ভালোবাসার রঙিন প্রজাপতি পর্ব-২৯+৩০

0
1191

#ভালোবাসার_রঙিন_প্রজাপতি
#লেখনীতে:সারা মেহেক

২৯

আদ্রিশ ভাইয়ার কথায় আমি বিস্ময় নিয়ে উনার দিকে তাকিয়ে রইলাম। উনি এভাবে অকপটে সবার সামনে এমন কথাবার্তা বলবেন তা আমি চিন্তাও করিনি। সবাই কি না কি ভাবছে আল্লাহ জানে। ছোট মামি হয়তো আকাশ পাতাল চিন্তা ভাবনা করে বসেছেন!
এ মূহুর্তে আমার মন চাইছে, দাঁতে দাঁত চেপে আদ্রিশ ভাইয়ার কলার চেপে ধরে বলি, ‘এই যে মিস্টার ডক্টর, আপনার কি বুদ্ধিজ্ঞানে ভাটা পরেছে? এ ধরনের কথাবার্তা এতগুলো মানুষের সামনে বলেন কি করে?’
আফসোস, মনের চাওয়া আর পূরণ হলো না। উল্টো আমি এখন চুপচাপ মায়া’র দিকে তাকিয়ে আছি। সে চোখ বন্ধ করে হাত পা অল্পবিস্তর নাড়াচাড়া করাচ্ছে।

আদ্রিশ ভাইয়া মায়া’র দিকেই তাকিয়ে ছিলেন। কিছুক্ষণ পর উনি তার মায়াপরীর উদ্দেশ্যে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলেন,
“আমার মায়াপরী……চাচ্চুর দেওয়া নামটা পছন্দ হয়েছে?”

মায়া কি বুঝলো কে জানে। মুখ দিয়ে ‘উম,উম’ আওয়াজ বের করতে লাগলো সে। তার এ শব্দ করাই আদ্রিশ ভাইয়া সম্মতি হিসেবে নিয়ে নিলেন। ঠোঁটের কোনে বিশ্বজয়ের এক হাসি টেনে আনলেন। তারপর মায়া’র কানের কাছে ফিসফিস করে বললেন,
“তোমার হবু চাচি আম্মুর সাথে মিলিয়ে তোমার এ নাম রেখেছি৷ পছন্দ তো হবেই৷ ঠিক না?”

উনার কথায় মায়া আবারো ‘উম,উম’ আওয়াজ করতে লাগলো। তা দেখে আদ্রিশ ভাইয়া আমার দিকে চেয়ে খুশিমনে হেসে দিলেন। এদিকে আমার অবস্থা নাজেহাল। একদিকে অস্বস্তি লাগছে, অন্যদিকে আদ্রিশ ভাইয়ার কথাগুলোয় লজ্জাও লাগছে। এতোকিছুর পরও না পারছি এখানে বসে থাকতে আর না পারছি উঠে চলে যেতে। উভয়সংকট!

এতক্ষণ বাদে হঠাৎ ছোট মামি বলে উঠলেন,
“বাহ, বাহ………”

মামির কথায় আদ্রিশ ভাইয়া চট করে উঠে দাঁড়ালেন। মামির দিকে এগিয়ে গিয়ে বললেন,
“নাম কেমন হয়েছে তা বলো।”

মামি ঢেউতোলা সুরে বললেন,
“তলে তলে এতোকিছু চলে আমার ছেলের মনে তা তো জানতামই না!”

“এসব বাদ দিয়ে আগে বলো, নামটা কেমন হয়েছে?”

“নাম তো আমার অনেক পছন্দ হয়েছে। তবে এ নামের উৎপত্তি কোথা থেকে? কার মায়াবী চোখ দেখে আমার ছেলে মাতাল হয়েছে? ”

আদ্রিশ ভাইয়া মুচকি হেসে মাথা চুলকিয়ে বললেন,
“সময় হলে ঠিকই জেনে যাবে।”

ছোট মামি হয়তো আরো কিছু বলতে চাইলেন। কিন্তু তার আগেই একজন নার্স এসে আমার কোল থেকে মায়াকে নিয়ে চলে ভাবীর কেবিনে চলে গেলেন। কারন ছোট্ট মায়াপরীর এখন খাওয়াদাওয়ার সময় হয়ে গিয়েছে।

.

রাত প্রায় একটা বাজে। আমি, ছোট মামি আর আদ্রিশ ভাইয়া এখনো হসপিটালে আছি। আদ্রিশ ভাইয়া এনাম ভাইয়া সহ উনার বাকি দুই বন্ধুকে জোর করে নিজেদের বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছেন। প্রথম প্রথম উনারা যেতে চাননি। তবে আদ্রিশ ভাইয়ার জোরাজুরিতে পরে যেতেই হয়েছে৷ আমি আর ছোট মামি অপেক্ষা করছি, কখন আসবে পলাশ ভাইয়া আসবেন। উনি হসপিটালে আসলে উনার সাথেই বাড়িতে যাবো আমরা দুজন। আপাতত আদ্রিশ ভাইয়া এই ভেবে রেখেছে যে, পলাশ ভাইয়া মায়াকে দেখে ফ্রেশ হতে আর খাওয়াদাওয়া করতে বাড়িতে যাবেন। তখন আমি আর ছোট মামিও উনার সাথে চলে যাবো। পলাশ ভাইয়া বাড়ি থেকে আবারো হসপিটালে না আসা পর্যন্ত আদ্রিশ ভাইয়া হসপিটালেই থাকবেন। এরপর পলাশ ভাইয়াকে সব বুঝিয়ো দিয়ে বাড়ি চলে আসবেন।

