#ভুলিনি_তোমায়?
#Nishat_Tasnim(ছন্দনাম)
#পর্ব :৯
সাড়ে ১৭ বছর বয়সে হঠাৎ করে নিজের আপন মা কে দেখে অবাক হয়ে গেলাম,,ভাবলাম হয়তো দেখার ভুল,কিন্তুু মোটেও এমন না।
সেই ছোট্ট চার বছর বয়সে দেখেছিলাম, আর আজ এত বছর পর দেখলাম।
মা কে চিনতে একটুও ভুল হয় নি,হ্যা আমি ঠিকই চিনেছি, উনি আমার মা।
কিন্তুু উনি একা নয় সাথে দুইটা বাচ্চাও আছে।হয়তো উনার বাচ্চা।
উনি ছোট ছেলেটাকে চিপস খাওয়াচ্ছে আর বড় মেয়েটা উনার পাশে বসে মোবাইল দেখতেছে।
উনি একটু পর পর মেয়েটার মুখে খাবার দিচ্ছেন,আর মেয়েটাকে কী কী যেনো বলছে।
পাশের টেবিল থেকে আমি সব ঠিকই দেখতেছি।
কেনো জানি এ দৃশ্য দেখে খুব খারাপ লাগলো,আমাকে তো কোনোদিন এমন খাইয়ে দেন নি।
আমি নিবিড়ভাবে উনাকে পর্যবেক্ষণ লরতে লাগলাম।
না দেখতে ঠিক আগের মতোই আছেন,শুধু চেহারাতে আগের লাবন্যটা নেই।
আগের থেকে একটু মোটাও হয়েছেন।
এত বছর পর মা কে দেখে তৃপ্তি ভরে দেখতে লাগলাম।
হঠাৎ করেই উনি আমার দিকে তাকালেন,আমাকে উনার দিকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে ভ্রু নাচিয়ে জিজ্ঞাস করলেন কী?
আমি হকচকিয়ে গেলাম,হালকা হেসে বললাম,, কিছু না।
তখনই আমার চোখ দিয়ে দুই ফোটা পানি গড়িয়ে পড়লো।
উনি আমাকে সাথে সাথে উনার কাছে ডাকলেন।
আমি হাতের উল্টোপিঠ দিয়ে পানি মুছে ফেললাম।
নিজেকে যথা সম্ভব স্বাভাবিক দেখে উঠে দাড়ালাম।
যতই আমি উনার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলাম ততই আমার শরীরের কাঁপুনি বাড়তে লাগলো।
পিছন থেকে কেয়া আপু আমাকে ডাক দিয়ে বললেন,”কই যাচ্ছিস?”
আমি ইশারায় মা কে দেখিয়ে বললাম,,”উনার কাছে যাচ্ছি।”
আসলে সেদিন এহসান ভাইয়ার সাথে ওমন অবস্থায় কেয়া আপু আমাকে দেখে ফেললেন।আপু আসতেই এহসান আমাকে ছেড়ে দিলেন,তারপর আমার কানে কানে ফিসফিস করে বলে উঠলেন,,,”আমি যদি কাউকে কিছু বলি,তাহলে উনি আমার সেদিনের উল্টা বোরকা পড়া পিক ফেসবুকে আপলোড দিয়ে দিবেন।”
কত বর শয়তান আমার ওইদিনের পিকও তুলছে।
তারপর আমি আর কাউকে কিছু বলি নি, কেয়া আপুকে অন্য কথা বলে বুঝিয়ে দিয়েছি।
আজকে কলেজ থেকে ফিরার পথে আপু জোর করে বড় হোটেলে নিয়ে আসলেন।
আমিও আপুর সাথে না পেরে আসলাম।
আপু খাবার ওর্ডার দিতে গেলেন ঠিক সে সময় আমি গুনগুন করতে করতে পাশে তাকালাম আর তাকাতেই এমন দৃশ্য দেখলাম।
উনার সামনে এসে কাঁপা কাঁপা গলায় বললাম,,”কিছু বলবেন,আন্টি?”
কী অদ্ভুদ তাই না?আজ নিজের আপন মা কে আন্টি ডাকতে হচ্ছে।
উনি কেমন রুডলি বলে উঠলেন,,”আন্টি কেনো ডাকতেছো?কল মি মেডাম।আমি তোমার মত মিডল ক্লাসদের আন্টি নই।”
আমি সচেতন চোখে উনার দিকে তাকালাম, উনার মুখ ভঙ্গি দেখে মনে হলো,উনি আমার উপর চরম বিরক্ত।
আমি কোনোরকম বলে উঠলাম ,,”জ্বি,জ্বি,মেডাম।আমাকে ককী কিছু বববলবেন?””
