ভালোবাসার রঙিন প্রজাপতি পর্ব-২৩+২৪

0
1263

#ভালোবাসার_রঙিন_প্রজাপতি
#লেখনীতে:সারা মেহেক

২৩

আমি মাধবীলতা গাছটার দিকে উদাস দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি। আদ্রিশ ভাইয়া সেই গাছটার নিচে এসে দাঁড়াতে বলেছিলেন বলেই এ মূহুর্তে সেখানে দাঁড়িয়ে আছি আমি। আমার দৃষ্টিজোড়া নিবদ্ধ মাধবীলতা নামক গুচ্ছাকারে থাকা দু রঙা ফুলের উপর। নজরকাড়া মনমাতানো সুন্দর এ ফুল। আমরা যে গাছটার নিচে দাঁড়িয়ে আছি সে গাছটার ফুল লাল এবং হালকা গোলাপি রঙের। আমাদের থেকে একটু দূরে আরেকটা গাছ আছে, সে গাছের ফুলের রঙ আবার লাল রঙা।

দুটো গাছই ঝোপের মত বেশ কিছু জায়গা দখল করে আছে। প্রায় প্রতিটা পাতার আড়ালে আড়ালে লুকোচুরি খেলার মত একটু করে উঁকি মারছে মাধবীলতা ফুলের গুচ্ছগুলো। আমার শুধু তাকিয়ে থাকতে মন চাইছে। মাঝেমধ্যে মন চাইছে এ মাধবীলতা গাছটাকে জড়িয়ে ধরে ফুলের গুচ্ছগুলোকে নিজের মধ্যে সমাহিত করে নেই। তাদের এ সৌন্দর্যে নিজেকে বিলিন করে দিতে মন চাইছে। মন চাইছে তাদের সৌন্দর্যে নিজেকে সুন্দর করে তুলি!

আমি সোজা দাঁড়িয়ে থেকে চোখজোড়া বন্ধ করে রইলাম। বাতাসের তালে নেচে বেড়ানো মাধবীলতার গুঞ্জনে নিজেকে হারিয়ে ফেলার চেষ্টায় মত্ত হলাম আমি। কিছুক্ষণের মাঝেই অনুভব করলাম আমার চারপাশে কিছু মাধবীলতা ফুল এলোমেলোভাবে পরছে। আমি চোখ বন্ধ থাকা অবস্থাতেই দুহাত সামনে মেলে ধরলাম। অমনিই বাতাসের তালে নিজ ঠিকানা হারিয়ে গুটিকয়েক মাধবীলতা আমার হাতে এসে পরলো। আমি সে স্পর্শ পেয়ে চোখ খুলতে নিলাম কিন্তু তার আগেই আদ্রিশ ভাইয়া ধীর সুরে বললেন,
“এই মিশমিশ, চোখ খুলবে না এখন। চোখ বন্ধ করেই রাখো। আর হাতটা যেমন আছে তেমনই করে রাখো।”

আদ্রিশ ভাইয়ার কথায় তাজ্জব হয়ে গেলাম আমি। সাথে সাথে হাত দুটো গুটিয়ে চোখজোড়া মেলতে চাইলাম আমি। কিন্তু তা হতে দিলেন তিনি। উনার এক হাত আমার নিকাবের উপর দিয়েই চোখের উপর রাখলেন। অপর হাত দিয়ে ধরলেন আমার হাতজোড়া। উনার এ স্পর্শে চমকে উঠলাম আমি। সারা শরীরে বয়ে গেলো শীতল এক স্রোত। উনি আমার এ অবস্থা টের পেলেন নাকি জানি না। তবে সে শিহরণ আবারো জাগিয়ে তুলতে তিনি কিছু বাক্য বললেন। তবে এবারের বাক্যগুলো দূরে থেকে নয়। বরং আমার কানের কাছ থেকে কিছুদূরে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বললেন,
“এত দুষ্টু কেনো তুমি? ঠিকভাবে বললাম,কিন্তু তুমি তা মানলে না। এজন্যই তো এভাবে তোমাকে স্পর্শ করতে হলো। এতে মাইন্ড করলেও আমার দোষ নেই। সবটার কারন তুমিই।”

উনার এ কথায় আমার চিন্তাশক্তি যেনো কিছু মূহুর্তের জন্য থমকে গেলো। অদ্ভুত এক অনুভূতি হলো মনের মধ্যে। অনুভব করলাম তুমুল তেজে লাফিয়ে চলা হৃদপিণ্ডের হৃৎস্পন্দন। তবে বেশিক্ষণ এ অনুভূতি নিজের মাঝে বিরাজ করতে দিলাম না আমি। তৎক্ষনাৎ নিজেকে সামলে নিয়ে চোখমুখ কুঁচকে জিজ্ঞাস করলাম,
“কেনো? চোখ খুললে কি সমস্যা?”

আদ্রিশ ভাইয়া হালকা শব্দ করে হেসে উঠলেন। হয়তো আমার এ কথা ঘুরানোর ছোট্ট ব্যাপারটা উনি একটু হলেও ধরতে পেরেছেন।
উনি আমার চোখের উপর থেকে নিজ হত সরিয়ে নিলেন। এরপর আমার হাত ছেড়ে দিতে দিতে বললেন,
“যতক্ষণ আমি না বলবো ততক্ষণ চোখ খুলবে না। না হলে কিন্তু খারাপ হয়ে যাবে।”

আমি একটু অবাক হয়ে বললাম,
“কি খারাপ হবে শুনি?”

আদ্রিশ ভাইয়া এখন আমার থেকে দূরে সরে গিয়েছেন। উনি আগের জায়গায় দাঁড়িয়ে পরে বললেন,
“যখন সেটা হয় তখন দেখে নিও। এখন একদম চুপ। ডু নট আটার এ ওয়ার্ড।”

আমি এবার বাধ্য মেয়ের মত চুপ করে আগেকার ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে রইলাম।

কয়েক মিনিট সময় অতিবাহিত হওয়ার পরও আদ্রিশ ভাইয়ার কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে আমি চোখ বন্ধ রেখেই বললাম,
“কি করছেন আপনি? আদৌ কি আমার আশেপাশে আছেন?”

এই বলে আমি কান খাড়া করে আশেপাশের সাড়াশব্দ শুনতে ব্যস্ত হয়ে পরলাম। কিছুক্ষণের মাঝেই অনুভব করলাম আমার হাতে ঝপাঝপ কিছু পরছে। সেকেন্ডেই ধরে ফেললাম আমার হাতে কি পরছে। সাথে সাথে চোখজোড়া খুলে হাতের দিকে তাকিয়ে দেখলাম আমার হাতে অবিরাম গতিতে একের পর এক মাধবীলতা ফুল পরছে। টুপটুপ করে তারা নিজেদের ছোঁয়ায় আমাকে বিমোহিত করে তুলছে। কি উষ্ণ গা শিরশির করা সে ছোঁয়া!

