#ভালোবাসার_রঙিন_প্রজাপতি
#লেখনীতে:সারা মেহেক
৩৭
আদ্রিশ ভাইয়ার এমন ছন্দময় বচন শুনে আমার সর্বাঙ্গ জুড়ে এক ভালোলাগার স্রোত বয়ে গেলো। উনার চোখ বরাবর তাকানোর সাহসটা হারিয়ে ফেলেছি আমি। আমার অবনত চাহনি দেখে আদ্রিশ ভাইয়া ধীর সুরে বললেন,
” এখনই এতো লজ্জা পাচ্ছো! বিয়ের পর কি হবে শুনি?”
উনার কথার জবাব দেওয়ার মত পরিস্থিতিতে আমি নেই। শুধু মাথা নিচু করে রাখা ছাড়া আর কিছুই করতে পারছি না আমি। উনি খানিকক্ষণ থেমে আবারও বললেন,
” ইশ….এতো লাজুক আমার মিশমিশ! সামান্য এক ভালোবাসার কথা শুনেই তুমি এতো লজ্জা পাচ্ছো কেনো? তোমার নাম মাধবীলতা না দিয়ে লাজুকলতা দেওয়া উচিত ছিলো। একদম সেরকম তুমি।”
এই বলে উনি আস্তে হেসে দিলেন। এদিকে আমার অবস্থা যায় যায়। সেই কখন থেকে লজ্জায় হৃদপিণ্ডটা ধুকপুক আওয়াজ তুলে যাচ্ছে! এসবের খেয়াল আদৌ আছে উনার? উনি তো আমাকে লজ্জায় ফেলে দিতে ব্যস্ত।
হঠাৎ কেউ দরজা নক করে বলল,
” মেই আই কাম ইন? ”
কণ্ঠের মালিককে চিনে ফেলতে অসুবিধা হলো না আমার। দরজা হালকা ভিজিয়ে দেওয়া ছিলো বলে নদী ওভাবে নক করে বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলো। নদীর কণ্ঠ শুনতে পেয়ে আদ্রিশ ভাইয়া অপ্রস্তুত হয়ে পরলেন। দ্রুত আমার কাছ থেকে দূরে গিয়ে দাঁড়িয়ে পরলেন। আমিও তৎক্ষনাৎ চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালাম।
নদী আবারও দরজায় নক করতেই আদ্রিশ ভাইয়া স্বাভাবিক হয়ে বললেন,
” ভেতরে আয়।”
অনুমতি পেয়ে সাথে সাথে রুমে প্রবেশ করলো নদী। তার চোখেমুখে দুষ্টু হাসি খেলা করছে। সে আমার দিকে এগিয়ে এসে বলল,
” বাহ বাহ,,বিয়ের আগেই ইলু ইলু চলছে!”
নদীর কথায় আমি জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললাম,
” মানে?”
নদী দাঁত কেলিয়ে হাসি দিয়ে বলল,
” আরে ঐ যে ওসব..বুঝছো তো আপু?” এই বলেই সে চোখ টিপে দিলো।
নদীর কথার তাৎপর্য বুঝতে পেরে বিস্ময়ে আমার মুখ হা হয়ে এলো। চোখজোড়া বড় বড় করে মুখের উপর হাত দিয়ে বললাম,
” ছিঃ ছিঃ নাউজুবিল্লাহ। কিসব বলছো তুমি?”
নদী এবার শব্দ করে হেসে উঠলো। সে আরো কিছু বলতে যাবে, কিন্তু তার আগেই আদ্রিশ ভাইয়া এসে নদীর মাথায় গাট্টা মেরে বললেন,
” কত বড় সাহস! নিজের ভাবীকে এসব বলিস কোন মুখে? বেহায়া মেয়ে।”
আদ্রিশ ভাইয়ার কথায় নদীর কোনো হেলদোল হলো না। আমি প্রথমে ভেবেছিলাম সে রেগে যাবে। তবে তা নয়। সে আবারও টিপ্পনী কাটতে ব্যস্ত হয়ে পরলো। আদ্রিশ ভাইয়ার দিকে তাকিয়ে ভ্রু নাচিয়ে বলল,
” ওহহো, এখনই বউয়ের পক্ষ নেওয়া শুরু হয়ে গিয়েছে। হায়ে! বিয়ের পর তো চোখে হারাবে মিম আপুকে। ওপস সরি, মিম আপু নয়৷ মিম ভাবী। ”
আদ্রিশ ভাইয়া এবার মেকি রাগ দেখিয়ে বললেন,
” দু’গালে দু চড় লাগালে ঠিক হবি তুই তাইনা? আগে বল, ড্রইংরুমে কি কথাবার্তা হলো? নাউ আই এম সিরিয়াস।”
আদ্রিশ ভাইয়া চোখেমুখে গাম্ভীর্যের ভাব ফুটিয়ে তুললেন। নদী তাতে স্বাভাবিক হয়ে বলল,
” এতক্ষণে হয়তো মিম আপুর ফ্যামিলিতে ফোন দেওয়া হয়ে গিয়েছে। এ বাড়ির সবাই বিয়েতে রাজি৷ শুধু মিম আপুর ফ্যামিলিকে জানানো বাদ। তারাও হয়তো না করবে না। আমি…….”
