Home "ধারাবাহিক গল্প মন কেমনের মরশুম মন কেমনের মরশুম পর্ব-১৯+২০

মন কেমনের মরশুম পর্ব-১৯+২০

0
348

#মন_কেমনের মরশুম

পর্ব: ১৯

সকালের রোদ চোখে পড়তেই আধো চোখে তাকায় আরশাদ। ঘন শ্বাস ফেলে বিছানার আরেক পাশে তাকাতেই শরীরে নীরব এক শান্তি ভর করে। ইরা বসে আছে কাচুমাচু হয়ে, খাটের একদম কোণায়। বোধহয় গোসল করেছে। চুল বেয়ে টপ টপ করে পানি পড়ছে বিছানায়।
কুসুম রঙের একটা শাড়ি পরেছে সে। শাড়িটা আরশাদই এনে দিয়েছিলো তাকে। এর আগে কখনো পরেনি ইরা। সাধারণ সুতি শাড়ি৷ তাতেই কি ভীষণ মোহনীয় লাগছে তাকে। মনে হচ্ছে সে-ই বুঝি এক ফালি নিশ্ছিদ্র ভোরের কমলা রঙা রোদ। সে-ই ছড়াচ্ছে বর্ণচ্ছটা। একদম বউ বউ লাগছে তাকে। মনে হচ্ছে তাদের গতকালই নতুন বিয়ে হয়েছে, এর আগে যা হয়েছে সবই মিথ্যে। যা সত্য সব গতকাল থেকেই।

আরশাদ খাটে হেলান দিয়ে বসে। দুই হাত বুকে গুঁজে তাকায় ইরার দিকে। তার দৃষ্টিতে যতোটা মুগ্ধতা তারচেয়ে অনেক বেশি প্রেম। তার চেয়ে আর একটু বেশি দুষ্টুমি।

“নূরবউ…”
ইরা ভীষণ চমকে তাকায় আরশাদের দিকে। সকালের কোমল আলোয় তার সদ্য ঘুম ভাঙা চেহারা দেখে বুকটা ধক করে ওঠে ইরার। ফোলা ফোলা ঈষৎ লাল চোখ, মুখে দাড়িগোঁফের জঙ্গল যেনো। সিগারেট খেতে খেতে ধূসর বর্ণের ঠোঁটের কোণে একটা হাসি। ইরার কেমন নিয়ন্ত্রণহীন লাগে নিজেকে।

“এদিকে আসুন।”
ইরা মাথা নিচু করে বললো,”উহু।”
“কেনো? রাগ করেছেন?”
“না রাগ করবো কেনো?”
“রাগ করার তো অনেক কারণ আছে। রাতে…”
ইরা গাঢ় গলায় বললো,”চুপ করুন, চুপ করুন।”
আরশাদ কিছুটা ঝুঁকে এসে ইরার হাত ধরে টান দেয়। অপ্রত্যাশিত হালকা টানেই ইরা টাল সামলাতে না পেরে আরশাদের বুকের উপর যেয়ে পড়ে। তার লাজুক মুখ যেনো সকালের সৌন্দর্য বাড়িয়ে দেয় কয়েক গুণে।

আরশাদ ইরার চুলগুলো কানের পিঠে গুঁজে দিয়ে বললো,”কাছে আসতে চাচ্ছেন না কেনো? এখনো ভয় করছে?”
“জানিনা।”
“আপনাকে আমি একটা নামে ডেকেছি, নূরবউ। কেমন লেগেছে নামটা?”
“ভীষণ সুন্দর।”
“আমার শ্রদ্ধেয় দাদাজান তার বউকে মানে আমার দাদীকে এই নামে ডাকতেন। দাদীর নাম ছিলো নূরজাহান। সেখান থেকেই নূরবউ। ছোটবেলায় শুনতে ভীষণ ভালো লাগতো। দাদাজান যখন হাট থেকে ফিরে বাড়ি ঢোকার আগেই রাস্তা থেকে নূরবউ বলে ডাকতে ডাকতে আসতো, দাদীর মুখটা দেখার মতো হতো। ওই বয়সেও লজ্জায় মুখ লাল যেতো তার প্রতিবার। ওই সময়ই আমি ঠিক করেছিলাম, আমার বউকে আমি নূরবউ বলে ডাকবো। গত রাতের পর তো আপনি আমার সত্যিকারের বউ হয়ে উঠলেন। আপনার পছন্দ না হলে আর ডাকবো না।”
একরাশ ভালো লাগা আচমকা ধাক্কা খায় ইরার মনন জুড়ে। মাঝে মাঝে সবকিছু স্বপ্ন মনে হচ্ছে। কারণ সে কষ্ট পেয়েই অভ্যস্ত। হঠাৎ এতো সুখ ঠিক হজম হচ্ছে না তার।

“অসম্ভব সুন্দর ডাক। কিন্তু আপনার দাদীর নাম তো নূরজাহান ছিলো বলে দাদাজান নূরবউ ডাকতেন। আমার নামে তো নূর নেই।”
আরশাদ ছোট্ট করে হেসে বললো,”নূর মানে আলো, নূর মানে রোশনী। ঘুম থেকে উঠেই যে পবিত্র আলো আমি আমার ঘরে দেখলাম আপনাকে ঘিরে, তাতেই আমি মুগ্ধ। আপনিই তো নূর, আমার নূরবউ।”
ইরার শরীর শিরশির করে উঠলো। মাথা নিচু করে ঠোঁট কামড়াতে থাকে সে। কি বলবে? কি বলা উচিত এমন অসহ্য সুখের মুহুর্তে? যে সুখে মন নিজেই নিজেকে ঈর্ষা করা শুরু করে, সেই সুখই তো অসহ্য সুখ।

“আপনি উঠবেন না? নাশতা করতে হবে না? অফিসে যেতে হবে তো।”
আরশাদ ইরাকে আরেকটু শক্ত করে চেপে তার কাঁধে নাক ডুবিয়ে দেয়। ইরার ভেজা চুলের মিষ্টি ঘ্রাণে উন্মাদের মতো প্রেম অনুভূতি হয় তার।
ইরা শরীর শক্ত করে বসে থাকে।

“উঠতে তো ইচ্ছা করছে না আজ। মনে হচ্ছে এই ক্যাফেইনেই ডুবে বসে থাকি। কিন্তু কি আর করা। অফিসে গুরুত্বপূর্ণ কাজ আছে। তার আগে একবার হাসপাতালে যেতে হবে খালুকে দেখতে। উঠতে তো হবেই এখন। আপাতত ভুলভাল ক্যাফেইনই সই। চট করে এক মগ কফি বানিয়ে নিয়ে এসো। নাহলে উঠতে পারবো না এই ক্যাফেইন রেখে।”
ইরা জোর করে নিজেকে ছাড়িয়ে উঠে বসে বললো,”নিজে বানিয়ে খান আজকে। আমি পারবো না।”
আরশাদ কিছুটা অবাক হয়ে যায়। এ পর্যন্ত এমন একটা দিনও যায়নি যে আরশাদ ইরার কাছে কফি চেয়ে পায়নি। ইরা যে অবস্থাতেই থাকুক, বানিয়ে দিবেই। ছুটির দিনগুলোতে তো আরশাদ কফির উপরেই থাকে। ইরা একটুও বিরক্ত না হয়ে বানিয়ে দেয় যতোবার আরশার চায়। আজ কি হলো?

