বৃষ্টি তোমাকে দিলাম পর্ব-২১+২২

0
395

#বৃষ্টি_তোমাকে_দিলাম
পর্ব-২১

ঘুম ভাঙল একটা মিষ্টি সুরে। একটানা কোনো পাখি সুরেলা গলায় গাইছে। শোওয়া থেকে উঠে বসল ধারা। তার পরনে নীল রঙের একটা জামা। এই জামা সে কখন পরল? চারদিকে তাকাল সে। কাঠের ঘর, কাঠের মেঝে। সে যে ঘরটায় শুয়ে আছে সেটা দোতলার ওপরে। বড় বড় দুটো জানালা আছে ঘরে। জানালার বাইরে সবুজ গাছাপলার সারি দেখা যাচ্ছে। দরজাও আছে তিনটা- একটা বারান্দায় যাওয়ার, একটা বাথরুমের, অন্যটা বাইরের যেটা বন্ধ। বৃষ্টি হয়েছিল বোধহয়, বাতাসে স্নিগ্ধ ঘ্রাণ।

ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল ধারা। পায়ে পায়ে এগিয়ে গেল বারান্দার দরজার দিকে। গ্রীল নেই বারান্দায়। প্রকৃতি তাই আরও বেশি কাছে মনে হচ্ছে। যতদূর চোখ যায় শুধু গাছ আর গাছ। এ কোথায় এসে পড়েছে সে? কেমন করে এলো? কিছু মনে পড়ছে না কেন?

একটা পুরুষকণ্ঠের ডাক শোনা গেল। চমকে তাকাল সে।

এক তরুণ দাঁড়িয়ে আছে বারান্দার দরজা ধরে৷ তামাটে গায়ের রঙ, দোহারা গড়ন, লম্বাটে মুখ, হালকা দাড়িগোঁফ আর ভীষণ সুন্দর একজোড়া চোখ। মুখে হাসছে না, হাসছে চোখ দিয়ে। চেনা লাগছে, কিন্তু চিনতে পারছে না ধারা। সে কী বলবে বুঝতে পারল না। ছেলেটাই এগিয়ে এলো। জিজ্ঞেস করল, “আপনি কি আমাকে চিনতে পারছেন?”

ধারা দু’পাশে মাথা নাড়ল।

“ওহ!” হতাশ হলো ছেলেটা। পরক্ষনেই হতাশা ঝেড়ে ফেলে বলল, “আমি শাহেদ। শাহেদ কাপুর নই কিন্তু!” বলে হাসল। আবার বলতে শুরু করল, “আমার অন্য পরিচয় আপাতত না জানলেও চলবে। আস্তেধীরে জানতে পারবেন। বর্তমানে আমি আপনার দেখাশুনার দায়িত্বে আছি। এখন কেমন আছেন বলুন।”

ধারা কিছুই বুঝতে পারল না৷ বলল, “দেখাশুনার দায়িত্বে মানে কী? আমি এখন কোথায়? আর আপনি কেন আমার দেখাশুনা করবেন?”

শাহেদ বড় করে নিঃশ্বাস ফেলে বলল, “আপনাকে কী বলেছি? এখন কিছু জানতে হবে না। সব বলব আপনাকে। আপনার ভালোই হবে তাতে। শুধু এতটুকু বলুন যে শরীর কেমন লাগছে?”

“ভালো।”

“মাথায় কোনো যন্ত্রণা আছে?”

“না।”

“ভেরী গুড! আমি আকলিমা আপাকে পাঠিয়ে দিচ্ছি। আমি সার্বিক তত্ত্বাবধানে আছি আর আকলিমা আপা আছেন আপনার সেবাযত্ন করতে। যা দরকার লাগে তাকে বলবেন।”

লোকটা বেরিয়ে যেতেই আকলিমা আপার দেখা পাওয়া গেল। মাঝবয়েসী পরিপাটি এক মহিলা। আন্তরিক ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করলেন, “কিছু লাগবে আপা?”

ধারা ক্ষীণ সুরে বলল, “না।”

“ক্ষুধা লেগেছে না?”