নদীর কথা শেষ হওয়ার আগেই মুহিব ভাইয়ার ডাক পরলো। ফলে আর কোনো কথাবার্তা না বাড়িয়ে রুম থেকে ছুটে বেড়িয়ে গেলো সে।
নদী যাওয়ার পর পরই আদ্রিশ ভাইয়া দু’হাত বুকে গুঁজে আমার দিকে তাকালেন। ভ্রু নাচিয়ে জিজ্ঞাস করলেন,
” তো মিস মিশমিশ? আপনি কি মিসেস আরসালান আহমেদ আদ্রিশ হতে প্রস্তুত?”
আদ্রিশ ভাইয়ার কথায় প্রত্যুত্তরে কিছুই বলার মত পেলাম না। উল্টো লজ্জায় উনাকে পাশ কাটিয়ে রুম থেকে চলে এলাম। পিছনে শুনতে পেলাম উনার উচ্ছ্বসিত কণ্ঠস্বর,
” ওহে আমার মিশমিশ, লজ্জায় তোমাকে মাধবীলতার সেই লাল ফুলগুলোর মতোই মোহময় দেখায়…”
.
সকালে ঘুম থেকে উঠেই তীব্র উৎকণ্ঠায় সময় কাটতে লাগলো আমার। আব্বু, আম্মু, আভা এখানে আসার জন্য রওনা দিয়েছে৷ তারা কি আদৌ রাজি কি না, তা আমি জানি না৷ শুধু বড়রা আমার ভয় কাটানোর জন্য আশ্বস্ত দিয়ে বলছে, আব্বু- আম্মু আসলেই সব জানতে পারবো।
যথাসময়ে আব্বু আম্মু এখানে এসে উপস্থিত হলো। তবে আমি ভয়ে তাদের সামনে যেতে পারলাম না। নদীর রুমে ঘামটি মেরে বসে রইলাম। এ রুমে কেউই নেই আপাতত। আব্বু আম্মু আসার পর পরই যে এই রুমে কেউ আসবে, সে আশা নিয়ে বসে থাকার পরও আশাহত হলাম আমি।
এদিকে তাদের আসার প্রায় এক ঘণ্টা পেরিয়ে গিয়েছে। অথচ আমাকে কিছু বলার বা ডেকে নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজনও বোধ করেনি কেউ। এদিকে যে আমার দুশ্চিন্তায় হাসফাস অবস্থা, তা বোধদয় কেউ জানে না। বারবার এই ভেবে ভয় করছে যে, আদ্রিশ ভাইয়ার এ প্রস্তাবে যদি আব্বু আম্মু রাজি না হয় তখন আমি কি করবো! অন্য কারোর সাথে বিয়ে করার চিন্তা মাথাতেই আনতে পারবো না।
আরো প্রায় আধঘণ্টা বাদে আভা আর নদী প্রায় দৌড়ে এ রুমে প্রবেশ করলো। তাদের চোখেমুখ বেয়ে পরছে খুশির জোয়ার। নদী আমাকে এসে জড়িয়ে ধরে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলল,
” তোমার আব্বু আম্মুও রাজি হয়ে গিয়েছে মিম আপু। নেক্সট ফ্রাইডে তোমাদের বিয়ে।”
আমার কানকে আমি বিশ্বাস করাতে পারছি না। আগামী শুক্রবারে আমারই পছন্দের মানুষের সাথে আমার বিয়ে, এটা ভাবতেই খুশিতে সারা শরীরে কাঁটা দিয়ে উঠলো। খুশি প্রকাশ করার মত কোনো কথা খুঁজে না পাওয়ায় বাকরুদ্ধ হয়ে বসে রইলাম।
নদী আমাকে ছেড়ে দিয়ে চিন্তিত কণ্ঠে জিজ্ঞাস করলো,
” কি ব্যাপার আপু? তুমি খুশি না? কথা বলছো না যে?”