“পারবে না?”
ইরা মাথা নাড়ে আস্তে আস্তে।
“কোনো সমস্যা ইরা? মা কিছু বলেছে আবার?”
“না না, উনি কি বলবেন। উনি তো সম্ভবত এখনো হাসপাতাল থেকে ফেরেননি।”
“তাহলে?”
ইরা অন্যদিকে ফিরে শাড়ির আঁচল পেঁচাতে থাকে আঙ্গুলে।

“বলো কি হয়েছে? না বললে বুঝবো কীভাবে?”
ইরা কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থেকে ধীরে ধীরে গলার বাম পাশ থেকে চুল সরায়। উজ্জ্বল শ্যামলা শরীরের রঙের উপর গাঢ় বাদামী বর্ণের দাগ গোল হয়ে আছে। বেশ স্পষ্টই দেখা যাচ্ছে।

আরশাদ আঁৎকে ওঠে সাথে সাথে।
“এসব কি ইরা? কীভাবে হলো? কিসে কামড়ালো? বল্লা?”
ইরা কিছু বলতে আরশাদের দিকে তাকাতেই তার ফিচেল হাসি চোখে পড়ে। সাথে সাথে ভ্রু কুঁচকে ফেলে সে। বুঝেশুনে ইচ্ছা করে এমন করছে।

“দেখে যা মনে হচ্ছে বেশ বড়সড় বল্লা, ক্ষত তো গভীর।”
“আগামী পাঁচ মিনিট আপনি আমার সাথে কোনো কথা বলবেন না। একদমই না। আমি রাগ করেছি।”
“আচ্ছা?”
আরশাদ ইরার দিকে পিছন ঘোরে, পিঠে মেলে দেয়। এরপর শার্ট খুলে দিতেই ইরা হালকা চিৎকার করে ওঠে।

“হায় খোদা! এতো আঁচড়ের দাগ?”
আরশাদ নির্লিপ্ত মুখে শার্ট পরতে পরতে বললো,”যেহেতু আগামী পাঁচ মিনিটের জন্য আমার মৌনব্রত, তাই কিছু বললাম না। নাহলে বলতাম, গত রাতে এক পরীমুখো শাঁকচুন্নি এসে আঁচড় কেটে গেছে। আফসোস রূপবতী হওয়ায় কিচ্ছু বলতে পারলাম না তাকে।”
ইরা হাসবে না হাসবে না করেও ফিক করে হেসে দেয়। যদিও একটু অপরাধবোধ হচ্ছে। কি বিশ্রী একটা কান্ড ঘটিয়ে ফেলে আবার নির্লজ্জের মতো হাসছে নিজেই।

আরশাদ ইরার চুলগুলো সব একপাশে নিয়ে গলার কাছে ছড়িয়ে দেয়।

“নূরবউ, এবার যান। ভয় নেই, কেউ দেখবে না। আর কেউ দেখলেও বা কি ক্ষতি?”
“ক্ষতি নেই? সবাই কি ভাববে?”
“কি আর ভাববে? তারা জানে, তাদের ছেলে উগ্র হয়ে গেলে বন্য হয়ে যায়। আসলে ছেলে ভালো, শুধু রাতে একটু খায়…”
ইরা উঠে দাঁড়ায়। এই লোকের কাছে বেশিক্ষণ বসা যাবে না। তার মুখে কোনো কথা আটকায় না। অবলীলায় যা মন চায় বলে দেয়। এতোদিন তাও কম ছিলো। আজ থেকে এ অত্যাচার বোধহয় কয়েকগুণ বেড়েই গেলো।
আরশাদকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে দ্রুত বেরিয়ে যায় ইরা। শাড়ির আঁচলটা ভালো করে মাথায় পেঁচিয়ে দিতে ভোলেনা। নিজেও কি ওই লোকটার মতো লজ্জাশরম পানিতে গুলে খায়নি তো আর!

নিজাম হোসেনকে বাড়িতে নিয়ে আসা হয়েছে। রাবেয়া বেগম তখনও নীলুর পাশেই। মেয়েটাকে তার স্বাভাবিক লাগছে না। তার এই হঠাৎ শান্ত হয়ে যাওয়া নীলুকে ভয়ই করছে বলতে গেলে। বন্যার মতো ছুটে চলা মেয়েটা হঠাৎ শান্ত হয়ে যাওয়াটা তার ভালো লাগছে না মোটেই।

“আপা নীলুকে একটু বুঝান। আমার এমন কিছুই হয়নি। কিন্তু ওর মুখ দেখে আমি আরো অস্থির হয়ে যাচ্ছি। এই বয়সে একটু আধটু অসুস্থ হওয়া তো অস্বাভাবিক কিছু না।”
নীলু কঠিন গলায় বললো,”বাবা চুপ করে শুয়ে থাকো। তাছাড়া আমি ছোট বাচ্চা নই যে আমাকে বুঝাতে হবে। আমি নিজে যথেষ্ট বুঝি।”
রাবেয়া বেগম নীলুর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললো,”বাবা তো ঠিক বলেছে নীলু। এমনিতেই ওর শরীর দূর্বল। তুই এমন করলে তো মনও ভেঙে যাবে। তখন কিন্তু তার সুস্থ হওয়া আরো কঠিন হয়ে যাবে।”
নীলু বিরক্ত হয়ে উঠে দাঁড়ায়। সবকিছু কেমন অসহ্য লাগছে তার। বসার ঘরে আবার রোশান চৌধুরী বসে আছে। আল্লাহর বান্দা কাল সারারাত হাসপাতালেই ছিলো। একটু পর পর ওদের খোঁজ নিয়েছে। সকালে তাদের সাথেই বাড়ি পর্যন্ত এসেছে। আবার এখন বসে আছে। আশ্চর্য! এতোটা বাড়াবাড়ি কেনো করছে উনি?
তার উপর গত রাতে আরশাদকে এতোটা কাছ থেকে আবার দেখে ভিতরে আগুন জ্বলছে তার। বারবার ওইদিনের কথা মনে পড়ছে। লজ্জা, অপমান, ক্ষোভ সব একসাথে কাজ করেছে। সব মিলিয়ে মন বিক্ষিপ্ত। ইচ্ছা করছে সব ছেড়েছুড়ে দিয়ে দূরে কোথাও যেয়ে বসে থাকতে, একা একা।

“খালাম্মা বাবার কাছে বসো। আমি একটু আসছি।”
নীলু বেরিয়ে যায়। ভীষণ ক্লান্তও লাগছে তার। মনে হচ্ছে কতো রাত ঘুমায় না। লম্বা একটা গোসল দিয়ে ঘুমাতে হবে একটানা।

“রোশান স্যার।”
রোশান বসার ঘরে বসে ম্যাগাজিন পড়ছিলো। নীলুর ডাকে উঠে দাঁড়ায়।

নীলু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে তার দিকে তাকিয়ে বললো,”আমি তো আপনার স্যার নই যে আমাকে দেখলেই দাঁড়াতে হবে।”
“তা ঠিক।”
“চা খাবেন? আমি এক কাপ খাবো।”
“খাওয়াই যায়।”
নীলু কঠিন গলায় বললো,”বসুন, আমি আসছি।”

নীলু দশ মিনিটের মাথায় চলে আসে। হাতে একটা ট্রে। তাতে দুই কাপ চা, সুগার কিউব, আর দুই রকম বিস্কুট।

রোশানের মুখোমুখি নীলু বসে। নিজের জন্য এক কাপ রেখে রোশানের দিকে তাকায় সে।
“চিনি?”
“দুই চামচ।”
নীলু দু’টো সুগার কিউব কাপে ফেলে চামচে নেড়ে এগিয়ে দেয় রোশানের দিকে। সাথে বিস্কুটের পিরিচ দুইটাও। অতিরিক্ত কোনো উদ্দীপনা নেই, ভীষণ শান্ত সে।

কাপে ছোট্ট করে দু’টো চুমুক দিয়ে নীলু বারান্দার দিকে তাকায়। কিছু একটা বলার প্রস্তুতি নেয় সে মনে মনে।

“মিস্টার চৌধুরী।”
“বলুন।”
“আপনি কি আমাকে করুণা করতে চাচ্ছেন? দয়া দেখাতে চাচ্ছেন রাস্তার ওই আহত কুকুরটার মতো?”
রোশান হতভম্ব হয়ে যায় নীলুর কথায়। তার স্থির দৃষ্টি নীলুর উপর, নীলু নির্লিপ্ত। এখনো বারান্দার দিকে তাকিয়ে সে।

