ভালোবাসার উল্টো পিঠে পর্ব-১৫+১৬

0
543

#ভালোবাসার_উল্টো_পিঠে
#পনেরো
প্রজ্ঞা জামান দৃঢ়তা

বাসায় আসার পর রিদ্ধির শরীর খুব খারাপ হয়ে গেল। বমি করে অস্থির হয়ে পড়ল। নাফিজা অনেক চেষ্টা করেও এতটুকু খাওয়াতে পারল না। কিন্তু এই সময় খাওয়াটা যে কতটা জরুরি সেটা নাফিজা তাকে বুঝাতেই পারছে না।

রিদ্ধির পুরো শরীর অবশ হয়ে আসছিল। সে কোনোরকম এসে বিছানায় শুয়ে পড়ল। দূর্বল শরীর বিছানায় পড়েই ঘুমে চোখ জুড়িয়ে এলো। নাফিজার কাছে কে যেন কল করে রিদ্ধির কথা জিজ্ঞেস করল।

খায়নি শুনে অকারণে মেয়েটাকে অনেক কথা শুনতে হলো। কিন্তু কিছুই করার নেই। সে জানে রিদ্ধিমা হায়দার কতটা অমূল্য তার স্যারের কাছে।

নাফিজা অনেকক্ষণ চুপ করে ঘুমানো রিদ্ধিমাকে দেখছে। তার কেন যেন খুব মায়া হয় মেয়েটার জন্য। আর এই যে এখন ঘুমিয়ে আছে তাতে আরও মায়াবী আর অসহায় লাগছে। পৃথিবীতে কিছু মানুষ অসম্ভব রকম সৌভাগ্য নিয়ে জন্মায়। এই মেয়েটিকে ঠিক সে কাতারে ফেলবে কিনা বুঝতে পারছে না। কারণ এই মেয়েটার একটা সুন্দর পরিবার আছে তাদের সবাইকে ছেড়ে সম্পূর্ণ একা এখানে থাকতে হচ্ছে। কিন্তু অন্যদিকে এমন কেউ আছে যার পুরো প্রাণটাই সে।

★★★

চার মাস পর।

মাহিদের গলা জড়িয়ে রিতি দাঁড়িয়ে আছে। মাহিদ এতে খুব বিরক্ত। আজকাল কোনোকিছুই তার ভালো লাগছে না। এমনকি রিতিকেও না। সারাক্ষণ রিদ্ধিমার কথা মনে পড়ে। কীভাবে তাকে খুঁজে পাওয়া যাবে তাই ভাবে। এতগুলো দিন অনেক চেষ্টা করেও তার হদিস পাওয়া যায়নি। বাবার বাসায়ও যায়নি তাহলে কার কাছে থাকতে পারে? অনেক ভেবেও এমন কোনো মানুষ পায় না। তার মানে কি আত্মহত্যা করল! এমন নানা চিন্তায় তার দিন পেরিয়ে রাত আসে। অবশেষে ভেবে একটা বুদ্ধি বের করল। ভাবল কালই এটা করতে হবে।

★★★

সকাল বেলা শাহনেওয়াজ খবরের পাতা খুলে অবাক হয়ে যায়। খবরের প্রথম পাতায় রিদ্ধিমার ছবি ছাপানো হয়েছে। তার চেয়ে বেশি অবাক হয় তার সম্পর্কে দেয়া লেখাগুলো দেখে। এখানে স্পষ্ট করে লেখা আছে। স্বামীর টাকা-পয়সা মূল্যবান জিনিস নিয়ে উধাও রিদ্ধিমা হায়দার। গোপন সূত্রে জানা গেছে কোনো পুরনো প্রেমিকের হাত ধরে চলে গেছে সে।

