নিষ্ক্রিয় চোখে টায়রার দিকে তাকিয়ে বলল,
‘কি করবো? বাবা-মা তো কোনোমতেই মানতে চাইছে না।’
ভারী নিঃশ্বাস ফেলে টায়রা বলল, ‘জানি না। সাতদিন থেকে আজ একদিন চলে গেলো। হাতে সময় আছে মাত্র আর ছয়দিন। কাল পরসু বোধ হয় বিয়ের কেনাকাটাও শুরু হয়ে যাবে।’
‘আমি চোখের সামনে অন্ধকার দেখছি টায়রা। আমার বাইরে বের হওয়া একদম বন্ধ। আমি উনার সাথেও দেখা করতে পারছি না। এসব কথা ফোনে বলাও সম্ভব না।’
টায়রা চিন্তিত মুখে বলল, ‘আরেকটু চেষ্টা কর। কালকে পর্যন্ত দেখ। যদি কোনো কাজই না হয় তবে ফোনেই ভাইয়াকে সব বলে দিতে হবে। এছাড়া তো আর কোনো উপায় দেখছি না। সব শুনে ভাইয়া কি রিয়েকশন দিবে তাও বুঝতে পারছি না।’
টিকলি হতাশ হয়ে নিরাশ মুখে বসে থাকলো। কিছুক্ষণ পর মাথা উঁচিয়ে বলল,
‘নিভাকে একটা ফোন দিবো? ওকে তো কিছুই জানানো হয়নি। দেখি ও যদি কোনো সাজেশন দিতে পারে।’
টায়রা মাথা দুলালো। টিকলি কল লাগালো নিভার নাম্বারে। দু’বার রিং হতেই ওপাশ থেকে বলা হলো,
‘কিরে কি খবর?’
‘ভালো না।’
নিভা ভ্রু কুচকে বলল, ‘ভালো না মানে? কি হয়েছে?’
টিকলির থেকে টায়রা খপ করে ফোনটা নিয়ে বলল, ‘টিকলির বিয়ে ঠিক করেছে বাবা-মা। আর ছয়দিন পরেই বিয়ে।’
নিভা হতবাক হয়ে গেলো। বিবেক বুদ্ধি লোপ পেয়েছে এহেন ধারায় অসহযোগ গলায় বলল, ‘কি? মজা করতাছস? হঠাৎ বিয়ে? বিয়ে কেনো? তাও এতো তাড়াতাড়ি? পাত্র কে?’
টায়রা চুপ থেকে সময় নিয়ে বলল, ‘রাহুল ভাইয়া। এখন তাড়াতাড়ি বিয়ে ভাঙার প্ল্যান দে।’
বাইরে তখন ঝড়ো হাওয়া। বাতাসের উদ্বেগে হেলে পরছে গাছ। ঝড়ছে পাতা। উড়ছে ধূলিকণা। নিভার কানে বজ্রপাতের মতো ঠেকলো কথাটা। স্তব্ধ হাত ঢিল হয়ে কান থেকে ফোন পরে গেলো সাদা মেঝেতে। তড়িৎ অনুপ্রভায় জ্বলসে যাচ্ছে হৃদয়। দানবের ন্যায় ক্ষত বিক্ষত হয়ে যাচ্ছে বুক। নিভা কথা হারিয়ে ফেলল। এহেন ঘটনার আচম্বিতে সে নির্বাক হয়ে শরীর ছেড়ে বিছানায় বসে পরলো। মনটা রক্তাক্ত হচ্ছে। উত্তাপ হচ্ছে। জ্বলন্ত বহ্নিশিখায় পুড়ছে। নিভার পাগল পাগল লাগছে নিজেকে। উদ্যমী হয়ে এই কণ্টকিত পৃথিবীকে পুড়িয়ে ছাড় খার করে দেওয়ার অদম্য ইচ্ছে প্রকাশ করছে মস্তিষ্ক। হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে পরেছে সে। রাগে দুঃখে কষ্টে সে কাদতে পারছে না। ভেতর থেকে নিঃশ্বাসের একটা ফুসফুস শব্দ বেরিয়ে আসছে।
নিভার পেছনে এসে দাড়ালো নিভার মা আমিনা বেগম। নিভা তখনও উদভ্রান্তের মতো বিছানা খামচে ধরে ছিলো। জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছিলো। আমিনা বেগম ব্যস্ত কণ্ঠে বললেন,
‘কি হয়েছে মা?’
