ভালোবাসার রঙিন প্রজাপতি পর্ব-৩৫+৩৬

0
1194

#ভালোবাসার_রঙিন_প্রজাপতি
#লেখনীতে:সারা মেহেক

৩৫

আমি অর্ণব ভাইয়ার দিকে তাকিয়ে রাগান্বিত স্বরে বললাম,
“আপনার কি মাথা ঠিক আছে? কি বলছেন তা কি একবারো ভেবে দেখেছেন?”

অর্ণব ভাইয়া ভড়কে গেলেন। ফুলটা হাতে নিয়েই তিনি সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বললেন,
“অবশ্যই ভেবে দেখেছি। আমি তো হুট করে তোমাকে প্রপোজ করিনি। সবকিছু ঠিকঠাক করেই প্রপোজ করেছি তোমাকে। আদ্রিশের সাথে কথাবার্তা বলেই এদিকে পা বাড়িয়েছি।”

অর্ণব ভাইয়ার কথায় আমি যেনো আকাশ থেকে পরলাম। উনি আদ্রিশ ভাইয়ার সাথে কথা বলে আমাকে প্রপোজ করেছেন! সবটা জানার পরও আদ্রিশ ভাইয়া কি চিন্তা করে অর্ণব ভাইয়াকে প্রপোজ করতে বলে! আমার মাথায় কিছুই আসছে না। হচ্ছে কি এখানে! ওদিকে আদ্রিশ ভাইয়া সব দেখেও না দেখার ভান করে আছে আর এদিকে অর্ণব ভাইয়া আমাকে প্রপোজ করছেন!

আমার কিছু বলার আগেই অর্ণব ভাইয়া একটু অন্যমনস্ক হয়ে বললেন,
“জানো মিম? তোমাকে সেই প্রথম দেখা থেকেই ভালো লেগেছিলো খুব। এরপর রোজ রোজ তোমার সাথে দেখা করতে মন চাইতো। কিন্তু তুমি কি ভাববে, এই ভেবে আর বেশি দেখা করতাম না।
একমাস আগে বিদেশে যাওয়ার পর থেকেই আমার অবস্থা নাজেহাল যেনো। শুধু তোমাকে দেখতে মন চাইতো, কথা বলতে মন চাইতো। কিন্তু আমি নিরুপায় ছিলাম। যতই দিন যাচ্ছিলো ততই আমার কষ্ট বেড়ে যাচ্ছিলো। একসময় ঠিকই বুঝতে পারলাম, আমি তোমাকে ভালোবাসি। খুব ভালোবাসি। দেশে ফিরেই তোমাকে আমার মনের কথা বলতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তুমি তো বাসায় চলে গিয়েছিলে। পরে দেখো…..নদীর বিয়ের জন্য তোমাকে প্রপোজ করার একটা সুযোগও পেয়ে গেলাম। অতঃপর আদ্রিশের সাথে কথাবার্তা বলে তোমাকে প্রপোজ করার সিদ্ধান্ত নিলাম। সেই আমাকে বলল, প্রপোজ করলে আজকালের ভেতরে করে ফেলতে । পরে যদি আবার তুমি চলে যাও! এজন্যই আজ আমার মনের কথা তোমার সামনে এনে রাখলাম। আর আদ্রিশ বললো কি জানো? ও বললো যে, তুমি খুশি মনে আমার প্রপোজ একসেপ্ট করবে। কারন সে তোমাকে বেশ ভালোভাবেই চিনে। আমারও মনে হয়, তুমি একসেপ্ট করবে। লুক মিম, আমার মধ্যে খারাপ কিছু তো নেই। আমি তোমাকে রিলেশনের কথা বলছি না। আমি সোজা বিয়ের কথা বলছি। আমার মনে হয় না…আমার মধ্যে রিজেক্ট করার কোনো কারন আছে।”
এই বলে অর্ণব ভাইয়া ফোঁস করে দম ফেললেন। যেনো উনি কথা বলতে বলতে হাঁপিয়ে উঠেছিলেন। আমি এসব বিষয়ে তেমন খেয়াল না করে আদ্রিশ ভাইয়ার দিকে তাকালাম। উনার এতে কোনো ভাবান্তর হলো না। শুধুমাত্র ফোনটা পকেটে রেখে আমার দিকে তাকালেন উনি। ঠোঁটের কোনে লেগে আছে বিজয়ের হাসি। যেনো খুব মূল্যবান কিছু জিতে নিয়েছেন উনি।

অনেক চিন্তা করেও আদ্রিশ ভাইয়ার এসব কর্মকাণ্ডের কোনো ভিত্তি খুঁজে পেলাম না আমি। বরং বারবার আমার মনে সন্দেহ জাগতে লাগলো। আদ্রিশ ভাইয়া আর অর্ণব ভাইয়ার এহেন কাণ্ডে আমার মনে হচ্ছে, আদ্রিশ ভাইয়া এতোদিন আমার সাথে নাটক করছিলেন। ভালোবাসার নাটক। উনি এখনো হয়তো মাহাকেই পছন্দ করেন। তাকেই ভালোবাসেন। যদি এমনটা না-ই হতো তাহলে উনি এতো হাসিখুশি থেকে অর্ণব ভাইয়ার প্রপোজ করা দেখছেন কি করে! আর অর্ণব ভাইয়ার কথামতো আদ্রিশ ভাইয়াই উনাকে আইডিয়া দিয়েছেন, আমাকে প্রপোজ করার। এরপর আবার বলেও দিয়েছেন, আমি প্রপোজাল একসেপ্ট করবো! উনি এমনটা কি করে বললেন!

এসব বলার পর কথা এক জায়গায় এসেই আটকায়। তা হলো, উনি আমাকে ভালোবাসেন না। আমার সাথে নাটক করছিলেন এতোদিন।
আজকালকার ছেলেদের উপর বিশ্বাস নেই। তারা এসব নাটকে পারদর্শী। আদ্রিশ ভাইয়াও তার ব্যতিক্রম নয়। আর আমিই বা কেনো ধরে নিয়েছিলাম উনি আমাকে ভালোবাসেন! এ পর্যন্ত কখনওতো উনি আমাকে সরাসরি এ বিষয়ে কিছু বলেননি। তাহলে আমি কেনো ধরে নিলাম উনি আমাকে ভালোবাসেন?
মাহার বিষয়টা আমাকে পরিষ্কারভাবে বলেননি উনি। গত তিন সপ্তাহেও উনি আমার খোঁজ নেননি। কারন কি এসবের? নিশ্চয়ই আমাকে ভালোবাসেন না উনি। আমিই পাগলের মত দুই লাইন বেশি বুঝে ফেলেছিলাম। তবে এখন তো তা শুধরে নিতে পারবো আমি। আদ্রিশ ভাইয়াকে দেখিয়ে দিবো, উনার এ নাটক আমার উপর কোনো প্রভাব ফেলেনি। আমি দেড় মাস আগে যেমন ছিলাম। এখনও তেমন আছি।

আমি ছোট্ট এক শ্বাস ফেলে অর্ণব ভাইয়ার দিকে তাকালাম। উনি হাসিমুখে বললেন,
“এতোক্ষন আমার বিষয়েই চিন্তা করছিলে, ঠিক না?”

