Home "ধারাবাহিক গল্প মন কেমনের মরশুম মন কেমনের মরশুম পর্ব-০৪

মন কেমনের মরশুম পর্ব-০৪

0
374

#মন_কেমনের_মরশুম

পর্ব: ৪

বাথরুম থেকে চুল মুছতে মুছতে বের হয় আরশাদ। ইরাকে ঘরে কোথাও দেখা যাচ্ছে না। বোধহয় সত্যিই কালা কফি বানাতে গেছে। আরশাদ মুচকি হাসে। হঠাৎ তার নজর যায় টেবিলের উপর। একটা ছোট্ট কাগজ, তার উপর কলম। কিছু লেখা তাতে। কি কি লাগবে তার ফর্দ করতে বলেছিলো আরশাদ, নিশ্চয়ই মেয়েটা লিখে রেখে গেছে।
কাগজটা বাম হাতে তুলে নেয় আরশাদ।

“এই আজীবন দুঃখী, অভাগী মেয়েটাকে করুণা করে আপনি যে মহানুভবতার পরিচয় দিয়েছেন তাতেই মেয়েটার দুনিয়ার সবকিছু পাওয়া হয়ে গেছে। আর কিছুই চায়না সে। তবুও যদি কিছু দিতে মন চায়, একটা কাজল এনে দিবেন? আমার আগের কাজল পেন্সিলটা ভেঙে গেছে।
পুনশ্চঃ ওভার সাইজ ব্লাউজ নিয়ে খুব অসুবিধা হলে দু’টো সেফটিপিন আনবেন দয়া করে। এটা ছাড়া আমার আর কোনো ব্লাউজ নেই।”

আরশাদ কাঁধেত উপর থেকে তোয়ালেটা নামায়, তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি। ট্রাউজারের পকেটে চিরকুটটা রেখে বিছানায় যেয়ে বসে দুই পা মেঝেতে ছড়িয়ে। দুই হাতে চুল চেপে ধরে। দুশ্চিন্তা আর অপরাধবোধ দু’টোই একসাথে হচ্ছে। সে মেয়েটাকে ভালোবাসেনা, প্রেমেও পড়েনি। এতো তাড়াতাড়ি তা হয়-ও না। ‘লাভ অ্যাট ফার্স্ট সাইট’ নাটক-সিনামায় সম্ভব, বাস্তবে না। বাস্তবে সম্ভব হলেও আরশাদ প্রেমে পড়েনি। কিন্তু কেনো যেনো একটু একটু মায়া লাগছে তার। এই একটু একটু মায়া যখন ভয়ংকর রূপ নিবে তখন তা সামলানো যাবে না। ভালোবাসা ছাড়া শুধু মায়া দিয়ে কি সারাটা জীবন কাটানো যাবে? এদিকে মা মনে হয় না এতো সহজে সবটা মেনে নিবে। কিন্তু কেউ কেনো তার অবস্থাটা বোঝার চেষ্টা করছে না? তার কি-ই বা করার ছিলো তখন? অস্থির লাগে আরশাদের।

“আপনার কফি।”
আরশাদ মাথা তোলে, তার চোখ ঈষৎ লাল। ইরা কিছু জিজ্ঞেস করতে যেয়েও করেনা। শাড়ির আঁচল টেনে রেখেছে আরেক হাতে, যাতে কোনোভাবেই ব্লাউজটা দেখা না যায়।

আরশাদ মগটা হাতে নেয়। ধোঁয়া উঠছে মগ থেকে, ঘ্রাণটাও দারুণ এসেছে।
“কদুর মা দেখিয়ে দিয়েছে সব?”
ইরা ক্ষীণ গলায় বললো,”না সে আসেনি এখনো।”
“তাহলে কীভাবে বানালে? খুঁজে পেয়েছো সব?”
“আপনার বাবা চা খেতে উঠেছিলেন। সকালে উনার চা প্রয়োজন হয়, তাই। আপনার মা তো এখনো দরজা খোলেননি। উনি আমাকে দেখিয়ে দিলেন কোথায় কি আছে।”
আরশাদ শান্ত মুখে চুমুক দেয় মগে, নাহ সব ঠিকঠাকই আছে। তেতো হয়ে যায়নি।