“ঠিক বুঝলাম না আপনার কথা। এসবের মানে কি?”
নীলু ছোট্ট করে হেসে বললো,”আমি জানি আপনি বুঝেছেন, কারণ আপনি বুদ্ধিমান। বুঝেও না বোঝার ভান করছেন। আর আমি এটাও জানি বাবা আপনাকে আমার বিষয়ে কিছু বলেছে। আমি কোনো কারণে ভীষণ কষ্ট পেয়েছি। বাবা হয়তো আমার সেই কষ্ট লাঘবের মহান দায়িত্ব আপনাকে দিয়েছে। আপনি আপনার স্যারের কথা পালন করতে চাচ্ছেন।”
রোশান কি বলবে ভেবে পায়না। মেয়েটা অসম্ভব রূপবতী। লেখক হুমায়ুন আহমেদ বলেছেন অতিরিক্ত রূপবতী মেয়েরা খানিকটা বোকা হয়। কথাটা বোধহয় সর্বক্ষেত্রে সঠিক না। তার সামনে বসে থাকা মেয়েটা যতোটা রূপবতী তারচেয়েও বেশি বুদ্ধিমতী।

“অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকার কিছু হয়নি। কিছু কিছু মানুষকে দেখতে বোকা বোকা লাগলেও তারা আসলে চালাক হয়। আমি তেমনই একজন মানুষ। আপনি চা খান, ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।”
এই বলে নীলু নিজেও চায়ে বিস্কুট ডুবিয়ে খায়।

“এমনটা যদি হয়, তবুও কি এটা ভাবা উচিত আমি আপনাকে রাস্তার আহত কুকুরের মতো দয়া করছি? এতোটা খারাপ চিন্তা আমাকে নিয়ে আপনার?”
“আপনাকে নিয়ে আমার কোনো চিন্তাই নেই, করতেও চাইনা। শুধু চাচ্ছি দয়া করে বাবার কথাকে এতোটা গুরুত্ব দিবেন না। আমি কষ্ট পেয়েছি, অনেকটাই পেয়েছি। তার মানে এটা নয় যে আমি কষ্টে মরে যাচ্ছি। আমাকে দয়া দেখানোর কিছু নেই। আমি বুদ্ধিমতী, সেই সাথে বোধহয় খানিকটা রূপবতীও। আমাদের দেশে রূপবতীদের আলাদা খাতির করা হয়। প্রয়োজনের অতিরিক্ত খাতির পেলে আমি হয়তো কষ্ট ভুলে যাবো আস্তে আস্তে। কিন্তু বাবার পরিকল্পনা এখন সফল হবে না। আমি এখন প্রেম বা বিয়ে কোনোটাই করবো না। সে চেষ্টা যদি কেউ করে তবে নিতান্তই ছাইতে ঘি ঢালা।”
রোশান থতমত খেয়ে বসে থাকে। ব্যাপারটা এই মেয়ে এদিকে নিয়ে যাবে সে ভাবতেও পারেনি। এমনকি সে নিজেও এই মেয়ের প্রেমে পড়েনি। শুধুমাত্র নিজাম হোসেন তাকে বলেছিলো মাঝে মাঝে তার মেয়েটার খোঁজখবর নিতে। গল্পের বই বাদে তার তেমন কোনো বন্ধুবান্ধব নেই। কেনো নেই, তা কেউ জানেনা। একমাত্র বন্ধু হোক বা প্রেম, তা ছিলো আরশাদ। তাকে হারিয়ে নীলু সীমাহীন কষ্ট পেয়েছে। রোশান যেনো বন্ধুর মতো তার পাশে থাকে। কিন্তু নীলু যে অন্য কিছু ভেবে বসে আছে। এই মুহুর্তে তার ভুল ভাঙাতে বিশেষ ইচ্ছা করলো না রোশানের।

রোশান উঠে দাঁড়ায়, নীলু তার দিকে তাকায়।
“আজ তবে আসি। প্রয়োজন হলে ডাকবেন। চেষ্টা করবো সাহায্য করতে।”
“চা শেষ করলেন না? ভালো হয়নি?”
“ভালো হয়েছে। তবে চিনি কম হয়েছে। আপনার কথা এবং চা দু’টোরই মিষ্টির অভাব রয়েছে।”
নীলু হালকা হেসে বললো,”চায়ের চিনির কথা কিন্তু আপনিই বলেছেন কতোটুকু খাবেন। আর হ্যা, মাঝে মাঝে মিষ্টি একটু কমই ভালো। ডায়বেটিস হওয়ার সম্ভাবনা কমবে। সেইটা চায়ে হোক বা কথায়। আপনারা ডাক্তার মানুষ, এগুলো ভালোই বুঝবেন।”

রোশানও নীলুর হাসির বিপরীতে হাসি ফিরিয়ে দেয়। মেয়েটা ক্ষুরের মতো ধার। তাকে বলা যেতে পারে মিছরির ছুরি। মিষ্টি কথায় ক্ষত তৈরি করতে পারে।
রোশান বেরিয়ে যায়। নীলু স্বাভাবিকভাবেই বসে চা শেষ করে, বিস্কুটগুলোও। কি অদ্ভুত, হঠাৎ খুব খিদে পাচ্ছে তার। মনে হচ্ছে এতোটুকুতে হবে না। আরো খেতে হবে। ঘুমও পাচ্ছে ভীষণ। সোফার উপরই কুন্ডলী পাকিয়ে শুয়ে পড়ে নীলু। পেটে তীব্র খিদা নিয়েই ঘুমিয়ে যায় সে, গভীর ঘুমে তলিয়ে যাওয়া যাকে বলে।

রাবেয়া বেগম না ফেরায় ইরা বুঝতে পারছিলো না কি করবে। এখনই রান্নাবান্না শুরু না করলে দুপুরে খাওয়া হবে না। একটা ছেলে এসে রাশেদুলের খাবার নিয়ে যায় দুপুরে। রাশেদুল যদিও নিজাম হোসেনকে দেখে এরপর কলেজে যাবে। কিন্তু দুপুরে সে কোথায় খাবে ইরা জানেনা। আশাও বাড়িতে আছে।
রান্নাটা তো ইরা ভালোই করে। একটা দিন যদি সে রান্না করে রাবেয়া বেগম কি খুব বেশি রেগে যাবে? ইরা সাতপাঁচ ভেবে রান্নাঘরে ঢুকেছে। নিজের ইচ্ছামতো কিছু সবজি নিয়ে কাটাকুটি করতে থাকে। বেশি কিছু করবে না, যতোটুকু না হলেই নয়। না জানি রাবেয়া বেগম ফিরে কোন তুলকালাম বাঁধায়।

“এই শুনছো।”
ইরা অবাক হয়ে তাকায়। রান্নাঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে আশা, চোখেমুখে অস্বস্তি। বেশ ফ্যাকাশে হয়ে গেছে তার মুখটা।

“কি ব্যাপার আশা? কিছু বলতে চাও?”
আশা ঢোক চেপে বললো,”তুমি কি ব্যস্ত? কথা বলা যাবে তোমার সাথে?”
ইরা আশার দিকে তাকিয়ে বললো,”ব্যস্ত একটু বটে। তবে তুমি চাইলে বলতে পারো। আমি কাজ করতে করতেই শুনবো।”
আশা বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে তাও। ইরা অপেক্ষা করে।

