বেপরোয়া ভালবাসা পর্ব-৪৩+৪৪+৪৫

0
1820

#বেপরোয়া_ভালবাসা
#লিখনীঃ #মনা_হোসাইন
#পর্বঃ ৪৩

রাত ১ টা বেজে ৪০ মিনিট আদিবার সাথে ঝগড়া করতে করতে কখন যে ঘড়ির কাঁটা এগিয়ে গিয়েছে আদি বুঝতেই পারে নি. তবে এখন আর চোখে খোলে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। গতরাতে সে একটুও ঘুমাতে পারেনি। জার্নি করে এসেছে তারউপড় আদিবার চিন্তা তো ছিলই। আদিবা এখনো বক বক করে চলেছে আদি এবার বাধ্য হয়েই বলল,

-“আচ্ছা ঠিক আছে আপনারি জয় হয়েছে। বিড়াল আপনিই মেরেছেন এখন আমরা একটু ঘুমাই..?

আদিবা সোজা উত্তর দিল,
-“আমার ঘুম পায়নি..

-‘তা পাবে কেন প্লেনে সারাক্ষন ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে এসেছেন বাসায় এসেও ঘুমিয়েছেন আপনার তো ঘুম পাওয়ার কথা না।

-“আপনার সাথে বিয়ে হয়েছে বলে কী ঘুমাতেও মানা..?

-“জ্বি না আপনার যা খুশি করতে পারেন।

-“বেশ তাহলে আমার এখন গল্প করতে ইচ্ছে করছে চলুন গল্প করি।

-“মানে কী..?

-“আপনিই তো বললেন যা খুশি করা যাবে।

-“আদিবার বাচ্চা এবার কিন্তু বাড়াবাড়ি করছিস। চুপচাপ ঘুমা তানাহলে কানের নিচে এমন মা*রব কেঁদে কূল পাবিনা।

-“কী সর্বনাশ বাসর রাতেই নারী নি*র্যাতন?

-“আদিবা আমাকে একটু ঘুমাতে দে প্লিজ। কাল অফিসে জরুরি মিটিং আছে।

-“আমি কী বাঁধা দিয়েছি নাকি..? ঘুমান যতখুশি ঘুমান।

বলেই আদিবা বিছানা ছেড়ে উঠে গেল। আর কিছু না বলে দরজার দিকে হাঁটা দিল।আদিবার কান্ডে আদি অবাকের উপড় অবাক হচ্ছে।দরজা পর্যন্ত যেতেই আদি বলল,

-“আজব তো ওদিকে কোথায় যাচ্ছিস?

-“বাইরে…

-“এত রাতে বাইরে কোন দুঃখে..?

-“দুখে যাব কেন সুখে যাচ্ছি। আমার একমাত্র জামাই একদিনেই আমার উপড় সব ইন্টারেস্ট হারিয়ে ফেলেছে সেই সুখে বাইরে একা একা হাঁটতে যাচ্ছি।

-“এসব কোন ধরনের কতাবার্থা? আমি কখন বললাম ইন্টারেস্ট হারিয়ে ফেলছি?

-“সব কি মুখে বলতে হয়? আপনি ঘুমান আমি বাইরে যাচ্ছি।

-“ওই দাঁড়া..

আদিবা দাঁড়াল না আদি নিচে নেমে এগুতে এগুতে বলল,

-“তো এখন আমি ঠিক কী কী করলে প্রমাণ হবে বউয়ের প্রতি আমার ইন্টারেস্ট আছে..? একটু আগে যা যা করেছিলাম সেগুলো রিপিট করব?

আদিবা মুখ ভেঙছি কেটে জবাব দিল,

-” একটু আগে যা যা করেছেন,এসব সব ছেলেরাই করতে চায় কার সাথে করছে ব্যাপার না এসব করতে পারলেই হল। ছেলে হয়ে যখন জন্ম নিয়েছেন যখন আপনারো এসব কিছুতে ইন্টারেস্ট থাকবে এটাই স্বাভাবিক। তাইবলে এ থেকে প্রমান হয় না যে আপনার বউয়ের জন্য টান আছে।

আদি চোখ বন্ধ করে নিজেকে রাগ সংযত করার চেষ্টা করে বলল,

-“আচ্ছা তাহলে বল কি করলে প্রমাণ হবে টান আছে?