আমি জোরপূর্বক হেসে বললাম,
” আপনি কিছুক্ষন আগে আপনার বন্ধু সম্পর্কে যা যা বললেন, সবই সত্যি ছিলো?”

“অবশ্যই সত্যি ছিলো। ” এই বলে উনি ঘাড় ঘুরিয়ে আদ্রিশ ভাইয়ার দিকে তাকিয়ে বললেন,
“কি ব্যাপার? তুই ওখানে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছিস কেনো? ওকে বল যে, আমি যা বলেছি তার সবটাই সত্যি। ইভেন, তোর বলা কথাগুলোও সত্য।”

আদ্রিশ ভাইয়া আমার আর অর্ণব ভাইয়ার পাশে এসে দাঁড়িয়ে পরলেন। হালকা হেসে বললেন,
“অবভিয়েসলি সব সত্যি।”

আমি মনে মনে এই ভেবে নিলাম যে, অর্ণব ভাইয়ার প্রপোজাল একসেপ্ট করবো আমি। এতেও যদি আদ্রিশ ভাইয়ার কোনো হেলদোল না হয় তাহলে আমি নিশ্চিত হবো যে, উনি এতোদিন আমার সাথে নাটক করছিলেন। ভাবনা মতোই কাজটা করলাম আমি। অর্ণব ভাইয়ার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললাম,
“আমি আমার জবাব আগামী দিন জানাবো। তবে নিশ্চিত থাকতে পারেন এই ভেবে যে, আমার উত্তর ‘হ্যাঁ’ হওয়ার সম্ভাবনা নব্বই পার্সেন্ট। ”

আমার কথা শোনামাত্রই অর্ণব ভাইয়ার চোখেমুখে খুশির ঝিলিক দেখা গেলো। তিনি উচ্ছ্বসিত হয়ে বললেন,
“আমি জানতাম তুমি আমার প্রপোজাল একসেপ্ট করবে।” এই বলে উনি আদ্রিশ ভাইয়ার দিকে তাকিয়ে বললেন,
“দেখ আদ্রিশ, তোর কথাই ঠিক হলো। ও আমার প্রপোজাল একসেপ্ট করলো। অবশ্য এখনো পুরোপুরি একসেপ্ট করেনি। কিন্তু আমার বিশ্বাস আগামীকাল পজিটিভ কোনো নিউজই শুনতে পাবো আমি।”
অর্ণব ভাইয়ার অবস্থা এখন এমন যে, মনে হচ্ছে, উনি যেনো হাতে আকাশের চাঁদ পেয়ে গিয়েছেন। আর এদিকে আমার অবস্থা করুন। আদ্রিশ ভাইয়ার নির্বাক হাসিমাখা মুখ দেখে আমার শেষ আশাটুকুও ভেঙে গেলো। ভেবেছিলাম এই হয়তো উনি বলবেন, ‘এসব মজা ছিলো। আমি তোমাকে ভালোবাসি মিশমিশ। আমার ভালোবাসায় কোনো নাটক ছিলো না।’কিন্তু না। এমনটা হলো না।

অর্ণব ভাইয়া এবার আদ্রিশ ভাইয়াকে বললেন,
“মিম আমার প্রপোজাল একসেপ্ট করলে তোর কি করার কথা ছিলো?”

আদ্রিশ ভাইয়া বিস্তৃত হেসে বললেন,
“ওহ ভুলেই গিয়েছিলাম। ”
এই বলে উনি অর্ণব ভাইয়াকে জড়িয়ে ধরে বললেন,
“কংগ্রাচুলেশনস ব্রো।”

“থ্যাংকস। এবার মিমকেও কংগ্রাচুলেট কর।”

অর্ণব ভাইয়ার কথামতো আদ্রিশ ভাইয়া হাসিমুখে আমাকে বললেন,
“কংগ্রাচুলেশনস। ”
আমি এর প্রত্যুত্তরে কিছুই বললাম না। শুধু নির্বাক চাহনিতে আদ্রিশ ভাইয়ার দিকে চেয়ে রইলাম। উনার হাসি দেখে কেনো যেনো মনে হচ্ছে, এ হাসিটা কৃত্রিম। অনিচ্ছার এক হাসি। কষ্টের এক হাসি। তবে আমি জানি, এমনটা মোটেও না। উনার হাসি বিজয়ীর হাসি। আমার হৃদয় পুড়িয়ে দেওয়ার খুশির হাসি।

অর্ণব ভাইয়া এবার আমার দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে বললেন,
“আচ্ছা, কালকে দেখা হবে। একটু কাজ আছে সন্ধ্যার দিকে। তাই এখন বাজারে যেতে হবে। আদ্রিশ, তুই কি যাবি আমার সাথে?”

আদ্রিশ ভাইয়া আমার দিকে তাকিয়ে তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বললেন,
“না, তুই যা। একজনের সাথে খুব জরুরী কথা আছে আমার।”

“আচ্ছা, তোরা থাক তাহলে। আমি আসি।”
এই বলে অর্ণব ভাইয়া আমাকে হাত নাড়িয়ে বিদায় জানিয়ে চলে গেলেন।

উনি চলে যাওয়ার সাথে সাথে আমি আদ্রিশ ভাইয়ার দিকে তাকালাম। কিছু বলার প্রস্তুতি নিতেই আদ্রিশ ভাইয়া তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বললেন,
“বাহ…..ভালোই তো নাটক করতে পারো তুমি। জানতাম না যে এতো বড় একজন অভিনেত্রী আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে।”
এই বলে উনি আমার মুখের সামনের হাততালি দিলেন।
আদ্রিশ ভাইয়ার কথায় আমার প্রচণ্ড রাগ হলো। যে কথা আমার বলা উচিত ছিলো, সে কথা উনি বলছেন! আমি তেড়ে গিয়ে বললাম,
” এ কথা আমার বলা উচিত ছিলো। নাটক আমি না, আপনি করেছেন। এতোদিন আমার সাথে ভালোবাসার নাটক করেছেন আপনি। কি লাভ হলো এ নাটক করে? বলুন।”

আদ্রিশ ভাইয়া ঠোঁট বাকিয়ে বললেন,
“আরে বাহ….অর্ণবের প্রপোজাল একসেপ্ট করলে তুমি। আর আমাকে বলছো, আমি নাটক করছি! কি ভেবে এই কথা বললে তুমি?”