কিছুক্ষণের মাঝেই পলাশ ভাইয়া চলে এলেন। উনার ক্লান্ত চেহারা, উষ্কখুষ্ক চুল, হালকা লাল হয়ে যাওয়া চোখ দেখে অবাক হয়ে গেলাম আমি। উনি কি কোনো কারনে কান্না করেছেন? বলা মুশকিল।
পলাশ ভাইয়া চেয়ারের কাছে ট্রাভেল ব্যাগ রেখে দ্রুত আদ্রিশ ভাইয়ার কাছে এসে হন্তদন্ত হয়ে বললেন,
“আমার মেয়ে কোথায়? আর রাইসা? দুজনকে আমি দেখবো। দ্রুত বল ওরা কোথায়?”

আদ্রিশ ভাইয়া পলাশ ভাইয়ার কাঁধে রেখে উনাকে আশ্বস্ত করে বললেন,
“রিল্যাক্স ভাইয়া। এতো হাইপার হচ্ছো কেনো? দুজনেই ঠিক আছে। এই যে এই কেবিনেই আছে দুজনে।”

পলাশ ভাইয়া কিছু না বলে দ্রুত দরজা ঠেলে কেবিনে ঢুকতে চাইলেন। তবে তার আগেই আদ্রিশ ভাইয়া উনার পথ আগলে বললেন,
“ভাইয়া, তুমি জার্নি করে এসেছো। এটলিস্ট হাত মুখ সাবান দিয়ে ধুয়ে ভিতরে যাও। সেফটির জন্য…..”

পলাশ ভাইয়া তাড়াহুড়া করে বললেন,
“আচ্ছা আচ্ছা, চল। কোথায় গিয়ে হাত ধুবো? আমাকে দ্রুত নিয়ে চল। ”

আদ্রিশ ভাইয়া পলাশ ভাইয়াকে নিয়ে দ্রুত পায়ে ওয়াশরুমের দিকে গেলেন। মিনিট দুয়েকের মধ্যেই উনারা দুজন চলে এলেন। এরপর পলাশ ভাইয়া কারোর তোয়াক্কা না করেই কেবিনের মধ্যে চলে গেলেন। উনার পিছুপিছু আমরা তিনজনও গেলাম।
রাইসা ভাবী পলাশ ভাইয়ার এমন হঠাৎ আগমনে চমকে উঠলেন। বিস্মিত কণ্ঠে পলাশ ভাইয়াকে সে জিজ্ঞাস করলো,
“তুমি কখন এলে?”

পলাশ ভাইয়া কিছু বললেন না। বরং ধীরপায়ে রাইসা ভাবীর দিকে এগিয়ে গেলেন। উনার দৃষ্টি এখন মায়ার উপর। আবেগী চোখে তিনি মায়াকে দেখছেন।
রাইসা ভাবীর কাছে এসে উনি আস্তে করে বললেন,
“ও কি ঘুমাচ্ছে? ”

রাইসা ভাবী হালকা হেসে জবাব দিলেন,
“না।
তুমি ওকে কোলে নিবে?”

পলাশ ভাইয়ার দু চোখ এখন নোনাজলে ভরে এসেছে। তিনি দ্রুত গতিতে মাথা ঝাঁকিয়ে বললেন,
“হ্যা হ্যা।”

রাইসা ভাবী আবারো হালকা হেসে পলাশ ভাইয়ার দিকে মায়াকে এগিয়ে দিলেন। মায়া তখন ‘উমম’ শব্দসহিত হাত পা নাড়াতে ব্যস্ত। পলাশ ভাইয়া তাকে অতি সাবধানে কোলে নিয়ে রাইসা ভাবীর পাশে রাখা টুলে বসে পরলেন।

পলাশ ভাইয়া মায়াকে দেখে আবেগাপ্লুত হয়ে পরলেন। চোখে জমে থাকা নোনাজল উপচে পরলো মায়ার কপালে। নিঃশব্দে কাঁদছেন তিনি। মায়ার কপালে, মুখমণ্ডলে আলতো হাত ছুঁইয়ে দিয়ে ভেজা গলায় বললেন,
“সরি আমার মা’টা…..অনেক অনেক সরি। তোমার আব্বুটা অনেক পঁচা তাইনা? এই পঁচা আব্বুটা তোমাকে করা প্রমিজ ভেঙে ফেলেছে। বলেছিলাম, তুমি যখন এই পৃথিবীতে আসবে তখন তুমি চোখ খুলেই আমাকে দেখতে পাবে। কিন্তু তার হলো না। সরি আমার মা। সরি।”

