ভালোবাসার রঙিন প্রজাপতি পর্ব-২৫+২৬

0
1178

#ভালোবাসার_রঙিন_প্রজাপতি
#লেখনীতে:সারা মেহেক

২৫

শাড়ী নামক বস্ত্র পরার পর একজন রমনীকে যতটা মায়াবী দেখা যায়, ঠিক ততটাই দুঃসাধ্য ব্যাপার ঘটে শাড়ী পরার সময়। বারো-তেরো হাত শাড়ী শুধু প্যাঁচিয়ে পরলে হয়না। সাথে কুঁচি দিতে হয়। এই কুঁচি ঠিক করাই সবচেয়ে দুঃসাধ্য এক ব্যাপার মনে হয় আমার কাছে। যারা প্রতিনিয়ত শাড়ী পরে তাদের জন্য এ কুঁচি দেওয়া একদম ডালভাত। তবে আমরা যারা বিশেষ কিছুদিনে শাড়ী পরি তাদের কাছে কুঁচি দেওয়া পোলাও কোর্মার মত ব্যাপার স্যাপার।

শাড়ী একদম ঠিকঠাক পরতে পারে বলে নদী রেডি হয়ে গিয়েছে অনেকক্ষণ আগেই। আর আমি সেজেগুজে শাড়ী দু প্যাচ লাগিয়ে পুরো রুমময় টইটই করে ঘুরে বেড়াচ্ছি। এই গরমে শাড়ী পরা মানে গরমকে নতুন করে নিমন্ত্রণ করা। কিন্তু বার্থডে গার্ল এর আবদার রাখতে অনিচ্ছা সত্ত্বেও সেই অসহ্য গরমকেও নিমন্ত্রণ জানাতে হলো। সেই নিমন্ত্রণে গরম এসে উপস্থিতও হলো।
প্রচণ্ড গরমে এক জায়গায় বসে থাকতে পারছি না আমি৷ এজন্য পুরো রুমময় হেঁটে বেড়াচ্ছি। আর অপেক্ষা করছি ছোট মামির। কখন ছোট মামি আসবে আর কখনই বা আমাকে শাড়ী পরিয়ে দিবে!
নদী অন্যকে শাড়ী পরিয়ে দিতে পারলে আমাকে এ মূহুর্তে এমন সময় কাটাতে হতো না। সে তো শুধু নিজেকেই ঠিকঠাক মতো শাড়ী পরাতে পারে। অন্য কাউকে পরাতে গেলে বলে সব উল্টাপাল্টা করে ফেলে। কি এক মহাযন্ত্রনা!

নদী ড্রেসিং টেবিলের সামনে গিয়ে মেকআপের ফাইনাল টাচআপ দিচ্ছে। আজ বেশ ভারী মেকআপ করেছে সে৷ আমিও করতে চাইছিলাম এমনটা। কিন্তু আমার মুখ মাত্রাতিরিক্ত ঘেমে যায় বলে ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও ভালো মেকআপ করতে পারিনি। একদম হালকা মেকআপে কাজ সেরে ফেলেছি।
নদী নিজের শাড়ীর আঁচল ঠিক করতে করতে বলল,
“আপু, তোমার ব্লাউজ ঠিক করার জন্য কি আর সেফটিপিন লাগবে?”

পরনের ব্লাউজটা এদিক ওদিক দেখে বললাম,
“না, আর লাগবে না বোধদয়। তারপরেও তুমি একটু দেখো তো।”

নদী আমার কথায় আমার ব্লাউজের ফিটিং দেখে বলল,
“নাহ,আর লাগবে না৷ একদম পার্ফেক্ট আছে।”

“ভালো কথা। তুমি প্লিজ একটু ট্রাই করে দেখো তো, আমাকে শাড়ী পরাতে পারো কি না। ”

“আমি পারি না আপু। এর আগে আমার শাড়ী পরা শেষে আমি আমার এক ফ্রেন্ডকে শাড়ী পরাতে নিয়েছিলাম। শাড়ী তো পরানো হলো না, উল্টো তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ লাগিয়ে দিলাম যেনো। সেদিনের পর থেকে বুঝতে পারলাম, আমার দ্বারা অন্যকে শাড়ী পরানো সম্ভব নয়।”

নদীর কথায় আমি হতাশার এক দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। ক্লান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম দরজার দিকে। কখন ছোট মামি আসবে আর কখনই বা আমাকে শাড়ী পরিয়ে দিবে!
ওদিকে নদী টাচআপ শেষে রুমের মধ্যেই এক এক করে সেলফি তুলতে লাগলো। এদিকে আমি প্রচণ্ড গরমে শাড়ীর সেই দু প্যাঁচও খুলে ফেললাম। বিছানায় বসে পাশে শাড়ী রেখে ফোন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পরলাম।

দরজা হালকা ভিজিয়ে দেওয়া আছে। হঠাৎ কে যেনো দ্রুত দরজা খুলে রুমের ভিতের প্রবেশ করলো। দরজায় টাঙানো পর্দার জন্য মানুষটাকে দেখতে পারছি না। হয়তো ছোট মামি এসেছে। তাকে ভেবেই আমি বসা থেকে উঠে শাড়ী হাতে একটু এগিয়ে গেলাম। ছোট মামি এসেছে ভেবে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে সামনে তাকাতেই চমকে উঠলাম আমি। আমার এ চমকে উঠার কারন সামনের মানুষটি। সামনের মানুষটি আর কেউ নয় বরং আদ্রিশ ভাইয়া। উনাকে এ মূহুর্তে রুমে দেখে আমি আকাশ থেকে পরলাম যেনো। তড়িৎ গতিতে শাড়ীর একটু অংশ ব্লাউজের উপর দিয়ে প্রায় পুরো শরীর আবৃত করে ফেললাম আমি।

আদ্রিশ ভাইয়া ফোন চালাতে চালাতে রুমে প্রবেশ করেছিলো। একটু এগিয়ে এসেই ফোন থেকে মাথা তুলে সামনে তাকিয়ে বললেন,
“নদী, আমি বাজারে যাচ্ছি। কিছু……. ” মাঝপথে থেমেই উনি তাজ্জব দৃষ্টিতে আমার দিকে চেয়ে রইলেন। উনার এ তাকিয়ে থাকা দেখে আমার প্রচণ্ড রাগ উঠে গেলো। আমি চোখ রাঙিয়ে উনার দিকে তাকিয়ে রইলাম। এতেও উনার কোনো হেলদোল নেই৷ যেনো স্ট্যাচু হয়ে গিয়েছেন। উনার এ কাণ্ডে আমি তারস্বরে চেঁচিয়ে উঠে বললাম,
” এই অসভ্য, বেয়াদব, ম্যানারলেস লোক কোথাকার! বেহায়া লোক কোথাকার! হা করে তাকিয়ে আছেন কেনো? এক্ষুনি রুম থেকে বের হোন বলছি। জলদি বের হোন। নাহলে এক ধাক্কায় একদম রুমের বাইরে পাঠিয়ে দিবো।” এই বলে আমি রাগে ফুঁসতে লাগলাম।
অপেক্ষা করছি আদ্রিশ ভাইয়ার রুম থেকে বেড়িয়ে যাওয়ার। কিন্তু উনি না বের হয়ে উল্টো ভয়ার্ত দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে দ্রুত এদিক এগিয়ে আসতে লাগলেন। উনাকে এদিকে এগিয়ে আসতে দেখে আমার চোখজোড়া বিস্ময়ে বড় হয়ে এলো। আমি কিছু বলতে যাবো তার আগেই আদ্রিশ ভাইয়া গলা খাদে নামিয়ে ভয়ার্ত স্বরে বললেন,
“ইয়া আল্লাহ! এই মেয়ে কত জোরে চেঁচায়! আস্তে চিৎকার করো। সারা শহরের লোকজন জড়ো করবে নাকি!”