“বদমাশটা আমার উপর ভীষণ রেগে আছে। সে বুঝতে পেরেছে আমি তোমাকে সব বলে দিয়েছি।”
“সে কি তোমার শরীরে আবার হাত দিয়েছে?”
“না, এরপর আর দেয়নি। আমি ভেবেছিলাম সব ঠিক হয়ে গেছে। ও আর এসব করবে না। কিন্তু….”
“কিন্তু কি?”
“কিন্তু ও থামেনি। ও আমাকে ওর ফাঁকা বাড়িতে ডেকেছে। আমি যদি কাউকে বলে দিই, তাহলে আমার ওসব মিথ্যা ছবি শুধুমাত্র আমার বাড়িতেই নয়। সবাইকে দেখাবে বলেছে। আমি নাকি আর মুখ দেখাতে পারবো না কাউকে।”
ইরা কাজ বন্ধ করে শক্ত করে ছুরি চেপে ধরে হাতের সাথে।

“এটা বলেছে ও?”
আশা মাথা নাড়ে আস্তে আস্তে।
“ইরা তপ্ত শ্বাস ফেলতে থাকে। পঞ্চম শ্রেণিতে থাকতে তার স্কুলের পিয়ন তার সাথে অসভ্যতা করতে চেয়েছিলো। ইরা তখন কিছুই বুঝতো না। কি মনে করে যেনো তার অন্ডকোষ বরাবর এক লাথি দিয়ে ইরা পালিয়েছিলো। নিজেকে বাঁচিয়েছিলো বদমাশটার হাত থেকে। এরপর অনেকদিন ভয়ে স্কুলে যায়নি। পরে শুনেছিলো শয়তানটা চাকরি ছেড়ে দিয়েছে স্কুলের। সেদিন থেকে ও বুঝেছে ভয় পাওয়া মানেই হেরে যাওয়া। জীবনে ভয় পাওয়া যাবে না কোনোভাবেই।

“আশা।”
“বলো।”
“তুমি কি চাও? শুধুমাত্র নিজেকে বাঁচাতে চাও? নাকি সেই সাথে ওর শাস্তিও চাও?”
আশার চোখমুখ জ্বলে ওঠে যেনো।

“অবশ্যই আমি ওর শাস্তি চাই। যাতে আর কোনোদিন কোনো মেয়ের সাথে অসভ্যতা করার সুযোগ ও না পায়। ওকে তো আমার শেষ করে দিতে ইচ্ছা হয়।”
“ব্যস! যথেষ্ট। এটুকু মনোবল আর তেজ ধরে রাখো, তাতেই হবে। কখনো ভয় পেয়ে পিছিয়ে এসো না। মনে রাখবে ভয় পেলে কি হেরে গেলে।”
“পাবো না, ভয় পাবো না।”
ইরা মুচকি হাসে।

“খুব ভালো। এবার আমি যা বলবো তা শোনো। আজ ও তোমাকে পড়াতে এলে ওকে কি কি বলবে আমি তোমাকে বলে দিচ্ছি।”
আশার চোখমুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে ইরার কথা শুনে। সাহস পায় ভিতরে।
এই মুহুর্তে তার ইচ্ছা করে ইরাকে জড়িয়ে ধরতে একবার। পরক্ষণেই কিছুটা লজ্জা পায়। ইরার সাথে যে খারাপ ব্যবহার সে করেছে, আগে ক্ষমা চাইবে এরপর জড়িয়ে ধরবে। তার আগে নয়।

“লক্ষ বছর ঘুম আসেনি,
জল জোটেনি ঠোঁটে।
তুমি আমার পেটে মারলে লাথি,
রাগ হবে না মোটে।
আমি ফুল ফোটাবো…..
আমি ফুল ফোটাবো বা হুল ফোটাবো
কোনটা তুমি চাও?
আমি ফুল ফোটাবো বা হুল ফোটাবো
কোনটা তুমি চাও?
খেলাতে বারণ চোখের পলক ফেলা,
চোখের জল আটকাও।
আমায় ধ্বংস করে দাও,
আবার ধ্বংস করে দাও।
তুমি তো সব দাও গো আমায়,
ধ্বংস করে দাও।
আমায় পাগল করে দাও,
আমায় পাগল করে দাও।
উড়ন্ত সব নেশার মতো,
পাগল করে দাও….”

ইরা আরশাদের মুখোমুখি বসে হাঁটুতে মুখ গুঁজে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে। তার শাড়ির আঁচল মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছে। আরশাদের গমগমে কণ্ঠ রাতের আঁধার ভেদ করে ইরার কানে প্রতিধ্বনিত হয়।
ইরার খুব ইচ্ছা ছিলো আরশাদের গান শোনা, গীটারে। একসময় নাকি খুব গান করতো।
ইরার মুগ্ধতার রেশ কাটে না। এই মানুষটার প্রতি মুগ্ধতা কি সময়ের সাথে সমানুপাতিক হারে বাড়তেই থাকবে তার?

আরশাদ গান থামিয়ে ইরার দিকে তাকিয়ে হাসে।

“কেমন লাগলো নূরবউ?”
ইরা চাপা গলায় ফিসফিস করে বললো,”অপূর্ব। এখনো যেনো কানে বাজছে।”
আরশাদ গীটার রেখে ইরার হাত ধরে দাঁড় করায় তাকে।

“এসো আমার সাথে।”
“বারান্দাতেই তো ভালো লাগছিলো। কি সুন্দর হাওয়া৷ শরীর ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।”
“আরো ঠান্ডা করে দিবো, এসো।”
ইরা দাঁতে দাঁত ঘষে। নেহাৎ গানটা ভালো করেছে বলে আমলে নিলো না কিছু।

আয়নার সামনে ইরাকে দাঁড় করায় আরশাদ। ইরার জন্য বেশ কিছুদিন আগে কিছু উপহার এনেছিলো সে। ইরা কিচ্ছু ব্যবহার করেনি। সে চেয়েছিলো আরশাদ যেনো তাকে ভালোবেসে ওগুলো দেয়।
সেখান থেকে একটা টিপের পাতা বের করে আরশাদ। ছোট্ট রূপোলী পাথরের একটা টিপ ইরার দুই সরু ভ্রুযুগলের মাঝে পরিয়ে দিতেই তা চিকচিক করে ওঠে। যেনো শরৎের আকাশে একটা শুকতারা। কিছু চুড়ি বের করে তাও পরিয়ে দেয় হাতে। ঝুনঝুন করে শব্দ হয় তাতে।

“নূরবউ।”
ইরা ছলছল চোখে তাকায় আরশাদের দিকে।
“তুমি কি বলতে পারবে কেনো আমি এতো তাড়াতাড়ি ডুবে গেলাম তোমাতে? কি হয়ে গেলো আমার মধ্যে?”
“আপনি কি আফসোস করছেন?”
“হ্যা করছি।”
ইরা মন খারাপ করে পিছন ঘুরে তাকায়। আরশাদ তার দিকে তাকিয়ে শব্দ করে হেসে দেয়। ইরার পিছন থেকেই তার কাঁধে থুঁতনি ঠেকিয়ে দাঁড়ায়।

“আফসোস করছি সেই শুরুর দিন থেকেই কেনো ডুবলাম না। এতোটা দেরি করলাম কেনো নিজের মনকে বুঝতে? জীবন থেকে কতোগুলো দিন চলে গেলো বলো?”
“ভালোই কথা জানেন। হার মানলাম আমি।”
“হেরো না ভ্রমর, শত রজনী তোমার জয়ের অপেক্ষায়। দেখো এই বুকে হাত দিয়ে, প্রতিনিয়ত এ হৃৎস্পন্দন কারে চায়। কিন্তু হায়, হারার আগেই হেরে গেলে এ মন কারে দিবে এথায় ঠাঁই?”

