#মন_কেমনের_মরশুম
পর্ব: ২৫
রাতে ভালো ঘুম হয়নি ইরার। মাঝে মাঝে তন্দ্রা মতো এসেছে। আবার শরীর ঝাঁকি দিয়ে ঘুম ভেঙে গেছে। যতবারই ঘুম ভেঙেছে ততবারই বারান্দায় উঁকি দিয়ে আরশাদকে দেখে এসেছে। আরশাদ যেনো বেহুঁশ। চেয়ারের উপরেও এভাবে ঘুমানো যায় ইরা না দেখলে বিশ্বাসই করতো না। প্রচন্ড দুশ্চিন্তা আর মানসিক অবসাদের পর শরীর ছেড়ে দেয়। তখন এক পৃথিবী সমান ক্লান্তি ভর করে যেনো চোখে। আরশাদেরও সেই অবস্থা।
ভোরবেলা নামাজ শেষ করে কুরআন নিয়ে বসেছে ইরা। কুরআন শরীফটি সে বাড়ি থেকেই এনেছিলো। এটা তার মায়ের। মা সবসময় তেলাওয়াত করতো। ইরাও চেষ্টা করে কিন্তু এ বাড়ি আসার পর থেকে ফাঁকি দেয় শুধু। আজ স্বল্প ঘুমের মধ্যেই মায়ের মুখটা একবার দেখেছে। সে যেনো খুব রেগে ছিলো। ইরা মন খারাপ করে বলেছিলো, ‘হ্যা সবাই রেগে থাকো আমার উপর। কারো ভালোবাসা পাওয়ার যোগ্যতা আমার নেই।’
তহুরা আরো রেগে বলেছিলো,’কুরআন শরীফ পড়া ভুলে গিয়েছিস নাকি ইরাবতী? এতো ধৃষ্টতা দেখানোর সাহস পেলি কোথায়?’
ব্যস! মা চলে যায়। হাওয়ায় মিশে যায় একদম। ইরা ধড়ফড় করে উঠে বসে দেখে প্রকৃতিতে আলো ফোটার প্রস্তুতি নিচ্ছে, এখনো আঁধার আছে যদিও বাইরে। তখন মুয়াজ্জিনের কণ্ঠ ভেসে আসে ‘আসসালাতু খাইরুম মিনান নাউম’। ইরা আর দেরি করেনা। তাড়াতাড়ি করে নামাজ পড়েই কুরআন নিয়ে বসে। অদ্ভুত এক প্রশান্তি জেঁকে ধরে তার শরীরে। গত রাতের সব বিষাদ, যন্ত্রণা, ঘুম না হওয়ার ক্লান্তি এক নিমিষেই দূর হয়ে যায়।
প্রিয় সূরা আর-রহমানের ‘ফাবিআইয়্যে আলা রব্বিকুমা তুকাজ্জিবান’ এটা যতোবার পড়ে ততবার যেনো শরীর শীতল হয়ে ওঠে। কি মায়াভরা একটা আয়াত। ‘অতএব, তোমরা প্রতিপালকের কোন অনুগ্রহকে অস্বীকার করবে?’
আসলেই তো! এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের উপর যে মানুষের এতো দাপট, মারামারি, হানাহানি। আসলে আমরা কারা? কি আমাদের পরিচয়? কোথায় আমাদের অস্তিত্ব? সৃষ্টিকর্তা মাত্র একটা সেকেন্ড অক্সিজেন বন্ধ করলে যেখানে তার সৃষ্টি ধ্বংস হয়ে মাটিতে মিশে যাবে, সেই সৃষ্ট মানবের কিনা এতো অহংকার?
ইরা তেলাওয়াত করে আর কাঁদে। গুণগুণ করে যেনো কান্নার সুর তুলেছে সে।
ঘুম ভেঙে যায় হঠাৎ আরশাদের। মিনিট দুই সময় লাগে সে কোথায় আছে এটা বুঝতে। নিজেকে চেয়ারের উপর আবিষ্কার করে প্রথমে অবাক হলেও পরে সব মনে পড়ে। গায়ের উপর চাদরটা দেখে শান্ত হাতে ওটা নামায় শরীর থেকে।
ঘুম ভাঙার উৎস খুঁজতে খুঁজতে ঘরে ঢোকে সে। ইরার সেদিকে খেয়াল নেই। উল্টোদিক ঘুরে বসে কুরআন পড়ছে আর কাঁদছে। ধবধবে সাদা একটা ওড়না শরীরে জড়িয়ে। আরশাদের সবকিছু কেমন অপার্থিব মনে হয়। ঘরটিতে যেনো রোশনাই জ্বলছে। নূর ছড়াচ্ছে দিকে দিকে। বারান্দায় ইরা কিছুদিন আগে একটা বেলী গাছ লাগিয়েছে। ক’দিন বৃষ্টির পানি পেয়ে অজস্র ফুল ফুটেছে। অসহ্য রকম সুন্দর ঘ্রাণ ম ম করছে ঘরজুড়ে। আরশাদের শরীর অবশ হয়ে আসে। সমস্ত শান্তি সৃষ্টিকর্তা বেহেশতের জন্য তুলে রেখেছেন। তার সামান্য পরিমাণ কিছু অংশ যদি দুনিয়ায় চলে আসে, তবে মানবকূলের অস্বস্তি শুরু হয়ে যায়। কারণ ভয় হয়, পরক্ষণেই কষ্ট এলে মেনে নিতে পারবে তো?
বেশ অনেকটা সময় নিয়ে ইরা তেলাওয়াত শেষ করে। পুরোটা সময় আরশাদ শান্ত হয়ে তার দিকে তাকিয়ে শুনছিলো। কোনো এক অবাধ্য টানে সরে যেতে পারছিলো না।
কুরআন বন্ধ করে ওটা বুকে চেপে ইরা উঠে দাঁড়ায়। পরক্ষণেই মনে হয় তার পিছনে কেউ আছে। ঝট করে তাকাতেই চমকে ওঠে সে। হকচকিয়ে পড়ে যেতে গেলেই আরশাদ বাম হাত দিয়ে তার কনুই চেপে ধরে তাকে সামলায়। একটু পরেই আবার ছেড়ে দেয়।
“আপনার ঘুম ভেঙে গেছে?”
“কেনো? না ভাঙলে খুশি হতে?”
“এ কি বলছেন? এসব কি কথা?”
“খারাপ মানুষের খারাপ কথা।”
ইরার মুখটা অন্ধকার হয়ে যায়। আরশাদ সেদিকে না তাকিয়ে বাথরুমে চলে যায়। ইরা ভেবে পায়না জনাবের রাগ কখন ভাঙবে। লঘু পাপে গুরু দণ্ড দিচ্ছে? না তা হবে কেনো? তার পাপই গুরু। বরং গুরু পাপে লঘু দণ্ড দিচ্ছে লোকটা। দেখা যাক আর কতোদিন ক্যাফেইন ছাড়া থাকতে পারে সে।
ইরা জায়নামাজ গুছিয়ে রেখে বেরিয়ে যায় ঘর থেকে।
★
‘যদি মন কাঁদে তুমি চলে এসো, চলে এসো এক বরষায়’ গুণগুণ করে গান করতে করতে টেবিল সাজাচ্ছে নীলু। নিজাম হোসেন হাঁটতে বের হওয়ার আগে এহেনো দৃশ্য দেখে যারপরনাই অবাক। চোখ বড় বড় হয়ে যায় তার। চোখ কচলে আবার তাকায়, ভুল দেখলো নাকি?
এই সাত সকালে কিনা মেয়ে গান করছে আর নাশতা গোছাচ্ছে? এ-ও সম্ভব? টেবিল ভরে গেছে যেনো। পরোটা, মুরগি ভুনা, ফিরনি আরো যেনো কি, নিজাম হোসেন নামও জানেনা এমন কিছু নাশতা।
“নীলু….”
নীলু মিষ্টি করে হেসে বাবার দিকে তাকায়। সে আবার সকাল সকাল গোসলও দিয়েছে। গাঢ় নীল সালোয়ার কামিজ আর সাদা ওড়নায় কি যে মোহনীয় লাগছে তাকে। ভেজা চুল বেয়ে পানি পড়ছে ফোঁটায় ফোঁটায়। এমনই কোনো এক রূপবতী তরুণীকে দেখেই বোধহয় কবিগুরু লিখেছিলেন,’ চোখের পানে চাহিনু অনিমেষ, বাজিলো বুকে সুখের মতো ব্যথা।’
“বাবা বেরোচ্ছো?”
নিজাম হোসেন আমতা আমতা করে বললো,”বেরোবো তো ভেবেছিলাম। কিন্তু তুই অসুস্থ হলে বেরোনো উচিত হবে না। আজ বরং বাড়িতেই থাকি।”
নীলু অবাক হয়ে বললো,”অসুস্থ মানে? কে অসুস্থ? আমাকে দেখে কি অসুস্থ মনে হচ্ছে তোমার?”
