#ভালোবাসার_রঙিন_প্রজাপতি
#লেখনীতে:সারা মেহেক
৩১
আমি সব শুনেও না শোনার ভান করে বসে রইলাম। ইচ্ছা করছে আদ্রিশ ভাইয়ার কথার প্রত্যুত্তরে কড়া কিছু কথা শুনিয়ে দেই। কিন্তু উনার সাথে কথা বলা বারণ। এক শব্দও মুখ দিয়ে উচ্চারণ করবো না।
আমি চুপচাপ বাইরের দিকে তাকিয়ে আছি। মনযোগ সেদিকেই নিবিষ্ট করতে ব্যস্ত হলাম আমি। তখনকার সেই কথাটা বলার পর আদ্রিশ ভাইয়া আর কিছুই বললেন না। হয়তো উনি বুঝতে পেরেছেন উনার কোনো প্রশ্নের জবাব আমি দিবো না।
আমরা যথাসময়ে মেজ নানু বাড়ি এসে উপস্থিত হলাম। সেখানে পৌঁছানোর পর দেখলাম, পুরো বাড়িতে লাইটিং এর কাজ চলছে। বাড়ির উঠোনে প্যান্ডেল বানানো হচ্ছে। আর বাড়ির বাইরে ছোট মানুষদের আনাগোনা। হয়তো এরা পাড়াপ্রতিবেশি বা নদীর আত্মীয়।
সিএনজি থেকে নেমেই আদ্রিশ ভাইয়া সিএনজি ওয়ালাকে টাকা দিতে ব্যস্ত হয়ে পরলেন। সেই ফাঁকে আমি বিনাবাক্যে নিজের ট্রাভেল ব্যাগটা সাথে নিয়ে বাড়ির দিকে হাঁটা ধরলাম। বাড়ির প্রধান দরজার কাছে পৌঁছানোর কিছু আগে আদ্রিশ ভাইয়া আমার পাশাপাশি হাঁটতে লাগলেন। একপর্যায়ে তিনি আমার হাত থেকে ব্যাগ নেওয়ার চেষ্টা করলেও আমি তা নিতে দিলাম না। উল্টো শক্ত হাতে ব্যাগ ধরে রাখলাম। আমার এ কাজ দেখে আদ্রিশ ভাইয়া আর ব্যাগ নেওয়ার চেষ্টা করলেন না। বরং চুপচাপ আমার সাথে হেঁটে বাড়ির ভেতর চলে এলেন।
বাড়িতে পৌঁছানোর সাথে সাথে নদী আমাকে দেখে উৎফুল্ল হয়ে পরলো। দৌড়ে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে বলল,
“আপু……তোমাকে কতদিন পর দেখলাম! মনটাই ভালো হয়ে গেলো। আই এম সো হ্যাপি।”
আমিও ভদ্রতাজনক হাসি দিয়ে বললাম,
“তোমাকেও অনেকদিন পর দেখতে পেয়ে ভালো লাগলো। তো নতুন বউ, কেমন আছো?”
নদী এবার আমাকে ছেড়ে দিয়ে মুচকি হেসে বলল,
“আমি এখনো বউ হয়নি।”
“হওনি। তবে হবে তো। বাই দা ওয়ে, এতো পরিবর্তন হলো কি করে?”
নদী মিষ্টি হেসে বলল,
“কিছু মানুষের প্রভাব থাকে এসবের উপর। ‘না’ কেও তারা ‘হ্যাঁ’ করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। সেও ওমন।”
নদীর কথা শুনে আমি বিস্ময় নিয়ে টিপ্পনী কেটে বললাম,
“ওহহো…..ভালোই প্রভাব ফেলেছে সে তাহলে।”
“হুম। আচ্ছা আপু, আমার রুমে চলো। ফ্রেশ হয়ে নাও। তারপর সবার সাথে দেখা করো।”
আমি নদীর কথায় সায় দিয়ে তার রুমে চলে এলাম। রুমটা বেশ অগোছালো হয়ে আছে। আমি ওয়ারড্রব এর কাছে ব্যাগ রেখে বোরকা খুলে ফ্রেশ হতে চলে গেলাম।
ফ্রেশ হয়ে এসে এ বাড়ির সবার সাথে দেখা করলাম। এরপর নদী তার মামা,খালাদের সাথে আমার পরিচয় করিয়ে দিলো। তাদের সাথে কুশল বিনিময় শেষে আমি রাইসা ভাবীর রুমে চলে এলাম। বাইরে থাকতে আর ভালো লাগছে না। কারন বাইরে মানুষের আনাগোনা বেশি। এতো মানুষের ভিতর এই গরমে ভালো লাগে না। তাই রাইসা ভাবীর রুমে আসা।
রাইসা ভাবীর রুমে আমি,নদী আর রাইসা ভাবী মিলে গল্প করতে লাগলাম। অবশ্য আমি শান্তিতে গল্প করতে পারলাম না। কারন আমি মায়াকে কোলে নিয়েছি। আর সে তো এখন হাত পা ছুঁড়তে ব্যস্ত। আর অনবরত মুখ দিয়ে ‘উউ’ আওয়াজ বের করে চলছে। তবে কান্না করেনি এখনো পর্যন্ত। এটা আমার কাছে ভালো লাগলো যে, মায়া খুব একটা কান্না করেনা। তবে মুখ দিয়ে উদ্ভট উদ্ভট সব আওয়াজ বের করতে ওস্তাদ সে।
.