“বাবা চা খেয়েছে?”
“জি আমি বানিয়ে দিয়েছি।”
এরপর নিস্তব্ধতা। কেউ কোনো কথা বলেনা। ইরার অস্বস্তি হয়। দাঁড়িয়ে উশখুশ করতে থাকে। ওদিকে আঁচলটা আবার সরে না যায় সেই ভয়ে তটস্থ সে। লোকটার মুখ পাশ করা, যতোদূর মনে হচ্ছে। কখন কি বেফাঁস কথা বলে বসবে তার নেই ঠিক।
ইরা আড়চোখে টেবিলের দিকে তাকায়। কাগজটা নেই ওখানে।

আরশাদ চুমুকের পর চুমুক দিয়েই যাচ্ছে। তার চোখেমুখে সুস্পষ্ট চিন্তার ছাপ। ইরা কি বলবে ভেবে পায়না।

“কফি কেমন হয়েছে?”
“ভালো। দশে সাত দেওয়া যায়।”
“ধন্যবাদ। কি করলে বাকি তিন পাওয়া যাবে?”
“মিষ্টি হয়নি, মিষ্টি হলে বাকি তিন পেয়ে যেতে।”
ইরা অবাক হয়ে বললো,”আপনি না বললেন চিনি ছাড়া কফি খাবেন?”
“হ্যা চিনি ছাড়া বলেছি। মিষ্টি ছাড়া তো বলিনি।”
ইরা ভাষা হারিয়ে ফেলে কথা বলার। লোকটার মাথায় কি কিঞ্চিৎ সমস্যা? তাই-ই হবে। তা না হলে হুট করে তার মতো একটা মেয়েকে বিয়ে করে ফেলতে পারে? চিনি ছাড়া মিষ্টি হবে কীভাবে? উনি কি গুড় দিয়ে কফি খায়?

আরশাদ উঠে দাঁড়ায়। মগটা ইরার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললো,”পরের বার থেকে কফি দিলে মুখটা এমন ভোঁতা বানিয়ে রাখবে না। তাহলে চিনি ছাড়াও কফি মিষ্টি হবে। এবার ঢুকেছে মাথায়?”
ইরা থতমত খেয়ে যায়। মগটা হাতে নিয়ে দেখে শেষে একটু খানি কফি অবশিষ্ট আছে৷ এটা কি ইরার খাওয়ার জন্য রেখেছে? ছি, এই বাজে জিনিস কে খায়?

“আরশাদ….”
দরজায় আচমকা কারো গলার আওয়াজ শুনে সচকিত হয় ইরা, আরশাদ তুলনামূলক শান্ত।

পুতুলের মতো একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে, শাড়ি পরা। চুলগুলো আলুথালু খোঁপা করা। চোখের নিচে কালি, খুব অশান্ত লাগছে মেয়েটাকে। হালকা লাল চোখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে বোধহয় কিছুক্ষণ আগেই কেঁদেছে। পাতলা ঠোঁটজোড়া কাঁপছে তিরতির করে।

“নীলু, তুমি এতো সকালে?”
নীলু নামের মেয়েটা কম্পিত গলায় বললো,”ও কে আরশাদ?”
আরশাদ ইরার দিকে তাকায়। ইরা ক্লান্তশ্রান্ত মুখে দাঁড়িয়ে আছে। মুখে হাসি, রাগ বা অভিমান কিছুই নেই। কেমন যেনো রোবটিক মুখাবয়ব।

“নীলু ও ইরা, পুরো নাম সম্ভবত ইরাবতী পালক। তাইনা?”
ইরা আস্তে আস্তে মাথা নাড়ে। এই মুহুর্তে তার কেনো যেনো ভীষণ হাসি পাচ্ছে। মুখ চেপে হাসি সামলাতে হচ্ছে। তার সদ্যবিবাহিত বরমশাই তার নামটা নিয়েও দ্বিধান্বিত।

