#মন_কেমনের মরশুম
পর্ব: ১৫
ভোরের দিকে ঘুম ভেঙে যায় আরশাদের। গতরাতে অনেক রাত পর্যন্ত সমুদ্রবিলাশ করেছে তারা। যদিও সারারাত ইচ্ছা ছিলো। কিন্তু ইরার আর ভালো লাগছিলো না, তাই রাতেই ফিরে এসেছে।
ভেবেছিলো আজ সারা সকাল হোটেলে বিশ্রাম নিয়েই দুপুরের দিকে বাড়ি ফিরবে।
কিন্তু খুব সকালেই ঘুম ভেঙে যায় আরশাদের। পাশ ফিরে তাকিয়ে দেখে ইরা পাশে নেই। কিছুটা অবাক হয়ে উঠে বসে। ঘুম ঘুম চোখে বারান্দার দিকে তাকায়। বারান্দা ফাঁকা। বাথরুমের দরজাও বাইরে থেকে বন্ধ।
বুকটা ধক করে ওঠে আরশাদের। চোখ ঘুম যেটুকু ছিলো, দৌড়ে পালায়। পাগলের মতো এদিক ওদিক খুঁজতে থাকে ঘরের ভিতর। কোথাও নেই ইরা।
হঠাৎ ঘরের দরজার দিকে তাকাতেই দেখে তা খোলা, ভেজিয়ে রাখা। আরশাদের কলিজার পানি শুকিয়ে যায়। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে আসে। লম্বা করিডর ফাঁকা। ভোরের দিকে সব সুনশান, কোথাও কেউ নেই।
আরশাদের মাথা শব্দশুন্য হয়ে যায়। মনে হয় চারদিক অন্ধকার ঘনিয়ে আসছে তার চারপাশে। সে বাদে সেই আঁধারে কেউ নেই। ইরা কোথায় যাবে তাকে না জানিয়ে? এখানে সে আগে কখনো আসেনি। কিচ্ছু চেনেনা সে। কোনো বিপদ হলো ওর?
নিজের মাথা নিজেই ফাটিয়ে ফেলতে ইচ্ছা করছে রাগে। কীভাবে ঘুমিয়েছে সে? ইরা পাশ থেকে উঠে দরজা খুলে বেরিয়ে গেলো আর সে কিচ্ছু বুঝতে পারলো না? মরণের ঘুম ঘুমালো নাকি সে?
শ্বাস বন্ধ করে নিচে নেমে আসে সে। জানেনা কোথায় যাচ্ছে, কিন্তু শুধু ছুটছে। ফিনকি দিয়ে ঘাম ঝরছে, শরীর ভিজে জবজবে। হৃৎপিণ্ডটা হাতুড়ির মতো শব্দ করছে। এতোটা অসহায় এই জীবনে তার লাগেনি কখনো।
“স্যার কোনো সমস্যা?”
হোটেল ম্যানেজারের ডাকে ধাতস্থ হয় আরশাদ। ছুটে এসে দাঁড়ায় তার সামনে।
“আপনি কতোক্ষণ ধরে আছেন এখানে?”
“আমি তো এসেছি বেশ কিছুক্ষণ। কি হয়েছে বলুন তো স্যার।”
“আমার স্ত্রী, আমার স্ত্রীকে চিনেন তো? দেখেছেন তাকে? এখানে দেখেছেন?”
ম্যানেজার হকচকিয়ে যায়। আরশাদের মুখ রক্তলাল। ঘন ঘন শ্বাস পড়ছে। এলোমেলো চুলে উন্মাদের মতো লাগছে তাকে।
“চুপ করে আছেন কেনো? উত্তর দিন, দেখেছেন তাকে?”
আরশাদের চিৎকারে কেঁপে ওঠে ম্যানেজার।
“শান্ত হোন স্যার।”
“এই শালা, আমি শান্ত হবো কিনা তুই বলে দিবি? তোর কাছ থেকে শুনতে হবে? তোকে যা জিজ্ঞেস করছি বল। নাহলে কিন্তু তোর হোটেলে আগুন জ্বালিয়ে দিবো। পুড়ে মরবি।”
ম্যানেজার কিছু বলার আগে তার সহকারী এগিয়ে আসে।
“স্যার আমার কথা শুনুন। দয়া করে এভাবে চিৎকার করবেন না। আমি দেখেছি, আমি ম্যাডামকে দেখেছি।”
আরশাদ আরো জোরে চিৎকার করে বললো,”কোথায় সে? কোথায়?”
“উনি অনেক সকালে, সূর্য ওঠার আগেই বেরিয়েছেন। একাই।”
আরশাদ হতভম্ব হয়ে যায়। কিছুক্ষণের জন্য মস্তিষ্ক কাজ করা বন্ধ করে দেয়। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা দুইজন মানুষকে চোখে পড়ে না তার। সব কেমন ধোঁয়াটে।
“একা বেরিয়েছে মানে? কোথায় গেছে?”
“এটা তো স্যার বলতে পারবো না। টুরিস্ট কখন কোথায় যাচ্ছে এটা জানা তো আমাদের এখতিয়ারের মধ্যে পড়েনা।”
আরশাদ আচমকা ছুটে যেয়ে লোকটার কলার চেপে ধরে। ম্যানেজার ভয়ে অর্ধেক হয়ে যায়। সে ছুটে আসে তাকে ছাড়াতে।
“স্যার এটা কি করছেন? ছাড়ুন ওকে। আমরা কিন্তু গার্ড ডাকতে বাধ্য হবো এবার।”
“একটা মেয়ে একা বেরিয়ে গেলো, তাও আবার সূর্য ওঠার আগেই। তুই কিচ্ছু জিজ্ঞেস করিসনি? ভূগোল বোঝাস আমাকে? আমার ইরা কোথায়? বল আমার ইরা কোথায়।”
লোকটা চিঁচিঁ করে বললো,”নিজেদের দোষ আমাদের উপর চাপাচ্ছেন কেনো? আপনার স্ত্রী আপনাকে না জানিয়ে বের হয়ে চলে এসেছে, আর এখন আপনি আমাদের উপর চোটপাট করছেন। নিজেদের মধ্যে সম্পর্ক ঠিক করুন আগে।”
আরশাদ ছেড়ে দেয় লোকটাকে। রাগে কাঁপছে সে। টেবিলের উপর পেপারওয়েট ছিলো একটা। আরশাদ রাগে ছুঁড়ে ফেলে দেয় ওটা। হাজার টুকরো হয়ে ভেঙে যায়। আরশাদ চুল চেপে ধরে বসে পড়ে ওখানেই। মাথা ছিঁড়ে পড়ছে তার রাগে। মনে হচ্ছে এই মুহুর্তে সবকিছু ধ্বংস করে দিতে। এমন হচ্ছে কেনো তার? নেহাৎ দায়িত্বের প্রতি টান নাকি অন্য কিছু?
