#মনের_গহিনে (৫)
Sarika Islam(mim)
ইয়াদ রাহাতের কথায় উঠে দাড়ালো বড় কাচের গ্লাস ভেদ করে বাহিরের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলল,
-নাহ তেমন কিছুই না।শুধু ভাবছি ফারাহর কথা।
রাহাত ইয়াদের পাশে দাঁড়িয়ে কাধে হাত রেখে বলল,
-বিয়ে হলে নাকি স্বামি স্ত্রীর এইভাবেই ভালোবাসা হয়ে যায়।তো এত চিন্তা করার কিছুই নেই দেখবি সব ঠিক হয়ে যাবে।
-এইটারই অপেক্ষায় আছি।
ইয়াদ কাজের মধ্য মন দিল।
————
ইয়াদের খালা বোন সব আজ চলে গেছে সোনিয়ার পুরো বাড়িতে খুবিই বোরিং লাগছে যদি এখন ফারাহ থাকতো?এই ভেবে ফারাহকে কল করবে তখনি কেউ এসে সোনিয়ার কান থেকে ফোন ছিনিয়ে নিল।সোনিয়া পিছ ফিরে আম্মুকে দেখে ঘাবড়ে গেল।সে এইখানে কেন?সুহানা বেগম ফোন হাতে নিয়ে বলল,
-ফারাহকে কেন কল করছিস?ও না আসলেই শান্তি।
-এইভাবেই ভালো লাগছিল না তাই ভাবলাম ভাবীকে একটু কল করি।
-শোন এই ভাবীর প্রতি এত্ত ভালোবাসা দেখার দরকার নেই যাহ পড়তে বস।
সোনিয়া মাথা নেড়ে নিজের রুমে গেল পড়তে।ইন্টার ফার্স্ট ইয়ারে এইবার প্রচুর পড়তে হবে।
————–
সকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা হয়েছে আম্মুর কাছেই আছি।চাচা চলে গিয়েছে নীলাপুর এখনো আসার খবর নেই আম্মুকে একটু পরই ডিসচার্জ করবে।আম্মুকে ডাক্তার দেখে গিয়ে রিলিজ করলো আমরাও বের হতে যাবো তখনি ইয়াদের আগমন।সে ঠিক তার কথা অনুযায়ী আমাকে নিতে এসেছেন।তাকে দেখে মনের গহিনে অজান্তেই ভালো লাগা কাজ করলো।তুর্য আর আমি আম্মুকে সাইড দিয়ে ধরে নিচে নামালাম।ইয়াদ বলল,
-আন্টি আমার গাড়িতে উঠুন আমি পৌছে দেই?
আম্মু না করে দিল।কিন্তু ইয়াদের জোরাজুরিতে বসতেই হলো।আম্মু পিছনে সাথে আমি আর দাদী আর ভাইয়া সামনে ইয়াদের পাশে।বেশ কিছুক্ষন পর বাড়ির সামনে এসে গাড়ি থামলো।আম্মুকে ধরে আস্তে বের করলাম তখনি আমাদের সামনে নীলা আপু এসে দাড়ালো।তাকে দেখে সবাই তার উপর দৃষ্টি আকর্ষণ করলাম।ইয়াদও কেমন এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে নীলাপুর দিকে।নীলাপুও তাকিয়ে আছে আমি শুধু ইয়াদের দিকে তাকিয়ে আছি তার রিয়েকশন দেখার জন্য।
ইয়াদ নীলাপুর দিক থেকে চোখ সরিয়ে আম্মুর উপরে দিল।তাকে সুন্দরভাবে বাড়ির ভিতরে ঢুকালাম।সোফায় বসিয়ে পানি আনতে গেলাম নীলাপুও আমার সাথে আসলো।দাদী নিজের কামরায় চলে গেল অনেক দুর্বল লাগছে তুর্য ভাইয়া আম্মুর পাশে বসা ইয়াদও।আমি শরবত বানিয়ে নিয়ে এলাম।আম্মুকে দিলাম ইয়াদকে দিতে যাবো আমার আগেই নীলাপু গ্লাস ধরে ইয়াদের দিকে এগিয়ে দিল।ইয়াদ নিচের দিকে তাকিয়ে গ্লাস ধরলো।
ইয়াদ ঢকঢক করে এক চুমুকেই পুরো শরবত শেষ করে উঠে দাড়ালো।
-আন্টি আমরা এখন আসি!
