ভালোবাসার রঙিন প্রজাপতি পর্ব-৩৯+৪০

0
1089

#ভালোবাসার_রঙিন_প্রজাপতি
#লেখনীতে:সারা মেহেক

৩৯

আমি তৃপ্তিময় এক হাসি দিয়ে আদ্রিশের দিকে হাত বাড়িয়ে দিলাম। উনি আমার দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইলেন। উনার ঠোঁটের কোনে এখনও সেই হাসি খেলা করছে।
আদ্রিশ নিজের বাম হাতের উপর আমার হাত নিয়ে ডান হাত দিয়ে আমার অনামিকা আঙ্গুলে আংটিটা পরিয়ে দিলেন। সাথে সাথে শান্ত পরিবেশটা উপস্থিত সবার করতালিতে ভরপুর হয়ে উঠলো। আদ্রিশ আর আমার ঠোঁটে ফুটে উঠলো প্রশান্তির এক হাসি। উনি এবার সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরতে চাইলেন। সাথে সাথে আমি হাত দিয়ে উনাকে বাঁধা দিয়ে বললাম,
” বিয়ে হয়নি এখনও।”
আমার কথা শুনে আদ্রিশ বোকাসোকা এক হাসি দিয়ে মাথা চুলকিয়ে বললেন,
” সরি।”

ওদিকে উনার এ কাণ্ডে উনার বন্ধুরা টিটকারি মেরে বললেন,
” আমাদের বন্ধু উতলা হয়ে যাচ্ছে রে….”
সাথে সাথে সেখানে ছোটখাটো একটা হাসির রোল পরে গেলো। আদ্রিশ সেদিকে তোয়াক্কা না করে মুহিব ভাইয়ার দিকে এগিয়ে গেলেন। উনার কানে কানে কি যেনো একটা বলে আমার কাছে চলে এলেন। বললেন,
” চলো এখান থেকে।”

উনার এ প্রস্তাবে আমি অবাক কণ্ঠে বললাম,
” কেনো! এখানে থেকে যাবো কেনো? আমার এ জায়গাটা খুব ভালো লেগেছে।”

আদ্রিশ চোখ দুটো ছোট ছোট করে কণ্ঠ খাঁদে নামিয়ে বললেন,
” এখানে আমাদের প্রাইভেসি নেই। বুঝো না?”

আমি উনাকে রাগ দেখিয়ে শক্ত কণ্ঠে বললাম,
” এতো প্রাইভেসি লাগবে না আমার। এ জায়গাটা আমার খুব ভালো লেগেছে। তাই আমি এখানে কিছু সময় কাটাতে চাই।”

আমার কথা শুনে আদ্রিশ আমার মুখের উপর হাত চেপে বললেন,
” আরে মেয়ে রে…..এসব ব্যাপার গলায় মাইক লাগিয়ে বলতে হয় নাকি! দেখো তো, সবাই শুনে ফেললো।”

উনার কথায় আমি আশেপাশে চোখ বুলিয়ে দেখলাম, এখানে উপস্থিত সবাই মুখ টিপে হাসছে। এ দেখে আমি লজ্জায় নুয়ে পরলাম। আদ্রিশ তা দেখে আমার মুখ থেকে হাত সরিয়ে ফেললেন। সাথে সাথেই আমি মিনমিনে গলায় বললাম,
” সরি। আসলে এতো জোরে এ কথা বলা হয়ে যাবে তা ভাবতে পারিনি।”

আদ্রিশ আমার কথায় মুখ লুকিয়ে হেসে ফেললেন। এরপর বললেন,
” আপাতত চলো এখান থেকে। ঐ বিলের দিকটায় একটু ঘুরে আসি। তারপর আবার এখানে আসবো। ”

আমি অবনত মাথা নিয়েই বললাম,
” আচ্ছা চলুন। ”
আমরা দুজনে সবার চোখের সামনে দিয়েই সে জায়গা থেকে চলে আসলাম।