সন্ধ্যার পর এক এক করে বাড়ির মোটামুটি সব পিচ্চিবাচ্চাদের মেহেদি দিতে লাগলাম। নদীকেও মেহেদি দিতে হবে। আগামীকাল হলুদের পর অনেক ঝামেলা থাকতে পারে ভেবে আজই মেহেদী দেওয়ার ঝামেলা চুকিয়ে নিতে বললো বড় মামি। সে অনুসারেই আমি এক এক করে পিচ্চিদের মেহেদি দিচ্ছি। ভাগ্য ভালো আমার সাথে নদীর এক মামাতো বোনও এসে যোগ দিয়েছে। মেয়েটা মাত্র ক্লাস নাইনে পড়ে। তাতেই বেশ ভালো মেহেদি দিতে পারে। এজন্যই সে আমাকে সাহায্য করছে।
দুই ঘন্টার পরিশ্রম শেষ সব পিচ্চিবাচ্চাদের একটু একটু করে মেহেদি দিয়ে আমি বিশ্রাম নিতে নদীর রুমে চলে আসলাম। তার রুমে কেউ নেই আপাতত। নদী ছোট মামির রুমে গিয়েছে কি কাজে যেনো। এজন্য সেও রুমে নেই।
সবাইকে মেহেদি দেওয়ায় হাত প্রচণ্ড ব্যাথা করছে বলে জানালার কাছে চেয়ার পেেত বসে বাম হাত দিয়ে ডান হাত টিপতে লাগলাম।
হঠাৎ পিছন থেকে কারোর কণ্ঠস্বর শুনতে পেলাম,
“আমি কি হেল্প করতে পারি?”
পিছনে না তাকিয়েই কণ্ঠস্বরের মালিককে চিনতে পারলাম। তবে কোনোরূপ শব্দ উচ্চারণ না করে বসে রইলাম। ওদিকে যে আদ্রিশ ভাইয়া আমার দিকে এগিয়ে আসছে তা বুঝতে পারছি।
উনি আমার পাশে এসে দাঁড়িয়ে বললেন,
“তোমার হাত ব্যাথা করছে, দাও একটু হাতটা টিপে দেই। ”
আমি জানালার দিকে চেয়ে থেকেই বললাম,
“নো থ্যাংকস। কারোর হেল্প লাগবে না আমার।”
আদ্রিশ ভাইয়া এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
“এসব লক্ষণ ভালো লাগছে না তো।”
উনার কথায় আমি বেশ অবাক হলাম। উনার দিকে তাকিয়ে চোখেমুখে বিস্ময়ভাব ফুটিয়ে তুলে জিজ্ঞাস করলাম,
“কিসের লক্ষণ?”
আদ্রিশ ভাইয়া এবার মুখ লুকিয়ে হেসে বললেন,
“এই যে কারোর উপর অভিমান করে তার সাথে কথা না বলা। তার দিকে না তাকানো। তার প্রশ্নের সোজাসুজি জবাব না দেওয়া, বিরাট এক অনুভূতির লক্ষণের মধ্যে পরে। জানো তো সেই লক্ষণ কিসের?”
আমি একদম ভালোমত ধরতে পেলাম আদ্রিশ ভাইয়া কথা কোনদিকে নিতে চাইছেন। কিন্তু আমি এ মূহুর্তে মোটেও চাইছি না কথা সেদিকে যাক। এজন্য আমি জানালার দিকে চেয়ে বললাম,
“আমি ওসব লক্ষণ টক্ষণ নিয়ে জানতে ইচ্ছুক নই।”
“কিন্তু আমি বলতে ইচ্ছুক।”
এই বলেই আদ্রিশ ভাইয়া আমার বাম দিকে হালকা ঝুঁকে ফিসফিস করে বললেন,
“এসব লক্ষণ প্রেমের লক্ষণ। যখন কেউ কারোর প্রেমে পরে তখন এসব লক্ষণ তার মধ্যে দেখা যায়।”
আদ্রিশ ভাইয়া এসব বলে আগের মতোই সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে পরলেন। অথচ আমি যেনো বরফের মতো জমে গেলাম। খানিক সময়ের জন্য যেনো আমি শ্বাস-প্রশ্বাস নিতেই ভুল গেলাম। আদ্রিশ ভাইয়ার এভাবে কথা বলাটা মোটেও উচিত হয়নি। উনি জানেন না, এভাবে কথা বলার পর আমার কেমন অনুভূত হবে? সব জানেন হয়তো উনি। জানার পরও ইচ্ছা করে এসব বলছেন উনি। বুঝতে পেরেছি বেশ। বেয়াদব লোক একটা।
আদ্রিশ ভাইয়া এহেন কাজে আমি লজ্জায় উনার দিকে তাকাতে পারলাম না। স্তব্ধ হয়ে জানালার বাইরে তাকিয়ে আছি। ওদিকে আদ্রিশ ভাইয়া আবারো বললেন,
“মিস মিশমিশ, আপনি তো মারাত্মকভাবে প্রেম নামক রোগে আক্রান্ত হয়েছেন! এই ডক্টর আরসালান আহমেদ আদ্রিশ কি আপনার এ রোগের চিকিৎসা করতে পারে? ”