ইরার চিন্তাভাবনা হঠাৎ এলোমেলো হয়ে যায়। আরশাদ যেদিন জানতে পারবে তার এতো পছন্দের পঙ্কক্তি গুলো সে যার প্রেমে আস্তে আস্তে বুঁদ হয়ে যাচ্ছে তারই লেখা, সে-ই আরশাদের না দেখা সেই ভ্রমর। কেমন হবে তার অনুভূতি? সে কি রেগে যাবে এতোদিন প্রকাশ না করায়? নাকি স্তম্ভিত হয়ে যাবে? নাকি আনন্দিত হবে ভ্রমরকে দেখতে পেয়ে? ইরার খুব দেখার ইচ্ছা, খুব।

(চলবে……)

#মন_কেমনের মরশুম

পর্ব: ২০

গম্ভীর মুখে বাবার ঘরের বিছানা পরিষ্কার করছে নীলু। এতোকাল বাড়ির সব কাজ বুয়াই করতো। কিন্তু আজকাল নীলুর বাড়ির কাজ করতে ভালো লাগছে। বিশেষ করে বাবার কাজগুলো সে নিজেই করছে, বুয়াদের দেয়না।
নিজাম হোসেন অদূরেই চেয়ারে বসে মেয়েকে দেখছে একদৃষ্টিতে। মেয়েটার চেহারায় ক্লান্তি কিন্তু তা সত্ত্বেও আলাদা একটা জ্যোতি দেখা যাচ্ছে। তীক্ষ্ণ চোখজোড়ার নিচে হালকা কালি পড়েছে, তবুও তাকে কেনো এতোটা মোহনীয় লাগছে নিজাম হোসেন বুঝতে পারছে না।

“নীলু।”
“হু।”
নীলু ছোট্ট করে উত্তর দেয় কাজ করতে করতেই।
“অনেক কাজ করেছিস। এবার আমার পাশে একটু বোস তো।”
“হাতের কাজটা শেষ করি বাবা। বালিশে নতুন কভারটা পরিয়েই আসছি।”
“ওসব পরে হবে। এখন তুই আমার কাছে এসে বসবি। এখন মানে এখনই।”
নীলু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বাবার কাছে একটা চেয়ার নিয়ে এসে বসে। মুখটা তখনও গম্ভীর, যেনো রেগে আছে সে ভীষণ ভিতর ভিতর।

“কিছু হয়েছে?”
“না তো, কি হবে?”
“কি হবে তাতো জানিনা। তবে এটুকু জানি কিছু একটা হয়েছে। দাঁড়িয়ে থেকে তোর নাড়ী কাটতে দেখেছি, তোকে আমি বুঝবো না?”
নীলু কিছুটা বিরক্ত হয়ে বললো,”সস্তা কৌতুক।”
“বেশ এখন থেকে দামী কৌতুক বলবো। টাকা দে দুই কোটি।”
“ধুর।”
নীলু উঠে দাঁড়াতে গেলেই নিজাম হোসেন তার হাত ধরে আবার বসায় তাকে।

“মা জননীর এতো রাগ কেনো হলো আমার উপর? জানতে হবে না?”
নীলু কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আস্তে আস্তে বললো,”তুমি আমাকে খুব ভালোবাসো তাইনা বাবা?”
“সন্দেহ হচ্ছে নাকি আজকাল?”
“কথা ঘুরিও না বাবা। আমার কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু আজকাল ভালোবাসতে বাসতে যে অত্যাচারটা তুমি করছো এটা আমার ভালো লাগছে না। এটা বন্ধ করো বাবা। আগেও বলেছি, আবারও বলছি। আবার যদি এগুলো করো আমি কিন্তু তোমাকে রেখে চলে যাবো। আর ফিরবো না।”
নিজাম হোসেন হতভম্ব হয়ে বললো,”কোথায় যাবি তুই আমাকে রেখে?”
“জানিনা কোথায় যাবো। দু’চোখ যেদিকে যায়।”
নিজাম হোসেন মেয়ের মুখ দুই হাতে আঁকড়ে উপরে ওঠায়। ঝড়ের আগের পরিবেশের মতো ঠান্ডা হয়ে আছে মুখটা।

“কি হয়েছে তোর মা? আমি কি এমন অত্যাচার করলাম তোকে? এসব কি বলছিস?”
“তুমি খুব ভালো করে জানো কি বলছি। দয়া করে এগুলো করোনা। আমি যথেষ্ট ভালো আছি এভাবেই। কারো অযাচিত করুণা বা দয়া আমার প্রয়োজন নেই। আর কীভাবে বোঝালে তুমি বুঝবে বাবা?”
নিজাম হোসেন থতমত মুখে বসে থাকে, কিছু বলেনা।

বাবার মুখ ভার দেখে নীলু বাবার সামনে মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসে। বাবার হাত দু’টো হাতের মুঠোর মধ্যে চেপে ধরে।

“বাবা আমি জানি, বাবা মা সন্তানের ভালো চায়। সন্তানের ভালোর জন্য তারা নিজেদের সুখটুকু বিসর্জন দিতেও পিছপা হয়না। যেমন তুমি বাবা। মা চলে যাওয়ার পর শুধু আমার জন্য নিজের কথা না ভেবে তুমি দ্বিতীয় বিয়ে করোনি। কিন্তু আমার দিকটা একটু বোঝার চেষ্টা করো বাবা। আমি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছি। এখন আমার তুমি বাদে আর কাউকেই সহ্য হয়না। এমনকি তুমি জানো আমি খালাম্মার সাথেও খারাপ ব্যবহার করেছি। যে খালাম্মা আমাকে মায়ের অভাব বুঝতে দেয়নি কখনো, আমি তার সাথেও উঁচু গলায় কথা বলেছি। আমি ভুল করেছি বাবা, অনেক বড় ভুল। কিন্তু বিশ্বাস করো আমি নিজের নিয়ন্ত্রণে নেই। আমি চাইনা আমার এই বিধ্বস্ত মস্তিষ্ক আরো বিক্ষিপ্ত হয়ে যাক কারো হঠাৎ উপস্থিতিতে। প্রতিটা মানুষের মাঝেই সৃষ্টিকর্তা ন্যাচারাল হিলিং পাওয়ার দিয়ে দেন। শরীরের কোথাও কেটে গেলে যেমন অণুচক্রিকা সেই ক্ষত স্থান সারিয়ে দেয়, ঠিক তেমন মন ভেঙে গেলেও কোনো এক অদৃশ্য অণুচক্রিকা তাও সারিয়ে দেয়। বাইরের কাউকে প্রয়োজন হয়না বিশ্বাস করো। আমারও হবে, হবেই। কিন্তু অনেকটা সময় লাগবে। এটুকু সময় কি তুমি আমাকে দিবে না বাবা? আমি তোমাকে কথা দিচ্ছি আমি সব প্রতিকূলতা কাটিয়ে উঠবো। শুধু তুমি আমাকে একটু বুঝো।”
নিজাম হোসেন কাঁপা কাঁপা হাতে মেয়ের মাথায় হাত রাখে। মেয়েটা তার কতো বড় হয়ে গেলো? সেই অবুঝ মেয়েটা আজ এভাবে কথা বলছে, কে শেখালো তাকে এতোকিছু? সময় নাকি পরিস্থিতি?

অপরাধবোধ কাজ করে তার হঠাৎ। সে কি মেয়েটাকে বেশি কষ্ট দিয়ে ফেললো? মেয়ে কি তাকে ক্ষমা করবে না?

“বেশ তবে তাই হোক। আমি তো এমন নীলুকেই চেয়েছিলাম। যা করেছি ভুল করেছি। তুই তোর এই বুড়ো ছেলেটাকে ক্ষমা করে দে।”
“এসব বলো না বাবা। দয়া করে এগুলো বলো না।”
নিজাম হোসেন ছোট্ট করে হেসে বললো,”আচ্ছা বলবো না। এবার একটু হাস তো। মন খুলে একটু হাস। অনেকদিন তোর হাসি দেখিনা। সেই উচ্ছল, প্রাণবন্ত হাসি দেখতে চাই আবার।”
নীলু কপট বিরক্ত হয়ে বললো,”শুধু শুধু বলদের মতো হাসবো কেনো বাবা? হাসির মতো কিছু হোক, তখন হাসবো।”
নিজাম হোসেন গম্ভীর গলায় বললো,”আচ্ছা বলদ কি হাসে? তুই দেখেছিস কখনো বলদকে হাসতে?”
নীলু নিজেকে সামলাতে না পেরে ফিক করে হেসে দেয়। প্রথমে আস্তে এরপর জোরে শব্দ করে। তার হাসির শব্দ যেনো প্রতিধ্বনিত হয় ঘরের চার দেওয়ালের মাঝে।
নিজাম হোসেন অপলক দৃষ্টিতে মুগ্ধ হয়ে মেয়ের হাসি দেখে। এই হাসি তো অমূল্য। আর কি চাই? থাক মেয়েটা ওর মতো। সত্যিই ওর এখন আর কাউকে প্রয়োজন নেই, শুধু এই হাসিটা প্রয়োজন। বাবা আছে তো তার জন্য!