” অর্ণব ভাইয়াকে প্রপোজের আইডিয়া কে দিলো? আপনি। আমি সেটা একসেপ্ট করবো,এটার গ্যারান্টি কে দিলো? আপনি। তারপরেও এসব কথা কোন মুখে বলছেন আপনি?”

“আমি কি অর্ণবকে এই আইডিয়া দিয়েছিলাম এজন্য যে, তুমি যাতে ওর প্রপোজাল একসেপ্ট করো?”

“বাহ, আইডিয়া দিবেন উনাকে। আবার বলবেন প্রপোজাল একসেপ্ট না করতে! চাইছেন টা কি আপনি? এতো নাটক করতে পারেন কি করে? এতোদিন মাহার সাথে রিলেশন থাকার পরও আপনি আমার সাথে ড্রামা করেছেন। কেনো? কারোর ভাবনার সাথে খেলতে…….”

আমাকে মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে আদ্রিশ ভাইয়া ভ্রুজোড়া কুঁচকে বিস্ময় নিয়ে বললেন,
“ওয়েট ওয়েট। মাহার সাথে আমার রিলেশন ছিলো, এটা কে বললো তোমাকে? কোন পাগলে এসব বলেছে?”

আমি ঠোঁট উল্টিয়ে বললাম,
” সে আপনাকে বেবি বেবি বলে পাগল হয়ে যায়। আর আপনি বলছেন, রিলেশনের কথা কে বললো আমাকে! এসব বলতে হয়না। কথাবার্তার ধরন শুনেই বুঝা যায়।”

“দু লাইন বেশি বুঝা কি তোমার কাজ? আমি কি কখনও বলেছি, আমি মাহাকে ভালোবাসি? বা সে আমার গার্লফ্রেন্ড? ”

“মিস্টার আদ্রিশ, এসব মুখে না বললেও কাজকর্মে বুঝা যায়। আপনাদের দুজনের কথাবার্তা, মাহাকে আপনার গান শোনানো, এসব কি প্রুফ করেনা, আপনারা একে অপরকে ভালোবাসেন? আর আপনি কখনও আমাকে বলেছেন, আপনি আমাকে ভালোবাসেন? বলেননি। সো আমার এখন যা ইচ্ছা, আমি তা করবো। আমি এখনই রুমে গিয়ে আব্বু আম্মুকে ফোন করে এখানে আসতে বলবো। অর্ণব ভাইয়া আর আমার বিয়ে ঠিক করার জন্য। ”
এই বলেই আমি বাড়িতে যাওয়ার পথে পা বাড়ালাম। প্রচণ্ড রাগ হচ্ছে আমার। রাগের মাথায় ঠিক কি কি বলেছি তা জানি না। মুখে যা যা এসেছে তা বলে ফেলেছি। এসবের পরিণতি কি হবে তা জানি না আমি। জানতেও চাইনা।

হঠাৎ আমার পিছন থেকে চেয়ার আছড়ে পড়ার শব্দ শুনলাম। চমকে পিছনে তাকাতেই দেখলাম, আদ্রিশ ভাইয়া প্রচণ্ড জোরে আরেকটা চেয়ার দূরে ছুঁড়ে মারলেন। উনার পুরো শরীর কাঁপছে। রাগে চোখমুখ লাল হয়ে এসেছে। উনি আমার দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বললেন,
“আমাকে রাগিয়ে ঠিক করোনি মিশমিশ। এবার এর ফল ভোগ করবে। অর্ণবের সাথে তোমার বিয়ে কি করে হয় তাই দেখবো আমি।”
এই বলে উনি বড় বড় পা ফেলে আমাকে পাশ কাটিয়ে বাড়ির ভেতর চলে গেলেন। আমি সেখানেই থম মেরে দাঁড়িয়ে আছি। আদ্রিশ ভাইয়ার এ রাগ দেখার দূর্ভাগ্য দ্বিতীয়বার হলো আমার। তবে প্রথম দিনকার রাগ থেকে এ রাগ আলাদা। কারনও আলাদা।
আদ্রিশ ভাইয়া বাড়িতে গিয়েই উচ্চস্বরে বড় মামিকে ডাকলেন। উনার এমন কণ্ঠস্বর শুনে আমি দ্রুত হেঁটে বাড়ির ভিতর চলে এলাম। ভয়ে বুক দুরুদুরু করছে। উনি ডাইনিং এ দাঁড়িয়ে বড় মামিকে ডেকে চলছেন। উনার এ ডাকার ধরন শুনে একে একে বড় মাম-মামি, ছোট মামা-মামি,নদী, মুহিব ভাইয়া,আমার নানু, মেজ নানু এবং নদীর মামি, পলাশ ভাইয়া, রাইসা ভাবী রুম থেকে বেড়িয়ে এলেন। সবার চোখেমুখেই প্রশ্ন খেলা করছে। আমি আদ্রিশ ভাইয়ার থেকে বেশ খানিকটা দূরে ড্রইংরুমের দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছি।
বড় মামি আমার দিকে একঝলক জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে আদ্রিশ ভাইয়ার কাছে এগিয়ে গিয়ে বললেন,
“কি ব্যাপার আদ্রিশ? এভাবে ডাকছিস কেনো?”

আদ্রিশ ভাইয়া রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বললেন,
“কিছু জরুরি কথা বলবো তোমাকে।”

“হুম বল। কি বলবি। ”

আদ্রিশ ভাইয়া আমার দিকে রাগান্বিত দৃষ্টিতে চেয়ে থেকে বললেন,
“আম্মু, আমি মিমকে বিয়ে করবো। কালকেই ওর আব্বু আম্মুকে আমাদের বাড়িতে আসতে বলো। প্রয়োজন হলে, কালকেই বিয়ের আয়োজন করো।”

®সারা মেহেক

#চলবে

#ভালোবাসার_রঙিন_প্রজাপতি
#লেখনীতে:সারা মেহেক

৩৬

আদ্রিশ ভাইয়ার এ কথায় সবার মুখ বিস্ময়ে হা হয়ে এলো যেনো। আমি নিজের কানকে বিশ্বাস করাতে পারছি না। কথা নেই বার্তা নেই এমন হুটহাট বিয়ের ঘোষনা দেওয়ার মানে কি! আদ্রিশ ভাইয়ার কথায় উনার দিকে কেউ সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকিয়েছে নাকি জানা নেই। তবে বাড়ির প্রতিটা সদস্য আমার দিকে সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকালো। আমার নানু তো হতবাক চাহনিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। নিশ্চয়ই অনেক কিছু ভেবে নিয়েছে সে।

বড় মামি আমার দিকে একনজর চেয়ে আবারও আদ্রিশ ভাইয়ার দিকে তাকালো। উনার এ কথার কারণ উদ্ধার করতে না পেরে বড় মামি জিজ্ঞাস করলেন,
“আদ্রিশ? কোনো সমস্যা হয়েছে? এভাবে হুটহাট এ ধরণের কথা…….”