এই বলে পলাশ ভাইয়া আলতো করে মায়ার কপালে চুমু দিলেন। তখনই মায়া ছোট্ট ছোট্ট দু হাত পলাশ ভাইয়ার দু গালের উপর রাখলেন। পলাশ ভাইয়াও নিজের এক হাত মায়ার হাতের উপর রাখলেন। বাবা মেয়ের ভালোবাসার এই আবেগী দৃশ্য দেখে আমার মন জুড়িয়ে গেলো। চোখের কোনে জমে আসলো দু ফোঁটা নোনাজল। তবে তাকে মাটিতে গড়িয়ে পরতে না দিয়ে দ্রুত হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে মুছে ফেললাম।

পলাশ ভাইয়া কিছুক্ষণ পর আদ্রিশ ভাইয়ার উদ্দেশ্যে বললেন,
“ওর নাম রেখেছিস?”

আদ্রিশ ভাইয়া পলাশ ভাইয়ার দিকে এগিয়ে গিয়ে মায়ার মাথার উপর হাত রেখে বললেন,
“হুম। মায়া নাম রেখেছি। আমার ছোট্ট মায়াপরী।”

“বাহ…নামটা অনেক সুন্দর তো। একদম ওর সাথে মিলে গিয়েছে। ঠিক না রাইসা?”

রাইসা ভাবী এতক্ষণ নিঃশব্দে কাঁদছিলেন। পলাশ ভাইয়ার প্রশ্ন শুনে হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে চোখের পানি মুছে বললেন,
“হুম৷ আমার খুব পছন্দ হয়েছে।”

ছোট মামি এবার পলাশ ভাইয়াকে আদ্রিশ ভাইয়ার প্ল্যানের কথা বললেন। প্রথম প্রথম পলাশ ভাইয়া রাজি হলেন না। পরে রাইসা ভাবীর জোরাজুরিতে রাজি হলেন উনি।

.

সকাল প্রায় এগারোটা বাজে। আম্মু আর আভা মেজ নানু বাড়িতে এসেছে প্রায় ত্রিশ মিনিট আগে। আম্মু ড্রইং রুমে বসে আছে আর আভা আমার সাথে নদীর রুমে এসেছে ব্যাগ গুছাতে। ছোট মামি, বড় মামি আর মেজ নানুর সাথে গল্প করছে আম্মু৷
আজ সকালের দিকে বড় মামা, মামি আর ছোট মামা এবং নদী গিয়ে রাইসা ভাবী আর মায়ার সাথে দেখা করে এসেছে। পলাশ ভাইয়া এখনও হসপিটালে আছেন। তবে ছোট মামা আর বড় মামা বাড়িতে এসে আরাম করছেন। আর আদ্রিশ ভাইয়া বাসায় চলে এসেছেন সেই রাতেই।

আমার ব্যাগ গুছানো হয়ে গেলে আমি, আভা আর নদী ড্রইংরুমে চলে এলাম। নদী তার মুখ গোমরা করে বসে পরলো সোফায়। সে কিছুতেই আমাকে যেতে দিতে চাইছে না। কিন্তু আমাকে তো যেতেই হবে।
ছোট মামি কথা বলার একপর্যায়ে আম্মুর উদ্দেশ্যে বলল,
“আপা, এই কয়দিনের জন্য মিমকে বাসায় নিয়ে যাওয়ার দরকার কি?”

আম্মু জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো,
“কয়দিনের জন্য মানে?”

ছোট মামি হাসিমুখে বললো,
“আর তিন সপ্তাহ পর আমাদের নদীর বিয়ে। ”

ছোট মামির মুখে এ কথা শুনে আমি বিস্ময় নিয়ে তার দিকে তাকালাম। তিন সপ্তাহ পর নদীর বিয়ে মানে! কবে কখন ঠিক হলো সব! এর মানে সেদিন নদীর সন্দেহটা ঠিক ছিলো। কিন্তু এভাবে হুটহাট বিয়ে ঠিক করলো তাও আবার নদীকে না বলে! নদীর কি অবস্থা কে জানে।
আমি নদীর দিকে তাকিয়ে দেখলাম, সে স্তব্ধ চাহনিতে ছোট মামির দিকে চেয়ে আছে। হয়তো মামির কথা বিশ্বাস করতে পারছে না সে।
কয়েক সেকেন্ড বাদে নদী থমথমে গলায় বলল,
“বাহ….আমার বিয়ে আর তিন সপ্তাহ পর। অথচ আজই জানলাম আমি। খুব ভালো তো।”

ছোট মামি স্বাভাবিকভাবেই বললেন,
“বিয়ে গতকাল বিকালের দিকেই ফোনে ঠিক হয়েছে। এরপর রাইসার ডেলিভারির জন্য তোকে বলার সুযোগ পায়নি।”

নদী এবার উঠে গিয়ে মামির সামনে গিয়ে বলল,
“ডেট ঠিক হয়েছে গতকাল। কিন্তু কথাবার্তা তো আগে থেকেই চলছিলো। তাহলে আগে বলোনি কেনো আমাকে?”

