#মন_ভেজা_শ্রাবণে
(পর্ব – ১০)
———————-
“ওই মেয়েটা আপনার সঙ্গে সবসময় লেপ্টে থাকে কেনো? আমার একদম সহ্য হয় না। ওই মেয়েটা আপনাকে ছুয়ে দেয় কেনো? আমার এসবে ভীষণ কষ্ট হয়। বুকের মধ্যে চিনচিনে ব্যথা অনুভব হয়। মস্তিষ্ক ফাঁকা ফাঁকা লাগে। সবকিছু শেষ করে দিতে ইচ্ছে হয় সঙ্গে নিজেকেও। কেনো এমন হয়? আমার এমন কেনো লাগে?”
আদ্র’র বক্ষে আবদ্ধ হয়ে মনের মধ্যে জমে থাকা সব অভিমানগুলো ঝেড়ে ফেলতে চাইছে অন্তি। এবারে সে নিজেই আদ্রকে জড়িয়ে ধরেছে। সর্বশক্তি দিয়ে আছড়ে পড়েছে আদ্র’র বুকে। ফোঁপাতে ফোঁপাতে মনের ক্ষোভ প্রকাশ করছে।
আদ্র’র মন,মস্তিষ্ক প্রশান্তিতে ছেয়ে যাচ্ছে বারংবার। অন্তির প্রতিটি কথা মধুর মতো ছড়িয়ে পড়ছে সর্বাঙ্গে। অদ্ভুত সুখানুভূতি তৈরি হচ্ছে। অন্তি জেলাস। ভীষণ রকম জেলাস। সঙ্গে অভিমানী। ভীষণ কষ্টে আছে। কিন্তু আজ এসবকিছু আদ্র’র ভীষণ ভালো লাগছে। তীব্র অনুভূতিতে বেসামাল মন, মস্তিষ্ক।
আদ্র অন্তিকে আরও একটু গভীর ভাবে নিজের সঙ্গে চেপে ধরল। অতীব নম্র কন্ঠে বলল,
“আমি বুঝি তোর কষ্ট হয়। কিন্তু আমি তো ইচ্ছে করে ওর কাছে যাই না। তোকে তো আগেই বলেছিলাম নিহাতের মেন্টাল ক্রাইসিসের কথা। ও হুটহাট এসব করে ফেলে। ইউ নো না আমি স্বজ্ঞান কখনোই তুমি ছাড়া অন্য কারো সান্নিধ্যে যাবো না।”
আদ্র’র মুখে হুটহাট তুমি সম্মোধন শুনলে অন্যরকম আবেশে ভেসে বেড়ায় অন্তির অন্তরিক্ষ। তবুও অভিমানী মন নিয়ে জিজ্ঞাস্য কন্ঠে বলল,
“তাহলে আজ সকালে….. ”
অন্তি কথা পুরোপুরি শেষ করল না। তার কন্ঠ ধরে আসছে। আদ্র ভ্রু কুঁচকে সকালে কী হয়েছে মনে করার চেষ্টা করতে লাগল। সহসা তার স্মরণে এলো সে তো সকালে নিহাতকে পড়ে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা করেছিল। আর সেসময়ে বেশ ঘনিষ্ঠ হতে হয়েছে তাদের। এই দৃশ্যই কী অন্তির মনে কষ্টের কারণ?
আদ্র অবাক দৃষ্টে অন্তির পানে চেয়ে দেখল। এই সামান্য বিষয়ে মেয়েটা কষ্ট পাচ্ছে। অদ্ভুত!! আদ্র অন্তির কোমল অভিমানী বদনখানি চোখের সামনে তুলে ধরল। অন্তির দৃষ্টি চঞ্চল। দৃষ্টি লুকাতে ব্যস্ত সে। আদ্র দৃঢ়তার সঙ্গে বলল,
“নিহাত পড়ে যাচ্ছিল মানবতার খাতিরে ওকে ধরেছি জাস্ট এটাই। আমি কিন্তু ইচ্ছে করে ধরতে চাই নি। এখন তুই বল একজন মানুষ বিপদে পড়লে তাকে বাঁচানো টা কী উচিত নয়?”