“হুম।”

“কী খাবেন বলুন।”

ধারা এত সহজ ব্যবহারেও স্বাভাবিক হতে পারছে না। বলল, “আচ্ছা আপনি কি জানেন আমাকে এখানে কে এনেছে?”

আকলিমা আপা হেসে বললেন, “শাহেদ ভাইয়া৷”

“কোথা থেকে?”

“তা তো আমি জানি না। আপনি বললেন না কী খাবেন?”

“যা আছে তাই খাব।”

ধারা ভেবেছিল তাকে হয়তো নিচে খেতে ডাকবে, কিন্তু সেরকম কিছু হলো না। খাবারের বিশাল ট্রে নিয়ে একটু পরেই আকলিমা আপা ঢুকল।

ঘরের একটা টি টেবিলে রাখল খাবারদাবার। অনেক কিছুই এনেছে৷ একটা বড় কাচের বাটিতে সুন্দর করে কাটা নানা রকম ফল, পাউরুটি, জ্যাম, টোস্ট, দুধ আর ডিম।

ধারার সত্যি খুব খিদে পেয়েছিল। অনেক কিছুই খেয়ে ফেলল। খাওয়ার পরপর তার ঘুম পেতে শুরু করল। কিন্তু এখন ঘুম পাচ্ছে কেন? একটু আগেই তো ঘুম ভেঙেছিল। আকলিমা আপা ধারার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, “ঘুম পেলে শুয়ে পড়বেন চলুন। আমার হাত ধরে উঠুন।”

ধারা অসহ্য ঘুমে চিন্তা করার শক্তিটুকুও হারিয়ে ফেলেছে। আকলিমা আপার হাত ধরে বিছানায় যাওয়ার ছোট্ট জায়গাটা পার হতে মনে হচ্ছিল যুগ লেগে যাচ্ছে। ধোঁয়াশায় আচ্ছন্ন মস্তিষ্ক তবু একটা প্রশ্ন করছিল, “কী হচ্ছে তার সাথে?”

ডায়েরিটা বন্ধ করতে করতে জহুরুল হক বললেন, “আর ইউ শিওর?”

সামনে বসা সুদর্শন তরুণটি বলল, “হ্যাঁ শিওর। আমি সব অ্যানালাইসিস করেই বলছি।”

“এই যে ছেলেটা..রাশিক…ওর কোনো খবর পেলে?”

“হ্যাঁ। তার পরিচয় নিয়ে তেমন কিছুই ডায়েরিতে লেখা ছিল না৷ তাই খুঁজতে একটু ঝামেলা হয়েছে। তবে বের করতে পেরেছি। সে রাজশাহীতেই থাকে। এখানে একবার আসতে বলেছি।”

“ওর সাথে দেখা হলে কোনো উপকার হবে বলে মনে হয়?”

“হতেও পারে। অনেক কিছুই হতে পারে আসলে। হয়তো ছেলেটাকে দেখলে ধারা সামলে উঠবে। সুস্থ হয়েও উঠতে পারে।”

“ছেলেটা কি এখনো ওকে…”

“আরে নাহ। সে বিয়ে করে সংসার করছে। এতদিন বসে থাকবে নাকি?”

“তাহলে তো আরও শক পাওয়ার কথা মেয়েটার।”

“সেটাই তো দিতে চাচ্ছি। এভাবে আর কতদিন?”

“শাহেদ, যা করবে ভেবেচিন্তে করো। খুব জটিল কেস এটা।”

“হ্যাঁ। আমি ভেবেই করছি স্যার।”

“ঠিক আছে। আশা করি সফল হবে।”

“ইনশাআল্লাহ।”

ধারার ঘুম ভাঙল বিকেলে। যথারীতি পাখির কিচিরমিচির শব্দে। তলপেটে প্রচন্ড চাপ নিয়ে সে বাথরুমে ঢুকল। মাথাও ঝিমঝিম করছে। শাওয়ার ছেড়ে মেঝেতে বসে পড়ল সে। অনেকক্ষণ ঠান্ডা পানির ধারা বয়ে গেল তার শরীরে। শরীর ভালো লাগতে শুরু করল।