বড় মামিকে মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে আদ্রিশ ভাইয়া বললেন,
“কোনো সমস্যা হয়নি। সব ঠিকঠাক। শুধু আমি বিয়েটা করতে চাইছি। এটাই বললাম। আমার জানামতে তোমাদের কারোর কোনো সমস্যা থাকার কথা না। কারন তোমরা আমাকে আগেই বলে দিয়েছো, আমি যাকে পছন্দ করবো তার সাথেই আমার বিয়ের ব্যবস্থা করবে তোমরা।”

আদ্রিশ ভাইয়ার কথায় বড় মামা হতভম্ব হয়ে বললেন,
“হ্যাঁ, মানলাম এ কথা বলেছি। তাই বলে এভাবে হুটহাট বিয়ের কথা…… বিয়ে কোনো ছেলেখেলা না আদ্রিশ। এভাবে হুট করে বললি আর বিয়ে হয়ে গেলো তা না। আর গতকালই তো নদীর বিয়ে শেষ হলো। আবার এখন তুই বলছিস বিয়ের কথা……..”

“আব্বু, আমি জানি, বিয়ে কোনো ছেলে খেলা না। আর আমি তো ওকে ভাগিয়ে নিয়ে বিয়ে করবো না বা ওর মতের বিরুদ্ধে বিয়ে করবো না। সবকিছুতেই ওর মত আছে। আর নেক্সট শুক্রবাররে পরে আমাকে ঢাকা ব্যাক করতে হবে। সো আমি, একেবারে বউসহ ঢাকায় ব্যাক করবো।”

আদ্রিশ ভাইয়ার কথা শেষ হতেই ছোট মামা উনার দিকে এগিয়ে এসে বললেন,
” দেখ আদ্রিশ, আমার মনে হয় এখন তোর বিয়ে করার সঠিক সময় না। আগে হসপিটালে জয়েন করে এক বছর অন্তত চাকরি করে তারপর বিয়ের ব্যাপারে ভাবা উচিত।”

ছোট মামার কথাতেও আদ্রিশ ভাইয়ার কোনো যায়-আসেনি। উনি তো নাছোরবান্দা। ফোঁস করে এক নিঃশ্বাস ফেলে উনি আবারও বললেন,
“চাচু, আমি সব ভেবেচিন্তেই বলেছি। আর আমি ওকে পছন্দ করি। আমার মনে হয়, যত দ্রুত বিয়ে হবে ততই বেটার। আপাতত আমি আর কিছু বলতে চাইছি না। আব্বু আম্মু, তোমরা ওর ফ্যামিলিকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমাদের বাড়িতে আসতে বলো। ”
এই বলে আদ্রিশ ভাইয়া বড় বড় পা ফেলে নিজের রুমে চলে গেলেন। উনি রুমে চলে যেতেই নানু আমার দিকে এগিয়ে এসে কিছুটা রাগান্বিত স্বরে বললেন,
“এসব কি হচ্ছে মিম? ও এভাবে হুট করে বিয়ের কথা বললো কেনো? তোমাদের মাঝে কিছু হয়েছে? মনে হলো ও রেগে আছে।”

নানুর কথার জবাবে আমি ঠিক কি কি বলবো তা বুঝতে পারলাম না। আদ্রিশ ভাইয়া তো নিজের সিদ্ধান্ত জানিয়ে রুমে চলে গেলেন। আর এদিকে সব প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য আমাকে সবার মাঝে ছেড়ে গেলেন। প্রচণ্ড রাগ হচ্ছে উনার উপর। এতো বড় একটা সিদ্ধান্ত আমাকে না জানিয়ে এভাবে হুট করে সবার সামনে বললেন কেনো উনি? আগেপিছে কিছুই ভাবেননি উনি। কিছুই না।

নানু আমাকে আবারও সেই একই প্রশ্ন করলেন। এর মাঝে বড় মামি এসে বললেন,
“মা, কোনো সমস্যা হয়েছে? আদ্রিশ এভাবে হুট করে সব……. ”

আমি সব শুনেও নিশ্চুপ ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে রইলাম। আমার যে এতে কিছুই বলার নেই।
বড় মামি এবার বললেন,
“আচ্ছা,ড্রইংরুমে চলো। সবাই একসাথে বসে কথা বলি।”
এই বলে বড় মামি আমাকে নিয়ে ড্রইং রুমে চলে এলেন। আমাদের পিছু পিছু বাড়ির বাকি সদস্যরাও চলে এলো।

ড্রইং রুমে সবাই বসে পরার পর বড় মামা হালকা কাশি গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,
“আদ্রিশ এতো বড় একটা সিদ্ধান্ত এভাবে নিয়ে নিবে তা কখনোই আন্দাজ করিনি আমি। হ্যাঁ, আমরা ওকে এই ছুট দিয়েছিলাম যে, ওর যেই মেয়ে পছন্দ হবে তার সাথেই আমরা ওর বিয়ে দিবো। তবে এভাবে হুটহাট নয়।”
এই বলে বড় মামা এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
“যাই হোক, ও বিয়ের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে ভালো কথা। তবে এর আগেপিছে আমাদের ভাবতে হবে। সবার মতামত নিতে হবে। আম্মা আর খালা, তোমরা কি বলো?”