আদ্রিশ ভাইয়ার কথা আমার উপর কোনো প্রভাব ফেললো। বরং উনার এগিয়ে আসা দেখে আমার রাগ উঠে গেলো। আমি রাগান্বিত স্বরে দাঁতে দাঁত চেপে চেচিয়ে বললাম,
” এই অসভ্য, ইতরজাত প্রাণি। ভালোয় ভালোয় বলছি এক্ষুনি বের হোন। নাহলে খুব খারাপ হয়ে যাবে বলছি। ম্যানারলেস, ক্যারেকটারলেস ছেলে কোথাকার! এতোকিছু বলছি, তারপরেও দাঁড়িয়ে আছে!”

আমার কথায় হাসির কি ছিলো কে জানে। আদ্রিশ ভাইয়া মুখ টিপে হেসে বললেন,
“আচ্ছা আচ্ছা, যাচ্ছি। তুমি প্লিজ গলার স্বর একটু নিচে নামাও। বাড়িতে মানুষ আছে। কি না কি ভেবে বসে!”

আমি আবারো দাঁতে দাঁত চেপে বললাম,
“আপনি বের হচ্ছেন নাকি ধাক্কা মেরে বের করবো!”

আমার কথা শেষ হতেই আদ্রিশ ভাইয়া হাসতে হাসতেই বললেন,
“নদী, সেলফি তোলা বাদ দিয়ে আগে ওকে সামলা। দেখ কি রেগে আছে। আমি যাচ্ছি। তোর কিছু লাগলে ফোন করে জানিয়ে দিস।”
এই বলে আদ্রিশ ভাইয়া আর পিছে ফিরে না তাকিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেলেন। এদিকে রাগে আমার মাথা গরম হয়ে এলো।
নদী পিছন থেকে এসে আমার সামনে দাঁড়িয়ে বলল,
“রিল্যাক্স আপু, এতো হাইপার হচ্ছো কেনো! ছোট ভাইয়া আসার পর পরই তুমি শাড়ী দিয়ে নিজেকে ঢেকে নিয়েছিলে না?”

আমি জোরে জোরে শ্বাস ফেলে বললাম,
“হুম। তারপরেও উনি…”

আমাকে মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে নদী বলল,
“তাহলে চিন্তা কিসের? মাথা ঠাণ্ডা করো।” এই বলে নদী চুপচাপ আমার দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। খেয়াল করলাম তার চোখেমুখে চাপা এক হাসি।

.

আমি আর নদী এখন সেই নতুন বাড়ির পুকুরপাড়ে দাঁড়িয়ে আছি। তখন আদ্রিশ ভাইয়া চলে যাওয়ার কিছুক্ষণের মাঝেই ছোট মামি নদীর রুমে চলে এসেছিলো। আমাকে শাড়ী পরিয়ে দিতে দিতে জিজ্ঞাস করলো, আমি কি কারনে চিৎকার করেছিলাম। মামির এ প্রশ্নের জবাব না দিতে আমি প্রশ্নটা নানা কথার মাধমে এড়িয়ে চলি। তখন ছোট মামি ওয়াশরুমে ছিলো বলে, আমি কি কি বলে চেঁচিয়েছি তা সে জানে না৷ এমনকি বাড়ির কেউই জানে না। কারন সবাই তখন ভাতঘুমে ব্যস্ত ছিলো।

ঘড়িতে এখন সময় পাঁচটা পাঁচ। তপ্ত বিকেলের হালকা সোনালী রোদ আছড়ে পরছে পুকুরের পানিতে। চারপাশে বয়ে চলছে উষ্ণশীতল এক বিকেল হাওয়া। সেই হাওয়ার তালে হালকা ঢেউ উঠেছে পুকুরে। বিকেলের সেই সোনালী রোদের সাথে নামহীন এক খেলায় মেতে উঠেছে পুকুরের শীতল পানি।
আমি এক ধ্যানে সেদিকে তাকিয়ে আছি। আশেপাশে মানুষজনের আনাগোনা নেই বলেই আমি আর নদী কিছুক্ষণ আগে এদিকটায় ঘুরে এলাম। বেশ গরম লাগায় পুকুরপাড়ে এসে একটু শরীর জিড়িয়ে নেওয়ার জন্য দাঁড়িয়ে পরলাম।
চারপাশে বয়ে চলা মৃদুমন্দ হাওয়া আমাকে স্নিগ্ধ এক অনুভূতি দিয়ে গেলো। আমি চোখ বন্ধ করে সবটা অনুভূত করছি। অনুভব করছি হাওয়ার তালে ভেসে বেড়ানো আমার চুলের নাচন।

হঠাৎ নদী বলে উঠলো,
“আপু, চলো ওদিকটায় আরেকটু ঘুরে এসে নতুন বাড়িতে গিয়ে উঠি। সেখানকার ছাদে গিয়ে ছবি তুলবো ভাবছি। অনেক সুন্দর সুন্দর ছবি উঠে ওখানে। ”
নদীর আরেক আবদারে সায় দিয়ে বললাম,
“আচ্ছা চলো।”

নদী আর আমি পুকুরের আশেপাশে ঘুরলাম। এরপর ওদিককার সুনসান এক জমির জায়গা দিয়ে ঘুরে নতুন বাড়িতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম।
এদিকে মানুষজন তুলনামূলক কম থাকে। নিরিবিলি এক জায়গা। হঠাৎ হঠাৎ দু একজন কৃষক গোছের লোক মাথা নিচু করে হেঁটে চলে যাচ্ছে। ফলে আমার আর নদীর কোনো সমস্যা হয়নি।

জমি পেরিয়ে বাড়ির রাস্তায় এসে থমকে দাঁড়ালাম আমি। কারন আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন আদ্রিশ ভাইয়া। আমাদের দিকে পিঠ দিয়ে কারোর সাথে ফোনে কথা বলছেন উনি। উনাকে এ মূহুর্তে এখানে মোটেও আশা করিনি আমি। এখন শাড়ী পরা অবস্থায় উনার সামনে দিয়ে যাওয়ার কথা ভাবতেই গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠলো আমার।
আদ্রিশ ভাইয়ার কাছ থেকে বাঁচতেই আমি নদীকে বললাম,
“নদী, ওদিকটায় চলো। এখানকার এতো নিরিবিলি পরিবেশ আর ভালো লাগছে না। বাড়ির আশেপাশে ঘুরে বেড়াই গিয়ে চলো।”