আমি মুগ্ধ নয়নে চেয়ে আছি মাধবীলতা সে ফুলগুলোর দিকে। প্রকৃতির ছোট্ট ছোট্ট পবিত্র এক উপাদান এ ফুলগুলো। আমি কিছুক্ষণ আমার হাতের দিকে তাকিয়ে থেকে সামনে তাকিয়ে দেখলাম আদ্রিশ ভাইয়া দাঁড়িয়ে আছেন। ঠোঁটের কোনে এক চিলতে মনোমুগ্ধকর হাসি নিয়ে তিনি গাছের কাছে দাঁড়িয়ে আছেন। শুধু দাঁড়িয়ে আছেন বললে ভুল হবে। তিনি সে মাধবীলতা গাছটা ধরে দাঁড়িয়ে আছেন। তার মানে উনিই এতক্ষণ গাছটা ঝাঁকাচ্ছিলেন। এর ফলেই তো আমার হাতে টুপটুপ করে ফুলগুলো পরছিলো। প্রথমে কয়েক সেকেন্ডের জন্য ভেবে নিয়েছিলাম, ফুলগুলো হাওয়ার তালে পরছে। কিন্তু চারপাশে চলা মৃদুমন্দ হাওয়ার তালে এতো জোরে জোরে ফুলগুলো আমার হাতে পরার কথা নয়। তবে এটাও ভাবিনি যে আদ্রিশ ভাইয়া গাছ এভাবে ঝাঁকাচ্ছিলেন বলে ফুলগুলো পরছিলো।

হাতের উপর থাকা মাধবীলতা ফুলগুলো মুঠোয় গুটিয়ে নিয়ে আদ্রিশ ভাইয়ার দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললাম,
“এ কারনে চোখ বন্ধ রাখতে বলেছিলেন?”

আদ্রিশ ভাইয়া আমার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে মুচকি হেসে দিলেন। এরপর চোখের পলকে এক লাফ দিয়ে হাতের কাছে থাকা ডাল থেকে দু মুঠো মাধবীলতা ছিঁড়ে নিলেন। সেই মাধবীলতা ফুলগুলো হাতে নিয়েই আমার দিকে এগিয়ে এসে অন্যমনস্ক হওয়ার ভান করে জিজ্ঞাস করলেন,
“ফুলগুলো কি কারোর কথা মনে করিয়ে দেয়?”

আদ্রিশ ভাইয়ার কথায় আমার পিলে চমকে উঠলো। আমি বিস্ময় নিয়ে জিজ্ঞাস করলাম,
“মানে!”

আদ্রিশ ভাইয়া আমার এমন বিস্মিত অভিব্যক্ত দেখে মুচকি হেসে বললেন,
“এ জীবনে চলার পথে কিছু প্রশ্ন থাকা উচিত। হয়তো সে প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে গিয়ে সে কৌতুহলী মানুষ নতুন এক অনুভূতির সাথে পরিচিত হতে পারে।”

আদ্রিশ ভাইয়ার এ ঘুরানো প্যাঁচানো কথার মানে ভালোভাবে ধরতে পারলাম না আমি। জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে উনার দিকে তাকিয়ে বললাম,
“এর মানে ঠিক বুঝতে পারলাম না।”

উনি আবারো মুচকি হেসে আমার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে আমার পিছে এসে দাঁড়ালেন। সেখানে দাঁড়িয়ে আমার হাতে সেই দু মুঠো মাধবীলতা ফুল দিয়ে বললেন,
“এগুলো ধরে থাকো। একটা কাজ করবো।”

আমি সে ফুলগুলো হাতে নিয়ে বললাম,
“কি কাজ? আর আপনার তখনকার কথাটা ভালোভাবে বুঝতে পারিনি। একটু ভালোভাবে বলুন।”

আদ্রিশ ভাইয়া আমার প্রশ্নের জবাব দিলেন না। বরং চুপচাপ আমার হাত থেকে একগোছা ফুল হাত নিয়ে নিলেন। এরপর আমার মাথার উপরে থাকা একটা হিজাব পিন খুলে হাতে নিলেন। উনার এ কাজে আমি চমকে উঠে জিজ্ঞাস করলাম,
“কি করছেন আপনি হুম? আমার হিজাব পিন খুলছেন কেনো?”

“হুসসস….একটা কথাও না। বড্ড কথা বলো তুমি।”
উনার এ কথায় আমি একদম চুপ করে রইলাম। কিছুক্ষণের মাঝেই বুঝতে পারলাম উনি আমার মাথায় সেই ফুলের গুচ্ছ, হিজাব পিন দিয়ে হিজাবের সাথে গুঁজে দিলেন। কাজটা হয়ে এলে উনি আমার সামনে এসে দাঁড়িয়ে বললেন,
“লুক লাইক এ ফ্লোরাল হিজাবি কুইন।”

আদ্রিশ ভাইয়ার এ কথা আমার মনে আবারো এক অনুভূতি জাগিয়ে তুললো। আমি জানি সে অনুভূতির নাম। কিন্তু ভুল মানুষের প্রতি ভুল অনুভূতি হওয়ায় আমার মনকে এক ধমক দিলাম আমি।
আদ্রিশ ভাইয়া আমাকে সেখানে দাঁড়িয়ে থাকতে বলে একটু দূরে গিয়ে ফোনে কয়েকটা ছবি তুললেন। ছবি তোলা শেষে উনি ফোনটা পকেটে রেখে দিলেন। এতেই আমার খেয়াল হলো ছবিগুলো উনার ফোনে তোলা হয়েছে।
কোন জগতে ছিলাম কে জানে। ব্যাপারটা আগে বুঝতে পারেনি আমি। আফসোস হচ্ছে এখন। আমি সাধারণত অন্য কারোর ফোনে সহজে ছবি তুলিনা। সেখানে আমার সামনে দিয়েই আদ্রিশ ভাইয়া নিজের ফোনে আমার ছবি তুললেন আর আমি চুপচাপ তুলতে দিলাম! অন্যমনস্ক থাকলে এই হয়। এখন আগ বাড়িয়ে উনাকে এ ছবিগুলো ডিলিট করার কথা বলতে হবে। কারন আমার ছবি অন্য কারোর ফোনে থাকুক তা আমি মোটেও চাইনা। বিশেষ করে আদ্রিশ ভাইয়ার ফোনে তো মোটেও না।
আমি আদ্রিশ ভাইয়াকে ছবি ডিলিট করার কথা বলতে চাইলাম। কিন্তু তার আগেই এ কোথা থেকে একটা বুড়ো লোক এসে সেখানে উপস্থিত হলেন। আমাদের দিকে তীর্যক দৃষ্টি নিক্ষেপ করে কিছুটা রাগী কণ্ঠে বললেন,
“আমার গাছের ফুলগুলো কে ছিঁড়লো?”

বুড়ো লোকটার কথায় বুঝতে পারলাম এ গাছটা উনার। এরপর উনার কাঁধে ছাপিয়ে উঁকি দিয়ে একটু উঁকিঝুঁকি দিতেই লক্ষ্য করলাম এ গাছের পিছনে একটা বাড়ির গেট রয়েছে। আমরা দুজন এতক্ষণ যেখানে দাঁড়িয়ে ছিলাম সেখান থেকে বাড়ির গেটটা একদম দেখা যায়না। এজন্য আমি বুঝতে পারিনি এ গাছটা কারোর ব্যক্তিগত সম্পদ।
বুড়ো লোকটা আবারো একই প্রশ্ন করলেন। উনার এ প্রশ্ন শুনে আদ্রিশ ভাইয়া বিস্তৃত হেসে সেই লোকটার কাছে এগিয়ে গেলেন। এরপর উনার কানে কি যেনো বললেন। সাথে সাথে লোকটা ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠলো। হাসতে হাসতেই তিনি আদ্রিশ ভাইয়ার পিঠে হালকা এক চাপড় মেরে বললেন,
“আচ্ছা যাও যাও।”

উনার কথায় আদ্রিশ ভাইয়া মুচকি হেসে আমার কাছে এসে দাঁড়ালেন। উনাদের দুজনের এ সিক্রেট কথাবার্তায় আমি বেশ অবাক হয়ে গেলাম। এখানে আসার পর বুড়ো লোকটা যতটা রেগে গিয়েছিলেন, এখান থেকে যাওয়ার সময় ঠিক ততোটাই খুশিমনে গেলেন। এতে আমার অবাক হওয়া ছাড়া কোনো উপায় রইলো না।
আদ্রিশ ভাইয়া বুড়ো লোকটা কানে কি বললেন,তা উনার কাছে শুনতে চাইলাম আমি। কিন্তু বরাবরের মত এবারও আমার প্রশ্ন এড়িয়ে গেলেন উনি।

.