বিলের পাশের মাটির লম্বা রাস্তা ধরে আমি আর আদ্রিশ পাশাপাশি হেঁটে চলছি। আজ দুপুরের দিকে বেশ বৃষ্টি হয়েছিলো। ফলে মাটির রাস্তা একটু কর্দমাক্ত হয়ে গিয়েছে। তবুও এর মধ্যে দিয়ে হাঁটতে বেশ ভালো লাগছে। বিশেষ করে চারপাশে বয়ে চলা ঠাণ্ডা ঝিরিঝিরি হাওয়া মনপ্রাণ জুড়িয়ে দিচ্ছে।
আমরা দুজনেই এতক্ষণ চুপচাপ ছিলাম। কিন্তু হঠাৎ আদ্রিশ সে নিরবতা ভেঙে অনুনয়ের সুরে বললেন,
” তোমার হাতটা কি ধরতে পারি?”

আমি মজা করে কপট রাগ দেখিয়ে বললাম,
” না ধরতে পারেন না। আমার হাত ধরার অধিকার তো এখনও আপনার হয়নি। ”

আমার কথায় আদ্রিশ হয়তো মিয়িে গেলেন। এজন্য আবারো সেই নিরবতাকে আশ্রয় করে হাঁটতে লাগলেন। বেশ খানিকটা সময় চুপচাপ থাকার পরও উনি কোনো কথা বললেন না। হয়তো আমার এ মজাটাকে উনি বেশ গুরুত্ব সহকারে নিয়েছেন। এজন্যই তো এমন চুপচাপ রয়েছেন উনি। এ সময়ে উনার এ নিরবতা আমার মোটেও সহ্য হলো না। আর উনি মন খারাপ করেছেন আমার কথায় এটা ভাবতেই নিজের উপর রাগ হলো আমার। অবশ্য উনার এ মন খারাপ দূর করার ছোট্ট একটা টোটকা আছে আমার কাছে।
আমি সাতপাঁচ না ভেবে আস্তে করে উনার ডান হাতটা আমার বাম হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরলাম। সাথে সাথে উনি বিস্ময় নিয়ে আমার দিকে ফিরে তাকালেন। উনার এ বিস্ময় ভরা চাহনি আমি আমার এক চিলতে হাসি দিয়ে দূর করে দিলাম।

আদ্রিশ বাম হাতে পকেটে ঢুকিয়ে ডান হাত দিয়ে বেশ শক্ত করে আমার হাত চেপে ধরলেন। যেনো আমার হাত একটু আলগা হলেই আমি ছুটে পালিয়ে যাবো। খানিক পথ পেরোনোর পর আদ্রিশ হালকা গলায় গান ধরলেন,
” এই পথ যদি না শেষ হয়…
তবে কেমন হতো তুমি বলো তো?
পৃথিবীটা যদি স্বপ্নের দেশ হয়…
তবে কেমন হতো তুমি বলো তো?”

” না না তুমিই বলো।”

গানের এ অংশটুকু আমার গলায় শুনে আদ্রিশ থমকে দাঁড়ালেন। উনার হঠাৎ দাঁড়িয়ে পরা দেখে আমি সামান্য বিস্মিত হয়ে বললাম,
” কি ব্যাপার? দাঁড়িয়ে গেলেন কেনো?”

আদ্রিশ চোখজোড়া বড়বড় করে আমাকে জিজ্ঞাস করলেন,
” তুমি এ গান পারো?”

আমি স্বাভাবিকভাবেই বললাম,
” হুম পারি অনেকটা। কেনো? না পারার কি আছে?”

” না তেমন কিছু না। এ যুগের অনেকেই ওসব পুরোনো গান শুনতে পছন্দ করে না।”

আমি মিষ্টি হেসে বললাম,
” তবে আমি পছন্দ করি। অনেক গানই পছন্দ করি।
আচ্ছা, হাঁটা শুরু করি। হাঁটতে হাঁটতে কথা বলতে বেশি ভালো লাগে।”

উনি হালকা হেসে আবারো আমার হাত চেপে ধরে হাঁটা শুরু করলেন। পথিমধ্যে বললেন,
” আর কোন কোন গান ভালো লাগে?”