★
এতো সকালে আশাকে দেখে যারপরনাই অবাক রাশেদুল। যে মেয়েকে সকাল দশটাতেও কলেজের জন্য বিছানা থেকে টেনে ওঠানো যায়না, সে মেয়ে কিনা এই সাতসকালে। তাও আবার নিজে থেকে উঠেছে। মেয়ের চোখের নিচে আবার কালি। সে কি রাতে ঘুমায়নি? রাশেদুল নিজের মধ্যে অপরাধের আগুন টের পায়। এই মেয়ে তার কতো শখের, কতো আদরের। আরশাদ হওয়ার কতো পরে মেয়েটা হলো। অথচ সেই মেয়েটা কতো দূরে সরে যাচ্ছে দিন দিন। নিজের চারপাশে অদৃশ্য প্রাচীর তুলে দিয়েছে যেনো। দুর্ভেদ্য সেই প্রাচীর। এই বয়সটা ভয়ংকর।
“আশা মা, তুমি?”
“বাবা তুমি কি কোথাও যাচ্ছো?” আশার কণ্ঠে একরাশ ক্লান্তি।
“আমি তো হাঁটতে যাই এই সময়ে। কিছু বলবে তুমি?”
“বাবা আমিও আজ যাই তোমার সাথে? তোমার কি অসুবিধা হবে?”
রাশেদুল অবাক হয়ে মেয়ের মাথায় হাত রাখে। ও এভাবে কথা বলছে কেনো? মনে হচ্ছে পরের কোনো মানুষের সাথে কথা বলছে।
“কি হয়েছে মা তোর? এভাবে কথা বলছিস কেনো?”
আশা ম্লান হেসে বললো,”অনেকদিন তোমার সাথে মন খুলে আড্ডা গল্প করিনা। আজ কি একটু সময় হবে তোমার বাবা? আমার ভীষণ ইচ্ছে করছে তোমার সাথে গল্প করতে। বাড়ির মধ্যে দমবন্ধ হয়ে আসে।”
রাশেদুলের বুক কাঁপে অজানা আতঙ্কে। মেয়েটা কি বড়সড় কোনো সমস্যায় পড়েছে? ও কি প্রেমে পড়েছে? বাবা হয়ে এ কথা জিজ্ঞেসই বা করবে কি করে সে?
“চল আজ অনেক ঘুরবো বাপ বেটিতে আর গল্প করবো।”
আশা সেই ছোট্ট বেলার মতো বাবার কড়ে আঙ্গুল ধরে আলতো করে। হাতটা বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে আছে তার। রাশেদুলের কষ্টে বুকটা ভার হয়ে ওঠে।
★
“গল্প করবি বলে এলি। কিন্তু তখন থেকে চুপ করে আছিস। আমি কিছু বললে উত্তর দিচ্ছিস, নাহলে চুপ।”
আশা ক্ষীণ গলায় বললো,”কিছু বলতে ইচ্ছা করছে না বাবা।”
“সে কি কথা? একটু আগেই তো বললি মন খুলে আড্ডা দিবি আমার সাথে। এখন আবার ইচ্ছা করছে না?”
“তখন করলেও এখন আর ভালো লাগছে না কথা বলতে। তুমি বলো, আমি শুনি।”
রাশেদুল একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,”আইসক্রিম খাবি?”
আশা বিষাদময় মুখে হাসে।
“বাবা এসব কি পাগলামি? এই সকালে কেউ আইসক্রিম খায়?”
“মাঝে মাঝে পাগলামি করা দোষের কিছু না। দেখলি না তোর ভাইয়াকে কেমন একদিনের মধ্যে মধুচন্দ্রিমায় পাঠালাম। হঠাৎ হঠাৎ পাগলামি করলে জীবন সুন্দর হয়, একঘেয়েমি কাটে।”
আশা বিড়বিড় করে বললো,”আমার জীবন আর সুন্দর হবে না বাবা।”
“কিছু বললি?”
“না বাবা। ভাইয়া কবে ফিরবে?”
“আজই তো ফেরার কথা। কেনো বল তো?”
“না কিছু না।”
আশা আবারও চুপ।
রাশেদুল মেয়েকে নিয়ে পার্কের একটা বেঞ্চে এসে বসে, ছেলেকে নিয়ে যেখানে বসেছিলো সেখানেই। আশা চুপচাপ। মেয়েটা এমন চুপচাপ ছিলো না কোনোদিন। আরশাদ শান্ত কিন্তু রাগী। আশা চঞ্চল, রেগে গেলেও পরক্ষণেই কেঁদে ভাসায়। সেই চঞ্চল মেয়ের এমন চুপচাপ হয়ে যাওয়াটা একজন বাবার জন্য কষ্টের বিষয়।
“আশা…”
“বলো বাবা।”
“তোর কি হয়েছে?”
সামান্য ছোট্ট প্রশ্নে আশা চমকে ওঠে। রাশেদুল তীক্ষ্ণ চোখে মেয়ের দিকে তাকিয়ে থাকে।
“কি হবে বাবা?” আশা কণ্ঠ কম্পমান।
“আমি তো সেইটাই জানোট চাচ্ছি। কি হয়েছে তোর?”
