মনোভূমির ছায়া পর্ব-৩৬ এবং শেষ পর্ব

0
460

#মনোভূমির_ছায়া
পর্ব – ৩৬
#মাহীরা_ফারহীন

নিনা কোন উত্তর না দিয়ে হেসে উঠল। ইভান ওর দিকে হতাশ ভাবে তাকাল। বলল,
‘হুম খুব মজার বিষয় না? আসো তোমাকে এখন কোলে করে তুলে নিয়ে যাই। তাহলে আরো মজা হবে।’ বলেই ওর দিকে এগিয়ে গেল। নিনাও ফট করে দূরে সরে গেল। নিনার হাসিই থামছে না। অবশেষে ইভানও হেসে উঠল। বলল,
‘আরে ভাই আমরা এখন কী করব কোন ধারণা আছে?’

‘কী আর? এত বড়ও গ্রাম না। হেঁটে ফিরে যাওয়া যাবে।’

‘হুম! আর ভাড়ার সাইকেলটা যে গেল সেটার পুরো দামটা তো তোমার বাবা দিবে তাই না?’

‘ওটা পরে দেখা যাবে। আসো আমরা হাঁটতে থাকি নাহলে এই নির্জন মাঠঘাটের মাঝেই আঁটকে পরে থাকব।’ বলেই ইভানের বাহু আঁকড়ে ধরল৷ ইভান দীর্ঘশ্বাস ফেললো৷ বলল,
‘বাট সালার গার্লফ্রেন্ড না কে আল্লাহই জানে ওদিকে কাঁদছে আর সে চুরি করতে ব্যস্ত? আশ্চর্য!’

‘আমার তা মনে হয় না। মেয়েটাকে ধরার জন্যেই তাড়াহুড়ো করে সাইকেলটা নিয়ে গেছে।’

ইভান শ্রাগ করল। ওরা রাস্তা ধরে হাঁটতে থাকল ধীরে সুস্থে।
এক জায়গায় এসে দেখা গেল দুপাশে শুধু ঘনঘন গাছপালা। মাথার ওপর অচেনা গাছের ঝাকড়া ডালপালা দিয়ে সবুজ ছাউনি তৈরি হয়েছে। নিনা বলল,
‘আচ্ছা শোন।’

‘হুম সুইটহার্ট।’

‘আহ এটা বলবা না।’

‘কেন?’ ইভান ওর দিকে একটা ভ্রু উঁচু করে জিজ্ঞেস করল।

নিনা অপ্রতিভ ভাবে বলল,
‘আমার ভালো লাগে না।’

‘তাহলে কী ভালো লাগে ডার্লিং?’ আমুদে স্বরে বলল।

‘এটা।’

‘কোনটা?’

‘ডার্লিং তুমি বুঝতেস না?’ এবার নিনা নাটকীয় ভাবে বলল।

ইভানের গালে পুনরায় সেই লালচে আভা ফিরে এলো। এবার সে লজ্জায় মুখ দিয়ে হাত ঢাকল। নিনা ওর মুখ থেকে হাত টেনে সরিয়ে বলল,
‘ইশ কী যে কিউট লাগছে!’

‘তাই না?’

‘হুম দেখেছো তোমাকে একই দিনে দুবার ব্লাস করানোর ক্ষমতাও আমার আছে।’ গর্বের সঙ্গে বলতে না বলতেই ইভান খপ করে নিনার বাহু আঁকড়ে ধরল। হ্যাচকা টানে কাছাকাছি টেনে নিল। মুখটা ঝুকিয়ে নিনার কানের কাছে গিয়ে প্রায় ফিসফিস করে বলল,
‘তুমি কিন্তু খুব রিস্কি গেম খেলছো ডার্লিং।’
ওর উষ্ণ নিঃশ্বাস কানে লাগছে। ওর কন্ঠে যেন কোন রহস্য ভরা মোহ ছিল। নিনা চোখ বুঝে ফেললো। হৃদপিণ্ড দ্রিমদ্রিম শব্দে দ্রুত গতিতে চলতে লাগলো। কেমন একটা শিরশিরে অনুভূতি বয়ে গেল শরীর জুড়ে। ও খেয়ালও করল না কখন প্রায় শ্বাস আঁটকে ফেলেছে। ইভান ওর কানের কাছ থেকে মুখ সরিয়ে ওর গালে ওষ্ঠ ছোঁয়াল। এরপর প্রায় সাথে সাথেই ওকে ছেড়ে দিয়ে এমন ভাবে দূরে সরে দাঁড়াল যেন একটু আগে কিছুই হয়নি। এদিকে নিনা লজ্জার অতি পরিচিত রঙের হাবুডুবু খাচ্ছে। নিজেকে কোন রকমে সামলে নিয়ে বলল,
‘কী ছিল এটা?’