বাড়িতে পৌঁছে আমার নিজের মাথার চুল নিজেই ছেঁড়ার উপক্রম হয়ে এলো। আজকের প্রতিটা ঘটনা, আদ্রিশ ভাইয়ার বলা প্রতিটা কথা আমাকে চিন্তার এক অতল সাগরে ডুবিয়ে দিলো। যেখানে দাঁড়িয়ে আমি কোনো কূলকিনারা পেলাম না।

তখন নদীর সাথে রেস্টুরেন্টে গিয়ে আমি আর নদী পাশাপাশি বসে ছিলাম। আর আদ্রিশ ভাইয়া বসে ছিলেন একদম আমার সামনের চেয়ারটায়। এতে বেশ অস্বস্তিতে পরে গিয়েছিলাম আমি। ফলে মজাদার সব পদও বিস্বাদ ঠেকছিলো তখন।

শুধু সামনাসামনি বসা পর্যন্ত হলেও একটা কথা ছিলো। কিন্তু ঘটনা এ পর্যন্ত থেমে থাকেনি। বরং ঘটনা আদ্রিশ ভাইয়ার লুকিয়ে লুকিয়ে দেখা পর্যন্ত গড়িয়ে গিয়েছিলো। আমি বেশ ভালোভাবেই বুঝতে পারছিলাম যে,আদ্রিশ ভাইয়া আমার দিকে বারবার তাকাচ্ছিলেন। তখন খুব অস্বস্তি অনুভব করায়ও নদী পাশে থাকায় কিছু বলতে পারিনি উনাকে। নদী এ বিষয়টা খেয়াল করেছে নাকি কে জানে।

আদ্রিশ ভাইয়ার কর্মকাণ্ড নিয়ে চিন্তা করতে করতেই শাওয়ার নিয়ে নিলাম আমি। আমি ওয়াশরুম থেকে বেরুতেই নদীও শাওয়ার নিতে চলে গেলো। আর আমি বসে বসে চিন্তা করতে লাগলাম আদ্রিশ ভাইয়ার কথা আর কাজগুলো। উনার এমন সব কথাবার্তা আর কর্মকাণ্ড একটা দিকেই নির্দেশ করে। তা হলো উনি আমাকে পছন্দ করেন।৷ কিন্তু এ বিষয়টা আমি ঠিক হজম করতে পারলাম না। উনার গার্লফ্রেন্ড থাকা সত্ত্বেও উনি আমাকে পছন্দ করবেন কেনো! কারনটা কি? আর আদৌ কি আমার এ ধারনা সঠিক? উনি কি সত্যিই আমাকে পছন্দ করেন? নাকি এসব অন্য কিছু নির্দেশ করে? কিন্তু সে অন্যকিছুই বা কি? আর গার্লফ্রেন্ড থাকার পরও যদি আমাকে পছন্দ করেন তাহলে তো এটা একদম চরিত্রহীনদের মতো কাজ করে ফেলেছেন উনি। তবে এ কয়দিনে আমি যতটুকু উনাকে চিনেছি তাতে উনার চরিত্র নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই আমার। কিন্তু……..

উফ,এই কিন্তু’র গোডাউন আমার মাথা খেয়ে ফেলবে। আজ যতক্ষণ না উনার এ অনুভূতির রহস্য জানবো ততক্ষণ পর্যন্ত আমার শান্তি হবে না। কিন্তু এসব জানবো কি করে?

বেশ কিছুক্ষণ চিন্তাভাবনা করার পর মনে হলো,উনার রুমে গিয়ে ছোটখাটো একটা তল্লাশি অভিযান চালালে কেমন হয়? হুম এটাই ভালো বুদ্ধি। এতে কিছু হলেও জানা যাবে উনার অনুভূতির ব্যাপারে। নিশ্চিত হতে পারবো উনার ব্যাপারে। আর এখনই সে অভিযান চালানোর ভালো সময়। কারন এখন সবাই নিজ নিজ কাজে ব্যস্ত আর সবচেয়ে বড় কথা আদ্রিশ ভাইয়া বাড়িতে নেই।

আমি আর সময় নষ্ট করে দ্রুত পায়ে আদ্রিশ ভাইয়ার রুমে চলে এলাম। দরজা ভিজিয়ে উনার রুমটা এক নজরে পর্যবেক্ষণ করতে লাগলাম। সেই গোয়েন্দা নজরে সন্দেহজনক কিছু খুঁজতে লাগলো আমার চোখজোড়া।
কিছুক্ষণের মাঝেই এক সোনার হরিণ পেয়ে বসলো আমার সে গোয়ান্দা দৃষ্টি। সে সোনার হরিণ হলো আদ্রিশ ভাইয়ার ডায়েরি। টেবিলের এক কোনায় ডায়েরির মত একটা খাতা দেখা দেওয়ায় তা ডায়েরি হিসেবেই ধরে নিলাম আমি।

খুশিতে মনটা নেচে নেচে সে ডায়েরির কাছে গিয়ে উপস্থিত হলো। মেডিকেলের বেশ কয়েকটা বইয়ের নিচে সেই ডায়েরির মত দেখতে খাতাটা বের করলাম। আমার আন্দাজ ঠিক হলো। এটা আসলেই ডায়েরি। আদ্রিশ ভাইয়ার পার্সোনাল ডায়েরি।
কারোর পার্সোনাল ডায়েরি পড়তে হয়না এটা জানা আছে আমার। কিন্তু কারোর পার্সোনাল ডায়েরি পড়ায় আলাদা একটা মজা আছে। অবশ্য আমি এখন কোনো মজা নেওয়ার জন্য ডায়েরি হাতে নেয়নি। আমি তো ‘আদ্রিশ’ নামক মানুষটার রহস্য জানার জন্য ডায়েরিটা হাতে নিয়েছি।

লম্বা একটা শ্বাস টেনে নিয়ে ডায়েরিটা খুললাম আমি। প্রথম কয়েক পেজে বেশ কিছু লেখা। কয়েক লাইন পড়ে বুঝলাম,লেখাগুলো কলেজ সময়ের। পুরোটা আর পড়ার সাহস হলো না। কারন এতো লেখা দেখে আমার অলস মন পড়তে চাইলো না। তাইতো ডায়েরির পাতাগুলো একসাথে করে আঙ্গুল দিয়ে ধরে পরপর একটানে উল্টাতে লাগলাম। একদম তড়িৎগতিতে যাকে বলে।

শেষ দিক থেকে মাত্র কয়েক পাতা উল্টানো হয়েছে। হঠাৎ একটা পেজে এসে ডায়েরির পাতা উল্টানোর গতি থমকে গেলো। আমি বিস্ময়ে নিয়ে সেদিকে তাকিয়ে দেখলাম আমার একটা ছবি বেশ যত্ন সহকারে সেঁটে দেওয়া হয়েছে। সে ছবি দেখে বিস্ময়ে আমার মুখ হা হয়ে এলো। মাথায় পরলো ছোটখাটো একটা বাজ।

সেদিন বিলে তোলা একটা ছবি সেঁটে দেওয়া হয়েছে ডায়েরির পাতায়। ছবিটা নৌকা বসে থাকা একটা মূহুর্তের। আমি চোখ বন্ধ করে রয়েছি। শেষ বিকেলের সে সোনালী আলো আমার চোখেমুখে পরেছে। ফলে চেহারায় স্বর্ণালি এক আভা দেখা দিয়েছে। ছবিটার নিচে ক্যাপশন লেখা,
“আমার সোনালী রাঙা সে মাধবীলতা। ”