আমি নির্বাক বসে রইলাম। বাম হাত দিয়ে ডান হাত জোরে চেপে ধরলাম আমি। বুকের ভেতর যে ধুকপুক আওয়াজটা তীব্রভাবে বেড়ে চলছে তা বেশ টের পাচ্ছি আমি। এখন একটা বাক্যও মুখ দিয়ে বের করার মত শক্তি নেই আমার।
আদ্রিশ ভাইয়া এবার ছোট্ট একটা শ্বাস ফেলে বললেন,
“অবশ্য আমার মনে হয় যে, একজন রোগী নিজে অন্য রোগীর চিকিৎসা করতে পারে না। সো আমার দ্বারা এ প্রেমের রোগের চিকিৎসা করা সম্ভব নয়। ”
এই বলে উনি আবারো আমার দিকে ঝুঁকে ফিসফিস করে বললেন,
“কারন আমি নিজেই এ রোগে আক্রান্ত মিশমিশ। মারাত্মকভাবে আক্রান্ত আমি। আমার এ রোগের চিকিৎসা আমার প্রেয়সীর কাছেই আছে। জানো তো সে কে?” বলে উনি সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে পরলেন। বরাবরের মত এবারও কিছু বলার ক্ষমতা রইলো না আমার ।
ওদিকে বাইরে থেকে নদীর কণ্ঠস্বর শুনতে পেলাম। সে এদিকেই এগিয়ে আসছে। নদীর কণ্ঠস্বর শুনেই হয়তো আদ্রিশ ভাইয়া দ্রুত এ রুম থেকে বেরিয়ে পরলেন। উনি চলে যেতেই জোরে জোরে শ্বাস নিতে লাগলাম আমি। এতক্ষণের দমবন্ধকর এক পরিবেশ থেকে অবশেষে মুক্তি পেলাম আমি। উনি আশেপাশে থেকে এ ধরণের কথাবার্তা বললেই আমার কেমন যেনো দমবন্ধকর এক পরিবেশ মনে হয় চারপাশ। হাত পা তখন প্রচণ্ড কাঁপতে থাকে। তবে তা আমি যথাসম্ভব আটকে রাখার চেষ্টা করি। যদিও বেশিরভাগ সময় তাতে ব্যর্থ হই আমি। আজকে অবশ্য একটু সফল হয়েছি আমি।
নদী রুমে এসেই আমাকে জানালার ধারে বসে থাকতে দেখে জিজ্ঞাস করলো,
“আপু, ওখানে বসে আছো কেনো? আমাকে মেহেদী দিয়ে দিবে না?”
আমি শুকনো একটা ঢোক গিলে নিজেকে সামলে নিয়ে উঠে দাঁড়ালাম। মেকি হেেস বললাম,
“হ্যা হ্যা, চলো। এখনই শুরু করি। নাহলে দেরি হয়ে যাবে।”
এই বলে আমি বিছানায় বসে পরলাম। নদী মেহেদী এনে আমার পাশে বসে পরতেই লম্বা এক শ্বাস টেনে নিয়ে তাকে মেহেদী দেওয়া শুরু করলাম আমি।
.
রাত প্রায় এগারোটার দিকে নদীর মেহেদী দেওয়া শেষ হলো। তার সাথে গল্প করতে করতে মেহেদী দিয়েছি বলে হাত ব্যাথা টের পায়নি আমি।
নদীর সাথে গল্পে গল্পে জানতে পারলাম, তার হবু বরের নাম মুহিব। আংটি পরানোর দিন থেকেই টুকটাক কথাবার্তা হতে থাকে তাদের মধ্যে। মুহিবের ব্যবহার আর কথাবার্তায় নদী মুগ্ধ হয়ে গিয়েছে বলেই মন থেকে বিয়েটাকে মেনে নিয়েছে সে। এটা শুনে বেশ খুশিই হয়েছিলাম আমি।
নদীর মেহেদী দেওয়া শেষে আমি ঠান্ডা হাওয়া উপভোগ করতে উঠোনে এসে দাঁড়ালাম। চারপাশ নিস্তব্ধ নিরব। শুধু ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক শোনা যাচ্ছে। মৃদু বাতাসে মরিচবাতিগুলো তালে তালে দুলছে। দেখতে বেশ লাগছে।
আগামী দুইদিন সবার উপরে বেশ ধকল যাবে বলে আজই জলদি জলদি ঘুমিয়ে পরেছে সবাই। নদীর মেহেদী দেওয়া মাত্রই শেষ হয়েছে বলে বেশ ক্লান্ত লাগছে। কিছুক্ষণ ফুরফুরে বাতাসে থেকে ঘুমুতে যাবো বলেই একা একা দাঁড়িয়ে আছি।
“তুমি হাতে মেহেদী নিবে না?”
হঠাৎ আদ্রিশ ভাইয়ার কণ্ঠস্বর শুনে চমকে উঠলাম। এই সময়ে উনার উপস্থিতি মোটেও আশা করেনি। এজন্য বেশ ভয় পেয়ে গেলাম।
আমার ভীতু চেহারা দেখে আদ্রিশ ভাইয়া একগাল হেসে বললেন,
“রিল্যাক্স, আমিই তো। এতো ভয় পাওয়ার কি আছে?”