‘প্রতিশোধ। তুমি কী ভেবেছ আমি আজকাল খুব ভদ্র বেশে ঘুরছি বলে আসলেই ভদ্র হয়ে গেছি। হুম?’

‘অসভ্য একটা!’ মুখ বাঁকিয়ে বলল নিনা। তারপর সোজা হাঁটতে শুরু করল।

‘এই দাঁড়াও। এই অসভ্যটাকে ফেলে যেও না।’ বলেই দ্রুত পায় ওর পাশে পাশে হাঁটতে শুরু করল।
এরপর ওরা বেশ কিছুক্ষণ নিরবেই হাঁটলো। কিছুক্ষণ পর “Red byrd” নামক একটা কফি সপের সামনে এসে পৌঁছল। এই দোকানটা ভারি চমকপ্রদ। একটা কাঠের মোবাইল হাউজের ভেতর দোকানটা তৈরি৷ সামনে অল্প কিছু চেয়ার টেবিল রাখা। তবে বেশির ভাগ সকলে কফি নিয়েই চলে যায়। ওরা দুজন এখানে থামল। এক কাপ কফি নিয়েই পুনরায় হাঁটা শুরু করল। সূর্য ক্লান্ত হয়ে ঝিমিয়ে পরেছে। পরন্ত বিকেলের সোনা বরণ রোদ ওদের ভিজিয়ে দিয়ে যাচ্ছে। বড় বড় গাছের ডালপালার ভেতর দিয়ে ঝুড়ি ঝুড়ি হয়ে সোনার টুকরোর মতো রোদ এসে পরছে ঘাসের ওপর। ইভান গরম গরম কফি সিপ করে বলল,
‘আচ্ছা তো তখন কী যেন একটা আমাকে বলতে চাচ্ছিলা। সেটা তো শোনা হলো না।’

‘ওহ ওটা।’ বলে একটু বিরতি দিল নিনা। তারপর বলল,
‘জিজ্ঞেস করতে চাচ্ছিলাম তুমি প্রথম দিকে আমাকে এত জ্বালাতে কেন?’

‘জ্বালাতাম? কখন?’ এমন ভাবে প্রশ্নটা করল ইভান যেন ও ‘জ্বালাতন’ শব্দটাই আজ প্রথম শুনছে।

‘আমার সাথে দেখা করার জন্য, কথা বলার জন্য পাগল হয়ে থাকো অথচ তোমার বোধহয় মনে নেই। বাস্কেটবল কোর্ট পরিষ্কার করার দায়িত্বটা যখন তোমার সাথে সাথে আমিও নিয়েছিলাম, ওফ বাপরে বাপ তুমি অলমোস্ট আমাকে ডেথ থ্রেট দিয়েছিলা।’ বলে থামল। তবে ইভানকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই আবারও বলল,
‘আর আমরা দুজন যখন বাস্কেটবল কোর্টটা পরিষ্কার করছিলাম তখন যা যা করলে। ইশ আমি কখনোই ভুলবো না।’

‘আমি তোমাকে জ্বালাতাম না। আমি ফ্লার্ট করতাম।’

‘ওটাকে জ্বালানো বলে ইভান।’

‘হ্যা হ্যা ঠিক আছে। আমার জ্বালাতনেই তুমি আমার প্রেমে পরে গিয়েছ। মেনে নিলাম। কিন্তু একই কথা তোমার ক্ষেত্রেও খাটে। তুমি কেন আমার সাথে কোমর বেঁধে ঝগরা করতা। কেন এমন আচরণ করতা যে সুযোগ পেলে পাহাড় থেকেও ঢাক্কা মেরে ফেলে দিবা?’