“তোকে আগে বললে রাজি হতি না জানা আছে। এজন্য সবকিছু ঠিকঠাক করে তারপর বলতে চেয়েছিলাম। ”

“আজব কথাবার্তা! বিয়ে আমার। অথচ আমি রাজি কি না তাও জানতে চাইলে না একবারো! ছেলেকে আর ছেলের ফ্যামিলিকে আমি আগে কখনো দেখিনি। অথচ কয়দিন বাদে সেই ফ্যামিলিতেই যেতে হবে আমাকে!”

“ছেলে তোর পরিচিত। তোর আব্বুর বন্ধুর ছেলে। এর আগেও তো বেশ কয়েকবার তোদের দেখাসাক্ষাৎ হয়েছে। তখন থেকেই ছেলে তোকে পছন্দ করতো। তোর হয়তো ওর চেহারা মনে নেই। এজন্যই তো সেদিন ছবি দেখানোর পরও তুই চিনতে পারলি না ”

“ছেলে চিনি আর না চিনি। আমার কাছে পারমিশন নিবে তো?”

“তোর কাছে পারমিশন চাইতে গেলে তুই না করে দিতি। এতো ভালো সম্বন্ধ আমরা হাতছাড়া করতে চাইনি। তাই তোকে এসব ব্যাপারে কিছু বলিনি। আর তোকে তাড়াতাড়ি বিয়ে দিতে চাইছি এই কারনে যে, তুই যাতে সুরক্ষিত থাকিস। আজকাল মেয়েদের কত অঘটন হয় শুনিস? এসব শুনলেই তো ভয়ে আমার আত্মা কেঁপে উঠে। এজন্যই তোর বিয়ে দিয়ে দিতে চাইছি। ”

“ভালো তো খুব ভালো। ”
এই বলে নদী কাঁদতে কাঁদতে ড্রইংরুম থেকে বেরিয়ে গেলো। ওদিকে ছোট মামি গলা উঁচিয়ে বললেন,
” তুই মা না তো…তাই মায়ের ভয় আর কষ্ট বুঝিস না। আমি বুঝছি তো সব। যেদিন মেয়ের মা হবি সেদিন আমার ভয় আর কষ্ট বুঝবি।”
এই বলে ছোট মামিও কাঁদতে শুরু করে দিলো। মা মেয়ের মধ্যে যে এমন কাণ্ড হবে তা চিন্তাও করিনি আমি। বড় মামি আর আম্মু মিলে ছোট মামিকে সামলাতে লাগলো। আর ওদিকে আমি আর আভা নদীর রুমে গেলাম, নদীকে এ ব্যাপারে বুঝাতে।
নদীর কাছে গিয়ে নানাবিধ কথাবার্তা বলার পরও সে কিছুতেই বিয়ের ব্যাপারটা মানতে চাইলো না। পরে একপর্যায়ে সে একা রুমে থাকার আবদার করলো। তার এ আবদার রাখতে আমি আর আভা তার রুম থেকে চলে এলাম।

.

বাসস্ট্যান্ডে আমি,আভা,আম্মু আর আদ্রিশ ভাইয়া দাঁড়িয়ে আছি। তখন নদীর রুম থেকে বেরিয়ে আসার কিছুক্ষণ পরই আমরা বাসায় যাওয়ার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পরি। সবাইকে বিদায় জানানো হলেও নদী, রাইসা ভাবী আর পলাশ ভাইয়াকে বিদায় বলা হয়নি। নদী তখন কেঁদেই যাচ্ছিলো। এজন্য আমি আর আগ বাড়িয়ে তার সাথে দেখা করতে যায়নি।

মেজ নানুর বাড়ি থেকে বেড়িয়ে আসার পরপরই খুব কষ্ট লাগছিলো আমার। মনে হচ্ছিলো আমার শিকড় ঐ বাড়িতে। নিজের শিকড় ছিঁড়ে নিয়ে আসতে যেমন কষ্ট হয় ঠিক তেমন কষ্ট হচ্ছিলো আমার। মাঝেমাঝে মনে হচ্ছিলো বুকের উপর কেউ একটা পাথর চাপা দিয়ে রেখেছে। বিশেষ করে আদ্রিশ ভাইয়ার প্রতি আমার অনুভূতিগুলোর কথা চিন্তা করতেই কষ্টে বুক চিঁড়ে কিছু বেড়িয়ে আসতে চাইছিলো যেনো। খুব কষ্টে নিজের চোখের পানি সংযত রেখেছিলাম তখন। এখনও নিজের চোখের পানি আটকে রাখার চেষ্টা করছি।

আদ্রিশ ভাইয়া আমার থেকে কিছুদূরে দাঁড়িয়ে আছেন। উনার চোখমুখের অবস্থাও ভালো না। অসহায় একটা ভাব ফুটে উঠছে উনার চোখের চাহনিতে। বারবার যেনো সে চাহনি আমাকে কিছু বলতে চাইছে। হয়তো আমাকে আটকে দেওয়ার কথা বলছে সে চাহনি…….