নদীর কথায় আমি হালকা হেসে কাঁপা-কাঁপা কণ্ঠে বললাম,
” আসলে কি বলবো বুঝতে পারছি না। মানে….আমি কখনোও এসব চিন্তা করিনি। সবাই যে রাজি হয়ে যাবে,এটা কখনও মাথায় আসেনি। ভাবিনি যে উনার সাথে আমার বিয়ে হবে। ”
এই বলে আমি অন্যদিকে তাকিয়ে রইলাম। অদ্ভুত এক খুশি লাগছে। বুঝতে পারছি না, সে খুশির প্রকাশ কিভাবে করবো।
হঠাৎ করে আভা এসে আমাকে জড়িয়ে ধরলো। মূহুর্তেই সে হু হু শব্দে কেঁদে উঠলো। আভা’র হঠাৎ কান্নায় অবাক হয়ে গেলাম আমি। দ্রুত তার মাথায় হাত বুলিয়ে চিন্তিত কণ্ঠে জিজ্ঞাস করলাম,
” কি ব্যাপার? তুই এভাবে কাঁদছিস কেনো?”
আভা কান্নারত কণ্ঠেই বলল,
” আপু….আমি কখনোও ভাবিনি যে তোর এভাবে হুট করে বিয়ে হয়ে যাবে। আমি তোকে ছাড়া থাকবো কি করে? তোর থেকে দূরে থাকার কথা ভাবলেই বুক কেঁপে উঠে আমার। গত এক মাস আমি কিভাবে তোকে ছাড়া কাটিয়েছি তা আমিই জানি। সেখানে সারাজীবনের জন্য তোর থেকে দূরে সরে যেতে হবে৷ ”
এই বলেই সে আবারও কান্নায় ব্যস্ত হয়ে পরলো। আভা’র কান্না দেখে আর কথাগুলো শুনে আমারও হুট করে কান্না পেলো। হুট করে চলে আসা সেই কান্নার বাঁধকে আটকে না রেখে অঝোর ধারায় বইতে দিলাম৷ আভা হাউমাউ করে কাঁদলেও, আমি নিরবে কেঁদে চলছি। এদিকে নদী আমাদের সান্ত্বনা দিচ্ছে। তবে কোনো লাভ হচ্ছে না৷
আমাদের কান্নার আওয়াজে বাড়িতে উপস্থিত সকলেই নদীর রুমে এসে ভীর জমালো। সকলেই আমাদের এ কান্না দেখে অবাক হয়ে গেলো।
আম্মু আর নানু দ্রুত এসে আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে পরলো। নানু আভাকে জোর করে ছাড়িয়ে নিতেই আমি আম্মুকে জড়িয়ে ধরলাম। এতক্ষণ নিরবে কান্না করলেও এবার হাউমাউ করে কান্না শুরু করে দিলাম আমি।
আম্মু আমাকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্যই হয়তো বলল,
” তোর পছন্দের ছেলের সাথেই তো তোর বিয়ে ঠিক করেছি। তাহলে এতো কাঁদছিস কেনো?”
আমি কোনো জবাব না দিয়ে নিজের মত কাঁদতে লাগলাম। আমার আর আভার এক কান্নার প্রহরের সমাপ্তি ঘটলো বেশ কিছুক্ষন পর।
আমাদের কান্না শেষ হতেই সবাই নানারকম বুঝ বুঝিয়ে রুম থেকে চলে গেলো। সবাই রুম ছেড়ে চলে যাওয়ার পর আমি ওয়াশরুমে গিয়ে চোখেমুখে পানির ঝাপটা দিয়ে রুমে ফিরে এলাম৷ এসে দেখলাম, নদী, আভা আর রাইসা ভাবী মিলে গল্প করছে৷ আমিও আর দেরি না করে টাওয়াল দিয়ে মুখ মুছে তাদের আড্ডায় শামিল হলাম।
.