‘কারণ আমি সত্যিই তোমাকে দেখতে পারতাম না। কিন্তু তোমার তো আমাকে না দেখতে পারার কিছু ছিল না।’

‘সেটাই তো। এইজন্যেই তো আমি ফ্লার্ট করতাম।’

নিনা দীর্ঘশ্বাস ফেললো। ওরা দুজন নিরবে নিজেদের কফি শেষ করল। এরপর ওরা বড় বড় নাম না জানা কোন ফুলের ঝোপের সামনে নরম ঘাসের ওপর বসল। মাথার ওপর নীল খোলা আকাশ। আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল,
‘জানো একটা কখনো বলাই হয়নি।’

‘কী কথা?’

‘ক্রাস, ভালোবাসা, রিলেশনশিপ এগুলো সবসময়ই আমার প্রায়োরিটি লিস্টের তলানিতে ছিল। অমিতের তো পাক্কা ধারণা ছিল আমার বিয়ে হতে হতে ওর বাচ্চা কাচ্চার কলেজে যাওয়ার বয়স হয়ে যাবে।’ এতটুকু বলে থামল।
শেষের কথাটায় ইভান হাসল। বলল,
‘বাট এখন পাত্র চব্বিশ ঘন্টা রেডি। কখন বিয়ে করবা বলো?’
উচ্ছসিত কন্ঠে বলল।
নিনা মুচকি হেসে বলল,
‘ধুরো। সে অনেক দেরি আছে।’ বলে থামল। ইভানের দিকে তাকাল। কী ফরসা, কী সুন্দর ধারাল চোয়াল। ওর ধূসর চোখের রহস্যময় ভাব কখনোই মলিন হওয়ার নয়। নিনা বলে গেল,
‘এই বিষয়ে বিন্দুমাত্র আগ্রহ না থাকা সত্ত্বেও আমি এখন কোথায় এসে দাঁড়িয়েছি? তিনটা মাস আগেও ভাবতে পারিনি আমার কাউকে সত্যি এতটা ভালো লাগতে পারে। এটা সেদিন আরোও ভালো ভাবে বুঝতে পেরেছিলাম যখন তুমি চলে যাচ্ছিলা। কারোও জন্য এই পরিমাণ কষ্ট যে কারো হতে পারে সেটা আমার ধারণার বাইরে ছিল।’