আমি খানিকক্ষণ ভেবে বললাম,
” অনেক গানই ভালো লাগে। তবে এ মূহুর্তে ‘পৃথিবী বদলে গেছে। ‘ গানটা মনে পরছে। এ গানটা আপনি পারেন? পারলে একটু গেয়ে শোনাবেন?”

আদ্রিশ মৃদু হেেস গান ধরলেন,
” পৃথিবী বদলে গেছে
তাতে কি নতুন লাগে।
তুমি আমি একই আছি
দুজনে যা ছিলাম আগে…
পৃথিবী বদলে গেছে। ”

উনার গান শেষ হতেই আমি উনার বাহুতে মাথা রেখে হাঁটতে লাগলাম। উনি আরো শক্ত করে আমার হাত চেপে ধরলেন। কিছুক্ষণ বাদে বললেন,
” এ গানটা আমি নেক্সট তখন গাইবো, যখন আমরা বুড়ো হয়ে যাবো। কারন এ গানের লিরিক্স এর সাথে আমাদের বুড়ো বয়সের মিল খুঁজে পাচ্ছি এখনই।”

উনার কথায় আমি একটু শব্দ করে হেসে দিলাম। উনি আবারো বললেন,
” তুমি গান পারো না?”

” পারি তো। ”

“তাহলে একটা গান গাও। শুনি।”

আমি উনার অনুরোধ রাখতে হালকা গলা পরিষ্কার করে কিছুটা নিচু গলায় গান ধরলাম,
” ঐ ঝিনুক ফোটা সাগর বেলায়
আমার ইচ্ছে করে
আমি মন ভেজাবো ঢেউয়ের মেলায়
তোমার হাতটি ধরে।।

আকাশ থেকে ফেলবে ছায়া
মেঘের ভেসে যাওয়া
শোনবো দুজন কি বলে যায়
উদাস দখিন হাওয়া
দূরের ঐ গাংচিলেরা নামবে জলের পরে।।

আমার চোখে চোখটি ছুয়ে
বলবে কথা তুমি
পাখি ডানায় বৃষ্টি রেখে শুনবো নীরব আমি।
বুকের সব ইচ্ছে গুলো বাজবে নতুন সুরে।।”

আমার গান শেষ হওয়ার সাথে সাথে আদ্রিশ বললেন,
” গানটা এ সিচুয়েশনের সাথে অনেকটাই মিলে গিয়েছে। শুধু এখানে সাগরের বদলে বিল আছে আর ঝিনুকের বদলে কাঁদা আছে।”
এই বলে উনি হো হো করে হাসতে লাগলেন। উনার হাসির সাথে আমিও তাল মিলাতে লাগলাম।

অনেকক্ষণ হাঁটার পর আমরা খেয়াল করলাম, আমরা দুজনে বিলের প্রায় শেষ প্রান্তে চলে এসেছি। কিছুক্ষণ সেখানেই দাঁড়িয়ে থেকে আদ্রিশ একটা অটো নিলেন। কারন আবারো উল্টো পথে সেখানে যাওয়া মানে আজ সারারাতের জন্য পা ব্যাথাকে আপন করে নেওয়া। আদ্রিশ আমাকে সহ চলন্ত একটা অটোতে উঠে পরলেন। মিনিট সাতেকের মধ্যে আমরা কাঙ্ক্ষিত জায়গায় এসে পৌঁছালাম।

®সারা মেহেক

#চলবে

#ভালোবাসার_রঙিন_প্রজাপতি
#লেখনীতে:সারা মেহেক

৪০

আমি এবং আদ্রিশ পূর্বের জায়গায় চলে এলাম। সেখানে পৌঁছানোর পর বেশ অবাক হলাম আমি। কেননা সেখানে কেউই ছিলো না। আমি আশপাশে চোখ বুলিয়ে সবাইকে খোঁজার ব্যর্থ চেষ্টা করে আদ্রিশকে জিজ্ঞাস করলাম,
” কি ব্যাপার? এখানে কেউ নেই কেনো?”