“সবসময় শারীরিক অসুস্থতাই যে অসুস্থতা তা কেনো? মানসিক অসুস্থতাও ভয়ের বিষয়।”
“বাবা তুমি নিশ্চয়ই আমাকে পাগল বলছো না।”
“ওরে বাবা! আমার ঘাড়ে কয়টা মাথা যে ঝাঁসির রানীকে পাগল বলবো।”
নীলু মুখ টিপে হাসে। আবারও গান করতে করতে খাবার গোছানোতে মন দেয়। আজ যেনো তার আনন্দের বান ডেকেছে।
“দেখো তো বাবা, সব ঠিক আছে? আমার মনে হচ্ছে কম হয়ে গেছে। আরো কয় পদ থাকলে ভালো হতো। মাঝরাতে ঘুম থেকে উঠে সব বানিয়েছি একা হাতে। আরেকটু আগে ঘুম থেকে উঠলে বোধহয় আরো কিছু পদ হতো।”
নিজাম হোসেন নরম গলায় বললো,”তোর বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধুরা কেউ আসবে?”
“না তো বাবা। আর তাছাড়া তুমি জানো না যে আমার কোনো বন্ধু নেই?”
“তাহলে এতো আয়োজন কিসের? আমরা মাত্র দুইজন এ বাড়িতে। দুইজনের জন্য নিশ্চয়ই এতো খাবার না। আর কে আসবে?”
নিজাম হোসেন কিছু একটা ভেবেও থেমে যায়, কিছু বলেনা। তবে কি আরশাদ আসবে? নীলু কি আরশাদের জন্য এতোকিছু….
নীলু খাবার গুলো ঢেকে রাখতে রাখতে বাবার দিকে তাকায়।
“ঠিক ধরেছো বাবা৷ এগুলো শুধু আমাদের জন্য না। অতিথি আসবে বাড়িতে, তার জন্যই।”
“অতিথি? কে আসবে? আমি তো জানিনা।”
“এখন জানবে। কারণ অতিথিকে তুমি নিমন্ত্রণ করে নিয়ে আসবে।”
নিজাম হোসেন ভ্রু কুঁচকে মেয়ের দিকে তাকায়। কমবয়সী মেয়েগুলো বাবা কিংবা স্বামীর সাথে আহ্লাদ করতে ভালোবাসে। রহস্য তৈরি করে খুশি হয়। যদিও নীলুর সেই বয়সটা আর নেই। মাত্র কয়েক মাস পর গ্রাজুয়েশন শেষ করতে যাচ্ছে। তারচেয়েও বড় কথা তার মনের অবস্থা ভালো নেই। হুট করে তার এমন আচরণ নিজাম হোসেনকে ভয় পাইয়ে দিচ্ছে। কিন্তু উপরে প্রকাশ করেনা সে।
“আমি নিমন্ত্রণ করে অতিথি নিয়ে আসবো?”
“হ্যা তুমি নিয়ে আসবে।”
“সে কে?”
নীলু চেয়ারে হেলান দিয়ে বাবার মুখোমুখি দাঁড়ায়। তার চোখেমুখে দুষ্টুমি খেলা করছে।
নিজাম হোসেন মেয়ের মাথায় হাত দিয়ে একটু ঘোরায় তার মাথাটা।
“মায়ের মতো সবসময় মাথায় কিছু না কিছু চলে তাইনা? এখন কি চলছে মাথায় ফটাফট বলে দাও তো মা জননী।”
“বাবা আজ হেঁটে বাড়ি ফেরার সময় তোমার প্রিয় ডাক্তার সাহেবকে সাথে নিয়ে আসবে। বেচারার বউ নেই, সংসার নেই। কি খায় না খায়। আজ সকালের নাশতাটা ডাক্তার সাহেব আমাদের সাথে করবেন।”
নিজাম হোসেন হতবাক হয়ে যায় মেয়ের কথায়।
“কাকে নিয়ে আসবো? রোশানকে?”
নীলু মাথা নেড়ে বললো,”হ্যা উনাকে। তুমিই তো বলেছো একদিন উনাকে পাত পেড়ে খাওয়াবে। সময় সুযোগ হচ্ছিলো না। আজই ভাবলাম মোক্ষম দিন। ভালো হবে না?”
নিজাম হোসেন উত্তর দেয়না। চোখ কুঁচকে মেয়ের দিকে তাকায়। নীলু সেদিকে পাত্তা না দিয়ে চিরুনি হাতে বারান্দায় চলে যায়। চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে আবারও গান গাইতে থাকে। তবে এবার খোলা গলায়। নিজাম হোসেন কিছুই বুঝতে পারেনা। মেয়ের হঠাৎ কি হলো? কি চলে তার মাথায়?
★
বাথরুম থেকে চুল মুছতে মুছতে বের হয় আরশাদ। ইরা নেই ঘরে কোথাও। একটা ছোট্ট শ্বাস ফেলে খাটের কাছে যেয়ে দেখে বিছানার উপর তার জামাকাপড় গুছিয়ে রাখা। পাশের ছোট টেবিলের উপর একটা মগ, তাতে গরম কফি থেকে ধোঁয়া উড়ছে। পাশে আবার ভাঙা মোবাইলটাও আছে।
মগের নিচে ছোট্ট একটা কাগজ। আরশাদ মগ সরিয়ে কাগজটা হাতে নেয়।
‘আমাকে দেখতে না চাইলে দেখা দিবো না কিন্তু ওসব বলে আমাকে কষ্ট দিবেন না। কে কবে দুনিয়া ছাড়বে আমরা জানিনা। কিন্তু আমি চাই আমার আয়ু আপনার চেয়ে একদিন হলেও যেনো কম হয়। আগে বুঝতে পারিনি, কিন্তু গত রাত থেকে বুঝেছি আপনি আমার এই পৃথিবীতে এক এবং একমাত্র আশ্রয়। আপনি না থাকলে আমি অসহায়। ঝড়ে পড়ে যাওয়া একটা চড়ুইয়ের মতোই অসহায়। আমি আপনাকে কষ্ট দিয়েছি, আপনার সব রাগ আমার উপর। কিন্তু আমার উপর রাগ করে নিজেকে কষ্ট দিবেন না৷ নাশতা না করে অফিসে যাওয়া বারণ।
একটু বেশি অধিকার দেখিয়ে ফেললাম? সে হোক, ভালোবাসার সাথে অধিকারটাও তো সমানুপাতিক হারে বাড়ে তাইনা? বিজ্ঞানের ছাত্র হয়ে অঙ্কটা ভালোই পারেন আপনি আমার থেকে।
বি.দ্র. ১: আমার হাতের কফি মনে করে দয়া করে মগটা ছুঁড়ে ভেঙে ফেলবেন না। কদুর মা বানিয়েছে আজ কফি, আমি না।
বি.দ্র. ২: মোবাইলটা কি আবার ফিরে পাওয়া সম্ভব? কথা দিচ্ছি আর বন্ধ থাকবে না৷ শেষ সুযোগ কি দেওয়া যায় আমাকে?
ইতি,
নূরবউ।
আরশাদ মগটা আবার রেখে দেয় জায়গা মতো। কাগজটার উল্টোপিঠে কলম চালায়। এরপর ওটাও মগের নিচে রেখে ভাঙা মোবাইলটা পকেটে ঢুকায় আরশাদ।
বিছানার উপরে রাখা জামা না পরে আলমারি থেকে অন্য কাপড় বের করে পরে। ল্যাপটপের ব্যাগ কাঁধে ঝুলিয়ে বেরিয়ে যায় ঘর থেকে।
স্টোর রুমের দরজা খোলা ছিলো, পর্দা টানা ছিলো শুধু। পর্দার ওপাশে দাঁড়িয়ে এদিকেই তাকিয়ে ছিলো ইরা। আরশাদ বেরিয়ে যেতেই সে ঘরে ঢোকে। বিছানায় থাকা জামাকাপড় গুলোর দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে। ‘আমি কি জামায় বিচুটি পাতা ঘষে দিয়েছিলাম নাকি ছারপোকা ছেড়ে দিয়েছিলাম যে ওটা পরা যাবে না?’
কফির মগটা দেখেও রাগ হয় ইরার। কি আশ্চর্য! বলেই তো দিয়েছে কফি তার বানানো না, তবুও খেলো না?
