ভালোবাসার রঙিন প্রজাপতি পর্ব-৪৪

0
1060

#ভালোবাসার_রঙিন_প্রজাপতি
#লেখনীতে:সারা মেহেক

৪৪

আদ্রিশের জখম অবস্থা দেখে আমি কিছুক্ষণের জন্য একদম অনুভূতি শূন্য হয়ে পরলাম। হঠাৎ বড় মামির ছোটখাটো এক আর্তনাদে হুঁশ ফিরলো আমার। আমি অসহায় চাহনিতে আদ্রিশের দিকে চেয়ে আছি। উনার কপালে আর বাম হাতে ব্যান্ডেজ করা। পরনের হালকা আকাশী রঙের শার্টটার অর্ধেকেরও বেশি অংশ জুড়ে রক্তে জর্জরিত। শার্টের হাতার অংশটুকু বেশ খানিকটা ছেঁড়া। উনার এ করুন অবস্থা দেখে কারোরই হয়তো বুঝতে বাকি রইলা না যে, উনি রাস্তায় বেশ বড়সড় এক্সিডেন্টের মুখোমুখি হয়েছেন।

বড় মামি আদ্রিশকে দেখে কোনোরকমে হেঁটে গিয়ে আদ্রিশকে জড়িয়ে ধরলো। এরপর বেশ জোরে জোরে নানারকম প্রলাপ বকে কান্না শুরু করে দিলো। এদিকে আমার কি হলো জানি না। পা দুটো হঠাৎ করেই অবশ হয়ে এলো যেনো। ফলস্বরূপ আমি দাঁড়িয়ে থাকতে পারলাম না। ধপ করে ফ্লোরে পড়ে যাওয়ার আগেই পাশ থেকে আভা আমাকে ধরে ফেললো। ভয়ার্ত কণ্ঠে বলল,
” এই আপু, কি হলো তোর?”

মূহুর্তেই সবার মবযোগ চলে এলো আমার উপর। আদ্রিশও করুন চাহনিতে আমার দিকে তাকালেন। সাথে সাথে আমার দুচোখ গড়িয়ে টপটপ করে নোনা জলের ধারা বইতে লাগলো। এ নোনাজলকে ব্যাথায় কাতর হৃদয়ের নিঃশব্দের অশ্রুধারা নামে আখ্যায়িত করা যেতে পারে।

আব্বু, আম্মু দ্রুত আমাকে ধরে উঠিয়ে নিলো। আম্মু বললো,
” হয়তো আদ্রিশের এ অবস্থা দেখে এমন হয়েছে ওর। ”

এবার বড় মামা হুট করে গলায় হাঁক ছেড়ে বললেন,
” আদ্রিশকে ওর রুমে নিয়ে চলো। তারপর সবটা শোনা যাবে। আর মিমকে নদীর রুমে নিয়ে যাও। মেয়েটার শরীরের অবস্থা হয়তো খুব একটা ভালো না। ”

বড় মামার কথা শেষ হতেই সবাই একে একে দরজার কাছ থেকে চলে আসতে লাগলো। আম্মু, আভা আর ছোট মামি আমাকে নিয়ে নদীর রুমে চলে এলো। আর বাকি সকলে আদ্রিশের সাথে আদ্রিশের রুমে চলে গেলো।
রুমে এসে আমাকে বিছানায় বসানোর পর ছোট মামি আমার দিকে এক গ্লাস পানি এগিয়ে দিয়ে বললো,
” পানিটা খেয়ে একটু রেস্ট নাও। শরীর হয়তো দূর্বল হয়ে গিয়েছে। আমি গিয়ে আদ্রিশের খোঁজখবর নিয়ে আসি।”

আম্মু বললো,
” আমিও আপনার সাথে যাই ছোট ভাবী। আভা এখানে থাকুক।”
এই বলে দু’জনে নদীর রুম থেকে বেড়িয়ে গেলো।

আমি দরজা উপর থেকে দৃষ্টি সরিয়ে ছোট্ট একটা নিঃশ্বাস ছেড়ে বিছানায় শরীর এলিয়ে দিলাম। আসলেই প্রচণ্ড দূর্বল বোধ করছি আমি।

কিছুক্ষণ পর, আভা আমার দিকে চেয়ে থেকে জিজ্ঞেস করলো,
” আপু? তখন কি হয়েছিলো তোর? ওভাবে পরে যেতে নিলি কেনো?”

