ভালোবাসার রঙিন প্রজাপতি পর্ব-৪৩

0
1062

#ভালোবাসার_রঙিন_প্রজাপতি
#লেখনীতে:সারা মেহেক

৪৩

হঠাৎ আদ্রিশের ডায়েরির কথা মনে পরলো। এখনো যে ডায়েরির অনেকখানি পড়া বাকি আমার! এখন সবাই ঘুমিয়ে আছে। সুতরাং, আদ্রিশের রুমে যেতে কারোর পারমিশন লাগবে না। তবে খুব সাবধানে রুমে গিয়ে পড়তে হবে ডায়েরিটা।

আমি পা টিপে টিপে আদ্রিশের রুমে চলে এলাম। তখনকার মতোই দরজাটা হালকা ভিজিয়ে রেখে ডায়েরিটা নিয়ে বিছানায় বসে পরলাম। সন্ধ্যায় ঠিক যেখানে পড়া ছেড়ে দিয়েছিলাম, তারপরের পাতা হতে আবারো পড়া আরম্ভ করলাম,

” পুরো একসপ্তাহ পর ডায়েরি লিখতে বসলাম। এতোদিনে একটু অলসতা ভর করেছিলো আমার উপর। আবার লিখতেও মন চাইছিলো না। তবে আজ লিখতে বসেই পরলাম।

এ কয়দিনে মিশমিশের সাথে দেখাসাক্ষাৎ, ঝগড়াঝাটি সব হয়েছে। মাঝে তো দুইদিন তার সাথে কথাই বলিনি। একটু রাগারাগি হয়েছিলো বটে ওর সাথে। আবার সে যে আগ বাড়িয়ে আমার সাথে কথা বলতে আসবে, সেটাও করেনি। মেয়েটার বেশ আত্মসম্মানবোধ আছে। আমি আগ বাড়িয়ে কথা না বললে সে কখনও কথা বলতে আসেনা। অবশ্য আমি আগ বাড়িয়ে কথা বলার পর যে সে একটু নরম সুরে কথা বলবে তা নয়। সবসময় ঝাঁঝালো সুরে কথা বলে। যেনো তার মুখে জন্মের সময় মধু নয় মরিচ দেওয়া হয়েছে। হা হা হা………

আমি প্রথম যখন তাকে মিশমিশ বলে ডেকেছি সে কোনোরূপ চিন্তা ভাবনা ছাড়াই চট করে আমার ডাকে সাড়া দেয়। সে জানে না যে আমি তাকে মিশমিশ বলে ডাকি। তারপরও সে সাড়া দিয়েছিলো। কিন্তু কি মনে করে সেটা বুঝতে পারিনি।
এসব ঘটনা হয়েছিলো আমাদের স্কুলের মাঠে। নদী আর মিশমিশ এর ছবি তুলতে যাওয়ার সময় তাকে এ নামে সম্বোধন করেছিলাম আমি। সেও সাড়া দিয়েছিলো।
স্কুলে তার আর নদীর যে ছবি তোলা হয়েছিলো, তা সুযোগ বুঝে আমি নিজের ফোনে নিয়ে নেই। কারন এ ছবিতে মিশমিশের এক নতুন রূপ দেখতে পেয়েছি। তার বোরকা পরিহিত রূপ। তার এ রূপ সাধারণের মাঝেও অসাধারণ লেগেছিলো আমার কাছে। এজন্যই সে ছবিটা প্রিন্ট করে এনে ডায়েরির পিছনের দিকে লাগিয়ে রেখেছি।”

এটুকু পড়া শেষ হতেই আমি দ্রুত হাতে ডায়েরির পাতা উল্টিয়ে শেষের দিককার পাতায় চলে গেলাম। সেসব পাতায় চোখ পড়তেই বিস্ময়ে আমার চোখজোড়া বড় হয়ে এলো। আমার অনেক ছবি আঠা দিয়ে লাগানো সেখানে! এতো ছবি কোন ফাঁকে কখন তুলেছে তা ভাবতেই মুখের উপর হাত চলে আসলো আমার। উনি যে এমন একটা অবিশ্বাস্য কাজ করে বসবে, তা কখনও কল্পনা করেনি আমি।

উনার তোলা আমার ছবিগুলো একনজর দেখার পর আবারো ডায়েরির সেই পাতায় চলে গেলাম আমি। আগের শেষাংশ থেকে পড়তে আরম্ভ করলাম আবারো,