“কই কিছু না তো।”
রাশেদুল কয়েক মিনিট চুপ করে বসে মেয়েকে অবলোকন করে। পুরোটা সময় আশা মাথা নিচু করে বসে থাকে, কোনো কথা না বলে। কেমন যেনো ঠান্ডা হয়ে আছে মেয়েটা।
“শোন মা, তোকে আজ কিছু কথা বলবো। একজন বাবা হয়ে এমন পরিস্থিতিতে যেটা বলা শোভন মনে হচ্ছে, তাই-ই বলবো। মন দিয়ে শুনবি।”
আশা ছোট্ট করে বললো,”মন দিয়েই শুনবো বাবা।”
“আমি জানিনা তোর কি হয়েছে। তবে আমি নিশ্চিত তুই স্বাভাবিক নেই। আমি জোর করবো না। জোর করার বয়সও নেই তোদের এখন। বাবার কাছে সন্তান সবসময় ছোটই থাকে, কিন্তু সন্তান হুট করে বড় হয়ে যায়। বাবা মা কে দূরের কেউ মনে করে। তবে তুই যাই করিস কখনো ভয় পাবি না। যদি মনে করিস তুই তোর জায়গায় ঠিক, তুই সত্য তাহলে দুনিয়ার আর কিছুতেই ভয় পাবি না। মাথা উঁচু করে বাঁচবি। কেউ অন্যায় করলে সর্বোচ্চ চেষ্টা করবি তাকে শাস্তি দিতে। আগে নিজের ভুলটা খোঁজার চেষ্টা কর। যদি দেখিস তোর কোনো ভুল নেই তবে যে তোর সাথে খারাপ করতে চাইবে তাকে শাস্তি দিতেই হবে তোকে। কখনো নিজেকে একা মনে করবি না। সবসময় তোর বাবা আর তোর ভাই তোর সাথে আছে। দুনিয়ার আর কেউ না থাকলেও আমরা আছি। আমরা তোর সুখের জন্য দুনিয়া উলোটপালোট করে দিতে পারি।”
আশার চোখে শ্রাবণের ধারা ভর করে। ছলছল চোখে অন্যদিকে তাকায়, অশ্রু লুকানোর চেষ্টা করে বাবার কাছ থেকে।
“যারা দূর্বল তারা কাঁদে মা। যারা সাহসী তাদের চোখে পানি মানায় না। তুমি সাহসী, তুমি আমার সাহসী কন্যা। তুমি কেনো কাঁদবে? চোখ মুছে এদিকে তাকাও।”
আশা কাঁপা হাতে চোখ মোছে কিন্তু বাবার দিকে তাকায় না।
“বাবা।”
“বলো।”
“কোনোদিন যদি জানতে পারো আমি অনেক বড় অন্যায় করেছি, তুমি কি তা বিশ্বাস করবে? আমাকে অবিশ্বাস করবে তুমি?”
রাশেদুল স্তম্ভিত হয়ে যায় মেয়ের কথায়।
“আশা…”
“বলো বাবা, আমার উপর বিশ্বাস আছে তোমার? আমি যে তোমার শিক্ষায় বড় হয়েছি। আমি কোনো অন্যায় করতে পারিনা। এই বিশ্বাস আছে তোমার?”
রাশেদুল আস্তে আস্তে মাথা নেড়ে বললো,”আছে, অবশ্যই আছে।”
আশার মুখে এক চিলতে হাসি ফুটে ওঠে। বাবার কথায় সাহস পাচ্ছে সে। নতুন উদ্যোমে বেঁচে থাকার আগ্রহ জন্মায়। তাই তো! সে কোনো অন্যায় করেনি। সে কেনো ভয় পাবে? বরং যে অন্যায় করেছে, শাস্তি সে পাবে। অবশ্যই পাবে। এ শাস্তি সে নিজেই দিবে।
আশা বাবার বুকে মাথা রাখে। রাশেদুল কিছু না বুঝে চুপচাপ বসে থাকে। বুকটা কেমন খাঁ খাঁ করতে থাকে তার।
★
উন্মাদের মতো ছুটছে আরশাদ। কোথায় যাচ্ছে সে জানেনা, শুধু জানে এই মুহুর্তে ইরা কে না পেলে তার কি হবে সে জানেনা। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে আসছে। কিছুক্ষণ আগেই সূর্য উঠেছে। ব্যস্ত রাস্তা এখনো তেমন জমজমাট হয়নি। রাস্তায় যে ক’জন আছে সবাই অবাক হয়ে আরশাদের দিকে তাকাচ্ছে। একটি অতি সুদর্শন পুরুষ, ঘর্মাক্ত হয়ে ছোট্ট শিশুর তো দৌড়াচ্ছে। তার চোখ লাল, শরীর কাঁপছে। তবুও থামছে না।
এই অচেনা জায়গায় কোথায় খুঁজবে সে মেয়েটাকে? এই অস্বাভাবিক টান শুধুমাত্র দায়িত্বের খাতিরে তৈরি হতে পারে কিনা আরশাদের ভাবার অবকাশ নেই আপাতত। ইচ্ছা করছে রাস্তায় বসে চিৎকার করে কাঁদতে। শরীর চলছে না, হাঁপাচ্ছে সে।
লাবনী বীচ পয়েন্ট তাদের হোটেলের পাশেই। আরশাদ সেদিকেই ছুটছে। তার কেনো যেনো মনে হচ্ছে সেখানে ইরাকে পেলেও পেতে পারে। কেনো মনে হচ্ছে জানেনা, কিন্তু তার শরীর ওদিকেই টানছে। ইরা কি এতোটা অবিবেচকের মতো কাজ করবে? এমন তো মনে হয়নি এই ক’দিনে তাকে। তাকে না জানিয়েই বেরিয়ে যাবে?
নাকি ওর কোনো বিপদ হলো? যদি তা-ই হয়, ইরাকে সে এখন কোথায় খুঁজে পাবে? আর খুঁজে না পেলে কি করবে সে? জানেনা…
★
বীচ ফাঁকা প্রায়। অল্প কিছু মানুষ ঘোরাঘুরি করছে। আরশাদ পাগলের মতো এদিক ওদিক খোঁজে। কোথাও পায়না। কিন্তু তার মন বলছিলো সে ইরা এখানে থাকবে। এতোক্ষণ শরীরে যে শক্তিটুকু ছিলো তা হাওয়ায় উড়ে যায়।
বালুর উপরেই হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে আরশাদ। দুই হাতে মুখ ঢেকে চিৎকার করে ওঠে সে। উপস্থিত বাকিরা অবাক হয়ে তাকায়। আরশাদের আর্তচিৎকারে বাতাস ভারী হয়ে ওঠে।
“ইরা মাই লাভ, হোয়্যার আর ইউ? আই অ্যাম ডায়িং লাভ, প্লিজ সেভ মি….”
(চলবে….)
#মন_কেমনের মরশুম
পর্ব: ১৬
“আপনি এখানে?”