“আমি ওর নাম জানতে চাইনি আরশাদ। আমি জানতে চাচ্ছি ও এখানে কেনো? কে এনেছে ওকে এ বাড়ি?”
“নীলু তোমাকে খুব উত্তেজিত মনে হচ্ছে। বসো, শান্ত হও।”
নীলু চিৎকার করে বললো,”কিসের শান্ত? আগে আমাকে উত্তর দাও এসবের মানে কি? এগুলো কেমন মজা?”
আরশাদ ছোট্ট একটা শ্বাস ফেলে বললো,”নীলু তুমি আমাকে ছোট থেকেই চিনো, জানো। আমি সচারাচর মজা করিনা, আর এমন ব্যাপারে তো একেবারেই নয়। আমি বুঝতে পারছি তুমি সবটা জেনেশুনেই এসেছো। তুমি জানো ইরার বর্তমান পরিচয়। তবুও যখন জানতে চাচ্ছো, বলছি। ইরা আমার স্ত্রী, আমার বিবাহিত স্ত্রী। গতকাল দুপুর তিনটায় আমি ওকে বিয়ে করেছি।”
নীলু বিস্ফারিত চোখে আরশাদের দিকে তাকিয়ে থাকে। তার শ্বাস পড়ে ঘন ঘন। ইরার লজ্জায় মাটির সাথে মিশে যেতে ইচ্ছা করে। নিশ্চয়ই এই পুতুলের মতো সুন্দর মেয়েটার সাথে কোনো একটা সম্পর্ক ছিলো আরশাদের। তার জন্য সবটা নষ্ট হয়ে গেলো। শুধুমাত্র তার জন্য দুইজন নিরপরাধ ব্যক্তি কষ্ট পাবে। ছিহ! নিজেকে ধিক্কার জানায় ইরা।

“এসব কিছু মিথ্যা, আমি জানি সবকিছু মিথ্যা। আরশাদ তুমি কেনো এই জঘন্য মজাটা করছো আমার সাথে?”
“নীলু আমি আবারও বলছি আমি কোনো মজা করছি না। হ্যা এটা ঠিক গতকাল এমন সময়েও আমি ভাবিনি আমি বিয়ে করবো। কিন্তু পরিস্থিতি আমাকে বাধ্য করলো। কিন্তু তাই বলে এই ধ্রুব সত্যটাকে মজা বলো না নীলু।”
ইরা পালাতে পারলে বাঁচে এখান থেকে। সুযোগ খোঁজে বেরিয়ে যাওয়ার। সৎমায়ের অত্যাচারও এরচেয়ে ঢের ভালো ছিলো। কম অপমানিত হতে হয়নি তাকে সৎমায়ের সংসারে। কিন্তু এরচেয়ে লজ্জা বোধহয় জীবনে তার দোরগোড়ায় কড়া নাড়েনি।

“আপনি বসুন, আপনার জন্য কফি করে আনি?”
নীলু স্তম্ভিত হয়ে তাকায় ইরার দিকে, কিছু বলতে পারেনা।

“ইরা ও নীলু, আমার মেজো খালার মেয়ে। সম্পর্কে তোমার ননদ হয়। তুমি নীলু আপা বলে ডাকতে পারো।”
“জি আচ্ছা। আপনারা গল্প করুন। আমি উনার জন্য কফি বানিয়ে আনছি।”
“আমরা গল্প করবো? আর তুমি কফি বানিয়ে আনবে?”
ইরা ভেবাচেকা খেয়ে আরশাদের দিকে তাকায়। আরশাদের দৃষ্টিতে হালকা রাগের আভাস। চোয়াল শক্ত হয়ে গেছে। ইরা বুঝতে পারে না সে ভুলটা বললো কি? সে তো শুধুমাত্র এই বিশ্রী পরিবেশটা থেকে পালাতে চাচ্ছে।

আরশাদ বেরিয়ে গেছে অনেকক্ষণ, তার বাবাও বেরিয়েছে। নীলু মেয়েটাও তখনই চলে গেছে কাঁদতে কাঁদতে। তার কান্নাটা ভীষণ পীড়া দিয়েছে ইরাকে। ইরা শুধু আরশাদকে বলেছিলো, ‘উনি কাঁদতে কাঁদতে চলে যাচ্ছেন তো। আটকান উনাকে।’
কে জানে আরশাদের কি হলো তারপর থেকে। ইরার সাথে আর কোনো কথা বলেনি। কাউকে কিছু না বলে জামাকাপড় পালটে বেরিয়ে গেছে। ইরার মা বলতো কাউকে না খাইয়ে বাড়ি থেকে বের হতে দিতে হয়না। অন্তত এক গ্লাস পানি হলেও দিতে হয়।
রাতটা কোনোরকমে চললেও সকালে কি নাশতা হবে ইরা জানেনা, তাকে জানানো হয়নি। তাই উপয়ান্তর না পেয়ে এক গ্লাস পানি আরশাদের সামনে ধরেছিলো সে। আরশাদ তীক্ষ্ণ গলায় বলেছে,’পানি তুমি খাও নাহয় তোমার মাথায় ঢালো।’