নির্দিষ্ট সময়ে বাসস্ট্যান্ডে বাস এসে উপস্থিত হলো। আদ্রিশ ভাইয়া আম্মুকে আর আভাকে উঠিয়ে দিলেন আগেই। আমি রয়ে গেলাম দুজনের পিছনে।
গতকাল রাত থেকে এখন পর্যন্ত একটা কথাও হয়নি আমাদের মাঝে। তবে এখন আমি কিছু বলতে চাইছি উনাকে। কিন্তু কি বলবো? বলার কিছু নেই আমার। শুধু চোখের ইশারায় আমার মনের কথাটা উনাকে জানিয়ে দিতে পারবো। এই তো….কিন্তু উনি কি সেই চোখের ভাষা বুঝতে পারবেন?

ওদিকে আম্মুর ডাক শুনতেই আমি হুড়োহুড়ি করে বাসে উঠে পরে। কষ্ট পাবার ভয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে আদ্রিশ ভাইয়াকে একবারো দেখিনি আমি।
আমি দ্রুত বাসে উঠে জানালার পাশের সিটে বসলাম। শুধু আদ্রিশ ভাইয়াকে একনজর দেখার লোভে। জানালার পাশে বসতেই দেখলাম আদ্রিশ ভাইয়া সেই জানালা বরাবর দাঁড়িয়ে আছেন। উনার দৃষ্টি স্থির,শূন্য। দুটো চোখে যেনো খেলা করছে হাজারো আকুতি। বারবার হয়তো সেই চাহনি চিৎকার করে আমাকে বলছে,
“মিশমিশ….থেকে যাও না সারাজীবন আমার সাথে। তোমাকে নিজের করে বেঁধে রাখার সব ব্যবস্থা করতে রাজি। তুমি শুধু সারাজীবন আমার কাছে থেকে যাও। দূরে যাওয়া কি প্রয়োজন ছিলো?
চলো না সময়টাকে এখানেই থমকে দেই দুজন। ফিরে যাই সেই মূহুর্তগুলোয়, যে মূহুর্তে আমার অনুভূতিগুলো ছিলো শুধু তোমার জন্য। যে মূহুর্তে আমার হৃদয়ে গুঞ্জিত হচ্ছিলো একটাই নাম ‘মিশমিশ…..আমার মিশমিশ, আমার মাধবীলতা।”

®সারা মেহেক

#চলবে

#ভালোবাসার_রঙিন_প্রজাপতি
#লেখনীতে:সারা মেহেক

৩০

সময় যেনো ছুটন্ত এক পাগলা ঘোড়া। যে অবিরাম ছুটে চলছে। কোনো ক্লান্তিভাব নেই তার৷ প্রয়োজন নেই কোনো বিশ্রামের। সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে চলা খুবই দুষ্কর বটে। সেই সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে চলতেই আমি চেষ্টা করছি৷ তবে খুব একটা সফল হচ্ছি তা নয়, বরং আদ্রিশ ভাইয়ার স্মৃতি আমাকে খুবলে খুবলে খাচ্ছে যেনো। দেখতে দেখতে সাতটা দিন চলে গেলো। আমার দিন এবং রাতের বেশিরভাগ সময় চলে যায় উনার কথা চিন্তা করতে করতে। আমি আগে কখনো এমন ছিলাম না। একটা বিষয় বা একটা মানুষকে নিয়ে আমি সর্বোচ্চ দুই থেকে তিনদিন চিন্তা করতাম। অথচ এখন…….

এখনকার আমি আর এক মাসের আমি’র বিস্তর ফারাক দেখা যাচ্ছে। আমি চাইছি না এই পার্থক্য কারোর দৃষ্টিপাত হোক। এই পার্থক্য দৃষ্টিপাত হওয়া মানে আমার উপর বড়সড় একটা ঝড় বয়ে যাওয়া। নানা প্রশ্নের সম্মুখীন হওয়া। দরকার কি আগ বাড়িয়ে এসবের মধ্যে পরতে যাওয়া। এর চেয়ে নিজের অনুভূতি, চিন্তাগুলোকে গুটিয়ে রাখা ভালো।