” বৃষ্টিতে ভিজলে যেকোনো মেয়েকে মোহনীয় দেখায়। এটা হয়তো সত্য। কারন আমি মিশমিশের বৃষ্টিতে ভেজা সেই মোহনীয় রূপ দেখেছি। আর তখন থেকেই ওর প্রতি আমার ভালোলাগাটা ভালো ভাবে অনুভব করতে পেরেছি আমি।
সেদিন মিশমিশের এক অজানা রূপের সাথে পরিচয় হতে পেরেছিলাম আমি। লুকিয়ে লুকিয়ে যে তার দিকে কতক্ষণ চেয়ে ছিলাম তা জানি না। এভাবে তাকে লুকিয়ে দেখতেও বেশ ভালো লাগছিলো। কেমন যেনো একটা প্রেম প্রেম ফিলিংস পাচ্ছিলাম। যদিও জানি, কয়দিনের দেখাসাক্ষাতে এসব প্রেম ট্রেম হওয়া সম্ভব নয়। এজন্য আমি এটা দাবি করতে পারি যে, মিশমিশের প্রতি আমার কোনো প্রেম বা ভালোবাসা নেই। যা আছে শুধু ভালোলাগা। আর আমি এটা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি যে, ‘কারোর প্রতি ভালোলাগা ধীরে ধীরে তীব্র হলে তা ভালোবাসায় পরিণত হয়। ‘
এখন……মিশমিশের প্রতি আমার যে ভালোলাগা আছে, তা আদৌ সেই ভালোবাসায় পরিণত হবে কি না কে জানে। অপেক্ষা করতে হবে এটা দেখার জন্য যে, জল আসলে কতদূর গড়ায়।

এদিকে মিশমিশের সেই মোহনীয় রূপ দেখায় আমি এতোটাই বিভোর ছিলাম যে, বেশিক্ষণ বৃষ্টিতে ভিজলে যে কারোর জ্বর এসে যেতে পারে, সেটা খেয়াল ছিলো না। অতঃপর, যখন এটা মনে হলো তখন আমি ছাতা হাতে নিয়ে একটু রাগী ভাব নিয়ে সেখানে গেলাম। কিছুটা ধমকের সুরেই দুজনকে ভিতরে যেতে বললাম।
কিন্তু যে কারনে ধমকটা দিয়েছিলাম মিশমিশকে, তা আর কাজের রইলো না। কারন রাত আসতে আসতে ঠিকই তার জ্বর এসে গিয়েছিলো। এক্ষেত্রে নদীকে বেশ স্ট্রং বলা চলে।
যাই হোক, এ জ্বরের জন্য মিশমিশ ঠিকঠাক মত খাওয়াদাওয়া করছিলো না। পরে চাচির হাত থেকে প্লেটটা নিলাম তাকে খাইয়ে দেওয়ার জন্য। কিন্তু মিশমিশ খেতে চাইলো না। এজন্য ধমকও দিলাম একটু। তাতেই কাজ হয়ে গেলো। পরে…….”

হঠাৎ কারোর পায়ের আওয়াজ কানে ভেসে আসতেই আমার বুকটা ধক্ করে উঠলো। সাথে সাথে ডায়রিটা তার নিজস্ব জায়গায় রেখে দরজার আড়াল দিয়ে বাহিরে উঁকি দিলাম আমি। দেখলাম, ডাইনিং এ বসে বড় মামা পানি খাচ্ছেন। উনাকে এ মূহুর্তে দেখে আমার ভয়টা দ্বিগুন পরিমানে বেড়ে গেলো। প্রচণ্ড ভয়ে আদ্রিশের ডায়েরি পড়ার আগ্রহ, ইচ্ছা সবটাই বিসর্জন দিলাম আমি। এ মূহুর্তে এ রুম থেকে বের হওয়া গুরুত্বপূর্ণ আমার জন্য। এতো রাতে আদ্রিশের রুমে কেউ আমাকে দেখলে ছোটখাটো একটা কাণ্ড ঘটে যাবে। এজন্য উনার ডায়েরি পড়ার রিস্কটা আর নিতে পারছি না আমি।

বড় মামার কাজ শেষ হওয়ার অপেক্ষা করতে লাগলাম আমি। অবশেষে মিনিট পাঁচেকের মাঝে উনি রুমে চলে গেলেন। আর আমি অত্যন্ত সতর্কতার সাথে আদ্রিশের রুম থেকে বেড়িয়ে নদীর রুমে চলে এলাম। আভা আর আম্মুকে পাশ কাটিয়ে আস্তেধীরে বিছানার ওপাশে শুয়ে পরলাম আমি। অনুভব করলাম, কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে আছে। আর বুকের ভেতর ঢিপঢিপ সে আওয়াজটার গতি ক্রমান্বয়ে কমে আসছে।
কিছুক্ষণ চোখজোড়া বন্ধ রেখে নিজেকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করলাম আমি। অবশেষে নিজেকে সুস্থ স্বাভাবিক করতে পেরে ঘুমানোর প্রস্তুতি নিলাম আমি।

.