মেজ নানু এবার চিন্তিত কণ্ঠে বললেন,
“মিমকে আমরা সবাই পছন্দ করি। ঠিক তো? ওকে এ বাড়ির বউ বানাতে আমার কোনো আপত্তি নেই। যেহেতু আদ্রিশ ওকে পছন্দ করে, সেহেতু এ সম্পর্ককে হালাল বানানোর দায়িত্ব আমাদের। বিয়ের মাধ্যমে ওদের পছন্দকে হালাল রূপদান করা একটা সুন্দর সিদ্ধান্ত। আমার মনে হয় এটা। বাকিটা তোরা দেখ।”

মেজ নানুর কথা শেষ হতেই ছোট মামা বললেন,
” আমরা সবাই আদ্রিশের কথায় তো বুঝে গেলাম যে সে মিমকে পছন্দ করে। কিন্তু আমরা মিমের সিদ্ধান্ত একবারো জানতে চায়নি। মেয়েটার মনে কি আছে। ও কি চাইছে তা অন্তত আমাদের একবার শোনা উচিত। ”
ছোট মামার কথা শেষ হতেই রুমে উপস্থিত সকলের দৃষ্টি আমার উপর এসে স্থির হলো। সাথে সাথেই এক জড়তা এসে ঘিরে ধরলো আমাকে। ফলস্বরূপ কিছুুই বলতে পারলাম না। আমার নিশ্চুপ ভঙ্গি দেখে পলাশ ভাইয়া জিজ্ঞাস করলেন,
“কি ব্যাপার মিম? বলো কিছু। আদ্রিশকে পছন্দ করো তো? আর বিয়েতে তোমার মত কি?”

আমি এরপরেও কিছু বলতে পারলাম না। কেমন এক ভয় আর সংকোচ বোধ কাজ করছে আমার মধ্যে। রাইসা ভাবী হয়তো আমার এ অবস্থা বুঝতে পারলেন। এজন্য সে আমার কাছে এগিয়ে এসে ফিসফিস করে জিজ্ঞাস করলো,
“কিছু বলো মিম। এসব ব্যাপারে এমন চুপচাপ থাকতে হয়না।”

আমি মিনমিন করে বললাম,
“ভাবী, এতোজন মানুুষের সামনে এসব ব্যাপারে বলতে কেমন যেনো লাগছে। তারপর আবার আব্বু আম্মু কেউই এখানে উপস্থিত নেই। আর তুমি তো আমাদের বিষয়টা জানোই। ”

এই বলেই আমি সকলের উদ্দেশ্যে খানিকটা ইতস্তত কণ্ঠে বললাম,
“আমি একটু বাইরে যেতে চাই।”

এরপর কে কি বললো তা আর কানে নেয়নি আমি। দ্রুত পায়ে ড্রইংরুম থেকে বেড়িয়ে ডাইনিং এ এসে দাঁড়িয়ে পরলাম আমি। সেখানে দাঁড়াতেই দৃষ্টি চলে গেলো আদ্রিশ ভাইয়ার রুমের দিকে। আজ সবটা উনার জন্য হয়েছে। আমি সবার সামনে ওমন পরিস্থিতিতে পরেছি শুধুমাত্র উনার জন্য। এর জবাবদিহি তো উনাকেই করতেই হবে।

আমি চোখমুখ কুঁচকে আদ্রিশ ভাইয়ার রুমের দিকে তাকালাম। লম্বা একটা শ্বাস টেনে নিয়ে বড় বড় পা ফেলে উনার রুমের দরজায় ধাক্কা দিলাম। ভেবেছিলাম, উনার রুমের দরজা বন্ধ। তবে না, উনার রুমের দরজা শুধু ভিজিয়ে রাখা ছিলো।

আমি রুমে ঢুকেই আদ্রিশ ভাইয়াকে খুঁজতে লাগলাম। উনি রুমে নেই। ওয়াশরুমে হয়তো। কারন ওয়াশরুম থেকে পানির আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি। এখন আমাকে অপেক্ষা করতে হবে। অনিচ্ছা সত্ত্বেও প্রচণ্ড রাগ নিয়ে কোমড়ে দু হাত রেখে উনার জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম।

কয়েক মিনিটের মধ্যেই আমার অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে আদ্রিশ ভাইয়া ওয়াশরুম থেকে বেড়িয়ে এলেন। গলায় টাওয়াল ঝুলিয়ে রেখেই আমার দিকে এগিয়ে আসতে লাগলেন উনি। কিন্তু আমিও কম না। আমি তেড়ে উনার দিকে এগিয়ে যেতে লাগলাম। ফলস্বরূপ উনিও পিছিয়ে যেতে লাগলেন। আমি উনার দিকে এগিয়ে যেতে যেতে ধমকের সুরে বললাম,
“আপনার সমস্যা কি হুম? এতো বড় একটা ডিসিশন আমাকে না জানিয়ে নিলেন কোন সাহসে? বলুন?”

আদ্রিশ ভাইয়া আমার দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বললেন,
“অর্ণবের প্রপোজাল একসেপ্ট করার আগে তোমার সবকিছু ভেবে নেওয়া উচিত ছিলো। আমার সাথে চালাকি করবে, এটা তো হতে দেওয়া যায়না। এজন্যই বিয়ের ডিসিশনটা একাই নিয়ে নিলাম।”

আমি দাঁতে দাঁত চেপে আদ্রিশ ভাইয়ার দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বললাম,
“আপনি নিজেই অর্ণব ভাইয়াকে বলেছিলেন, আমাকে প্রপোজ করতে। তারপর আমি যে রাজি হবো,সেটাও বলে দিয়েছিলেন। তাহলে আমি রাজি হলে সমস্যা কি?”

আদ্রিশ ভাইয়ার পিঠ সামনের দেয়ালে ঠেকে গিয়েছে। আর আমি উনার সামনে দাঁড়িয়ে আছি।
উনি আমার দিকে বিরক্তি নিয়ে তাকিয়ে বললেন,
“হ্যাঁ, আমিই ওকে বলেছি, তোমাকে প্রপোজ করতে। বাট আমি এটা ভাবিনি যে, তুমি ওর প্রপোজাল একসেপ্ট করবে। আমি তো ভেবেছিলাম, তুমি ওর মুখের উপর রিজেক্ট করে দিবে।”

আমি এবার বেশ রেগে গেলাম। বারবার উনি একই কথা বলছেন কেনো? আমি শক্ত কণ্ঠে বললাম,
“আপনি বারবার একই কথা বলছেন ভালো কথা। একটু ডিটেইলস এ তা বললে সমস্যা কি? অর্ণব ভাইয়াকে আমাকে প্রপোজও করতে বলবেন, আবার আমাকে রিজেক্টও করতে বলবেন। চাই কি আপনার?”

আদ্রিশ ভাইয়া আমার দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইলেন। নিজের ঘন ভ্রুজুগল নাচিয়ে দাঁত বের করে হেসে বললেন,
“আমার আফটার শাওয়ার লুক কি তোমার এতোই ভালো লেগেছে যে, আমাকে এভাবে দেয়ালে আটকে রেখেছো?”