নিভার থেকে উত্তর ভেসে এলোনা। তিনি আর ঘাটালেন না। বললেন, ‘রেডি হ মা। তোর খালামনি ডেকে পাঠিয়েছে। কিসব জরুরি আলাপ আছে নাকি।’
নিভা চকিতেই মায়ের দিকে তাকালো। উন্মাদের মতো বলল, ‘আদর ভাইয়াদের বাসায়?’
‘হ্যাঁ।’
নিভা বিরবির করে বলল, ‘খালামনির বাসায় যাবো। খালামনির বাসায় আমার যেতে হবে। টিকলির সাথে উনার বিয়ে হতে পারে না। উনার সাথে টিকলি কেনো? কীভাবে সম্ভব?’
_______________________________
দিনের আলো আধারের গহব্বরে হারিয়ে যাওয়ার আগামবার্তা। সন্ধ্যে নামার অপেক্ষা। শেষ আকাশে রক্তিম লাল আভা। আনন্দে ব্যাকুল নিঃশ্বাসের সাথে উত্তালতার ভারী হাওয়া। ওই তো…দূরে দেখা যাচ্ছে সন্ধ্যাতাঁরা। রাহুল স্মিত হাসলো। ছাদের দরজায় শব্দ হলো। চমকে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতেই নিভাকে দেখা গেলো। রাহুল অবাক হলো। অভিনবত্ব চোখে তাকিয়ে থেকে অবিশ্বাস্য গলায় জিজ্ঞেস করলো,
‘আপনি?’
রাহুল চোখ কচলালো। আবার তাকিয়ে নিভাকেই আবিষ্কার করে হেসে আশ্চর্য হয়ে বলল, ‘হোয়াট আ প্রেজেন্ট সারপ্রাইজ! কালই তো গেলেন। কই বলে যাননি তো আজ আসবেন।’
নিভা কথা বলছে না। অনর্গল ঘেমে চলেছে। সে মুখ হাতরে ঘাম মুছলো। শরীর ঠকঠক করে কাঁপছে। কথা বলতে গিয়ে দেখা গেলো, তার কণ্ঠনালিও ব্যাপক মাত্রায় কাঁপছে। নিভা প্রচ্ছন্ন দৃষ্টিতে তাকালো। সেই দৃষ্টিতে একটু হতাশা। কিছুটা দিশেহারা।সাথে অনেকটা অসহায়তা। নিভা এলোমেলো পায়ে রাহুলের দিকে এগিয়ে গেলো। সে টলছে যেনো এক্ষুণি পড়ে যাবে। রাহুলের কাছে গিয়ে নিভা টলমলে চোখে তাকালো। বলহীন শরীরে পড়ে যেতে নিলেই রাহুলের কলার খামচে ধরলো। রাহুল নিভাকে ধরে উদ্বিগ্ন স্বরে বলল,
‘কি হয়েছে আপনার? নিভা? শরীর খারাপ? কথা বলুন।’
নব্য প্রস্ফুটিত ফুলের ন্যায় নিভা আরক্ত নয়নের সহযোগে তাকালো। রাহুল ভ্রু কুচকে চাইলো। নিভা চোখের পানি ছেড়ে দিয়ে ভাঙা গলায় দৈবাৎ বলে উঠলো,
‘আমি আপনাকে ভালোবাসি। বিয়ে করবেন না! দয়া করে বিয়েটা ভেঙে দিন।’
রাহুলের কানে বিণৎ অদ্ভুত লাগলো কথাটা। সে বজ্রাহত হলো। তাজ্জব বনে গেলো। বিস্ময়কর দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই তার মনে হলো সে ভুল শুনেছে কথাটা কিংবা সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এই মানবী তার খুব ভালো বন্ধু নিভা নয়। এ অন্য কোনো অসুস্থ মানবী বা অশরীরী আত্মা যা রাহুলকে ভয় পাওয়া এবং চমকে দেওয়ার মতো অপরিসীম ক্ষমতা রাখে। রাহুল নিভার গালে হালকা থাপড়ে বলল,
‘গেট আপ। আপনি কি ঘুমিয়ে আছেন? কি বলছেন এসব নিভা?’
