#ভালোবাসতে_চাই
#পর্বঃঅন্তিম_পর্ব
#ফারজানা_আক্তার
পানি খেয়ে শিশির বলতে শুরু করলো ” নিবিড় একদিন আমাকে খাবারের সাথে নেশা মিশিয়ে দিয়ে আমার থেকে কিসব কগজে সিগনেচার করিয়ে আমার সেই হোটেল টা নিজের করে নিয়েছে যেটা দেখাশোনার দায়িত্ব ওকে দিয়েছিলাম আমি, আর স্নেহাকে বিয়ে করে নিয়েছে, এটা শুনে যদিও আমি তেমন চমকায়নি, কারণ নিবিড় স্নেহাকে ভালোবাসতো সেটা আমি জানতাম, কিন্তু ওর বেইমানি দেখে সেদিন আমি সত্যিই অনেকটা চমকেছিলাম। কিভাবে পারলো ও এভাবে আমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করতে? ভাবতে গায়ের লোম কাড়া হয়ে যায় আমার। এই ঘটনার পর এই প্রথম কানাডা গিয়েছি আমি শুধু তোমাকে ভালোবাসতে চাই বলে, তোমাকে হারাতে চাইনা বলে।
~আচ্ছা যে হোটেলে আমরা গেছি ওটা নেওয়ার চেষ্টা করেনি?
চোখ বড় বড় করে জিজ্ঞেস করে রিক্তা।
~করেছে অনেক তবে পারেনি, কারণ ওই হোটেলের কাগজপত্র সব আমার কাছে ছিলো।
আর যে হোটেল নিয়ে ফেলেছে ওটার সবকিছু আমি ওকে দিয়েছিলাম বিশ্বাস করে। কিন্তু আমি জানতামই না যে ওর মতো হারামি কারো বিশ্বাসের যোগ্যতা রাখেনা।
শিশিরের চোখ থেকে নিজের অজান্তেই দু’ফোটা জল গড়িয়ে পরে, চোখ এড়ালো না রিক্তার। সে দ্রুত শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখ মুছে দেয় শিশিরের, আর বলে
~আচ্ছা থাক আর মন খারাপ করে থাকবেননা প্লিজ,, আর কখনো কানাডা যাওয়ার জন্য বাহানা করবোনা আমি।
‘
‘
‘
এভাবে কেটে গেলো কয়েকটা মাস, শিশিরের সাথে খুনসুটি, শাশুড়ীকে রান্নায় সাহায্য করা, কয়েকদিন পর পর বাপের বাড়ি যাওয়ার বাহানা। বেশ ভালো ই কাটতে লাগে তাদের দিনগুলো
হঠাৎ এক বসন্ত সকালে শিশির ঘুম থেকে উঠে দেখে রিক্তা পাশে নেই, বেলকনি থেকে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্নার শব্দ আসতেছে। শিশির দ্রুত উঠে রিক্তার কাছে গিয়ে জড়িয়ে ধরে আদুরে সুরে জানতে চাইলো কি হয়েছে। রিক্তা তার উত্তর না দিয়ে আরো জোরে জোরে কাঁদতে লাগে।
শিশির বেশ চিন্তায় পরে গেলো, কি হলো হঠাৎ। আমি তো কাঁন্না করার মতো করিনি বা বলিনি।
~আরে কি হয়েছে বলবে তো।
কি আজব।।।
বিরক্তিকর কন্ঠে বলে শিশির।
~আমার পরে যাদের বিয়ে হয়েছে তারা সবাই প্রেগন্যান্ট হয়েছে, তবে আমি কেন….
এটা বলতে বলতে আরো জোরে কান্না জুড়ে দিলো রিক্তা। এবার কিন্তু বেশ রাগ হচ্ছে শিশিরের।
~কে বলেছে তোমাকে সকাল সকাল এই অদ্ভুত কথা? আল্লাহ যখন চাইবে তখন আমাদেরও হবে। হাতে ফোন কেন? কার সাথে কথা বলেছো এতক্ষণ?
দাঁত কটমট করতে করতে বলে শিশির।
ভরকে যায় রিক্তা।
~আ আসলে আমি রু রু রু….
~কি রু রু রু করছো? কি বলবে স্পষ্ট বলো
নিজের বুক থেকে রিক্তার মাথাটা সরিয়ে বলে শিশির।
~রুপা বলেছে
ছোট্ট বাচ্চাদের মতো ঠোঁট উল্টিয়ে বলে রিক্তা।
~কী পুঁচকে রুপার কথায় তুমি এভাবে কান্না করছো?