ভর্তির মাস দেড়েক পর ইরার ক্লাস শুরু হলো অবশেষে। খুবই উত্তেজিত সে ভিতর ভিতর। পড়াশোনা করতে বরাবরই ভালো লাগতো ইরার। এরপর অনাকাঙ্ক্ষিত ছুটি পড়াশোনা থেকে। এতোদিন পর আবার যাবে সে কলেজে। আবার পড়াশোনা শুরু করবে সে। কি যে আনন্দ হচ্ছে তার।

ইরা খুব সকাল সকাল উঠেই তৈরি হয়ে নিয়েছে। প্রথম দিন তাই সাদা সালোয়ার কামিজ, সাদা ওড়না মাথায়। হালকা একটু কাজলও দিয়েছে চোখের নিচে। মানুষের চেহারার সৌন্দর্যের একটা সিংহভাগ নির্ভর করে মনের উপর। মন ভালো থাকলে চেহারাতেও তার ছাপ পড়ে। ইরার নিজেকে দেখে নিজেরই ভালো লাগে। বারবার ওই মানুষটাকে ধন্যবাদ জানাতে ইচ্ছা করে। কিন্তু অনেক কষ্টে চুপ থাকে
ভদ্রলোকের কথার যে অবস্থা, কি না কি বলে বসবে। তারচেয়ে থাক।

আজকে যেনো বেশি সময় নিয়ে গোসল করছে লোকটা। এদিকে ইরা তৈরি হয়ে কতক্ষণ ধরে বসে আছে। সময় যেনো আর কাটে না।
ইরা চেয়েছিলো সে একাই যাবে। তাছাড়া একটু কাজও আছে। কলেজ যাওয়ার আগে ভেবেছিলো একবার পোস্ট অফিস হয়ে যাবে। ডাক যোগাযোগে রেডিওতে লেখা পাঠাতে হবে। ভদ্রলোক সাথে গেলে সম্ভব হবে না। কিন্তু আজ সে যাবেই। ইরা একা এক পা-ও বাইরে রাখলে নাকি ইরার খবর আছে। কি সাংঘাতিক একটা লোক!

আধা ঘন্টা পর শিষ বাজাতে বাজাতে বাথরুমের দরজা খোলে আরশাদ। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল মুছতে মুছতে গান গাইতে থাকে। ইরা কিছু বলতে যেয়েও বলেনা। কোনো আক্কেল নেই নাকি? কতো দেরি হয়ে যাচ্ছে এমনিতে, এখন কি গান গাওয়ার সময়?

“কফি খাবেন?”
আরশাদ ইরার দিকে না ঘুরেই বললো,”অন্যকিছু খাবো, খাওয়াবে?”
ইরা বিরক্ত হয়ে বারান্দায় চলে যায়। থাকুক উনি একা একা।

বেশ অনেকটা সময় নিয়ে আরশাদ তৈরি হয়। কাঁধে ল্যাপটপের ব্যাগটা ঝুলিয়ে বারান্দার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসে সে।

“আমি বাইরে যাচ্ছি। দ্রুত চলে এসো। বাবা মা’কে বলে বেরিয়ে পড়ি। দেরি করবে না একদম।”
ইরা অবাক হয়ে তাকায় আরশাদের দিকে। ততক্ষণে আরশাদ বেরিয়ে গেছে ঘর ছেড়ে। ইরা দেরি করছে? ইরা? অদ্ভুত লোক তো! নিজে এতো সময় কাটিয়ে এখন তাকে বলছে দেরি না কর‍তে।

ইরা দ্রুত পায়ে বেরোতে যেয়ে আয়নার সামনে একটা কাগজ দেখে দাঁড়িয়ে যায়। অপ্রয়োজনীয় কাগজ ভেবে উঠাতেই শীতল হয়ে যায় তার মন, মস্তিষ্ক দু’টোই। ঠোঁটের কোণে এক চিলতে মিষ্টি হাসি ফুটে ওঠে সাথে সাথে।

‘নূরবউ, শুধু কাজল চোখেই যে রূপের পসরা সাজিয়েছেন, সে রূপে আমাকে ঝলসে দিতেই বড্ড দেরি করলেন। এমনিতে আপনি পাংকচুয়ালই আছেন।”
ইরা চারবার কাগজটা পড়লো, এরপর ওটা ব্যাগে ঢুকিয়ে বেরিয়ে আসে ঘর ছেড়ে। ভালোবাসা সুন্দর, যদি মানুষটা সঠিক হয়।

রাশেদুল ইরার মাথায় হাত রেখে দাঁড়িয়ে আছে। ইরার হঠাৎ নিজের বাবার জন্য মনটা কেমন করে উঠলো। আচ্ছা আজকের এই দিনে সে-ও কি এতোটা খুশি হতো? সে কি কষ্ট পেয়েছিলো ইরার পড়াশোনা বন্ধ হওয়াতে? ইরার বুকটা মোচড় দিয়ে ওঠে তার বাবার জন্য।

“মন দিয়ে পড়াশোনা করো মা। জীবনে ভালো কিছু করো। কারো জন্য না হোক, নিজের জন্য। নিজেকে এমন তৈরি করো যাতে কেউ তোমাকে ভেঙে দিতে না পারে। কারো অনুগ্রগে বাঁচতে না হয়।”
ইরা ছোট্ট করে হেসে বললো,”স্বপ্ন দেখতে খুব ভয় করে আমার। যে জীবন দুঃস্বপ্নে অভ্যস্ত, হঠাৎ সুন্দর স্বপ্ন দেখলে মনের কোণে ভীতি সৃষ্টি হয়। এই ভয়ে যে ঘুম ভাঙলেই দেখবো সব আগের মতো, কিচ্ছু বদলায়নি।”
“মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড় রে মা। যতো বড় স্বপ্ন তুমি দেখবে তুমি ঠিক ততটাই উঁচু। এসব না ভেবে সামনের দিকে এগিয়ে যাও। আমরা আছি তোমার সাথে।”
ইরা পায়ে হাত দিয়ে সালাম করতে গেলেই রাশেদুল তাকে আটকায়। পকেট থেকে একটা ঘড়ির প্যাকেট বের করে। গতকালই কিনে রেখেছিলো সে ইরার জন্য এটা।

কালো বেল্টের ঘড়িটার দিকে মুগ্ধ হয়ে তাকায় ইরা, এতো সুন্দর ঘড়ি। রাশেদুল নিজেই তাকে পরিয়ে দিয়েছে।

“পছন্দ হয়েছে?”
ইরা গাঢ় গলায় বললো,”খুব সুন্দর, খুব।”
“যাক বাঁচা গেলো। মেয়েদের বিষয় কমই বুঝি আমি। আশাকে তো কিছু কিনে এনে দিলে তার পছন্দই হয়না। তোমার যে পছন্দ হয়েছে তাতেই ভালো লাগছে।”
“আপনি হাতে করে এনে দিয়েছেন এটাই আমার জন্য অনেক বেশি। আমার উপহার পেয়ে অভ্যাস নেই। নিজের মুগ্ধতা প্রকাশ করতেও জানিনা। তবে এই ঘড়ি আমি সবসময় আমার কাছে রাখবো। এটা আমার জন্য অমূল্য।”
ইরা আড়চোখে আরশাদের দিকে তাকায়। আরশাদ বুকের মধ্যে একরাশ প্রশান্তি অনুভব করে। বাবা যে এতো সুন্দর করে সবটা সামলাতে পারে, আরশাদ অবাকই হয় মাঝে মাঝে বাবাকে দেখে।