কি অদ্ভুত আচরণ এ বাড়ির সবাই। না খেলে না খাবে, তাই বলে মাথায় ঢালতে বলবে কেনো?

আরশাদ বেরিয়ে যাওয়ার পর ঘরের মধ্যে একা একা ভালো লাগছিলো না। কিছুক্ষণ পায়চারি করে বেরিয়ে এসেছে। পা টিপে টিপে ডায়নিং-এ এসে দেখে রাবেয়া বেগমের ঘর এখনো আটকানো ভিতর থেকে। কদুর মা নামক ব্যক্তিও আসেনি এখনো। আশা মেয়েটাকেও দেখা যাচ্ছে না। কীভাবে কাটবে এখন সময়? সে কি রান্নাঘরে যেয়ে কিছু রান্না করবে? না থাক, বেশি রেগে যায় যদি ভদ্রমহিলা? ইরার মাথায় আসেনা কি করবে, কি করা উচিত।

চেয়ারে ঠিক কতক্ষণ যাবৎ বসে বসে পা দুলিয়েছে ইরা জানেনা। আগড়ুম বাগড়ুম ভাবতে ভাবতে হুঁশই হারিয়ে ফেলেছিলো সে৷ ধাতস্থ হয় দরজার খুট করে আওয়াজে। কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে বসে থাকে ইরা, দাঁড়াতেও ভুলে যায়।

ধবধবে ফরসা, মাঝারি উচ্চতার একজন নারী বের হয়ে আসে। চোখ ফুলে ঢোল হয়েছে, রক্তিম বর্ণ চোখের। বোঝাই যাচ্ছে টানা কেঁদেছে রাত থেকে। সুখী সুখী চেহারায় চরম বিষাদের ছাপ। ইরা ঢোক চাপে।

রাবেয়া একবার চোখ তুলে তাকায় ইরার দিকে, কিছু বলেনা। যেনো ইরা অদৃশ্য, তাকে চোখেই পড়েনি রাবেয়ার। শান্তভাবে হেঁটে রান্নাঘরের দিকে পা বাড়ায়।
ইরার এতোক্ষণে হুঁশ হয়। সে ছুটে যেয়ে রাবেয়াকে সালাম করে পা ধরে। সে ভেবেছিলো রাবেয়া সরে যাবে। কিন্তু তাকে অবাক করে দিয়ে রাবেয়া চুপ করে দাঁড়িয়ে সালাম নিলো। ইরা সরে যেতেই রাবেয়া আবারও রান্নাঘরের দিকে এগোয়। ইরা কি করবে বুঝতে না পেরে সে-ও পিছন পিছন রান্নাঘরের দিকে যায়।

“আমি আপনাকে সাহায্য করি? আমি মোটামুটি ভালো রান্না করতে পারি। খারাপ লাগবে না আপনাদের।”
রাবেয়া উত্তর দেয়না, নিজের কাজ করতে থাকে। ফ্রিজ থেকে সবজি বের করে আনে নিজেই।
ইরা কিছুটা দমে যায়। রাবেয়ার এমন আচরণ বেশ অবাক লাগে তার। চিৎকার চেচামেচি বা রাগ করলেও বোধহয় ইরা এতোটা অস্বস্তিতে পড়তো না। গালাগাল শুনেও হজম করতে পারে ইরা, অভ্যাস বহুদিনের।

“আমাকে দিন না, আমি কেটে দিই সবজি। আপনি আরাম করে বসুন। আমার কাজ করতে ভালোই লাগে।”
রাবেয়া ছুড়ি হাতে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে। তাকায় একবার ইরার দিকে। ইরা হাসিমুখে তাকিয়ে আছে। খুশি যেনো আর ধরছে না তার চোখেমুখে।

