ভালোবাসার উল্টো পিঠে পর্ব-১১

0
524

#ভালোবাসার_উল্টো_পিঠে
#এগারো
প্রজ্ঞা জামান দৃঢ়তা

মাহিদের আচরণ দিনদিন রিদ্ধিকে ভাবাচ্ছে। তার কেবলই মনে হচ্ছে কোথাও কিছু একটা ঠিক নেই। কিন্তু সে না ঠিক হওয়াটা কী সেটাই তার মাথায় আসছে না।

মাঝে মাঝে তার মনে হয় মাহিদের দেহে দুটো চরিত্রের বাস। একজন রাগী, জেদি তো অন্যজন যথেষ্ট শান্ত।

অনেক রকম চিন্তা মাথায় আসলেও সে তাকে জায়গা দিতে চায় না। মনে হয় অফিসের চাপে এমন হচ্ছে। ধীরে ধীরে সব ঠিক হয়ে যাবে।

অথচ বোকা মেয়েটা কী জানে জীবনে কোনোকিছুই এভাবে ঠিক হয় না। বরং আমাদের মেনে নেয়া, আর মানিয়ে নেয়ার পরিমাণ বেড়ে যায়।

সেদিন সকালে মাহিদ তাকে বাবার বাসায় নামিয়ে দিয়ে গেছে। সে চায়নি তাও অনেক বুঝিয়ে রাজি করিয়েছে। কিন্তু এ বাসায় আসছে আজ তিনদিন তাও কিছুতেই টাকার বিষয়টা কাউকে বলতে পারছে না। সে জানে আর পারবেও না। রিদ্ধিমা হায়দারের আর কিছু থাক না থাক আত্মসম্মানবোধ অনেক বেশি। মাহিদ যেভাবেই বলুক সে কিছুতেই নিজেকে আর মাহিদকে ছোট করবে না।

আজ দুপুরে ফুফুরা এসেছে। রিদ্ধিকে দেখে অনেক কথা শুনিয়েছেন। সে চুপ করে শুনে গেছে। এত বড় অন্যায়ের পর এমন কথা তো শুনতেই হবে।

সে ঠিক করেছে বিকেলেই ফিরে যাবে। এখানে বসে মাহিদের নামে নিন্দে শুনতে পারবে না। খাবার শেষে বাবার কাছে বসবে বলে তার রুমের দিকে এগুতেই রিদ্ধি শুনল ফুফু বাবাকে বলছেন, “এই মেয়েকে বাড়িতে কেন জায়গা দিয়েছেন ভাইজান? আমি হলে এমন মেয়ের মুখ অবধি দেখতাম না।”

রিদ্ধি ভেবেছিল বাবা অন্তত তার হয়ে কিছু বলবে। কিন্তু তেমন কিছুই হলো না। বরং তিনি বললেন, “কাউকে তো বাড়ি থেকে ধাক্কা দিয়ে বের করে দেয়া যায় না।”

বাবা কথা শেষ করে বই পড়ায় মন দিয়েছেন। ফুফু আরও অনেক কথা বলেই যাচ্ছেন। তার কষ্ট ফুফুর কথায় না। সে জানে ফুফু এমনই। কিন্তু বাবা এমন কথা বলতে পারেন সেটা যেন সে ভাবতেই পারেনি। জীবন আমাদের এমন অনেক পরিস্থিতির সম্মুখীন করে যার মোকাবিলা করা অসম্ভব। সে ভাবতো বাবা রাগ করে আছেন। বাবার রাগ সে ভাঙাতেও পারত। কিন্তু এখন তো মনে হচ্ছে তিনি চান না আমি এ বাড়িতে আসি।

আজ যেন সে একেবারে ভেঙে পড়ল। জীবনে সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ যে মানুষটি তিনি হচ্ছেন বাবা। আজ তার এমন একটা কথাও তাকে ভেতর থেকে ভেঙে টুকরো টুকরো করে দিয়েছে। তার মনে হলো সে হাঁটতে পারছে না। শরীরের প্রতিটি রন্ধ্রে রন্ধ্রে তীব্র যন্ত্রণা শুরু হয়েছে।