ভয়ার্ত, বিস্মিত এক রিনরিনে গলার আওয়াজে ঈষৎ কেঁপে ওঠে আরশাদ। সে জানে তার হ্যালুসিনেশন হচ্ছে। তার অবচেতন মন তাকে সান্ত্বনা দিচ্ছে ইরা তার সামনে। মাথা তুললেই দেখবে ইরা নেই, কোথাও নেই।
ইরা হতবিহ্বল, সে বুঝতে পারছে না আরশাদ এখানে কীভাবে। মাটিতে বসে আর্তনাদই বা করছে কেনো? তার জন্য?
ইরাও বসে পড়ে আরশাদের মুখোমুখি। বিস্ফারিত চোখে তাকায় আরশাদের দিকে। চোখমুখ রক্তের মতো লাল হয়ে আছে তার। ইরা ভয় পেয়ে যায় সাথে সাথে।
“আপনার কি হয়েছে? এমন করছেন কেনো?”
আরশাদ চোখ তোলে। ঠিক তখন সূর্য মেঘের ফাঁকফোকর দিয়ে উঁকি দিচ্ছে। রাতের আঁধার ছিদ্র করে এক নতুন দিনের সূচনা জানান দিচ্ছে সে।
সেই পবিত্র আলোর ছিঁটেফোঁটা এসে পড়েছে ইরার মুখে। তাকে একটা সদ্য পরিস্ফুটিত জেসমিন ফুলের মতো লাগছে, কস্তুরির গন্ধ মাখা যার কেশ।
আরশাদ হঠাৎ ভীষণ ক্লান্তি অনুভব করে। খুব ধীরে শ্বাস পড়ছে তার। ইরা অপলক তাকিয়ে আছে তার দিকে। তার চোখমুখে ভীতি উপচে পড়ছে।
“ইরা….”
আরশাদের ফ্যাসফ্যাসে কণ্ঠ আরো বিগলিত করে দেয় ইরাকে। ঢোক চাপে সে ভয়ে।
“আপনার কি হয়েছে? আপনি এখানে কীভাবে এলেন?”
আরশাদ খুব সাধারণ এবং শান্তভাবে জিজ্ঞাসা করে,”প্রশ্নটা তো আমার করার কথা। তুমি এখানে কেনো?”
আরশাদ খুব শান্ত হয়ে আছে। কিন্তু ইরার মনে হলো সবটা ঠিক নেই, কোথাও একটা ঝামেলা হয়েছে। বড়সড় একটা অঘটন ঘটিয়ে ফেলেছে সে। ইরা চুপ থাকে।
“কি হলো ইরা? বলো? তুমি এখানে কেনো?”
ইরা ক্ষীণ গলায় বললো,”ঘুম আসছিলো না আমার। সমুদ্র পাড়ের সূর্যাস্ত সেদিন দেখলাম। ভাবলাম সূর্যোদয়টাও না জানি কতো সুন্দর হবে। আর কোনোদিন আসতে পারি বা না পারি, তাই…”
আরশার ছোট্ট করে হেসে বললো,”আর তাই আপনি আমাকে না জানিয়ে একা একা বেরিয়ে এলেন সূর্যোদয় দেখার জন্য। তাই তো ইরাবতী?”
আরশাদের এমন অদ্ভুত আচরণ ইরার বুকে কাঁপন ধরিয়ে দেয়। হঠাৎ সে বুঝতে পারে কতোবড় একটা ভুল করে ফেলেছে সে।
“স্ত্রী হিসেবে আমি সবসময় স্পষ্টভাষী মেয়ে চেয়েছিলাম। যে আমার চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলার সাহস রাখে। আপনাকে তো তেমনটাই মনে হয়েছিলো। কিন্তু এখন আপনি চুপ কেনো? কি যুক্তি আছে আপনার কাছে? দিন…”
“আমি আসলে আপনাকে জাগাতে চাইনি। আপনি ক্লান্ত হয়ে ঘুমাচ্ছিলেন। আমি ভেবেছি অল্প সময়ের মধ্যেই ফিরে যাবো। পরে আপনি ঘুম থেকে উঠলে বলবো।”
আরশাদ অদ্ভুত ভাবে হাসতে হাসতে উঠে দাঁড়ায়। ইরাও ওঠে। নিজের করা ভুলের জন্য ভীষণ রকম আফসোস হচ্ছে তার। জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।
“আচ্ছ, বুঝলাম। এরমধ্যে যদি আপনাকে কেউ তুলে নিয়ে চলে যেতো? আপনি নিশ্চয়ই তাতে ভীষণ খুশি হতেন। কারণ আমাকে তো আপনার পছন্দ না। স্বামী হিসেবে আমি এতোটাই ব্যর্থ যে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আমাকে জানানোর প্রয়োজন মনে করেন না।”
ইরা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে। ইচ্ছা করছে সমুদ্রে ঝাঁপ দিতে। নিজের উপর রাগে নিজেকেই শেষ করে দিতে ইচ্ছা করছে।
“মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে কি প্রমাণ করতে চাচ্ছেন? আপনি নিরপরাধ?”
ইরা আরশাদের চোখে চোখ রেখে তাকায়। কণ্ঠের উদীয়মান উত্তাপ দৃষ্টিতে ছড়িয়েছে। এতোগুলো দিন ইরা যে চোখে এক বিন্দু প্রেম খুঁজে বেরিয়েছে, সেই চোখ দেখে ইরা এই প্রথমবারের মতো ভয় পায়। ঝড়ের আগে পরিবেশ যেমন শান্ত থাকে, আরশাদ তেমন আছে। যে কোনো সময় আছড়ে পড়বে।
“আপনি কেনো এভাবে খুঁজছিলেন আমাকে? আমি হারিয়ে গেলে কি হতো? আপনি তো আর আমাকে ভালোবাসেন না।”
আচমকা আরশাদ ঝড়ের বেগে উপরে হাত ওঠায়। ইরা চমকে ওঠে। দুই হাতে মুখ ঢাকে সে।
আরশাদ কিছুটা ধাতস্থ হয়ে হাত মুষ্টিবদ্ধ করে ফেলে। হাত নেমে যায় সাথে সাথে। কিন্তু রাগের পারদ নামে না, হু হু করে বাড়তে থাকে।
ইরা মুখের উপর থেকে হাত সরিয়ে বললো,”মারুন, থামলেন কেনো?”