দুপুর প্রায় একটার দিকে হঠাৎ আদ্রিশ ভাইয়া আমার ফোনে উনি ম্যাসেজ করে বললেন,
“বড় উঠোন পার হয়ে যে আম গাছ আছে। সেখানে চলে এসো। এখনি।”
উনার এ অসময়ের ম্যাসেজ দেখে আমি একটু অবাক হয়ে গেলাম বটে। এই সেই নানা চিন্তা করতেই খেয়াল হলো, আজকে অর্ণব ভাইয়াকে উনার প্রপোজালের জবাব দিতে হবে। সে কারনেই কি আমাকে ডেকেছেন উনি? হয়তো সে কারনেই ডেকেছেন।
নদীর রুমে কেউ না থাকায় আমাকে কোনোরূপ বাহানা বানিয়ে বাহিরে আসতে হলো না। শুধু সবার থেকে একটু লুকিয়ে আমি বড় উঠোনে চলে এলাম। সেখানে এসে নির্দিষ্ট সেই আম গাছটার দিকে নজর পরতেই দেখলাম অর্ণব ভাইয়া আর আদ্রিশ ভাইয়া একসাথে দাঁড়িয়ে আছে। অর্থাৎ আমার আন্দাজটাই সঠিক হলো।
অর্ণব ভাইয়াকে ‘না’ বলার সম্পূর্ণ প্রস্তুতি মনে মনে নিয়েই আমি সে পথে পা বাড়ালাম।
আমাকে আসতে দেখে অর্ণব ভাইয়া হাসিমুখে বললেন,
” তোমাকে এখানে ডাকার কারন তো জানোই। ”
আমি উনার কথার প্রত্যুত্তর না দিয়ে কোনোরূপ ভণিতা ছাড়াই বললাম,
” দেখুন, অর্ণব ভাইয়া৷ গতকাল আমার আর আদ্রিশের মধ্যে কিছু মিসআন্ডারস্ট্যান্ডিং হয়েছিলো। এজন্যই আপনাকে বলেছিলাম, আমার উত্তর হ্যা হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। কিন্তু আসলে এমন কিছুই না৷ আমি আদ্রিশকে পছন্দ করি। আর উনার সাথে আমার বিয়ে ঠিক হয়ে গিয়েছে অলরেডি। আমাদের ফ্যামিলিই এ বিয়ে ঠিক করেছে। আমার এ বিয়েতে কোনো আপত্তি নেই৷ আগামী শুক্রবারেই আমাদের বিয়ে। সো, আমার মনে হয়, আপনার জবাবটা আপনি পেয়ে গিয়েছেন৷ ” এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে ফোঁস করে এক শ্বাস ফেললাম আমি।
অর্ণব ভাইয়ার চেহারা থেকে সকল হাসি মূহুর্তেই উধাও হয়ে গেলো। এর বদলে নেমে এলো বিষাদের এক ছায়া৷ উনি হয়তো কিছুই বিশ্বাস করতে পারছেন না। এজন্যই আমি আবারো বললাম,
” আমি এ পর্যন্ত যা যা বললাম সবটাই সত্যি ছিলো।”
আমার কথা শেষ হতেই অর্ণব ভাইয়া থমথমে গলায় বললেন,
” এমনটা করা কি খুব জরুরি ছিলো?”
আমি খানিকক্ষণ উনার চেহারার পানে তাকিয়ে রয়ে বললাম,
” এমনটা ইচ্ছাপূর্বক হয়নি। ”
এই বলে আমি কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবারো বললাম,
” আমাদের বিয়ে ঠিক হয়ে গিয়েছে অর্ণব ভাইয়া। আমার মনে হয় না এ ব্যাপারে আর কিছু বলার আছে।”
অর্ণব ভাইয়া আমার এ কথা শুনে কোনোরকম কথাবার্তা ছাড়াই সেখান থেকে চলে গেলেন। উনি চলে যেতেই আদ্রিশ ভাইয়া আমার সামনে এসে বললেন,
” মিথ্যা কেনো বললে?”
আমি মাথা তুলে কণ্ঠে সামান্য বিস্ময় প্রকাশ করে বললাম,
” মিথ্যা কি বললাম? যা বলার সব সত্যি বলেছি। এ ব্যাপারটা এখানেই বাদ দিলে খুশি হতাম। মুড অফ হয়ে গিয়েছে আমার।”
আদ্রিশ ভাইয়া আর কিছু বললেন। কিছুক্ষণ আমার পানে চেয়ে রইলেন।
হঠাৎ করে উনি বাঁকা হেসে বললেন,
” তোমার মুখে এই প্রথম আমার নাম শুনে খুব ভালো লাগলো। বাই দা ওয়ে….বিয়ের পর আমাকে কি বলে ডাকবে তুমি?”