কোনোরকম নিজের রুমে গিয়ে দরজা আটকে কান্না করল। বিকেল হওয়ার অপেক্ষা করছে। আজ এ বাড়ি থেকে সে চলে যাবে। যদি বাবা কোনোদিন তাকে ডাকে তবেই সে আসবে নয়তো না। তার যদি সবাইকে দেখতে ইচ্ছে হয় লুকিয়ে দেখবে তাও এখানে আসবে না।

★★★

সত্যি সত্যি এক বুক অভিমান নিয়ে রিদ্ধি বেরিয়ে পড়ল। রাইয়ানকে জড়িয়ে ধরে অনেকক্ষণ কাঁদল।

আকাশ কালো হয়ে এসেছে। যেন এখনই সন্ধ্যা নেমেছে। কাল বৈশাখীর ঝড়ের মতো বাতাস শুরু হয়েছে। তার বাসায় ঢুকতে একটা গলি পার হতে হয়। সে গলির সামনে রিক্সা থেকে নেমে হাঁটছে। আজ মিনিট তিনেকের রাস্তাকেও তিন হাজার মাইলের বলে মনে হচ্ছে।

কেবলই মনে হচ্ছে প্রকৃতি আজ তার মতোই অশান্ত। দুঃখে জর্জরিত। এমন সময় জরিনা বাসায় থাকবে না। আর মাহিদও অফিসে তাই ব্যাগ থেকে চাবি বের করে বাসায় ঢুকলো। মনে মনে ভাবল আজ জরিনা ড্রয়িংরুমের বাতি বন্ধ করতে ভুলে গেছে। তারপর দেখল টেবিলে খাবার ছড়িয়ে আছে। অবাক হলো সে। জরিনা কী অসুস্থ! এমন অগোছালো তো সে না। সবকিছু এলোমেলো কেন আজ! মেয়েটার শরীর খারাপ করল না তো। সাথে সাথে ব্যাগ থেকে ফোন বের করে তার নম্বরে ডায়েল করতে করতে বেডরুমের দিকে এগিয়ে যেতেই থমকে দাঁড়াল। মনে হলো কারো গলার আওয়াজ আসছে। এখন বাসায় কে থাকবে!

রুমের দরজা বেজানো ছিল। তাই ভেতরের কথা স্পষ্ট এদিকে আসছে।

“তুমি আর কতদিন এই মেয়েকে সহ্য করবে মাহিদ?”

“আর অল্প ক’টা দিন রিতি। দেখো টাকাটা আমার খুব দরকার। আমাদের সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য একটু অপেক্ষা করো সুইটহার্ট।”

রিদ্ধির পায়ের নিচ থেকে যেন জমিন সরে গেছে। নিজের কানকেই বিশ্বাস করতে পারছে না। মনে হচ্ছে কেউ গরম শিষা ঢেলে দিয়েছে।

“তা না হয় করলাম। কিন্তু এই মেয়ে তোমার সন্তানের মা হচ্ছে এ আমি মেনে নিতে পারছি না।”

“দেখো আমি তো বলেছিলাম কিছু একটা করে মিস ক্যারেজ করে দিতে। তুমিই তো দিচ্ছো না।”

“আমি তোমার ভালোর জন্য বলেছি। সেদিন যদি আমি ফোনে তোমায় না বলতাম তবে এতক্ষণে ও-ই বোকা মেয়েটা তোমার কথা মতো বাবার বাড়ি টাকার জন্য যেত না।”

“সে জন্যই তো আমি তোমায় এত ভালোবাসি।”

“আমাদের কাজ শেষ হলে একে বিদায় করবে কীভাবে?”

“সাহিলের সাথে তোমার এডিট করা ছবিগুলো এখনো আমার কাছে আছে। কাজ শেষে এগুলোকে ইস্যু বানিয়ে বিদায় করে দেব। বলব এমন চরিত্রহীন মেয়েকে আমি চাই না, সিম্পল।”

রিদ্ধি আর নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারল না। সে ভেতরে চলে আসলো। বিছানায় অন্য মেয়ের অন্তরঙ্গ অবস্থায় সেই মানুষটা যার জন্য বাবা-মাকে কষ্ট দিয়ে নিজের আয়েসি জীবন ছেড়ে এসেছিল।

চিৎকার করে বলল, “তোমাদের আশা কোনোদিন পূরণ হবে না। ছি! মিস্টার মাহিদ এতটা নিচে নেমে গেছেন আপনি? শুধুমাত্র টাকার জন্য এত ভালো অভিনয় কীভাবে করতে পেরেছিলেন? আমার বিশ্বাসকে গলা টিপে হত্যা করতে এতটুকু খারাপ লাগেনি আপনার?”