আদ্রিশ আমাকে কিছু না বলে টেবিলের একটু পেছনের দিক থেকে দুটো চেয়ার এনে আমার সামনে রাখলেন। এরপর সেই টেবিলটা একা হাতেই আমার কাছে এনে চেয়ার দুটো যথাস্থানে রাখলেন। চোখের ইশারায় চেয়ারে বসতে বললেন উনি। আমি উনার নির্দেশে মুচকি হেসে চেয়ারে বসে পরলাম।

আমি এবং আদ্রিশ কিছুক্ষণ মাধবীলতা গাছটির দিকে চেয়ে রইলাম। মাধবীলতার এই অপার সৌন্দর্য সচক্ষে না দেখলে মনে হবে জীবনে বড় কিছু মিস করে ফেলেছি। সাদা লালের এই মিশ্রণ দেখলে যে কারোর মন খারাপ ভাবটাও একদম চট করে উধাও হয়ে যাবে।
আসলে প্রকৃতিতে রয়েছে এমন অপার সৌন্দর্য যা মানুষের মনের দুঃখগুলোকে মূহুর্তেই তীব্র সুখে পরিণত করে দেয়। শুধু প্রকৃতির মাঝে নিজেকে বিলীন করে দিতে শিখতে হয়। প্রকৃতিকে মন দিয়ে আপন করে নিতে শিখতে হয়। এসব ক্ষেত্রে সফল হলে, প্রকৃতি তোমায় দেবে নজরকাড়া এবং মনকাড়া কিছু সৌন্দর্য। যা তোমার শুধু উপভোগ করতেই মন চাইবে।

কিছুক্ষণ মাধবীলতা গাছটার দিকে তাকিয়ে থাকার পর আদ্রিশকে জিজ্ঞাস করলাম,
” আইডিটা কার ছিলো?” এই বলো আমি উনার দিকে তাকালাম। উনি কিছুটা প্রতিবাদী সুরে বললেন,
” অবশ্যই আমার ছিলো। তুমি কি মনে করো, অন্যের থেকে আইডিটা নিয়ে আমি তোমাকে প্রপোজ করবো?”

আদ্রিশের এ প্রতিবাদে আমি হালকা হেসে দিলাম। আমার হাসি দেখে উনি শান্ত গলায় বললেন,
” আইডিটা আসার পর এনামকে বললাম মাধবীলতা গাছ খুঁজে বের করতে। প্রথমেই ও ঐ বাড়িটার খোঁজ পেয়েছিলো। পরে আমি বললাম, ঐটা হবে না। অন্যটা খোঁজ। তারপরে এসে ও এই বিলের কাছের জায়গাটা পেলো। প্রথম প্রথম তো এখানকার অবস্থা করুন ছিলো। পরে এ জায়গাটা সাজানোর জন্য সব গোছগাছ করলাম। জানি, সাজানোটা একদমই সিম্পল হয়েছে। হয়তো তোমার মনমতো……”

উনাকে মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে রাগ মিশ্রিত কণ্ঠে বললাম,
“মোটেও সিম্পল না। আর আমার ভালো লাগেনি, এটা কে বলেছে আপনাকে? আমার এটা খুব ভালো লেগেছে। সো বেশি বেশি কথা বলবেন না। ”

আদ্রিশ আমার কথায় হালকা হেসে দিলেন। কিছুক্ষণ বাদে আমি জিজ্ঞাস করলাম,
” আভা, নদী, মুহিব ভাইয়া…ওর সব কোথায়?”