ইভান ঝট করে নিনার হাত দুটো নিজের হাতে নিল।
শক্ত করে ওর হাত দুটো ধরে বলল,
‘আই এম সরি নিনা। আমি একটা ইডিয়ট ছিলাম। তোমার প্রতিটা কাজের পেছনেই একটা ভ্যালিড রিজন ছিল। তবুও আমি ইস্টুপিটের মতো তোমাকে বারবার কষ্ট দিয়েছি। আর ওইদিন সত্যিই বারাবাড়ি হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু আমি কথা দিচ্ছি তুমি যেখানেই গিয়ে দাঁড়াও না কেন, সেখানেই গিয়ে আমি তোমার পাশে জায়গা করে নিব।’ বলে নিনার হাতের মাঝে কপাল ঠেকাল। নিনা মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল।
এত সহজে ওর চোখে পানি আসে। কষ্টেই যখন আসে না তখন আনন্দে তো দূরের কথা ছিল প্রায়। আর এখন দেখো অবস্থা? নিনার চোখ ছলছল করে উঠল। দুহাতে ইভানের মুখে হাত রেখে ওর মুখ তুলে ধরল। নরম কন্ঠে বলল,
‘তুমি যেরকম শর্ট টেম্পারড সেই অনুযায়ী তোমার প্রতিক্রিয়া ঠিকই ছিল। আর এমনিতেও সাধারণ কোন মানুষ কী আমার মতো উল্টা পা্লটা কাজকর্ম করে বেড়ায় এমন? সাধারণ ভাবে সব হলে আমাকে আমার পরিচয় নিয়ে মিথ্যাে বলতে হতো না। রাতবেরাতে বেরিয়ে স্কুলে যেতে হতো না। অমিতও আমাকে অমন নাটক করার পরামর্শ দিত না। আমিও তোমায় সন্দেহ করতাম না।’ বলেই থামল।
ইভান ওর দিকে অনিমেষ মায়াভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।
নিনা আবার বলল,
‘আমি হয়তো মানুষের সাথে সহজে মিশতে পারি না। মানুষকে না বোঝার আগেই বিচার করে ফেলি। অহেতুক রুড ব্যবহার করে যা একটুও সম্পর্ক থাকে তাও নষ্ট করে দেই। কিন্তু তোমাকে আমি কোন ভাবেই, কোন মূল্যে হারাতে চাই না। তোমাকে আগলে রাখার জন্য আমার যাই করা লাগুক আমি তাই করব।’ বলে শেষ করতে না করতেই ইভান ঝুঁকে এসে ওর কপালের সাথে কপাল ঠেকাল। কিছুক্ষণ দুজনেই চোখ বুঝে নিশ্চুপ রইল। দু’জনের উষ্ণ নিঃশ্বাস একে অপরের গালে এসে পরছে। শুধু একে অপরকে অনুভব করে বসে রইল ওরা। কিছুক্ষণ পর ইভান স্পর্শ ছিন্ন করে নিনার কপালে ওষ্ঠ ছোঁয়াল। একটু সরে এসে বলল,
‘তুমি আমার কাছে আছ এটাই যথেষ্ট নিনা।’

আরোও কিছুক্ষণ সেখানে বসার পর উঠে গেল ওরা। রাস্তা ধরে হাঁটতে শুরু করল। নিনার হাত ধরে আছে ইভান।
হাঁটতে হাঁটতে বলল,
‘আচ্ছা আমাদের যেদিন সুগার হিলে দেখা করার কথা ছিল, সেদিন তোমার জরুরি কাজটা আসলে কী পরেছিল যার জন্য তুমি আসোনি?’

নিনা থমকাল এক মুহূর্তের জন্য। তারপর ইতস্তত করে বলল,
‘ওয়েল…ওই দিন হারিন ও অরল্যান্ডো গ্রেউড বাড়িতে ঢুকেছিল চুরি করে। তাই আমি নজর রাখতে গিয়েছিলাম মূলত।’

ইভান ভ্রু উঁচু করল। বলল,
‘ওয়েট ওয়াট! তুমি কিভাবে জেনেছ যে ওরা ওই বাড়িতে ঢুকেছে?’

‘অমিত। ও ফোন করে বলেছিল। তাই তো ছুটে গিয়েছিলাম।’
ইভান ওর ধূসর চোখের মণি ঘোরাল। বলল,
‘ওফ অমিত!’

‘আচ্ছা একটা কথা বলো, তোমার কী অমিতের সাথে কোন ঝামেলা আছে?’

‘না তো।’

‘তাহলে ওর কথা উঠলেই তুমি বিরক্ত হও কেন?’

‘কোথায় বিরক্ত হই?’

‘হুহ্ এইসব ভান করে লাভ নেই। বলো বলো।’

ইভান এবার দীর্ঘশ্বাস ফেললো। নিরাশ কন্ঠে বলল,
‘কারণ তোমাকে পাওয়ার পর থেকেই আমার শুধু মনে হয় কেন আমরা একই নেইবারহুডে, মাত্র সাত মিনিটের দূরত্বে থেকেও এত বছরে কখনোই একে অপরের সাথে দেখা হয়নি? সেখানে অমিত যে কিনা আমাদের নেইবারহুডে আধাঘন্টার দূরত্বে থাকে। আলাদা স্কুলে পড়ে। তারপরেও তোমার চার বছরের বেস্ট ফ্রেন্ড। চার বছর!’