আমি কিছু না বলে বিরক্তি নিয়ে উনার দিকে তাকিয়ে মুখ বাঁকিয়ে ভেঙচি কাটলাম। সাথে সাথে উনি শব্দ করে হেসে বললেন,
“বাহ, বেশ ভালো ভেঙচি দিতে পারো তো দেখছি। এই ভেঙচিতে কতজনের এক্সিডেন্ট করিয়েছো?”
উনার কথার মানে বুঝতে না পেরে চোখমুখ কুঁচকে বললাম,
“এক্সিডেন্ট মানে? ভেঙচি দিয়ে আবার এক্সিডেন্ট করে গে?”
আদ্রিশ ভাইয়া আমার কথায় আবারো হেসে আমার মাথায় হালকা চাপড় মেরে বললেন,
“ঘায়েল মিশমিশ, ঘায়েল। এই যে মাত্রই আমাকে ঘায়েল করলে। এমন আর কতজনকে করেছো?”
উনার এ কথায় আমার লজ্জা পাওয়ার কথা থাকলেই আমি নিজেকে শক্ত করে তা থেকে বিরত রাখলাম। দুহাত বুকে গুঁজে বললাম,
“এতো পাম মারতে শিখেছেন কার কাছ থেকে?”
আদ্রিশ ভাইয়া এবার অবাক হবার ভান ধরে বললেন,
“সত্য কথাকে তুমি পাম বলছো! দিস ইজ নট ফেয়ার মিশমিশ।”
“ওসব ফেয়ার, ব্ল্যাক কি আমি জানি না। যা সত্য তাই বললাম।”
আদ্রিশ ভাইয়া আবারো হেসে দিলেন। উনার এ হাসি মারাত্মক আঘাত করে। শত অভিমান, রাগ, কষ্ট এই হাসির সামনে ফিকে পরে যায়। অদ্ভুত! উনার হাসিতে এতো মুগ্ধ হই আমি!
উনি এবার বললেন,
“আচ্ছা, এ টপিক বাদ দাও। তুমি মেহেদী নিবে কখন?”
“কেনো? এ প্রশ্ন জিজ্ঞাস করার কারন কি?”
“আছে কারন। আগে বলো তো কখন মেহেদী নিবে।”
“এখান থেকে গিয়ে নিতে পারি। ঠিক নেই। বেশি ক্লান্ত অনুভব করলে ঘুমিয়ে পরবো।”
“উহুঁ, মেহেদী না নিয়ে ঘুমাবে না।”
“আপনার কথা শুনতে যাবো কোন দুঃখে?”
“নাম লেখার দুঃখে। ”
“মানে?”
“মানে এই যে, তুমি মেহেদী নেওয়ার পর তোমার প্রেমিক পুরুষ বা পছন্দের মানুষ, যাই বলো না কেনো, তার নাম লিখবে।”
আদ্রিশ ভাইয়ার কথা একদম পরিষ্কার বুঝতে পারলাম আমি। উনার এসব সোজাসাপটা কথাবার্তা আমাকে অবাকের চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছে দিচ্ছে। অদ্ভুত তো! উনি এসব কথাবার্তা এতো সোজাসুজি বললো কিভাবে!
আমি এবার বললাম
“এ্যাহ, শখ কতো। আমি ওসব নাম লিখতে যাবো কেনো? খেয়েদেয়ে কাজ নেই আমার। শখের মেহেদী নষ্ট করতে রাজি নই আমি।”
এই বলেই আর এক মূহুর্তও সেখানে দাঁড়িয়ে না থেকে বাড়ির ভেতরের দিকে পা বাড়ালাম। পিছন থেকে শুনতে পেলাম আদ্রিশ ভাইয়ার কণ্ঠস্বর,
“নাম তো তোমাকে লিখতেই হবে।”
উনার কথার প্রত্যুত্তরে আমি কিছুই বললাম না।
.
সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠতে হলো আমাকে। যদিও আমি উঠতে চায়নি। কিন্তু আশেপাশে বাচ্চাদের চিৎকার চেঁচামেচি আর মহিলাদের হট্টগোলের আওয়াজ শুনে আর ঘুমানো হলো না আমার। ফ্রেশ হয়ে খাওয়াদাওয়া করে নদীর সাথে গল্প জুড়ে দিলাম আমি।
সকাল প্রায় এগারোটার দিকে এখানকার রীতিনীতি মেনে নদীকে হলুদ গোসল দেওয়ার আয়োজন করা হলো। পিছনের ছোট উঠোনে সব আয়োজন করা হয়েছে বলে নদীকে হলুদ শাড়ী পরিয়ে দিয়ে বড় মামি সেখানে নিয়ে গেলো তাকে। এদিকে আমি শাড়ী পরতে পারিনা বলে নদীর খালামনি আমাকে শাড়ী পরিয়ে দিলেন।
আমাকে শাড়ী পরিয়ে দেওয়া শেষ হতেই ছোট মামি নদীর খালামনিকে উঠোনের দিকে ডাকলেন। যাওয়ার সময় তিনি আমাকে সাথে নিয়ে যেতে চাইলেন। কিন্তু আমি যাইতে চাইলাম না। কারন এখনো মাথার অগোছালো চুলগুলো গুছিয়ে খোঁপা করতে হবে আমাকে।
নদীর খালামনি চলে যেতেই আমি দ্রুত চুল আঁচড়ে সামনের চুলগুলো টুইস্ট করে পিছনে হাতখোঁপা করে নিলাম। সবকিছু হালকা গোছগাছ করে উঠোনের দিকে রওনা দিতেই মনে পরলো, নদীর খালামনি যাওয়ার আগে আমাকে বলেছিলেন, আদ্রিশ ভাইয়ার রুম থেকে হলুদের দ্বিতীয় ডালা নিয়ে আসতে হবে আমাকে। এ ডালায় গামছা,শাড়ীসহ প্রয়োজনীয় কিছু জিনিসপত্র আছে যা হলুদ গোসলের পর লাগবে।
নদীর খালামনির কথামতো আমি আদ্রিশ ভাইয়ার ভাইয়ার রুমের দিকে পা বাড়ালাম। উনার রুমের দরজা ভিজিয়ে রাখা। আমি আস্তে করে উনার রুমের দরজা খুলে রুমের ভিতরে প্রবেশ করলাম।
উনার রুমে দ্বিতীয় ডালা আছে তা ভেবেই আমি প্রথমে অবাক হয়েছিলাম। পরে নদীর খালামনি বললেন, গতকাল সন্ধ্যায় আদ্রিশ ভাইয়ার রুমেই হলুদের দুটো ডালা প্রস্তুত করা হয়। প্রথম ডালায় হলুদ রাখার জন্য তা আগেই নদীর রুমে নিয়ে আসা হয়। কিন্তু দ্বিতীয় ডালাটা উনার রুমেই রয়ে যায়।
আদ্রিশ ভাইয়ার রুমে পা রাখতেই দেখলাম উনি এখনো ঘুমাচ্ছেন। সকাল এগারোটার দিকেও উনি ঘুম থেকে উঠেননি এটা ভেবেই অবাক হলাম। অবশ্য নিজেকে বুঝিয়েও দিলাম যে, হয়তো উনি রাতে দেরি করে ঘুমিয়েছেন। বিয়ে বাড়ির ব্যস্ততা বলে কথা।
আমি হলুদের ডালাটা উনার বিছানার পাশের টেবিল থেকে হাতে নিলাম। তবে রুম থেকে বেরিয়ে যাওয়ার আগে উনার ঘুমন্ত অবস্থা দেখে আমার মাথায় দুষ্টু এক বুদ্ধি চেপে বসলো।
@সারা মেহেক
#চলবে
#ভালোবাসার_রঙিন_প্রজাপতি
#লেখনীতে:সারা মেহেক
৩২
আদ্রিশ ভাইয়ার ঘুমন্ত অবস্থা দেখে উনার নেওয়া সেদিনকার রিভেঞ্জের কথা মনে পরে গেলো। সেদিন বিলে যাওয়ার আগে আমাকে আর নদীকে যেভাবে মিথ্যা বলে ঘুম থেকে উঠেছিলেন উনি, আমিও আজ উনার ঘুম সেভাবে নষ্ট করবো। ঠিক সেভাবে নয়। উনি আমাদের মিথ্যা বলে ঘুম থেকে উঠিয়েছিলেন। তবে আমি কোনো কথা বলবো না। সোজা কাজে নেমে পরবো। একদম, কথা কম কাজ বেশি ধরনের।
আদ্রিশ ভাইয়ার ঘুম খুব ভালোভাবে তাড়ানোর জন্য পুরো রুমের জিনিসপত্রগুলো দেখতে লাগলাম। কি দিয়ে উনার ঘুম ভাঙানো যায় তা ভাবতে লাগলাম। হঠাৎ চোখ আটকে গেলো হলুদের ডালা রাখা টেবিলে পানির বোতলের উপর। অর্ধেক পানি দিয়ে বোতলটা ভরা। এ পানি দিয়েই যে উনার ঘুম ভালোমত ভাঙানো যাবে তা ভেবেই আনন্দ লাগলো মনে।
আমি নিঃশব্দে হলুদের ডালাটা টেবিলের উপর রেখে পানির বোতলটা হাতে নিলাম। বুকটা একটু একটু ভয়ে ধুকপুক করছে। তবুও লম্বা একটা শ্বাস টেনে সাহস জুগিয়ে নিলাম মনে। এদিকে বোতলের মুখ খুলছি, অপরদিকে মাথায় প্ল্যানিং করছি, এরপর কিভাবে এখান থেকে এক দৌড়ে পালাবো।