নদী আমার কথার তোয়াক্কা না করে বলল,
“ইম্পসিবল, এখন তো আমি মোটেও বাড়ির ওদিক যাচ্ছি না আপু। ঐ দেখছো না,ছোট ভাইয়া এসেছে? ভাইয়াকে দিয়ে এখন সুপার-ডুপার কয়েকটা ছবি তুলিয়ে নিবো। আর এতক্ষণ আমরা দুজন একই ফ্রেমে ছবি তুলতে পারছিলাম না, কারন ছবি তুলে দেওয়ার মানুষ ছিলো না। কিন্তু এখন দেখো… না চাইতেও ছবি তুলে দেওয়ার মানুষ এসে হাজির। আহা..কি আনন্দ। ”

আমি আন্দাজ করেছিলাম, নদী কিছুতেই যেতে চাইবে না। আমার আন্দাজ অবশেষে সত্য প্রমাণিত হলো। কিন্তু আর যাই হোক, আমি আদ্রিশ ভাইয়ার সামনে এভাবে যেতে পারবো না। কারন, আদ্রিশ ভাইয়ার পছন্দ সম্পর্কে জানা আছে আমার। এভাবে শাড়ী পরে উনার সামনে যাওয়া মানে উনার মনযোগ আমার দিকে টেনে নেওয়া। আর এটা আমি হতে দিতে চাইনা। কারন এ বিষয়টা আমাকে বেশ অস্বস্তিতে ফেলে দিবে। এ পরিস্থিতিতে বাঁচতে এখন কি করবো তাই ভাবতে লাগলাম।
কিন্তু নদী আমাকে সে ভাবনাটুকুও ভাবতে দিলো না। আমার হাত টেনে নিয়ে দ্রুত পায়ে আদ্রিশ ভাইয়ার কাছে চলে এলো। এক হাত দিয়ে আমার হাত ধরে রেখে অপর হাত দিয়ে আদ্রিশ ভাইয়ার কাঁধে হাত দিয়ে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলল,
“ছোট ভাইয়া…..”

নদীর ডাকে আদ্রিশ ভাইয়া ফোন কানে রেখেই ঘাড় ঘুরিয়ে এদিকে তাকালেন। উনার দৃষ্টিজোড়া যে আমার উপর এসে নিবদ্ধ হলো তা চট করে ধরে ফেললাম আমি। ফলে সাথে সাথে লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেললাম।
ওদিকে আদ্রিশ ভাইয়া নদীকে জিজ্ঞাস করলেন,
“কি ব্যাপার? এতো সেজেগুজে এখানে কেনো?”

নদী আগের মত উচ্ছ্বসিত হয়ে বলল,
“একটু ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম। এখন নতুন বাড়ির ছাদে গিয়ে একটু ছবি তুলবো। আর সেখানে ক্যামেরাম্যান হবে তুমি।”

আদ্রিশ ভাইয়া বিস্মিত কণ্ঠে বললেন,
“আমি!”

“হুম তুমি। এতক্ষণ আমরা দুজন একই ফ্রেমে আসতে পারছিলাম না, এখন তুমি চলে এসেছো। তাই তুমিই আমাদের ছবি তুলে দিবে।”

“আচ্ছা! ছবি তুলে দিলে কি বকশিশ পাবো?”

“তুমি যা চাইবে তাই।”

“আচ্ছা,চল তাহলে। তোদের সুপার-ডুপার কয়েকটা ছবি তুলে দেই।”
এই বলে উনি স্থির দাঁড়িয়ে রইলেন। নদী আমার হাত ধরে উনাকে পাশ কাটিয়ে নতুন বাড়ির দিকে চলে এলো।

বাড়ির সিঁড়িঘরের কাছে এসে নদী আমার হাত ছেড়ে দিয়ে নিজের শাড়ীর কুঁচিগুলো শক্ত হাতে ধরলো। এরপর এক পা দু পা করে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে লাগলো। কয়েক সিঁড়ি উঠে যাওয়ার পর সে আমার উদ্দেশ্যে বলল,
“আপু, তুমি চলে এসো। শাড়ী পরে সিঁড়ি দিয়ে উঠা একটু কষ্টকর বলে এভাবে যাচ্ছি। তুমিও চাইলে এভাবে আসতে পারো।”

নদীর কথামত ডান হাত দিয়ে শাড়ীর কু্ঁচি শক্ত করে ধরে প্রথম সিঁড়িতে পা রাখলাম। সাথে সাথে মনে হলো আমি ব্যালেন্স হারিয়ে পিছনে পরে যাচ্ছি। তড়িৎগতিতে ডান হাত কুঁচি থেকে সরিয়ে দেয়ালে ভর দিলাম। এখনো বাড়ির কাজ সম্পূর্ণ হয়নি বলে সিঁড়ির রেলিংও লাগানো হয়নি। এজন্য শেষ ভরসা রইলো এই দেয়াল। তবে এই দেয়ালকেও ভরসার কাতারে ফেলা যায়না। কারন আঁকড়ে ধরার মতো কিছুই নেই এ দেয়ালে।
আমি সিঁড়ির দিকে তাকিয়ে একটা শুকনো ঢোক গিললাম। এক সিঁড়ি হতে অপর সিঁড়ির দূরত্ব বেশ খানিকটা। শাড়ী পরে কোনোরকম সাহায্য ছাড়া এ দূরত্ব পার করা দুঃসাধ্য বটে। কিন্তু এখন এ দুঃসাধ্য কাজই আমাকে করতে হবে।
আমি আবারো দেয়াল ছেড়ে ডান হাত দিয়ে শক্ত হাতে কুঁচি ধরে সামনের সিঁড়িতে পা রাখলাম। এ মূহুর্তে নিজেকে নিতান্তই ছোট্ট এক বাচ্চা মনে হচ্ছে, যে মাত্রই হাঁটা শিখেছে।
এক সিঁড়ি পার হয়ে অপর সিঁড়িতে পা রাখতেই মনে হলো আবারো ব্যালেন্স হারিয়ে ফেলছি আমি। সাথে সাথে কুঁচি থেকে হাত সরিয়ে দেয়ালে হাত রাখতে চাইলাম। তবে এমনটা করবার আগেই পিছন থেকে কেউ আমাকে ধরে ফেললো। মূহুর্তেই বুঝে ফেললাম পিছনে থাকা মানুষটা কে।
পিছনে আদ্রিশ ভাইয়ার উপস্থিতি টের পেয়ে আমি দ্রুত নিজেকে সামলে নিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালাম। সাথে সাথে আদ্রিশ ভাইয়া আমার পিছন থেকে সরে গেলেন। এরপর আমাকে পাশ কাটিয়ে তৃতীয় সিঁড়িতে উঠে আমার দিকে ঘুরে তাকালেন। আমার যাওয়ার পথে উনার বাঁধা পেয়ে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে উনার দিকে তাকালাম।
আদ্রিশ ভাইয়া আমার চাহনি দেখে মৃদু হেসে নিজের হাত আমার দিকে বাড়িয়ে বললেন,
“আপনার সাহায্য করতে এসেছি ম্যাডাম। আপনি তো শাড়ী সামলিয়ে উঠতে পারছেন না৷ আশা করি, আমার সাহায্য গ্রহণ করিয়া আমাকে বাধিত করবেন, ম্যাডাম।”