এই সাতদিনে ঐ বাড়ির কারোর সাথে আমার যোগাযোগ হয়নি। নদীর সাথে ম্যাসেঞ্জারে কথা বলতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সে অনলাইনেই আসেনি। হয়তো তার রাগ,অভিমান এখনো ঠিকভাবে যায়নি।
নদীর ব্যাপারটা আমি বুঝতে পারলাম। তবে আদ্রিশ ভাইয়ার ব্যাপারটা কিছুতেই আমার মাথায় এলো না। এই সাতদিনে উনি একবারো আমার সাথে কোনোরূপ যোগাযোগ করেননি। কোনো ম্যাসেজ না, কোনো ফোনকল না। জানি, আমার নাম্বার উনার কাছে নেই। তবে উনি কি কোনোভাবেই আমার নাম্বার জোগাড় করতে পারতেন না? নদীর সাথে কথা বলে আমার নাম্বার নিতে পারতেন না? হুম, জানি যে, নদীর কাছে আমার নাম্বার নেই। কিন্তু ফেসবুক আইডি যে নেই তা তো নয়। এই আধুনিক যুগে যোগাযোগ করার নানান উপায় আছে। আদ্রিশ ভাইয়া পারতেন এর মধ্যে থেকে একটা উপায় বেছে নিতে। কিন্তু উনি নেননি।
আচ্ছা? উনি কি আদৌ আমাকে পছন্দ করতেন? নাকি খানিকের মায়ায় জড়িয়ে পরেছিলেন উনি? যদি এমনটাই হয়, তাহলে সেই ডায়েরিতে লেখা অনুভূতিগুলো, আমাকে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে বলা মনের কথাগুলো কি ছিলো? যদি আমি উনার খানিকের মোহ হয়ে থাকি তাহলে আমার প্রতি উনার মুখে বলা অনুভূতিগুলো কি ছিলো? সব হয়তো মিথ্যা ছিলো। সব সত্য হলে এই সাতদিন উনি আমার সাথে বিনা কথায় থাকতে পারতেন না। কিন্তু উনি দিব্যি আমার সাথে কথা না বলে, আমাকে না দেখে সাতদিন পার করে দিলেন। অথচ আমি ভেতরে ভেতরে একটু একটু করে ক্ষয় হচ্ছি। কিন্তু আমার অনুভূতিগুলো তীব্র হচ্ছে উনার প্রতি। এদিকে যেমন উনার প্রতি আমার অভিমানের পাল্লা ভারী হচ্ছে, তেমনি অপরদিকে উনার প্রতি আমার ভালোলাগা ক্রমশ বাড়ছে। মাঝেমাঝে মনে হয়, সেই ভালোলাগা তীব্র আকার ধারণ করে ভালোবাসায় পরিণত হয়েছে। অথচ উনি আমাকে বেমালুম ভুলে বসেছেন। তাহলে আমারও উচিত উনার কথা ভুলে যাওয়া! জানি, এতে কষ্ট হবে। তবে এটাই ভালো আমার জন্য। যেখানে একজনের অনুভূতিগুলো পর্বত ছোঁয়ার জন্য ব্যস্ত,তেমনি অপরজনের অনুভূতি হয়তো মৃত্তিকা ছোঁয়ায় ব্যস্ত।

.

সকালে ঘুম থেকে উঠতেই আম্মুর কাছে শুনলাম, নদী বিয়েতে রাজি হয়ে গিয়েছে। ঘুম থেকে উঠেই এমন একটা খবর শোনার জন্য আমি মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না। আম্মুর কাছে আর বিস্তারিত জানতে চাইলাম না। দ্রুত ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে নিলাম। খেয়েদেয়ে তৎক্ষনাৎ নদীকে ম্যাসেঞ্জারে কল দিলাম।
প্রথমে ভেবেছিলাম সে কল রিসিভ করবে না। কারন এতোদিন করেনি। তবে আমাকে অবাক করে দিয়ে সে কয়েক সেকেন্ডের মাঝেই কল রিসিভ করলো।
নদী কল রিসিভ করতেই আমি বিচলিত হয়ে বললাম,
“কি ব্যাপার নদী? কি শুনছি এসব?”

নদী স্বাভাবিকভাবেই বলল,
“কি শুনছো?”

আমি একটু অবাক হয়ে বললাম,
“এই যে তুমি বিয়েতে রাজি হয়ে গিয়েছো?”

ওপাশ থেকে নদীর তাচ্ছিল্যের হাসি শুনতে পেলাম। সে বলল,
“রাজি না হয়ে উপায় ছিলো না। তারা আমাকে বিয়ে দিবেই। যেভাবেই হোক।”

“তুমি পারতে না বলতে।”

“আমি না বললে সবার মান সম্মান মাটিতে মিশে যেতো।”

“সেটা ঠিক। তবে তোমার অনিচ্ছায় বিয়েটা না করলে ভালো হবে। কারন বিয়ে এক বা দুইদিনকার কিছু না। বাকি জীবন চলতে হবে এই নিয়ে। এখন যদি অন্যের কথা চিন্তা করে নিজের জীবন, খুশি বিসর্জন দাও তাহলে কি হবে ভেবেছো একবার?”

“এখন অতো ভাবলে চলবে না মিম আপু। আব্বু, আম্মু, চাচু, চাচির মানসম্মান আমার জীবনের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাদের সম্মানের কিছু হলে আমি জীবনেও নিজেকে ক্ষমা করতে পারবো না। বিয়েতে রাজি হওয়া ছাড়া আর পথ ছিলো না আমার কাছে। আমি বিয়েতে মানা করলে ছেলেপক্ষের কাছে আমার পরিবারের মানসম্মান কোথায় নেমে যেতো ভেবেছো আপু? এসব ভেবেই বিয়েতে রাজি হলাম।। এক সপ্তাহ তাদেরকে বুঝিয়েছি। আর পারেনি। এসবের পর নিজেকে বুঝিয়ে দিয়েছি যে, যা হবে ভালোর জন্যই হবে। আল্লাহ তায়ালা নিশ্চয়ই এতে আমার ভালো কিছু লিখে রেখেছে।”

নদীর কথাবার্তা শুনে আমার আর কিছু বলার রইলো না। শুধু এক দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। কিছুক্ষণ থেমে বললাম,
“তাহলে ছেলের সাথে দেখা হয়েছে?”