সব প্ল্যান ঠিকমতো সেট করে নিয়ে বোতলের মুখ খুললাম। আদ্রিশ ভাইয়া উদাম শরীরে উপর হয়ে শুয়ে আছেন। পরনে শুধু একটা ঢিলেঢালা ফুল প্যান্ট। উদাম শরীরে পানির স্পর্শ একদম ভালোমত লাগবে ভেবেই হাসি পেলো খুব।
আদ্রিশ ভাইয়ার দিকে একনজর তাকিয়ে ছোট্ট একটা শ্বাস ফেলে বোতলের সবটুকু পানি উনার শরীরে ছুঁড়ে দিলাম। সাথে সাথে উনার ঘুম ভেঙে গেলো। চমকে একদম হুড়হুড় করে শোয়া থেকে উঠে পরলেন উনি। ততক্ষণে আমি বোতলটা কোনোমতে টেবিলে রেখে হলুদের ডালাটা হাতে নিয়ে দরজার দিকে ভৌ-দৌড় দেওয়া চেষ্টা করলাম। কিন্তু আফসোস, শাড়ী নামক প্যাঁচানো প্যারা আমাকে ভালোমতো দৌড়াতে সাহায্য করলো না। উল্টো মনে হলো, একটু জোরে দৌড় দিতে গেলেই শাড়ীতে পা প্যাঁচিয়ে উল্টে পরবো। তবুও নিজের সর্বোচ্চ দিয়ে হলুদের ডালাটা হাতে নিয়ে দৌড় দিলাম।
কিন্তু……..দরজার একদম কাছে আসতেই অঘটনটা ঘটলো। আমি দরজার কাছে পৌঁছাতেই আদ্রিশ ভাইয়া দরজা আটকে দিলেন। আমার পাশ দিয়েই উনি দরজাটা আটকে দিলেন। আর আমি বিস্ময় নিয়ে শুধু দেখলাম। বুঝতে পারলাম আদ্রিশ ভাইয়ার খরগোশের গতির কাছে আমার গতি একদম শ্লথের মতো ধীর। উনি যে এতো তাড়াতাড়ি উঠে আমার পথ আগলে ধরবেন তা বুঝতে পারিনি। সব ঝামেলা এই শাড়ীকে ঘিরে। আজ যদি এ শাড়ী না পরে সাধারণ পোশাকে থাকতাম তবে আমার প্ল্যান মোতাবেক সময়মতোই রুম থেকে বেরিয়ে যেতে পারতাম। কিন্তু এখন এসব আফসোস করে লাভ হবে নাকি! ফেঁসে তো গিয়েছি। এবার উনি কি করবেন তা উনিই ভালো জানেন।
আমি দরজার দিকে মুখ করে এখনো দাঁড়িয়ে আছি। আর আদ্রিশ ভাইয়া আমার পিছনের দিকে দাঁড়িয়ে আছেন। আমি ভয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছি দেখে উনি গলা পরিষ্কার করে বললেন,
“এসব কি ছিলো মিশমিশ?”
আমি শুকনো একটা ঢোক গিলে সে অবস্থাতেই দাঁড়িয়ে রইলাম। আমতাআমতা করে বললাম,
“কো-কোনট কি ছিলো?”
আদ্রিশ ভাইয়া এবার খানিকটা ধমকের সুরে বললেন,
“আমার দিকে ঘুরে কথা বলো। ”
“আপনার কথা না মানলে?”
উনি কোনো কিছুরই তোয়াক্কা করেননা, এমন একটা ভাব নিয়ে বললেন,
“না মানলে নেই। আমার কথা কিভাবে মানিয়ে নিতে হয় তা জানি আমি।”
বুঝতে পারলাম, উনার কথা মানতেই হবে আমাকে। আমি শুকনো একটা ঢোক গিলে ফোঁস করে শ্বাস ফেলে উনার দিকে ফিরে দাঁড়ালাম। তবে আমার দৃষ্টি নত। কারন উনার উদাম শরীরের দিকে তাকানোর শক্তি এবং ইচ্ছা, কোনোটাই নেই।
আদ্রিশ ভাইয়া এবার বললেন,
“আমার ঘুম ভাঙালে কেনো?”
আমি অবনত দৃষ্টি নিয়েই বললাম,
“ইচ্ছা করলো তাই।”
“এতো ইচ্ছার মূল্য কবে থেকে দিতে শিখলে তুমি?”
“আপনাকে জানাবো কেনো?”
“জানাবে না কেনো? আর এভাবে আমার ঘুম ভাঙানোর কারনটা কি মিস মিশমিশ?”
” কারনটা হলো রিভেঞ্জ। ”
আদ্রিশ ভাইয়া হয়তো আমার কথা বুঝতে পারেননি। এজন্য জিজ্ঞাসু স্বরে বললেন,
“কিসের রিভেঞ্জ? ”
“আমাকে আর নদীকে সেদিন যে মিথ্যে বলে ঘুম থেকে উঠিয়েছিলেন, সেটার রিভেঞ্জ। ”
আদ্রিশ ভাইয়া বিস্ময় নিয়ে জিজ্ঞাস করলেন,
“সেইদিনকার রিভেঞ্জের কথা এখনো মনে আছে!”
“হুম মনে আছে। সেটা ভুলার মত নয়। ”
“বাহ, আর কি কি ভুলার মত না?”
“আছে অনেক কিছু। সবকথা সবাইকে বলতে হয়না।”
আদ্রিশ ভাইয়া খানিকক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর স্বাভাবিকভাবে বললেন,
” এতো সাহস আসে কোথা থেকে? ভয় পাও না আমাকে দেখে?”