কপাল ভাজ করে কোমরে হাত দিয়ে বলল শিশির।
~নাহ, ওর কথায় আমি কাঁদবো কেন?
নাক টেনে টেনে বলে রিক্তা।
~তো?
~আমি ওকে জিজ্ঞেস করেছি নিপা, উর্মি, হৃদিকা প্রেগন্যান্ট কিনা। রুপা বলল ওরা কেউ চারমাসের, কেউ তিন মাসের প্রেগন্যান্ট।
~এরা কে কারা।
ভ্রু কুঁচকে বলে শিশির।
~আমাদের বাড়ির পাশের, আমার পরে বিয়ে হয়েছিলো, আপনি চিনবেননা।। আর আমার বিয়ের এখন ৯মাস রানিং, আমি এখনো মা হতে পারছিনা
আবারো ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে রিক্তা।
বেশ বিরক্ত হচ্ছে শিশির। শিশির ওয়াশরুমে চলে যায় গটগট করে। রাগ হচ্ছে খুব। গাধিটাকে বুঝাবো কি করে?
‘
‘
‘
শাশুড়ির সাথে নাস্তা বানাচ্ছে রিক্তা মন মরা হয়ে, তো আফিয়া বেগম ওর মন মরা দেখে কি হয়েছে জিজ্ঞেস করতেই শাশুড়ী কে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করে দেয় রিক্তা।
পরে অনেক চেষ্টা করে তিনি শান্ত করে রিক্তাকে, তারপর রিক্তা সব খুলে বলে আফিয়া বেগমকে। সকাল থেকে কাঁদতে কাঁদতে অবস্থা খারাপ করে ফেলেছে রিক্তা। নাকটা টমেটোর মতো লাল হয়ে আছে ওর। আফিয়া বেগমের খুব হাসি পেলেও রিক্তার সামনে হাসলেননা তিনি।
‘
‘
‘
ডাইনিংয়ে সবাই বসে নাস্তা করছে। রিক্তা এখনো মনমরা হয়ে আছে, আঁড়চোখে তাকাচ্ছে শিশির বারবার রিক্তার দিকে। আফিয়া বেগম চুপিচুপি মুখ লুকিয়ে হাসছেন, কুটকুট করে হাসতে পারছেনা বলে পেট ব্যাথা করছে উনার। দেখে ফেলে তারেক ইসলাম।
~এই যে গিন্নি এভাবে চুপিচুপি হাসছো কেন? কি ব্যাপার?
~ক কই হাসছি আমি, মোটেও হাসছিনা আমি।
আমতাআমতা করে বলেন আফিয়া বেগম।
শিশিরের সন্দেহ হয়, সে রিক্তার দিকে আগুনের দৃষ্টিতে তাকায়, কিন্তু বাবা মায়ের সামনে কিছু বলেনা।
‘
‘
‘
শিশির তৈরি হচ্ছে অফিস যাওয়ার জন্য, রিক্তা বসে বসে ছোট বাচ্চার মতো চকলেট খাচ্ছে। শিশির ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে
~কয়েকদিন ধরে কি হয়েছে তোমার, যখন তখন ছাগলের মতো চকলেট চিবাও ক্যান?
ভেংচি কাটে রিক্তা। শিশির আর কিছু বলেনা, যাওয়ার সময় রিক্তার কপালে একটা চুমু দিয়ে চলে যায়।
‘
‘
‘
হসপিটালে বসে আছে রিক্তা আর আফিয়া বেগম রিক্তার রিপোর্টের জন্য। কিছুক্ষণ পর ডাক্তার নাসরিন চৌধুরী ডাকলেন তাদের কে কেবিনে। রিপোর্ট পজিটিভ শুনে রিক্তা হা হয়ে আছে, আফিয়া বেগম বেশ খুশি হলেন।
ডাক্তার রিক্তাকে উদ্দেশ্য করে বলল
~ আপনি দেড়মাসের প্রেগন্যান্ট।
~তবে আমার বমি হয়না ক্যান? মাথা ঘুরাইনা ক্যান?