” রেস্টুরেন্টে গিয়েছে। আমরাও যাবো কিছুক্ষণের মধ্যেই।”

” ওহ। ”

” সো সরি…এখানে খাবারের আয়োজন করতে পারিনি বলে। আসলে এখানকার এই ছোট্ট ডেকোরেশন করতে করতেই সময় পার হয়ে গিয়েছিলো। এজন্য রেস্টুরেন্ট থেকে খাবার আনার সময় হয়নি। ”

আদ্রিশের কথার প্রত্যুত্তরে আমি কিছুই বললাম না। বরং রাগী কটমট চাহনিতে উনার দিকে তাকিয়ে রইলাম। তা দেখে আদ্রিশ মেকি ভয় পাওয়ার অভিনয় করলেন। উনার এ অভিনয়ে মূহুর্তেই আমি ফিক করে হেসে ফেললাম।

কিছুক্ষণ সেখানেই বসে থেকে হালকা গল্পগুজব করলাম আমরা। এরপর সেখান থেকে অটোতে উঠে রেস্টুরেন্টে চলে এলাম দুজনে। যদিও জায়গাটা ছেড়ে আসতে একটুও ইচ্ছা করছিলো না আমার। কিন্তু কিছুই করার ছিলো না আমার। শুধু সেখানকার কয়েকটা ছবি তুলে আনলাম স্মৃতি স্বরূপ।

নদী এবং মুহিব ভাইয়া আগামীকাল সকালেই চলে যাবে। এজন্য তারা দুজন আমাদের সাথে জমিয়ে আড্ডা দিচ্ছে।
কথায় কথায় জানতে পারলাম, আজকে আমার আর আদ্রিশের এঙ্গেজমেন্ট হবে। আদ্রিশ এতো সাধারণভাবে আমাকে আংটি পরিয়ে দিতে চায়নি বলেই প্রপোজটা করেছে। অবশ্য বাড়িতে ঢোকার আগেই আমার হাতের আংটিটা খুলে উনাকে দিয়ে দিতে বলেছেন উনি। কারন বড়দের অনুপস্থিতিতে এভাবে আংটি পরানোর বিষয়টা কেউই ভালো চোখে দেখবে না। এজন্যই আংটিটা খুলে দিতে হবে আমাকে।

.

রাত প্রায় আটটার দিকে আমার আর আদ্রিশের এঙ্গেজমেন্ট হয়ে গেলো। রেস্টুরেন্ট থেকে ফিরতে ফিরতে প্রায় সন্ধ্যা পার হয়ে গিয়েছিলো আমাদের। বাড়িতে ঢোকার আগেই প্ল্যান মোতাবেক আদ্রিশ আমার হাত থেকে আংটিটা খুলে নেয়।
বাড়িতে ঢোকার পরপরই আমরা সবাই সাধারণভাবেই থাকি। রুমে গিয়ে বোরকা খুলতে খুলতেই আম্মু এঙ্গেজমেন্টের কথা বললো। ব্যাপারটা আগে থেকে জানা থাকায় নরমালভাবেই সবটা নিলাম আমি।

পরে আম্মু আমাকে হালকা আকাশী রঙের একটা শাড়ী পরিয়ে দেয়। মুখে হালকা মেকআপ করানোর পর মাথায় ঘোমটা দিয়ে আমাকে ড্রইংরুমে আনা হলে আদ্রিশকে দেখতে পেলাম। উনিও হালকা আকাশী রঙের একটা পাঞ্জাবি পরেছেন।
আম্মু আমাকে নিয়ে উনার পাশে বসাতেই উনি আমার উদ্দেশ্যে ফিসফিস করে বললেন,
” মনে হচ্ছে টুকুস করে তোমাকে এ হৃদয়ে পুরে নেই। ”
উনার এ কথায় আমার হাসি পেলেও বড়দের সামনে লাজলজ্জার কথা ভেবে মুখে এঁটে ধরলাম।

অবশেষে কিছুক্ষণের মাঝেই, সবার সামনে আনুষ্ঠানিকভাবে আমরা একে অপরকে আংটি পরিয়ে দিলাম।