নিভা রাহুলের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট ভেঙে কেদে দিলো। প্রচন্ডভাবে কামোম্মত্ত হয়ে রাহুলের কলার আরো শক্ত করে চেপে ধরে উচ্চস্বরে বলল,
‘কেনো বুঝতে পারছেন না? আমি আপনাকে ভালোবাসি। বুঝার চেষ্টা করুন। কেনো বুঝতে চাইছেন না?’
রাহুলের বুকে মাথা ঠেকালো নিভা। ছন্নছাড়া কান্নায় মজে উঠলো। রাহুলের চোখ মুখ শক্ত হয়ে এলো। কলার থেকে নিভার হাত ছাড়িয়ে নিলো আক্রোশে। রোষ-আগুন চোখে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল,
‘আমি বিস্মিত! এটা আমি আপনার থেকে আশা করিনি। বন্ধু নামে এতো বড় সুযোগ নিলেন। সব জেনেশুনে আপনি….’
রাহুল আটকে গেলো। প্রচণ্ড রাগে কথা বলতে পারা যাচ্ছে না। চলে গেলো সে তীব্র উষ্মা রাগ দেখিয়ে। জোরে জোরে শব্দ তুলল তার পদধ্বনি। নিভা ভেজা নয়নে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই ছাদে বসে পরলো। এখন তাকে দেখাচ্ছে যন্ত্রমানবের মতো। ভঙ্গ হৃদয়ে যেই নারী বসে আছে নিথর দেহে। নিষ্প্রাণ চোখ দুটো দিয়ে গড়াচ্ছে না পানি। মুখে ফুটছে না কোনো বুলি। শুধু এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে অজানা পথের বাঁকে। নৈরাশ্য তার দু’চোখ। স্ফূর্তি-শূন্য ভালোবাসার ঘড়া। হতোদ্যম এক বুক আশা। মর্মপীড়িত প্রেমিক মন।
চলবে❤️
#বৃষ্টিশেষে_প্রেমছন্দ
#মুমুর্ষিরা_শাহরীন
৪৫.
ছাদের পাটাতনে বসে থাকতে থাকতেই সন্ধ্যা পেরিয়ে রজনীর আগমন ঘটলো। নিস্যন্দ নিশি বেলার ঝিঁঝি পোকাদের কোলাহল। বাতাসের গুঞ্জন। বাদুর পেঁচাদের ডানা ঝাপটানো। নিভা আস্তে করে উঠে দাড়ালো। টলমলে পায়ে ঘরে যেতেই বসার ঘর থেকে ডাক পরলো। নিভা ভালো করে চোখ মুছলো। মুখটা যথাসম্ভব স্বাভাবিক করে বসার ঘরে গেলো। নিভাকে দেখেই আর্দ্র চোখ মুখ শক্ত করে উপরে চলে গেলো। চোখে তার ভীষণ রাগ। নিভা প্রশ্নবোধক চোখে মায়ের দিকে তাকাতেই মায়ের থেকে শুনতে পেলো, ‘তার এবং আর্দ্রের বিয়ে। ঘরোয়া ভাবে বিয়ে হবে এবং আগামী শুক্রবার তাদের বিয়ে দিন ঠিক করা হয়েছে।’
নিভা স্তব্ধ হয়ে গেলো। পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে গেলো। গোটা আকাশটাএক নিমিষেই ভেঙে পড়লো মাথার উপর। অবিশ্বাস্য চোখে বলল,
‘কিহ্?’
আমিনা বেগম এবং মনোয়ারা খান কে ভীষণ
খুশি দেখাচ্ছে। মনোয়ারা খান উঠে এসে নিভার থুতনি ধরে চুমু খেয়ে বললেন,
‘আমার অনেক দিনের সাধ ছিলো তোকে এই বাড়ির বউ করবো।’
নিভা কোনো কথা খুঁজে পেলো না। ফ্যালফ্যাল নয়নে তাকিয়ে থাকলো প্রাণপ্রিয় খালার দিকে। এ সবকিছুই তার কাছে অপার্থিব ঠেকছে। যেনো এসব ঘটনা মিথ্যে, কাল্পনিক, স্বপ্ন বৈ আর কিছুই না। একটু পরই এই ভয়ংকর স্বপ্ন ভেঙে যাবে। সবকিছু আবার আগের মতোই নিজ গতিতে চলতে থাকবে। একটার পর একটা ভয়ংকর সারপ্রাইজ কি আজ শুধু নিভার জন্যই অপেক্ষা করছিল? নাহ…এসব হয়না। কোনোমতেই হয় না। এ অবাস্তব। অসম্ভব। আদর আর্দ্রকে নিজের ভাই ব্যতীত অন্য কোনো নজরে সে কোনোদিন তাকায় নি। কীভাবে সম্ভব? আর্দ্রর সাথে সে? ছি!