আদ্রিশ ভাইয়ার এহেন প্রশ্নে আমি থতমত খেয়ে গেলাম। উনার দিকে ভ্রুকুটি করে তাকিয়ে দেখলাম, উনি উদাম শরীর নিয়ে থ্রি কোয়ার্টার একটা প্যান্ট পরে আছেন। আর গলায় ঝুলিয়ে রেখেছেন একটা টাওয়াল। উনার এ অবস্থা দেখে আমি তৎক্ষনাৎ পিছিয়ে এলাম। দৃষ্টি অন্যদিকে ফিরিয়ে বললাম,
“এমনটা মোটেও না। আপনি দ্রুত শার্ট বা গেঞ্জি যা পরার পরে আসুন। আজকে সব কথা শুনে তারপরই যাবো এখান থেকে।”

আদ্রিশ ভাইয়া বললেন,
“যথা আজ্ঞা মিস মিশমিশ। আজকে আমিও সব কথা বলেই তোমাকে ছাড়বো৷ এক মিনিট ওয়েট করো যাস্ট। আমি টাওয়ালটা রেখে গেঞ্জি পরে আসি।”

“হুম। জলদি করুন। ”

আদ্রিশ ভাইয়া আর কিছু না বলে সোজা আলমারির কাছে চলে গেলেন। ধূসর রঙের একটা টিশার্ট বের করে গায়ে জড়িয়ে নিলেন। উনার কথা আর কাজে মনে হচ্ছে, উনি এখন আর রেগে নেই৷ স্বাভাবিক হয়ে গিয়েছেন।

টিশার্ট পরে আদ্রিশ ভাইয়া আমার দিকে এগিয়ে এসে বললেন,
“তো আমরা কোথায় ছিলাম যেনো? ওহ হ্যাঁ, অর্ণবের বিষয়ে ছিলাম।
তো শুনো……. এটা গতকাল রাতের কথা। তোমার সাথে দেখা করার পরপরই অর্ণব আমাকে ফোন করে দেখা করতে বলে। আমি অতো শত না ভেবে ওর সাথে দেখা করতে চলে যাই৷ ওর সাথে দেখা হওয়ার পরপরই ও বললো যে, ও তোমাকে খুব লাইক করে৷ উহু, লাইকের চেয়েও বেশি। ও তোমাকে ভালোবাসে। বিশ্বাস করো, অর্ণবের কথা শুনে আমার তখন এতো রাগ হয়েছিলো যে মন চাইলো, ওকে ইচ্ছামতো মারি৷ দুনিয়ায় কি মেয়ের কমতি পরেছিলো যে, আমার পছন্দের মেয়েকেই ওর পছন্দ করতে হবে! এর আগে ও স্কুল লাইফে থাকতেও এমনটা করেছিলো। ক্লাস নাইনে থাকতে আমি একটা মেয়েকে একটু পছন্দ করতাম। পরে গিয়ে শুনি, অর্ণবও ঐ মেয়েকে পছন্দ করে। আচ্ছা, ভালো কথা। বন্ধুর পছন্দের কাছে আমি আর কিছু বললাম না। আসলে তখন তেমন একটা গায়ে লাগেনি বিষয়টা। কিশোর বয়সে ছিলাম তখন। অনুভূতিগুলো অতোটাও তীব্র ছিলো না।
এরপর ঐ পছন্দের বিষয়টা ওখানেই শেষ হয়ে যায়। অর্ণব ঐ মেয়েকে আগ বাড়িয়ে ওর পছন্দের কথা বলেনি৷ আমিও বলিনি।
কিন্তু গতকাল যখন শুনলাম, ও তোমাকে ভালোবাসে তখন প্রচণ্ড রাগ উঠেছিলো। তারপরেও রাগ দমিয়ে রেখে ওকে বলেছিলাম, তোমাকে প্রপোজ করতে। কারন আমি জানি, তোমার কাছে রিজেকশন পেয়ে জীবনেও ও তোমার ধারের কাছেও আসবে না৷ তোমার জন্য ওর মনে বিন্দুমাত্র ফিলিংস ও অবশিষ্ট থাকবে না। আমি যদি ওকে বলতাম, আমি তোমাকে পছন্দ করি তাহলে ওর মনে তেমন প্রভাব ফেলতো না। কিন্তু তোমার কাছে সোজা রিজেকশন পেলে ভুলেও তোমার ধারের কাছে আসতো না ও। কলেজ লাইফে থাকতে একটা মেয়েকে অর্ণব প্রপোজ করেছিলো। সেই মেয়েটা ওর মুখের উপর একদম রিজেক্ট করে দেয়৷ ব্যস,এরপর থেকে ঐ মেয়ের নাম ভুলেও মুখে আনতো না ও। ঐ মেয়েটার প্রতি ওর সব ফিলিংস মরে যায়। আমি তোমার বেলাতেও এমনটা চাইছিলাম। আমি কখনোই চাইনা যে, আমার মনের মানুষটাকে নিয়ে অন্য কোনো ছেলের মনে এমন ফিলিংস থাকুক। বাট তুমি, একটু বেশিই বুঝো। আগ বাড়িয়ে ওর প্রপোজাল একসেপ্ট করে নিলে। কেনো এমনটা করলে?”

আদ্রিশ ভাইয়ার সব কথা শুনে আমি নিজের উপর এবার রাগ হলো। কেনো যে অর্ণব ভাইয়ার প্রপোজাল একসেপ্ট করতে গিয়েছিলাম! অবশ্য তখন আদ্রিশ ভাইয়ার হাসিমুখ দেখে আর মাহার কথা চিন্তা করে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম।
আমি এবার মিনমিনে গলায় নিজের অপরাধ স্বীকার করে বললাম,
“আমি কি তখন এসব বিষয়ে জানতাম নাকি? আর আপনার সামনে তখন অর্ণব ভাইয়া আমাকে প্রপোজ করেছিলো, এটা ভেবেই রাগ উঠেছিলো আমার। তারপর আবার আপনার হাসিমুখ। আর মাহার বিষয়ে তখনও আপনি ক্লিয়ারলি কিছু বলেননি আমাকে। এসব কিছু দেখে ভেবেছিলাম, আপনি আমার সাথে নাটক করছিলেন। ”
এই বলেই আমি মাথা নিচু করে নিলাম।
আদ্রিশ ভাইয়া তখন আমার কথা শুনে হো হো করে হেসে বললেন,
“সিরিয়াসলি মিশমিশ! আমি নাটক করছিলাম তোমার সাথে। হাসি পেলো খুব।
ওহ হ্যাঁ, তখন আমি হাসছিলাম এই ভেবে যে, তুমি ওকে রিজেক্ট করবে। আর ওর মনে তোমার জন্য তৈরী হওয়া সব ফিলিংস শেষ হয়ে যাবে। নিজেকে উইনার মনে হচ্ছিলো তখন। আর মাহা’র বিষয়টা এখনই ক্লিয়ার করে বলে দেই। মাহা আমার গার্লফ্রেন্ড না। সি ইজ মাই ফ্রেন্ড। ”