নীলাপু মাঝ দিয়ে বলল,
-আরেকটু থাকো?
ইয়াদ নীলাপুর দিকে এক পলক তাকিয়ে আম্মুর দিকে তাকালো।আম্মু সোজা হয়ে বসে দুর্বল গলায় বলল,
-আচ্ছা বাবা যাও।
ইয়াদ আমাকে আসতে বলে সে বাহিরে চলে গেল।আমি আম্মু ভাইয়া সবার থেকে বিদায় নিয়ে বাহিরে আসলাম।ইয়াদ গাড়ির মধ্য হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে আমাকে দেখে গাড়ির দরজা খুলে দিল।আমি ইয়াদের দিকে তাকিয়ে ভিতরে বসলাম।আচ্ছা নীলাপুকে দেখে কি ইয়াদ ডিস্টার্ব ফিল করছে নাকি ভালোলাগা কাজ করছে?কোনটাই আমার জানা নেই।ইয়াদ একমনে গাড়ি চালাচ্ছে আমি ইয়াদের দিকে তাকিয়ে ভাবনার সাগরে গড়াচ্ছি।
কিছুক্ষন পর বাড়ির গেটের সামনে গাড়ি থামলো।দারোয়ান আংকেল বড় গেট খুলে দিলেন গাড়ি ভিতরে ঢুকিয়ে পার্ক করলো।আমি গাড়ি থেকে নেমে তার সাথেই ভিতরে ঢুকলাম।কলিং বেল বাজাতেই কিছুক্ষন পর এসে সোনিয়া দরজা খুলে দিল।আমাকে দেখে সোনিয়া উত্তেজিত কন্ঠে বলল,
-ভাবী কোথায় ছিলে সারাদিন?
-আম্মুর শরির ভালো ছিল না সেখানেই ছিলাম।
-ওহ, এখন সুস্থ?
-হুম কিছুটা।
পাশেই সোফায় বসে সুহানা আন্টি বলল,
-ভিতরে ঢুকা বাহিরেই সব আলাপ পারবি নাকি?
আমি ভিতরে প্রবেশ করে আন্টিকে সালাম দিলাম।আন্টি মুখ ফিরিয়ে নিল আদো কি উত্তর নিল আমার জানা নেই।ইয়াদ ঢুকেই উপরে চলে গেল আমিও উপরে আসলাম।বাসা থেকে আসার সময় নিজের কিছু জামা নিয়ে এসেছিলাম না হয় কি পরবো না পরবো।ব্যাগ থেকে একটা থ্রিপিস বের করলাম সারাদিন এই শাড়িতে হাপিয়ে গেছি আমি।
ইয়াদ আয়নার সামনে দারিয়ে টাই খুলল শার্টের বোতাল খুলে ওয়াশ্রুমে যাবে তখনি ফারাহর হাতে থ্রিপিস দেখে ভ্রু কুচকে এলো।
-জামা পেলে কোথায়?
-বাড়ি থেকে এনেছিলাম।
-ওহহ আজকে তো শপিং এর কথা ছিল আসলে আমি সত্যিই দুঃখিত।এত কিছুর মাঝে ভুলেই গিয়েছিলাম।
-ইটস ওকেহ কোন সমস্যা নেই।
-কাল যাবো শিওর।
ওয়াশ্রুমের দিকে যেতে যেতে বললাম
-দরকার নেই আপাতত এগুলো দিয়েই চলবে।
ইয়াদের কাছে ব্যাপারটা খুব খারাপ লাগলো।নিয়ে যাবে বলেও সে ভুলে গেল?এতটা কেয়ারলেস সেতো আগে ছিল না!!নিজের করা সামান্য ভুলও যেন তার কাছে অনেক বড় লাগছে।ফারাহর সব জামা কাপর ব্যাগ থেকে বের করে আলমারির এক সাইডে রাখলো।ফারাহ ততক্ষনে বের হয়ে গিয়েছে।ইয়াদকে তার জামা নিতে দেখে দ্রুত পায়ে তার সামনে গিয়ে দাড়ালো।
-একি করছেন?