আজিম খান থমথমে গম্ভীর মুখে বসে ছিলেন। বড় ছেলের আগে ছোট ছেলের বিয়ে ঠিক করা নিতান্তই সমাজ বিরোধী কাজ। কটুক্তিময় কথা শুনারও কাজ। তবুও তিনি নিজ সীদ্ধান্তে অটল। তিনি খবর লাগিয়ে খোঁজ পেয়েছেন জামিলুর রেজার মেয়ে টিকলির বিয়ে আগামী শুক্রবার। তাই আর্দ্রের বিয়েও ঠিক করেছেন বেছে বেছে শুক্রবারে।
আদর সিড়ি দিয়ে হন্তদন্ত হয়ে নামছে। নিভার শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। মনে হচ্ছে কেউ গলা চেপে ধরেছে৷ এইতো… এক্ষুণি এক্ষুনি নিভা মারা যাবে। এই ধরণী থেকে তার বিদায়বেলা এসে গেছে। এই বসুন্ধরায় ষাট বছর বাঁচার ইচ্ছেটা বোধহয় তার পূরণ হয়েও হলো না। নিভা রুদ্ধশ্বাসে জড়ানো কণ্ঠে বলল,
‘বাসায়.. বাসায় যাবো।’
নিভা আর এক মুহুর্তও দাড়ালো না। কারোর কথা শুনার আগেই এক ছুটে এ বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলো।
________________________________
রাতের আকাশে গোল চাঁদ উঠেছে। অজস্র নক্ষত্র তাঁরার ভিড়ে চাঁদমামা বসে আছে রাজা রাজা ভাব নিয়ে। তাঁরাগুলো যেনো তার সৈন্যদল। তার পাহারাদার। সবথেকে বড় তাঁরাটা হলো তার সেনাপতি। তারা চাঁদের নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছে, কোনোভাবেই যেনো অমাবস্যা তাকে ছুতে না পারে। আর চাঁদ নিশ্চিন্তে চারিপাশে বিকোচ্ছে জ্যোৎস্নার আলো। জ্যোৎস্নার সেই কোমল আলোয় টিকলির দখিন মুখী ঘরটা তখন মাখামাখি। দাঁত দিয়ে নখ কামড়িয়ে টিকলি চপল পায়ে ঘরের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে পায়চারি করছিলো। ভীষণ মাত্রায় অস্থিরতা থেকে বলল,
‘আমি কাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারছি না টায়রা। আমার মনে হয় উনাকে এখনি জানানো প্রয়োজন। বাবা-মা কোনোমতেই রাজি হচ্ছে না।’
টায়রা কপালে ভাঁজ ফেলে একদিকে তাকিয়ে থাকলো। টায়রার জবাবের অপেক্ষা না করেই টিকলি ফোন লাগালো আদরকে।
টিকলি যখন আদরকে ফোন করায় ব্যস্ত তখন টায়রার ফোনে অপরিচিত নাম্বার থেকে কল এলো। টায়রা বিরক্ত মুখে কেটে দিলো। কেটে দেওয়ার দু মিনিট না গড়াতেই আবার ফোন আসলো। টায়রা বারান্দায় চলে গেলো। ফোন রিসিভ করেই প্রথমে ঝাড়ি দিলো,
‘এই কোন আবাল রে? ফোন কেটে দেই চোখে দেখোস না? আল্লাহ চোখ দেয় নাই?’