“যাও মা’কে যেয়ে বলো। এরপর রওনা করো।”
ইরা ঢোক চেপে বললো,”উনাকে বলবো? রাগ করবেন না উনি?”
রাশেদুল হো হো করে হেসে বললো,”না করবেন না। ভয়ের কিছু নেই।”

নিজের ঘরে কাপড় গোছাচ্ছিলো রাবেয়া বেগম। দরজায় ইরার উপস্থিতি টের পেয়েও সেদিকে তাকায়না। নিজের মতো কাজ করতে থাকে।

“আসবো?”
রাবেয়া বেগম উত্তর দেয়না তবুও।
“আজ আমার একটা বিশেষ দিন। আপনাদের কাছে সামান্য হতে পারে কিন্তু আমার কাছে এই দিনের মূল্য অনেক। আমি আবার পড়াশোনা শুরু করতে পারছি। আজ আমার নিজের মা বেঁচে থাকলে অনেক বেশি খুশি হতেন। উনি নিজে বেশি পড়াশোনা করতে না পারলেও পড়াশোনা খুব ভালোবাসতেন। আমাকে বলতেন অনেক বড় কিছু করতে। হয়তোবা মায়ের সেই ইচ্ছা কোনোদিন পূরণ করতে পারবো না। তবুও আমি খুশি, ভীষণ খুশি।”
রাবেয়া বেগম শান্ত চোখে ইরার দিকে তাকায়। ইরা হাসে সুন্দর করে।

“জানেন মায়ের ভালোবাসা কেমন হয় ভুলেই গিয়েছি আমি। সেই কবেই মা আমাকে একা করে চলে গেলো। বাবার দ্বিতীয় স্ত্রী বোধহয় শুধু বাবার স্ত্রী-ই হয়, মা হয়ে ওঠে না। তবুও আমার কোনো অভিযোগ নেই তার প্রতি। কিন্তু আপনি তো আমার দ্বিতীয় মা নন, আমার প্রথম মা-ই। আজকের দিনে আপনি কি আমাকে একটু দোয়া করবেন না?”
রাবেয়া বেগম গম্ভীর গলায় বললো,”দোয়া করলাম। মায়ের স্বপ্ন পূরণ করো।”
ইরার মুখে হাসির ঝলক। সে কল্পনাও করতে পারেনি রাবেয়া বেগম তার কথার উত্তর দিবে। এতোটুকুতেই সে খুশি। ইশ! আজকের দিনটা এতো সুন্দর কেনো? সত্যিই ভ্রমরের মতো উড়ে বেড়াতে ইচ্ছা করছে ফুলে ফুলে।

“খেয়েছো নিশ্চয়ই? আমার কর্তামশাই আবার কাউকে না খাইয়ে বাড়ি থেকে বের হতে দেন না।”
ইরার জন্য আরেকটা চমক ছিলো এটা। রাবেয়া বেগম তার খাওয়ার কথা জিজ্ঞাসা করলো? শুনতে ভুল করলো নাকি সে? হা করে তাকিয়ে থাকে।

“শোনো মেয়ে, কেউ তোমাকে খাইয়ে দিবে না এখানে। যার হাত ধরে লাফিয়ে লাফিয়ে চলে এলে এ বাড়ি, তাকেও অনেক বয়স পর্যন্ত আমাকেই খাইয়ে দিতে হতো। এখন আবার সে বিশাল লায়েক হয়েছে। কাউকে কিছু না জানিয়ে বিয়ে করে বউ নিয়ে চলে এসেছে। সে যাই হোক, নিজের খাওয়াটা নিজেই খেয়ে নিবে। পরে আবার শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেলে সবাই আমাকেই বলবে আমি তোমাকে খেতে দিইনা।”
ইরা মুখ টিপে হাসে।

“হাসছো কেনো? আমাকে কি জোকার মনে হয় তোমার? হাসির কি হলো?”
“না না হাসছি না, আমার মুখটাই এমন হাসি হাসি।”
“ভালো হয়েছে। দোয়া করেছি এবার বিদায় হও। পড়াশোনা করে বিদুষী হও আর আমার মাথায় উঠে নৃত্য করো।”
ইরা আবার হাসতে যেয়েও নিজেকে সামলায়। আজ যেটুকু হয়েছে অনেক। আর দরকার নেই।

ক্লাস শেষে কলেজ গেটে দাঁড়িয়ে আছে ইরা। মেঘ ভাঙা রোদে তপ্ত নগরী। গরমে অবস্থা কাহিল। ঘেমেনেয়ে শেষ ইরা।
ভেবেছিলো হেঁটেই চলে যাবে। যদিও আরশাদ তাকে রিকশা ব্যবহার করতে বলেছে। ইরা হেঁটেই অভ্যস্ত।
কিন্তু মাঝে মাঝে মানুষও আদুরে বিড়ালের মতো আহ্লাদ চায়। ইরার মনে হচ্ছে তার ছোটখাটো অভ্যাসগুলো আরশাদ খুব সাবধানে বদলে দিচ্ছে। ইরা আরো জড়িয়ে পড়ছে আষ্টেপৃষ্টে।

“এইযে কাটপিস, এদিকে এসো।”
ইরা বেশ অবাক হয়ে পিছনের দিকে তাকায়। চোখ বড় বড় হয়ে যায় তার। কলেজ গেটেই তিনটা মোটরসাইকেলে দুইজন করে, মোট ছয়জন আয়েশ করে বসে আছে। দেখতেই কেমন বখাটেদের মতো সবাই।
তারচেয়েও বেশি অবাক হয় আপাতত আশেপাশে সে বাদে আর কেউ নেই। তবে কি ওই কথাটা তাকে উদ্দেশ্য করে বললো?

“কি হে? কথা কানে যায়না? বয়রা নাকি কাটপিস?”
ইরার শরীর চিড়বিড় করে ওঠে। চোখ পাকিয়ে তাকায় ওদের দিকে। এবার সে নিশ্চিত কথাগুলো তাকেই বলেছে।

ইরা এগিয়ে যায়।
“কি বলে ডাকলেন আপনারা আমাকে?”
“কাটপিস। কলেজে নতুন কেউ এলে আমরা তাকে এই নামেই সম্বোধন করি।”
ইরা দাঁতে দাঁত চেপে বললো,”এটা কি কলেজ কর্তৃপক্ষের নিয়ম? এভাবে আপ্যায়ন করতে হয় নতুন শিক্ষার্থীদের?”
ছেলেগুলো নড়েচড়ে বসলো এবার।

“কি বললে তুমি?”
“তুমি না আপনি। অপরিচিত মেয়েদের হুট করে তুমি বলে ফেলাটা অসভ্যতা। অবশ্য আপনাদের দেখে সভ্য বলে মনেও হচ্ছে না।”
তিনজন মারমুখী হয়ে ওঠে ইরার দিকে। ইরা শান্ত ভাবে দাঁড়িয়ে থাকে। এসব লম্পটদের ভয় পাওয়া মানেই তাদের প্রশ্রয় দেওয়া আরো।

“এই মেয়ে তুমি আমাদের চিনো? জানো আমাদের বাবা কারা?”
“কেনো আপনারা জানেন না? না জানলে আপনাদের মায়ের কাছ থেকে জেনে নিবেন আপনাদের বাবা কারা। শুধু শুধু রাস্তায় মেয়েদের উত্যক্ত করছেন কেনো? এসব কাটপিস না কি, এগুলো কেমন ভাষা?”
“এ ভাই, এ মেয়ে তো বড়ই বেয়াদব। ওকে একটা উচিত শিক্ষা দিয়ে দিতে হবে।”
ইরা মুচকি হেসে বললো,”শিক্ষা নিতেই কলেজে ভর্তি হয়েছি। শিক্ষা দেওয়ার জন্য শিক্ষক আছে। আপনারা কি শিক্ষক?”