আমি তৎক্ষণাৎ তার প্রশ্নের জবাব দিলাম না। বরং ক্লান্ত দৃষ্টিতে জানালা ভেদ করে বাহিরের দিকে তাকালাম। দুপুরের এ সময়ে এ রুমে এবং বাহিরে অদ্ভুত এক নিরবতা কাজ করছে। অথচ পাশের রুমে সে কি এক হট্টগোলের আওয়াজ! আসলে আদ্রিশের সাথে কি হয়েছিলো তা জানার জন্য হুট করে মরিয়া হয়ে উঠলাম আমি। কিন্তু এখন তো চাইলেও ঐ রুমে যাওয়া সম্ভব নয়।

আমি এবার আভার দিকে কয়েক সেকেন্ড চেয়ে থেকে বললাম,
” জানি না কি হয়েছিলো আমার। আদ্রিশের ওমন অবস্থা দেখে আমার ভেতরটা যেনো একদম ভেঙে চুরমার হয়ে গিয়েছিলো। শরীরে তখন বিন্দুমাত্র শক্তি অনুভব করতে পারছিলাম না। আমি উনাকে দেখে বেশ বড়সড় একটা শক খেয়েছিলাম। এজন্যই হয়তো পরে যাচ্ছিলাম তখন।
আচ্ছা, তুই একটু ঐ রুমে গিয়ে দেখ না, কি না কি হলো উনার সাথে।”

” আচ্ছা, যাচ্ছি। তুমি এবার রেস্ট নাও।”

আমি আলতো করে মাথা দুলিয়ে হ্যা সূচক জবাব দিলাম। আভা আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে রুম থেকে চলে গেলো৷ তার রুম থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পরপরই ক্লান্ত শরীর নিয়ে চোখ বন্ধ করে শুয়ে রইলাম আমি।

.

কখন যে ঘুুমিয়ে পরেছিলাম তা টেরই পায়নি আমি। হঠাৎ কিছু একটা পরার শব্দে হুট করে ঘুম ভেঙে গেলো আমার। বুকটা ধরফর করে উঠলো আমার। শোয়া অবস্থাতেই আশেপাশে তাকিয়ে নিজেকে ধাতস্থ করার চেষ্ট করলাম৷
কয়েক সেকেন্ড পর আস্তেধীরে বিছানা থেকে উঠে ওয়াশরুমে গেলাম। আয়নার দিকে তাকাতেই নিজেকে দেখে চমকে উঠলাম আমি। কান্নার ফলে দু-চোখ ফুলে একেবারে ঢোল হয়ে গিয়েছে যেনো। যদিও খুব বেশি একটা ফুলেনি। হয়তো কম ঘুমিয়েছি বলে।
বেশ ক’বার ভালোমত চোখেমুখে পানির ঝাপটা দিয়ে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে এলাম আমি। নদীর রুমে আপাতত কেউ নেই। হয়তো আদ্রিশের রুমেও কেউ নেই। যদি৷ কেউ৷ না থাকে তাহলে উনার সাথে সহজেই দেখা করা সম্ভব। এমনটা না হলে সঠিক সময়ের অপেক্ষা করা ছাড়া আর পথ খোলা থাকবে না।

আমি বেশ কিছু সময় ধরে দু’চোখ চেপে ধরে বসে রইলাম। এই আশায় যে, চোখ ফোলা ভাবটা হয়তো একটু কমে যাবে। সাথে চোখ খোলা বন্ধ করাটাও অতি সহজ হবে।
যখন চোখজোড়া মোটামুটি একটু স্বাভাবিক হয়ে এলো, তখন বিছানা ছেড়ে উঠে দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম আমি। বাহিরে উঁকি দিয়ে ডাইনিং এ কারোর উপস্থিতি না পেয়ে আলতো পায়ে আদ্রিশের রুমে ঢুকে পরলাম। রুমে পৌঁছানোর সাথে সাথে আমার দৃষ্টি চলে গেলো ঘুমন্ত আদ্রিশের উপর। সটান হয়ে কপালে হাত রেখে ঘুমাচ্ছেন উনি।
আমি চারপাশে সতর্ক দৃষ্টি দিয়ে আস্তেধীরে হেঁটে বিছানার কাছে গেলাম। কিছুক্ষণ আদ্রিশের দিকে চেয়ে থেকে ধীরেসুস্থে উনার পাশে বসে পরলাম