-“বাইরে চলুন আর আমার সাথে গল্প করুন।

-“খোদা আমাকে ধর্য্য দাও।

আদিবা কিছু না বলেই বাইরে চলে গেল আদি বাধ্য হয়েই পিছু পিছু গেল। বাইরে এসে আদিবা একটা বেঞ্চে বসল আদিও তার পাশে বসেছে।

-“তো এখন বল আমার সাথে তোর কী এমন গল্প করার আছে? জীবনে কোনদিন তো ভাল করে একটা কথা বললি না আজ কী এমন গল্প বলবি বল শুনি।

-“এমন বাঁকা কথা বললে কারোর গল্প করতে ইচ্ছে করবে?যাইহোক আপনি এখানে বসুন আমি একটু ঘুরে আসি।

-“মানে কী? রাতের বেলায় কোথায় যাবি?

-“কোথাও যাব না এখানেই থাকব। আর আপনি বসে বসে আমাকে পাহারা দিবেন।

-“কোন মানে হয়..?

আদিবা আদির কথার পাত্তা না দিয়ে চলে গেল। আদি আদিবার কর্মকান্ড দেখছে আর রাগ নিয়ন্ত্রনের চেষ্টা করছে আদিবা অন্তত কয়েকবার বাসার পুরো বাগান চক্কর দিয়ে ফেলেছে তবুও থামার নাম নেই। আদির ঘুম পেলেও সে ঘুমাতে পারছে না কারন এই মেয়ের বিশ্বাস নেই আদি চোখ বুজলেই এদিক ওদিক চলে যাবে সন্দেহ নেই।

মুটামুটি ঘন্টা খানিক পর আদি উঠে আদিবার কাছে গেল।

-“একটু পরেই ভোর হয়ে যাবে এখন ভিতরে যাই..?

-“উহু…

-“উফফ আদিবা ছোট বাচ্চাদের মত এসব কি হচ্ছে..?

-“আপনি জানেন এখন কী হবে..?

-“কী হবে..?

-“বৃষ্টি নামবে..

-“হুম আকাশে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে সেই জন্যেই বলছি চল ভিতরে যাই…

-“নাহ আজ আমরা বৃষ্টিতে ভিজব।

-“মানে..?

আদিবা হটাৎ করেই কেন যেন মন খারাপ করে ফেলল।হাস্যজ্জল মুখে মূহুর্তেই মেঘ জমেছে..সে অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে নীরব গলায় বলল,

-“আপনি জানেন আমি কত বছর বৃষ্টিতে ভিজিনি..?

আদি উত্তর দিল না কোন কারনে তারও মন খারাপ হয়েছে…

আদিবা একটু থেমে বলল,
-“উত্তর দিলেন না? তারমানে আপনার মনে আছে? সেদিন ভিজেছিলাম জন্যে আপনি পুরো একদিন আমাকে খেতে দিন নি।

আদিও অন্যদিকে মুখ করে জবাব দিল,

-“আমি কোনকিছুই সহজে ভুলি না তাছাড়া বৃষ্টিতে ভেজা কোন যুক্তিসংগত কাজ না। কোন সুস্থ মানুষের বৃষ্টিতে ভেজার ইচ্ছে হতে পারে বলে আমার মনে হয় না।

-“আপনার কী মনে হয় পৃথিবীর সবার পছন্দ অপছন্দ গুলো আপনার মত হবে?

-“নাহ পৃথিবীর সবাইকে আমি আমার সাথে রাখব না। তাই তাদের পছন্দ অপছন্দ নিয়ে আমার ভাবার কিছু নেই কিন্তু যাকে আমার সাথে থাকতে হবে তার পছন্দ অপছন্দগুলো আমার মত হওয়া জরুরি। তাছাড়া আমি কখনো নিজের জন্য কিছু করিনি যা করেছি তোর ভালর জন্যই করেছি…

-“সত্যিই তাই..?