উনার কথায় আমি থতমত খেয়ে গেলাম। আমি যে অর্ণব ভাইয়ার সামনে এই প্রথম উনার নাম নিয়েছি তা ভাবতেই অবাক হয়ে গেলাম আমি। এ বিষয়টা যে সম্পূর্ণ অনিচ্ছায় হয়েছে তা উনাকে বুঝালেও উনি বুঝবেন না।
আমি চুপ করে উনার দিকে তাকিয়ে মনে মনে বললাম, ‘ অবশেষে এই মানুষটা আদ্রিশ ভাইয়া থেকে শুধুমাত্র আদ্রিশে পরিণত হলো। অবশ্য এমনটা করা দরকার ছিলো। নাহলে নিজের বরকে ভাইয়া বলবো নাকি আমি! ছিঃ তওবা তওবা…..’ এসব ভাবতেই আমার ঠোঁটের কোনে এক চিলতে হাসির রেখা ফুটে উঠলো।
আদ্রিশ তা দেখে বললেন,
” কি ব্যাপার? হাসছো যে?”
” তেমন কিছুই না। ”
আদ্রিশ প্রত্যুত্তরে কিছুই বললেন না৷ উল্টো হালকা হেসে হুট করে আমার দিকে এগিয়ে এলেন উনি। কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বললেন,
” বি প্রিপেয়ার্ড মিশমিশ। আজকে বিকালে তোমার জন্য একটা সারপ্রাইজ আছে।”
®সারা মেহেক
#চলবে
#ভালোবাসার_রঙিন_প্রজাপতি
#লেখনীতে:সারা মেহেক
৩৮
দুপুরে খাওয়াদাওয়ার পর পরই আমি, আভা, নদী বেড়িয়ে পরলাম অজানা এক গন্তব্যের উদ্দেশ্যে। অবশ্য গন্তব্যটা শুধু আমারই অজানা। আমাকে ছাড়া বাকি সবাই অর্থাৎ আভা আর নদী গন্তব্যের উদ্দেশ্য জানে। বাড়িতে আম্মু, নানুসহ বাকি সবাইকে আদ্রিশ বলেছেন, নদী আর মুহিব ভাইয়াকে নিয়ে রেস্টুরেন্টে একটু খাওয়াদাওয়া হবে। তবে উনার এ কথায় বিন্দুু পরিমাণ সত্যতা আমি খুঁজে পায়নি। কারন উনি সকালের দিকেঔ আমাকে বলেছেন সারপ্রাইজ এর কথা। নিশ্চয়ই সেটার জন্যই আমাকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
অটোতে নদী আর আমি পাশাপাশি বসে আছি আর আভা বসে আছে আমাদের বিপরীত দিকের সিটে। অটোতে উঠার পর আমরা তিনজনেই চুপচাপ ছিলাম। কিছুক্ষণ পর হঠাৎ আভা বলে উঠলো,
” জানিস আপু? আব্বু আম্মু বিয়ের ব্যাপারটা আগে থেকেই জানতো।”
আভার কথায় আমি প্রচণ্ড অবাক হলাম। বিস্মিত কণ্ঠে জিজ্ঞাস করলাম,
” মানে! তুই কিভাবে জানলি? আমাকে ডিটেইলস এ বল সব।”
নদীও হয়তো এ ব্যাপারটা জানতো না। এজন্য সেও আমার মত অবাক হলো। আমাদের দুজনের বিস্মিত চাহনি দেখে আভা হালকা হেসে দিলো। হালকা কাশি দিয়ে গলা পরিষ্কার করে সে বলল,
” তোর আর আদ্রিশ ভাইয়ার বিয়ের কথাটা আগেই মনে মনে ভেবে নিয়েছিলো আম্মু আর বড় মামি। বিশেষ করে বড় মামির আগ্রহ বেশি ছিলো। এজন্যই তোকে দেড় মাস আগে এ বাড়িতে রেখে যাওয়ার জন্য জোর করেছিলো। আম্মুও মামির কাছে হার মানে। যদিও আম্মুর মনে এমন কিছু ছিলো না। পরে বলে বড় মামি আম্মুকে প্রস্তাবটা দেয়। আব্বু আম্মুও রাজি হয়ে যায়। তখন কথা হয়েছিলো যে আরো কয়েক মাস পর তোদের দুজনের মতামত জেনে বিয়ে ঠিক করবে। কিন্তু তার আগেই তো আদ্রিশ ভাইয়া নিজেই বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে বসলো। ”
এই বলে আভা মুখ টিপে হাসতে লাগলো। অন্য সময় হলে তার এ হাসির জন্য দু চার ঘা খেয়ে যেতো আমার কাছে। তবে আজকে খায়নি। কারন আভা’কে মারার মুডে মোটেও নেই আমি।
আমি তো আব্বু আম্মুর বিয়েতে রাজি হওয়ার বিষয়টা ভাবছি। তখন ভাবতেও পারিনি যে, এই দুইজন আগে থেকেই রাজি ছিলো। এসবের পিছনে যে এ কাহিনি তা কে জানতো……এজন্যই দুজনে এতো সহজে বিয়েতে রাজি হয়ে গিয়েছে।
আমার এসব ভাবনার মাঝেই হঠাৎ অটো থেমে গেলো। আমি আশেপাশে চোখ বুলিয়ে দেখতে পেলাম, আমরা নদীর পারের কাছাকাছি জায়গায় এসেছি। জায়গাটা একটু চেনাচেনা লাগছে আমার কাছে। এজন্য আরো ভালো করে দেখতেই বুঝতে পারলাম আমরা সেই বিলের কাছাকাছি চলে এসেছি। যেখানে এর আগে আমি,নদী আর আদ্রিশ ঘুরতে এসেছিলাম। সেই বিলকেই চোখের ভুলের কারনে নদী বানিয়ে ফেলেছিলাম কিছুক্ষণ আগে!