আমি চুপ করে রইলাম। আসলে, আদ্রিশ ভাইয়াকে দেখে কখনো ওমন ভয় পায়নি। উল্টো কেমন যেনো সাহস পেয়ে বসি। এই যে, আজ যেমন উনার শরীরে পানি ঢেলে দিলাম! তবে সবসময় যে সাহস পাই তা নয়, মাঝেমধ্যে ভয় লাগে।
আদ্রিশ ভাইয়া আমার নিশ্চুপ ভঙ্গি দেখে কিছুটা ধমকের সুরে বললেন,
“ঘাড়ে কি প্রবলেম? মাথা নিচু করে আছো কেনো? মাথা তুলো। ”
আমি চোখমুখ খিঁচে বন্ধ করে মাথা তুললাম। ফোঁস করে একটা শ্বাস ফেলে চোখ মেলে তাকালাম। উনার চোখ বরাবর তাকানোর সাহসটা আপাতত নেই। এজন্য, পাশে ফিরে জানালার দিকে চেয়ে রইলাম।
আদ্রিশ ভাইয়া এখনো উনার বাম হাত আমার পিছনে দরজার উপর রেখে দাঁড়িয়ে আছেন। উনার আর আমার মধ্যকার দূরত্ব এক হাত। উনি সে অবস্থাতেই থেকে নিজের ডান হাত দিয়ে আমার থুতনি হালকা চেপে ধরলেন। এরপর আমার মাথা নিজের দিকে ঘুরিয়ে ভ্রুজোড়া নাচিয়ে বললেন,
“চোখে চোখ রাখতে সমস্যা কি?”
আমি উনার চোখ বরাবর তাকিয়ে থাকতে পারছি না। আবারও সে দমবন্ধকর পরিস্থিতি অনুভব করছি আমি। নিজেকে এখন একটু ভিতু মনে হচ্ছে। তবে এ ভিতু ভাবটা উনার সামনে দেখালে উনি আমাকে পেয়ে বসবেন। এর চেয়ে মনে সাহস জুগিয়ে উনার সম্মুখীন হতে হবে।
আমি এবার কাঁপাকাঁপা কণ্ঠে বললাম,
“কোনো সমস্যা নেই।”
আদ্রিশ ভাইয়া আমার থুতনি ছেড়ে দিয়ে বললেন,
“তাহলে তাকাচ্ছো না কেনো?”
“ইচ্ছা নেই তাই।”
“তোমার ইচ্ছাগুলোও খুব অদ্ভুত! তুমি মানুষটাও নিজে অদ্ভুত। ”
“জানি। এতো ঘটা করে বলতে হবে না।”
“বাহ,,, তো বলো মিস মিশমিশ, আমাকে দেখে ভয় করে না?”
আমি এবার মেকি সাহস দেখিয়ে বললাম,
“আপনাকে দেখে ভয় পাবো কোন দুঃখে? আপনি বাঘ না ভাল্লুক? আপনি একটা সাধারণ মানুষ। সো আপনাকে দেখে ভয় পাওয়ার কারন নেই।”
আদ্রিশ ভাইয়া এবার ভ্রু উঁচিয়ে ঠোঁট উল্টে বললেন,
“মিশমিশ এতো সাহসী তা তো জানতাম না। এখনও কি ভয় করছে না?”
আমি পূর্বের মতোই বললাম,
“মোটেও না।”
আদ্রিশ ভাইয়া আমার কথায় বাঁকা হেসে দিলেন। আমার দিকে হালকা একটু ঝুঁকে বললেন,
“এখনও না?”
আমার ভয় লাগার পরও বললাম,
“না।”
উনি এবার আমার দিকে একটু এগিয়ে এসে বললেন,
“এখনো না?”
আমি শুকনো একটা ঢোক গিলে নিজের স্থানেই ঠিকঠাক দাঁড়িয়ে থেকে বললাম,
“না।”
উনি আরও একটু এগিয়ে আসতে লাগলেন আমার দিকে। এবার আর না পেরে আমি দু পা পিছিয়ে এলাম। উনি আবারো বললেন,
“এখনো ভয় লাগছে না?”
আদ্রিশ ভাইয়ার কথা আর কাজে এখন আমার কান্না পেতে লাগলো। আর কতক্ষণ এই মেকি সাহস দেখাবো বুঝতে পারছি না। এদিকে যে আমার ভেতরে হৃদপিণ্ডটা তুমুল জোরে লাফাচ্ছে তা হাড়েহাড়ে টের পাচ্ছি আমি। অথচ এই বেয়াদব লোকটার এদিকে কোনো তোয়াক্কাই নেই। সে তো আমাকে ভয় পাইয়ে দিতে ব্যস্ত। কিন্তু আমিও কম কিসে? কিছু কিছু ব্যাপারে অভিনয় জানি ভালো।
সেটাই এখানে প্রয়োগ করবো।
আমি ঠোঁটের কোনে স্বাভাবিক হাসি আনার চেষ্টা করে বললাম,
“জ্বি না। এখনো ভয় লাগছে না।”
আমাকে ভয় দেখানোর পুরো প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছেন হয়তো আদ্রিশ ভাইয়া। উনি আমার দিকে আরেকটু এগিয়ে এসে বললেন,
“এখনো ভয় লাগছে না? ”
আমি আবারও পিছিয়ে এলাম। এবার আমার পিঠ একদম দরজায় গিয়ে ঠেকে পরলো। আমি তবুও সাহস নিয়ে বললাম,
“জ্বি না। মোটেও ভয় করছে না।”
আদ্রিশ ভাইয়া আমার দিকে আরো এগিয়ে আসতে চাইলেন। তবে আমার হাতে হলুদের ডালা থাকায় তা ঢাল হিসেবে কাজ করলো এখন। ফলে উনি আমার দিকে এগিয়ে আসতে পারলেন না। তবে আমাকে ভয় দেখাতেই উনার ডান হাত দিয়ে আমার কানের পিছনে চুল গুঁজে দিতে বললেন,
“এতো সাহসী তুমি তা জানতাম না। তোমাকে যদি এখন আমি অন্যভাবে স্পর্শ করি, তবুও তুমি ভয় পাবে না?”