এঙ্গেজমেন্টের পরপরই শুনতে পেলাম, আগামীকাল সকালে আমরা সবাই বাসায় যাবো। কারন আমার ব্যবহার্য সকল জিনিসপত্র বাসায় আছে। সেসব না নিয়ে ঢাকায় যাওয়া সম্ভব নয়। এজন্যই সোমবার অর্থাৎ আগামীকাল বাসায় গিয়ে সব জিনিসপত্র গুছিয়ে মঙ্গলবার সন্ধ্যার মধ্যে বাড়িতে চলে আসতে হবে। তারপর বৃহস্পতিবার রাতে আমাকে মেহেদী পরিয়ে একদম কাছের আত্মীয়স্বজনের উপস্থিতিতে বিয়ের কাজ সম্পন্ন হবে। বিয়ের সব আনুষ্ঠানিকতা এ বাড়িতেই হবে। কারন ফ্ল্যাট বাসায় আমার চাচা,ফুফু,খালা, মামা সবাই একসাথে থাকতে পারবে না। কিন্তু এ বাড়ি বড় হওয়ায় আরামসে সবাই এখানে থাকতে পারবে। অবশ্য আদ্রিশের আত্মীয়স্বজনেরাও আছে। তাদেরও থাকার ব্যবস্থা হয়ে যাবে।

আমার বিয়েতে বড়সড় অনুষ্ঠান করার ইচ্ছা থাকলেও নদীর বিয়ের জন্য তা সম্ভব হচ্ছে না। এজন্য সবাই মিলে ফয়সালা করলো, ঈদের পরে বড় করো অনুষ্ঠান করবে।

আংটি পরানো শেষ হওয়ার পর রাতের খাবার খেয়ে যে যার মত ঘুমিয়ে পরলো। অবশ্য আমি আর আদ্রিশ জেগে রইলাম। অনেকক্ষণ যাবত ম্যাসেজে কথা হওয়ার পর ক্লান্ত শরীর নিয়ে ঘুমের দেশে পারি দিলাম আমি।

.

আজ বুধবার,
দেখতে দেখতে দুটো দিন কেটে গিয়েছে। এ দুটো দিন আমার কেমন গিয়েছে, তা শুধু আমিই জানি। একদিকে আব্বু, আম্মু, আভাকে ছেড়ে থাকার কষ্ট তাড়া করছিলো আমাকে। অপরদিকে আদ্রিশকে না দেখার কষ্টও মনের মধ্যে চেপে বসেছিলো। দুটো কষ্টের বোঝা একসাথে টানা যে কি কষ্টের তা এ দুই দিনে হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছি আমি।

অবশ্য গতকাল বিকেলে বাড়ি ফেরার পর একদিকের কষ্ট লাঘব হয়েছে। তা হলো, আদ্রিশকে না দেখার কষ্ট। কিন্তু অপর কষ্ট তো ঠিকই রয়ে গিয়েছে। সেটা হলো আব্বু,আম্মু,আভাকে ছেড়ে থাকার কষ্ট। এ কষ্ট নিয়ে আমাকে সারাজীবন চলতে হবে। যদিও একসময় সংসার আর পড়ার চাপে নিজেকে সামলে নিবো আমি। তবুও এ ক্ষতটা কখনো সেরে উঠবে না।

গতকাল বাড়িতে আসার পর আদ্রিশের চোখদুটো দেখার মত হয়েছিলো। উনার চোখজোড়া যেনো খুবই তৃষ্ণার্ত হয়েছিলো আমাকে দেখতে না পেয়ে। অবশ্য উনার মত আমারও অবস্থা এমন হয়েছিলো। তবে এক্ষেত্রে উনার মত এভাবে হা করে তাকিয়ে থাকার সাহস আমার ছিলো না। আমি তো শুধু তখনই উনার দিকে তাকিয়েছি যখন উনি অন্য কোনো কাজে ব্যস্ত ছিলেন। ব্যস, আমার দেখা অতটুকুই।
শুক্রবার বিয়ে বলে আমাদের দুজনকেই সবসময়ই চোখে চোখে রাখা হচ্ছে। এ কারনে যে, আমরা যেনো একা একা কথা না বলতে পারি। একটু খারাপ লাগলেও বড়দের সিদ্ধান্ত মাথা পেতে মেনে নেই আমরা। অবশ্য আজ সকালে খাওয়াদাওয়া করার পর বাড়ির বড়রা একত্রে বসে বিয়ে নিয়ে আলোচনা করার জন্য। সে সুযোগে আদ্রিশ নদীর রুমে চলে আসেন। উনাকে দেখেই তো আমার চক্ষু চড়কগাছ! আমি তখনই বিস্মিত কণ্ঠে উনাকে জিজ্ঞাস করলাম,
” আপনি এখানে কেনো!”