হঠাৎ রিদ্ধির আগমনে তারা দুজন অবাক হয়ে গেছে। কিছুক্ষণ চেয়ে রইল। কিছু বলতে পারল না। মাহিদ বিছানা থেকে ওঠে এসে তার সামনে দাঁড়িয়ে বলল, “প্লিজ রিদ্ধি শোনো। তুমি ভুল বুঝছো।”

“ভুল? একই বিছানায় অন্য মেয়ের সাথে দেখার পর সব প্ল্যান শোনার পরও বলছেন এসব ভুল?”

মাহিদ যেন কিছু বলতে গিয়ে থমকে গেল।

রিদ্ধি মুখে হাত দিয়ে কাঁদতে কাঁদতে লাগল। রিতি মাহিদকে কি যেন ইশারা করল। মাহিদ বুঝে ড্রয়ার থেকে ছুরি নিয়ে রিদ্ধির দিকে এগুতে লাগল। এমন সময় জরিনা চিৎকার দিয়ে ওঠল। তার চিৎকারে রিদ্ধি সামনের দিকে তাকিয়ে দেখল মাহিদ তার দিকে ছুরি নিয়ে এগিয়ে আসছে। রিদ্ধি পেছনে সরে আসল।

রিতি বলল, “তাড়াতাড়ি মাহিদ।”

মাহিদ যেই রিদ্ধির দিকে এগিয়ে আসল তখনই জরিনা ফুলের টব মাহিদের দিকে ছুড়ে মারল। টবটা সোজা মাহিদের কপালে গিয়ে লাগল। কপাল কেটে রক্ত বের হতে লাগল। মাহিদের হাত থেকে ছুরি পড়ে গেল। সে মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ল।

রিতি তারপরও বলল, “মাহিদ পালিয়ে যাচ্ছে ধরো ওদের।”

জরিনা ততক্ষণে রিদ্ধিকে টেনে ধরে দৌঁড়াতে লাগল। কিন্তু রিতি জরিনাকে ধরে ফেলল৷ জরিনা জানে এরা তার কিছু করবে না। তাই সে রিদ্ধিকে চলে যেতে বলল। রিদ্ধি যেতে চাইল না। কিন্তু জরিনা তার সন্তানের কসম দেয়ার সে বের হতে বাধ্য হলো। বাইরে মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে। সন্ধ্যাও গভীর রাত বলে মনে হচ্ছে। পেছনে না তাকিয়ে সে দৌঁড়াতে লাগল। কারো জন্য নয় তার ভেতরে যে আছে তার জন্য। তাকে যে বাঁচাতেই হবে।

জরিনা রিতিকে ছাড়িয়ে যখন রাস্তায় আসল তখন কোথাও রিদ্ধিকে দেখতে পেল না। অনেক খুঁজেও পেল না। সে রাস্তায় বসে পাগলের মতো আহাজারি করতে লাগল। তখন তাকে কল দিয়ে রিদ্ধি কাটতে ভুলে গিয়েছিল। তাই তো সে সব শুনে চলে এসেছে। নয়তো আজ এই অমানুষরা তাকে মেরে ফেলত। কিন্তু এখন কোথায় গেল সে! কার কাছে গেল!

জরিনা বারবার আল্লাহর কাছে বলল, “আল্লাহ আপনিই একমাত্র রক্ষক। রক্ষা করুক এমন ভালো মেয়েটাকে। এই জালিমদের হাত থেকে রক্ষা করুন।”

জরিনার আহাজারিতে সন্ধ্যার ভারি আকাশ যেন আরও ভারি হয়ে ওঠল। যেন রিদ্ধির যন্ত্রণা প্রকৃতিরও। তাই তো অশ্রু হয়ে ঝরতে লাগল। এমন একটা অন্ধকার সন্ধ্যা কোনোদিন ভুলা যাবে না।

চলবে