হঠাৎ কাগজটার দিকে চোখ যায় ইরার। তার লেখার উল্টোপিঠে কিছু লেখা। কৌতুহলী হয়ে ওটা উঠায় হাতে।
‘পর্দার ওপাশ থেকে নজরদারি রাখে সতীনের সংসারে, নিজের সংসারে না। যদি কেউ তাই চায় তবে আমারও বিশেষ আপত্তি নেই।
বি.দ্র. ১: কদুর মায়ের কফি কদুর শরবতের মতো বিস্বাদ হয়। ওটা কদুর বাপের জন্য ঠিক আছে। আর কেউ বানালে ভেবে দেখতাম।
বি.দ্র. ২: নতুন মোবাইল আসবে, সাথে নতুন চার্জার। চার্জটা মোবাইলের সাথে মোবাইলের মালকিনের জন্যেও প্রযোজ্য হবে।
ইতি,
একজন বাজে মানুষ।
চিঠিটা হাতে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকে ইরা। চোখমুখ লাল হয়ে উঠেছে। কীভাবে বলে লোকটা এসব? গম্ভীর মুখে অবলীলায় দুষ্টুমি করার উপর কোনো পুরষ্কার ব্যবস্থা থাকলে উনিই পেতো।
আবার একটা বিয়ে করতে নাকি আপত্তি নেই। আসলেই একটা বাজে লোক, ভীষণ বাজে। ইরা মুখ অন্ধকার করে বিছানায় বসে থাকে।
★
বাবা বেরিয়ে যাওয়ার পর নীলু নিজের ঘরে আসে। আলমারি থেকে একটা ফুলের তোড়া বের করে। দুইদিন আগের তোড়া, বেশ অনেকটা শুকিয়ে এসেছে। একশটা তাজা গোলাপ ছিলো। বেশ অনেকগুলোর পাপড়ি ঝরে গেছে। কিন্তু গোলাপ তো গোলাপই, ফুলের রানী। এখনো কেমন চাপা সুন্দর একটা সুঘ্রাণ বেরোচ্ছে।
এ ফুলের ঘটনা মোটেই সামান্য নয়। সেদিন ভার্সিটি থেকে বের হয়েই দেখে টিপটিপ বৃষ্টি। নীলু রিকশার জন্য রাস্তায় এসে দাঁড়ায়। ঠিক তখনই একটা আট নয় বছরের মেয়ে ফুলের তোড়া হাতে হাজির হয়। ময়লা ফ্রক, এলোমেলো চুল। নীলু দেখেই বোঝে ক্যাম্পাসের ফুলওয়ালী মেয়ে।
“আপা ও আপা।”
নীলু তার দিকে তাকিয়ে সুন্দর করে হেসে বললো,”আমার ফুল লাগবে না, অন্য কোথাও যাও।”
মেয়েটা হলুদ দাঁতে হাসে।
“এটা আপনারে উপহার দিছে একজন।”
নীলুর ভ্রু কুঁচকে যায়।
“কি বললে? উপহার? আমাকে?”
“জি, স্যার গাড়িতে বসেছিলো। আমাকে এটা দিয়ে দূর থেকে দেখায় দেয় আপনারে দিতে। আমারে টাকা দিছে এইজন্য উনি।”
নীলুর অবাক হওয়ার মাত্রা ছাড়িয়ে যায়। এই মেয়ে নির্ঘাত ফুল বেচার জন্য ফাজলামি করছে তার সাথে। নীলু এটা হাতে নিলেই বলবে ফুল নিছেন এবার টাকা দেন। এদের নীলু ভালো করেই চিনে।
“আমি ফুল নিবো না, যাও এখান থেকে।”
মেয়েটার মুখ কালো হয়ে যায়।
“নেন না, নাহলে স্যার মন খারাপ করবেন। স্যার দেখতে খুব সুন্দর, কালো চশমা পরেছিলেন।”
নীলু মেয়েটাকে বকা দিতে যেয়ে থেমে যায়। হঠাৎ অন্য একটা চিন্তা মাথায় আসতেই চুপ করে যায় সে।
“নেন না আপা, নেন না। স্যার অনেক ভালো মানুষ।”
নীলু কিছুটা ইতস্তত করে তোড়াটা হাতে নিতেই মেয়েটা পালায়। নীলু ডাকে তাকে পিছন থেকে, কে শোনে কার কথা।
হঠাৎ তোড়ার মাঝে একটা চিরকুট দেখে নীলু আগ্রহী হয়ে হাতে নেয় ওটা।
‘পৃথিবীর সবচেয়ে স্নিগ্ধ ও মিষ্টি গোলাপটির জন্য একশটা তাজা গোলাপ। গ্রহণ করলে খুশি হবো।’
নীলু বুঝে ফেলে এ কাজ কার। রাগে নীলুর তালু জ্বলে ওঠে। ঘন ঘন তপ্ত শ্বাস ফেলতে থাকে সে।
ভাবনার মধ্যেই কলিংবেল বেজে ওঠে। নীলুর মুখে হাসি ফুটে ওঠে। তোড়াটা আবার আলমারিতে ঢুকিয়ে রেখে আয়নার দিকে একবার তাকায়। নিজের কাছে নিজেকে সুন্দর লাগছে। মেয়েদের সাইকোলজি বড়ই অদ্ভুত। কেউ যদি তাদের পছন্দ করে তারা নিজেদের সৌন্দর্য যেনো আরো উজাড় করে দেয়। তাকে পছন্দ হোক বা না হোক। নীলুর ঠোঁটে একটা দুষ্টু হাসি ফুটে ওঠে।
দরজা খুলেই নীলুর দুশ্চিন্তা কাটে। সে ভেবেছিলো রোশান আসবে না হয়তো। অনেক উত্তেজিত হয়ে কোনো পরিকল্পনা করলে তা ভেস্তে যায়, আগেও দেখেছে নীলু। কিন্তু না, রোশান এসেছে। গাঢ় নীল ট্রেকস্যুটে তাকে ভালো লাগছে। বয়সটা বোঝা যায়না।
“আরে নীলু দেখ না, রোশান তো আসতেই চাচ্ছিলো না। আমি বললাম তুই রান্নাবান্না করে বসে আছিস। না গেলে মেয়েটা মন খারাপ করবে। এসব বলে ব্লাকমেইল করে ধরে নিয়ে এলাম ওকে। ভালো করেছি না?”
নীলু গাঢ় গলায় বললো,”খুব ভালো করেছো বাবা।”
রোশানের খুব অবাক লাগছে নীলুকে দেখে। নীলু নিজে হাতে হঠাৎ তার জন্য রান্নাবান্না করে তাকে দাওয়াত দিয়েছে? কিন্তু কেনো? ফুল মন থেকেই গ্রহণ করেছে এজন্য? মনে হয়না নীলু এতো নরম মনের মেয়ে। তাহলে ঘটনা কি?
নিজাম হোসেন রোশানকে নিয়ে টেবিলে বসেছে। নীলুকেও জোর করছে একসাথে বসার জন্য। কিন্তু নীলু জানায় সে পরে খাবে। রোশান আড়চোখে তাকায় নীলুর দিকে। তাকে আজ এক খন্ড নীলাকাশ মনে হচ্ছে। শরৎ-এর আকাশ, যে আকাশে তুলোর মতো রাশি রাশি সাদা মেঘ ভেসে বেড়ায়।
নীলু নিজে হাতে খাবার পরিবেশন করে। বাবার জন্য আলাদা বাটি, রোশানের জন্য আলাদা।
“রোশান বসে না থেকে শুরু করো। মেয়ে তার মায়ের রান্নার হাত পেয়েছে। এতো মজার খাবার সামনে নিয়ে বসে থাকা যায়না।”
রোশান কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে বললো,”জি জি।”
নীলু পাশেই দাঁড়িয়ে থাকে। তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রোশানের দিকে।
রোশান পরোটা ছিঁড়ে মুরগির ঝোল মাখিয়ে মুখে নিতেই তব্দা খেয়ে যায়। বাঁকা চোখে নীলুর দিকে তাকায়, নীলু নির্লিপ্ত।
“কি হে ইয়াং ম্যান! একবার নিতেই এই অবস্থা? বলেছিলাম কিনা বলো? মেয়ের মায়ের হাতের রান্না এমনই ছিলো।” নিজাম হোসেন খেতে খেতে হড়বড় করে কথা বলতে থাকে।
এদিকে রোশানের চোখ থেকে পানি বের হয়ে আসে। চোখমুখ জ্বলছে তার মরিচের ঝাঁঝে৷ আস্তে আস্তে মুখ নাড়ে সে।
নীলু বিড়বিড় করতে থাকে,”পৃথিবীর সবচেয়ে মিষ্টি গোলাপের হাতের কলিজা জ্বালানো রান্না। বেশি করে খান ডাক্তার সাহেব।”
“এই রোশানকে আরো দে, দাঁড়িয়ে আছিস কেনো?”
“ওটুকু আগে খেয়ে নিক উনি। তাইনা ডাক্তার সাহেব?”
রোশান মুচকি হেসে বললো,”আরো দিন, কি আর আছে জীবনে।”
নীলু অবাক হয়ে তাকায় তার দিকে। রোশান খেয়েই যাচ্ছে একদমে। সে কি! ঝাল হয়নি নাকি? সে যে চেখে দেখলো। তাতেই তার ঠোঁট জ্বলে যাচ্ছিলো। আর এই লোক….
“কি হলো দিবেন না?”