ক্যাপশনটা পড়ে আমি আরেকদফা চমকে গেলাম। চারপাশ একদম স্তব্ধ হয়ে এলো। চিন্তাশক্তি কিছুক্ষণের জন্য থমকে গিয়েছে যেন। সবকিছু ঠিকঠাকভাবে বুঝে উঠতে পারছি না। মাথায় শুধু একটা প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে, “এসব কি আদৌ সত্যি?”
এ মূহুর্তে অনুভূতি শক্তি প্রায় শূন্যের কোঠায় এসে উপস্থিত হলো। তবে কিছুক্ষণের মাঝেই বুঝতে পারলাম কি একটা যেন আমার গলার কাছে এসে আটকে আছে। পেটের মধ্যে কেমন এক সুড়সুড়ি অনুভূত হচ্ছে! মনে হচ্ছে কিছু প্রজাপতি উড়ে বেড়াচ্ছে যেন! খুব বেশি খুশি হলে আর না চাওয়া কিছু জিনিস পেলে আমার এমন অনুভূত হয়। তাহলে আজ, এ মূহুর্তে আমি খুব খুশি?
হুম,খুব খুশি। অনেক বেশি খুশি। অনেক অনেক অনেক খুশি আমি। সীমাহীন খুশি আমি। আচ্ছা এ খুশির বহিঃপ্রকাশ করবো কিভাবে? এ খুশির বহিঃপ্রকাশ না করলে পেটের ভিতর এ প্রজাপতিগুলো উড়ে উড়ে আমার অবস্থা খারাপ করে দিবে। কিন্তু কি করবো আমি তাই চিন্তা করতে লাগলাম।

হঠাৎ বাইরে থেকে ছোট মামির গলার স্বরে চমকে উঠলাম আমি। বুকটা দুরুদুরু করে কাঁপতে লাগলো।ফলে হাত থেকে ডায়েরিটা পরে গেলো। সচেতন মস্তিষ্ক জানান দিলো ডায়েরিটা দ্রুত উঠিয়ে রেখে রুম থেকে বের হয়ে যাওয়া উচিত।
আমি দ্রুত ডায়েরিটা উঠিয়ে তার নিজের জায়গায় রেখে দিলাম। তবে পূর্বের অবস্থায় রাখতে পারলাম না। ওদিকে ছোট মামির আওয়াজ আরো স্পষ্ট কানে আসতে লাগলো। অর্থাৎ মামি এ রুমের প্রায় কাছাকাছি চলে এসেছে। আমি তাড়াতাড়ি করে ডায়েরিটা ঠিকঠাকমতো রেখে দিলাম। টেবিলের কাছ থেকে সরে আসতেই চোখ আটকে গেলো কিছু বইয়ের উপর। বইগুলো সেই লাইব্রেরীর বই। এ বিপদেও মনটা হঠাৎ চাইলো সে বইগুলো খুলে দেখতে। হয়তো কিছু পাওয়া যেতে পারে। ওদিকে ছোট মামির আওয়াজ কিছুক্ষণের জন্য বন্ধ হয়ে গেলো। এতে সাহস পেয়ে দ্রুত শরৎচন্দ্রের ‘চরিত্রহীন’ উপন্যাসটা হাতে নিলাম। এতো কি আছে এসব বইয়ে যে আদ্রিশ ভাইয়া লাইব্রেরী থেকে নিয়ে এসেছিলেন!
বইয়ের সব পাতা উল্টানোর পরও কিছু পেলাম না। কিন্তু শেষ পাতায় এসে গোটাগোটা হাতের লেখা কিছু দেখতে পেলাম। শুরুতেই লেখা ‘মাধবীলতা’। এ নাম দেখে চমকে উঠলাম আমি। পরবর্তী লাইনগুলো পড়ার জন্য আকুপাকু করা মনকে সান্ত্বনা দিতে পড়তে চাইলাম। কিন্তু পারলাম না। ওদিকে ছোট মামির গলার আওয়াজ আরো কাছে শুনতে পেলাম। ফলে ভয়ে বইটা নিজের জায়গায় রেখে দ্রুত নদীর রুমে চলে আসলাম আমি।

নদী নিজের রুমে নেই। এজন্য ধপ করে বিছানায় বসে চোখ বন্ধ করে রইলাম আমি। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম আমি। ভাগ্য ভালো কারোর হাতে ধরা পরেনি। এমনটা হলে তো মানসম্মান সব মাটিতে মিশে যেতো একেবারে।
মনমস্তিষ্ক এক গুরুত্বপূর্ণ চিন্তায় পরে গোলো। ভাবতে লাগলাম আদ্রিশ ভাইয়ার সব প্রশ্নগুলো। সে ডায়েরির পাতাটা দেখার ফলে একে একে সব প্রশ্নের উত্তরও পেয়ে গেলাম আমি। আদ্রিশ ভাইয়া আমাকে পছন্দ করেন, এটা কিছুতেই বিশ্বাস হতে চাইছে না আমার। তবে অবিশ্বাস করার মত একটাও সংকেত পায়নি আমি।
রুমে কেউ নেই। তবুও অদৃশ্য কিছুর সামনে আমি লজ্জায় নিজেকে গুটিয়ে ফেললাম। দু হাত দিয়ে মুখ ঢেকে ফেললাম। এখন হয়তো মুখ থেকে হাত সরিয়ে ফেললে সামনেই দেখবো আদ্রিশ ভাইয়া অকপটে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন! ইশ,কি লজ্জা! তবে ব্যাপারটা পুরোদমে ফিল্মি হয়ে যায়। আবার সাথে হাস্যকরও দেখায় বটে।

আচ্ছা? এ মূহুর্তে আমার কি করা উচিত? এ খুশির বহিঃপ্রকাশ কিভাবে করা উচিত? গানের তালে নেচে নেচে? কিন্তু আমি তো নাচই পারিনা। অবশ্য চোখ বন্ধ করে কাল্পনিক আমি নৃত্যরত আছি, এটা ভাবলেই নাচ হয়ে যাচ্ছে! এমনটা হাস্যকর শোনালেও এ মূহুর্তে খুশির বহিঃপ্রকাশ করতে আমি কল্পনায় নাচবো। মন খুলে নাচবো। গানের তালে নেচে নেচে হাওয়ায় উড়ে বেড়াবো। কল্পনায় পিঠে একজোড়া ডানা লাগিয়ে উড়ে বেড়াবো আমি। সে ডানার নাম হবে ‘প্রেমের ডানা’! যা আমাকে অনেকদূরে উড়তে সাহায্য করবে।

আমার মন মোতাবেক চলার জন্য চার্জার লাইন থেকে ফোনটা খুলে নদীর রুমের দরজা হালকা ভিজিয়ে দিলাম। এরপর ব্যাগ থেকে ইয়ারফোন বের করে ফোনে ঢুকিয়ে দু কানে ভালোভাবে সেঁটে নিলাম। মিউজিক প্লেলিস্ট থেকে মনমতো গান খুঁজলাম। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে পেয়েও গেলাম। নব্বই দশকের হিন্দি একটা গান। আমার পরিস্থিতির সাথে এ গানটা একদম মিলে যায়।