আরশাদ ইরার দুই বাহু শক্ত করে ধরে ইরার চোখে চোখ রাখে।
“তাকাও আমার দিকে, এই মেয়ে তাকাও বলছি।”
ইরা তাকায়, গভীর চোখ দু’টো ভালোবাসার জানান দিচ্ছে। মন কেমনের মরশুমটা হঠাৎ মন ভালো করার মরশুম হিসেবে ধরা দিচ্ছে যেনো।
“আজ যদি কাপুরুষ হতাম, হয় তোমাকে আর নাহয় আমার নিজেকে শেষ করে দিতাম। কিন্তু আফসোস, সৃষ্টিকর্তা আমাদের পুরুষদের অসীম সহ্যশক্তি দিয়ে দুনিয়ায় পাঠিয়েছে। আর কোনোদিন যদি আমার অনুমতি ছাড়া, আমাকে না জানিয়ে আমার দৃষ্টিসীমার বাইরে যাও খোদার কসম বলছি সেদিন তুমি আমার অন্য রূপ দেখবে যা কখনো দেখোনি কিংবা যা আমি তোমাকে দেখাতে চাইনি।”
ইরাকে ছেড়ে দেয় আরশাদ। কিছুটা দূরে ছিটকে যেয়ে পড়ে ইরা। হাতের দুই পাশ ব্যথায় টনটন করছে।
লজ্জায়, অপমানে এতোটুকু হয়ে গেছে সে।
“হোটেলে চলো, এক্ষুনি রওনা দিবো আমরা।”
ইরাকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই আরশাদ দ্রুত বেগে হাঁটতে থাকে। পিছন পিছন গুটিগুটি পায়ে ইরা। অন্যদিন পাশাপাশি হাঁটার সময় আরশাদ তার পাশেই হাঁটে, আস্তে আস্তে। যাতে ইরা তাল মেলাতে পারে তার সাথে। কিন্তু আজ তার চারপাশ থেকে যেনো আগুনের লেলিহান শিখা জ্বলছে। ইরা কাছাকাছি গেলেই পুড়ে ভস্ম হয়ে যাবে।
★
মধ্য সকাল, চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে পাড়ি জমিয়েছে আরশাদ আর ইরা। ঝড়ের বেগে ছুটে চলছে আরশাদের বাইক। এদিকে আকাশ মেঘে কালো, যে কোনো মুহুর্তে ভেঙেচুরে বৃষ্টি নামবে। ইরার পরনে একটা কালো রেইনকোট, এটা আরশাদের। আরশাদ তাকে দিয়েছে, নিজে পরেনি।
কিছুক্ষণের মধ্যেই একূল ওকূল ছাপিয়ে শ্রাবণ ধারা নামে। ঠিক যেমন তাদের বিয়ের দিন নেমেছিলো। রাস্তার এক হাত দূরের কিছু দেখা যায়না। আরশাদের শরীর ভিজে জবজব করছে। হেলমেটটাও পরেনি, অবাধ্য চুলগুলো কপালে এসে ভীড় করেছে।
ইরা মৃদু গলায় বললো,”কোথাও নেমে দাঁড়াই আমরা? বৃষ্টি কমলে আবার রওনা করবো। আপনি তো ভিজে চুপসে যাচ্ছেন। এমনিতে অসুস্থ…”
আরশাদ উত্তর দেয়না, মোটরসাইকেলের গতি আরো বাড়িয়ে দেয়।
“অন্তত রেইনকোটটা পরুন। আমি সহজে অসুস্থ হইনা, এসবে আমি অভ্যস্ত।”
তবুও উত্তর নেই। বৃষ্টিতে এক হাত দূরের কিছু দেখা যাচ্ছে না, সেখানে আরশাদ পাগলের মতো মিনিটে মিনিটে গতি বাড়াচ্ছে মোটরসাইকেলের। একটা অঘটন যদি ঘটে? তার উপরের রাগ, যেনো সে বাদে বাকি সবকিছুর উপর দেখাচ্ছে।
“তাহলে আমিও রেইনকোট খুলে ফেলবো, আমিও ভিজবো।”
আরশাদ খুব ছোট্ট একটা দৃষ্টি ফেলে লুকিং গ্লাসে। ইরা খুলতে যেয়েও থেমে যায়। কেনো যেনো এই মুহুর্তে ভয় পেতেও অদ্ভুত রকম ভালো লাগছে তার। এক অন্যরকম অনুভূতি হচ্ছে। এ অনুভূতি কি তবে ভালোবাসার সমার্থক শব্দ?
★
রোজ সকালে এক কাপ চা নিয়ে রাস্তার পাশের বড় বারান্দাটাতে বসে নীলু। দিনের সূচনাটা চা ছাড়া তার জমে না। যদিও মাঝে কিছুদিন সবকিছু এলোমেলো হয়েছিলো তার। কিছুই ভালো লাগতো না। কিন্তু আজ কি মনে করে আবার সেই পুরোনো জীবনে ফিরে যেতে ইচ্ছা করছে।
খুব ভোরে উঠে গোসল দিয়েছে আজ সে। ভীষণ ফুরফুরে লাগছে। নিজের মতো করে বাঁচতে ইচ্ছা করছে। এই জীবনটা তার, শুধুই তার। সে কষ্ট পেলে, যন্ত্রণায় ছটফট করলে কারো কিছু যায় আসেনা। তবে এই জীবনের মালিকানা কেনো অন্য মানুষের হাতে থাকবে?