রাগে ক্ষোভে কাগজ টুকরো টুকরো করে ফেলল শাহানেওয়াজ। সাথে সাথে পত্রিকা অফিসে কল দিয়ে এই খবরের কাগজ যেন কোনোভাবে পাবলিক না হয় তার ব্যবস্থা করতে। কিন্তু তারা জানায় পত্রিকা অনেক জায়গায় চলে গেছে। তারা শুধু এইটুকুই করতে পারে যে, তাদের কাছে যা আছে তা তারা আর পাবলিক করবে না।

রাগে মাথা ভনভন করছে শাহনেওয়াজের। রিদ্ধি এটা জানতে পারলে আরও ভেঙে পড়বে। তাড়াতাড়ি করে নাফিজাকে কল দিল। যাতে আজকের পত্রিকা রিদ্ধিমার হাতে না পড়ে।

নাফিজা ফোন রেখে তাড়াতাড়ি করে রিদ্ধির কাছে গিয়ে দেখে রিদ্ধি পাগলামি মতো কাঁদছে। নাফিজার আর বাকি রইল না বুঝতে কী হয়েছে। নিশ্চয়ই খবরটা পড়ে ফেলেছে সে।

এই প্রথম নাফিজাকে নাম ধরে ডেকে ভেজা গলায় বলল, “দেখেছো নাফিজা? যার জন্য সব ছাড়লাম সে আমাকে এখানে এনে দাঁড়িয়েছি। নিজের আপনজন, পরিবারের সামনে তাকে ছোট করব না বলে আজ আমি বনবাসী হলাম। দেখো সে আমার নিখোঁজ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে কিসব লিখেছে। নাফিজা অনেক চেষ্টা করেও যখন রিদ্ধিকে সামলাতে পারল না তখন শাহনেওয়াজকে কল দিয়ে জানাল। অনেক ভেবে সে গাড়ি নিয়ে বের হয়ে গেল।

বাসায় এসে সোজা রিদ্ধির রুমে চলে আসে। ফ্লোরে রিদ্ধির সামনে বসে যায়। তাদের মাঝখানে অনেকখানি দূরত্ব।

” মিসঃ রিদ্ধিমা?”

রিদ্ধি চমকে সামনে তাকায়। গলাটা সে চেনে। আগে অনেকবার শুনেছে।

সামনে তাকিয়ে দেখল। একজন লোক তার সামনে বসে আছে। কালো শার্ট পরা, হাতা কনুই পর্যন্ত গুটানো। মুখে খোঁচা-খোঁচা কয়েকদিনের অবহেলার দাড়ি। ফার্স্ট ইমপ্রেশনে একটা শব্দই মাথায় আসে। ‘ডিসেন্ট’।

রিদ্ধি কাঁপা-কাঁপা গলায় বলল, “শাহানেওয়াজ শেখ?”

সামনে থাকা মানুষটা অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল। কোনোদিন দেখেনি। আর দেখলেও পরিচয় জানতো না। কিন্তু এক মুহূর্তে কীভাবে চিনে ফেলেছে!

শাহানেওয়াজ অস্ফুটস্বরে বলল, ” কানেকশন!”

রিদ্ধির যেন এক মুহূর্তে হুস ফিরে এলো। সে আরও দূরে সরে গিয়ে বলল, “আপনি কে? এখানে কী চাই?”

“দেখুন রিদ্ধিমা আপনি যা ভাবছেন তাই। আমিই শাহানেওয়াজ শেখ। সবটা শোনার আগে আপনার একটু ফ্রেশ হয়ে নেয়া দরকার। এভাবে কাঁদলে আপনার মাঝে যে বেড়ে ওঠছে তার ক্ষতি হবে।”

রিদ্ধি ঝাঁঝিয়ে উঠে বলল, “আপনি কে আমাকে নিয়ে ভাবার। আমি কোনো রাইট আপনাকে দেইনি। এখান থেকে আমি আজই চলে যাব।”