নীলুর ধ্যান ভাঙে রোশানের ডাকে।
“জি জি দিচ্ছি।”
রোশান খেতে খেতেই নিজাম হোসেনের দিকে তাকায়।
“স্যার ম্যাডাম বুঝি আপনার সাথে অনেক দুষ্টুমিও করতেন?”
“তুমি কীভাবে জানলে? আরে একবার কি হয়েছে শোনো, আমার সাথে তার তুমুল ঝগড়া। আমি রাগ করে বাইরে চলে গেলাম। অনেক রাতে বাড়ি ফিরে দেখি সে মহাসমারোহে রান্নাবান্না করছে। সব আমার পছন্দের খাবার। সে এক এলাহি আয়োজন। আমি তো অবাক। ভাবলাম ঝগড়া থেকে যদি ভালো কিছু হয় তবে ঝগড়াই ভালো। কিন্তু খেতে বসে বুঝতে পারি কি পাপটাই না করেছি ভদ্রমহিলার সাথে ঝগড়া করে। সব খাবারে এতো মরিচ দিয়েছে যে আমার জিভ থেকে পাকস্থলী পর্যন্ত জ্বলতে থাকে। সামনে প্রিয় খাবার অথচ খেতে পারছি না।”
নিজাম হোসেন হো হো করে হাসে।
নীলু বিরক্ত হয়ে বললো,”বাবা খাও না চুপ করে।”
রোশান নিঃশব্দে হাসে নীলুর দিকে তাকিয়ে। ফিসফিস করে বলে,”মেয়ে মায়ের অনেক গুণই পেয়েছে।”
রোশানের চোখমুখ লাল, তবুও সে খেয়েই যাচ্ছে।
নীলুর এবার কিছুটা মায়া হয়। একটু বাড়াবাড়ি করে ফেললো? কিন্তু লোকটা খেয়েই যাচ্ছে কেনো? থামলে হয়না? আশ্চর্য!
হঠাৎ ল্যান্ডলাইনের ফোনটা বেজে ওঠে। নিজাম হোসেন খাওয়া রেখে উঠে যায়।
সে চলে যেতেই নীলু রোশানের দিকে তাকিয়ে কঠিন গলায় বললো,”আর খেতে হবে না।”
“কেনো? শাস্তি শেষ?”
“দিন প্লেট দিন। আমি নতুন করে এনে দিচ্ছি।”
“কেনো? এতে কি সমস্যা?”
নীলু অস্বস্তিতে ঠোঁট কামড়ায়।
“আচ্ছা ওটা রাখুন, ফিরনি খান। আমি নতুন করে এনে দিচ্ছি বললাম তো।”
“ফিরনিতে আবার কি মিশিয়েছেন? মরিচগুঁড়া মেশালে তো সাদা রঙ হতো না। হুম বুঝেছি, লবণ রাইট?”
নীলু খপ করে রোশানের সামনে থেকে প্লেট সরিয়ে ফেলে। ফিরনির বাটিটা সামনে দিয়ে রান্নাঘরে চলে যায়। সব খাবার ফেলে দিয়ে নতুন করে প্লেট সাজায়।
কিন্তু খাবার নিয়ে ফিরে আসতেই দেখে রোশান উঠে দাঁড়িয়েছে। ফিরনি ছুঁয়েও দেখেনি।
নিজাম হোসেন এসে অবাক হয়ে বললো,”এ কি? তুমি দাঁড়িয়ে কেনো?”
“আজকের মতো এটুকুই থাক স্যার।”
“কেনো কেনো? মেয়েটা এতো কষ্ট করে সবকিছু রান্না করলো। অল্প খেয়েই চলে যাচ্ছো যে?”
“জি উনি ভালোই কষ্ট করেছেন, সফলও হয়েছেন। মানতেই হবে অসম্ভব সুন্দর উনার রান্নার হাত। তবে আজকের মতো এখানেই বিদায় নিতে হবে স্যার। আমরা ডাক্তার মানুষ, কতোটুকু ডোজে থামতে হবে আমরা বুঝবো না তো কে বুঝবে বলুন?”
নিজাম হোসেন আর কিছু বলতে পারেনা। ছেলেটার চোখমুখ হঠাৎ এমন লাল হয়ে গেলো কেনো বুঝতে পারছে না সে।
অপরাধী মুখে খাবার হাতে দাঁড়িয়ে নীলু। ধুর! বেশি বেশি হয়ে গেলো। নিজের রাগকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি সে। হ্যা রোশানও বাড়াবাড়ি করেছে কিন্তু এতোটা শাস্তি কি প্রাপ্য ছিলো তার? কে জানতো সে খাবারটা শেষ করবে? নীলু তো ভেবেছিলো একবার খেয়েই আর খাবে না।
সিঁড়ির মুখে এসে নীলু মৃদু গলায় ডাকে রোশানকে।
“এইযে শুনুন।”
রোশান দাঁড়ায়। সুন্দর করে হাসে তার দিকে তাকিয়ে।
“ফিরনিটা খেলেননা কেনো? ঝালটা কমতো অন্তত। বিশ্বাস করুন ওতে আমি কিছু…”
“ওতে কিছু মেশাননি তাই তো? আমি জানি তা করেননি। ওটা খেলে ঝাল কমতো আমার। কিন্তু তাতে তো আমার শাস্তির পরিমাণ কম হতো, তাইনা?”
নীলুর অস্বস্তি হয় ভীষণ। ছোট লাগে নিজেকে নিজের কাছেই।
“আজ চলি কেমন? অন্য কোনোদিন নাহয় এসে বেশি করে লবণ দেওয়া ফিরনি খেয়ে যাবো।”
রোশান চলে যায়। নীলু সিঁড়ির সামনে ভোঁতা মুখে দাঁড়িয়ে থাকে। দিনের সূচনাটাই এমন, দিনটা কেমন যায় কে জানে!
★
কলেজ থেকে ফিরে গোসল দিয়ে বারান্দায় বসেছে ইরা। ভেজা চুল ছেড়ে দিয়ে পাখিদের সাথে গল্প করছে। পরনে একটা কুসুম হলুদ রঙা শাড়ি, লাল পাড়। শাড়িটা রাবেয়া বেগমের। সেদিন শাড়ি দেখতে দেখতে ইরার চোখ বারবার এই তাঁতের শাড়িটার দিকে যাচ্ছিলো। রাবেয়া বেগম বুঝতে পেরে বললো,”তোমার পছন্দ হয়েছে এটা? আরশাদের বাবা রাজশাহী থেকে এনে দিয়েছিলো। তাও প্রায় বছর নয়/দশ আগে। কম পরি বলে নতুন আছে।”
“খুব সুন্দর শাড়ি।”
“তোমার ভালো লাগলে নাও।”
ইরা হতভম্ব হয়ে বলেছিলো,”না না, আমি কেনো নিবো আপনার শাড়ি? তাছাড়া উনি আপনাকে উপহার দিয়েছেন। এটা তো স্মৃতি আপনার জন্য।”
“অসুবিধা নেই, তোমার কাছেই নাহয় স্মৃতি থাকলো। পালিয়ে নিশ্চয়ই যাবে না শাড়ি নিয়ে। তাছাড়া এই বয়সে আমি এসব রঙ পরবোই বা কেনো? এগুলো তো তোমাদের রঙ।”
ইরা একটু ইতস্তত করলেও রাবেয়া বেগম জোর করে শাড়িটা দিয়ে দেয় ইরাকে সেদিন।
এ ক’দিন না পরলেও আজ কি মনে করে গোসল করেই শাড়িটা পরেছে ইরা। হালকা সেজেছে আবার। ওর কাছে মনে হয় মেয়েদের চোখের নিচে অল্প কাজলের ছোঁয়া পড়লেই আর বেশি কিছু লাগেনা সাজতে। এতেই মোহনীয়তার চিহ্ন এঁকে যায় সারা মুখ জুড়ে।
ভেজা চুল বাঁধতে না পেরে ওভাবেই ছেড়ে বসে আছে।
“এই তোরা সারাদিন প্রেম করিস কেনো? তোদের আর কোনো কাজ নেই?”
পাখিগুলো কিচকিচ করে ওঠে। যেনো ইরার কথার উত্তর দেয় ওরা। ইরা মুখ বাঁকায়।
এদিকে উনি রাগ করে বসে আছেন আর এদিকে কিনা পাখিদের প্রেম দেখতে হচ্ছে সকাল-সন্ধ্যা।
ইরা উঠে দাঁড়ায়। সন্ধ্যা মিলাবে এক্ষুনি। সূর্যাস্ত দেখতে ইরার খুব ভালো লাগে। কেমন গোধূলি রঙা আলো ছড়িয়ে দেয় চারপাশে। প্রকৃতি যেনো সেজে ওঠে ষোড়শী রূপবতী কন্যা হিসেবে। এই মায়াভরা পৃথিবী ছেড়ে একদিন চলে যেতে হবে ভাবতেই বুকটা কেমন করে ওঠে। ইরা গ্রিলে দুই হাত ঠেকিয়ে আবৃত্তি করে ভ্রমরেরই আরেক পঙক্তি, যা এক সময় অনেক প্রশংসা পেয়েছিলো।
“স্বর্ণ বিগলিত রোশনী, সে যেনো কিশোরীর মতো উচ্ছল।
উজাড় করে হৃদয়ের কুঠুরি, কে গো সখী উজ্জ্বল?