দরখাস্তের মত কথন শুনে আমি ফিক করে হেসে দিলাম। আমার এ মূহুর্তে সত্যিই সাহায্যের প্রয়োজন ছিলো। তাই বিনাবাক্যে আমি উনার হাতে নিজের হাত দিয়ে এক এক করে সিঁড়ি পেরুতে লাগলাম। ছটফটে নদী আদ্রিশ ভাইয়ার এখানে আসার আগেই ছাদে পৌঁছে গিয়েছে।

ছাদের প্রায় কাছাকাছি এসে আদ্রিশ ভাইয়া বললেন,
“অতি মাত্রায় ভদ্র বলে আজ হাত ধরে তোমাকে ছাদে নিয়ে যাচ্ছি। দুষ্টু প্রকৃতির হলে সোজা পাঁজাকোলে তোমাকে নিয়ে ছাদে চলে যেতাম।”

আদ্রিশ ভাইয়ার এমন অকপটে করা স্বীকারোক্তি শুনে আমি থ বনে গেলাম। হালকা একটু কাশি দিয়ে পরিস্থিতিকে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলাম। আমার এ কাণ্ড দেখে আদ্রিশ ভাইয়া আর কথা বাড়ালেন না। তবে যে উনি মুখ লুকিয়ে হেসে চলছেন তা বুঝতে বাকি রইলো না আমার।

ছাদে এসে নদী এই সেই নানা পোজ দিয়ে ছবি তুলে যাচ্ছে। আমি তার থেকে কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে হাত দুটো গুটিয়ে রেখে নদীর ফটোসেশন দেখছি।
আদ্রিশ ভাইয়া নদীর ছবি তুলে দিচ্ছেন। এ ছবি তোলার মাঝে কতবার যে এই বেহায়া লোকটা এদিকে তাকিয়েছেন তার হিসেব নেই। উনার এ চোরাচাহনি থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে মাথা নিচু করে রাখা ছাড়া কিছুই করতে পারলাম না।
নদীর সিঙ্গেল ছবি তোলা শেষে সে আমাকে টেনে নিয়ে নিজের পাশে এনে দাঁড় করালো। উদ্দেশ্য, এখন আমাদের একই ফ্রেমে বন্ধি কয়েকটা ছবি তোলা হবে।
সামনে আদ্রিশ ভাইয়া থাকায় লজ্জায় মাথা নিচু করে স্ট্যাচু হয়ে দাঁড়িয়ে আছি আমি। আমার এ কাণ্ডে নদী শব্দ করে হেসে বলল,
“আরে লজ্জাবতী আপু, এতো লজ্জা কিসের? সামনে তোমার প্রেমিক বা হাজবেন্ড দাঁড়িয়ে নেই যে তুমি এতো লজ্জা পাচ্ছো। ”

নদীর কথায় আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। তাকে এখন কি করে বুঝাই আমার লজ্জার কারন। তবে এভাবে মাথা নিচু করে থাকলে যে আরো কথা শুনতে হবে তা জানা আছে আমার। এজন্য চট করে মাথা তুলে বললাম,
“নাও, এবার মাথা তুলেছি। জলদি জলদি ছবি তুলো।”

নদী এবার বলল,
“চশমা পরে ছবি তুলবে নাকি! আগের ছবিগুলোতে তো চশমা পরোনি। সো এখন চশমা খুলো।”
এই বলে সে আমার চশমা খোলার অপেক্ষায় না থেকে নিজ হাত চশমা খুলে নিলো। এরপর এগিয়ে গিয়ে সামনে রাখা ইটের উপর চশমাটা রেখে এলো।

এদিকে চশমা খোলার পর থেকে আদ্রিশ ভাইয়া আমার দিকে নিষ্পলক তাকিয়ে আছেন। উনার এ চাহনি ঝাপসা দৃষ্টি দিয়েও দেখতে পারছি আমি। কারন উনি আমাদের থেকে খুব বেশি দূরে নন।
আদ্রিশ ভাইয়ার এ বেহায়া নজর দেখে আমার মন চাইলো, উনার চোখদুটো কোনো কাপড় দিয়ে বেঁধে দেই। এতে অন্তত আমি শান্তি পাবো। উনি কি জানেন না, উনার এ চাহনি আমাকে লজ্জার মহাসাগরে ডুবিয়ে দিতে সক্ষম?

পরপর কয়েকটা ছবি তোলা শেষে গরম লাগার বাহানা বানিয়ে আমি নদীর পাশ থেকে সরে এলাম। এবার এসে দাঁড়ালাম আদ্রিশ ভাইয়ার পিছনে, যাতে উনি আমার দিকে না তাকিয়ে থাকতে পারেন। এমনিই কয়েক মিনিটের সে ফটোসেশনে উনার মারাত্মক চাহনি দিয়ে আমাকে যেনো ঝলসে দিয়েছেন উনি।

ওদিকে আদ্রিশ ভাইয়া নদীর ছবি তুলছে আর আমি হাওয়া উপভোগ করার জন্য ছাদের ধারের কাছে দাঁড়িয়ে আছি। কারন এদিকটায় একটু বেশি বাতাস লাগছে।

রেলিঙবিহীন ছাদের একদম কোনায় দাঁড়িয়ে আছি আমি। তবে একটুও ভয় লাগছে না আমার। কারনটা জানা নেই। তবে এটা জানা আছে, এখান থেকে পরলে সর্বোচ্চ হাত পা ভাঙতে পারে। কারন এক তলা উঁচু এ বিল্ডিং থেকে পরার পর এর চেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি আশা করা যায়না। তবে নিচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা দু একটা ইটের উপর পরলেই কেল্লাফতে। আজ প্রচণ্ড গরমে একটু হাওয়া খাওয়ার লোভে এসব কিছুই মনে রাখলাম না আমি।

হঠাৎ সে ঠাণ্ডা হাওয়া বন্ধ হয়ে গেলো। বেশ কিছুক্ষণ ধরেই কোনো হাওয়া চলাচল করছে না। ফলস্বরূপ প্রচণ্ড গরম লেগে গেলো আমার। এদিকে শাড়ী পরা, আবার ওদিকে চুল ছেড়ে দেওয়া। সব মিলিয়ে মনে হলো যেনো, গরমের চোদ্দগুষ্টি এসে হানা দিয়েছে আমার উপর।

আমি হাতে থাকা ফোনটা নিচে রেখে চুলগুলো একত্রে করলাম। গরমের জন্য হাতখোপা করতে চাইলাম। কিন্তু বিপত্তি বাঁধলো আমার কানের দুলের কাছে এসে।
কানের আশেপাশে থাকা গুটিকয়েক ছোট চুল দুলের ডিজাইনে এসে আটকে গেলো। বার কয়েক চেষ্টার পরও সে চুলগুলো দুলের ডিজাইন থেকে বের করতে পারলাম না। না দেখে হাতরে হাতরে অনেকবার চেষ্টার পরও কোনো ফল পেলাম না। এদিকে লাগছে প্রচণ্ড গরম। অস্থির লাগছে খুব।

“আমি কি হেল্প করতে পারি, মিশমিশ?”