আমাদের তিনজনকে নামিয়ে দিয়েই অটোওয়ালা চলে গেলেন। হয়তো উনার ভাড়া আগে থেকেই মিটানো ছিলো। আমি তীক্ষ্ণ নজরে আশেপাশে চোখ বুলিয়ে চলছি। আমার হন্যে হয়ে থাকা দৃষ্টিজোড়া আদ্রিশকে খুঁজতে ব্যস্ত হয়ে পরলো। উনাকে খুঁজতে খুঁজতে ডানদিকে নজর পরতেই দেখলাম মুহিব ভাইয়া আমাদের দিকে এগিয়ে আসছেন। আমি খেয়াল করে দেখলাম, মুহিব ভাইয়াকে দেখা মাত্রই নদীর ঠোঁটের কোনে এক চিলতে হাসির রেখা ফুটে উঠলো।
মুহিব ভাইয়া এসে আমাদের পাশে দাঁড়িয়ে পরলেন। হালকা হেসে বললেন,
” আদ্রিশ ভাই ওদিকটায় আছে। আপনাদেরকে নিয়ে যেতে বলেছে। চলুন আমার সাথে। ”
এই বলেই মুহিব ভাইয়া হাঁটা শুরু করলেন। উনার পাশাপাশি নদী হাঁটা শুরু করলো। আর আমি এবং আভা তাদের পিছুপিছু।
মিনিট দুয়েকের মধ্যে আমরা একটা মাঠের মত জায়গায় এসে পৌঁছালাম। অবশ্য জায়গাটা মাঠের মতোও নয়। একটু ফাঁকা জায়গা। যার আশেপাশে গাছগাছালি আছে। তবে পর্যাপ্ত। বেশ কিছুদূরে আছে দুই তিনটা বাড়ি। আমি যেখানে দাঁড়িয়ে আছি সেখান থেকে বাড়িগুলো ঝাপসা দেখা যাচ্ছে।
মুহিব ভাইয়া আমাদের তিনজনকে নিয়ে আরো এগিয়ে গেলেন। অবশেষে গন্তব্যে পৌঁছুতেই আমার চোখজোড়া বেরিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়ে এলো।
আমার সামনে আদ্রিশ আর উনার তিন বন্ধু দাঁড়িয়ে আছেন। আর উনাদের ঠিক পিছনেই ঝাপরার মত অনেক মাধবীলতা গাছ ছড়িয়ে আছে। সেই মাধবীলতা গাছের সামনেই লাল আর সাদা জর্জেটের কাপড়গুলো দিয়ে সাজানো হয়েছে অল্প একটু জায়গা। সেই কাপড়গুলো কিছু বাঁশকে আশ্রয় করেই সেখানে আছে।
আমি বিস্ময়ে নিয়ে সকল সাজসজ্জা দেখছি। যদিও সাজসজ্জা অতিমাত্রায় সাধারণ। তবে এই অতি সাধারণ সাজসজ্জাকেই অতি অসাধারণ সাজসজ্জায় রূপদান করেছে মাধবীলতা গাছ আর সেই মাধবীলতা ফুলের রঙগুলোর সাথে মিলিয়ে আনা সেই কাপড়গুলো।
আমি এখনো থমকে দাঁড়িয়ে আছি। আদ্রিশ দূর হতে আমাকে দেখে হালকা হেসে দিলেন। এরপর আমার দিকে এগিয়ে এসে বললেন,
” মিস মিশমিশ, কেমন লাগলো আমার সারপ্রাইজ? ”
আমি এখনো তব্দা খেয়ে দাঁড়িয়ে আছি। মুখ দিয়ে কথা বের করার মত পরিস্থিতিতে মোটেও নেই আমি। তবুও জোরপূর্বক হেসে বললাম,
” আমি কখনো ভাবিনি এতো সুন্দর একটা সারপ্রাইজ পাবো!”