রাবেয়া তবুও কথা না বলে নিজেই সবজি কাটতে থাকে। ইরা মাথা নিচু করে দাঁড়ায় জড়োসড়ো হয়ে। কি এক ভয়াবহ অদ্ভুত পরিস্থিতিতে খোদা তাকে ফেললো। এরচেয়ে ওই ঘাটের মড়া বুড়োটাকে বিয়ে করে নিলেও হতো। ইশ! কি বড় একটা ভুল হয়ে গেলো।

বেশ কিছুক্ষণ এভাবে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থেকেও যখন কোনো লাভ হলো না, ইরা ভাবলো সে ঘরে ফিরে যাবে। এভাবে দাঁড়িয়ে থাকা মানে উনাকেই বিরক্ত করা। হয়তো ইরার উপস্থিতিটা উনি পছন্দই করছেন না।

ঘরের দিকে পা বাড়াতেই,

“এই পরিকল্পনা কতোদিনের?”
ইরা চমকে উঠে পিছনে তাকায়। কাকে বললো কথাটা উনি? ইরাকে? হ্যা তাই তো, আশেপাশে তো কেউ নেই। কিন্তু কিসের পরিকল্পনার কথা বলছেন উনি?

“হ্যা তোমাকেই বলছি। কতোদিনের পরিকল্পনা?”
“জি কিসের পরিকল্পনা? ঠিক বুঝতে পারলাম না।”
রাবেয়া হাতের ছুড়িটা রেখে ছোট্ট করে হাসে। ইরার দিকে তাকায় সে পূর্ণদৃষ্টি মেলে।

“বুঝতে পারছো না তাইনা?”
ইরা আস্তে আস্তে মাথা নাড়ে।
“এইযে বড়লোকের ছেলেদের আবেগ নিয়ে খেলে এরপর একটা ফাঁদে ফেলে বিয়ে করে সোজা তার বাড়ি উঠে পড়া। এই পরিকল্পনার কথাই বলছিলাম আর কি।”
ইরা উত্তর দেয়না। সে প্রস্তুত ছিলো এমন বাঁকা কথা শোনার জন্য। তাই তেমন কষ্ট পায়না। হয়তো কষ্ট পাওয়া উচিত ছিলো, কিন্তু পায়না।

“তোমাদের মতো মেয়েদের সব আছে। রূপ, যৌবন, বুদ্ধি সবই। শুধু কি নেই জানো? লজ্জা নেই। বিন্দুমাত্র লজ্জা থাকলে চেনা নেই, জানা নেই একটা ছেলের কাঁধে ভর দিয়ে উঠে, তাকে বিয়ে করে তার বাড়ি চলে আসতে পারতে না। কোনো ভালো বংশের, ভালো শিক্ষার মেয়েরা এটা করেনা। এটা কি বুঝতে পারছো?”
ইরা ক্ষীণ গলায় বললো,”জি বুঝতে পারছি।”
“শোনো মেয়ে, তুমি যদি ভেবে থাকো আরশাদকে বিয়ে করেছো মানেই এই বাড়ি তোমার, এই সংসার তোমার তাহলে ভুল করছো। আরশাদ খুব ভদ্র একটা ছেলে, মায়া বেশি। ও তো দুইদিন পর পর রাস্তা থেকে অসুস্থ বিড়াল-কুকুর তুলেও বাড়িতে আনে। তাদের খাওয়ায়, যত্ন করে, ওষুধও কেনে তাদের জন্য। এরপর তারা সুস্থ হয়ে গেলে আবার রেখে আসে তাদের স্থানে। আমার ছেলে তো, আমি ওকে খুব ভালো করে চিনি। তোমার উপর একটা সূক্ষ্ম মায়া তৈরি হয়েছে ওর, আর কিছুই না। একটা অসহায় মেয়ে, যাকে বাড়ি থেকে জোর করে একটা বৃদ্ধের সাথে বিয়ে দেওয়া হচ্ছে এটা ওকে কষ্ট দিয়েছে। ঝোঁকের মাথায় একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে। এ বাদে আর কিছুই না। ও নীলুকে ভালোবাসে, কিশোর বয়স থেকেই। মুখে হয়তো কখনো বলেনি কিন্তু আমি মা, আমি বুঝি। ওইযে ওই বিড়াল-কুকুর গুলোর মতো তোমাকেও একদিন ও তোমাকে ফেলে আসবে। যেখান থেকে তুলে এনেছে, সেখানেই। তাই জোর করে এই ভালো মানুষ সাজার নাটকটা করোনা, প্রয়োজন নেই। তুমি এ বাড়ির অতিথি, স্রেফ দু’দিনের। বুঝলে?”