খুশিতে খুশিতে গানটা অন করলাম।সাথে সাথে কানে বেজে উঠলো,
“Aaj main upar aasman neeche
Aaj main aage zamana hai peechhe
Aaj main upar aasman neeche
Aaj main aage zamana hai peechhe
Tell me o khuda ab main kya karoon
Chaloon seedhi ke ulti chaloon.”
চোখ বন্ধ করে গানের তালে কল্পনায় নেচে যাচ্ছি আমি। একদম পার্ফেক্ট ড্যান্স যাকে বলে…..
অথচ বাস্তবে শুধু রুমের এপাশ থেকে ওপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছি। কখনো হাত দুটো গুটিয়ে আছি, তো কখনো হাত দুটো দুপাশে প্রসারিত করে আছি।

হঠাৎ করে কারোর সাথে ধাক্কা লাগায় আমার গতি একদম থমকে গেলো। পিটপিট করে চোখ মেলে সামনে তাকিয়ে দেখলাম আদ্রিশ ভাইয়া দাঁড়িয়ে আছেন। ঠোঁটের কোনে লেপ্টে আছে মন মাতাল করা মনোমুগ্ধকর এক হাসি। উনাকে দেখেই হুট করে অদ্ভুত এক অনুভূতি হলো আমার। তবে মনে হচ্ছে মানুষটা কল্পিত।
আচ্ছা? উনি কি বাস্তবেই এখানে আছেন? নাকি সবটাই আমার কল্পনা? অবশ্য এমন কল্পনা বাস্তবে হয়না। এমন কল্পনা তো মুভিতে হয়। এর মানে উনি বাস্তবেই আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন।

আদ্রিশ ভাইয়া নিজের উপস্থিতিকেই যেন প্রমানিত করতে আমাকে প্রশ্ন করলেন,
“কি ব্যাপার মিশমিশ? আজ এতো খুশি কেনো? মনে কিসের রঙ লেগেছে?”

উনার এ প্রশ্নের জবাবে আমার মন বলতে চাইলো,
“আজ আমার মনে রঙ লেগেছে। প্রজাপতির রঙ লেগেছে। আপনার #ভালোবাসার_রঙিন_প্রজাপতি’র রঙ লেগেছে।”

®সারা মেহেক

#চলবে

#ভালোবাসার_রঙিন_প্রজাপতি
#লেখনীতে:সারা মেহেক

২৪

আমার মনের কথা মনেই রয়ে গেলো। তবে আদ্রিশ ভাইয়াকে দেখে আবারো আমার মাঝে এক ভালোলাগার অনুভূতি বয়ে গেলো। সাথে লজ্জাও লাগলো খুব। এতোদিন উনার সামনাসামনি থাকতে, উনার সাথে কথা বলতে খুব একটা সংকোচ বোধ হয়নি। অমন লজ্জাও লাগেনি। কিন্তু আজ যখন জানতে পারলাম যে আদ্রিশ ভাইয়া আমাকে পছন্দ করেন, তখন থেকে লজ্জার এক মস্ত বড় চাদর আমার সমস্ত অঙ্গ আবৃত করে নিলো যেনো।

আদ্রিশ ভাইয়া এখনো আমার দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। আমি কয়েক সেকেন্ড উনার দিকে চেয়ে তড়িৎ-গতিতে মাথা নিচু করে ফেললাম। উনি হয়তো আমার দিকে তাকিয়েই একটু শব্দ করে হেসে বললেন,
“নিজের মধ্যে আছো তো?”

এ প্রশ্নের ঠিক কি জবাব দিবো তা বুঝতে পারলাম না। কারন জবাব দুটো হতে পারে। এই মনে হচ্ছে, আমি নিজের মধ্যেই আছি এবং ঠিক আছি। আবার পরক্ষনেই মনে হচ্ছে, নাহ আমি নিজের মধ্যে নেই। আমি অদ্ভুত এক ভালোলাগা আর সুখের মধ্যে আছি।
এদিকে যে আমি নিশ্চুপ ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছি সেজন্য আদ্রিশ ভাইয়া একটু চিন্তিত সুরে বললেন,
“মিশমিশ….কোনো সমস্যা? কখন থেকে একের পর এক প্রশ্ন করে যাচ্ছি, কিন্তু তুমি জবাবই দিচ্ছো না। কি হয়েছে তোমার?”

উনার কথায় আমি দ্রুত মাথা তুলে বললাম,
“তেমন কিছু হয়নি।”

আদ্রিশ ভাইয়া এবার ভ্রু উঁচিয়ে সন্দেহের সুরে বললেন,
“তাহলে কি হয়েছে? এতক্ষণ পর মুখের বুলি ফুটলো কেনো? ”

“আরে বললাম তো…কিছুই হয়নি। আপনি শুধু শুধু এত প্রশ্ন করছেন।” কথাটা একটু ঝাঁঝালো সুরেই বললাম। কারন এ মূহুর্তে উনার সামনে থাকতে লজ্জা লাগছে। আবার এখান থেকে সরে যাবো, সে শক্তিটুকুও পাচ্ছি না। সবকিছু অগোছালো লাগছে। হয়তো প্রেমে পরার পূর্ব লক্ষণ এটা….

আমি মাথা তুলে পাশ ফিরে অন্যমনস্ক হয়ে তাকিয়ে আছি। কিছু বলার মত শব্দ খুঁজে পাচ্ছি না। তবে উনাকে একটা প্রশ্ন হুট করে জিজ্ঞাস করতে মন চাইলো। তা হলো,উনি কি আমাকে সত্যিই ভালোবাসেন? যদি এমনটাই হয় তাহলে মাহা কে?

হঠাৎ আদ্রিশ ভাইয়া আমার মুখের সামনে তুড়ি বাজিয়ে বললেন,
“আজকে কোন কল্পলোকের রাজ্যে ডুবে আছো? ঠিকঠাক বলো তো। তোমায় নিয়ে চিন্তা হচ্ছে। এতো সময় তোমার সামনে দাঁড়িয়ে আছি, দুইলাইন কথা বলেই চুপ! আবার মুখের অঙ্গভঙ্গির কোনো পরিবর্তন নেই। হয়েছে টা কি তোমার?”

উনার কথা শুনে আমার মনে হলো, এখন এখান থেকে চলে যাওয়াই উত্তম। কারন এসব প্রশ্নের সঠিক জবাব আমার কাছে নেই। আর এখন হয়তো আমার শরীরে সে শক্তিটুকুও এসে গিয়েছে যার সাহায্যে আমি এ রুম থেকে চলে যেেত পারবো। এজন্য আমি কোনো জবাব না দিয়ে হন্তদন্ত হয়ে বললাম,
“আমি জানি না আমার কি হয়েছে। তবে এ মূহুর্তে আমার এখানে থাকা সম্ভব না।”
এই বলেই আমি আদ্রিশ ভাইয়াকে পাশ কাটিয়ে রুম থেকে বের হতে চাইলাম। তবে তার আগেই নদী রুমে ঢুকে পরলো। আদ্রিশ ভাইয়ার সামনে গিয়ে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে সে বলল,
“বড় ভাইয়া ডাকছে তোমাকে। ভাইয়া ঢাকা যাবে এজন্য তোমার ঘাড়ে হয়তো দায়িত্ব চাপিয়ে দিয়ে যাবে।” এই বলে নদী মুখ টিপে হাসতে লাগলো। তার এ হাসির কারণ নিশ্চয়ই আদ্রিশ ভাইয়াকে ব্যস্ত দেখতে পারা।
নদীর কথায় আদ্রিশ ভাইয়া চোখেমুখে বিস্ময় প্রকাশ করে বললেন,
“ভাইয়া ঢাকা যাবে! কবে কখন?”