-“অবশ্যই তাছাড়া তুই ভুল বলেছিস তুই কদিন আগেও গ্রামে বৃষ্টিতে ভিজেছিস আমি কিছুই বলিনি।

-“এই ভেজা আর আনন্দে ভেজা কী এক? বৃষ্টিতে ভেজার ইচ্ছেটা অনেক আগেই হারিয়ে গিয়েছে।

-“ক্ষতিকর বিষয়ে ইচ্ছে না থাকাই ভাল।

-“ওহ…

আদিবা পুরো কথা শেষ করার আগেই আকাশ কেঁপে বৃষ্টি শুরু হল তবে আদি কিংবা আদিবা কেউই ভিতরে যাওয়ার ব্যাস্ততা দেখাল না বরং আদিবা খিলখিল করে হেসে উঠল সে আদির হাত ধরে টেনে বাগানের ফাঁকা দিকটায় নিয়ে গিয়ে দাঁড়াল অঝোর ধারায় বৃষ্টি পড়ছে আদি আদিবা দুজনেই ভিজে একাকার। আদিবা আদির হাত ধরে ঘুরে ঘুরে ভিজছে। প্রথম দিকে আদির বিরক্ত লাগলেও আদিবার খুশি দেখে তাকে বাঁধা দিতে ইচ্ছে করল না কিছুক্ষনের মধ্যে তারও ভাল লাগতে শুরু করেছে। হয়ত আদিবা তার সাথে ভিজছে জন্যেই ভাল লাগছে। তাই সেও বেশ অনেক্ষন ভিজল। দেখতে দেখতে সময় কেটে গেল। ভোর হতে আর কিছুক্ষন।

-“আদিবা এবার ভিতরে চল বেশি ভিজলে ঠান্ডা লাগবে..

হটাৎ করেই আদিবা আদিকে জড়িয়ে ধরল আদিবা এমন কিছু করবে আদি ভাবতেও পারেনি সে এক মিনিটের জন্যে থমকে গেল। হাত দুটো কাঁপছে,বুকের ভিতর উতাল পাতাল শুরু হয়েছে। আদি স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে দেখে আদিবা বলল,

-“হাঁটতে ইচ্ছে করছে না কোলে নিন।

আদি কোন জবাব না দিয়ে আদিবাকে কোলে নিয়ে ঘরে গেল। আদিবাকে ফ্রেশ হতে বলে নিজেও গিয়ে ফ্রেশ হয়ে আসল।



বেচারার বেহাল দশা এতক্ষন ভিজেছে তারউপড় সারারাত না ঘুমানোর ফলে চোখ লাল হয়ে আছে। যাই হয়ে যাক এখন একটু ঘুমাতেই হবে ভেবে আদি যেই বিছানায় গাঁ ছুয়াল সাথে সাথে আদিবা হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসল। আদি উদ্বেগ নিয়ে তাড়াতাড়ি উঠে বলল,

-“কী হয়েছে আদিবা..?

-“কি হয়েছে মানে? আপনি শুয়ে পড়ছেন কোন বুদ্ধিতে?

-“কেন কী হয়েছে? এখন তো তোর গল্প করা শেষ হয়েছে এখন ঘুমাতে অসুবিধে কী?

-“আশ্চর্য তো সকাল হয়ে গিয়েছে দেখতে পাচ্ছেন না?

-“তো সকালে কী ঘুমানো বারণ আমার অফিস দশটায় এখনো ঘুমালে অনেক্ষন ঘুমানো যাবে। একটু না ঘুমিয়ে গেলে কাজে মন বসবে না তুই তো জানিস আংকেল অনে আশা নিয়ে আমাকে দায়িত্ব দিয়েছে যদি তার মান রাখতে না পারি…

-“কার না কার আশা পূরণ করতে গিয়ে নিজের বউকে না খায়িয়ে রাখবেন?

-“মানে?

-“আমি কি সকালে ব্রেকফাস্ট করব না নাকি? আপনি এখন ঘুমালে ব্রেকফাস্ট কে বানাবে..? ভালয় ভালয় এখনী নিচে গিয়ে রান্না করুন।

আদি বেশ অবাক হয়ে তাকাল আদিবার দিকে।

-“এভাবে তাকিয়ে আছেন যে? খেতে চাওয়াও অন্যায় তাই না?

-“আমি তা বলিনি। তুই তো রান্না পারিস।

-“ওহ তারমানে সকালে যা যা বলেছিলেন সব মিথ্যে ছিল? আমাকে কাজ করতে হবে না এসব মিথ্যা ছিল।

আদি উত্তর দিতে পারল না উঠে রান্না ঘরের দিকে হাঁটা দিল।



চলবে…!!