আমি সূর্যের ন্যায় যেমন জ্বালিয়েছে ওই আকাশ, ওই প্রহর।
আমি ভ্রমর, আমি চিত্তসন্ধিতে রই অমর।”
অফিস থেকে তাড়াতাড়ি ফিরে এসেছে আরশাদ। কেনো যেনো মন বসছিলো না আজ কাজে। তোলপাড় চলছে বুকে। প্রকৃতির ঝড় তো শান্ত হয়ে যায়, কিন্তু হৃদয়ের ঝড় শান্ত হতে চায়না সহজে।
দরজা খুলতেই দেখে ইরা ঘরে নেই। চুপচাপ ব্যাগটা রেখে বারান্দায় উঁকি দিতেই দেখে ইরা ভেজা চুল শুকাচ্ছে। শাড়ির আঁচল সরে গেছে বেখেয়ালে। পিঠ, কোমরের অনেকটা অংশ অনাবৃত হয়ে পড়েছে। মোমের মতো গলতে থাকে আরশাদের বেসামাল রাগ।
কিন্তু না এতো সহজে ধরা দেওয়া যাবে না। বারবার তাহলে একই ভুল করবে। বালিকা বধূর রূপে উন্মাদ হয়ে ক্রোধ সামলানো তো সামান্য ব্যাপার নয়।
ইরা পিছন ঘুরে তাকাতেই দেখে আরশাদ দাঁড়িয়ে আছে তার দিকে তাকিয়ে। ইরার মনটা আর্দ্র হয়ে যায়। পিপাসায় বুকটা শুকিয়ে আসে। তার মন বলছে আরশাদ তাকে বুকে ঠাঁই দিবে এবার। তার চোখ যে সে ইশারাই করছে।
আরশাদ আপাদমস্তক ইরাকে দেখে সামনে থেকে। বাইরে শ্রাবণ চললেও ইরার শরীরে যেনো ফাগুনের আগুন জ্বলছে। মেয়েটাকে অসহ্য সুন্দর লাগছে আজ। আরশাদের রাগ হয়, অকারণেই মেজাজ খারাপ হয়।
“তোমার নতুন মোবাইল টেবিলে আছে। আশা করি পছন্দ হবে।”
আরশাদ আর দাঁড়ায় না। হাতমুখ ধুতে চলে যায়। ছলছল চোখে তার দিকে তাকিয়ে ইরা চাপা গলায় বলে,’উজাড় করে হৃদয়ের কুঠুরি, কে গো সখী উজ্জ্বল?”
(চলবে……)
#মন_কেমনের_মরশুম
পর্ব ২৬:
আজ বোধহয় অমাবস্যা, চাঁদের আলো নেই বাইরে। বৈদ্যুতিক লাইনে সমস্যা হওয়ায় লোডশেডিং, স্ট্রিট লাইট পর্যন্ত বন্ধ। ঘুটঘুটে অন্ধকার বাইরে। এরকম আঁধার ইরার ভালো লাগে। কেনো ভালো লাগে তা সে জানেনা। নিশ্ছিদ্র আঁধারে দাঁড়িয়ে নিজের অতীত নিয়ে ভাবতে ইচ্ছে হয়। কেমন হতো যদি তার মা বেঁচে থাকতো? বাবা পঙ্গু হয়ে না যেতো? সৎমায়ের সংসারে থাকা না লাগতো? নীলু আপা কিংবা আশার মতো একটা আদুরে মেয়ে হয়ে বাঁচতে পারতো না সে? পারতো বোধহয়।
আবার ভাবে, তাহলে কি আরশাদকে পাওয়া যেতো? জীবন তার কাছ থেকে অনেক কিছু কেড়ে নিলেও, ফিরিয়েও তো দিয়েছে অনেক মূল্যবান উপহার। আরশাদের মতো সুপুরুষ যে স্বপ্ন তার জন্য, স্বপ্ন ছোঁয়া কি এতোই সোজা?
“বারান্দায় এভাবে দাঁড়িয়ে আছো কেনো? সমস্যা কি?”
ইরা পিছনে ঘুরে তাকায়। অন্ধকারে আরশাদের মুখটা ভালোভাবে দেখা যাচ্ছে না।
“আপনিই তো বলেছেন আমার মুখ দেখতে চান না। তাই এখানে দাঁড়িয়ে আছি। আপনি ঘুমিয়ে গেলে ঘরে যাবো।”
এই বলে ইরা আবার উলটো ঘুরে বাইরের দিকে তাকায়।
আরশাদ ভ্রু কুঁচকে তাকায় ইরার দিকে। তাদের অফিসের বস একজন মধ্যবয়স্ক পুরুষ, খুব মজার এবং রসিক। সবসময় কিছু না কিছু নিয়ে মজা করতেই থাকে।
আরশাদ বিয়ে করেছে শুনে জোঁকের মতো লেগেছে তার পিছে। দেখা হলেই রসিকতা শুরু। আরশাদ তো পারলে পালিয়ে বাঁচে। সেদিন কথায় কথায় ইরার বয়স শুনে বস হেসেই অস্থির। আরশাদ যারপরনাই বিরক্ত হয়। বাইশ বছর শুনে এতো হাসির কি আছে? সে কি দশ বছরের শিশু বিয়ে করেছে? কি আশ্চর্য!
“স্যার হাসছেন কেনো বুঝলাম না। এখানে হাসির কি আছে?”
বস হাসতে হাসতে আরশাদের পিঠ চাপড়ে দেয়।
“বয়স কম মেয়েরা একটু ঢংঢাং করতে পছন্দ করে আরশাদ। তারা সবসময় আহ্লাদী মুখ করে ঘোরে। একটু বকা দিলেই ঠোঁট ফুলিয়ে কাঁদে। বউ বড় করতে করতে তো তুমিই বুড়ো হয়ে যাবে।”
বস হাসে। আরশাদ আরো বিরক্ত হয়। তার বয়স মাত্র ঊনত্রিশ। বুড়ো হওয়ার বয়স হয়েছে তার? আরশাদ মনে মনে বসকে তিনবার বলে,’আপনি বুড়ো, আপনি বুড়ো, আপনি বুড়ো।’
“ব্যাপারটা এমন না স্যার। ও বাস্তবতা বোঝে। বয়স বেশি না হলেও তার ম্যাচুরিটি কিশোরীদের মতো নয়। আপনার ভুল ধারণা এসব।”
“শোনো ইয়াং ম্যান, চুলগুলো বাতাসে পাকেনি। বহুদিনের অভিজ্ঞতা আছে এই ঝুলিতে। যতোই বাস্তবতা বুঝুক আর ম্যাচিউর হোক না কেনো, স্বামীর সামনে তারা আহ্লাদী। আদর সোহাগ করে না বুঝিয়ে, বকা দিলে হিতে বিপরীত। আর স্বামী যদি তোমার মতো নায়ক চেহারার হয় তাহলে তো কথাই নেই।”
আবার হাসে লোকটা। আরশাদের ইচ্ছা করে উঠে চলে যেতে। নেহাৎ বস বলে সহ্য করছে। চাকরি বাঁচানো দরকার আগে।
“আমি জানি তুমি বিরক্ত হচ্ছো আমার উপর। কিন্তু মিলিয়ে নিও। মেয়েদের ষোলো থেকে পঁচিশ বছর বয়সটা আগুনের মতো। ছাই চাপা দিয়ে থাকলেও ভিতর ভিতর লেলিহান শিখা। একটু উষ্কে দিয়েছো কি মরেছো।”
আরশাদ সেদিন বসের কথা পাত্তা না দিলেও এখন হাড়ে হাড়ে বুঝতে পারছে। লোকটা নেহাৎ মন্দ কথা বলেনি, শুধু শুধুই রেগে যাচ্ছিলো সে। কোথায় এতো বড় একটা অন্যায় করেছে, অনুতপ্ত হবে। তা না করে উলটে মেজাজ দেখাচ্ছে। মোবাইলটা পর্যন্ত ছুঁয়ে দেখেনি এখনো। মহা ধিরিঙ্গিবাজ মেয়ে!
“ঘরে চলো।”
“বললাম তো আপনি ঘুমান, তারপর যাবো।”
আরশাদ চোখ বন্ধ করে বড় শ্বাস নেয়। রাগ নিয়ন্ত্রণ করা দরকার।
“তোমাকে আমি দুই মিনিটের মধ্যে ঘরে দেখতে চাই। মাত্র দুই মিনিট সময়।”
ইরা আবারও আরশাদের দিকে ঘুরে বললো,”না গেলে কি করবেন?”