রিদ্ধি ওঠে বাইরে যেতে লাগলে শাহানেওয়াজ তাকে ধমক দিয়ে সামনে গিয়ে দাঁড়ায়।

“খবরদার এখান থেকে এক পা বাইরে দেবেন। পা ভেঙে ঘরে বসিয়ে রাখব। আপনি কী ভেবেছেন আমি আপনার বাবার মতো আপনাকে শাসন করব না? একজন আর্মি অফিসারের মেয়ে হয়েও আপনি এত অবাধ্য কি করে তাই আমি ভাবছি। শুনেছি আপনার বাবার অনেক দাপট কিন্তু এখন দেখছি রিটায়ার্ড হয়ে সে দাপট নিশ্চয়ই কমে গেছে। নয়তো আপনি এতদিনে সোজা হয়ে যেতেন।”

রিদ্ধিমা এত অবাক জীবনে হয়নি। অবশ্য অবাক হওয়ারই বা কী আছে। এই ছেলে যে তার সব খবর রাখে সে তো জানেই। তাও এতটা আশা করেনি।

অনেক কিছু বলতে চেয়েও সে কিছুই বলতে পারল না। লোকটার চেহেরায় এমন কিছু ছিল যা তাকে আর কিছু বলার সুযোগই দেয়নি। রাগে-দুঃখে কান্না দলা পাকিয়ে আসল। নাফিজা তাকে অবাক হয়ে সব দেখছে। যে মানুষটার ড্রেস, খাবার, প্রতিটি বিষয়ের জন্য হাজারটা মানুষ থাকে। সে আজ একটা মেয়ের জন্য নিচে বসে পড়ল। আর এই রাগ! এটা কিছুতেই রাগ হতে পারে না। এটা ভালোবাসা! হ্যাঁ তাই তো। ভালোবাসা নয়তো কি হতে পারে! এই মেয়েটা অনেক বোকা যা বুঝতে পারছে না।

শাহানেওয়াজ তাকে ইশারায় রিদ্ধিকে পানি দিতে বলে চলে গেল। এখন এই মেয়ের সাথে কথা বলা বোকামি ছাড়া আর কিছু নয় এটা সে জানে।

রিদ্ধির শরীর আগে থেকে অনেকটা ভারি হয়ে ওঠেছে। মা হওয়ার সময় মনে হয় মেয়েদের উপর ঐশ্বরিক কোনো সৌন্দর্য নেমে আসে। নয়তো রিদ্ধিকে এত মায়া লাগছে কেন!

চলবে।

#ভালোবাসার_উল্টো_পিঠে
#ষোলো
প্রজ্ঞা জামান দৃঢ়তা

নাফিজা অনেক চেষ্টা করেও রিদ্ধিকে খাওয়াতে পারছে না। এই অবস্থায় যে নিজের যত্ন নেয়া কতটা জরুরি তাকে সেটা বুঝাবে কে! দু’দিন ধরে রুমে দরজা দিয়ে বসে থাকে। অনেক বলার পর দরজা খুলে।

নাফিজা বিরক্ত হয়ে শাহানেওয়াজকে কল দিল।

“উনি কিছু খেতে চাচ্ছে না।”

আচ্ছা ঠিক আছে বলে শাহানেওয়াজ কল কেটে দিল।

রিদ্ধিমা তার রুমে বসে আছে। এমন সময় তার ফোন বেজে উঠল। ডক্টর হুমায়রা কল দিয়েছেন।

ফোন রিসিভ করতেই জানালেন৷ আজকে তাদের সেশন আছে। তিনি রিদ্ধির জন্য অপেক্ষা করছেন।

রিদ্ধি উঠে ফ্রেশ হয়ে নিল। এখন এভাবে মুখ না ডেকে বাইরে যাওয়া তার জন্য বিপজ্জনক। পত্রিকায় ছবি ছাপা মানে সারাদেশে ছড়িয়ে পড়া। তাই ভাবল যদি একটা বোরখা থাকত ভালো হত। ছোট বেলা থেকে সে কখনো বোরখা পরেনি। তাই থাকার কথাও নয়। ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়াতেই ডক্টর হুমায়রার দেয়া গিফটের প্যাকেটটা চোখে পড়ল।

সেটা খুলতেই চোখ কপালে উঠে গেল। ভাবল তার সাথে এসব কী হচ্ছে! সে যা চাচ্ছে তা কীভাবে পেয়ে যাচ্ছে!