লম্বা বক্তৃতা দিয়ে রাবেয়া থামে। নিজেকে বিজয়ী মনে হচ্ছে। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এই মেয়েটা কষ্ট পেয়েছে ভেবেই ভালো লাগছে তার। এই মেয়ে তাকে কষ্ট দিয়েছে। মেয়েটার নিজেরও কষ্ট প্রাপ্য।

“জি বুঝেছি।”
“তাহলে এখানে দাঁড়িয়ে আছো কেনো এখনো? নিশ্চয়ই এখনো আমাকে সাহায্য করতে চাও না।”
“এখনো আপনাকে সাহায্য করতে চাই। কিন্তু আপনি সাহায্য নিবেন কিনা আপনার ব্যক্তিগত ব্যাপার। আমি জোর করবো না। কারণ এ বাড়ি, এ সংসার কিছুই আমার না। আমি দখল করতেও চাইনা। আমার একটা আশ্রয় প্রয়োজন ছিলো, উনি আমাকে তা দিয়েছেন। এটাই আমার জন্য যথেষ্ট। সংসারের চিন্তা করছি না। উনি যদি নীলু আপাকে বিয়ে করতে চান, তাতেও আমি একটুও আপত্তি জানাবো না। আর হ্যা আপনি বললেন আমাকেও একদিন ওই রাস্তার অসুস্থ বিড়াল-কুকুরের মতো উনি ফেলে আসবেন। যদি তেমনটা হয় আমি খুব বেশি অবাক হবো না। বরং উনি যদি আমাকে নিয়ে সত্যিই সংসার করেন, তাতেই আমি বেশি অবাক হবো। তবে একটা কথা, উনি কিন্তু রাস্তার বিড়াল-কুকুরকে বিয়ে করে বাড়িতে তোলেননি কখনো। আমাকে বিয়ে করে এনেছেন। আমাকে ছুঁড়ে ফেলে দিতে উনার একটু হলেও খারাপ লাগবে।”
রাবেয়া হতভম্ব চোখে ইরার দিকে তাকিয়ে থাকে। ইরার মুখে এখনো সেই রহস্যময় হাসি। কি বলতে চাইলো ও?

“আর একটা কথা, পরিকল্পনা করেই যদি সবটা হতো তবে আমি এখন ওই বৃদ্ধের স্ত্রী থাকতাম। গতকাল এই সময়টা পর্যন্ত আমি তাই-ই জানতাম। অথচ এখন দেখুন, আমি আপনার সামনে আপনার পুত্রবধূ হিসেবে দাঁড়িয়ে আছি। বলুন তো পরিকল্পনা করে কি হলো? যা-ই হোক, সাহায্যের প্রয়োজন হলে ডাকবেন। আমি মানুষ, বিড়াল কিংবা কুকুর নই যে আপনাকে ঘরের কাজে সাহায্য করতে পারবো না।”
ইরা একটু চেপে হেসে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে যায়। রাবেয়া হকচকিয়ে যায়। মেয়েটাকে যতোটা শান্ত মনে হয়েছে, সে তা নয়। বরং একটু বেশি ভয়ংকর। অতিরিক্ত সাহস বা আত্মবিশ্বাস কোনোটাই ভালো না৷ এটা ওই মেয়েকে বুঝিয়ে দিতে হবে। রাগে শরীর কাঁপে রাবেয়ার।