“তুলে নিয়ে যাবো।”
“ঘোড়ার ডিম নিবেন।”
“কি বললে তুমি?”
ইরা খুব মজা পাচ্ছে। আরেকটু রাগিয়ে দেওয়া যাক ভদ্রলোককে। দেখা যাক কি করে। কি ভাঙবে এবার? বারান্দায় তো ভাঙার মতো কিছু নেই। ইরাকে ধরে আছাড় দিবে না তো?
“বললাম ঘোড়ার ডিম নিবেন।”
আরশাদ ইরার অনেকটা কাছে এগিয়ে আসে। ইরা স্পষ্ট আরশাদের গন্ধ পায়। সিগারেটের ধোঁয়ার গন্ধ ছাপিয়ে অন্য রকম একটা গন্ধ, একদম অন্যরকম।
“তোমাকে তুলে নিতে পারবো না আমি?”
ইরা দুই বার মাথা নাড়িয়ে হেসে দেয়। পরক্ষণেই আরশাদের কঠিন মুখটার দিকে তাকিয়ে নিজেকে সামলায়। ভাঙার কিছু না পেয়ে যে তাকে তুলে ছুড়ে দিতে পারে, সে ইরা জানে।
“তুমি ঘরে যাবে?”
ইরা ঢোক চেপে বললো,”না যাবো না।”
“তুমি নিশ্চিত?”
ইরা মুখ বাঁকিয়ে বললো,”হুম একশবার।”
আচমকার নিজের হাতে শক্ত চাপ পড়ায় শিউরে ওঠে ইরা। আরশাদ তাকে এতো জোরে হ্যাঁচকা টান দিয়েছে যে সে যেনো হাঁটছে না, হাওয়ায় ভাসছে। হাতের রক্ত চলাচল বন্ধ হওয়ার দশা।
“আপনি না নিজেকে সুপুরুষ দাবি করেন? একটা মেয়েকে এভাবে ব্যথা দিচ্ছেন কারণটা কি?”
ঘরের মাঝখানে ইরাকে দাঁড় করায় আরশাদ। দুইটা মোমবাতি জ্বলছে টেবিলে। সেই আলোয় ইরার ঠোঁটের উপর চোখের পাপড়ির ছায়া পড়েছে। তাকে খুব রহস্যময়ী লাগছে। মনে হচ্ছে একটা মাটির পুতুল, পড়ে গেলেই ভেঙে যাবে।
“আদরে কাজ না হলে মাঝে মাঝে ব্যথা দেওয়া উচিত।”
ইরা নাক কুঁচকে বললো,”আবার সিগারেট খেয়েছেন? কি বিশ্রী গন্ধ।”
আরশাদ কিছু বলেনা। মোম গলছে টেবিলের উপর, সেই সাথে পাল্লা দিয়ে গলছে সে নিজেও। ছোটবেলায় বাবা গল্প শোনাতো ট্রয় নগরীর। এক রূপবতী নারী হেলেনের জন্য যে নগরী ধ্বংস হয়েছিলো। তখন আরশাদ শুনে অবাক হতো, এক নারীর জন্য কীভাবে একটা সমৃদ্ধ নগরী ধ্বংস হয়ে যেতে পারে? এখন বোধহয় খানিকটা বুঝতে পারছে।
“এই আপনি কবে থেকে সিগারেট খান?”
“কলেজ থেকেই ধরেছিলাম। বাবা একদিন জানতে পেরে ধোলাই দিয়েছিলো। শিক্ষক মানুষ হয়ে ছাত্রদের যে জিনিস থেকে দূরে থাকতে বলে, নিজের গুণধর পুত্র সে জিনিস ধরেছে। বাবার ভয়ে ছেড়ে দিলাম। এরপর ভার্সিটি জীবন, সুদূর খুলনা। বাবা মা কাছে নেই, নিজেই নিজের অভিভাবক। সারাদিন দস্যিপনা করে রাতে সব বন্ধুরা মিলে পড়তে বসতাম। তখন পুরোপুরি ধরলাম। আর ছাড়া গেলো না।”
ইরা ভ্রু কুঁচকে কি যেনো ভেবে বললো,”তার মানে প্রায় দশ বছর যাবৎ এসব ছাঁইপাশ খাচ্ছেন।”
“হতে পারে।”
“এই ক’বছরে সিগারেট বাদ দিলে কম করে হলেও পাঁচ লাখ টাকা জমাতে পারতেন। বা তার বেশিও হতে পারে। আপনার একটা জমি কেনা হয়ে যেতো এ টাকায়।”
আরশাদ দুই হাত বুকে গুঁজে শান্ত গলায় বললো,”তুমি সিগারেট খাও?”
“ছিহ না, কখনো না।”
“তাহলে তোমার জমি কোথায়?”
ইরা কিছুটা দমে যায়। আরশাদের দৃষ্টি তার পুরো শরীরে বিচরণ করছে। ইরা অপ্রস্তুত হয়ে যায়।
“হ্যা হতে পারে আমার জমি নেই। কিন্তু এমন কিছু আছে যেটা আপনার নেই।”
“আচ্ছা?”
“হ্যা।”
“কি আছে আপনার এই নিরেট মাথাটা ছাড়া?”
ইরা কিছুটা রেগে বললো,”আমার মাথা নিরেট না।”
“আচ্ছা বেশ। এখন বলুন কি এমন সঞ্চয় করেছেন আপনি সিগারেট না খেয়ে?”
ইরা আরশাদের চোখে চোখ রাখে সরাসরি। জোড়া ভ্রুর নিচে এক জোড়া বুদ্ধিদীপ্ত চোখ আরশাদের। দৃষ্টি যেনো অন্তর্ভেদী। মোমের আলোয় চোখের গাঢ় বাদামী রঙ আরো জ্বলজ্বল করছে।
ইরা নিজের ঠোঁটের উপর আঙ্গুল দেয়।
“এইযে এটা। আমার প্রিয় মানুষটির জন্য যত্ন করে রেখে দিয়েছি স্পর্শহীন। যেখানে আপনি এক ধূম্রশলাকাকে আশ্রয় দেন প্রতিনিয়ত। তার ধোঁয়ায় নিজেকে পোড়ান। যা স্পর্শ আপনি পেয়েছেন অধরা, অক্ষত, সেই স্পর্শ আমি পেয়েছি অন্য কারো দখলে থাকার পর, সেকেন্ড হ্যান্ড বলা যায়। এই এক টুকরো কোমল অধরা জমি আমার আছে, কিন্তু আপনার?”
আরশাদ হতভম্ব হয়ে যায় ইরার উত্তরে৷ ইরার কথাগুলো এতো পরিচিত লাগে, মাঝে মাঝে আরশাদ ভীষণ ভাবে অবাক হয়ে যায়। এমন নেশাক্ত কথা তো সে আগেও শুনেছে। কিন্তু…
“জানেন খুব ছোটবেলা থেকে আমি মানুষের শরীরে ফুলের গন্ধ পাই। আমার প্রিয় আর কাছের মানুষদের শরীর থেকে। আমার মায়ের শরীরে পেতাম শিউলী ফুলের সুবাস। মা চলে গেছে আজ অনেক গুলো বছর। তবুও যেনো সেই সুবাস আমি পাই এখনো। বাবার শরীর থেকে পাই গোলাপের। তেমন তীব্র না, তবে কেমন পবিত্র, মায়ায় আবৃত। বাবা আমার সাথে হয়তো অন্যায় করেছে, কিন্তু কখনো এই সুবাসের তারতম্য হয়নি। আর আপনার শরীর থেকে….”
আরশাদ গাঢ় গলায় বললো,”আমি কি আপনার প্রিয় মানুষ?”
ইরা আহত দৃষ্টিতে তাকায় আরশাদের দিকে। রাগ করেছে ভালো কথা। বকা দিক, ঝগড়া করুক কিংবা ব্যথা দিক। কিন্তু এগুলো কেনো বলে সে? তার কি এখনো সন্দেহ আছে?
ইরা ফুঁ দিয়ে মোমবাতি দু’টো নিভিয়ে দেয়। গাঢ়, কালো আঁধারে ছেয়ে যায় ঘরটা। কোথাও এক বিন্দু আলো নেই।
“এ কি? মোমবাতি নেভালে কেনো?”
“যাতে আমার মুখ আপনার দেখতে না হয়। তাছাড়া আঁধার আমার ভালো লাগে।”
“সবাই আলো খোঁজে আর তুমি আঁধারে থাকতে চাও?”
ইরা চাপা গলায় বললো,”আঁধারই তো ভালো। মানুষের জন্ম মাতৃগর্ভে, ওই আঁধারেই। মৃত্যুর পরে অন্ধকার কবর, তাও আঁধার। মাঝের সময়টুকু আমরা আলোয় নিমজ্জিত থাকি। কিন্তু টানটা ওই আঁধারেই।”
আরশাদের চোখে অন্ধকার কিছুটা সয়ে এসেছে। অস্পষ্ট ভাবে দেখতে পায় ইরা খাটে যেয়ে শুয়েছে। খুব অল্প জায়গায় গুটিশুটি মেরে শুয়ে পড়েছে। বেশি কষ্ট পেলো নাকি?