আদ্রিশ পা টিপে টিপে আমার দিকে এগিয়ে এলেন। গলা খাঁদে নামিয়ে সতর্ক কণ্ঠে বললেন,
” হুশশশ। আস্তে কথা বলো। তোমাকে দেখতে এলাম আমি।”

” সে তো শুক্রবারে আরামসে দেখতে পারবেন। এখন দ্রুত আপনার রুমে চলে যান। কেউ দেখতে পেলে খুব খারাপ ভাববে।”

আদ্রিশ কিছু একটা বলতে চাইলেন। তবে হঠাৎ উনার ফোন আসায় তা সম্ভব হলো না। উনি প্যান্টের পকেট থেকে ফোনটা বের করে স্ক্রিনের দিকে তাকালেন। তৎক্ষণাৎ উনার চোখেমুখে জিজ্ঞাসু এক ভাব ফুটে উঠলো। আমি তা দেখে ফিসফিস করে জিজ্ঞাস করলাম,
” কে ফোন দিয়েছে?”

উনি ফোন রিসিভ করতে করতে বললেন,
” বশির স্যার।”

‘বশির স্যার’ কে, এ নিয়ে একটু চিন্তিত থাকলেও পরমূহুর্তেই আমার মনে পরলো যে, বশির স্যার হলেন মাহা’র বাবা। কিন্তু এ সময়ে উনি ফোন করলেন কেনো? এ ‘কেনো’র উত্তর খুঁজতে আমি আদ্রিশের দিকে তাকালাম। দেখতে পেলাম ধীরেধীরে উনার চেহারা পাংশুটে বর্ণ ধারন করছে। উনার এ অবস্থা দেখে আমার মনে বিপদের ঘণ্টা বাজতে লাগলো। অজানা আশংকায় কেঁপে উঠলো বুক।

কিছুক্ষণের কথাবার্তায় আদ্রিশ ফোন রেখে দিয়ে আমার দিকে অসহায় দৃষ্টিতে তাকালেন। উনার এ চাহনি আমার মোটেও পছন্দ হলো না। প্রচণ্ড ভয়ে বুক ঢিপঢিপ করে আওয়াজ তুলে চলছে। মন বলছে কোনো বিপদ এসেছে। তবে এ বিপদের কথা শোনার সাহস আমার হচ্ছে না। কিন্তু সাহস না জুগিয়েও থাকতে পারছি না। অবশেষে শুকনো একটা ঢোক গিলে মনে খানিক সাহস জুগিয়ে আদ্রিশকে জিজ্ঞাস করলাম,
” বশির স্যার কি বললো?”

আদ্রিশ আমার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে বললেন,
” মাহা সুইসাইড করেছে। আমার জন্য………..”

আদ্রিশের কথা শুনে আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম। এমন অনাকাঙ্ক্ষিত একটা সংবাদ শুনে আপনাআপনি কয়েক কদম পিছিয়ে এলাম আমি।

আদ্রিশ এখনো অসহায় চাহনিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি সাতপাঁচ না ভেবেই এ কথা উড়িয়ে দেওয়ার ভান করে বললাম,
” আরে…. কি যা তা বলছেন। মাহা আপনার জন্য সুইসাইড করবে কেনো?”