প্যাকেটটায় বোরখা রাখা আছে। সেটা খুলে উল্টে-পাল্টে দেখে পরল। তারপর নিকাব বেঁধে নিজেকে আয়নায় দেখে চমকে গেল! একদম চেনা যাচ্ছে না। কী অবাক কান্ড!

সে ভাবল সারাজীবন আমি নিজেকে খোলা বইয়ের মতো রেখেছি। কিন্তু আজ এই অবস্থায় নিজেকে দেখে খুব হাসি পাচ্ছে। চোরের মতো থাকতে হবে। চাইলেও আগের স্বাধীন, স্বাভাবিক জীবন পাওয়া যাবে না। এটাই হয়তো ভাগ্য।

এই পৃথিবীতে ‘সময়’ বোধহয় সব থেকে বেশি প্রতিশোধ পরায়ন। নয়তো একজন রাজকন্যাকে কীভাবে কারো দয়ার পাত্রী বানিয়ে দেয়! কীভাবে সব আপন মানুষকে দূরে সরিয়ে দেয়!

একটা জীবন। একটা গল্প। কিন্তু তার মধ্যে চরিত্রের এত আধিক্য কেন? কিছু প্রশ্নের জবাব কী কখনো মেলে! কিছু যন্ত্রণার অবসান কী কখনো হয়!

নানা ভাবনায় বের হয়ে এলো। ডক্টর হুমায়রার হাসপাতালে এসে দেখে তিনি গেটে তার জন্য অপেক্ষা করছে।
রিদ্ধিকে দেখে বলল,”আসসালামু আলাইকুম।”

“ওয়ালাইকুম আসসালাম। আপনি বাইরে দাঁড়িয়ে কেন?”

“কারণ আজ কোনো সেশন নয়। তোমায় এক জায়গায় নিয়ে যাব।”

রিদ্ধি কোথায় যাবে তা নিয়ে কোনো প্রশ্ন করল না। হয়তো সবকিছুতে তার আগ্রহ দিনদিন শেষ হয়ে যাচ্ছে।

গাড়িতে বসে ডক্টর বললেন, “রিদ্ধিমা, আপনার শরীর ভালো?”

“জি, ডক্টর।”

হুমায়রা খেয়াল করে দেখলেন রিদ্ধির মন খুব খারাপ। জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে।

তিনি বললেন, “রিদ্ধিমা আপনাকে আজ বেশ সুন্দর লাগছে।”

রিদ্ধিমা তাচ্ছিল্যের সুরে বলল, “ওহ! রিয়েলি? এভাবে চোরের মতো চললে বুঝি সুন্দর লাগে ডক্টর?”

ডক্টর বুঝতে পারলেন আজ মেয়েটার মন বিক্ষিপ্ত, বিক্ষুব্ধ। তাই তিনি মুখে কিছু বললেন না। শুধু হাসলেন।

তিনি ভাবলেন, “আজ আপনার এই লেবাসের জন্য মন খারাপ হচ্ছে রিদ্ধিমা। এমন একদিন আসবে যখন আপনার এই ড্রেস-আপের জন্য গর্ব হবে।”

★★★

ডক্টর হুমায়রা রিদ্ধিকে নিয়ে একটা বাড়িতে এলেন। দোতলা বাড়ি। চারপাশে দেয়াল দিয়ে ঘেরা। রিদ্ধি তার পিছু পিছু এগুচ্ছে।

“আমরা এখানে কেন এসেছি ডক্টর?”