‘ওহহ্ বুঝেছি বুঝেছি। জেলাসি। হুম।’ শব্দটা করেই নিনা খুব গম্ভীর ভাবে কিছু একটা ভাবার ভান করল। ইভান কিছু একটা বলতেই যাচ্ছি তবে তার আগেই নিনা বলল,
‘ওয়েট ইভান! জানো কয়েকদিন আগেই হঠাৎ আমার মনে পরেছে আমি বোধহয় এর আগেও তোমাকে এক বার দেখেছি।’

‘সিরিয়াসলি! কোথায়? কখন?’ অতি আগ্রহী হয়ে জিজ্ঞেস করল। ওরা একটা গাছের নিচে দাঁড়িয়ে। ইভান গাছে হেলান দিয়ে আছে। নিনা আস্তেধীরে বলা শুরু করল,
‘তো প্রায় তিন বছর আগের কথা হবে। একবার আমি
আর অমিত কার রেসিংয়ের জন্য ফেয়ারগ্রাউন্ড স্পিডাওয়ে তে গিয়েছিলাম। তো ওখানে আমরা গিয়ে নিজেরা রেসে যোগ দেওয়ার আগে অন্যান গাড়িগুলো এসে থামছিল। সকল রেসার রা বেরিয়ে চলে যাচ্ছিল। আর আমার ধারণা আমি তোমাকেও একটা গাড়ি থেকে বের হতে দেখেছিলাম।’

ইভান অবাক চোখে তাকিয়ে থাকল। বলল,
‘ওয়েল হ্যা আমি কার রেসিং করতাম আগে। অনেক দিন যাওয়া হয় না। কিন্তু আমাদের নিজেদের নেইবারহুডের মধ্যে তো আর দেখা সাক্ষাৎ হয়নি।’ উদাসীন কন্ঠে বলল।

‘যাই হোক দেখা তো হয়েছিল।’

‘তা ঠিক। বাট স্টিল অমিত ওখানেও ছিল।’ নিনা হাসল।
ওরা আবারও হাঁটতে শুরু করল। হাঁটতে হাঁটতে ঘুরেফিরে পুনরায় “Puckett Bros market” এর সামনে এসে পৌঁছল। আরেকটু দূরেই দেখা গেল ওদের গাড়িটা এখনো পার্ক করে রাখা।
‘ওফ ফাইনালি আর হাঁটতে হবে না। ক্লান্ত হয়ে গিয়েছি।’

তখনই একটা সাইকেল এসে হোটেল টার সামনে দাঁড়াল। সাইকেলে সেই ছেলেটাই বসে আছে যে সেটা চুরও করেছে। তার পেছনে সেই কাঁদুনি মেয়েটা। ইভান সাথে সাথে ছুটে গেল সেদিকে। গিয়েই কঠিন স্বরে বলল,
‘আশ্চর্য ম্যান। তুমি জানো এটা ভাড়া করে নেওয়া? আমি রেন্টাল সপকে কী বলতাম?’

ছেলেটা কাচুমাচু হয়ে বলল,
‘আরেহ ভাই। আমি তখন একটা বিপদে পরেছিলাম। আর তারপর থেকেই আপনাদের খুঁজছিলাম৷ আপনাকে দেখেই তো এদিকে এগিয়ে এলাম।’

নিনা এগিয় এসে বলল,
‘তো সমস্যা সমাধান হয়েছে?’

‘অবশ্যই।’ হালকা হেসে বলল সে। ইভান শান্ত কন্ঠে বলল,
‘যাই হোক। আমার সাইকেল ফেরত দেন।’ ছেলেটা ইভানের হাতে সাইকেলের ভার দিয়ে চলে গেল। এরপর ওরা সাইকেলটা পুনরায় রেন্টাল সপকে বুঝিয়ে দিয়ে এলো। এরপর গাড়িতে এসে বসল। কিছুক্ষণ পরই সন্ধ্যা নেমে যাবে। জিজ্ঞেস করল,
‘তো আমরা এবার বাড়ি যাব।’

‘উঁহু কে বললো? আসল কাজই তো এখনো বাকি।’

‘আসল কাজটা আবার কী?’