আদ্রিশের চোখেমুখে একটা মায়াময়ী ভাব খেলা
করছে। ঘুমন্ত অবস্থায় উনার চেহারার দিকে তাকালে মনে হবে, বড্ড নিষ্পাপ এক মানুষ উনি।
আমি কয়েক সেকেন্ড উনার দিকে চেয়ে রইলাম। এরপর আলতো হাতে উনার হাতটা কপালের উপর থেকে সরাতে নিলাম। তবে তার আগেই উনি চোখ খুলে বিস্মিত কণ্ঠে বললেন,
” মিশমিশ, তুমি এখানে!”

আমি খানিকটা ভড়কে গেলাম। আমতাআমতা করে বললাম,
” আ-আপনি ঘুমাননি?”

আদ্রিশ কিছু না বলেই হুট করে হাতে ভর দিয়ে শোয়া থেকে উঠতে নিলেন। কিন্তু সাথে সাথে ব্যাথায় কুঁকিয়ে উঠলেন উনি। উনার এ অবস্থা দেখে ভয়ে বুক কেঁপে উঠলো আমার। ব্যতি-ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞাস করলাম,
” ব্যাথা পেয়েছেন কোথায়? কি হয়েছিলো আপনার? এ অবস্থা কেনো? তাড়াতাড়ি বলুন প্লিজ।”

আদ্রিশ আমার গালে এক হাত রেখে দূর্বলভাবে হেসে বললেন,
” রিল্যাক্স মিশমিশ। সব বলছি। আমাকে হেলান দিয়ে বসতে একটু হেল্প করো। পুরো শরীর ব্যাথা আমার।”

আমি দ্রুত উনার পাশ থেকে একটা বালিশ নিয়ে খাটের সাথে হেলান দিয়ে রেখে দিলাম। এরপর উনাকে ধরে সেই বালিশের উপর হেলান দিয়ে দিলাম। উনি স্বাভাবিক হয়ে বসে পরতেই আমিও উনার পাশে বসে পরলাম। বেশ ভয় নিয়েই উনাকে জিজ্ঞাস করলাম,
” এবার বলুন। আপনার এ অবস্থা কি করে হলো? এক্সিডেন্ট করেছিলেন?”

আদ্রিশ আলতো করে মাথা দুলিয়ে বললেন,
” হুম। বেশ বড়সড় একটা এক্সিডেন্ট হয়েছিলো।”

এসব জানার পরও আদ্রিশের কথা শুনে আমার বুক ধক্ করে উঠলো। মূহুর্তেই কান্নায় গলা ভিজে এলো। তবে আদ্রিশের সামনে এখন কান্না করা যাবে না। এজন্য আমি যথাসম্ভব নিজেকে শক্ত রেখে জিজ্ঞাস করলাম,
” আপনার ফোনের কি হয়েছিলো? জানেন? কতবার ফোন দিয়েছিলাম আমি। কিন্তু একটা বারও আপনি ফোন রিসিভ করেননি৷ উল্টো শুনলাম আপনার ফোন বন্ধ। এটা শোনার পর আমার কত কি চিন্তা হচ্ছিলো তা বলে বুঝাতে পারবো না। আপনি……. ”
এটুকু বলতেই আমার দু’চোখ ভিজে এলো। এতো চেষ্টার পরও সেই কান্না চলে এলো। আদ্রিশের চোখকে ফাঁকি দিতে আমি দ্রুত মাথা নিচু করে ফেললাম।
কিছুক্ষণ পর আদ্রিশ আমার হাত নিয়ে নিজের হাতের মুঠোয় পুরে বললেন,
” এতো চিন্তা হচ্ছিলো আমার বউটার!”