বোকার মতো ফেস করে জিজ্ঞেস করে রিক্তা।
হেসে দিলেন আফিয়া বেগম আর ডাক্তার নাসরিন চৌধুরী।
বেশ লজ্জা পেয়েছে রিক্তা।
ডাক্তার বলল “এসব সবার হয়না, আপনি সুস্থ আছেন ম্যাডাম।
বাসায় এসেই ড্রয়িং রুমে পায়চারি করতে লাগে রিক্তা। আফিয়া বেগম পানি খেয়ে জিজ্ঞেস করে ” কি হয়েছে তোমার? এভাবে পায়চারি করছো কেন?
~আমার বমি হচ্ছে না ক্যান? ডাক্তার কে বলেন আমায় বমি হওয়ার ঔষুধ দেওয়ার জন্য।
আফিয়া বেগম এবার আর না পেরে কল দেয় শিশিরকে। আর সব খুলে বলে। শিশির বাবা হওয়ার খুশি ফিল করবে নাকি রিক্তার পাগলামি বন্ধ করার ব্যাবস্থা করবে বুঝতে পারছেনা।
শিশির দ্রুত ড্রাইভ করে বাসায় চলে আসে বিকাল ৪টাই।
এসে দেখে পুরো রুম জুড়ে চকলেটের চিলকা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। রিক্তা খাটের এক কোণে বসে বসে চকলেট খাচ্ছে। কি আজব? প্রেগন্যান্ট হলে মানুষ খায় তেঁতুল আর এই আজব প্রাণী খাচ্ছে চকলেট। সবকিছু এড়িয়ে শিশির দৌড়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরে রিক্তা কে।
রিক্তার পেটে হাত বুলিয়ে একটা চুমু দিয়ে ফ্রেশ হতে চলে যায় শিশির। রিক্তা কোনো রেসস্পন্স না করে চকলেট খেতেই আছে।
রাতে ঘুমানোর সময় রিক্তা শিশির কে আমতাআমতা করে বলে “আমাকে বমি হওয়ার ঔষুধ এনে দিন।
শিশিরের চোখ কপালে উঠে যায়, এই মেয়ে পাগল নাকি? সবাই চাই সুস্থ হতে আর এই মেয়ে চাই অসুস্থ হতে। কি আজব।
মাথায় হাত দিয়ে নিজে নিজে বলে শিশির।
‘
‘
‘
কয়েকমাস পরেই রিক্তা টুইন বেবির মা হয়, দুটোই মেয়ে হয়েছে তার। খুশির ঠেলায় রিক্তা শিশিরকেও ভুলে গেছে।
শিশির ধীরে ধীরে কেবিনে আসে, শিশিরের অবস্থা খুবই খারাপ হয়ে গেছিলো রিক্তার কষ্ট দেখে, কিন্তু কেবিনে এসে রিক্তার হাসিমুখ দেখতেই শিশিরের মুখেও হাসি ফোটে। বাচ্চা দু’টো দোলনায় দুলছে। শিশির বাচ্চা দু’টোকে আদর করে রিক্তার দিকে তাকায়, রিক্তা হঠাৎ লজ্জা পায়, শিশির বুঝতে পারেনা গাধিটা কেন লজ্জা পেলো এই মুহুর্তে। শিশির রিক্তার পাশে গিয়ে বসে, চুমু দেয় রিক্তার কপালে। চেখ বুঁজে নেই রিক্তা।
এটাকেই হয়তো মেয়ে মানুষ মানে মা বলে, এতো কষ্টের পরেও রিক্তার মুখে হাসির রেখা। রিক্তাকে দেখে মনেই হচ্ছে না যে একটু আগে তার অনেক বড় অপারেশন হয়েছে। দিব্যি হেসে যাচ্ছে রিক্তা।
এই কারণেই শুধু তোমাকেই ভালোবাসতে চাই এই হিয়া মন।
~কেনো?
মুচকি হেসে জিজ্ঞেস করে রিক্তা।
শিশির স্পষ্ট সুরে একটু জোরেই বলে ” এই একসাথে দু দু’টো বেবির আব্বু বানিয়ে দিলে, এটা শুধু তোমার ধারায় সম্ভব তাই শুধু তুমি নামক পাগলিটাকেই ভালোবাসতে চাই আমি নামক পাগলটা।।।
~আস্তে আস্তে বলুন টুইনবেবির আব্বু, শুনে ফেলবে সবাই।
~শুনলে শুনুক।
রিক্তা লজ্জায় কুটিকুটি হয়ে যাচ্ছে শিশিরের এসব পাগলামি দেইখে।
#সমাপ্ত
#হ্যাপি_রিডিং