হঠাৎ আদ্রিশ ভাইয়ার কণ্ঠে চমকে উঠলাম আমি। ফলস্বরূপ কয়েক কদম পিছিয়ে এলাম। কিন্তু ওদিকে পিছিয়ে গেলে যে আমি এক মরণফাঁদে পরবো তা খেয়াল ছিলো না আমার৷
আকস্মিকভাবে আদ্রিশ ভাইয়ার কণ্ঠস্বর শুনতেই আমার পুরো শরীর পিছিয়ে এসে একদম ছাদের ধারের কাছে চলে এলো। বাম পা অর্ধেক বেড়িয়ে গেলো ছাদের বাইরে। আরেকটু হলেই পরে যাবো। সবকিছু এতো দ্রুত ঘটে যাচ্ছে যে আমি চিৎকার করে সামনের দিকে সাহায্যের জন্য হাত বাড়াবো, তাও পারছিলাম না।
তবে আমার কিছু করার আগেই আদ্রিশ ভাইয়া দ্রুত আমার দিকে এগিয়ে এসে আমার বাহু ধরে হ্যাঁচকা টান দিলেন। এ টানে টাল সামলাতে না পেরে আমি ছিটকে গিয়ে আদ্রিশ ভাইয়ার উপর পরলাম।
আমার ভারে কয়েক কদম পিছিয়ে এলেন উনি। তবে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারলেন। এভাবে ছিটকে উনার উপর পরায় আমার মাথা গিয়ে ঠেকলো উনার বুকের একটু উপরে,প্রায় কাঁধের অংশে।
সবকিছু এতো অকস্মাৎ ঘটে গেলো যে আমি ঠিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখানোরই সুযোগ পেলাম না। তবে খানিক সময় পর আমি যখন একটু স্থির হয়ে গেলাম, তখন শুনতে পেলাম কারোর হৃৎস্পন্দন। একটা হৃদয়ের হৃৎস্পন্দন নয় এটা। দুটো হৃদয়ের হৃৎস্পন্দন শুনতে পাচ্ছি আমি। দুটো হৃৎস্পন্দন পরস্পরের সাথে মিলিত হয়ে এক নতুন সুরের হৃৎস্পন্দন তৈরী করেছে যেনো।
আমার ধ্যানমগ্ন অন্য কোনো শব্দে নেই। আমি তো মধুর এ আওয়াজ শুনতে ব্যস্ত। এর আগে কখনো অন্যের হৃৎস্পন্দন শুনেনি। শুধু নিজের হৃৎস্পন্দন শুনেই অভ্যস্ত ছিলাম আমি। তবে আজ আমার পছন্দের মানুষটার হৃৎস্পন্দন শুনছি। খাঁটি বাংলা ভাষায় যাকে বলে হয়তো, বুকের ধুকপুকানি আওয়াজ।

বেশ কিছুক্ষণ পর আদ্রিশ ভাইয়া আমার মাথার পিছনে হাত দিয়ে ভয়ার্ত এবং চিন্তিত কণ্ঠে বললেন,
“মিশমিশ, তুমি ঠিক আছো তো?”

®সারা মেহেক

#চলবে

#ভালোবাসার_রঙিন_প্রজাপতি
#লেখনীতে:সারা মেহেক

২৬

আদ্রিশ ভাইয়ার কথায় আমি সম্বিৎ ফিরে পেলাম। খেয়াল হলো, আমি উনার বুকের উপর মাথা দিয়ে আছি। লজ্জাজনক এক ব্যাপার এটা৷ আমি দ্রুত মাথা তুলে কয়েক কদম পিছিয়ে যেতে লাগলাম।

হঠাৎ আদ্রিশ ভাইয়া আমার কোমড়ে হাত রেখে আমাকে টেনে উনার কাছে নিয়ে আসে। উনার এ অদ্ভুত কাজে আমি ভীষণ ভড়কে গেলাম। বিস্ময় নিয়ে উনার দিকে তাকাতেই উনি চোখ বড় বড় করে বললেন,
“আবারো পিছিয়ে যাচ্ছিলে! আমি না টেনে আনলে তো পিছিয়ে পিছিয়ে পরেই যেতে।”

আদ্রিশ ভাইয়ার কথাগুলো আমার কানে এলো ঠিকই। তবে আমি সে কথার প্রতুত্তরে কিছু বলতে চাইলাম না। কারন এ মূহুর্তে আদ্রিশ ভাইয়ার কাছ থেকে দূরে যেতে হবে আমাকে। এভাবে উনার কাছে থাকা সম্ভব নয় আমার পক্ষে। কারন প্রচণ্ড অস্বস্তি অনুভব করছি।

আমি দ্রুত মাথা নিচু করে আমতাআমতা করে বললাম,
“আ-আমাকে ছাড়ুন, আমি বাড়িতে যাবো।”

এতে কয়েক সেকেন্ডের মাঝেই আদ্রিশ ভাইয়ার হাতের বাঁধন আলগা হয়ে এলো। উনি আমার কোমড় ছেড়ে দিতেই আমি দ্রুত উনাকে পাশ কাটিয়ে সিঁড়ির কাছে যেতে লাগলাম। মাঝপথেই উনি আমার পথ আগলে অপরাধী সুরে বললেন,
“আই এম সরি। আসলে ওভাবে তোমাকে টাচ করতে চাইনি। কিন্তু তোমাকে না ধরলে তুমি পরেই যেতে। তোমাকে ওভাবে টেনে আনার জন্য সরি। আই এম এক্সট্রিমলি সরি।”

আদ্রিশ ভাইয়ার দিকে তাকিয়ে দেখলাম উনি মাথা নিচু করে আছেন। হয়তো আমাকে এভাবে কাছে টেনে নেওয়ায় অপরাধবোধ কাজ করছে উনার মাঝে।
আমি মাথা নিচু করে আদ্রিশ ভাইয়ার কথার পরিপ্রেক্ষিতে নিজের দিকের কথা সাজিয়ে নিলাম। ছোট্ট একটা নিঃশ্বাস ফেলে মাথা তুলে উনার দিকে তাকিয়ে বললাম,
“ইটস ওকে। আসলে দোষটা কারোরই ওভাবে ছিলো না। আপনার কণ্ঠ হুট করে শোনায় আমি চমকে গিয়েছিলাম বলেই আপনা-আপনি পিছিয়ে গিয়েছিলাম। তখন আপনি আমাকে টেনে না ধরলে একটা দূর্ঘটনা ঘটে যেতো। ”