#বেপরোয়া_ভালবাসা
#লিখনীঃ মনা হোসাইন
#পর্বঃ৪৪

আদিবার আচারন আদিকে অবাক করলেও আদি ততটা গায়ে মাখল না। সে আদিবার জন্য রান্না করে তাকে খায়িয়ে দিয়ে নামে মাত্র বিশ্রাম নিয়েই অফিসে ছুটল। যাই হয়ে যাক আজ অফিস মিস করা যাবে না। আদির চোখ মুখে ক্লান্তির ছাপ তবুও তা উপেক্ষা করে মিটিং রুমে ঢুকল।
আদির মিটিং শুরু হতেই সশব্দে তার ফোন বেজে উঠল। মিটিং এর মাঝে ফোনের আওয়াজে সবাই মোটামুটি বিরক্ত হয়েছে তবে আদি যেহেতু অফিসের বস তাই এইটুকু এক্তিয়ার তার আছে।
সে ফোনটা হাতে নিয়ে চোখ রাখতেই দেখল আদিবা ফোন করেছে। আদি তাড়াতাড়ি ফোন তুলে সাইডে গেল।

-“হ্যালো আদিবা..?

-“তা নয়ত কে?আমার ভুতে ফোন করেছে আপনাকে?

-“আদিবা আমি মিটিং এ আছি তোকে কিছুক্ষন পর ফোন দেই..?

-“আমার চেয়ে মিটিং বেশি হল আপনার কাছে…?

-“উফফ কিসব বলছিস?

-“আপনিই তো বললেন।

-” আমি বলেছি মিটিং শেষ করে কল দিব।

-“কিন্তু আমি এখনী কথা বলতে চাই।

-“বেশ দরকারী কিছু বলার থাকলে বলে ফেল সবাই আমার জন্য অপেক্ষা করছে।

-“আমি আপনাকে ভালবাসি।

আদিবার কথায় আদি স্মিথ হাসল। হাসি মুখেই উত্তর দিল।

-“আমি জানি আর এর বিপরীতে আমি কী উত্তর দিব সেটাও তুই জানিস।

-“আমি জানলে হবে তো নিজের মুখে উত্তর দিন।

-“কী ছেলেমানুষী হচ্ছে? আমি মিটিং রুমে,সবার সামনে কী করে বলব?

-“তারমানে বলবেন না।

-“ছোট বাচ্চাদের মত কি হচ্ছে এসব? তুই কী ছোট বাচ্চা বুঝিস না কিছু ?

-“স্বামীর সাথে আহ্লাদ করার বয়স আমার নেই সেটাই বুঝাতে চাইছেন?

-“আদিবা আমি ব্যাস্ত আছি..এখন ঝগড়া করার পরিবেশ নেই যা যা বলার আছে বাসায় ফিরলে
বলিস।

-“তাহলে এখনী ফিরে আসুন।

-“মানে কী..?

-“আমার একা একা ভাল লাগছে না প্লিজ আসুন না…

-“তুই তো জানিস আজ আমার জরুরী কিছু মিটিং আছে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব শেষ করে চলে আসব ঠিক আছে?

-“এতক্ষন আমি একা একা কী করব? আপনি এখনী চলে আসুন প্লিজ প্লিজ প্লিজ…

-“তুই কিন্তু এবার বাড়াবাড়ি করছিস আদিবা। যাইহোক সবাই আমার জন্য অপেক্ষা করছে রাখছি। পরে কথা হবে বলেই আদিবাকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে ফোন টা কেটে দিল আদি।

আদি এসে মিটিং এ যোগ দিল। মিটিং চলাকালীন সময় আরও কয়েকবার ফোন আসল। বারবার ফোন বাজায় সবাই বিরক্ত হচ্ছে। শুধু ভয়ে বলতে পারছে না কিন্তু ম্যানেজার সাহেব বলেই বসল,

-“স্যার আপনি ফোনের ঝামেলা আগে মিটিয়ে নিন। এভাবে মিটিং এ মন বসাতে পারবেন না।

ম্যানেজারের কথায় আদির মেজাজ খারাপ হয়ে গেল এমনিতেই সারারাত না ঘুমিয়ে মেজাজ খিটখিটে ছিল। আদি মোটামুটি ধমক দিয়েই বলল,

-“আমাকে কী করতে হবে আর কী করতে হবে না সেটা নিশ্চুই আপনার কাছ থেকে শিখতে হবে না তাই না?