ইয়াদ হঠাৎ ফারাহকে দেখে হচকচিয়ে গেল।তার হাতে ধরা ফারাহর জামা কাপড় সোফার উপরে রেখে দিল।
-আল্মারিতে রাখার জন্য উঠিয়েছিলাম।
বলে টাওয়াল নিয়ে ওয়াশ্রুমে চলে গেল।আমি মনে মনে হাসলাম রাখার ছিল তাহলে রাখতো রেখে দেওয়ার কি ছিল!!এক গাল হেসে নিজেই রাখতে গেলাম। এক সাইড করে সুন্দর ভাবে গুছিয়ে রেখেছেন আমার জামাগুলো।পুরো আলমারিটাই পরিপাটি ভাবে গোছানো।আর আমরা মেয়ে হয়ে কতটা অগোছালো।আমার আলমারির কথা হুট করে মনে পরলো আর হাসতে লাগলাম।
ইয়াদ টাওয়াল দিয়ে চুল মুছতে মুছতে বের হলো এশ কালারের একটা টি-শার্ট আর টাউজার পরে।ফারাহকে আলমারির সাইড থেকে হাসতে দেখে ভ্রু কুচকে তার সামনে গিয়ে দাড়ালো।
-একা একা হাসছো যে?
আমি ঘুরে তাকিয়ে দেখলাম ইয়াদ ভেজা চুলে দাঁড়িয়ে আছে এশ কালারের রঙ টা বেশ মানিয়েছে।চুলগুলো কপালে পরে আছে চোখের চশমাটা সব মিলিয়ে বেশ সুন্দর লাগছে।গোসলে যেন তার সৌন্দর্য ফুটে উঠেছে।
ফারাহ উওর না দেওয়ায় ইয়াদ ফারাহর মুখের সামনে তুড়ি বাজালো।
-কিছু জিজ্ঞেস করেছি।
ইয়াদের তুড়িতে হচকচিয়ে উঠলাম।এতক্ষন তার দিকে তাকিয়ে ছিলাম কি লজ্জাজনক ব্যাপার কি ভাব্বে এখন ইয়াদ আমার ব্যাপারে?ইয়াদের সামনে থেকে বিছানার ধারে এসে দাড়ালাম।ইয়াদ ঘুরে আবারো একিই প্রশ্ন করলো।আমি বললাম,
-এভাবেই।
ইয়াদ আমার কাছে এসে ভ্রু কুচকে বলল,
-এইভাবেই কি কেউ হাসে নাকি?আরেকবার একটু হাসো দেখি?
ইয়াদের করা এমন প্রশ্নে আমার মুখ হা হয়ে গেল।এইটা কি বলল হাসার সময় কেউ যদি আবার হাসতে বলে তাকিয়ে থেকে তখন ঠোঁট প্রসারিত হয়ে হাসি এভাবেই চলে আসে।আমি মুখে হাত দিয়ে বললাম,
-এভাবেই কি হাসা যায় নাকি?
-তুমি না বললে এইভাবেই হাসছিলে?তাহলে এখন একটু হাসো?
ওড়নার কোন দিয়ে মুখ ঢেকে হাসতে লাগলাম ইয়াদের কান্ড দেখে।ইয়াদও এক গাল হাসলো।কেউ দরজায় কড়া নারালো ইয়াদ গিয়ে খুলে দিল।আমি শাড়ি বারান্দায় মেলতে গেলাম।
সুহানা বেগম ছেলেকে এইভাবে হেসে দরজা খুলতে দেখে কিছুটা মুখ কুচকালো।মোটেও এই জিনিসটা তার ভালোলাগলো না।ভিতরে ঢুকে ফারাহকে না দেখে মুখ কালো করেই বলল,
-ফারাহ কোথায়?