উনি সোজা হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,,”তোতলাচ্ছো কেনো?আর তোমাকে কিছু বলবো বলেই তো ডেকেছি।এটা বলো,তুমি আমার ছেলেমেয়েদের খাবারের দিকে ওমন ভিখারীর মতো তাকিয়ে ছিলে কেনো?নজর কেনো দিচ্ছিলে?ওদের যদি পেট খারাপ করে?”
আমি অবাক হয়ে টলমল চোখে উনার দিকে তাকালাম,কতটা নিচু মনমানসিকতা উনার।
উনি এক পিস বার্গার আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন,,”টাকা পয়সা নাই তো এত বড় হোটেলে আসছো কেনো?এই নেও এটা খেয়ে নেও। আর কারো দিকে এমন কু দৃষ্টিতে তাকিয়ো না।”
এবার আমার সত্যি খুব খারাপ লাগতে লাগলো।
ঠোঁট কামড়ে চোখের জল আটকানোর চেষ্টা করতেছি। কিন্তুু বেহায়া চোখ মানলো না।
অন্য কারো কাছ থেকে এসব শুনলে হয়তো এত দুঃখ লাগতো না,কিন্তুু নিজের আপন মা দেখে হয়তো দুঃখ বেশি লাগতেছে।
কেয়া আপু এতসময় সব শুনছিলেন,কিন্তু শেষের কথা শুনে আপু রেগে গেলেন।
আপু নিজের হাতের দুইটা বার্গারই উনার প্লেটে দিয়ে বললেন,,,”আসলে আন্টি ও আপনার দিকে ওমনভাবে তাকিয়ে ছিলো, কারন আপনারা দুইটা বার্গার তিনজনে মিলে খাচ্ছেন তাই।
ও ভেবেছে হয়তো আপনাদের টাকা নাই,তাই আমাকে এগুলো আনতে বলেছে আপনাদের দিতে।
এই নিন,আর ফারদার কাউকে কিছু বলার আগে নিজের দিকে তাকিয়েন।
নিজেরা তো ফকির আবার আসছে অন্যদের এসব বলতে।”
আপু আরো কত কথা উনাকে শুনিয়ে দিয়ে আমাকে টানতে টানতে নিয়ে আসতে লাগলেন।
আমার মা এর মুখটা রাগে লাল হয়ে গিয়েছিলো,,আমার দিকে ফোসফোস করে আমার দিকে তাকিয়ে কীসব বলতে লাগলেন আর আমি উনার দিকে অপলকভাবে তাকিয়ে রইলাম।
কত বছর পর মা কে দেখলাম,কত অপেক্ষা করেছিলাম এ মা এর জন্য।
এত বছর পর দেখেও মা বলে ডাকতে পারলাম না,,,খুব ইচ্ছে করছিলো মা বলে ডাকতে।
কিন্তুু মা তো আমাকে চিনতেই পারলো না,উল্টা আমাকে বাজে কথা শুনিয়ে দিলো।
মা মনে হয় খুব সুখে আছে,শুধু আমি আর বাবাই দুঃখে আছি।
কিছু মানুষ এমনও থাকে যে অন্যের সুখ কেড়ে নিয়ে নিজেরা সুখে থাকে।
এদিকে কেয়া আপু আমাকে বকতে বকতে নিয়ে যেতে লাগলো।
বাসায় ডুকতেই বাবাকে দেখলাম সোফায় বসে টিভি দেখতেছে।
আমি কোনো কথা না বলে চুপচাপ গিয়ে বাবাকে জরিয়ে ধরে ফুফিয়ে কেঁদে দিলাম।
হঠাৎ করে এমন হওয়াতে বাবা হকচকিয়ে গেলেন।
বাবা একহাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে অন্যহাতে রিমোট দিয়ে টিভি বন্ধ করলেন।
আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে নরম স্বরে বলে উঠলেন,,”কী হয়েছে আমার মায়ের?আমার স্ট্রং মেয়ে কেনো কান্না করতেছে?আমার মেয়ে তো কান্না করে না,তো হঠাৎ কী হলো যে আমার বাবাই কান্না করে দিলো?
বাবার কথা শুনে আমার কান্নার বেগ আরো বেড়ে গেলো।বাবার বুকে মাথা রেখে অস্ফুটস্বরে বলে উঠলাম,,,”বাবা আমি আমি মা,মা, মা..”
আজ এত বছর পর হঠাৎ করে আমার মুখে মায়ের কথা শুনে বাবা থমকে গেলেন।বাবা কোনোরকম আমার মাথা তুলে কাঁপা কাঁপা গলায় বললো,,,”হ্যা,,,বল।মা কী?””
চলবে,,,,,