এই বলে আমি দ্রুত পায়ে সিঁড়িঘরের কাছে চলে এলাম৷ কারন সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা আর সম্ভব নয় আমার পক্ষে। বিগত কয়েকটা মিনিট আমার জীবনের অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু সময় ছিলো। পছন্দের মানুষের সান্নিধ্যে আসার সময় ছিলো। তবে আমি কখনো এভাবে স্পর্শের মাধ্যমে উনার সান্নিধ্য পেতে চায়নি। চেয়েছি একান্তে কথাবার্তার মাধ্যমে কিছু সময় অতিবাহিত করতে। চেয়েছি মনের আড়ালে থাকা কিছু সুপ্ত অনুভূতি প্রকাশ করতে।

অবশ্য আজকের এ ঘটনা আমাদের কারোরই অনুমতিতে হয়নি৷ সবটা একদম আকস্মিক ঘটনা ছিলো৷ এজন্য এসব পুরোপুরি ভুলিয়ে নিতে আমার একটু সময় প্রয়োজন এবং এ সময়ে আদ্রিশ ভাইয়া আমার কাছাকাছি থাকলে এসব ঘটনা ভুলিয়ে উঠা সম্ভব নয় আমার পক্ষে।

আমি প্রথম সিঁড়িতে পা রাখতেই পিছন থেকে আদ্রিশ ভাইয়া আমার সামনে চলে এলো। দু সিঁড়ি নেমে আমার উদ্দেশ্যে মুচকি হেসে বললেন,
“আমি আগে আগে তুমি পিছে পিছে। শাড়ীতে বেঝে পরে গেলে আমার উপরই পরবে তো। তখন নিজেকে সামলে নিলেই তুমি সামলে যাবে।”

আদ্রিশ ভাইয়ার কথায় আমি নির্বাক চাহনিতে উনার দিকে তাকিয়ে রইলাম। উনার এ ছোটছোট কথা, কাজ আমাকে মুগ্ধতার চাদরে ঢেকে দিয়ে যায়। না জানি, মুগ্ধতায় ভরপুর আরো কিছু বাক্য বললে আমার কি হবে…

আদ্রিশ ভাইয়া আমার সামনে এক এক সিঁড়ি ভেঙে এগিয়ে যাচ্ছেন। আর আমি শাড়ীর কুঁচি ধরে খুব সাবধানে এক এক সিঁড়ি নামছি।
সিঁড়ি দিয়ে নামার মাঝপথে কি মনে করে আমি আদ্রিশ ভাইয়াকে জিজ্ঞাস করলাম,
“মাহা’র সাথে আপনার পরিচয় কতদিনের?”

আমার প্রশ্ন শুনে আদ্রিশ ভাইয়া হুট করে মাঝপথে থেমে আমার দিকে ফিরে তাকালেন। আচমকা উনার গতি থমকে যাওয়ায় আমার গতিও আচমকা থমকে গেলো। ফলে শাড়ীতে আটকে উল্টে পরার মত পরিস্থিতি আসতেই আমি সামনে আদ্রিশ ভাইয়ার শার্টের কাঁধের অংশ খামচে ধরলাম। সাথে সাথে উনিও আমার হাত চেপে ধরলো।আবারও এক আকস্মিক ঘটনার শিকার হলাম দুজনে।

আদ্রিশ ভাইয়া আমার দিকে তাকাতেই আমি দ্রুত উনার শার্ট ছেড়ে দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালাম। মাথা নিচু করে অপরাধী সুরে বললাম,
“সরি। চলতে চলতে ওভাবে থেমে গিয়েছেন বলে ব্যালেন্স না রাখতে পেরে আমি পরে যেতে নিচ্ছিলাম। এজন্যই আপনার শার্ট চেপে ধরেছি।” এই বলে আমি উনার দিকে তাকালাম।
উনি চোখেমুখে দুষ্টু হাসির রেখা টেনে বললেন,
“ইটস ওকে।
আচ্ছা? তোমার কি মনে হচ্ছে না, আজকে এসব উল্টাপাল্টা ঘটনা একটু বেশিই ঘটছে আমাদের সাথে?”

আমি উনার দিকে তাকিয়ে জোরপূর্বক হেসে বললাম,
“হুম। একটু বেশিই হচ্ছে সব৷ এবার যাওয়া যাক? নদীকে দেখছি না অনেকক্ষণ হলো। ও বোধদয় নিচে নেমে গিয়েছে। কি না কি ভাবছে আমাদের নিয়ে আল্লাহ জানে।”

আদ্রিশ ভাইয়া আমার কথার প্রতুত্তরে কিছু বললেন না। আগের মত সিঁড়ি ভেঙে এগুতে এগুতে বললেন,
“যা ভাবার তাই ভাবছে। ”

আমি খানিকটা অবাক হয়ে জিজ্ঞাস করলাম,
“কি ভাবছে?”

“আমি কি জানি, কি ভাবছে সে।”

“তো বললেন যে,যা ভাবার তাই ভাবছে।”

“হুম,আবারও বলছি। যা ভাবার তাই ভাবছে।”

“উফ,আপনি এতো কথা ঘুরান কেনো?”

“কথা ঘুরাতে খুব ভালো লাগে তাই। আমার দ্বারা যদি কথারা বিনামূল্যে ভ্রমণ করতে পারে তো করুক।”

“হা হা ভেরি ফানি। ”

“তা তো অবশ্যই।”

“ভালো ভালো।”

এতক্ষণে আমরা সবগুলো সিঁড়ি পেরিয়ে বাড়ির সদর দরজার সামনে চলে এসেছি। দরজা পেরিয়ে সামনের দিকে তাকিয়ে দেখতে পেলাম নদী আমাদের থেকে বেশ কয়েক হাত দূরে দাঁড়িয়ে আছি। ফোনে কারোর সাথে কথা বলছে সে।

আদ্রিশ ভাইয়া সামনের দিকে এগুচ্ছেন আর উনার পিছু পিছু আমি এগিয়ে যাচ্ছি। হঠাৎ উনি বলে উঠলেন,
“তোমার কি মনে হয়, আজকের এসব উদ্ভট এবং আকস্মিক ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী আমাদের নদী ম্যাডাম হয়েছেন?”

আমি কাঁধের কাছে আঁচল ঠিক করতে করতে বললাম,
“সে ওর কাছে জিজ্ঞাস করলেই জানা যাবে। যাই হোক, আজকের এসব উদ্ভট উদ্ভট সিচুয়েশনে পরার জন্য এই শাড়ীই দায়ী। যত নষ্টের গোঁড়া এ শাড়ী। একে যদি আর কোনোদিন গায়ে জড়িয়েছে তো…….”