বাথরুমটা বেশ সুন্দর। গোসল করার জায়গা আলাদা, একপাশে একটা দরজা দিয়ে যাওয়া যায় ছোট্ট ড্রেসিং রুমে। সেখানে কাবার্ডে জামাকাপড় ঝোলানো। একটা হালকা সবুজ রঙের শাড়ি ভারি পছন্দ হয়ে গেল ধারার। ব্লাউজ একদম মাপমতো। শাড়িটা পরে ফেলল সে। একপাশে আয়নার সামনে কাজলদানি থেকে কাজল লাগালো চোখে। আয়নায় নিজেকে দেখল বেশ কিছুক্ষণ। একটু যেন বদলে গেছে আদল। সে কোথায় আছে, কাদের মধ্যে আছে কিছুই জানে না। অথচ সেজন্য সে অস্থিরতা বোধ করছে না। মনে হচ্ছে এসব স্বাভাবিক। এটাই তো হওয়ার কথা।

খিদেয় পেট চো চো করছে। কিন্তু আকলিমা আপাকে দেখা যাচ্ছে না। বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল ধারা। বেশ কিছুক্ষণ ঘোরলাগা চোখে তাকিয়ে রইল প্রকৃতির দিকে। কী একটা মনে আসতে আসতে আসছে না৷ হঠাৎ খেয়াল হলো ওর সাথে আরও কেউ আছে এখানেই। মানুষটা আর কেউ নয়, শাহেদ।

শাহেদ মুগ্ধ চোখে দেখছিল ধারাকে। তার বুকে চিনচিনে ব্যথা করছে। সেই শুরুর দিন থেকেই ব্যথাটা করে। তবে দিন দিন ধরন বদলাচ্ছে। আগে খারাপ লাগল এত চমৎকার একটা মেয়ের অবস্থা দেখে৷ আর এখন খারাপ লাগে মেয়েটা দ্রুত সুস্থ হচ্ছে দেখে। পুরোপুরি ভালো হয়ে গেলেই তো চলে যাবে!

(চলবে)

সুমাইয়া আমান নিতু

#বৃষ্টি_তোমাকে_দিলাম
পর্ব-২২

“নাম কী তোমার?”

“ধারা।”

“বাবার নাম?”

“আজিজুল ইসলাম।”

“মায়ের নাম?”

“রোকসানা।”

“তোমার জন্ম তারিখ?”

“৩রা জুলাই ১৯৯৫।”

“এখন কত সাল?”

“জানি না।”

“তোমার শেষ কত তারিখের কথা মনে আছে?”

“১৪ই আগস্ট ২০১৭।”

“সেদিন বিশেষ কিছু হয়েছিল?”

“আমার ডিভোর্স হয়েছিল।”

“তারপরের কথা কিছুই মনে নেই?”

“ধোঁয়াশার মতো। তেমন কিছু মনে নেই।”

“তোমার কি মনে আছে তুমি অনেকগুলো দিন চিকিৎসাধীন ছিলে?”

“না।”

“হসপিটালের দিনগুলো ভুলে গেছ?”

“হ্যাঁ।”

“আচ্ছা। রাশিকের ব্যাপারে কী মনে আছে বলো।”

“সে আমার ফেসবুকের বন্ধু ছিল। প্রপোজ করেছিল বিয়ের জন্য। কিন্তু আমি বর্ষণকে পছন্দ করতাম বলে তাকে না করে দেই।”

“তারপর তার সাথে তোমার যোগাযোগ হয়েছে?”