আমি আস্তে করে মাথা তুলে বাচ্চাদের মত অভিযোগের সুরে বললাম,
” আমি এখনও আপনার বউ হয়নি।”

আদ্রিশ হালকা হেসে বললেন,
” হওনি৷ বাট কালকে তো হয়ে যাবে।”

” আচ্ছা,কালকে বিয়েটা না হলে কি খুব ক্ষতি হয়ে যাবে? আপনার শরীরের……..”

আদ্রিশ আমাকে মাঝপথে থামিয়ে দিয়েই আঁতকে উঠে বললেন,
” বিয়ে কালকেই হবে। এত প্রিপারেশন নেওয়া হয়েছে কি বিয়ে পিছানোর জন্য?”

” না তেমনটা না। আপনার শরীরের অবস্থা তো ভালো না।”

” কিচ্ছু হয়নি আমার। একদম ফিট এন্ড ফাইন। শুধু পুরো শরীরে ব্যাথা আরকি, এই তো। এজন্য কি আমি বিয়ে পিছিয়ে দিবো নাকি! বিয়ে আগামীকালই হবে। ফিক্সড এন্ড ফাইনাল।”

আদ্রিশের কথাবার্তা শুনে আমার আর বুঝতে বাকি রইলো না যে, আমি হাজারবার নিষেধ করা সত্ত্বেও উনি বিয়ে পিছিয়ে দিতে রাজি হবেন না।
আমি হাল ছেড়ে দিয়ে ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেললাম।

আমরা দুজনেই চুপচাপ বসে আছি। হঠাৎ আদ্রিশ বলে উঠলেন,
” হসপিটাল থেকে রাতেই বাস স্টেশনে পৌঁছাই। ২/৩ ঘন্টা বসে থাকার পর কাঙ্ক্ষিত বাসটা পাই। বাসে উঠার পর শুরুতেই আমি তোমাকে ম্যাসেজ করে জানিয়ে দিতে চেয়েছিলাম সব। কিন্তু পকেট থেকে ফোন বের করে দেখলাম, ফোন অফ। অনেকবার ট্রাই করার পরও অন করতে না পেরে বুঝলাম যে ফোনে চার্জ নেই। তখন ভাবলাম সকালে একেবারে গিয়েই সারপ্রাইজ দিবো তোমাকে। ”
এই বলে উনি কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইলেন। একটু পর আবারো বলা শুরু করলেন,
” বাস সিরাজগঞ্জ ঢুকবার কিছুক্ষণ আগে আমার ঘুম ভাঙে। এই সিরাজগঞ্জেই এক্সিডেন্ট হয়েছিলো। বাস আর ট্রাক মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এক্সিডেন্টটা মাঝারি ধরনের হয়। বাসের দুজন যাত্রী তখনই মারা যায়। কয়েকজনের অবস্থা অনেক করুন ছিলো। কিন্তু বেশিরভাগ মানুষের অবস্থা আমার মত ছিলো। অর্থাৎ খুব একটা ক্ষতি হয়নি।
এক্সিডেন্ট হওয়ার সাথে সাথে আমি জ্ঞান হারিয়েছিলাম। কিছুক্ষণের মাঝেই জ্ঞান ফিরতে দেখি আশেপাশে বেশ চিৎকার চেঁচামেচি হচ্ছে। দূর থেকে দেখলাম এম্বুলেন্স আসছে।
আমি কোনোরকমে নিজেকে ধাতস্থ করে উঠে দেখলাম এই বাম হাতটা একটু কেটে গিয়েছে। আর কপালের অংশ জ্বলছিলো বলে বুঝতে পেরেছিলাম যে কপালেও চোট পেয়েছি।