নদী ভ্রু নাচিয়ে বলল,
“আজই যাবে এবং এখনই বের হবে। এজন্যই তোমাকে ডাকছে।”

আদ্রিশ ভাইয়া নদীর কথার পিঠে আর কথা না বাড়িয়ে এ রুম থেকে বেড়িয়ে পলাশ ভাইয়া রুমে চলে গেলেন। উনার পিছুপিছু নদীও গেলো। তবে একা যায়নি সে। আমাকেও তার সাথে নিয়ে গেলো।

আদ্রিশ ভাইয়া পলাশ ভাইয়ার রুমে গিয়েই ব্যস্ত সুরে বললেন,
” কি ব্যাপার ভাইয়া? হুট করে ঢাকা যাচ্ছো যে?”

পলাশ ভাইয়া রেডি হয়ে গায়ে পারফিউম নিয়ে আদ্রিশ ভাইয়ার সামনে এসে দাঁড়ালেন। কয়েক সেকেন্ড বিছানায় উদাস চেহারায় বসে থাকা রাইসা ভাবীর দিকে তাকিয়ে আদ্রিশ ভাইয়ার কাঁধে হাত রেখে বললেন,
“দুইদিনের জন্য ঢাকা যাচ্ছি। মিটিং আছে বিদেশি ক্লায়েন্টদের সাথে। তারা ফেস টু ফেস মিটিং করতে চাইছে। এজন্যই ইমার্জেন্সি ভিত্তিতে ঢাকা যেতে হচ্ছে।”

আদ্রিশ ভাইয়া চিন্তিত কণ্ঠে বললেন,
“এ মূহুর্তে ঢাকা যাবে তাহলে ভাবীকে সামলাবে কে? আর কয়দিন বাদেই ডেলিভারি ডেট। ভাবীর কিছু কমপ্লিকেশন এর জন্য আগেভাগেও কিছু হয়ে যেতে পারে। ”

পলাশ ভাইয়া এবার মৃদু হেসে আশ্বস্তের সুরে বললেন,
“এজন্যই তোকে ডাকলাম এখানে। আমার অনুপস্থিতিতে রাইসার সমস্ত দায়িত্ব তোর উপর দিয়ে যাচ্ছি। ইভেন বাড়ির সবার দায়িত্ব তোর উপর পরলো।”

আদ্রিশ ভাইয়া অবাক হয়ে বললেন,
“মানে!!আব্বু আর চাচু কোথায় যাবে?”

“তারা দুজন আজ বিকেলে সিলেটে যাবে। ওখানকার জমিজমার ব্যাপারে কিছু দলিলপত্র সাইন করতে হবে তাই। বাড়ি ফিরতে ফিরতে পরশুদিন হয়ে যেতে পারে।”

আদ্রিশ ভাইয়ার চেহারা দেখে মনে হলো , তিনি এবার মহাবিপদে পরলেন। পলাশ ভাইয়ার দিকে তাকিয়ে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
“তাহলে সব দায়িত্ব আমার ঘাড়েই এসে পরলো।”

পলাশ ভাইয়া মুচকি হেসে আদ্রিশ ভাইয়ার কাঁধ থেকে হাত সরিয়ে বললেন,
“ইয়েস চ্যাম্প। তোর ঘাড়েই সব দায়িত্ব এসে পরলো। আমার জানামতে এ দায়িত্ব তোর কাছে কিছুই না। যেখানে এত এত পেশেন্টের সুস্থতার দায়-দায়িত্ব তোর উপর পরে সেখানে এই গুটিকয়েক মানুষের দায়িত্ব নেওয়া কোনো বড় ব্যাপার না।”

“হুম সেটা ঠিক। তবে বাড়ির সবার চিন্তা একদিকে আর ভাবীর চিন্তা আরেকদিকে। ভাবী একা একদম ফিটফাট থাকলে আমার কোনো চিন্তাই থাকতো না। কিন্তু এখানে তো ভাবী একা না। তার সাথে আরেকজনও আছে। কখন কি হয়ে যায় তা কি বলা যায়!”

“এজন্যই তোর উপর ভরসা করে যাচ্ছি। কারন তুই নিজেই ডক্টর। ক্রিটিকাল কন্ডিশনে কি কি পদক্ষেপ নেওয়া উচিত তার সবটাই জানিস।
আর এত চিন্তা করিস কেনো। দেখিস এমন কিছুই হবে না যেটা তুই ভাবছিস।”

আদ্রিশ ভাইয়া এবার রাইসা ভাবীর দিকে তাকিয়ে নিজেকে আশ্বাস দিয়ে বললেন,
“আই হোপ এমন কিছুই যেনো না হয়।”

পলাশ ভাইয়া আদ্রিশ ভাইয়ার সামনে থেকে সরে আমাদের সামনে এসে দাঁড়ালেন। নদী আর আমাকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
“রাইসার একটু খেয়াল রেখো। আম্মুর আর চাচির তো সারাদিন সংসার সামলাতেই চলে যায়। তাদের দুজনকে আর এ নিয়ে কিছু বলিনি তাই। চেষ্টা করো রাইসার সাথে সময় কাটানোর। ”

নদী হালকা মাথা দুলিয়ে বললো,
“একদম চিন্তা করবে না ভাইয়া। তুমি ঢাকায় গিয়ে মন লাগিয়ে কাজ করো। এখানকার সব টেনশন আমার,মিম আপুর আর ছোট ভাইয়ার উপর ছেড়ে যাও। ”
এই বলে নদী আমাকে আর আদ্রিশ ভাইয়াকে নিয়ে রুম থেকে বেড়িয়ে গেলো। আমাদের নিয়ে বেড়িয়ে যাওয়ার কারন, সে পলাশ ভাইয়া আর রাইসা ভাবীকে একটু সময় দিতে চাইছে। ব্যাপারটা আমি বুঝতে পারলাম। হয়তো আদ্রিশ ভাইয়াও বুঝতে পেরেছেন। তবে উনার চেহারার হাবভাব দেখে তা বুঝার উপায় নেই। উনি এখন গভীর কোনো চিন্তায় আছেন। উনার এ চিন্তার কারন একটু হলেও আন্দাজ করতে পেরেছি আমি।

.