“ঠিক জানি না।”

“আচ্ছা তোমাকে আমি দুটো ডায়েরি দেব, দুটোই তোমার নিজের। একটা তুমি বাড়িতে থাকতে লিখেছ, আরেকটা হসপিটালে থাকার দিনগুলোতে। ডায়েরি দুটো পড়বে। তারপর তোমার মতামত জানাবে।”

ধারা মাথা কাত করল। শাহেদ তাকে ডায়েরি দুটো দিয়ে গেল। আকলিমা আপা দিয়ে গেল এক কাপ কফি।

প্রথম ডায়েরিটা সে খুব ভালোভাবে চেনে। এটাতে সে জীবনের যাবতীয় খুটিনাটি লিখে রাখত। কিন্তু অপর ডায়েরিটা? এটা তো সে চেনে না! নেড়েচেড়ে দেখল ডায়েরিটা৷ ভেতরে তারই হাতের লেখা। কখন লিখেছে এসব? সময়গুলো হারিয়ে গেছে কেমন করে জীবন থেকে?

অবশ্য কয়েকদিনের চেষ্টায় সে আলো আধারিত কিছু স্মৃতি মনে করতে পারছে, যেসব স্মৃতির কোনো ভিত্তি নেই। স্বপ্নের মতো অবাস্তব সব!

প্রথম ডায়েরির শেষ পাতাগুলো সে ঠিকঠাক মনে করতে পারল না৷ রাশিকের সাথে কথোপকথন সব যেন মাথা থেকে মিলিয়ে গেছে।

দ্বিতীয় ডায়েরি পড়ে একেবারে চমকে উঠল ধারা৷ একি! এসব কখন হলো? সেগুলো বেমালুম স্মৃতি থেকে বিলোপ হয়ে গেল? কোনো বড় ধাক্কা খেয়েছিল কি সে?
_________________

রাত সাড়ে বারোটার দিকে রাশিক এসেছে অবশেষে। এসেই কানে ধরে বলেছে তার ভুল হয়ে গেছে৷ তার মা নাকি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে গিয়েছিল। তাই এত দেরি। এদিকে এই শুনশান বাসস্ট্যান্ডে এতক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে আমার কাঁপুনি ধরে গেছে তার বেলায় কী?

আমরা ওর বাড়ির পথে রওনা হলাম৷ ও শিখিয়ে পরিয়ে দিল কেমন করে সবার সাথে কথা বলতে হবে। রাশিকের বাড়িতে আছে মা বাবা আর ছোটো দুই ভাইবোন৷ সুখের সংসার৷ আমি ওদের বাড়িতে পা দেয়া মাত্র বুঝলাম এই বাড়িটার জন্যই দীর্ঘদিন অপেক্ষা করে ছিলাম। রাশিকের মায়ের নিজ হাতে করা সবজির বাগান, উঠোনের মাঝে দোলনা। বাড়িটা ছিমছাম সুন্দর।

ভেতরে ঢুকতেই সবাই বেরিয়ে এলো। আমাকে হাসিমুখে স্বাগত জানাল তারা। আমি রাশিকের মায়ের কথা জিজ্ঞেস করলাম। জানলাম তিনি ঘরে আছেন, ঘুমিয়ে পড়েছেন৷

ক্লান্ত ছিলাম বলে হাতমুখ ধুয়ে খেয়ে শুয়ে পড়লাম। আমার জায়গা হলো রাশিকের বোন পৃথার বেডরুমে। পৃথা খুব সুন্দর করে গল্প করতে পারে৷ গুনগুন করে কীসব বলতে লাগল, আমি শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়লাম।

—————

এটুকু পড়ার পর দরজায় টোকার শব্দে মুখ তুলল ধারা। দেখল আকলিমা আপা এসে দাঁড়িয়েছে। জিজ্ঞেস করল, “ক্ষুধা লেগেছে আপা? খাবার আনি?”

“কয়টা বাজে এখন?”

“দুপুর দেড়টা।”

ডায়েরি পড়ার তীব্র ইচ্ছে দমন করে ধারা বলল, “আনুন।”

খাবার নিয়ে তার কড়াকড়ি আছে। এই ক’দিনে সে বুঝেছে একটু অনিময় হলে তারই সমস্যা। আর খেতে হবে পেটপুরে। খেয়ে ঔষধ খেতে হবে। সেদিন সকালের খাবার খেয়ে তার মড়ার মতো ঘুম পেয়েছিল কারন দুধে ঔষধ মেশানো ছিল। সে নাকি ঔষধ খেতে চাইত না। তাই এই ব্যবস্থা!