আমি কিছুক্ষণ স্থির থেকে সবাইকে হেল্প করার জন্য উঠে পরলাম। যেহেতু আমার অবস্থা খুব একটা খারাপ ছিলো না, সেহেতু এজ এ ডক্টর আহতদেরকে হেল্প করা আমার কর্তব্য। ব্যস, এই ভেবে যতটুকু পেেরছি সবাইকে হেল্প করে শেষের এম্বুলেন্সে হসপিটালে পৌঁছাই। সেখান ডক্টররা ব্যান্ডেজ করে দেয়। আর বলে রেস্ট নিতে। তবে আমি সেখানে থাকতে চায়নি। এজন্যই পরে কষ্ট করে হলেও ভেঙে ভেঙে বাকি পথ এসেছি।”
এই বলে আদ্রিশ এক দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন।

এদিকে কখন থেকে যে আমার চোখ দিয়ে টপটপ করে নিরবে পানি ঝরছে তা জানা ছিলো না। উনার কথা বলা শেষ হতেই তা বুঝতে পারলাম।

আদ্রিশ হালকা হেসে এক হাত দিয়ে আমার চোখের পানি মুছে দিয়ে বললেন,
” এতো কাঁদো কেনো তুমি?”

আমি ভেজা গলায় বললাম,
” ছোট থেকেই আমি অনেক আবেগপ্রবণ মানুষ। খবরে, পেপারে এসব এক্সিডেন্টের কথা শুনার পর খুব ভয় করতো। মাঝেমধ্যে একটু পানিও জমতো চোখে। আর সেখানে আপনি সরাসরি এক্সিডেন্ট ফেস করেছেন, তো কাঁদবো না আমি!”

আদ্রিশ আমার কথা শুনে মুখ লুকিয়ে হেেস ফেললেন। আমি চোখমুখ কুঁচকে অভিযোগের কণ্ঠে বললাম,
” এতে হাসার কিছু নেই। যদি আপনার বেশি কিছুু হয়ে যেতো তখন আমার কি হতো, একবারো ভেবে দেখেছেন?”

আদ্রিশ আবারো হালকা হেসে দিলেন। উনার এ হাসি মোটেও সহ্য হলো না আমার। আমি এবার রাগান্বিত কণ্ঠে বললাম,
” এতো হাসি কোথায় পেলেন হুম? আর একবারো যদি হেসেছেন তো আপনার মুখে স্কচটেপ মেরে বসিয়ে রাখবো।
আমার জায়গায় আপনি থাকলে বুঝতেন কতটা টেনশনে ছিলাম আমি৷ এমনিতেই মাহা…….”
হঠাৎ মাহার কথা উঠতেই চুপ হয়ে গেলাম আমি। মাহা’র ব্যাপারটা মনে আসতেই তাড়াহুড়ো করে আদ্রিশকে জিজ্ঞাস করলাম,
” যে কারনে ঢাকা গিয়েছেন সে কাজ হয়েছে?”

আদ্রিশ ঠোঁটের কোনে সেই মনোমুগ্ধকর হাসি ফুটিয়ে হ্যা সূচক জবাব দিলেন। সাথে সাথে খুশিতে আমার চোখজোড়া চকচক করে উঠলো। বিরবির করে বললাম,
” আলহামদুলিল্লাহ। ”

আদ্রিশ আমার দিকে চেয়ে আবারো আমার হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বললেন,
” মাহা’র ঘুম ভাঙার পরপরই ওর সাথে কথা বলতে যাই। প্রথম প্রথম অনেক বুঝানোর পরও ও বুঝতে রাজি হলো না। পরে কষ্টেসৃষ্টে কোনোরকমে বুঝিয়ে সেখান থেকে বেরিয়ে এলাম। বশির স্যার আমার পিছুপিছু এসে সবকিছুর জন্য ক্ষমা চাইলেন আমার কাছে। বললেন, আজকে দুপুরের ফ্লাইটেই মাহা আর উনি আমেরিকায় চলে যাবেন। সেখানে মাহা’র ফুফুরা থাকে। বশির স্যারের বিশ্বাস, মাহা সেখানে থাকলে আমার ব্যাপারটা সম্পূর্ণ ভুুলে যাবে৷ আর বিয়ে হলে তো কথাই নেই। ব্যস, তখনই খুশি খুশি মন নিয়ে সেখান থেকে বেরিয়ে এলাম। ”