ডক্টর হুমায়রা হেসে বললেন, “এখানে এসেছি কারণ, তোমার সাথে ডক্টর হয়ে কথা বলতে ইচ্ছে করে না। আমি এখানে প্রতি বৃহস্পতিবার আসি। ভাবলাম আজ তোমায়ও নিয়ে আসি।”

“কিন্তু, আমাকে কেন?”

“কারণ আমার মনে হয়েছে এখানে এলে তোমার অনেক প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যাবে। তোমার অনেক রাগ শেষ হয়ে যাবে।”

“আচ্ছা! তা কীভাবে?”

“রিদ্ধিমা, আজ তোমায় আমি একটা গল্প বলব। বহু বছর আগে আমি আজকের এ আমি ছিলাম না। আমার পরিবার ছোট বেলা থেকে আমায় সব রকম স্বাধীনতা দিয়েছে। একজন মুসলিম হওয়ার পরও আমাকেও কখনো আমার পরিবার নামাজ পড়তে বলেনি। আমার পরিবারের ব্যাকগ্রাউন্ড খুব হাই ক্লাসের। আমার সব কাজিনরা কেউ ডক্টর, কেউ ইঞ্জিনিয়ার, কেউ পাইলট, কেউ ভার্সিটির শিক্ষক, কেউ কর্পোরেট সেক্টরে কাজ করে। তাই ছোট থেকে আমাকে এটাই বলা হয়েছে আমাকেও তাদের মতোই জীবনে সফল হতে হবে। তাই তো পড়াশোনার জন্য তারা আমাকে চাপ দিলেও, ইসলামিক বিষয়ে কোনোদিন আমি তাদের মুখে কোনো কথা শুনিনি।

হ্যাঁ, সত্য বলা, ভালো কাজ করা এমন উপদেশ নিশ্চয়ই পেয়েছি। কিন্তু যা আমার একান্ত প্রয়োজন তা পাইনি। এভাবেই আমি একজন সফল মানুষ হওয়ার পেছনে ছুটতে লাগলাম। আমার ভাইও তাই করল। কলেজ, ভার্সিটিতে ছেলে বন্ধুদের সাথে সবসময় মেলামেশা ছিল আমার। তাদের সাথে ঘুরতে যাওয়া, কফি খাওয়া, ক্যাম্পাসে বসে আড্ডা দেয়া এসব কিছুতেই আমার পরিবার কোনোমতে বাধা দেয়নি।

কেউ আমাকে বলেনি এসব ঠিক নয়। এতে তোমারই বিপদ বাড়বে। তারপর হঠাৎ একদিন আমার জীবনে প্রেম এলো। একজনকে ভালোবেসে ফেললাম। ছেলেটা নিম্ন মধ্যভিত্ত ঘরের বলে আমার পরিবার তার সাথে মিশতে বারন করে দিল। কিন্তু ছেলেটাকে আমি এত ভালোবাসতাম যে তাকে ছাড়া আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না। তাই তো তার কথা মতো আমরা কোট ম্যারেজ করে ফেলি। আমি লুকিয়ে লুকিয়ে আমার স্বামীর সাথে দেখা করি। ক্লাস ফাঁকি দিয়ে তার বাসায় তার সাথে সময় কাটাতে শুরু করি। বুঝতেই পারছো নতুন নতুন বিয়ে হয়েছে। তার পরিবার সব জানতো বলে আমার যাওয়ায় তাদের কোনো সমস্যা হত না। আমি সারাদিন তাদের সাথে থেকে সন্ধ্যায় বাসা ফিরতাম।