আচমকা শক্ত হাতের একটা থাপ্পড় খেয়ে ইরা ছিটকে পড়ে দূরে। গালে হাত দিয়ে হতবাক হয়ে তাকায় সে সামনের দিকে। চোখ বিস্ফারিত হয়ে যায় তার। তার গায়ে হাত তুললো? গায়ে হাত তাই বলে?

“এটা তোর জন্য একটা ট্রেইলার ছিলো। এরপর আমাদের সাথে অসভ্যতা করলে তুলে নিয়ে চলে যাবো। যাকে পারিস নালিশ কর। আমাদের কেউ কিছু বলার সাহস নেই।”
ইরা দুই হাত মুষ্টিবদ্ধ করে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করে। ক্ষোভে চিৎকার করতে ইচ্ছা করছে তার। ঘন ঘন শ্বাস পড়ছে তার।

“ইরা…..”
চমকে উঠে ইরা তাকায় পাশে। গলার কাছে হৃৎপিণ্ড এসে ধক করে ওঠে। আসলেই স্বপ্ন দেখছে নাকি সত্যি?

“কি হয়েছে ইরা? এমন লাগছে কেনো তোমাকে? দাঁড়াও তো, এদিকে তাকাও। তোমার গাল লাল কেনো? কি হয়েছে?”
আরশাদ মোটরসাইকেলের উপর বসে ইরাকে নিজের দিকে ফেরায়। ইরা কাঁপছে, ভীষণ ভাবে কাঁপছে।

ছেলেগুলো নিজেদের মধ্যে হাসাহাসি করে। আরশাদ ভ্রু কুঁচকে তাকায় তাদের দিকে।
“ইরা কি হয়েছে বলো? চুপ করে আছো কেনো?”
ছেলেগুলোর মধ্যে একজন আরেকজনের পিঠ চাপড়ে দিয়ে বললো,”নায়ক বোধহয়। আরেকটু আগে আসলে ট্রেইলার দেখতে পারতো।”
আরশাদ মোটরসাইকেল থেকে নামে।

“ইরা ওই ছেলেগুলো কিছু বলেছে তোমাকে?”
ইরা ক্ষীণ গলায় বললো,”আমাকে চড় মেরেছে।”
আরশাদ চিৎকার করে বললো,”কি বললে তুমি? কি বললে?”
ইরা আঙ্গুল দিয়ে একজনের দিকে আঙ্গুল নির্দেশ করে বললো,”ও আমাকে চড় মেরেছে।”

আরশাদ ইরাকে ছেড়ে দিয়ে ওদের দিকে এগিয়ে যায়। ওরা আবারও আয়েশ করে শুয়ে পড়ে, মাথার নিচে হাত রেখে।

“এই শুয়ো*রের বাচ্চা, তোরা আমার স্ত্রীর গায়ে হাত তুলেছিস? বল হিম্মত থাকলে, স্বীকার কর।”
“এই গালাগালি করলি কেনো? চিনিস আমাদের তুই?” উঠে বসে ছেলেগুলো।

আরশাদ ঘন ঘন শ্বাস ফেলে। চোখ লাল হয়ে যায় তার মুহুর্তেই। শার্টের হাতা গুটাতে থাকে সে এরমধ্যেই।

“তোরা কোন বাপের সন্তান আমার জানার দরকার নেই। তোরা আমার স্ত্রীর গায়ে হাত তুলেছিস। কাপুরুষের বাচ্চা তোদের এখানে পুঁতে রাখার ক্ষমতা আছে আমার। ডাক তোদের কোন বাপকে ডাকবি।”
ছেলেগুলো উঠে দাঁড়ায়। ইরা ঢোক চাপে ভয়ে।

আরশাদের হাত ধরে হালকা টান দেয়।
“চলুন এখান থেকে।”
আরশাদ হাত ছাড়ায় নেয়।

“ইরা তুমি ছোটবেলায় নাচ শিখেছো কখনো শখ করে?”
“তার মানে?”
“শিখেছো কিনা বলো। অল্পস্বল্প পারলেও হবে।”
ইরা ভেবাচেকা খেয়ে যায়। কি করতে চাচ্ছে আসলে আরশাদ?

“কি রে থামলি কেনো? নাচ, কি রে নাচ?”
রক্তাক্ত অবস্থায় রাস্তায় পড়ে আছে একেকজন। আরশাদের ঠোঁটের কোণ থেকেও ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হচ্ছে। হাত কেটে গেছে অল্প। ইরা দিশেহারা। রুমাল চেপে ধরে আরশাদের হাতে।

“ইরা চুড়ি খোলো।”
“মানে? চুড়ি খুলবো কেনো?”
“চুড়ি খুলে একেকটা একেকজনের হাতে পরিয়ে দাও। যে পুরুষের হাত মেয়েদের উপর ওঠে সেই হাতে চুড়িই মানায়।”
আরশাদ নিজেই ইরার হাত থেকে চুড়িগুলো খুলে নেয়। এরপর একেকজনের হাতে সত্যিই পরিয়ে দেয় একেকটা।

“নে এবার ওঠ, নাটক করেছিস অনেক।”
“আমাদের তুই চিনিস না, আমরা কিন্তু…”
কথা শেষ করতে পারেনা, আরশাদ লাথি দিয়ে মুখ ঘুরিয়ে দেয়। আর্তচিৎকার করে ওঠে ওরা যন্ত্রণায়।

রিকশা চলছে, মানুষ হাঁটছে। অবাক হয়ে তাকাচ্ছে ওরা। রাস্তার এক পাশে ছয়জন ছেলে রক্তাক্ত অবস্থায় নাচছে, মুদ্রা দেখাচ্ছে।

পাশেই ঠোঁটের কোণে রক্তের ছোপ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে একটা বলিষ্ঠ, সুদর্শন সুপুরুষ। একটু যেনো হাসছে সে। পাশেই একটা মেয়ে ভীত মুখে দাঁড়িয়ে দেখছে ওদের।

আরশাদ চুল ঠিক করতে করতে গান শুরু করে,
“এ চুমকি চলেছে একা পথে, সঙ্গী হলে দোষ কি তাতে?
হার মেনেছে দিনের আলো, রাগলে তোমায় লাগে আরো ভালো…
হেই সুন্দরী চলেছে একা পথেএএএএএ…”

ছেলেগুলো দাঁড়াতেই পারছে না ঠিকমতো, নাচ তো দূরের কথা। তবুও থামার উপায় নেই। আরশাদের গানের তালে তালে নাচতে বাধ্য হচ্ছে ওরা। অদৃশ্য ভয় জেঁকে বসেছে তাদের।

ইরা চাপা গলায় বললো,”অনেক হয়েছে। চলুন এবার।”
“ভয় পাচ্ছেন নূরবউ?”
“আমি এদের মতো কুলাঙ্গারদের ভয় পাইনা। কিন্তু আপনি ঝামেলায় কেনো জড়ালেন?”
“কাপুরুষগুলো আমার বউয়ের গায়ে হাত তুলেছে, ওদের শাস্তি কেবল শুরু।”
ইরা কি মনে করে হেসে দেয়। আরশাদও হাসে কেটে যাওয়া ঠোঁটে।

“তাই বলে নাচাবেন?”
“কাপুরষদের শাস্তি দিতে মাঝে মাঝে একটু নাচানোই যায়। ব্লাউজ পরাতে পারলে আরো জমে যেতো। তোমার ওই গোলাপি ব্লাউজটা। হেই সুন্দরী চলেছে একা পথেএএএএএ….”
ইরা কপালে হাত দিয়ে মাথা নাড়ে ধীরে ধীরে। লোকটা কি আসলেই পাগল?

(চলবে….)