-“সরি স্যার…

আদি জবাব না দিয়ে ফোনটা তার এসিস্ট্যান্ট এর কাছে দিয়ে বলল,

-“ফোন টা নিয়ে যাও আবার ফোন আসলে ফোন টা ধরে বলবে স্যার ব্যাস্ত আছেন আপনাকে পরে ফোন করবেন।

আদির এসিস্ট্যান্ট ফোনটা নিয়ে মিটিং রুম থেকে বেরিয়ে আদির পার্সনাল রুমে রেখে আসল। এরমধ্যে আর ফোন আসল না।

এসিস্ট্যান্ট ফিরে আসতেই আদি জিজ্ঞাসা করল ফোন এসেছিল?

এসিস্ট্যান্ট উত্তর দিল
-“আর ফোন আসেনি।

আদি স্তস্তি পেল। আদি মিটিং এ মন দিতে চাইলেও কিছুতেই যেন মন বসছে না। বসবে কী করে আদির মন যে পড়ে আছে আদিবার কাছে মেয়েটা বাসায় একা একা কি করছে কে জানে। যত তাড়াতাড়ি মিটিং শেষ হবে বাসায় যেতে হবে।

কিন্তু অফিসে কিছু ঝামেলা হওয়ায় আদি তাড়াতাড়ি ফিরতে পারল না। ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা গড়িয়ে গেল। বাসায় ফিরে আদি অবাক হল আদিবার হাতে বেন্ডেজ দেখে আদির মাথা চক্কর দিল। তাড়াহুড়ো করে আদিবার কাছে গিয়ে প্রশ্ন করল,

-“হাতে কি হয়েছে আদিবা…

আদিকে দেখেই আদিবা রাগে ফুসফুস করতে লাগল।
-“খবরদার আমার কাছে আসবেন না এতক্ষন যেখানে ছিলেন সেখানেই যান..বলে আদিবা সরে গেল।

-“এসব কী ধরনের ফাযলামি? ব্যাথা পেয়েছিস কি করে?

-“আমার ব্যাথা আমি বুঝে নিব আপনার বুঝার দরকার নেই তো…

-“আদিবা ছেলেমানুষী বাদ দে দেখি কী হয়েছে…

-“আপনি আমার কাছে আসবেন না বলছি। বাড়াবাড়ি করলে খারাপ হয়ে যাবে বলে দিলাম।

আদি বেশ বিরক্ত হয়ে রাগে উঠে গেল। আদিবাও বাঁধা দিল না। আদি উঠে গিয়ে ল্যাপটপ নিয়ে বসল। সে মনযোগ দিয়ে কিছু একটা দেখল তারপর আদিবার কাছে এসে কিছু না বলে ঠাস করে থাপ্পড় বসিয়ে দিল। আদিবাও কড়া চোখে তাকাল।

-“খুব বাড় বেড়েছিস তাই না..? বেশ এখন দেখব তুই কত বাড়তে পারিস বলেই আদি জিন্স থেকে বেল্ট খুলে আদিবার সামনে দাঁড়াল। তবে আদিবা বরাবরের মত আদিকে ভয় পেল না বরং সরাগী চোখে তাকাল আদির দিকে। চোখ দুটি যেন যেন ভিতরের সব রাগ উগড়ে দিতে চাইছে



চলবে…!!!

#বেপরোয়া_ভালবাসা
#লেখনীঃ মনা হোসাইন
#পর্বঃ৪৫

আদি নিজের রাগ কন্ট্রোল করতে পারল না। ঠাস করে থা*প্পড় বসিয়ে দিল আদিবার গালে। আদিবা তাতে ব্যাথা পেলেও ভয় পেল না। রাগী চোখে তাকাল আদির দিকে। আদিবা ভয় পায়নি ব্যাপরটা আদির রাগের আগুনে যেন ঘী ঢালল। সে চেঁচিয়ে উঠল,

-“এসবের মানে কী? কী চাইছিস তুই আদিবা জবাব দে…

আদিবা উত্তর দিল না আদি আরও রেগে গিয়ে বলল,

-“সবকিছুর একটা লিমিট থাকে তুই সব সীমা পেরিয়ে গিয়েছিস আমাকে আর রাগাস না। সামলাতে পারবি না ভালয় ভালয় জবাব দে হাত কেটেছিস কেন …?