‘চলো তারপর বলছি।’ এক চোখ টিপে বলল ইভান।

নিনা ভ্রু কুঁচকে বলল,
‘কোথায় যাব?’

‘গেলেই দেখতে পাবা।’ বলেই গাড়ি স্টার্ট দিল। পাঁচ মিনিটের মাথায়ই ওরা একটা পুকুরের পারে এসে থামল। লেকের পাশে একটা পুরনো দেখতে ছোট এক গার্ডেন কফি সপ। অন্তত নিনার তাই মনে হলো। ওরা গাড়ি থেকে বের হয়ে দাঁড়াল। মিষ্টি পিঁয়াজি রঙের নদীতে যেন আকাশ ডুব দিয়েছে। এর মাঝে নানান ভিন্ন ভিন্ন রঙের সাজে সেজেছে ভাসমান মেঘগুলো। লাল টকটকে সূর্যটা দূর দিগন্তে দুটো ঝাপসা পাহাড়ের পেছনে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। পুকুরের পানিটা যেন স্বচ্ছ এক আয়না। পুকুরের লাল, কমলা রঙের পানি দেখে নিনার ইচ্ছে করল পুকুরে ঝাঁপিয়ে পরতে। তাহলেই যেন আকাশে পৌঁছে যাবে ও। ইভান বলল,
‘এসো।’ বলেই সেই পুরনো লতাপাতায় জড়ানো কফি সপে এসে ঢুকলো। এটা যেহেতু একটা গার্ডেন কফি সপ কাজেই জায়গাটা খোলা ওপরে ছাউনি দেওয়া। সেসব অবশ্য এখন বহু বছর পরিত্যাক্ত পরে থেকে জঙ্গলি লতাপাতায় ছেয়ে গিয়েছে। নিনাকে একটা মোটাসোটা মজবুত দেখতে রেলিঙের ওপর বসিয়ে দিয়ে ইভান পুনরায় গাড়ির কাছে ফিরে গেল। গাড়ি থেকে কী যেন একটা হাতে নিয়েই ফিরে এলো। নিনার পাশে বসে ওর হাতে দিল সেটা। চিকন, চ্যাপ্টা একটা বক্স। একটা বইয়ের সমান হবে। নিনা ভ্রু কুঁচকে একবার ইভানের দিকে তাকাল। তারপর মুচকি হেসে সেটা খুললো। ভেতরে আরেকটা প্যাকেট। সেটা বের করে খুলতেই প্রথমে দেখা গেল একটা কার্ড বোর্ডের টুকরো। কিন্তু না সেটা কোন কার্ডবোর্ড নয়। বরং চকলেট। প্লেইন ডেরি মিল্ক চকলেটের ওপর কার্সিভ নকশা করে লেখা,
“I love you and I will love you as long as I am breathing.”

“Kiss me, close your eyes
and miss me, close your eyes
and kiss me
I can read your lips
on your finger tips
and Happiness on your eyes
kiss me, close your eyes
and miss me
will you take my love,
and not leave me
will you promise to stay forever?”
ইভান গানটা গেয়ে শেষ করল। নিনা অবাক চোখে ওর দিকে তাকিয়ে থাকল। তারপর হাসি মুখে চকলেটে এক কামড় দিয়ে বলল,
“I will.”

ইভানের ঠোঁটের কোণে মুচকি একটা হাসি ফুটে উঠল। ওদের ওপরে আকাশের রঙ পাল্টে যাচ্ছে ক্রমেই। সেই অসংখ্য রঙের মেলা নিমিষেই হারিয়ে যাচ্ছে অন্ধকারের কালো চাদরে। সূর্য আকাশের কোল থেকে হারিয়ে যাওয়ার পূর্বেই বহু দূরে এক টুকরো রুপার মতো চাঁদ উঁকি দিচ্ছে মেঘেদের আড়াল থেকে।

সমাপ্তি।