সারাদিনই প্রায় নিজেকে চার দেওয়ালের মধ্যে আটকে রেখেছে ইরা। সারাদিন বৃষ্টি পড়েছে, বিকালের পর যেনো আরো বেড়েছে। দূর থেকে যেনো বৃষ্টি টেনে টেনে আনছে প্রকৃতি। আর সেই গমগম করে আওয়াজ বৃষ্টির। ইরা ভেবেছিলো এই নিদারুণ নিষ্ঠুর ধারার মতোই তার চোখ দিয়ে অবিরাম ধারা ঝরবে। কিন্তু কি আশ্চর্য, সে একটুও কাঁদতে পারছে না। কান্না যেনো বিদায় জানিয়েছে তাকে।
শরীরটা দূর্বল লাগছে ভীষণ। সারাদিনে কোনো দানাপানি পড়েনি পেটে। অবশ্য খিদা লাগছেও না তার। শুধু শক্তি পাচ্ছে না কোনো। অকারণেই আরশাদকে নিয়ে ভাবতে ইচ্ছা করছে।
সে জানে সে উড়ে এসে জুড়ে বসা একটা প্রাণী এই বাড়ির, বিড়াল-কুকুরের মতোই। তার এ বাড়িতে আসার কথা ছিলো না। তার জায়গায় নীলু নামক রূপবতী মেয়েটার থাকার কথা। ভাগ্যের ফেরে সে এই জায়গায়। কিন্তু অবাধ্য মন কি কোনো শাসন বারণ শোনে? মনের উপর কার-ই বা আছে দখলদারত্ব?

উল্টাপাল্টা ভাবতে ভাবতে কখন ইরা ঘুমিয়ে গেছে সে জানেনা। যখন ঘুম ভাঙে তখন দিনের আলো ফুরিয়েছে। চারদিক আঁধারে ছেয়েছে। সন্ধ্যে নেমে গেলো? সে ইদানীং কি একটু বেশি ঘুমাচ্ছে?

“ঘুম ভেঙেছে তবে?”
লাফ দিয়ে উঠে বসে ইরা। বেতের সোফায় আরশাদ বসে আছে আয়েশ করে। তার কোলের উপর ল্যাপটপ। বাইরের কাপড় পাল্টায়নি এখনো, ওভাবেই বসে আছে। কতোক্ষণ এসেছে কে জানে।

“আপনি? কখন এসেছেন? আমাকে ডাকেননি কেনো?”
“ঘুম ভাঙাতে ইচ্ছা করেনি, বেশ গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ছিলে। ঘুম ভালো হয়েছে?”
“হয়েছে।”
“জানালা খুলে ঘুমিয়েছো, আমি না এলে তো এতোক্ষণে মশার দল এসে তাদের ডেরায় নিয়ে চলে যেতো তোমাকে। বৃষ্টির আবহাওয়ায় মশা বেশি আসে।”

ইরা উঠে দাঁড়ায়, গোসলে যেতে হবে। মরার মতো পড়ে ছিলো সারাদিন বিছানায়। গোসল না করলে অস্বস্তি লাগে তার।

কিন্তু এক পা-ও এগোতে পারেনা। মাথাটা হঠাৎ চক্কর দিয়ে ওঠে। সারাদিনের না খাওয়া শরীর, আর কতোই বা সয়?
টাল সামলাতে না পেরে পড়ে যেতে গেলেই আচমকা যেনো শুন্যে ভেসে ওঠে সে। দুই হাত খপ করে ধরে বসেছে কেউ। কেউ আবার কে? আরশাদ ব্যতীত আর কেউ না।

“এ কি? এতো তাড়াতাড়ি এসব কীভাবে হলো? আমি তো কিছু করিনি।”
ইরা হতবাক হয়ে আরশাদের দিকে তাকায়। তার বাঁকা কথা বুঝতে দেরি হয়না ইরার। ইতোমধ্যে আয়ত্তে নিয়েছে এসব কথা সে। কিন্তু তাই বলে….