আদি বেশি রেগে যাচ্ছে দেখে আদিবা উত্তর দিতে বাধ্য হল খটমট করে উত্তর দিল,
-“কাটিনি,কেটে গেছে…

-“আবার মিথ্যা বলিস? সিসিটিভিতে আমি সবি দেখেছি। এত জেদ তোর? আজ যদি তোর জেদ আমি ভাংগতে না পারি আমার নাম আদি না। বলেই জিন্স থেকে বেল্ট খুলে আদিবার সামনে দাঁড়াল,

-“বল কেন কেটেছিস? এত বাড়াবাড়ির কারন কী? সুখে থাকতে ভূতে কিলায়..?

-“সুখ..? কোনটাকে সুখ মনে হচ্ছে আপনার?

-“মানে..? কি বুঝাতে চাইছিস? সরাসরি বল,

-“না বললে কী করবেন? মা*রবেন? মা*রুন। তবে তার আগে বলুন আমার ভুল টা কী? বিয়ের পর দিন নিজের বরকে কাছে পেতে চেয়েছি সেটা অন্যায়? বারবার ফোন করেছি সেটা অন্যায়?

-“না অন্যায় না তবে বাড়াবাড়ি। আমি কি ম*রে যাচ্ছিলাম বাসায় ফিরতাম না? আমি বার বার বলেছিলাম আজ আমার একটু কাজ আছে তারপরেও সারারাত ফাযলামি করেছিস আর এখন হা*ত কে*টে একাকার অবস্থা এভাবে আমার উপড় ট*র্চার করার মানে কী?

-“হাত আমার, ব্লা*ড আমার, আপনার অসুবিধা কোথায়?

-“আদিবা তুই বাচ্চাদের মত আচারন কেন করছিস? এমন তো না যে আমি তোকে রেখে অন্য কাউকে সময় দিতে চলে গিয়েছি এটা আমার প্রফেশন তোকে সেটা বুঝতে হবে।

-“বুঝলেই কী আর না বুঝলেই কী? আপনার কাছে আমার অভিমানের কোন দাম আছে?

-“মানে?

-“মানেটা বুঝলে অনেক আগেই বাসায় ফিরতেন রাতে ফিরতেন না যাইহোক নিচে যান আমি খাবার দিচ্ছি। বিয়ে করে এনেছেন দায়িত্ব তো পালন করতেই হবে। তানাহলে আবার কখন থাপ্প*ড় লাগাবেন কে জানে?

-“আদিবা…?

আদিবা কিছু না বলে নিচে চলে গেল। আদিও নিচে নামছিল ঠিক তখন বাসার কলিং বেল বেজে উঠল আদিবা গিয়ে দরজা খোলল। দরজা খোলে আদিবা কিঞ্চিত ভ্রু কুচকে আদির দিকে তাকাল কিন্তু আদি তাকে পাত্তা না দিয়ে তাড়াহুড়ো করে এগিয়ে গেল।

-“আংকেল,সিনথিয়া,জেসমিন কেমন আছো তোমরা? এসো এসো ভিতরে এসো।

আদিবা ঠাঁই দাঁড়িয়ে আছে তার চোখে মুঝে বিরক্তি ফুটে উঠছে।তবে আদিকে বেশ খুব প্রফুল্ল দেখাচ্ছে। সবাই ঘরে ঢুকতেই লোকটা বললেন,

-“আসলে বউ মার সাথে তো ভাল করে পরিচয় হয় নি। তুই এত ঝামেলা করে বিয়ে করলি কথা বলার সুযোগেই পেলাম না তাই দেখা করতে এসেছি।

-“খুব ভাল করেছো আম এমনিতেও ওকে নিয়ে বাসায় যেতাম।

-“তাত অবশ্যই যাবে তাই বলে আমরা যাব না? জেসমিন বউ মার গয়নাগুলো দাও তো..

লোকটি বলতেই একটা মেয়ে কয়েকটা গয়নার বক্স আদবার দিকে এগিয়ে দিল।সাথে সাথে আদি বলে উঠল,

-‘আরে আংকেল এসবের কি দরকার ছিল? তোমরা দেখা করতে এসেছো এই তো অনেক..

-“তা বললে হয় নাকি আমার একমাত্র ছেলের বউ আমার দায়িত্ব আছে না? বউ মা একটু এদিকে এসো।

লোকটি বলতেই আদি বলল,
-“আদিবা ইনিই আংকেল যার কথা তোকে বলেছিলাম আর সিনথিয়া জেসমিন আমার…বাকি কথা শেষ করার আগেই আদিবা বলে উঠল,

-“বোন তাই তো..?