বিকেলে আমি, নদী আর রাইসা ভাবী মিলে জমিয়ে আড্ডা দিলাম। আড্ডার মাঝে রাইসা ভাবী বেশ কয়েকবার অন্যমনস্ক হয়ে পরেছিলো। তবে তাকে আড্ডার মাঝে আবারো এনে প্রাণবন্ত করে তোলে নদী। আসলে নদী মেয়েটাই এমন। কারোর মন ভালো করতে হয় কিভাবে তা তার জানা আছে। অথচ আমি এ কাজটা একদমই পারিনা। কেনে যেনো আমার দ্বারা এটা ঠিকভাবে হয়না। মাঝেমধ্যে মনে হয়, কাকে কি বলে ফেলবো,এতে তার মন ভালো হওয়ার বদলে উল্টো খারাপ হয়ে যাবে। এজন্যই আমি এসব পরিস্থিতি থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে চাই। আজ হয়তো বাঁচতে পারতাম না এ পরিস্থিতি থেকে। তবে নদী আছে বলে বেঁচে গিয়েছি। সে রাইসা ভাবীর ধ্যানমগ্ন অন্য জায়গায় করতে ব্যস্ত। তার সহযোগী হিসেবে আমিও আছি।
পলাশ ভাইয়া যাওয়ার পর থেকে রাইসা ভাবী মনমরা হয়ে সময় কাটিয়েছিলো। বারবার পলাশ ভাইয়া আর নিজেদের অনাগত সন্তানকে নিয়ে কথা বলছিলো। ভাবীর একটাই কথা,তা হলো, যদি পলাশ ভাইয়া না থাকতেই ভাবীর ডেলিভারি হয়ে যায় তাহলে তো তাদের প্রথম সন্তান নিজের বাবার মুখ আগে দেখতে পারবে না। এটাই রাইসা ভাবীকে চিন্তার এক গভীর সাগরে ডুবিয়ে দিয়েছে। আমি আর নদী সেই চিন্তার সাগর থেকে রাইসা ভাবীকে উদ্ধারের চেষ্টায় মত্ত হলাম।
কয়েক ঘন্টার ব্যবধানে রাইসা ভাবীর চিন্তা দূর হলো খানিকটা। এখন সে বেশ হাসিখুশি আছে। আমাদের আড্ডার মাঝে মাগরিবের আজান দিলো। রাইসা ভাবীর রুমে বসেই আড্ডা দিচ্ছিলাম বলে নদী আর আমি রাইসা ভাবীকে রেখে নদীর রুমে চলে আসলাম৷
রুমে এসে দুজনে ওজু করে নামাজ পরতে বসে গেলাম। নামাজ শেষে নদী বসে পরলো পড়ালেখা নিয়ে। আর আমি বসে পরলাম ফোন নিয়ে।
ফোন হাতে নিতেই আদ্রিশ ভাইয়ার কথা মনে পরলো আমার। আজ সারাদিনের ব্যস্ততায় আজকের সকালের ঘটনা বেমালুম ভুলে বসেছিলাম। তবে এখন একটু শান্ত,স্থির হতেই আবারো সব কথা মাথায় ঘুরপাক খেতে লাগলো। পার্থক্য একটাই সকালে আমি মাত্রাতিরিক্ত খুশি ছিলাম তবে এখন আছি চিন্তায়। আমার প্রধান চিন্তার কারন ‘মাহা’। এই মেয়েটা আসলে কে? আদ্রিশ ভাইয়ার সাথে মাহা’র সম্পর্ক কি তাই যা আমি এতোদিন ভেবে আসছি? সে কি সত্যিই আদ্রিশ ভাইয়ার গার্লফ্রেন্ড? এতোদিনে উনাদের দুজনের কথাবার্তা শুনে এমনটাই মনে হয়েছে আমার। যদি এমনটাই হয়ে থাকে তাহলে আদ্রিশ ভাইয়া আমাকে ভালোবাসবেন কেনো?
মাহা নামক কারোর উপস্থিতি উনার জীবনে থেকে থাকার পরও যদি আমাকে উনি ভালোবেসে থাকেন তাহলে এ সম্পর্ক কোনোভাবেই এগিয়ে নিয়ে যাওয়া উচিত না৷ কারন মাহাকে ভালোবাসার পরও যদি আমাকে উনি ভালোবাসতে পারেন, তাহলে ভবিষ্যতে আমার অনুপস্থিতিতে উনি অন্য কাউকেও ভালোবাসতে পারবেন। এতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে এতোদিন উনার সাথে থেকে উনার চরিত্র সম্পর্কে একটু হলেও ধারণা এসে গিয়েছে। এতে এমনটা করা অবিশ্বাস্য ব্যাপার।

এতো এতো সব প্রশ্নের উত্তর শুধুমাত্র আদ্রিশ ভাইয়াই দিতে পারেন। কিন্তু উনার সাথে সরাসরি এ বিষয়ে কি করে কথা বলবো। সরাসরি এসব বিষয়ে কথা বলার মত সাহস একটুও নেই আমার মাঝে। হ্যাঁ,তখন কথা বলতে পারবো যখন উনি আগ বাড়িয়ে কথা বলতে আসবেন। কিন্তু উনি আদৌ আসবেন কি?

আদ্রিশ ভাইয়া তো নিজের মনের খবর জানেন। কিন্তু আমার মনের খবর কি আদৌ জানেন? অবশ্য আমি নিজেই আমার মনের খবরকে চাপিয়ে রাখি। আমি কখনোই এসব বিষয়ে আমার মনকে উস্কানি দেয়নি। আমার তো মনে হয় না, উনার সামনে আমি এমন কিছু করেছি যাতে উনি বুঝতে পারেন উনাকে আমি পছন্দ করি। আর উনি তো জানেনই আমি কাউকে আগ বাড়িয়ে কিছু না বললে সে আমার মনের খবর জানতে পারবে না। এক্ষেত্রে উনারও জানার কথা নয়। তবে যাই হোক,সব প্রশ্ন,সব যুক্তি একটা জায়গায় এসেই আটকে যায়। তা হলো মাহা নামক মেয়েটা কে? এ নিয়ে এ মূহুর্তেই আদ্রিশ ভাইয়ার সাথে কথা বলা উচিত। নাহলে এসব প্রশ্ন আমার মাথার অর্ধেক নিউরন ড্যামেজ করে দিবে। উনাকে এ বিষয়ে সরাসরি নয়,বরং ঘুরিয়ে প্যাঁচিয়ে জিজ্ঞাস করতে হবে। এসময় আদ্রিশ ভাইয়া নিশ্চয়ই উনার রুমে আছেন। সেখানে গিয়ে কথা বললেই সব প্রশ্নের জবাব পাবো।

এসব ভেবে আমি ধীরেসুস্থে বিছানা থেকে নেমে পরলাম। খুব সাবধানে পা ফেলে সামনের দিকে এগুতে লাগলাম, যাতে নদী আমার অনুপস্থিতি পরে টের না পায়।

নদীর রুমে থেকে বেড়িয়েই আমি আদ্রিশ ভাইয়ার রুমের সামনে চলে এলাম। উনার রুমের দরজা হালকা ভিজানো রয়েছে। আমি দরজার এপাশে দাঁড়িয়ে উনার রুমে উঁকি দিতেই দেখলাম রুমের মাঝ বারবার ফ্যানের নিচে চেয়ারে বসে আছেন উনি। গভীর মনযোগ দিয়ে কিছু একটা লিখছেন উনি। চোখে চিকন ফ্রেমের চশমা, দু কানে ইয়ারফোন গুঁজিয়ে রাখা। ভ্রুজোড়া একটু কুঁচকিয়ে রেখেছেন। তবে ঠোঁটের কোনে সেই মনোমুগ্ধকর হাসি। উনার এ কর্মকাণ্ডগুলো লুকিয়ে দেখতে কেনো যেনো খুব ভালো লাগছে। বিশেষ করে উনার অগোচরে উনাকে পর্যবেক্ষণের কাজটা করায় আলাদা এক সুখ,এক প্রশান্তি অনুভব করছি। যদিও কাজটা করা বেহায়ার মত হয়ে যাচ্ছে। তবে পছন্দের মানুষকে যদি একটু লুকিয়ে দেখার সুযোগ পাওয়া যায়, তাহলে আমি হাজারবার বেহায়া হতে রাজি।

“লুকিয়ে লুকিয়ে কি দেখা হচ্ছে? ”

হঠাৎ পিছনে কারোর কণ্ঠস্বর শুনতে পেয়ে চমকে উঠলাম আমি। চকিতে মাথা ঘুরিয়ে দেখতে পেলাম রাইসা ভাবী দাঁড়িয়ে আছে। চোখেমুখে তার দুষ্টুমি এক হাসি। তার এ হাসির কারনটা বুঝতে বাকি রইলো না আমার। সে যে আমাকে হাতেনাতে ধরে ফেলেছেন তা বুঝতে পারলাম আমি। তবে ভাবীর কাছে যে ধরা পরে গিয়েছি তা উনাকে কিছুতেই বুুঝতে দেওয়া যাবে না।
আমি উনার দিকে ফিরে দৃঢ় কণ্ঠে বললাম,
“কিছুই তো দেখা হচ্ছে না।”

রাইসা ভাবী ঠোঁটের কোনে আগের সে হাসিই ঝুলিয়ে রেখে বললো,
“মিথ্যা বলো না। আমি তো তোমাকে একদম হাতেনাতে ধরে ফেলেছি।”

আমি অবুঝ হওয়ার ভান ধরে বললাম,
“কি করেছি আমি? যে তুমি বলছো হাতেনাতে ধরে ফেলেছো। বলো বলো।”

রাইসা ভাবী ভ্রু নাচিয়ে বললো,
“আমার সাথে চালাকি হচ্ছে তাইনা? আদ্রিশের রুমে বাইরে কি করছিলে?”