ওপাশ থেকে করুণ স্বরে প্রথম যেই কথাটা ভেসে এলো তাতে টায়রা থমকে গেলো৷ শরীরটা কেমন অসাড় হয়ে এলো। অনুভূতিশূন্য দেহে শুনতে লাগলো তার প্রতিটি কথা।
‘টায়রা আমার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে।’
টায়রা ভ্রু বাকালো। ফোন যে আর্দ্র করেছে তা বুঝতে আর বাকি নেই।
‘তো? মেয়েদের মতো কথা বলছেন কেনো? বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে বিয়ে করে নিবেন।’
‘কিন্তু আমি বিয়ে করতে চাই না।’
‘বিয়ে করতে চান না তো নিজের বাবা-মাকে বলুন। আপনার হয়ে কি এখন আমি বিয়ে ভাঙবো? আর কেনোই বা ভাঙবো?’
‘এইসময় ঝগড়া না করলে চলবে না?’
‘না চলবে না। কারন আমি তো ঝগড়ুটে চাপাবাজ ফুটা টায়ার ভুলে গেছেন? ভুলে গেলেও সমস্যা নেই মনে করিয়ে দিয়েছি।’
টায়রা আবার বলল, ‘এখন আমাকে ফোন দিয়েছেন কেনো? আমি কি আপনাদের সবার হ্যাল্পিং হ্যান্ড? নাকি হ্যাল্পিং সার্ভেন্ট?’
‘টায়রা বুঝার চেষ্টা করুন….’
আর্দ্রকে মাঝপথে থামিয়েই টায়রা বলল, ‘সত্যি বুঝলাম না বড়টাকে রেখে ছোটটাকে নিয়ে টানাটানি কেনো?’
আর্দ্র এতোক্ষণে সুযোগ পেলো কথা বলার। কাদো কাদো গলায় বলল, ‘কিছু করুন না! আমি বাবা মাকে বলেছি। তারা তো ভাইয়ার উপর ক্ষেপে আছে। আমি আরেকবার বললে হতে পারে ধুমধাম করে দু-চারটে লাগিয়ে দিলো।’
টায়রা ভীষণমাত্রায় বিরক্তি নিয়ে বলল, ‘ভাই আপনি কি ছেড়া না ছেড়ি? ফ্যাচফ্যাচ করে কাইন্দে আমারে ফোন দিছেন। তারউপর আবার বাপ মায়ের হাতে মাইর খাওয়ার ভয়ও পান। রাখেন তো মিয়া। মেজাজ এমনিতেই হাই লেভেলের গরম আছে।’
আর্দ্র ভ্রু কুচকে বলল, ‘ইনসাল্ট করছেন?’
‘সন্দেহ আছে? যাক গে, পাত্রী কে? কবে বিয়ে?’
আর্দ্র সময় নিয়ে বলল, ‘পাত্রী নিভা। বিয়ে আগামী শুক্রবার।’
টায়রা থমকালো কিছুক্ষণের জন্য। নিস্পন্দ হৃদয়ে শূন্যে তাকিয়ে রইল। খানিক বাদে মৃদুস্বরে হেসে বলল,
‘ভালোই তো! বিয়ে করে ফেলুন। সমস্যা কি? অপরিচিত কারোর সাথে তো আর বিয়ে হচ্ছে না।’
আর্দ্র আর কিছু বলার আগেই টায়রা ফোন কাটলো। ফোন কেটেই ঠোঁট চেপে বাইরে তাকিয়ে থাকলো। চারিপাশে জ্যোৎস্নার আলো। রাস্তার ধারে ফ্লুরোসেন্ট এর আলো। আশেপাশের বড় বড় ফ্ল্যাটগুলো থেকে ভেসে আসছে আলো। এতোসব আলোর মাঝেও টায়রার মনে হলো প্রকৃতি আজ বড্ড কালো। চারিদিকে খুব করে আধার নেমেছে। নৈঋতের এই অন্ধকারেই হয়তো হারিয়ে যায় পৃথিবীর কেউ না কেউ। টায়রার মনে হলো হঠাৎ করেই তার বুকে নৃশংসু কষ্টরা দামাল তবলা বাজাচ্ছে। চাপা এক প্রকার কাদতেও ইচ্ছে করছে কিন্তু কারণ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না তাই কান্না বেরুতে চেয়েও বেরুলো না।
,
আজিম খানের মুখোমুখি বসে প্রচণ্ড আক্রোশে আদর বলল, ‘তুমি নাকি আর্দ্রের বিয়ে ঠিক করেছো বাবা? তাও নিভার সাথে?’