আদি হেসে জবাব দিল।
-“হুম…

আদিবা ওদের হাই হ্যালো কিছু না বলে হন হন করে উপড়ে যেতে যেতে বলল
-“একটু উপড়ে আসুন তো…

আদিবার আচারনে আদি বিব্রত হল সে বেশ অবাক হয়েই আদিবার কাছে গেল,

-“এসবের মানে কী আদিবা..?

-“প্রশ্ন টা তো আমার করার কথা.. এরা কারা এখানে কী করছে..?

-“কারা মানে..আংকেলের কথা তো আগেই বলেছি আর ওরা আংকেলের মেয়ে…

-“তাদের সাথে আপনার এত ভাব কিসের।

-“আদিবা ওরা আমার বোন..

-“কেমন বোন নিজের বোন? নাকি বিয়ের আগে আমি যেমন ছিলাম তেমন বোন?

আদিবার কথাটা শুনে আদির মুখ কালো হয়ে গেল। আদি প্রচন্ড অবাক হয়ে আদিবার দিকে তাকাল,

-“মানে…?

-“মানেটা আপনি ভাল করেই বুঝেছেন।

-“আদিবা মুখ সামলে কথা বল এই ব্যাপারে কোন রকমের ফা*যলামি আমি সহ্য করব না।

-“আমি ফা*যলামি করছি? নাকি আপনি লুকানোর চেষ্টা করছেন..

-“আজব আমি কি লুকাব? তুই কী বুঝাতে চাইছিস? ওদের সাথে আমার অন্য কোন সম্পর্ক আছে..?

-“অবশ্যই আছে যদি না থাকে এখনী নিচে গিয়ে ওদের বেরয়ে যেতে বলুন…

-“তোর মাথা ঠিক আছে কি বলছিস বুঝতে পারছিস?

-“ভুল বলছি? আপনার যে চরিত্র! দেশে গিয়ে দুদিন থেকেছিলেন তারমধ্যে আমার সাথে যা যা করেছেন এদের সাথে ৬ বছর থেকে কিছু করেন নি কিভাবে বিশ্বাস করি? যাইহোক বিয়ের আগে যা করেছেন এখন আর সেসব সম্ভব না ওদের এক্ষনী বাসা থেকে বের করবেন যান।

আদি আদিবার আচারনে হতবাক হয়ে গেল সে উত্তর দিতে পারল না।

-“এভাবে তাকিয়ে আছেন কেন? ও পারবেন না তাই তো..? ঠিক আছে আমিই যাচ্ছি বলে আদিবা হনহন করে চলে গেল আর আদি নিচে আসার আগেই আদিবার চেঁচানো কন্ঠ কানে আসল,

-“বিয়ের আগে যেসব ফূর্তি করার করেছেন এখন থেকে এসব বন্ধ আদির সাথে আপনারা আর কোন যোগাযোগ রাখবেন না। রাখতে চাইলেও আমি রাখতে দিব না বুঝেছেন? বেরিয়ে যান এখনী…

-“বউমা তুমি এসব কি বলছো? আদি আমার ছেলের মত আর ওরা আদির বোন..

-“সেটা আপনি বিশ্বাস করেন আমি তো করিনা।
বেরিয়ে যান বলছি…

আদিবার বাড়াবাড়ি দেখে আদি তাড়াতাড়ি ছুটে আসল,

-“আদিবা তুই এসব কি করছিস ।আংকেল ওর কথায় কিছু মনে করো না প্লিজ। আদিবা ভিতরে চল…

বলে আদি আদিবার হাত ধরতেই আদিবা চেঁচিয়ে উঠল,

-“আপনি আমাকে ভিতরে না নিয়ে ওদের বেরিয়ে যেতে বলুন।

আদির সমস্ত ধর্য্যের বাঁধ ভাংগল সে আবারও আদিবার গালে থাপ্পড় বসিয়ে দিল।

আদিবা গালে হাত দিয়ে ছল ছল চোখে তাকিয়ে বলল,
-“আপনি বাইরের কারো জন্য আমায় গায়ে হাত তুললেন..?

আদি দাঁতে দাঁত চেপে জবাব দিল
-“ওরা বাইরের কেউ না।

-“তাহলে কী আমি বাইরের?

-“মানে..?

-“আপনি ওদের আর আমার মাঝে কাকে বেঁচে নিবেন হয় ওদের বের করে দিন অথবা আমি নিজে বেরিয়ে যাব..