কাল সারারাত নিজের সাথে যুদ্ধ করেছে নীলু। নতুন করে গুছাবে সে জীবনটা এবার। যাতে তাকে কষ্ট দেওয়া মানুষগুলোই তাকে দেখে অনুপ্রাণিত হয়, এভাবেও ফিরে আসা যায়।
আজ পরেছে শ্বেতশুভ্র একটা পাতলা শিফনের শাড়ি, সাদা ব্লাউজ, ভেজা চুল। চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে বারান্দার রেলিঙ ঘেঁষে দাঁড়ায়। জোরে শ্বাস নেয় কয়বার। মেঘ গুমোট মেরে আছে, হয়তো আবারও জোর বৃষ্টি নামবে। নীলুর খারাপ লাগেনা সব মিলিয়ে।
হঠাৎ নীলুর চোখ যায় বড় রাস্তার বিপরীতে, একটা কুকুর অসুস্থ অবস্থায় পড়ে আছে। বোধহয় গাড়ি উঠে গেছে পায়ের উপর দিয়ে। মানুষ হলে মারাই যেতো, পশু বলেই বেঁচে আছে।
কিন্তু কথা সেখানে নয়, রোশান হাঁটু মুড়ে বসে আছে কুকুরটার সামনে। তাকে খাবার খাওয়াচ্ছে খুব যত্ন করে। পাশেই আরেকজন দাঁড়িয়ে, তার হাতে একটা ইঞ্জেকশন। বোধহয় কুকুরটির জন্য। নীলু আগ্রহ নিয়েই অপেক্ষা করে তারা কি করে দেখার জন্য।
রোশান কুকুরটিকে খাবার আর ওষুধ খাওয়ায়। এই ফাঁকে দাঁড়ানো লোকটি ইঞ্জেকশন দেয়। রোশান কিছুক্ষণ কুকুরের মাথায় হাত বুলিয়ে উঠে দাঁড়ায়। পকেট থেকে স্যানিটাইজার বের করে হাতে মাখে। পুরো ব্যাপারটা নীলুর এতো ভালো লাগে। সে চায়ের কাপে আস্তে আস্তে চুমুক দেয় আর তাকিয়ে থাকে ওদিকে।
“ছেলেটা অসাধারণ, কি বলিস?”
নীলু বেশ চমকে উঠে পিছনে তাকায়। তার বাবা হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছে, তার দৃষ্টিও রোশানের দিকেই।
“কার কথা বলছো বাবা?”
“রোশানের কথাই বলছি। দুঃস্থ মানুষজন, রোগীদের প্রতি অগাধ ভালোবাসা ওর। পশুপাখিদের উপরও কম না। কতো অসুস্থ বিড়াল কুকুরকে যে সুস্থ করে তোলে, নিয়ম করে ওষুধ, খাবার খাওয়ায় ঠিক নেই।”
“ও আচ্ছা।”
“ছেলেটার সবদিকে জ্ঞানও অসাধারণ। ওর সাথে হাঁটাহাঁটি করি তো, অনেক কিছুই শিখি ওর কাছ থেকে। এই বয়সে এসেও অনেক কিছু জানিনা, ওর কাছ থেকে জানি, শিখি।”
নীলু উত্তর দেয়না। রোশান ততক্ষণে চলে গেছে। কুকুরটা আরাম করে শুয়ে আছে, বোধহয় ব্যথাটা একটু কমেছে।
“এমন একটা ছেলেকে কীভাবে কেউ প্রতারণা করে চলে যেতে পারে বল তো?”
নীলু মৃদু হেসে বললো,”বাবা মানুষকে এতো সহজে বিশ্বাস করে ফেলো না। মানুষকে তুমি ততটাই চিনবে, যতটা সে তোমাকে দেখাবে। তুমি মানুষের বাহ্যিক রূপ দেখে তাকে বিচার করে ফেলো। নিশ্চয়ই উনি তোমার সাথে এমন আচরণ করবেন না যেটা উনি উনার স্ত্রীর সাথে করতে পারেন। হতে পারে উনার খারাপ আচরণের জন্যই উনার স্ত্রী উনাকে ছেড়ে চলে গেছে। একপাক্ষিক কিছু দেখে বিচার করা বোকামি। উনার বাবা উনাদের ঠকিয়েছেন, হতে পারে উনি উনার বাবার মতো।”
নিজাম হোসেন বেশ অবাক হয়ে মেয়ের দিকে তাকায়। নীলুর চা শেষ। সে এখনো তীক্ষ্ণ চোখে কুকুরটির দিকে তাকিয়ে আছে। তবে তার কথাগুলোতে যুক্তি আছে।
নিজাম হোসেন চাপা গলায় বললো,”তোর অনুমান শক্তি মনে হচ্ছে ভালো।”
“জি বাবা ভালো। শুধু ভালোই নয়, খুব ভালো। এখন আমি এটা খুব ভালো করে অনুমান করতে পারছি তুমি মনপ্রাণ দিয়ে চাচ্ছো তোমার ওই ভালোমানুষ ডাক্তারের সাথে আমার কিছু-মিছু হোক। আমি যেনো তার প্রেমে পড়ি আর অবশেষে বিয়েও করি। কিন্তু তোমাকে অতি দুঃখের সাথে জানাচ্ছি আমি আর প্রেমে পড়বো না। বিয়েও করছি না আপাতত। আমি আরো অনেক বছর তোমার ঘাড়ে সিন্দাবাদের ভূতের মতো চেপে বসে থাকবো। তুমি নামাতে চাইলেও নামবো না।”
নিজাম হোসেন ঢোক চাপে। মেয়ের কাছে ধরা পড়ে যাওয়াটা আসলেই বিব্রতকর।
“তাহলে তুই এখন কি করবি?”
“আপাতত আমি আরো এক কাপ চা বানিয়ে খাবো। কারণ চা’ টা আজ অপূর্ব হয়েছে। আজ সারাদিন আমি চা বিলাশ করতে চাচ্ছি। তুমি খেতে চাও? ঝিম মেরে বসে থাকো, আমি এনে দিচ্ছি।”
নীলু মেলট্রেনের গতিতে কথাগুলো বলে বেরিয়ে যায় সেখান থেকে। নিজাম হোসেন রকিং চেয়ারে যেয়ে বসে, ঝিম মেরে।
মেয়েটা তার মায়ের মতো হয়েছে। কম বয়সে মেয়ের মা বুদ্ধিমতী ছিলো ভীষণ কিন্তু দেখে মনে হতো বোকা। বেশি বয়সে এসে বুদ্ধি তার বাড়তো কি কমতো নিজাম হোসেন বুঝতে পারছে না। কারণ তার আগেই সে পাড়ি জমিয়েছে অন্য ঠিকানায়। নীলুর মধ্যে নীলুর মায়ের ছায়া স্পষ্ট দেখতে পায় নিজাম হোসেন।
★
শরীরটা একটু খারাপ হওয়ায় আজ কলেজ থেকে ছুটি নিয়েছে রাশেদুল। বসার ঘরে আয়েশ করে চা খেতে খেতে খবরের কাগজ পড়ছে। রাবেয়া বেগমও সেখানে।
হঠাৎ ঝড়ের মতো প্রবেশ আরশাদ আর ইরার। আরশাদের পুরো শরীর ভিজে আছে, চুল থেকে টপটপ করে পানি পড়ছে। ইরাও ভেজা তবে অনেকটাই কম। তাদের মুখ দেখে মনে হচ্ছে না তারা মধুচন্দ্রিমা থেকে ফিরেছে। মনে হচ্ছে কোনো ঝড় মোকাবিলা করে ফিরেছে এই মাত্র।
“আরশাদ…”
আরশাদ বাবার দিকে তাকায়, উত্তর দেয়না। ইরার মুখে কিছুটা দুশ্চিন্তার ছাপ।
রাবেয়া বেগম ছুটে যেয়ে ছেলের সামনে দাঁড়ায়।
“এ কি অবস্থা তোর? এভাবে ভিজেছিস কীভাবে?”