আজিম খান অবহেলার সুরে বললেন, ‘হুম’
আদর টেবিলে থাবা বসিয়ে ক্রোধান্বিত হয়ে প্রশ্ন করলো, ‘কেনো? ওর বিয়ের বয়স হয়েছে?’
আজিম খান নির্বিকার কন্ঠে বললেন,
‘হয়েছে। তোমার ওতো আমার ছেলেকে নিয়ে ভাবার দরকার নেই।’
আদর তাক লাগা কণ্ঠে বলল, ‘ও আমার ভাই!’
আজিম খান পায়ের উপর পা তুলে বসে বললেন,
‘আনফরচুনেটলি।’
আদর বিস্ময়তা নিয়ে বলল, ‘বাবা…?’
‘তুমি বিয়ে করবে না তাহলে তো এবার ছোট ছেলের দিকেই এগোতে হবে তাই না? আর কতদিন তোমার পথ চেয়ে বসে থাকবো? বুড়ো হয়েছি নাতি-নাতনির মুখ দেখতে হবে না?’
আদর দাঁত চেপে রাগ নিয়ন্ত্রিত করে আজিম খানের দিকে তাকালো। বলল, ‘এবার বেশি বাড়াবাড়ি হচ্ছে বাবা। নিভাকে আমরা আপন বোনের চেয়ে কোনো অংশে কম দেখিনি। তাকে কীভাবে তুমি এ বাড়ির বউ করতে চাও?’
আজিম খান বসা থেকে দাঁড়িয়ে পড়লেন। উঁচু গলায় বললেন, ‘তোমার কি? তোমার সাথে তো আর বিয়ে হচ্ছে না। নিজেও বিয়ে করবে না অন্যকারোর বিয়েও হতে দিবে না। সমস্যা কি তোমার?’
‘আমার অনেক সমস্যা। আর্দ্রর বিয়ে হবে না।’
‘দেখি কে আটকায়!’
‘ও বিয়ে করবে না।’
‘ও করবে না ওর দাদা করবে।’
‘ঠিকাছে, তবে তোমার কথাই থাক। আমি দাদুকে ফোন করছি। দাদু এসে নিভাকে বিয়ে করবে।’
আজিম খান ছেলের দিকে কটমট করে তাকালেন। বাপ-ছেলের তর্ক গড়ালো বহুদূর পর্যন্ত। মনোয়ারা খান উপরে গেলেন আর্দ্রের উদ্দেশ্যে। গিয়ে দেখলেন আর্দ্র ফোনে কারো সাথে কথা বলছে। তিনি আর ঘাটালেন না। চলে আসতে নিলেই শুনতে পেলেন আদরের ঘর থেকে ফোন বাজার শব্দ। মনোয়ারা খান কৌতুহল নিয়ে ঘরে ঢুকলেন। বিছানায় আদরের ফোন পড়ে আছে। তাতে ভেসে উঠছে ‘শুকতাঁরার মনতাঁরা।’ মনোয়ারা খান বেশ অনেক্ক্ষণ নাম্বারটার দিকে তাকিয়ে থাকলেন।
,
টায়রা থমথমে মুখে ঘরে আসতেই টিকলি হতাশ কণ্ঠে বলল, ‘উনি তো ফোন ধরলেন না।’
টায়রা গম্ভীর মুখে উত্তর দিলো, ‘হয়তো বিজি। পরে ফোন করে নিবে দেখিস।’
‘হুম’ বলে টিকলি আবার ঘরময় পায়চারি শুরু করলো। খানিক পরে টায়রার দিকে ভ্রু কুচকে বলল,
‘কি হইছে? মুখটা ওরম কেনো? মন খারাপ?’
টায়রা মাথা দুলিয়ে না করলো। টিকলি সচেতন দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
‘কেদেছিস?’
টায়রা চোখ পাকিয়ে বলল, ‘কাদবো কেনো?’
‘না মানে…’ পুরো কথা সম্পন্ন করার আগেই টিকলির ফোনে অপরিচিত নাম্বার থেকে কল এলো। টিকলি ফোন কানে ধরে বলল,
‘হ্যালো, আসসালামু আলাইকুম। কে বলছেন?’
‘ওয়ালাইকুম আসসালাম। তুমি কি টিকলি রেজা?’
‘জি। আপনি?’