আদিবার কথা শেষ হতেই লোকটি বলে উঠল,
-“ছি ছি বউমা তুমি এসব কি বলছো? তোমাকে কোথাও যেতে হবে না আমরা এখনী চলে যাচ্ছি তুমি এত রাগ করো না।

বলে ওরা চলে যেতে নিল সাথে সাথে আদি দৃঢ় কন্ঠে বলল,
-” না আংকেল তোমরা কোথাও যাবে না।

আদির কথা শুনে আদিবা আদির দিকে তাকাল সে ভাবতেও পারেনি আদি এমন কিছু বলবে তাই হতবাক হয়ে বলল,

-“আপনি…??

পুরো কথা শেষ হওয়ার আগেই আদি বলল,
-“বাইরে যাওয়ার দরজাটা ওদিকে.. বলে আদি আদিবাকে দরজা দেখিয়ে দিল।

আদিবা আর কিছু না বলে কাঁদতে কাঁদতে দৌড়ে বাইরের দিকে ছুটল।

সাথে সাথেই লোকটি বলল,
-“আদি কি করলে এটা? যাও এখনী বউমা কে ফিরিয়ে আনো…

-“না আংকেল,আমি কোনদিন অন্যায়ের সাথে আপোস করিনি। আজও করব না। চিন্তা করো না নিজের ভুল যখন বুঝতে পারবে তখন নিজে থেকেই ফিরে আসবে…




আদি আদিবার পিছু পিছু গেল না তারা সবাই মিলে অপেক্ষা করছিল আদিবার জন্য। কিন্তু আদিবার ফিরার নাম নেই বেশ কিছুক্ষন কেটে যাওয়ার পর জেসমিল বলল,

-“আদি ভাই আমার মনে হচ্ছে তুমি ভুল করছো তোমার ভাবীর কাছে যাওয়া উচিত…

-” ভুল আমি করেছি নাকি আদিবা করেছে..? আমি এখন ওকে আনতে গেলে ও নিজের ভুলটা কখনই বুঝবে না। ওর উচিত নিজের থেকে নিজের ভুলটা অনুধাবন করা।

-“কিন্তু আমার মনে হয় ভাবী তোমাকে একটু বেশিই ভালবাসে তাই তুমি অন্য কোন মেয়ের প্রতি কেয়ারিং সেটা মানতে পারে নি।

-“তাই বলে অযথা রিয়েক্ট করবে..?

-‘ অতিরিক্ত ভালবাসায় এমন possessiveness দেখা যায়…

-“এটাকে ভালবাসা বলে না। ভালবাসলে ওপর পাশের মানুষটার কথা ভাবতে হয় আদিবা এসেছে থেকে আমাকে একের পর এক প্রেসার দিয়ে যাচ্ছে…

-“একদিনেই ওর উপড় থেকে তোমার মন উঠে গেল?

আদি বিস্ময় চোখে জেসমিনের দিকে তাকাল,

-“ভাইয়া আমি এভাবে বলতে চাইনি কিন্তু তোমার আচারনে সেটাই প্রকাশ পাচ্ছে।

-“না বুঝে ভুলভাল বকবা না। তোমার কোন ধারনা আছে আদিবা এসেছে থেকে কি কি করেছে? আমি অফিস থেকে ওকটু লেইটে ফিরেছি বলে নিজেফ হা*ত কে*টে…

-“কী বলছো এসব? সামান্য অফিসে যাওয়া নিয়ে…

-“হ্যা এবার ভাবো কতটা ছেলমানুষ…

-“সত্যিই ভাবার কথা,একবার ভাবো সামান্য কারনে যে হাত কা-টতে পারে সে তোমার এমন আচারন দেখে কি করবে?

-“মানে..?

-“তুমি অন্য মেয়েদের জন্য তাকে বের করে দিয়েছো এটা কি সে সহ্য করতে পারবে..? সামান্য দেরি করে বাসায় আসায় যে নিজের ক্ষতি করতে পারে সে এত বড় ধাক্কার পর গাড়ির নিচে মা*থা দিবে না তার কি গ্যারান্টি আছে..? দেখা গেল ভাবি নিজের ভুল বুঝার আগেই কোন অঘটন ঘটিয়ে ফেলল।

-“নাহ… বলেই আদি চেঁচিয়ে উঠল।
-‘আমার আদিবার কিছু হতে পারে না।

বলতে বলতে সে বাইরের দিকে ছুটল…



চলবে..!!