আদ্রিশ আমার কাছে আরো একটু এগিয়ে এসে বললেন,
” সারপ্রাইজ এখনো শেষ হয়নি। সবচেয়ে বড় সারপ্রাইজ তো এখনো পরে আছে।”
আমি চোখজোড়া বড় বড় করে কণ্ঠে বিস্ময় প্রকাশ করে বললাম,
” আর কি সারপ্রাইজ বাকি আছে?”
আদ্রিশ আবারো হালকা হেসে দিলেন। বললেন,
” তুমি নিকাব খুলতে পারো। এখানে যারা যারা আছে, তারা সবাই তোমাকে দেখেছে।”
একটু ইতস্তত বোধ করলেও আমি নিকাবটা খুলে নিলাম। আদ্রিশ কিছুক্ষণ আমার দিকে চেয়ে রইলেন। এরপর আমার দিকে এক হাত বাড়িয়ে অবনত মাথা নিয়ে বললেন,
” মে আই?”
আমি যেনো কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পরলাম। এ মূহুর্তে ঠিক কি করতে হবে তা ভেবে পাচ্ছি না। হঠাৎ পাশ থেকে আভা ফিসফিস কণ্ঠে বলে উঠলো,
” আরে আপু,দাঁড়িয়ে আছিস কেনো? হাত এগিয়ে দে।”
আভার কথায় আমি সম্বিৎ ফিরে পেলাম। বোকাসোকা ধরনের একটা হাসি দিয়ে আদ্রিশের হাতে আমার হাত রাখলাম। আমার নিরব সম্মতি পেয়ে উনি আমার হাত ধরে সামনের দিকে হাঁটা শুরু করলেন।
মাধবীলতা গাছের সামনে সাজিয়ে রাখা সে জায়গায় এসে আমার হাত ছেড়ে দিয়ে আমার সোজাসুজি দাঁড়িয়ে পরলেন উনি৷ উনার ঠোঁটের কোনে খেলা করছে মনোমুগ্ধকর সেই হাসি, যে হাসির প্রেমে আমি বারবার পরে যাই৷ আর আজকে তো আরেক দফায় উনার প্রেমে পরলাম আমি। সাদা শার্ট আর জিন্সের প্যান্ট পরহিত আদ্রিশের চোখমুখে খেলা করছে প্রাণোচ্ছল একা ভাব। আজ উনার গালের হালকা ট্রিম করা সে দাড়ি দেখতে আরো বেশি আকর্ষণীয় দেখাচ্ছে। কে কি ভাবছে সেটার তোয়াক্কা না করে আমি
আদ্রিশের দিকে তাকিয়ে আছি৷ আর তাকিয়ে থাকবোই না বা কেনো, উনি যে একান্তই আমার। উনার উপর আর কারোর অধিকার নেই। আর চারদিন বাদে উনি ধর্মীয় এবং আইনিভাবে আমার হয়ে যাবেন। এরপর থেকে উনাকে দেখে দেখেই আমি আমার চোখের ক্লান্তি মেটাবো।
আচ্ছা? আমি এতোটা বেহায়া হলাম কবে থেকে! হয়তো যেদিন থেকে আদ্রিশের প্রেমে পরেছি সেদিন থেকে……..
হঠাৎ চোখের সামনে তুড়ি বাজানো দেখে আমি সম্বিৎ ফিরে পেলাম। নিজেকে সামলে নিয়ে আদ্রিশের দিকে তাকাতেই দেখতে পেলাম, উনি ঠোঁটের কোনে দুষ্টু হাসি ঝুলিয়ে রেখেছেন। আমার দিকে একটু এগিয়ে এসে বললেন,
” আজকে কি আমাকে একটু বেশিই হ্যান্ডসাম লাগছে?”
আমি তড়িৎ গতিতে মাথা নাড়িয়ে বললাম,
” না না। তেমন কিছু না।”
“তাহলে ওভাবে আমার দিকে তাকিয়ে ছিলে কেনো?”