শরীরের অবশিষ্ট শক্তিটুকু দিয়ে নিজেকে ছাড়ায় ইরা। আরশাদ তাকে ছেড়ে দিয়ে পাশেই দাঁড়ায়।

“সারাদিনে কিছু খাওনি তাইনা?”
“খেয়েছি।”
“কি খেয়েছো?”
“আপনি যে কফিটুকু মগে রেখেছিলেন, ওটা।”
“বাহ অনেক কিছু খেয়েছো তো। এখনো মাসখানিক চলে যাবে ওটুকুতে।”
ইরা কি মনে করে ফিক করে হেসে দেয়। ক্লান্ত মুখে হাসিটা ঠিক ফোটে না। আরশাদ চোখ ফিরিয়ে নেয়।

“টেবিলের উপর খাবার আছে। চটজলদি দু’টো প্লেট নিয়ে এসো। নিজেও খাও, আমাকেও দাও। খিদেয় মনে হচ্ছে পেটে ইঁদুর বুকডন দিচ্ছে।”
“আপনিও খাননি?”
“খেয়েছি তো, আপনার বানানো ওই তেতো স্বাদের কফি।”
“সে কি সারাদিনে আর কিছুই খাননি?”
“জি না।”
“কেনো?”
“অপেক্ষা করছিলাম কেউ মাথা ঘোরার নাটক করে আমার গায়ের উপর পড়বে, তারপর খাবো। আমার স্পর্শ পাওয়ার জন্য কেউ এতোটাও উতলা হতে পারে আগে বুঝিনি।”
ইরা মুহুর্তেই কিছুটা রাগান্বিত হয়ে বললো,”আমি মাথা ঘোরার নাটক…..”
“আচ্ছা আচ্ছা রাগ পরে দেখালেও চলবে। আগে একটু খেয়ে নেওয়া যাক, কি বলো? খালি পেটে রাগটা ঠিক জমে না।”
ইরা ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকে। বদমায়েশের আখড়া এই লোক। ইচ্ছা করে রাগিয়ে দিয়ে এখন আবার বারণ করছে।

“আমি পরে খাবো, আপনি খেয়ে নিন।”
“আমি খেয়ে নেওয়ার জন্য তো সারাদিন না খেয়ে বসে ছিলাম না, তাইনা? আপনার কোনো রাজকার্য থাকলে করে আসুন, আমি অপেক্ষা করছি।”
ইরা মৃদু গলায় বললো,”আমি গোসলে যাচ্ছি। তাহলে ততক্ষণ অপেক্ষা করুন।”
“বেশ। আর হ্যা আপনার জন্য কিছু জিনিস আছে টেবিলের উপর। জানিনা পছন্দ হবে কিনা। আমি মেয়েদের বিষয় কম বুঝি। নিজে যা পারি এনেছি। পছন্দ না হলে আমার সাথে যেয়ে নিজে কিনবেন।”
ইরা কিছুটা অবাক হয়ে এগিয়ে যায়। বেশ কয়েকটা ব্যাগ টেবিলের উপর। ইরা উঁকি দিয়ে দেখে। জামাকাপড় বোধহয় একটা ব্যাগে, আরেকটাতে সাবান, ব্রাশ আরো কিছু জিনিস। আরেকটাতে কি আছে দেখা জন্য ইরা হাত ঢুকায়। বের করে তিনটা ব্লাউজ। কি অদ্ভুত, তিনটাই একই রঙের, গোলাপি। একই রঙের তিনটা ব্লাউজ কেউ কেনো কিনবে? আলাদা রঙ হলেও হতো। লোকটা আসলেই পাগল।

“আশা করি এই ব্লাউজগুলো ঠিকঠাক হবে।”
ইরা মাথা নিচু করে হাসে।
“তারপরেও সেফটি পিন এনেছি, এক্সট্রা সেফটির জন্য।”
“এক্সট্রা সেফটি?”
“গোসলে যাবে বলছিলে। একা পারবে?”

ইরা হতবাক চোখে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় আরশাদের দিকে। আরশাদ শান্ত, যেনো কিছুই বলেনি।

“কি বললেন?”
“আরে কি মুশকিল! মাথা ঘুরে পড়ে যাচ্ছিলে তো এইমাত্রই। এখানে আমি ছিলাম বলে ধরলাম। বাথরুমে কে ধরবে? তাই বললাম আর কি। এমনিতে তুমি কি ভেবেছিলে?”
ইরা গাঢ় গলায় বললো,”কিছু না, কিচ্ছু না।”
জামাকাপড়, তোয়ালে কিছু না নিয়েই ইরা দৌড়ে বাথরুমে ঢুকে যায়। আরশাদ ভ্রু কুঁচকে তাকায়। মেয়েটার মাথায়ও কি কিঞ্চিৎ সমস্যা আছে?

(চলবে…..)