আদ্রিশ ভাইয়ার কথা আমি উড়িয়ে দেওয়ার ভঙ্গিতে বললাম,
“হুহ, বললেই হলো। সে আপনার ফ্রেন্ড হয়েও আপনাকে বেবি বলে ডাকে! এসব ফ্রেন্ডশিপে হয়না মিস্টার।”

“মানে…….আমি ওকে আমার ফ্রেন্ড ভাবি। বাট ও আমাকে ওর বয়ফ্রেন্ড ভাবে।”

উনার কথার আগামাথা বুঝতে না পেরে ভ্রু কুঁচকে বললাম,
“মানে কি এসবের? একজন ভাবে ফ্রেন্ড,আরেকজন ভাবে বয়ফ্রেন্ড। ফানি ব্যাপার স্যাপার।”

“মোটেও ফানি না মিশমিশ। আচ্ছা, তোমাকে সব বলছি।
আজ থেকে কয়েক মাস আগে। এই ধরো, পাঁচ ছয়মাস আগের কথা। আমি তো তখন ইন্টার্নি করছিলাম। আমার সাথে মাহা’র বাবা অর্থাৎ বশির স্যারের খুব মিল ছিলো। উনি আমাকে নিজের ছেলের মত ভালোবাসতো। তো একদিন, উনি আমাকে এসে বললেন, মাহা’র সাথে রিলেশনে যেতে। প্রথমে আমি নিষেধ করে দিয়েছিলাম। কারন আমি মাহাকে চিনি না জানি না। কখনও দেখিনি। তো হুট করে রিলেশনে যাবো কিভাবে। কিন্তু স্যার নাছোরবান্দা। উনি বললেন, মাহা হসপিটালে একদিন আমাকে দেখেছিলো। সেই থেকে আমাকে খুব পছন্দ করতে শুরু করে। পরে স্যারকে বলে আমার সাথে ও রিলেশন করবে। বলা ভালো, স্যারের সাথে ওর বন্ধুর মত সম্পর্ক।
নিজের একমাত্র মেয়ের এ আবদার রাখতেই স্যার আমাকে ওর সাথে রিলেশন করতে বলে। আমি প্রথম প্রথম এই ভেবে অবাক হয়েছিলাম যে, নিজের মেয়েকে এভাবে রিলেশনের মধ্যে ফেলে দেওয়া বাবা হয়তো উনি একাই।
তো যাই হোক, স্যারের কথামত আমি মাহা’র সাথে রিলেশনে জড়িয়ে পরলাম। ভাবলাম, আমি হয়তো মাহাকে পছন্দ করতে শুরু করবো। সময় যেতে যেতে ওকে ভালোবাসতেও শুরু করবো। কিন্তু বিশ্বাস করো, ওর সাথে দেখা হওয়ার প্রথম দিন থেকেই মনে হয়েছিলো, সে আমার টাইপের না। মেয়েটা দেখতে সুন্দর। কিন্তু প্রচণ্ড অহংকারী আর শো অফ করা টাইপ। মাহা সব বিষয়ে শো অফ করতে পছন্দ করে। ও ওর ফ্রেন্ডদের সামনে আমাকে নিয়ে সে কি শো অফ করতো! আমার এতে প্রচণ্ড বিরক্তি লাগতো। এ নিয়ে পরে স্যারের সাথে কথা বলে আমি রিলেশন থেকে সরে আসতে চাইলাম। কিন্তু স্যার আমার কাছে রিকুয়েষ্ট করে বলল, ওর সাথে রিলেশন রাখতে। উনার বিশ্বাস সময় যেতে যেতে আমিও একসময় মাহাকে ভালোবেসে ফেলবো। কিন্তু সে সময় আর এলো না। আমি কখনও মাহাকে ভালোবাসতে পারেনি। ইভেন কোনোদিনও ওকে পছন্দ করিনি আমি। ওকে বন্ধুর চেয়ে বেশি কিছু মানতেই পারিনি কোনোদিনও।
মাহা ওর ফ্রেন্ডদের সামনে আমাকে নিজের বয়ফ্রেন্ড বলে পরিচয় করিয়ে দিলেও আমি কখনো আমার বন্ধুদের সামনে ওকে গার্লফ্রেন্ড বলে পরিচয় করিয়ে দেয়নি। কারন ও আমার গার্লফ্রেনড না।
আমি সবসময় অপেক্ষা করতাম এমন একটা সুযোগের, যেটাকে কাজে লাগিয়ে ওর সাথে এই শো অফের সম্পর্ক শেষ করে দিবো। অবশেষে সে সুযোগটা এখন এলো। তো….এই ছিলো কাহিনি।”

এই বলে আদ্রিশ ভাইয়া ফোঁস করে এক নিঃশ্বাস ফেললেন। মাহাকে নিয়ে এই বড়সড় একটা গল্প শুনে আমার মুখ হা হয়ে এলো।
আমি পিছনে থাকা চেয়ারে ধপ করে বসে বললাম,
” এটা তো অনেক বড়সড় একটা হিস্টোরি।”

আদ্রিশ ভাইয়া মাথা চুলকে এলোমেলোভাবে হেসে বললেন,
“ইয়াহ….ইটস এ লং হিস্টোরি স্টোরি।”

উনার কথায় আমি উনার দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইলাম। বিরক্তিমাথা কণ্ঠ নিয়ে বললাম,
“এই লং হিস্টোরি আমাকে আগে বলা যেতো না?”

আদ্রিশ ভাইয়া আমার কথার কোনো জবাব না দিয়ে গভীর চিন্তায় ডুব দেওয়ার ভান করে বললেন,
“আমার তো মনে পরছে না যে, তুমি আমাকে আগে এ বিষয়ে কোনো প্রশ্ন করেছো।”

আমি আমতাআমতা করে বললাম,
“তো…. এসব বিষয়ে আমি ওভাবে জিজ্ঞাস করতে যাবো কোন দুঃখে। আমারও তো লাজলজ্জা বলে একটা ব্যাপার আছে নাকি? কেনো? আপনি বলতে পারেননি আগে বাড়িয়ে? হুহ।”

“বাহ, মিস মিশমিশ, নিজে ভুল ধারনা নিয়ে বসে থাকবে আর কোনোরূপ প্রশ্ন না করে সেই ভুল ধারণা ক্লিয়ার করতে বলবে আমাকে!”