“এখনো হয়নি। আজকে বিকেলে পরিবার সমেত আমাকে সরাসরি দেখতে আসবে। হয়তো আংটি পরিয়ে যাবে। এরপর কথাবার্তা একদম ফাইনাল করে সবাইকে বিয়ের দিবে।”

“বাহ…ভালো তো।
এই বিয়ের ব্যাপারে কে কে জানতো?”

“আমি আর ভাবী বাদে সবাই জানতো। তবে বিয়ে ফাইনাল হওয়ার ব্যাপারটা শুধু আব্বু- আম্মু আর চাচু- চাচি জানতো।”

এবার আমি তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বললাম,
“বেশ ভালো তো…. সবাই জানতো তাহলে। কিন্তু যার জানার কথা সেই জানতো না। ”

এই বলে আমি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলাম। আদ্রিশ ভাইয়ার ব্যাপারটা জিজ্ঞাস করার জন্য নদীকে বললাম,
“বাড়ির সবাই কেমন আছে?”

“আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছে।”

“ছোট বাবু কেমন আছে?”

“সেও ভালো।”

“আচ্ছা….. তো তোমার বিয়ের কাজে ব্যস্ত সবাই তাইনা?”

” এখনও ওমন ব্যস্ততা শুরু হয়নি। আব্বু আর চাচু একটু একটু করে করছে সব৷ আর বড় ভাইয়া নিজের বাচ্চা আর অফিসের কাজে খুব ব্যস্ত এ কয়দিন৷ আবার ছোট ভাইয়া গিয়েছে ঢাকায়।”

নদীর কথা শুনে আমি বেশ অবাক হলাম।আদ্রিশ ভাইয়া ঢাকায় গিয়েছে এ সময়! উনার তো পোস্ট গ্র্যাজুয়েশনের প্রিপারেশন এখনই শুরু হওয়ার কথা না। তাহলে উনি ঢাকায় গিয়েছে কি কারনে তা মাথায় আসছে না। আচ্ছা? সে কি মাহার সাথে দেখা করতে গিয়েছে? এ ব্যাপারে নদীর কাছে জিজ্ঞাস করাই উত্তম। তাহলে একটু হলেও আইডিয়া করতে পারবো।
আমি একটু গলা পরিষ্কার করে বললাম,
“উনি ঢাকায় গিয়েছে কেনো?”

“হসপিটাল থেকে ডেকেছে কি কারনে যেনো।আমি ঠিক…….”
নদীর কথা শেষ না হতেই আমি ওপাশ থেকে ছোট মামির কণ্ঠস্বর শুনতে পেলাম।
ছোট মামির ডাক পেয়ে নদী আমাকে বলল,
“আপু, পরে কথা হবে। এখন আম্মু ডাকছে।”

“আচ্ছা যাও।”

আমি ফোন রেখে গভীর চিন্তায় মত্ত হলাম। আদ্রিশ ভাইয়া কি আসলেই হসপিটালের কাজে ঢাকায় গিয়েছে নাকি অন্য কোনো কারনে গিয়েছে? অন্য কারনটা মাহা হলে উনাকে আমি কোনোদিনও ক্ষমা করবো না। এতোকিছুর পরও যদি উনি মাহার সাথে সম্পর্ক রাখেন তাহলে আমার অনুভূতি নিয়ে এমন পুতুলখেলার কি দরকার ছিলো? আবার মাহার জন্য যদি ঢাকায় গিয়েই না থাকে তাহলে এতোদিনে আমার খোঁজ নিলো না কেনো?
সব প্রশ্ন ঝুলে আছে। উনাকে এখন সরাসরি এ ব্যাপারে জিজ্ঞাস করার মতো উপায় নেই। বরং পরিস্থিতির শিকার হয়ে আমার এ অনুভূতিগুলোকে মাটিচাপা দিতে হবে। কারন এসব প্রশ্ন, এসব আকাঙ্ক্ষা নিয়ে আমি চলতে পারবো না। অযথা এসব আমার মন খারাপের কারন হবে।
আমি আগেই জানতাম, এসব ভালোবাসা, ভালোলাগা কখনো সুখ বয়ে আনেনা। আনে শুধু কষ্ট বয়ে। বিশেষ করে প্রথম ভালোবাসা তো হয়েই কষ্ট দেওয়ার জন্য। প্রথম ভালোবাসার অপর নাম কষ্ট। এজন্যই সবসময় নিজেকে এসব ভালোবাসা, ভালোলাগা থেকে দূরে রাখতে হয়। যদি সারাজীবন সুখী থাকতে মন চায়, তবে এসব থেকে একশো হাত দূরত্ব বজায় রাখা উচিত।
কিন্তু এতোকিছু জানার পরও সেই নিষিদ্ধ কাজটা আমি করে ফেললাম। এজন্য নিজের মন থেকে মস্তিষ্ককে বেশি শক্ত করতে হয়। যা আমি এতোদিন করিনি। তবে এখন থেকে করবো। আমি শক্ত হবো। শুধু শুধু অপর মানুষের জন্য এসব অনুভূতি মনে জাগিয়ে কষ্ট পাওয়ার কোনো ভিত্তি হয়না। শক্ত করতে হবে নিজেকে। খুব শক্ত।…………..