“বৃষ্টিতে ভিজেছি মা, আর কীভাবে ভিজবো?”
রাবেয়া তীক্ষ্ণ চোখে ইরার দিকে তাকায়। নিশ্চয়ই এই মেয়ের কারণে তার ছেলের মেজাজ খারাপ।
রাশেদুল শান্ত গলায় বললো,”পথিমধ্যে যদি বৃষ্টি আসে তাহলে কোথাও অপেক্ষা করতে পারতে। এভাবে ভেজাটা ভালো কথা নয়, তাইনা? যাই হোক তোমরা ঘরে যাও, ভেজা কাপড় পালটে নাও। বাকি কথা পরে শুনবো।”
রাবেয়া বেগম কিছু বলতে গেলে রাশেদুল তাকে থামিয়ে দেয়।
আশা নিজের ঘরের দরজা থেকে মাথা বের করে ইরার দিকে তাকায়। ইরা তার দিকে তাকাতেই চোখ নামিয়ে নেয়।
আরশাদ আশার দিকে তাকিয়ে বললো,”আমাকে এক মগ কফি বানিয়ে দিয়ে যা তো।”
কথাটা বলে সে আর দাঁড়ায় না, ঘরে চলে যায়।
ইরাও পিছন পিছন যেতে গেলে হঠাৎ তার হাত খপ করে ধরে ফেলে রাবেয়া। ইরা অপ্রস্তুত হয়ে যায়।
“এই মেয়ে কি হয়েছে আমার ছেলের? ও এতো রেগে আছে কেনো? নিশ্চয়ই তুমি কিছু বলেছো ওকে।”
ইরা কিছু বলার আগেই রাশেদুল বিরক্ত হয়ে বললো,”কি হচ্ছে রাবেয়া? ওরা মাত্র এলো, এখনই এসব বলতে হবে কেনো? ওকে ছেড়ে দাও।”
রাবেয়া চিৎকার করে ওঠে।
“হ্যা সব তো ছেড়েই দিয়েছি। আর ছেড়ে দিয়েছি বলেই তোমরা বাপ ছেলে মিলে এই চালচুলোহীন মেয়েটাকে মাথায় তুলে ফেলেছো। এখন সে তার আসল রূপ দেখানো শুরু করেছে। ভালো ঘরের মেয়ে হলে এতোদিন বাবা মা খোঁজ না নিয়ে পারতো? যতো যা-ই হোক। ভোলাভালা রূপ দেখে গলে জল একদম তোমরা। একটা কথা শুনে রাখো, বুনো ফুল যতোই সুন্দর হোক তারা জঙ্গলেই মানায়। তাদের দিয়ে ঘর সাজানো যায়না। ঘর সাজাতে গোলাপ কিংবা রজনীগন্ধার প্রয়োজন হয়।”
ইরার বুকটা খচখচ করে উঠলো। তার মা নাহয় নিজের না, কিন্তু বাবাটা তো তার নিজের। সে কি একটাবার মেয়েটার খোঁজ নিতে পারলো না? কার হাত ধরে মেয়েটা বেরিয়ে এলো। মেয়েটা আদৌ বেঁচে আছে নাকি মারা গেছে। ওই মানুষটা তো বাবা হওয়ার প্রথম অনুভূতি ইরাকে ছুঁয়েই পেয়েছিলো। তবে কেনো এই অবহেলা?
এক আকাশ অভিমান ভর করে ইরার বুকে। আরশাদের মায়ের কথায় না, তার নিজের বাবার উপর। দ্বিতীয় স্ত্রী আর সেই ঘরের ছেলেমেয়েরাই সব তার কাছে? সে কিছুই না?
রাশেদুল কিছু বলার আগেই ঘর থেকে আরশাদ বেরিয়ে আসে। মায়ের দিকে তাকায় সে শান্ত দৃষ্টিতে।
“মা ইরা বুনোফুল নাকি গোলাপ তা আমার জানার দরকার নেই। ও আমার স্ত্রী, ওর সৌন্দর্যেই আমার ঘর সাজবে। ওর সুগন্ধেই আমার ঘর সুশোভিত হবে। কারণ ও ফুলদানিতে সাজানো ফুল না, ও বাগানে ফোঁটা ফুল। ও ঝরে পড়ে যাবেনা, ও আরো হাজারটা ফুলের সূচনা ঘটাবে।”
কথাটা বলেই আরশাদ ইরার দিকে তাকায়। ইরা চোখে এক সমুদ্র মায়া নিয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে।
“এভাবে পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছো কেনো? বাবা আমার বাথরুমে যাওয়ার তাড়া ছিলো। এজন্য বৃষ্টির মধ্যেও অপেক্ষা করতে পারিনি। বোধহয় ইরাকে আর কোনো প্রশ্ন করবে না তোমরা।”
ইরা হতবাক হয়ে যায়, আরশাদ তাকে বাঁচানোর জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছে। এই এক জীবন যদি ওই মানুষটার পায়ের কাছে বসে থেকে কাটিয়ে দেওয়া যায়, তাহলেও কি তার মুগ্ধতা কাটানো সম্ভব হবে?