আদ্রিশ ভাইয়া আমাকে মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে আমার চোখের দিকে চেয়ে বললেন,
“নষ্টের গোঁড়া মানে? সব ভালোর মূল এই শাড়ী। সো, শাড়ী না পরার কথা আর একবারো বলবে না।
আমি রোজ রোজ তোমাকে এ শাড়ীতে দেখতে চাই। রোজ রোজ তোমার ঐ কাজল কালো ডাগরডাগর চোখের চাহনি দেখতে চাই। এসব থেকে আমাকে বঞ্চিত করার রাইট তোমার নেই। আন্ডারস্ট্যান্ড? ”
এই বলে উনি সামনে এগিয়ে চলে গেলেন। আর আমি সেখানেই থমকে দাঁড়িয়ে রইলাম। আদ্রিশ ভাইয়ার এ সোজাসাপটা কথা আমার হজম হতে চাইলো না। যদিও উনি একদম সোজাসাপটা কথা বলেছেন, তবুও এ কথার ভেতরে উনার গভীর এক অধিকার সত্ব প্রকাশ পেয়েছে।

“কি আপু? এখানে দাঁড়িয়ে আছো কেনো? চলো…”

হঠাৎ নদীর কথায় সম্বিৎ ফিরে পেলাম আমি। নদীর চোখের আড়ালে নিজেকে সামলে নিয়ে মৃদু হেসে বললাম,
“হুম চলো।”

শেষ বিকেলের অস্তমিত সূর্যের হলুদাভ আলোয় ছেয়ে গিয়েছে পুরো জায়গাটা৷ আশপাশ হলুদাভ কমলা এক রঙে রাঙিয়ে উঠেছে। আমি আর নদী পাশাপাশি হাঁটছি। আমি বিনাবাক্যে হেঁটে চলছি। অনবরত মুখ চালানো নদীও কোনো এক কারনে কথা বলছে না। তার এ নিশ্চুপতার কারন জানতে মন চাইলো। তবে এ শেষ বিকেলের এ স্নিগ্ধ পরিবেশে নিশ্চুপ থাকাটাই শ্রেয় মনে হলো আমার কাছে।
বাড়ির প্রায় কাছাকাছি চলে এসেছি। চারপাশের নিরবতা ভেঙে নদী বলে উঠলো,
“ছোট ভাইয়ার মনের খবর জানো আপু?”

নদীর এমন প্রশ্নে ভড়কে গেলাম আমি। আদ্রিশ ভাইয়া আর আমাকে নিয়ে যে সে সন্দেহ করছে তা আর বুঝতে বাকি রইলো না আমার। অবশ্য তাকে সন্দেহ করার কারনগুলোও তো আদ্রিশ ভাইয়া একদম ভালোমত বিলিয়ে দিয়েছেন। নদীর জায়গায় আমি থাকলেও এমনটাই সন্দেহ করতাম।
সব বুঝেও না বুঝার ভান ধরে বললাম,
“উনার মনের খবর জানবো কি করে? আর উনার মনের খবরই বা কি?”

“সত্যিই আপু, তুমি জানো না?”

“কি জানবো?”

“এই যে,ছোট ভাইয়া তোমাকে পছন্দ করে।”

আমি কথা উড়িয়ে দেওয়ার ভান করে বললাম,
“যা তা কথা বলো না। উনি আমাকে পছন্দ করতে যাবেন কেনো?”

নদী এবার টিপ্পনী কেটে বলল,
“সে তো তোমার ‘উনি’ই বলতে পারবে। ”

আমি কিছু না বলে শুধু মাথা নিচু করে হাসলাম। আসলে, আমাকে পছন্দ কারনটা কি, তা আমি আদ্রিশ ভাইয়ার কাছে জানতে চাই৷ কিন্তু কখন সে সুযোগ আসবে? আগামীকাল হয়তো চলে যাবো আমি। এরপর কি আর কোনোদিন দেখা হবে আমাদের? আমার জীবনের প্রথম ভালোবাসা কি পাবো আমি? আমার মনের কথা সামনাসামনি উনাকে কখনো বলতে পারবো? বা কখনো কি উনার মনের সুপ্ত অনুভূতিগুলো আমাকে বলতে পারবেন? নাকি সেই ডায়েরীর পাতাতেই উনার অনুভূতিগুলো আবদ্ধ থাকবে? আদৌ কি আমাদের এ ভালোলাগার কোনো ভবিষ্যতে আছে? নাকি সময়ের বেড়াজালে এই ভালোলাগা শুধুমাত্র ‘মোহ’ নাম পাবে? জানি না কি হবে সামনে। এসব ভাবলেও ভয়ে গা শিউরে উঠে। যদি আমাদের কোনো ভবিষ্যত না থাকে, তাহলে এসব ভুলে যাওয়া কি সম্ভব হবে আমার পক্ষে? হয়তো না। বরং রোজ তিলে তিলে এ অনুভূতি, এ শূন্যতা আমাকে শেষ করে দিবে। এখনকার আমি আর ভবিষ্যতের আমি’র মধ্যে বিস্তর ফারাক হবে।

.

মাগরিবের নামাজের পর নদীর জন্মদিন উপলক্ষে কেক কাটা হলো। নদী এ ব্যাপারটা বেশ ইঞ্জয় করেছে। যদিও পলাশ ভাইয়া, ইদ্রিস মামা আর ইলিয়াস মামা বাসায় নেই, তবুও যে তার খুশি উদযাপন করা হচ্ছে, তাতেই সে খুশি।

কেক খাওয়ার পর্ব চুকিয়ে যে যার রুমে চলো গেলাম। আদ্রিশ ভাইয়া আর বাইরে যাননি আজকে। অন্যদিন হলে সন্ধ্যা পেরুতেই তিনি বাইরে ছুট দিতেন। তবে গতকাল আর আজকে উনার এ রুটিনে পরিবর্তন এসেছে। কারন উনি এখন দায়িত্বের বেড়াজালে আবদ্ধ। চাইলেও এসব রেখে চিল মুডে ঘুরিয়ে বেড়ানো সম্ভব নয়।

নদী রুমে এসেই চিৎপটাং হয়ে বিছানায় শুয়ে পরলো৷ তার পাশেই আমি ফোন নিয়ে বসে পরলাম৷ আজকের সবগুলো ছবি নদীর ফোন থেকে আমার ফোনে ট্রান্সফার করার জন্যই ওর পাশে বসলাম।

হঠাৎ রাইসা ভাবীর গগনবিদারী এক চিৎকার আমার কানে এলো।’ আল্লাহ’ বলে তিনি চিৎকার দিলেন। ভাবীর এ চিৎকার শুনে আমি আর নদী একে অপরের দিকে ভয়ার্ত দৃষ্টিতে তাকালাম। ভাবীর এ চিৎকারের কারন বুঝতে বাকি রইলো না আমাদের দুজনের। লেবার পেইন উঠেছে উনার।
নদী আর আমি একে অপরের দিকে চাওয়াচাওয়ি করে তড়িৎগতিতে বিছানা ছেড়ে উঠে গেলাম৷ ওড়না ঠিকঠাক করে শরীরে জড়িয়ে দুজনে এক প্রকার দৌড়ের উপর রাইসা ভাবীর রুমের দিকে যেতে লাগলাম। ওদিকে রাইসা ভাবী চিৎকার করে কাঁদছে। থেকে থেকে ‘ও মা’ বলে আর্তনাদ করছে। ভাবীর এ আর্তনাদে আমার শরীরে কাঁটা দিয়ে উঠলো।