আরশাদ ইরার পাশে যেয়ে বসে। ইরা ইচ্ছা করে ঘন শ্বাস ফেলছে যাতে আরশাদ মনে করে সে ঘুমিয়ে গেছে। মুচকি হাসে আরশাদ।
“আমার শরীর থেকে কোন ফুলের গন্ধ পাও তা না বলেই ঘুমিয়ে গেলে?”
ইরা ফোঁস করে উঠে বললো,”আপনার শরীর থেকে শুধু সিগারেটের গন্ধ পাই। কোনো ফুলের না।”
আরশাদ শার্ট খুলে ইরার দিকে এগিয়ে যায়। ইরা শ্বাস আটকে শুয়ে থাকে।
“এবার দেখো তো, কিসের গন্ধ পাও?”
“ধুর জানিনা।”
আরশাদ আরেকটু এগিয়ে যায়। ইরা একবার লম্বা শ্বাস নিয়েই চোখ বন্ধ করে ফেলে। একটা তীব্র হাসনাহেনার গন্ধ তাকে মোহাবিষ্ট করে ফেলেছে। ভদ্রলোক চাচ্ছেটা কি?
মুখের উপর ফুঁ পড়তেই ইরা তাকায়, আরশাদ তার চুলগুলো সরিয়ে দিচ্ছে ফুঁ দিয়ে।
“ঘুমাবেন না নাকি?”
“হুম ঘুমাবো। আগে একটু অধরা স্পর্শটা গ্রহণ করি, তারপর।”
“আপনি না রেগে ছিলেন আমার উপর?”
আরশাদ ইরাকে দুই বাহুর মধ্যে জড়িয়ে ফিসফিস করে বললো,”রাতের বেলা কোনো রাগ নেই।”
ইরা আরশাদকে সরিয়ে দেয়।
“ছি কি বাজে আপনি।”
“বাহ! আজ যদি কোনো কবি বলতো ‘নির্ঘুম রজনীতে, নিশ্ছিদ্র এ আঁধারে, রূপবতী প্রেয়সীকে পেয়েছি একলা। রাগ ক্ষোভ বিবর্জিত করে, প্রেম ছড়াতে এ মন উতলা।’ তখন তো ঠিকই বলতে বাহ কি দারুণ, প্রেমে পড়ার মতো কবিতা। আমি বাজে হয়ে গেলাম এখন?”
ইরা হঠাৎ কুটকুট করে হেসে দেয়।
ঈষাণ কোণে বোধহয় মেঘ জমেছে কিন্তু আরশাদের মনের মেঘ কাটতে শুরু করেছে। ইরার বুকে মুখ ডুবিয়ে ফিসফিস করে বললো,”আপনার শরীর থেকে পপি ফুলের গন্ধ আসে নূরবউ। যে ফুল দিয়ে আফিম বানায়, যে আফিম থেকে শক্তিশালী নেশা তৈরি হয়।”
ইরার বার কয়েক উষ্ণ শ্বাস ফেলে। প্রেম বাঁধনহারা হয়ে গেলে মস্তিষ্ক ক্ষণিকের জন্য কাজ করা বন্ধ করে দেয়। আরশাদের বেপরোয়া প্রেম, আফিমের নেশার চেয়েও বেশি শক্তিশালী মনে হয়।
★
বারান্দায় পায়চারি করছে নীলু। রাত প্রায় পৌনে দুইটা। নীলুর চোখে ঘুম নেই। সারাদিনই কেমন অস্থির লেগেছে তার। বারবার নিজেকে সান্ত্বনা দিয়েছে, লোকটা বাড়াবাড়ি করছিলো, সে শাস্তি দিয়েছে। কিন্তু পরে তো অনুতপ্তও হয়েছে তার সামনে। নতুন করে খাবার এনে দিতে চেয়েছে। উনি খেতে চায়নি আর। ব্যস! এখানেই কাহিনী শেষ। কিন্তু কোনো স্বান্তনাতেই কাজ হয়না। বুকের মধ্যে খচখচ করেই যাচ্ছে। শাস্তিটা অন্যভাবেও দেওয়া যেতো৷ কিন্তু ওই লোকটাই বা কেমন জেদী! পুরোটা খেয়ে উঠলো। কেনো রে বাবা! অল্প খেয়ে বললেই হতো আর খাবে না।
নীলু অশান্ত হয়ে হয়ে একবার আরাম কেদারায় যেয়ে বসে আরেকবার উঠে হাঁটাহাঁটি করে৷ বারবার রোশানের লাল হয়ে যাওয়া মুখটা মনে পড়ছে। পরক্ষণেই অপরাধবোধ তৈরি হচ্ছে। যদি কোনো সমস্যা হয় আবার পেটে?
“নীলু।”
নীলু চমকে উঠে ঘুরে তাকায়। তার বাবা সদ্য ঘুম ভাঙা চোখে দাঁড়িয়ে আছে। রোজ রাতে সে ঘুমের ওষুধ খেয়ে ঘুমায়। রাতে সাধারণত ঘুম ভাঙে না তার।
“বাবা তুমি এখন? ঘুমাওনি?”
নিজাম হোসেন ধীর পায়ে হেঁটে বারান্দায় পাতা একটা চেয়ারে বসে। নীলুকে ইশারা করে মুখোমুখি বসতে।
“কি হয়েছে বাবা? শরীর খারাপ লাগছে আবার? আমাকে বলো।”
“আমি ঠিক আছি। তুই আমার সামনে একটু বসে থাক।”
নীলু অস্থিরতার সাথে পা নাড়ায়।
“নীলু…”
“জি বাবা।”
“তুই সেদিন বললি না, যে রোশান আমার সাথে হয়তো এমন আচরণ করবে না যেটা তার স্ত্রীর সাথে করেছে? হতে পারে তার স্ত্রীর সাথে তার আচরণ ভালো ছিলো না। এজন্য মেয়েটা ওকে ছেড়ে চলে যায়।”
নীলু অবাক হয়ে বললো,”এতো রাতে পরের একজন মানুষকে নিয়ে আলোচনা করার মানে কি বাবা?”
“তুই পরের মানুষটার সাথে অন্যায় করে ঘুমাতে পারছিস না আর আমি কিছু বললেই দোষ?”
নীলু সাথে সাথে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। বুকটা ধক করে ওঠে তার। বাবা কীভাবে…
“বোস নীলু, একটু কথা বলি।”
নীলু থতমত খেয়ে আবার বসে। বাবার দিকে তাকাতে পারছে না সে। তবে কি লোকটা বলে দিলো বাবাকে? নালিশ করেছে তার নামে?
“রোশান আমাকে কিছু বলেনি, ওই চিন্তা করিস না।”
নীলু আরেকবার চমকায়। বাবা খুব শান্ত গলায় কথা বলছে তবুও নীলুর ভয় করছে।
“মেয়েটার নাম ছিলো শালিক। পারিবারিক ভাবে বিয়ে হলেও রোশান তাকে অনেক ভালোবাসতো। কিন্তু বিয়ের কয়েক বছর যেতে না যেতে মেয়েটা রোশানের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলে। রোশান তাকে শারীরিকভাবে অত্যা*চার করে, মারধোর করে। রোশান এ অভিযোগের বিপরীতে একটা প্রতিবাদও করেনা, কেমন যেনো নিশ্চুপ ভাবে সব মেনে নেয়। ওর বাবা মা নেই, মামা খালারা মিলেই বিয়ে দিয়েছিলো ওকে। রোশানের নীরবতায় তারাও বিশ্বাস করে নেয় যে শালিক ঠিক বলছে। তারাও রোশানকে ভুল বুঝে দূরে সরে যায়। আমি অনেকদিন থেকেই ছেলেটাকে চিনতাম। ওকে আমি বুঝাই যদি মেয়েটা মিথ্যাই হবে তাহলে তুমি মুখ খুলছো না কেনো? এতে তো প্রমাণিত হচ্ছে ও-ই সঠিক। রোশান আমার দিকে তাকিয়ে হেসে বললো, ও তো ভুল নয় স্যার, ও আসলেই সঠিক।”
নীলু শিউরে উঠে বললো,”তার মানে উনি আসলেই উনার স্ত্রীকে মা*রধর করতেন?”