এখন অবশ্য সেরকম করা হয় না৷ ধারা নিজেই সুবোধ বালিকার মতো ঔষধ খায়।

এখনো খেল। তারপর আকলিমা আপাকে বলল, “আমাকে ডিসটার্ব করবেন না প্লিজ। আমি বিকেল পর্যন্ত একা থাকতে চাই।”

আকলিমা আপা মাথা হেলিয়ে সম্মতি জানিয়ে চলে গেল। ধারা শুয়ে পড়ল ডায়েরি নিয়ে।

—————

ঘুম থেকে উঠলাম ভোরে৷ প্রথমেই দেখতে গেলাম রাশিকের মাকে। রাশিকের মুখটাই বসানো একেবারে। শুধু একটু বুড়িয়ে গেছেন। চেহারা দেখেই বোঝা যাচ্ছে ভালো অসুস্থ উনি৷ তবু আমার সাথে অনেক কথা বললেন। কথা সেরে নাস্তা করতে বসলাম।

নাস্তা বানিয়েছে পৃথা। ও আমারও আগে উঠে কাজ করতে শুরু করেছে৷ এমনিতে নাকি মা সবকিছু করেন৷ আজকে মা অসুস্থ বলে পৃথা করছে। সাথে ছোটো ভাই আশিকও কাজে সাহায্য করছে। সব দেখে খুব ভালো লাগল।

একটু পর রাশিক চলে গেল অফিসে আর আশিক ইউনিভার্সিটিতে। বাসায় রয়ে গেলাম আমি, পৃথা আর মা।

——————-

পড়তে পড়তে কখন ঘুমিয়ে পড়েছিল বুঝতেও পারেনি ধারা। ঘুম ভাঙল বিকেল গড়িয়ে যাওয়ার পর। আড়মোড়া ভেঙে উঠেই আবার বসে গেল ডায়েরি নিয়ে। পুরোটা পড়ে শেষ করল। বাকিটা রাশিকের বাড়িতে থাকাকালীন সময়ের দিনলিপি। পড়ে মনে হলো ওই সময়টাতে সে বেশ ভালোই ছিল। ওদের বাড়ির লোকজনের আন্তরিকতায় মুগ্ধ হয়ে কাটিয়েছে দিনগুলো। তারপর হঠাৎ করেই লেখা বন্ধ হয়ে গেছে। শেষ যেদিন লেখা হয়েছিল তার পরদিন তাদের ঘুরতে যাওয়ার কথা ছিল। আচ্ছা সেই ঘুরতে গিয়েই কি অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছিল কোনো?

ধারা উঠে বারান্দায় চলে গেল। রীতিমতো শরীর খারাপ লাগছে তার। মাথায় প্রচন্ড যন্ত্রণা।

এ সময় শাহেদ ঘরে ঢুকল। “কেমন আছ ধারা?”

ধারা আহত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে বলল, “ডায়েরি পড়েছি। আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।”

বলতে বলতেই জ্ঞান হারাল সে। শাহেদ তাকে তুলে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এবার সত্যিটা জানাতে হবে তাকে।

রাশিক বসে আছে ড্রইংরুমে। সে কিছুতেই বুঝতে পারছে না ধারার জন্য কেন তাকে এত জোর করে আসতে বললেন লোকটা? মেয়েটার সাথে সম্পর্ক অনেক আগেই চুকেবুকে গেছে। এখন এসব কেন?

শাহেদকে ঢুকতে দেখা গেল। হাসিমুখে সে পরিচিত হলো রাশিকের সাথে।

রাশিক এবার জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে বলুন তো? আমি অনেক কাজ ফেলে এসেছি।”

শাহেদ কিছু না বলে ডায়েরি দুটো এগিয়ে দিল রাশিকের দিকে। বলল, “পড়ে দেখুন।”

রাশিক স্পষ্টতই বিরক্ত হলো। “আমার সময় নেই। শর্টে বললে ভালো হতো।”

শাহেদ স্মিত হেসে বলল, “সময় করেই তো এসেছেন। পড়লে এমন অনেক কিছু পাবেন যেগুলো হয়তো আপনাকে ভীষণ চমকে দেবে!”