‘আমি আদরের মা। মনোয়ারা খান।’
টিকলি চোখ বড় বড় করে নাম্বার টায় আরেকবার চোখ বুলালো। কিছুক্ষণ থম মেরে ফোন হাতে দাড়িয়ে থাকলো। ওপাশ থেকে দুই তিনবার হ্যালো বলার পর ভয়ে তোতলানো স্বরে সে বলল,
‘জি জি বলুন আন্টি।’
‘তুমি আর তোমার বোন কি কাল আমার সাথে দেখা করতে পারবে?’
টিকলি অবাক হলো। তবুও বলল, ‘জি চেষ্টা করবো। কোথায়?’
মনোয়ারা খানের থেকে এড্রেস নিয়ে টিকলি ফোন রেখে টায়রার দিকে তাকালো৷ টায়রা ভ্রু কুটি করে জিজ্ঞেস করলো,
‘কে?’
‘উনার মা।’
‘এ্যা?’
‘হুম।’
‘তোকে ফোন দিছে? নাম্বার কই পাইলো? ‘
‘জানি না।’
‘কি বলল?’
‘কাল তোকে আর আমাকে দেখা করতে বলল।’
টায়রা চোখ কুচকে বলল, ‘তোকে দেখা করতে বলছে ঠিকাছে। কিন্তু আমি কেন? থিওরী টা কি? যেদিকে তাকাই সেদিকেই শুধু ঝামেলা দেখতে পাই।’
টিকলি চিন্তিত মুখে বলল, ‘সব বাদ দে। আগে এটা বল। আমরা বের হবো কি করে? আমাদের তো বাড়ি থেকে বের হওয়া বন্ধ। বিকাল চারটায় দেখা করতে বলছে।’
‘আগে কাল আসুক। তারপর ভাবি।’
টিকলি টায়রা গভীর চিন্তায় মশগুল হলো। হিসাব মিলাতে গিয়ে দেখলো অংকই মিলছে না। অগোছালো সবকিছু গোছানোর কোনো পথই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। সব চিন্তা ছাপিয়ে একটা কথাই টায়রার মাথায় ঘুরঘুর করছে। অত্যন্ত ক্রোধানলে জ্বলে মন বলছে, ‘নিভার বাচ্চা কেমনে ভাদ্র রে বিয়ে করতে রাজি হইলো? তার মানে কি ও আগে থেকে ভাদ্রকে পছন্দ করতো? এর জন্যই এতো ঘেষাঘেষি করতো!’
সমস্ত চিন্তাভাবনা গুলোকে লণ্ডভণ্ড করে দিলো টিকলির ফোন। বাজখাঁই গলায় বেজে উঠলো এই যন্ত্র। টায়রা চমকে উঠে টিকলির দিকে কুশন ছুড়ে বলল,
‘বালের এতো ফোন দেয় কে তোরে?’
টিকলি ফিসফিস করে বলল, ‘চুপ থাক। উনি ফোন দিয়েছে।’
টায়রা মুখটানা মেরে বলল, ‘হুহ..আসছে উনি..। বিয়ে করা জামাইয়ের লগেও মানুষ এম্নে কথা কয় না। তুই যেমন সারাক্ষণ কানের কাছে উনি উনি করস।’
‘কানের নিচে চটকানা খাবি।’
‘হ। এখন তো আমারেই মারবা। আমি পড়ছি মাইনকা চিপায়।’
‘চুপ থাক। উনাকে কি সবকিছু বলবো?’
টায়রা কিছু বলার আগেই টিকলি বলল, ‘নাহ থাক। আগে উনার মা কি বলে শুনে আসি। তারপর ধীরে সুস্থে সব বলা যাবে।’
‘হুম। বিয়ে করার পরে বইলো আমার কোনো সমস্যা নাই। নো চিন্তা ডো ফুর্তি। তোমার কপাল তুমি নিজে পুড়বা।’
‘চুপ থাক তুই।’
‘থাকলাম।’
টিকলি ফোন রিসিভ করে বলল, ‘কতগুলা ফোন দিলাম কোথায় ছিলেন?’
আদর রাগে দাঁত কিড়িমিড়ি করে বলল, ‘আর্দ্রের বিয়ে ঠিক হয়েছে। নিভার সাথে।’
টিকলি আশ্চর্য চোখে অবিশ্বাস্য গলায় বলল, ‘হ্যাঁ?’
চলবে❤️