মাহা নামক ঝামেলা আমাদের দুজনের জীবন থেকে চিরতরে দূর হয়ে গিয়েছে, এই সুসংবাদ নিজেকে বোঝাতে খানিকটা সময় লাগলো আমার। তবে এটা বোঝার পর যে খুশি অনুভব করলাম, তা বলে বুঝানো সম্ভব নয় আমার পক্ষে।

হঠাৎ আদ্রিশের দিকে তাকাতেই উনার শরীর ব্যাথার কথা মনে পরলো৷ তৎক্ষনাৎ আমি বলে বসলাম,
” আপনি রেস্ট নিন। আমি আসছি।” এই বলে আমি উঠতে নিলাম। কিন্তু আদ্রিশ আমার হাত ধরে আমাকে আটকে রাখলেন। আবারো উনার পাশে বসতে ইশারা করলেন।
আমি উনার পাশে বসতেই উনি খানিকটা চিন্তিত কণ্ঠে জিজ্ঞাস করলেন,
” তখন তোমার কি হয়েছিলো? ওভাবে পরে যাচ্ছিলে কেনো?”

আমি ছোট্ট একটা নিঃশ্বাস ফেলে বললাম,
” প্রথমে গিয়েই আপনার শার্টে অতো রক্ত দেখে আমি একদম অনুভূতি শূন্য হয়ে পরেছিলাম। কয়েক সেকেন্ডের জন্য ভেবেই নিয়েছিলাম আপনার বড় কিছু হয়ে গিয়েছে। যদিও এমন কিছুই হয়নি৷ কিন্তু ঐ যে, আপনার জন্য টেনশন করতে করতে নানারকম উল্টাপাল্টা জিনিস ভেবেছিলাম। এজন্যই আপনার শার্টে এত রক্ত দেখে আমার হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে এসেছিলো। আর শরীর একটু দূর্বল থাকায়, হঠাৎ করে পা অবশ হয়ে আসার জন্য পরে যেতে নিয়েছিলাম। ”

আদ্রিশ আমার দিকে মায়াভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন,
” তোমার অমন অবস্থা দেখে বেশ ভয় পেেয় গিয়ছিলাম৷ তোমার কাছে যে তখনই এগিয়ে যাবো, সে শক্তিটুকুও শরীরে ছিলো না। ”

আমি এবার উনার কথার প্রত্যুত্তরে কিছু না বলে চুপ করে রইলাম। উনি মৃদু হেসে বললেন,
” এক্সিডেন্টে একজনের মাথা ফেটে রক্ত ঝরছিলো। তাকে কোলে নিয়ে এম্বুলেন্স পর্যন্ত পৌঁছাতেই এ রক্ত আমার শার্টে ভরে যায়।”

” আচ্ছা। সব বুঝলাম৷ আপনি এবার রেস্ট নিন। ব্যাথার ওষুধ খেয়েছেন তো?”

” হুম খেয়েছি।”

” গুড। এবার ভদ্র ছেলের মত ঘুমিয়ে পরুন। আমি এখন উঠি। আমার চাচিরা আমাকে এ রুমে দেখে ফেললে খারাপ ভাবতে পারে।”
এই বলে আমি আদ্রিশের পাশ থেকে উঠে উনাকে শুয়ে পরতে সাহায্য করলাম।
উনাকে শুইয়ে দিয়ে চলে আসতে নিলেই আবারো উনি আমার হাত ধরে ফেললেন। আমি ভ্রু উঁচিয়ে উনার দিকে তাকাতেই উনি জিজ্ঞাস করলেন,
” আজকে মেহেদী নিবে না?”

” কি জানি। নিলেও নিতে পারি।”

” এই, এতো হেলাফেলা চলবে না৷ মেহেদী তো অবশ্যই নিবে। ”

” আচ্ছা নিবো। ”

” সেখানে আমার নামও লিখবে কিন্তু। ”

” আচ্ছা আচ্ছা লিখবো। একদম পুরো হাত জুড়ে শুধু আপনার নাম লিখেই বসে থাকবো।”
এই বলে আমি ফিক করে হেসে দিলাম। আমার সাথে আদ্রিশও যোগ দিলেন।

®সারা মেহেক

#চলবে