রাশিক শাহেদের কথায় ভরসা পেল না। অনিচ্ছুকভাবে একটা ডায়েরির পাতা ওল্টালো। নিজের নাম দেখতে পেয়ে খানিকটা নড়েচড়ে বসল সে। পড়তে লাগল পাতার পর পাতা। সময়-জ্ঞান আর রইল না৷ শাহেদ পুরোটা সময় সামনে বসে উপভোগ করতে লাগল রাশিকের চেহারার পরিবর্তন। সাইকিয়াট্রিস্ট হিসেবে মানুষের মনের রসায়ন নিয়ে তার প্রচুর আগ্রহ। প্রতিটা বাক্য পড়তে পড়তে রাশিকের বিষ্ময় যে বেড়ে চলেছে সেটা তার চোখমুখ দেখে বোঝা যাচ্ছে। মুখের পেশি, চোখের ছোটবড় হওয়া, মুখ খোলা বা বন্ধ হওয়া, হাতের নড়াচড়া প্রতিটা জিনিস খুটিয়ে লক্ষ্য করছে শাহেদ৷

পড়া শেষে রাশিক অনেকক্ষণ কোনো কথা বলতে পারল না৷ একসময় অনেক চেষ্টা করে আমতা আমতা করে বলল, “কিন্তু এসব…এসব কেন লিখেছে সে? ধারার সাথে আমার মাত্র একবার দেখা হয়েছে। আমি ওর ইউনিভার্সিটিতে গিয়েছিলাম। সেখানে ওকে প্রপোজ করি। এই অংশ ঠিকই লিখেছে। কিছুদিন পর আমাকে সে রিজেক্ট করে দেয়। তখন খুব রাগ লেগেছিল আমার। ওকে ব্লক করে দিয়েছিলাম আমি। বিয়ে করে নিয়েছিলাম এক মাসের মধ্যে। তারপর আমাদের আর কোনোরকম যোগাযোগ হয়নি৷ ও লিখেছে আমাদের বাড়িতে এসেছিল..অসম্ভব!”

শাহেদ বলল, “আপনি উত্তেজিত হবেন না প্লিজ!”

“উত্তেজিত হব না? সব মিথ্যে, কিন্তু এত মিল কেমন করে হয়? আমাদের বাড়ির বর্ণনা, আমার মায়ের বর্ণনা, আমরা কেমনভাবে চলি, কেমন খাবার খাই, কোথায় ঘুরতে যাই এসব এই মেয়ে এত নিঁখুতভাবে কেমন করে লিখতে পারল? ও কি জাদুটোনা করে?”

শাহেদ হেসে ফেলে বলল, “আপনি এই যুগে বসে জাদুটোনায় বিশ্বাস করেন নাকি? আবার বলছি শান্ত হোন। আমি সব বুঝিয়ে বলছি।”

“ঠিক আছে বলুন।”

“ডায়েরি পড়ে নিশ্চয়ই বুঝেছেন ধারার বিয়ে হয়েছিল আর ডিভোর্সও হয়ে গেছে?”

“হ্যাঁ।”