আদ্রিশ ভাইয়ার কথা শুনে আমি অবাক হয়ে গেলাম। জানি, উনি আমাকে কখনও ওভাবে স্পর্শ করবেন না। এ বিশ্বাস আছে উনার প্রতি। আর এ বিশ্বাস জন্মেছে উনার কথা,কাজে।
আমি আত্মবিশ্বাসের সহিত বললাম,
“আপনি কখনো ওভাবে আমাকে স্পর্শই করবেন না। তাই এসব নিয়ে ভেবে ভয় পাওয়ার দরকার নেই আমার। ”
আমার কথায় আদ্রিশ ভাইয়ার চোখেমুখে বিস্ময়কর এক ভাব ফুটে উঠলো। উনি বিস্ময় নিয়ে বললেন,
“এতো বিশ্বাস করো আমাকে!”
আমি ঠোঁটের কোনে তৃপ্তির হাসি ফুটিয়ে বললাম,
“হুম। কোনো সন্দেহ আছে?”
আদ্রিশ মৃদু হেসে বললেন,
“এতো বিশ্বাস করো কেনো আমাকে? কারন কি?”
“আজ নয়, কোনো একদিন জানতে পারবেন কারন।”
“আচ্ছা? কোনোদিন যদি এ বিশ্বাসের মূল্য না রাখতে পারি?”
আমি হালকা হেসে বললাম,
“সেই ‘কোনোদিন’ কখনো আসবে না।”
আদ্রিশ ভাইয়া আরো কিছু বলতে চাইলেন। তবে বাহির হতে বড় মামির উচ্চস্বরে ডাক শুনতে পেলাম।
“মিম…….কোথায় তুমি? ”
বড় মামির কণ্ঠস্বরে আদ্রিশ ভাইয়া তটস্থ হয়ে পরলেন। দ্রুত দরজার উপর থেকে হাত সরিয়ে আমার কাছ থেকে দূরে দাঁড়িয়ে পরলেন। সাথে সাথে আমি দরজা খুলে বাইরে চলে আসলাম। হাতে হলুদের ডালা ধরে রেখেছি। বড় মামি তখন ছোট উঠোন থেকে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করে বলল,
“কি ব্যাপার মিম? এতক্ষণ কোথায় ছিলে? নদীর হলুদ গোসল প্রায় শেষের দিকে। ”
আমি নিজেকে সামলে নিয়ে বললাম,
“ঐ যে শাড়ীর সেইফটিফিন খুলে গিয়েছিলো। সেটা ঠিক করলাম।”
“তাই বলে এতক্ষণ!”
“বড় মামি, তুমি হলুদের ডালাটা নিয়ে যেতে পারবে? আমি একটু আসছি রুম থেকে। ”
বড় মামি চিন্তিত স্বরে বলল,
“কেনো? কোনো সমস্যা?”
বড় মামি যাতে কিছুই না বুঝতে পারে, এজন্য আমি জোরপূর্বক হেসে বললাম,
” একটু হাতমুখ ধুবো আরকি। ওয়াশরুম থেকে বের হয়েই আমি ওখানে চলে আসবো।”
বড় মামি আমার হাত থেকে হলুদের ডালাটা নিয়ে বলল,
“আচ্ছা। যাও।”
আমি সেখানে দাঁড়িয়ে না থেকে দ্রুত নদীর রুমে চলে এলাম। ওয়াশরুমে ঢুকেই জোরে একটা শ্বাস ফেললাম। সবকিছু বড্ড অদ্ভুত লাগছে। আমাদের মধ্যে কখনো পছন্দ, ভালোলাগা নিয়ে সরাসরি কথা হয়নি। অথচ, আমরা দিব্যি একে অপরের মনের কথা জানি। আমাদের দুজনের মধ্যে কেউই কখনো ভালোলাগা, ভালোবাসার কথা মুখে স্বীকার করেনি, অথচ দুজন দুজনের মনের কথা জানি। যদিও আমি আদ্রিশ ভাইয়ার ডায়েরী পড়ে উনার মনের কথা সম্বন্ধে নিশ্চিত হয়েছি। কিন্তু উনি আমার মনের কথা কখনো নিশ্চিত জানতে পারেননি কোনোভাবে। কিন্তু উনার আমার প্রতি ছোট্ট ছোট্ট কিছু অধিকার খাটানোর কথাবার্তা বলে দিচ্ছে যে, উনি আমার মনের কথা সবটা জানেন। সবটা……
এখনো পর্যন্ত আমাদের দুজনের অনুভূতি মনের মধ্যেই রয়ে গেছে। কবে তা সরাসরি মুখে প্রকাশ হবে জানা নেই। ভয় করে, এর আগেই যদি কোনো ঝড় এসে পরে!
আমি আর কিছু না ভেবে দ্রুত চোখেমুখে পানির ঝাপটা মেরে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে পরলাম। টাওয়াল দিয়ে মুখ মুছে রুম থেকে বের হতেই একদম অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে অর্ণব ভাইয়ার মুখোমুখি হলাম। উনাকে এ মূহুর্তে এখানে মোটেও আশা করেনি।
®সারা মেহেক
#চলবে