নিজাম হোসেন কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললো,”আমি নিজেও সেদিন রোশানকে ভুল বুঝি। ওকে এড়িয়ে চলতে থাকি। কেস হয়, কোর্টে যাওয়া লাগে ওর। সেখানেও রোশান চুপ, যেনো মেনেই নিয়েছে নিজের ভুল। শালিককে অনেক টাকা দেওয়া লাগে রোশানের। ছেলেটার চাকরি চলে যায় আগের হাসপাতাল থেকে। পরিবারের কেউ ওর পাশে নেই। একদম যেনো নিঃস্ব হয়ে গেলো ও। কিন্তু আমার মনের কোথাও যেনো একটা ‘কিন্তু’ ছিলো। যতোদিন ওকে চিনি, ওকে আমার এমন বাজে চরিত্রের পুরুষ মনে হয়নি। তোর ওই ভাবনা আমিও সেদিন ভেবেছিলাম, হতেই পারে আমার সামনে সেই আচরণ করবে না যা ওর স্ত্রীর সামনে করবে। যেহেতু ওকে এড়িয়ে চলছিলাম, তাই ওর কাছে যেতে ইতস্ততও করছিলাম। এরমধ্যে কেটে যায় বেশ কিছু মাস। হঠাৎ একদিন…”
নীলু উৎকণ্ঠিত হয়ে বললো,”হঠাৎ একদিন কি বাবা?”
“শুনলাম শালিক ফিরে আসতে চাচ্ছে ওর কাছে। পরে যাকে বিয়ে করেছিলো সে ওর সব টাকাপয়সা নিয়ে, ওকে মেরে তাড়িয়ে দিয়েছে। সে এখন আবার রোশানের সংসার করতে চায়।”
নীলু হতভম্ব হয়ে বললো,”যে স্বামী তার উপর শারীরিক অত্যা*চার করেছে তার সংসারে আবার ফিরতে চায়?”
“ঠিক এই চিন্তাটাই করি আমি। একদিন খুব ভোরবেলা রোশানের ফ্লাটে চলে যাই আমি। আমার অনেক কিছু জানার ছিলো ওর কাছ থেকে। ও দরজা খোলে, আমাকে দেখে চমকে যায়। তার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি চমকাই আমি ওকে দেখে। চেনার মতো নেই ওর চেহারা। সারা মুখে দাড়ি-গোঁফের জঙ্গল, উদ্ভ্রান্ত চোখ, কেমন যেনো ভেঙে পড়া একটা চেহারা।
ও আমাকে ঘরে বসায়। আমি জানতে চাই আসলে কি হয়েছিলো তখন? শালিক যদি সেদিন সঠিকই হবে তাহলে ও কেনো আবার ফিরে আসতে চাচ্ছে? সেদিন রোশান আমার সামনে সব স্বীকার করে।”
নীলু মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনছে। কেমন যেনো এলোমেলো লাগছে তার সবকিছু।
“রোশান একদিন শালিককে চমকে দিতে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে আসে। তার কিছুদিন পরেই ওদের বিবাহবার্ষিকী ছিলো। রোশান চেয়েছিলো ওরা দু’জন দেশের বাইরে থেকে ঘুরে আসবে। নেপালের পোখরাতে সব ব্যবস্থা শেষ। শালিক কিছুই জানতো না। রোশান ভেবেছিলো শালিক ভীষণ খুশি হবে শুনে। এজন্য হাসপাতালে থেকে সোজা স্বর্ণের দোকানে যায় সেদিন রোশান। শালিকের জন্য একটা স্বর্ণের আংটি কিনে বাসায় চলে আসে। নিজের কাছে একটা চাবি থাকতো সবসময়। ওটা দিয়েই দরজা খুলে ঘরে ঢোকে ও। কিন্তু হঠাৎ নিজেদের শোবার ঘরে পুরুষ কণ্ঠ পেয়ে অবাক হয়ে যায় ও। সেখানে যেয়ে দেখে তার প্রিয়তমা স্ত্রী অন্য পুরুষের সাথে, তাদেরই শোবার ঘরে।”
নীলু হালকা চিৎকার করে বললো,”কি বলছো বাবা!”
নিজাম হোসেন মাথা নাড়ে।
“স্ত্রীকে চমকে দিতে যেয়ে নিজেই জীবনের সবচেয়ে বড় চমক পায়। একজন পুরুষ, যে তার স্ত্রীকে এতোটা ভালোবাসে সে যদি স্ত্রীর এই বিশ্বাসঘাতকতা দেখে সহ্য করতে পারে? রাগের বশে শালিককে দু’টি চড় মারে সে। শালিক ওই সময় কাঁদতে কাঁদতে বেরিয়ে যায় বাড়ি থেকে। রোশান নিজেকে সময় দেয়। কিন্তু দুইদিনের মাথায় অনুতপ্ত হয় সে। যতো যা-ই হোক, স্ত্রী তো। মারাটা উচিত হয়নি। এটা ভেবে শালিকের বাবার বাড়ি যায় সে। কিন্তু শালিক ওর সাথে দেখা করেনা। তাকে জানানো হয় বাকি কথা কোর্টে হবে। রোশান হতভম্ব, সব দোষ তাকেই দেওয়া হয়। এটাই ছিলো রোশানের শারীরিক অত্যাচার।”
নীলু শীতল গলায় বললো,”তাহলে উনি সবার সামনে স্বীকার কেনো করলেন না সবটা? শালিকের দোষ কেনো বলেননি সবাইকে?”
“এ কথা আমি ওকে জিজ্ঞেস করেছিলাম। ও আমাকেও বলতে চায়নি, আমি জোর করায় বলেছিলো আবছাভাবে। ও নিজের স্ত্রীর মানসম্মান নষ্ট করতে চায়নি সবার সামনে।”
নিজাম হোসেন ম্লান হেসে নীলুর দিকে তাকায়। নীলু হকচকিয়ে বসে আছে। কি বলা উচিত বুঝতে পারছে না।
“শালিককে রোশান আর কোনোদিন ফিরিয়ে নেয়নি। তবে শুনেছি শালিকের ভাইকে এককালীন কিছু টাকা দিয়েছিলো যেনো সে শালিককে দেখেশুনে রাখে। এইতো!”
নীলু মাথা নিচু করে বললো,”আমি যে উনার সাথে একটা অন্যায় করে ফেলেছি এটা তুমি কীভাবে বুঝলে বাবা?”
নিজাম হোসেন কঠিন গলায় বললো,”ছেলেটার চোখমুখ লাল দেখে আমি সন্দেহ করেছিলাম। যদিও শুরুতেই তোমার হঠাৎ পরিবর্তন দেখে খটকা লেগেছিলো। রোশান চলে যাওয়ার পর তুমি যখন সিঁড়িতে যাও ওর সাথে কথা বলতে আমি ওর জন্য আলাদা বাটিতে রাখা খাবার চেখে দেখি। সাথে সাথে বুঝে যাই তোমার পরিকল্পনা।”
নীলু বাবাকে কিছু বলতে যেয়েও থেমে যায়। ফুলের কথা এই মুহুর্তে বাবাকে জানানো উচিত হবে না।
“তোমার থেকে এটা আমি আশা করিনি নীলু। যে মানুষটা তোমার বাবার অসুখে বারবার ছুটে এসেছে, তার সাথে এটা কীভাবে করতে পারলে? আমি কি ওর সামনে আর মুখ দেখাতে পারবো?”
“বাবা আমি…..”
নিজাম হোসেন উঠে দাঁড়ায়। নীলুও দাঁড়ায় বাবার পাশে।
“বাবা আমার কথাটা শোনো না।”
“যাই হোক, ভুলটা তুমি করেছো কীভাবে সংশোধন করবে তুমি জানো। আমার ঘুম পাচ্ছে। আমি ঘুমাতে যাচ্ছি।”
নীলুকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে নিজাম হোসেন চলে যায়। নীলু দুই হাতে মুখ ঢেকে বসে পড়ে চেয়ারে। তার অবচেতন মন যে এখনো আরশাদকেই ভুলতে পারছে না। রোশান যা চাচ্ছে তা কি আদৌ সম্ভব? মনে হয় না।
★
সপ্তাহ ঘুরে এলো সেই কাঙ্ক্ষিত সোমবার। আগের দুই রাতে আশা ঘুমায়নি। সে জানেনা ইরা কি করতে চাচ্ছে। কিন্তু জানে ইরা কিছু না কিছু তো করবেই।
সকাল সকাল রাবেয়া বেগম নীলুকে দেখতে ও বাড়ি চলে যায়। প্রায় প্রতি সোমবারেই যায়। রাশেদুল আর আরশাদও বেরিয়ে যায়। কলেজ বন্ধ এই মিথ্যা বলে ইরা শুধু বের হয়না। আসল জিনিস গতকালই কলেজ থেকে ফেরার সময় কিনে এনেছে। এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা।
ইরা মনে মনে হাসে।
‘মহিবুলের বাচ্চা আজ তো তুই শেষ। তুই আর কোনোদিন বাবা ডাক শুনতে পারবি না।’
ইরার দরজায় আশার ছায়া পড়ে। ইরা তার দিকে না তাকিয়েই বুঝতে পারে বোকা মেয়েটা কাঁপছে ভয়ে। ওর সব ভয় আজ কেটে যাবে ভাবতেই ইরার ভালো লাগে, শান্তি লাগে।
(চলবে……)