.

দেখতে দেখতে দু সপ্তাহ কেটে গিয়েছে। কাল বাদে পরশু নদীর বিয়ে। তার বিয়ের দাওয়াত সেদিনই পেয়েছিলাম, যেদিন নদীকে দেখতে এসে আংটি পরিয়ে রেখে যায়। নদী,ছোট মামি,বড় মামি বিয়েড এক সপ্তাহ আগে আসার জন্য খুব অনুরোধ করেছিলো। তবে আমি যেতে চায়নি। নানা তাল-বাহানায় বিষয়টা কেটে গিয়েছি। আর পরেও যে নদীর বিয়েতে যেতে চেয়েছি তা নয়। এর কারন আদ্রিশ ভাইয়া। উনার মুখোমুখি আমি কিছুতেই হতে চাইনা। উনার প্রতি খুব অভিমান জন্মে গিয়েছে আমার মনে। হয়তো মনের কোনো এক কোনে কিছু রাগ বা ঘৃণাও জন্মেছে উনার প্রতি। এমন হওয়াটা অবশ্য স্বাভাবিক। কারন এই তিন সপ্তাহে একটা দিনও উনি আমার খোঁজ নেননি। রাগ, ঘৃণা, অভিমান জন্মানোর জন্য এই বিষয়টাই মূখ্য নয় কি?

আমার শত চেষ্টার পরও সেই বিয়ে বাড়িতেই আমাকে যেতে হবে আজকে। নদীর প্রচণ্ড জোরাজোরিতে আম্মু আমাকে সেই বিয়ে বাড়িতে পাঠাতে রাজি হলো। কথা ছিলো আম্মু আর আভাও যাবে। কিন্তু আভার অ্যাসাইনমেন্ট জমা দেওয়ার কারনে আম্মু আর আভা যেতে পারবে না বিয়ে বাড়িতে। এজন্য আমাকে সেখানে নিয়ে যাওয়ার জন্য আদ্রিশ ভাইয়া আসবে। আর সেখানে আমাকে চোখেচোখে রাখার জন্য আমার নানু আসবে। বিয়ে বাড়িতে অনেক কিছুই হয় বলে আম্মু নানুকে আজকেই আসতে বলেছে। এমনিতে নানুর বৃহস্পতিবারে সেই বাড়িতে যাওয়ার কথা। কিন্তু আমার জন্য আজ বুধবারে আসছে নানু৷
আদ্রিশ ভাইয়া আমাকে উনাদের বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার জন্য আসছে, এটা আমার কাছে বেশ খটকা লাগলো। খটকা লাগার কারনটা আম্মু আমাকে আদ্রিশ ভাইয়ার সাথে একা পাঠাবে। কি কারনে সে এতো সহজে বড় মামির এ প্রস্তাবে রাজি হয়ে গেলো তা আম্মুর কাছে জানতে চাইলাম। কিন্তু আম্মু বিষয়টাকে এড়িয়ে গেলো। জানি, আম্মুর কাছ থেকে এসবের কারন বের করা বড় দায়। এজন্য এ ব্যাপার নিয়ে আর ঘাটাঘাটি করেনি।

দুপুরের খাওয়াদাওয়ার পর আদ্রিশ আমাকে নিতে এলেন। বাসায় বসে কিছুক্ষণ আম্মু আর আব্বুর সাথে কথাবার্তা বললেন। উনি যে বাসায় এসেছেন, এটা জানার পরও আমি একনজরও উনার দিকে তাকাইনি। তাকার ইচ্ছাও নেই। অভিমানের পাহাড় জমে আছে। অনেক উঁচু সে পাহাড়।

কথাবার্তা শেষে আদ্রিশ ভাইয়া আমাকে নিয়ে বেরিয়ে পরলেন। আমি এখনো উনার দিকে চোখ উঠিয়ে তাকাইনি। তাকাইবোই বা কেনো? দরকার নেই তো। এমনই ভালো আছি আমি।

আদ্রিশ ভাইয়া আমাকে নিয়ে রিজার্ভ করা সিএনজিতে উঠে পরলেন। আমি বসলাম ডান দিকের একদম কোনায় আর উনি বসলেন বাম দিকের কোনায়। সিএনজি স্টার্ট নেওয়ার পরপরই উনি নরম গলায় বললেন,
“এই অধমের উপর কি অভিমানের পাল্লাটা একটু বেশিই ভারী হয়ে গিয়েছে মিশমিশ?”

®সারা মেহেক

#চলবে