সকাল থেকেই আদ্রিশকে ফোন করার জন্য উন্মুখ হয়ে বসে আছি আমি। কিন্তু সঠিক সুযোগের অভাবে উনাকে ফোন দিতে পারছি না। অবশ্য ফোন দিতে না পারায় টেনশন হচ্ছে না খুব একটা। টেনশন হচ্ছে ঘড়িতে সময় দেখে। সকাল প্রায় দশটা বাজতে চললো। এর মধ্যে বাড়িতে চলে আসার কথা আদ্রিশের। অথচ এখনো আসেননি উনি। তাহলে কি রাতের মধ্যে সকল সমস্যার সমাধান হয়নি? এমনটা না হলে যে, সময় যেতে যেতে উনার আর আমার বিয়ের মধ্যে নানারকম সমস্যার সৃষ্টি হবে তা বেশ অনুমান করতে পারছি আমি।

অনেকক্ষণ অপেক্ষা করার পর অবশেষে আদ্রিশকে কল করার সুযোগ পেলাম। কোনোরকম সময় অপচয় ছাড়াই উনাকে কল দিলাম। কিন্তু…..কিছুক্ষণের মধ্যেই ওপাশ থেকে যান্ত্রিক স্বরে এক বার্তা শুনতে পেলাম আমি,
“দা নাম্বার ইউ হ্যাভ কলড, ইজ কারেন্টলি আনরিচেবল।প্লিজ ট্রাই…..”
এটুকু শোনামাত্র আমার হৃদস্পন্দন যেনো থমকে গেলো। কয়েকে সেকেন্ডের জন্য শ্বাস নিতেও ভুলে গেলাম আমি।
আদ্রিশের ফোন বন্ধ মানে! কি বলছে এরা! নিশ্চয়ই কোনো ভুল হয়েছে। উনার ফোন তো বন্ধ থাকার কথা না। এসব ভাবতে ভাবতেই আমি আবারো উনার নাম্বার ডায়াল করে কল দিলাম। একবার, দুইবার……পাঁচবার। প্রতিবারই একই বাক্য আমার কানে ভেসে আসছে। নিজের কানকে কিছুতেই বিশ্বাস করাতে পারছি না। উনার ফোন বন্ধ কেনো! রাস্তায় কোনো অঘটন বা মাহা’র সাথে….নাহ, কিছুতেই কিছু ভাবতে পারছি না আমি। প্রচণ্ড ভয় হচ্ছে আমার। মস্তিষ্ক শূন্য হয়ে যাচ্ছে যেনো। তাহলে কি আমি আদ্রিশকে হারাতে…… এসব ভাবতেই আমার চোখজোড়া বেয়ে নোনা জলের ফোয়ারা বইতে লাগলো। একদম নিঃশব্দে। ভয়ের ফলে ফোনটা কোলের উপর রেখে দুপাশের বিছানার চাদর খামছে ধরলাম আমি। শ্বাস নিতে পারছি না আমি। বারংবার আমার চোখের সামনে আদ্রিশের চেহারা ভেসে উঠছে। তাহলে কি আমাদের ভালোবাসার সমাপ্তি এখানেই……………

” এই আপু, তুই কাঁদছিস কেনো?”
হঠাৎ আভা’র কণ্ঠস্বর কানে আসতে ঝাপসা দৃষ্টি নিয়ে তার দিকে তাকালাম আমি। গলা দিয়ে আওয়াজ বের করতে পারছি না আমি। এজন্য আভা আবারো একই প্রশ্ন করলো। কিন্তু আমি জবাব দিতে পারলাম না।
আমার কাছে কোনো জবাব না পেয়ে আভা একপ্রকার গলা উঁচিয়ে বাড়ির প্রায় প্রতিটা সদস্যকে এ রুমে ডাকলো। কয়েক সেকেন্ডের মাঝেই মোটামুটি সবাই রুমে উপস্থিত হয়ে পরলো। তাদেরকে দেখে যে আমার কান্না থামবে তা নয়, বরং আমার কান্নার বেগ বেড়েই চলছে।

আম্মু আমার এ অবস্থা দেখে চিন্তিত হয়ে বলল,
” এভাবে কাঁদছিস কেনো?”