“ও আসলে খুব ভালোবাসত ছেলেটাকে। যখন ওর কাছ থেকে ধোঁকা খেল, সহ্য করতে পারল না। একটা বড়সড় আঘাত পেয়েছিল মনে। কিন্তু সে লিখেছে অনেক রেখেঢেকে। মেয়েটা বুদ্ধিমতী। যুক্তি দিয়ে বিবেচনা করতে চাইত সবকিছু৷ তাইতো বর্ষণকে হারিয়ে প্রাণপণে নিজেকে বোঝাতে শুরু করল সে বর্ষণকে আসলে ভালোবাসত না।
নিজের যুক্তি নিজের কাছেই যখন গ্রহনযোগ্য হতো না তখন চাইত অন্য কেউ তাকে বোঝাক। সান্ত্বনা দিক, পাশে দাঁড়াক। আর সেই চাহিদা থেকেই সে আপনাকে আবিষ্কার করে। মনে মনে একটা কাল্পনিক রাশিক গড়ে নেয়, যে তাকে প্রতিনিয়ত সেটাই বোঝাত যেটা ধারা নিজে নিজের মনকে বোঝাতে চাইত। বর্ষণকে হারিয়ে সে একটা অবলম্বনকে আঁকড়ে ধরে ভালো থাকতে চেয়েছে যার নাম রাশিক। বর্ষণের সাথে যেসব কথোপকথন ডিভোর্সের পর সে লিখেছে সেগুলোও কাল্পনিক। বর্ষণের সাথে ডিভোর্সের পর আদতে তার দেখাই হয়নি। কথা হয়েছিল টুম্পার সাথে। টুম্পা আর বর্ষণের সম্পর্ক জোড়া লেগে যাওয়ার পর মনে মনে আরও বেশি ভেঙে পড়ে ধারা। কাল্পনিক রাশিকের সাথে কথোপকথন বেড়ে যায়৷ এক পর্যায়ে সে সিদ্ধান্ত নেয় সে রাজশাহী যাবে। কিন্তু আসলে সে কোথাও যায়নি। যাত্রা, বাসস্ট্যান্ডে অপেক্ষা করা, আপনার বাড়িতে যাওয়া পুরোটা ও বাড়িতে নিজের ঘরে বসে কল্পনা করেছে৷

ওর মধ্যে তখন দুটো সত্ত্বা কাজ করত। একটা ছিল বাস্তবিক। বাস্তবে যখন সে থাকত, খুব স্বাভাবিক জীবনযাপন করত, কিন্তু কল্পনায় সে চলে যেত আপনার কাছে।

প্রথম প্রথম ব্যাপারটা কেউ ধরতে পারেনি। কিন্তু ধীরে ধীরে ওর বাস্তব সত্ত্বাটাকে গ্রাস করতে থাকে কাল্পনিক অংশ৷

ওর বাবা মা তখন বুঝতে পারে মেয়েটা অস্বাভাবিক আচরণ করছে। অদৃশ্য কারো সাথে অনবরত কথা বলছে, হাসছে। সারাক্ষণ নিজেকে ঘরে বন্দি করে ডায়েরিতে গুটিগুটি কীসব লিখছে।

ধারার মা ওর সাথে কথা বলেছে অনেকবার, কিছুই বোঝেনি। কারন বাস্তব জগতে ও যখন থাকত তখন রাশিকের ব্যাপারে সবটা ভুলে যেত। সে জানত রাশিক তাকে ব্লক করেছে অনেক আগেই। কিন্তু কল্পনায় ফিরে গেলেই রাশিক ফিরে আসত প্রেমিকরূপে।”

রাশিক হা করে শুনছিল সব। এবার মাথায় দুই হাত দিয়ে বলল, “মাই গড! কী শোনালেন এসব!”

“সব সত্যি। ধারার অবস্থা একসময় বেশি খারাপ হয়ে গেলে মেন্টাল হসপিটালে ভর্তি করা হয় তাকে৷ অনেকদিন সে সেখানে ছিল। কিন্তু সেসবের কিছুই তার মনে নেই। কারন সে সময়টাতে সে পুরোপুরি কল্পনার জগতে ছিল। দ্বিতীয় ডায়েরির বেশিরভাগ অংশ সে হাসপাতালে বসে লিখেছে। অথচ পড়লে মনে হবে সে হবু স্বামীর বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে কোয়ালিটি টাইম স্পেন্ড করছে। কতটা খারাপ অবস্থায় ছিল ধারণা করুন!”

“আমার ধারণার বাইরে চলে যাচ্ছে সব! এমনও হয়? কিন্তু একটা কথা…আমার বাড়ির খুটিনাটি..”