রাইসা ভাবীর রুমে পৌঁছিয়ে দেখলাম বড় মামি আর ছোট মামি ইতোমধ্যে সেখানে চলে এসেছে৷ রাইসা ভাবী বিছানায় বসে চোখ দুটো খিঁচে বন্ধ করে কাঁদছে। দুই মামি রাইসা ভাবীর দুপাশে বসে ভাবীর দুহাতে মালিশ করছেন। ওদিকে মেজ নানু রাইসা ভাবীর মাথা নিজের কোলে রেখে অনবরত দোয়া পরে যাচ্ছে। আদ্রিশ ভাইয়া পুরো রুমময় পায়চারী করছেন আর ফোনে কথা বলছেন।
সবার চেহারায় এখন আতঙ্ক ভর করছে। আদ্রিশ ভাইয়ার কণ্ঠে প্রকাশ পেয়েছে চিন্তা।
আমি আর নদী দরজার কাছ থেকে এগিয়ে রাইসা ভাবীর দিকে এগুলাম। রাইসা ভাবীর এ যন্ত্রণা দেখে আমার পুরো শরীর কাঁপছে৷ হাত দুটো ঘেমেনেয়ে একাকার। এদিকে নদী কখন কান্না শুরু করে দিয়েছে তা জানা নেই আমার। সে কান্নারত স্বরে বলল,
“তোমার ভাবীর কাছে কখন এসেছো?”

বড় মামি কম্পনরত কণ্ঠে বললেন,
“ও অনেকক্ষণ ধরেই নিচু আওয়াজে যন্ত্রণায় কোঁকাচ্ছিলো। নাদিয়া আর আমি তা টের পেয়েই ওর পাশে চলে আসি।”

“তো সে সময় আমাদের ডাকতে পারোনি?”

“তোরা এসে কি করতি৷ এখন তো ওকে হসপিটালে নিতে হবে। সেসবের ব্যবস্থা কর। ওর আলমারিতে দেখ ব্যাগ গোছানো আসে। সেটা বের করে নিয়ে আয়।”
বড় মামির নির্দেশ পেয়ে নদী আলমারির দিকে গেলো।

আমি স্তব্ধ দৃষ্টিতে রাইসা ভাবীর দিকে তাকিয়ে আছি। কখনো সরাসরি কারোর লেবার পেইন উঠতে দেখিনি আমি। লেবার পেইনে যে কতোটা কষ্ট হয় তা একজন মেয়েই জানে। রাইসা ভাবীর চিৎকার আর যন্ত্রনা দেখে আমি মাঝেমধ্যে কেঁপে উঠছি।
হঠাৎ আদ্রিশ ভাইয়া বলে উঠলেন,
“অটো চলে এসেছে। ভাবীকে এখন রাস্তা পর্যন্ত নিয়ে যেতে হবে।”

বড় মামি এবার রেগে বললেন,
“অটো ডাকলি কেনো? এম্বুল্যান্স ডাকতে পারলি না? এখন অটোতে ওকে নিয়ে যাবি কিভাবে?”

আদ্রিশ ভাইয়া রাইসা ভাবীর কাছে এসে তড়িঘড়ি কণ্ঠে বললেন,
“এম্বুল্যান্সের খোঁজ নিয়েছিলাম। আসতে সময় লাগবে তাদের। এজন্যই অটো ডাকলাম। এছাড়া আর উপায় নেই। এখন বেশি কথা না বাড়িয়ে ভাবীকে উঠাতে হেল্প করো।”

ছোট মামি এবার চিন্তিত স্বরে বললেন,
“রাইসাকে বাহির পর্যন্ত নিয়ে যাবি কিভাবে?”

আদ্রিশ ভাইয়া দু হাত টান করে বললেন,
“কোলে করেই নিতে হবে। আর কোনো উপায় নেই। ভাবীর যে অবস্থা, তাতে সে হেঁটে যেতে পারবে না।”

ওদিকে রাইসা ভাবী দুহাত দিয়ে বিছানার চাদর খামচে ধরে চিৎকার করছেন। তার দুচোখ দিয়ে অনবরত নোনা জল গড়িয়ে পরছে।
আদ্রিশ ভাইয়ার প্রস্তাব শুনে বড় মামি আতঙ্কিত স্বরে বললেন,
“তোর মাথা খারাপ আদ্রিশ? ওর ভার কি তুই একা নিতে পারবি? যদি মাঝপথে পরে যাস?”

আদ্রিশ ভাইয়া কারোর কথার তোয়াক্কা না করে শক্ত মুখে রাইসা ভাবীকে পাঁজাকোলে তুলে নিলেন। চোখ বন্ধ করে লম্বা লম্বা কয়েকটা শ্বাস টেনে নিয়ে বললেন,
“ইনশাআল্লাহ পারবো আমি৷ তোমাদের মধ্যে দুজন আমার সাথে আসলেই হবে। যাওয়ার পথে কিছু হয়ে গেলে আমার সাথে সামলিয়ে নিবে।”

রাইসা ভাবী আদ্রিশ ভাইয়ার পরনের টিশার্ট খামচে ধরে জোরে জোরে চিৎকার করে যাচ্ছে। মেজ নানু ভাবীকে শান্ত হতে বললো। তবে এমন পরিস্থিতিতে যে শান্ত হওয়া যায়না তা সবারই জানা। সান্ত্বনা স্বরূপ এসব বলা হয় যাতে সামনে বিপদে পরা মানুষটা অন্তত শান্ত হতে চেষ্টা করে।

বড় মামি আমাকে আর নদীকে আদ্রিশ ভাইয়ার সাথে যেতে বললেন। তারা তিনজনও আমাদের পিছুপিছু আসবে।
বড় মামির প্রস্তাবে আমি আর নদী রাজি তো হলাম, কিন্তু কিছুতেই নিজেদের ভয়মুক্ত করতে পারলাম না। বুকের ভেতর অনবরত দ্রিমদ্রিম আওয়াজ হচ্ছে আমার। না জানি বাকি সবার অবস্থা কি।
সবার চোখেমুখে এখন চিন্তার ছাপ। সকলে প্রতিটা মূহুর্তে ঘনিয়ে আসা বিপদে চিন্তিত। কেউই সামনের সময়ের নিশ্চয়তা দিতে পারছে না। সকলে শুধু মহান আল্লাহ’কে ডেকে চলছে। কারন এ বিপদ থেকে রক্ষা করার মালিক একমাত্র আল্লাহ তায়ালা।

®সারা মেহেক

#চলবে