উনি থমথমে গলায় বললেন,
” দুই দিন আগে ওকে আমাদের বিয়ের নিউজটা দিয়েছি। তখন থেকেই ও অনেক পাগলামি করছিলো। বারবার ফোন দিচ্ছিলো। এজন্য রাগে ওর ফোন নাম্বার ব্লক করে দেই। এজন্য বশির স্যার নিজের ফোন দিয়ে আমাকে ফোন করেন।”

আমি খানিকক্ষণ উনার দিকে স্তব্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম। এরপর ঠাণ্ডা গলায় জিজ্ঞাস করলাম,
” এখন কি করবেন?”

” আমাকে আজই ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দিতে হবে। ”

আদ্রিশের কথায় আমার মাথায় যেনো আকাশ ভেঙে পরলো। আমি হতবাক কণ্ঠে বললাম,
” কেনো! ঢাকায় গিয়ে কি করবেন? আমি আপনাকে ঢাকায় যেতে দিবো না৷ ঐ মাহা’র মতলব ভালো ঠেকছে না আমার কাছে। নিশ্চয়ই নাটক করছে। ”
আমি স্পষ্ট খেয়াল করছি যে, আমি অনেকটা উন্মাদের মত ব্যবহার করছি।
আদ্রিশ আমার দু’বাহু ধরে আমাকে আশ্বাস দিয়ে বললেন,
” ও নাটক করছে না৷ বশির স্যার আমাকে কাঁদতে কাঁদতে ওর কথা বলেছে। উনি আমার কাছে আকুতিমিনতি করে বলেছেন ঢাকায় আসার কথা। কারন, উনার বিশ্বাস আমি মাহাকে আমার বিয়ের কথা বললে মাহা বুঝে যাবে। তা না হলে ওর পাগলামি বেড়েই চলবে। এজন্য আমাকে আজই ঢাকায় যেতে হবে।”

উনার কথা শুনে আমি শান্ত দৃষ্টিতে উনার দিকে তাকিয়ে রইলাম। উনি হালকা হাসার চেষ্টা করে বললেন,
” আমার উপর বিশ্বাস আছে, তাইনা মিশমিশ?”

আমি মৃদু মাথা দুলিয়ে হ্যা সূচক জবাব দিলাম। উনি আবারো বললেন,
” তোমার এ বিশ্বাসের মর্যাদা থাকবে। খারাপ কিছুই হবে না। এখনই আম্মুর সাথে কথা বলছি এ ব্যাপারে। ”

এই বলে আদ্রিশ আমার বাহু ছেড়ে চলে যেতে চাইলেন। কিন্তু যাওয়ার আগেই পিছন থেকে উনার হাত চেপে ধরে বললাম,
” তাদের সম্পূর্ণ সত্যি বলার দরকার নেই।”

আদ্রিশ আমার দিকে ফিরে কিছুটা অবাক হয়ে জিজ্ঞাস করলেন,
” মানে? ”

” মানে সবাইকে বলবেন যে, মাহা আপনাকে পছন্দ করতো। কিন্তু আপনি করতেন না। আপনার বিয়ের কথা শুনে ও সুইসাইড করেছে। ভুলেও এ বলতে যাবেন না যে, আপনার সাথে কয়েক মাসের রিলেশন ছিলো ওর। ”

” কিন্তু…..”

” কোনো কিন্তু নয়। এগুলোই বলবেন আপনি। আমি চাইনা অযথা সবার সামনে আপনি খারাপ হোন। আর আব্বু, আম্মু আপনার রিলেশনের ব্যাপারে জানলে আদৌ এ বিয়ে হতে দিবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে আমার। আমি এমনটা মোটেও চাইনা। এজন্য, প্লিজ, আমার খাতিরে এমনটাই বলবেন,যেমনটা আমি মাত্র বললাম।”

” আচ্ছা।”
এই বলে আদ্রিশ আমার কাছে এগিয়ে এসে আমার দু গালে হাত রেখে বললেন,
” ভালোবাসি, ভালোবাসি, খুব ভালোবাসি আমার এই মিশমিশ নামক চাশমিশকে।”

®সারা মেহেক

#চলবে