আমি আমতাআমতা করে বললাম,
“উ-উনার রু-রুমের বাইরে কোথায়? আমি তো ডাইনিং এ দাঁড়িয়ে আছি। উনার রুমের বাইরে কিচ্ছু করছিলাম না।”

“ওওওও তাই নাকি!! আদ্রিশের রুমের বাইরে দাঁড়িয়ে ওর রুমে উঁকি দিচ্ছেলে না? ”

বুঝলাম রাইসা ভাবীর থেকে বাঁচতে পারবো না। এটা স্বীকার করতেই হবে যে উনার রুমে আমি উঁকি দিচ্ছিলাম। তবে এরা স্বীকার করলেও কি কারনে উঁকি দিচ্ছিলাম সেটা তো আর বলা যাচ্ছে না। অন্যকিছু বলতে হবে।

আমি অকপটে স্বীকার করে নিলাম,
“হুম উঁকি দিচ্ছিলাম তো। আমি কি মানা করেছি নাকি? আমি কি একবারো বলেছি উনার রুমে আমি উঁকি দিচ্ছিলাম না?”

রাইসা ভাবী আমার কথায় শব্দ করে হেসে বললো,
“মেয়েটা একটা জালে ফেঁসে গিয়েছে। বুঝতে পারছি তো।”

আমি আবারো অবুঝ হওয়ার ভান ধরে বললাম,
“কিসের জাল?”

রাইসা ভাবী সে প্রশ্নের জবাব না দিয়ে জিজ্ঞাস করলো,
“ওর রুমে উঁকি দিচ্ছেলে কেনো?”

আমি জানতাম ভাবী এ প্রশ্নটা করবে। তবুও আমি সময়মতো কোনো জবাব তৈরী করতে পারি নি। এখন কি জবাব দিবো তাই চিন্তা করছি।
কয়েক সেকেন্ড ভাবতেই চট করে বলে ফেললাম,
“ঐ যে আরকি মেডিকেলের কয়েকটা বই দেখতে এসেছিলাম। অনেক কিউরিওসিটি কাজ করছিলো তাই আরকি।” এই বলে আমি জোরপূর্বক এক হাসি টেনে আনলাম ঠোঁটের কোনে।
রাইসা ভাবী যে আমার এ কথা বিশ্বাস করলো না, তা তার চেহারার হাবভাবে বুঝতে পারলাম। ভাবী দুহাত বুকে গুঁজে বললো,
“তো রুমে যাও। এভাবে উঁকি মারছো কেনো? ”

“না মানে এখন সব কিউরিওসিটি হারিয়ে ফেলেছি। আমি বরং এখন রুমে চলে যাই। যখন আবার কিউরিওসিটি ফিল করবো তখন চলে আসবো।”
এই বলে আমি দ্রুত পায়ে নদীর রুমে চলে আসলাম। আপাতত আর কথা বানানোর ইচ্ছা নেই আমার। যথেষ্ট মিথ্যা বলেছি। রাইসা ভাবী নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছে কিছু। যাই হোক, বুঝতে পারলে আমার কি। সে তো আর কিছু বলছে না। তবে এতোকিছু ওখানে হলো, তা আদ্রিশ ভাইয়া না জানতে পারলেই হলো। অবশ্য উনার জানারও কথা নয়। কারন উনার দু কানেই ইয়ারফোন গুঁজিয়ে রাখা ছিলো। হুম,উনি কিছু শুনেননি। আপাতত নিজেকে এসব সান্ত্বনা দেওয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই।

.

সকাল সকাল নদীর রুমে আদ্রিশ ভাইয়া,রাইসা ভাবী,বড় মামি,ছোট মামি আর মেজ নানুকে দেখে আমি খুব অবাক হলাম।
কেবলই ঘুম ভেঙেছে আমার। নদী এখনও ঘুমিয়ে আছে। বিছানার সামনে সবাইকে একসাথে দেখে বেশ বড়সড় একটা ধাক্কা খেলাম। এ নিয়ে উনাদের কিছু প্রশ্ন করার আগেই আদ্রিশ ভাইয়া নদীর দুবাহু ধরে জোরে জোরে ঝাঁকিয়ে ঘুম থেকে ডেকে তুললো তাকে। এভাবে ঘুম থেকে জাগিয়ে তোলায় বেশ ভয় পেয়ে গিয়েছে নদী, তার চেহারা দেখেই বুঝতে পারলাম আমি।
নদী চোখ বড় বড় করে দ্রুত শোয়া থেকে উঠে বসলো। সাথে সাথে সবাই একসাথে বলে উঠলো,
“হ্যাপি বার্থডে প্রিন্সেস।”

উনাদের এ সারপ্রাইজে নদী বেশ বড় একটা শক পেয়ে গেলো। সাথে আমিও। কারন নদী আমাকে বলেইনি যে আজ তার জন্মদিন!
সবার জন্মদিনের উইশ পেয়ে নদী খুশিতে দুহাত দিয়ে মুখ চেপে ধরলো। খানিক সময় সবার দিকে তাকিয়ে থেকে ভেজা গলায় বলল,
“থ্যাংকইউ সবাইকে। আমি ভুলেই গিয়েছিলাম যে আজ আমার জন্মদিন। ”
নদীর কথায় আদ্রিশ ভাইয়া মুচকি হেসে তার মাথায় গাট্টা মেরে বললেন,
“তুই তো নাম্বার ওয়ান ভুলোমনা। কিন্তু তুই ভুলে গেলে কি হবে। আমরা তো মনে রেখেছি। ”

নদী কথার প্রতিউত্তরে আর কিছু বললো না। শুধু তৃপ্তির এক হাসি দিলো। আমি কিছুক্ষণ সেদিকে তাকিয়ে থেকে নদীকে বললাম,
“হ্যাপি বার্থডে নদী।”

নদী মুচকি হেসে বলল,
“থ্যাংকস মিম আপু।”

এই বলে নদী বাকি সবার দিকে ছলছল দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। হয়তো সে আশা করেনি এমন কিছু হবে।

উপস্থিত সকলে নদীর সাথে টুকটাক কথাবার্তা বলে রুম থেকে বেড়িয়ে গেলো। সাথে সাথে নদী আমার দিকে ফিরে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলল,
“আপু, আজকে তুমি আর আমি বিকেলে শাড়ী পরবো। ওকে?”

নদীর আবদারে আমি চমকে উঠে বললাম,
“হঠাৎ শাড়ী! আমি পরতে পারিনা তো। আর বড় কথা হলো আমি নিজের সাথে কোনো শাড়ী আনেনি।”

নদী আমাকে আশ্বস্ত করে বলল,
“ওসব নিয়ে একদম চিন্তা করো না। শাড়ী আমার কাছে আছে। তুমি শুধু হ্যাঁ বলে দাও। দেখো,আজকে আমার জন্মদিন। সো মানা করো না প্লিজ।”

হাজারো অনিচ্ছা সত্ত্বেও আমাকে নদীর এ আবদারে রাজি হতে হলো।

®সারা মেহেক

#চলবে