“ওহ! ওসব আপনি নিজেই ধারাকে বলেছেন কখনো না কখনো। মনে করে দেখুন। আপনি নিজের পরিবার নিয়ে যা কথাবার্তা বলেছিলেন সব ওর মাথায় সেভ করা ছিল। সেগুলো দিয়ে সাজিয়ে পরপর ঘটনা বানিয়েছে ওর মস্তিষ্ক। খুবই জটিল আর অদ্ভূত ব্যাপার!”

রাশিক আবারও বেশ খানিকক্ষণ চুপ করে ব্যাপারটা হজম করার চেষ্টা করল। শেষে বলল, “এখন আমার করণীয় কী? আমি তো ওর জীবনে ফেরত আসতে পারি না। আমার একটা মেয়ে আছে…”

শাহেদ হাত তুলে থামিয়ে বলল, “আরে না। সেরকম কিছু করতে ডাকিনি আপনাকে। আপনাকে ডেকেছি দুটো কারণে- এক. আপনি নিজের অজান্তে একটা বড় ঘটনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে গেছেন, যেটা জানার অধিকার আপনার আছে। আর দুই. ধারা এখন মোটামুটি সুস্থ। তাকে ঔষধ খাইয়ে, থেরাপি দিয়ে অনেক কষ্টে কল্পনার জগৎ থেকে বের করে আনা হয়েছে। এখন আপনাকে সামনে দেখলে ওর প্রতিক্রিয়া কী হয় সেটা থেকে বোঝা যাবে ও সত্যিই কতটা সুস্থ হয়েছে।

ডায়েরি দুটো পড়তে দিয়েছিলাম ধারাকে। পড়ার পর সে শুধু বলেছে এরকম কোনো ঘটনা সে মনে করতে পারছে না৷ তাকে এখনো কল্পনার ব্যাপারটা বলিনি। আপনাকে দেখার পর কী করে সেটা দেখে পরবর্তী চিকিৎসার দিকে এগুনো হবে।

রাশিক মাথা নেড়ে বলল, ” ঠিক আছে। আমি যাব ওর কাছে।”

“আসুন। ওপরতলায় আছে ধারা।”

ধারা বসেছিল জানালার পাশে। গানের পাখিটা আজ ডাকছে না। বিকেলের ছায়া ঘন হয়ে আসছে গাছগুলোর নিচে। তন্ময় হয়ে দেখছিল ধারা। দরজায় টোকার শব্দে ঘোর ভাঙল। দরজা খোলাই থাকে তার ঘরের। শাহেদ কিংবা আকলিমা আপা এমনি ঢুকে পড়ে। আজ আবার কড়া নাড়ছে কেন? সে বলল, “আসুন ভেতরে।”

শাহেদের সাথে আরও একজন ঘরে ঢুকল। প্রথম দেখায় চিনতে একটু অসুবিধা হলো ধারার। তারপর হঠাৎ চিনে ফেলল। রাশিক!

রাশিক বোকার মতো হাসল। অস্বস্তি বোধ করছে ভীষণ। পাগলদের সে ভয় পায়। কিন্তু ধারা তো রাস্তার পাগল নয়৷ তাকে কি আসলে পাগল বলা যায়? দেখে মনে হচ্ছে ইউনিভার্সিটিতে পড়া সুন্দরী মিষ্টি মেয়েটাই দাঁড়িয়ে আছে সামনে। রোগা হয়েছে একটু, আরও বয়স কম লাগছে তাতে।

ধারা খুব শীতল গলায় জিজ্ঞেস করল, “কেমন আছেন?”

রাশিক খেয়াল করল ধারার চোখমুখ শুকিয়ে গেল যেন৷ কপাল কুঁচকে আছে মেয়েটা। বোধহয় মাথাব্যথা করছে। হঠাৎ দু’হাতে মাথা চেপে ধরে বসে পড়ল ধারা।

শাহেদ ছুটে গিয়ে ধরল তাকে। রাশিক দাঁড়িয়ে রইল কিংকর্তব্যবিমুঢ় এর মতো।

(চলবে)

সুমাইয়া আমান নিতু