রাবেয়া বেগম ইরার হাত ছেড়ে দেয়। রাগে গজগজ করতে করতে অন্য দিকে চলে যায়। রাশেদুল মুচকি হাসে তাদের দিকে তাকিয়ে, কিছু বলেনা।
★
“আপনার কফি।”
আরশাদ চুল মুছতে মুছতে তাকিয়ে দেখে ইরা এক মগ ধোঁয়া ওঠা কফি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এখনো বাইরের কাপড়টাও পাল্টায়নি।
“আশাকে বলেছিলাম তো।”
ইরা আস্তে আস্তে বললো,”আমার কাজটা আমি করি। এটুকু অধিকার বোধহয় আমাকে দেওয়াই যায়।”
আরশাদ তার হাত থেকে মগটা নিয়ে বারান্দায় যেয়ে বসে। পাখিগুলোকে আশা নিশ্চয়ই খাবার দিয়েছে, সে বলেই গিয়েছিলো। কিচমিচ করছে পাখি দু’টো বৃষ্টি দেখে।
ইরা পিছু পিছু এসে দাঁড়ায়। আরশাদ তাকায় না তার দিকে।
“আমার ভুল হয়েছে।”
আরশাদ সামনের দিকে তাকিয়েই বললো,”কি ভুল হয়েছে? আমাকে বিয়ে করা?”
ইরা ঈষৎ হেসে বললো,”যদি কোনো ম্যাজিকে জীবন আবার প্রারম্ভিক থেকে শুরু করা যেতো, সব ভুল শোধরানোর সুযোগ পাওয়া যেতো তবুও আমি জীবনের এই সন্ধিক্ষণে এই ভুলটাই করতাম। কারণ কিছু ভুল ফুল হয়ে মানুষের জীবনে ফোটে। আপনি আমার জীবনের ভুল না, আমার সৌভাগ্য।”
আরশাদ ভ্রু কুঁচকে তাকায়। এই কথাগুলো ভীষণ পরিচিত তার। কোথায় যেনো শুনেছে।
“তাহলে কোন ভুলের কথা বলছো?”
ইরা কিছুটা এগিয়ে আসে আরশাদের দিকে।
“আপনার অনুমতি না নিয়ে আমি আর কোথাও যাবো না কখনো।”
“সে তোমার ইচ্ছা।”
“ক্ষমা চাচ্ছি তো। পা ধরলে ক্ষমা করবেন?”
আরশাদ কফির মগটা পাশে রেখে ইরাকে ইশারা করে সামনের চেয়ারে বসতে। ইরা কিছুটা ইতস্তত করে বসে।
“তুমি আজ যা করেছো তা অন্যায়। আমি জানিনা ওই সময়টুকু কীভাবে পার করেছি আমি। আমার মাথা এলোমেলো হয়ে গিয়েছিলো। নিজেকে উন্মাদের মতো মনে হচ্ছিলো। মনে হচ্ছিলো আমি কিছু একটা হারিয়ে ফেলেছি, যা আমার কাছে অমূল্য। খুব উদ্ভট আচরণ করেছি আমি ওই সময়। হোটেল কর্তৃপক্ষের সাথে খারাপ ব্যবহার করেছি, যেখানে তাদের কোনো দোষ ছিলোনা। ওইযে বললাম আমার মস্তিষ্ক কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছিলো। আমি অনুভূতি প্রকাশে কাঁচা ইরা, এ সম্পর্কে আমার ধারণা কম। তুমি প্রমাণ চেয়েছিলে আমার ভালোবাসার। আমি প্রমাণ দিতে পারিনি। ভালোবাসা তো আর পীথাগোরাসের উপপাদ্য নয় সে যখন তখন দুই পাতা লিখেই প্রমাণ দেওয়া যায়। তবে হ্যা তোমার অনুপস্থিতি আমার কষ্ট দিয়েছে, যন্ত্রণা দিয়েছে। জানিনা এটা তোমার কাছে ভালোবাসা নাকি শরীরের প্রতি টান। ওই সময় তো আমার তোমার শরীর নয়, তোমাকেই প্রয়োজন ছিলো।”
আরশাদ থামে। ইরার চোখের কোণে দুই ফোঁটা পানি ভীড় করে। তার মতো এক দুর্ভাগা মেয়ে সত্যিই এমন একজন সুপুরুষের ভালোবাসা পেতে পারে? এ কি ভ্রম নাকি বাস্তব?
“তুমি কি আমাকে আরেক মগ কফি বানিয়ে দিতে পারবে? যদি তোমার কষ্ট না হয়।”
ইরা সাথে সাথে উঠে দাঁড়ায়।
“এক্ষুনি দিচ্ছি।”
ইরা চলে যেতে গেলে হঠাৎ আরশাদ তাকে থামায়।
“থাক প্রয়োজন নেই, লাগবে না।”
ইরা মুখ টিপে হাসে। আরশাদ কিছুটা অবাক হয়।
“কেনো? ক্যাফেইন দরকার নেই?”
আরশাদ ইরার প্রশ্রয় বুঝতে পারে। তার দিকে তাকিয়ে ঠোঁট কামড়ে হাসে। হাসিটা অন্যরকম, ইরার শরীর শিরশির করে ওঠে দেখে।
“মাঝে মাঝে ক্যাফেইন দিয়ে কিছু হয়না। ক্যাফেইনের চেয়েও বেশি কিছু লাগে। এই মুহুর্তে মনে হচ্ছে আফিম লাগবে। কড়া নেশা ধরানো আফিম।”
ইরা হেসে বারান্দা থেকে চলে যায়।
আরশাদ চেয়ারে শরীর এলিয়ে দেয়। তার যে নেশা এখন প্রয়োজন তা ক্যাফেইন কিংবা আফিমে নয়, অন্য কিছু লাগবে। যা কফি কিংবা সিগারেটে পাওয়া যাবে না।
“তোমাতে উদ্ধিগ্ন, তোমাতেই রই মগ্ন। ও প্রেম তুমি ক’জনার কাছে দাও ধরা? আমি যে উতলা ভ্রমর, ফুলের ডাকে দিয়েছি সাড়া। আমি উত্তপ্ত শিখা, তুমি শীতলতায় মোড়া চাঁদ। তোমাতে সর্বস্ব খুইয়েছে এ ভ্রমর, তুমি মরণ ফাঁদ।”
ভ্রমরের সর্বশেষ লেখাটা দু’দিন আগেই শুনেছে সে। এ লেখা তার জীবনের সাথে মিলে যাবে কোনোদিন ভাবতে পারেনি এর আগে। এ যে তার জীবনেরই প্রতিচ্ছবি…
(চলবে…)