আমি তখন মেডিক্যালে পড়ি। বরাবরই আমি মেধাবী ছাত্রী ছিলাম। কিন্তু এসবের জন্য আমি পরীক্ষায় খারাপ করা শুরু করলাম। এর জন্য আমার পরিবারের কাছে সব জানাজানি হয়ে গেল। আসলে আমরা যতই চাই সত্য কোনোদিন চাপা থাকে না। সব জানার পর আমার পরিবার আমাকে অনেক বুঝালো তাকে ছেড়ে দিতে। তাদের মতে এই ছেলে ভালো নয়। তারা নাকি খবর নিয়েছে এই ছেলে ড্রাগস নেয়। এর আগে অনেক বড় লোকের মেয়ে দেখে বিয়ে করেছে শুধু মাত্র টাকার জন্য। সে নাকি তার বিয়ে করা বউদের সাথে কাটানো সময় ভিডিও করে পরে তা দিয়ে ব্লাকমেইল করে মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করে।”

ডক্টর হুমায়রা থামলেন ব্যাগ থেকে নেয়া বোতল থেকে একটুখানি পানি খেয়ে গলা ভেজালেন।

তারপর আবার বললেন, “আমি এসবের কিছুই বিশ্বাস করিনি। আমি জানতাম আমার পরিবার তার থেকে আমাকে আলাদা করার জন্যই এসব করছে। তাই তো ভার্সিটির নাম করে আমি আমার স্বামী রাহিদদের বাসায় গিয়ে উঠলাম। রাহিদের পরিবার আমাকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করলেন। এর মধ্যে আমার বাবা অনেক বার এসেছেন আমাকে নিতে আমি যাইনি। এভাবে ছয় মাস চলে গেল। এর মধ্যে প্রথম তিন মাস আমরা ভালোই ছিলাম। কিন্তু দিনদিন বুঝতে পারলাম রাহিদের ব্যবহার পরিবর্তন হচ্ছে। সে রাত করে বাসায় আসে। অনেক রাত পর্যন্ত ফোনে কথা বলে। কিছু জিজ্ঞেস করলে আমাকে এড়িয়ে যায়। এভাবেই দিন যেতে লাগল। ছয় মাসের মাথায় আমার হাতে কিছু প্রমাণ চলে আসে যে আমার পরিবার সত্যি বলছে।

একদিন আমি রাহিদ গোসল করতে গেলে তার ফোন দেখি। বলে রাখা ভালো ও কখনো আমায় নিজের ফোন ধরতে দিত না। কিন্তু আল্লাহ হুকুমে আজ তার ভাগনি ফোনে গেমস খেলছিল ফোনে কল আসায় আমার কাছে নিয়ে আসে। আমি কোনো সন্দেহ ছাড়াই ফোনটা হাতে নিয়ে গ্যালারিতে গিয়ে অবাক হয়ে গেলাম। আমাদের একসাথে কাটানো কিছু প্রাইভেট মুহূর্তের ভিডিও রয়েছে। অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে এই ভিডিওতে শুধু আমার চেহেরা দেখা যাচ্ছে। তার না। যদি এটা না হত তবে আমি তাকে হয়তো সন্দেহ করতাম না। ভাবতাম স্বামী করতেই পারে।

তারপর আরও অবাক হয়ে গেলাম এমন আরও অনেক ভিডিও আছে। অনেক মেয়ের। আরও অবাক হলাম এই মেয়েদের মধ্যে একজন আমার ক্যাম্পাসের পরিচিত। সেদিন আমার পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে গেল। নিজেকে সামান্য একটা কিটের চেয়েও নগন্য মনে হলো। এই মানুষকে আমি বিশ্বাস করেছিলাম! যারা আমায় বাইশ বছর লালন-পালন করল। যারা আমায় ভালোবেসেছিল তাদের বিশ্বাস না করে একে করেছিলাম!