এ প্রশ্নের কোনো জবাব দিতে না পারায় চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম। আদ্রিশ আমার অবস্থা বুঝতে পেরে হালকা হেসে দিলেন। এরপর কয়েক কদম পিছিয়ে উনার পিছনে থাকা সাজানো টেবিল থেকে ছোট্ট একটা ফুলের তোড়ার মত জিনিস আনলেন। ঠিক ফুলের তোড়া না৷ কেমন যেনো মুকুটের মত। উনি সেটা নিয়ে আমার দিকে এগিয়ে আসতেই ভালোমত সেই জিনিসটা দেখলাম।
আদ্রিশের হাত একটা ফুলের মুকুট। মাধবীলতার ফুলের মুকুট। শুধুমাত্রা মাধবীলতা ফুল আর তার কয়েকটা পাতা দিয়ে অসম্ভব সুন্দর একটা ফুলের মুকুট বানানো। আমি সেই মুকুটের দিকে হতবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি। এতো অসাধারণ সুন্দর মুকুট এর আগে কখনো চোখে পরেনি আমার। আমি কিছুক্ষণ মুকুটের দিকে তাকিয়ে চট করে আদ্রিশের দিকে তাকালাম। উনি সাথে সাথে আমার মাথায় মাধবীলতা ফুলের মুকুট পরিয়ে দিয়ে বললেন,
” এটা আমার হাতে তৈরী করা ফ্লাওয়ার ক্রাউন। এই প্রথম তৈরী করলাম। ইউটিউব দেখে আরকি। এ মুকুটের স্থায়িত্ব কতক্ষণ বা কতদিনের তা আমার জানা নেই৷ আমি নিজ হাতে তোমাকে পরিয়ে দিয়ে মন ভরে তোমাকে দেখবো, এটাই আমার চাওয়া৷ যদিও সবার সামনে মন ভরে দেখার ইচ্ছাটাকে আপাতত বিসর্জন দিতে হচ্ছে৷ ” এই বলে উনি আমার থেকে কিছুটা দূরে গিয়ে দাঁড়িয়ে পরলেন। ঠোঁটের কোনে মনোমুগ্ধকর সেই হাসি এনে বললেন,
” এবার লাগছে জীবন্ত মাধবীলতা৷ ”
আদ্রিশের কথার ভঙ্গিতে আমার মুখ লজ্জায় ঢাকার জোগাড় হয়ে গেলো। ওদিক থেকে নদী বলে উঠলো,
” মাধবীলতা গাছের সামনে আপুকে, উপস সরি। ভাবীকে আর তোমাকে একসাথে দেখতে সেই রকম ভালো লাগছে৷ সবকিছু পারফেক্ট। তোমার গায়ের সাদা শার্ট, ভাবীর মাথায় মাধবীলতার মুকুট আর এখানে লাল সাদা কাপড়ের ডেকোরেশন। সবটা মানিয়েছে বেশ।”
নদীর কথায় আদ্রিশ তৃপ্তির হাসি দিয়ে গলা হালকা পরিষ্কার করলেন। এরপর একটা কবিতা শোনালেন,
” ওহে মাধবীলতা
আকাশে শিশির ঝরে
মন বাগানে ঝরে ফুলল
বাতাশে বসন্তের সুবাস
বেলকণির কার্নিশে দাঁড়িয়ে
তোমার এলোচুলে
মিতালি ফুলের ঘ্রাণ ভাসে
অন্তহীন শূণ্যতা আর কত রাখিব
এ হৃদমাঝারে
পূর্ণতার লাগি আসিয়া পরো
আমার উঠোনে
দুজন মিলে ভিজবো
এক শ্রাবণ সন্ধ্যায়
সাক্ষী হিসেবে উড়ে বেড়াবে
ভালোবাসার রঙিন প্রজাপতি ❤”️(অসম্ভব সুন্দর এ কবিতাটা লিখেছেন “কানিজ ফাতেমা আশা” আপু)
আদ্রিশ কবিতা আবৃত্তি করতে করতেই টেবিলের কাছে গিয়ে কিছু একটা নিয়ে এলেন। সেটা হাতে নিয়েই হুট করে আমার সামনে এক হাঁটু গেড়ে বসে পরলেন। এরপর উনার হাতে রাখা সেই বক্সের মত জিনিসটা থেকে একটা আংটি বের করলেন৷ ঠোঁটে সেই মনোমুগ্ধকর হাসি এঁটে আমার দিকে আংটিটা এগিয়ে দিয়ে উনি বললেন,
” এই মিশমিশ…….
দেবে কি আমায় ভোরের সেই স্নিগ্ধ শিশিরের ছোঁয়া,
দেবে কি আমায় রোজ রোজ আমার ঐ লালটে তোমার ঠোঁটর ছোঁয়া?
রাখবে কি আমার হাতে তোমার ঐ হাত?
রাখবে কি আমার উপর তোমার ঐ ভরসার এক ছাদ?
হবে কি আমার মনের রানী?
যে আমার উপর রাজত্ব করবে সারাটিজীবন?”(এটা আমার লেখা😑)
®সারা মেহেক
#চলবে