আমি নিজের ভুল স্বীকার করবো না সহজে। এজন্যই এদিক ওদিক তাকিয়ে এ টপিকটা ঘোরানোর চেষ্টা করলাম। কিছু সময়ের ভাবনায় তা পেয়েও গেলাম। আমি চট করে আদ্রিশ ভাইয়ার দিকে তাকিয়ে বললাম,
“আমি আপনাকে বিয়ে করতে পারবো না। ”

আমার এ কথায় আদ্রিশ ভাইয়ার মুখ বিস্ময়ে হা হয়ে এলো। উনি চোখজোড়া বড় বড় করে বিস্মিত কণ্ঠে বললেন,
“সব তো ক্লিয়ার করে বললামই। তাহলে সমস্যা কোথায়?”

আমি চেয়ারে বসেই পা নাচাতে নাচাতে কষ্ট পাওয়ার ভান করে বললাম,
“আপনি আমার একটুও খোঁজ নেননি এই তিন সপ্তাহ। কোনো রকম ফোনকলও করেননি। এখনই এমন। না জানি বিয়ের পর কি হয়। আমার তো মনে হয় তখন আপনি আমাকে ঠুস করে উঠিয়ে ঠাস করে ইগনোর লিস্টে পাঠিয়ে দিবেন।”
এই বলে আমি কাতর দৃষ্টিতে আদ্রিশ ভাইয়ার দিকে তাকালাম। যদিও আমার এ ভাবটা নাটকীয়।
আদ্রিশ ভাইয়া আমার দিকে কিছুক্ষণ ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইলেন। এরপর হুট করে হো হো করে হেসে বললেন,
“মিশমিশ, ইউ আর সো ফানি। সিরিয়াস একটা কথাকেও শেষে এসে ফানি বানিয়ে ফেললে। ”
এই বলে উনি হাসতে হাসতে আমার দু গালে টেনে বললেন,
“ইউ আর ড্যাম কিউট মিশমিশ।”

আদ্রিশ ভাইয়ার এ কাণ্ড দেখে মনে হলো, যেনো আমি ছোট্ট একটা বাচ্চা। যার গাল উনি ইচ্ছামত টেনে দিচ্ছেন।
আমি এবার ঝট করে আমার গাল থেকে উনার হাত সরিয়ে বললাম,
” আপনি কিন্তু কথায় মোড় ঘুরিয়ে নিচ্ছেন। এটা মোটেও ঠিক না৷ সিরিয়াস হয়ে আমার প্রশ্নের জবাব দিন।”

আমার কথা শুনে আদ্রিশ ভাইয়া সিরিয়াস হওয়ার ভান করে বললেন,
“ওকে ম্যাডাম। আপনার কি প্রশ্নের জবাব দিতে হবে বলুন।”

“এই যে, আপনি গত তিন সপ্তাহ আমার খোঁজ নেননি কেনো? আমার কথা কি একটুও মনে পরেনি?”

আদ্রিশ ভাইয়া ছোট্ট একটা নিঃশ্বাস ফেলে বললেন,
“মনে পরেনি মানে! তোমার কথা মনে পরে পরে আমি কাতর হয়েছিলাম। বারবার তোমার কথা মনে পরতো। এজন্যই তো আমার ফোনে তোলা তোমার ছবিগুলো দেখে দিন কাটাতাম৷ তোমার সাথে যোগাযোগের যে এক মাধ্যম ছিলো সেও আমার সাথে কথা বলতো না৷ ওর বিয়ে ঠিক হওয়ার পর প্রথম কয়দিন তো সে কারোর সাথেই কথা বলতো না। পরে যখন সব ঠিকঠাক হয়ে গেলো তখন আমি চলে আসলাম ঢাকায়। হসপিটালে জয়েন এর জন্য নানা কাগজপত্র জমা দেওয়ার কাজ ছিলো। খুব ব্যস্ত ছিলাম তখন। নদীর সাথে কথা বলে তোমার নাম্বার জোগাড় করার সময় সুযোগ ছিলো না তখন। এরপর যখন বাড়িতে আসলাম, তখন নদীর বিয়ের ব্যস্ততা চলছিলো৷ সব মিলিয়ে ভাবলাম এতোদিন যখন অপেক্ষা করেছি তখন আর কয়েকটা দিন অপেক্ষা করলে ক্ষতি কি! বরং এতো তিক্ত অপেক্ষার পর মিষ্টি ফল হিসেবে তোমাকে দেখতে পাবো আমি। মনের তৃষ্ণা মিটিয়ে দেখবো তোমাকে। এজন্যই লাস্ট কয়দিন সুযোগ থাকার পরও তোমার সাথে যোগাযোগ করিনি। অবশ্য আমি নিজেকে পরীক্ষাও করছিলাম।”

আদ্রিশ ভাইয়ার সম্পূর্ণ কথা বুঝালেও শেষ কথাটা আর বুঝতে পারলাম না। এজন্য উনাকে জিজ্ঞাস করলাম,
“নিজেকে পরীক্ষা করছিলেন মানে?”

“মানে নিজের ভালোবাসাকে পরীক্ষা করছিলাম। পরীক্ষা করছিলাম আমার অনুভূতিগুলোকে। দেখতে চাচ্ছিলাম আমার অনুভূতি কি আসল? দেখতে চাচ্ছিলাম তুমি আমার ক্ষণিকের মোহ নয় তো……”

এই বলে আদ্রিশ ভাইয়া আমার দিকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। আমার এখন লজ্জায় মুখ লুকানোর জোগাড়।
আমি তারপরেও সাহস করে উনাকে জিজ্ঞাস করলাম,
“আচ্ছা? তো আপনার পরীক্ষার ফলাফল কি হলো?”

“জানতে চাও?”

“হুম জানতে চাই।”

আদ্রিশ ভাইয়া আমার দিকে সেভাবেই তাকিয়ে রইলেন। এরপর হুট করে আমার দিকে এগিয়ে এসে চেয়ারে হাত রাখলেন। আমার উপর খানিক ঝুঁকে পরে ঘোরলাগা কণ্ঠে বললেন,
“তুমি আমার ক্ষণিকের মোহ নও, তুমি আমার সারাজীবনের মায়া। যা কখনোই কাটিয়ে উঠা সম্ভব নয়।

তুমি আমার ক্ষণিকের ভালোলাগা নও, তুমি আমার সারাজীবনের ভালোবাসা। যাকে ছেড়ে কখনোই থাকা সম্ভব নয়।”

®সারা মেহেক

#চলবে