কান্নার জন্য এবারও গলা দিয়ে আওয়াজ বের করতে পারছি না। ওদিকে সবাই চিন্তায় চিন্তায় বারবার আমাকে একই প্রশ্ন করে যাচ্ছে। অবশেষে না পেরে আমি আমার ফোনটা হাতে নিয়ে সবার উদ্দেশ্যে সামনে ধরলাম। বহু কষ্টে কাঁপা-কাঁপা কণ্ঠে বলতে পারলাম,
” আ- আদ্রিশের ফোন অফ। অনেক- অনেকক্ষণ ধরে।”

মূহুর্তেই পরিবেশ ঠাণ্ডা হয়ে এলো। সবার মুখ থমথমে হয়ে গেলো। আমি আরেকটু চেষ্টা করে বললাম,
” আজ সকাল নাগাদ উনার চলে আসার কথা। কিন্তু এখনো আসেনি। ফোনও বন্ধ।”

আমার কথা শেষ হওয়া মাত্রই রাইসা ভাবী আর ছোট মামি নিজেদের ফোন নিয়ে এসে আদ্রিশকে কল দিলো। কিন্তু ফলাফল একই। উনার ফোন বন্ধ। এদিকে বড় মামি আমার পাশে ধপ করে বসে পরলেন। মুখে কোনো কথাবার্তা নেই। আর আমার……কান্নার বেগ কিছুটা কমে আসলেও দুশ্চিন্তা কমে আসছে না।
রাইসা ভাবী আমাদের দুজনের অবস্থা দেখে আশ্বস্ত করে বললেন,
” আব্বুকে ফোন করছি। পলাশকেও ফোন করছি। উনারা নিশ্চয়ই কোনো খবর বের করতে পারবেন। ”

এই বলে রাইসা ভাবী, পলাশ ভাইয়া, বড় মামা আর ছোট মামাকে কল দিয়ে সবটা বললেন। উনারা আমাদেরকে বললেন, অপেক্ষা করতে।

উনাদের ফোন করার পর প্রায় পনেরো মিনিট কেটে গিয়েছে হয়তো। এখনও কেউ কল ব্যাক করেননি। ওদিকে ছোট মামি অনবরত আদ্রিশকে কল দিয়ে চলছে। কিন্তু প্রতিবারই সেই তিক্ত যান্ত্রিক বাক্য শোনা যাচ্ছে। সবার অবস্থা টেনশনে নাজেহাল। আমার কান্নার গতি কমলেও বারবার ফুঁপানোর আওয়াজ হচ্ছে। এই কান্নার ফলে যদি টেনশনকে দূর করা যেতো তাহলে কত ভালো হতো! আমি টেনশনের সময় বসে বসে কাঁদতাম। অথচ এমন কিছুই হয়না!

এভাবে সময় গড়িয়ে যেতে যেতে দুপুর হয়ে এলো। কেউই আদ্রিশের কোনো খোঁজ আনতে পারলো না। এদিকে বড় মামির অবস্থা ধীরেধীরে অবনতি হচ্ছে। প্রেশার ফল করে একবার অজ্ঞানও হয়ে গিয়েছেন। কিন্তু এ পর্যন্ত আদ্রিশের কোনো খোঁজ পাওয়া গেলো না।
আর আমার অবস্থা এমন যে, মনে হচ্ছে যেকোনো সময় হার্টফেল করে মারা পরবো আমি। এই কয়েকটা ঘণ্টা চোখ ভেজা রেখেই সময় পার করলাম। সবাই একে অপরকে, আমাকে, বড় মামিকে নানাভাবে সান্ত্বনা দিয়ে চলছে। কিন্তু এতে কোনো কাজ হচ্ছে না।

কিছুক্ষণের মাঝে পলাশ ভাইয়া, বড় মামা, ছোট মামাও বাড়ি ফিরে এলেন। সবার চোখেমুখেই তীব্র দুশ্চিন্তার ছাপ। কেউই শান্তিতে নেই শুধুমাত্র একজন মানুষের চিন্তায়। ওদিকে আমার ফুফুসহ তার পুরো পরিবার এ বাড়িতে হাজির হয়ে গিয়েছে। বাড়িতে চিন্তার মহল দেখে হয়তো উনাদের মাথা হতে বিয়ের চিন্তা উবে গেলো।

থমথমে পরিবেশটা হঠাৎ পলাশ ভাইয়ার কথায় সরব হয়ে উঠলো। উনি গলায় উঁচিয়ে বললেন,
” সবাই বেরিয়ে এসো। আদ্রিশ চলে এসেছে। ”

পলাশ ভাইয়ার কথা শুনে হুড়োহুড়ি করে রুম থেকে বেড়িয়ে এলাম আমি। ডাইনিং পার হয়ে বাড়ির সদর দরজার দিকে চোখ পড়তেই থমকে গেলাম আমি। মস্তিষ্ক যেনো পুরোপুরি শূন্য হয়ে এলো। হাত পা যেনো পরিণত হলো বরফে।

®সারা মেহেক

#চলবে