আমার নাম উচ্চারিত হওয়ায় আমি বারান্দা থেকে বেরুলাম।আমার দিকে সুহানা আন্টি এগিয়ে এসে দাড়ালেন। আমার বুক ঢিপঢিপ করতে লাগলো চড় পরবে নাকি গালে এখন?কিন্তু সে তার হাতে থাকা কিছু জিনিস আমার হাতে ধরিয়ে দিল।আমি ভালোভাবে দেখে বুঝলাম ডায়মন্ড এর একটা নাকফুল,স্বর্নের একটা গলার চেন আর একটা আংটি।আমি এইসব দেখে আন্টির দিকে তাকালাম।সুহানা আন্টি ঠিকভাবে তাকায়ও না আমার দিকে।মুখ আকুপাকু করে বললেন,
-এইগুলো সব পড়ে নিও নতুন বউয়ের চিহ্ন স্বরুপ।
আমি অসহায়নিয় ভাবে আন্টির দিকে তাকালাম।নোসপিনটা হাতে নিয়ে বললাম,
-আন্টি আমারতো নাক ফুরানো নেই।
-কাল পার্লারে গিয়ে ফুরাবে।
বলেই চলে গেল।আর আমি এক অসহানিয় প্রানী সেগুলো হাতে নিয়ে বিছানায় বসে পরলাম।
ইয়াদ লেপটপটা নিয়ে সোফায় বসেছিল ফারাহর চেহারার এমন বারোটা বাজা দেখে জিজ্ঞেস করলো,
-কি হয়েছে?
ফারাহ মুখ তুলে ইয়াদের দিকে তাকালো।নোসপিনটা হাতে নিয়ে বলল,
-এইটা না পরলে হয়না?বাকি গুলো পরি?
-আম্মু আমার রেগে যাবেন।
-আমার খুব ভয় লাগে।
-কেন?(ভ্রু কুচকে)
-পার্লারে গিয়ে নাক আমি ফুরাবো না।
বলেই চোখ মুখ কুচকে বন্ধ করে নিল ফারাহ।ইয়াদের ফারাহ মুখ দেখে হেসে ফেলল।ফারাহর কাছে এসে টাউজারের পকেটে হাত দিয়ে বলল,
-তুমি সেই ফারাহ না যে কিনা তার আপুর জায়গায় নিজে বিয়ে করে ফেলেছে তাও আবার না জানিয়ে?
ইয়াদের ঠেস মারা কথায় আমি মাথা তুলে তার দিকে তাকালাম।এক গাল হেসে কথাটা বলল আমার পুরো মনের ভিতরে গিয়ে বিধলো কথাটা।মুখ কালো করে বললাম,
-খোচা মারছেন?
-আমি বুঝাচ্ছি যে তুমি সেই ফারাহ হয়ে সামান্য জিনিসে ভয় পাও?
আমার মনটা এইভাবেই নোসপিন দেখে খারাপ হয়ে গেল।আবার ইয়াদের এইরুপ কথায় আমার মন পুরো ভেংগে গুড়াগুড়া হয়ে গেল।সেইখান থেকে উঠে বিছানার এক পাশে গিয়ে চুপচাপ শুয়ে পরলাম।
ফারাহর হঠাৎ উঠে গিয়ে শুয়ে পরা ইয়াদ মোটেও বুঝতে পারলো না।একদিনে ফারাহকে যা বুঝেছে খুবিই চঞ্চল স্বভাবের মেয়ে।কিন্তু কি হলো যে এইভাবে চলে গেল?ইয়াদও আর কিছু না জিজ্ঞেস করে সোফায় চলে গেল লেপটপে কিছু কাজ করতে।
চলবে,
(ভুল ত্রুটিগুলো ক্ষমার চোখে দেখবেন।)