কি করব কিছু বুঝতে পারলাম না। একবার মনে হলো তখন গিয়ে একে শুট করে, তারপর নিজেকে শেষ করে দেই। কিন্তু না, এভাবে কিছু ঠিক হবে বলে মনে হলো না। মেডিক্যাল স্টুডেন্ট আমি। আমার মাথায় বুদ্ধি কম ছিল না। ভেঙে ঠিকই পড়েছিলাম সেটা শুধু নিজের জন্য। সাথে সাথে তার ফোনের সব ভিডিও ডিলিট করে দিলাম।

ভাগনিকে ফোন দিয়ে বললাম, “যাও ফোন মামাকে দিয়ে আসো। আমি যে ফোন ধরেছি সেটা বোলো না কেমন? এই নাও এই চকলেট গুলো তোমার।”

আমি জানতাম বাচ্চা মেয়ে চকলেট পেলে কিছু বলবে না। আর ভিডিও নেই দেখলে আমাকে সন্দেহ করতে পারবে না। ভাববে বাচ্চা মেয়ে না বুঝে ডিলিট করে দিয়েছে।

হলোও তাই সে গোসল সেরে বের হলে মেয়েটা তাকে ফোন দিল। সে কি কি যেন দেখে বলল, “মামনি তুমি আমার ফোনের সব ডিলিট করে দিয়েছো?”

“মেয়েটা হুম বলল।”

আমি বেঁচে গেলাম। আমার ইচ্ছে করছিল এই নরকের কিটকে তখনই মেরে ফেলি। কিন্তু না তা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আমি ডক্টর হতে যাচ্ছি। আমার কাজ জীবন বাঁচানো শেষ করা নয়।

অদ্ভুত ব্যাপার হলো সে এতে একটুও রাগ করল না। বলল, “ওকে মামনি সমস্যা নেই। আমার সব প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টস ল্যাপটপে কপি করা রয়েছে।”

বিশ্বাস করো রিদ্ধিমা এটা শুনে আমার পায়ের নিচ থেকে মাটি আবার সরে গেল। আমি নিজেকে অনেক কষ্টে নিয়ন্ত্রণে রাখলাম৷

এরপর ভাবলাম কীভাবে ল্যাপটপ থেকে সব মুছে ফেলা যায়। আমি তার পাসওয়ার্ড সে আমাকে দেবে না আমি জানি। তাই ভেবে রাখলাম ঠিক কি করব।

পরদিন সে যখন বাইরে গেল ওয়াশরুমে এসে ল্যাপটপের উপর পানির কল ছেড়ে দিলাম। আলমারির ড্রয়ারের লক ভেঙে দেখলাম অনেকগুলো মেমোরি সেগুলো নিয়ে নিলাম নিজের ব্যাগে। আলমারির সব কাপড় চেক করে আরও কিছু ডকুমেন্টস পেলাম। তারপর ল্যাপটপটা ভেঙে রেখে চলে এলাম মেডিক্যালে। আমার ভাই আমাকে নিতে এলো। তার সাথে বাড়ি চলে গেলাম।

আমার কাজ ছিল বাড়ি ফিরে আসা। বাকিটা আমার পরিবার দেখেছে। সেই মেমোরিগুলো দেখিয়ে কেইস করা হলো তাকে ধরা হলো। এবং সে এখন জেলে সাজা কাটছে।

তোমার নিশ্চয়ই মনে হচ্ছে এতকিছুর মাঝে এত বুদ্ধি খাটানো কি সম্ভব! আসলেই সম্ভব নয়। আমার জন্য সম্ভব হয়েছে কারণ আমি আমার ভাইকে কল দিয়েছিলাম। সব জানার পর সে আমাকে সব বলে দিল। তার কথা অনুযায়ী সব করলাম। সে না থাকলে আমার পক্ষে কিছুই সম্ভব হত না।

আমার ভাই আমাকে বাঁচিয়ে দিয়েছে। তারপর এই ট্রমা থেকে বের হতে অনেক সময় লেগেছে। তারপরও পরিবারের সাপোর্টে সেরে উঠলাম। পড়াশোনায় ফোকাস করলাম। নিজের ক্যারিয়ার গড়ে পরিবারের মতে বিয়ে করলাম। এখন আমি সুখি। আমার দুই সন্তান আছে।

তুমি ভাবতে পারো এসব আমি তোমায় কেন বললাম। আবার এটাও ভাবতে পারো আমার মতো একটা মডার্ণ মেয়ে এখন বোরখা কীভাবে পরে!

আসলে এই ট্রমা থেকে বের হওয়ার পর আমার একজনের সাথে দেখা হলো সে আমায়। অনেক বলার পরও বোরখা পরলাম না। তারপর একদিন সে বলল, “যদি তুমি বোরখায় আবৃত থাকতে তবে কী কোনোদিন রাহিদ নামের ছেলেটা তোমায় দেখতে পেত? যদি তুমি নিজেকে আড়ালে রাখতে তবে কেউ কী কোনোদিন বুঝতে পারত তুমি দেখতে কতটা সুন্দর? যদি তুমি নিজের মেডিক্যালের পড়ার মতোই দ্বিনের দিকে গুরুত্ব দিতে তবে কী আজ তোমায় এতকিছু ফেস করতে হত? যদি আমার কথা গুলো মিথ্যা মনে হয় তবে তুমি যাও নিজের প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করো। যাও কোরান খুলে বসে পড়ো। যদি মনে হয় আমি ভুল বলছি তবে আমায় যে শাস্তি দেবে মাথা পেতে নেব।”

আমি থমকে দাঁড়ালাম। সেখান থেকে পালিয়ে এলাম। বাসায় এসে এসব মন থেকে দূর করতে চাইলাম। কিন্তু পারলাম না। পরের এক সপ্তাহ মেডিক্যালে গেলাম না। তারপরও কিছুই ভুলতে পারলাম না। সারাক্ষণ আমার তার কথা গুলো কানে বাজত।

তার জন্য দরজা বন্ধ করে কোরান খুলে বসে পড়লাম। ছোট বেলায় কোরান শিখেছি কিন্তু অর্থ পড়িনি। তাই তাফসীর করা বাংলা অর্থসহ কোরান নিয়ে এই সাতদিন বসে থাকতাম।

এই সাতদিনে আমার বাইশ বছরের শিক্ষার, টাকার, সৌন্দর্যের অহংকারকে ভেঙে গুড়িয়ে দিয়ে পুরো খালি হাত করে দিয়েছিল। বাইশ বছরের প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর আমি সাতদিনে পেয়ে গিয়েছিলাম। কী ছিল কোরানে যা আমাকে সামান্য কাঁদা-মাটি ছাড়া কিছুই মনে করার উপযুক্ত রাখল না।

মেডিক্যালে পড়া নিয়ে যে গর্ব ছিল তা এক মুহূর্তে ঝনঝনিয়ে ঝরে পড়ে গেল। যা আমাকে আমার আল্লাহর নিকট মুখ দেখানোর মতো জায়গা রাখল না।

রাহিদ আমার সাথে প্রতারণা করার পরও আমি এতটা খালি হয়ে যাইনি। যতটা এই সাতদিনে কোরানের প্রতিটি আয়াত আমায় করে দিয়েছিল।

তখন মনে হলো আমার মূল্য না, এ পৃথিবীতে আছে। না আখিরাতে। আমি তো নিজেকে এমন জায়গায় নামিয়ে এনেছি যেখানে রাহিদের মতো ছেলেদের নজরে পড়তে হয়।

সে রাতে আমি যতটা কেঁদেছি ততটা বোধহয় আমার জীবনে কখনো কাঁদিনি। আমার মনে হচ্ছিল আমি আল্লাহর সামনে কী নিয়ে দাঁড়াব। এই পৃথিবী, এই জীবন, এই সৌন্দর্য সব ক্ষণিকের। সব শেষ হয়ে যাবে। শুধু যা থাকবে তার নাম আখলাক। তার নাম আমল। যা আমার ঝুড়িতে পুরোপুরি শূন্য। আমার জীবন তা তো আরও শূন্য।

চলবে।