অন্তির মন প্রখর ভাবনায়। কেউ বিপদে পড়লে বাঁচানো টা তো উচিত কিন্তু কেউ ইচ্ছে করে বিপদে পড়লে তখন?
অন্তি চুপ করে রইল। সকালে অন্তি লক্ষ্য করেছে নিহাত ইচ্ছে করেই পড়ার চেষ্টা করেছে। হয়তো আদ্র’র কাছাকাছি আসার জন্য। কিন্তু এই কথাটা আদ্রকে বললে যদি বিশ্বাস না করে। যদি অন্তিকে ভুল বোঝে। যদি মনে করে অন্তি জেলাসি থেকে বলছে। এসব ভাবনা থেকে অন্তি চুপ করে রয়। কিচ্ছুটি বলতে পারে না। আদ্র অন্তির নির্মলতায় দৃষ্টি রেখে দৃঢ় কন্ঠে বলে,
“ওকে তোর কষ্ট হয় এমন কাজ আর কখনোই আমার দ্বারা হবে না সেটা যতই ন্যায্য কর্ম হোক না কেনো। আমার পিচ্চি পরীর কষ্টের কাছে সকল কিছু তুচ্ছ। প্রমিস!!”
অন্তির মনে এক সমুদ্র ভালো লাগার স্রোত বয়ে গেল। এই এতটুকু ভরসার বানী ঠিক কতটা সুমধুর তা বলে বোঝানোর মতো নয়৷ অন্তি ফের আদ্র’র বুকে লেপ্টে পড়ল। কিছুসময় কাটল নিস্তব্ধতায়, নিরবতায়।
————
রাত নয়টা নাগাদ ওরা বাড়িতে ফিরে এলো। আরিয়া, অনিক সাড়ে আটটার সময়ই ওদের সঙ্গে জয়েন করেছে। আধ ঘন্টা চারজন একসঙ্গে ঘোরাঘুরি করে অবশেষে বাড়ি ফিরল তারা। অনিক, অন্তিকে ড্রপ করে দিয়ে আদ্র, আরিয়া বাড়িতে চলে গেছে। আজ অন্তির কেনো জানি আদ্রর থেকে দূরে যেতে মন সায় দিচ্ছিল না। খুব ইচ্ছে করেছিল অনন্তক্ষণ দু’জনে একত্রে একান্তে সময় কাটাতে। মনটা বোধ হয় একটু বেশিই বেহায়া হয়ে উঠছে। তাকে সামলাতে নাজেহাল অন্তি। গাড়ি থেকে নেমে গেটের মধ্যে ঢোকার আগ পর্যন্ত আদ্র গাড়ি টান দেয় নি। গেটের মধ্যে কদম ফেলে এক পলক সেদিকে দৃষ্টি দিতেই মিলে যায় চারচোখ। আদ্র সেই সঙ্গে চোখ টিপ মা’রে। পরপরই নিচের ঠোঁটাংশ কামড়ে ধরে অবাধ্য ইচ্ছে গুলো জানান দেয়। অন্তি লজ্জায় রক্তিম হয়ে ওঠে। সঙ্গে সঙ্গে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়ে দৌড়ে ভেতরে চলে যায়। ফেলে রেখে যায় চঞ্চল, সুদর্শন ছেলেটির হাসোজ্জল মুখশ্রী।
রাতে অন্তির ঘুম আসতে চাইল না। বিছানায় এপাশ ওপাশ করেই কাটিয়ে চলেছে। সহসা ফোনের ম্যাসেজ টোনে বক্ষে ধুকপুক শুরু হয় তার। মনের মধ্যের আশঙ্কা বাস্তবায়নে লক্ষ্যে ফোনের স্কিনে চোখ বুলায়। তার আশঙ্কাই ঠিক আদ্র মেসেজ দিয়েছে। মেসেজ লেখা আছে, “অনেক রাত হয়েছে আজেবাজে চিন্তা বাদ দিয়ে ঘুমিয়ে পড়। সকালে কলেজ আসবি তাড়াতাড়ি।”
লেখাটার মধ্যে কী ছিল তা অন্তির জানা নেই। তবে এতক্ষণে তার মন, মস্তিষ্ক শান্ত হলো। হয়তো এই মেসেজের অপেক্ষায় ছিল তার অন্তরিক্ষ। ফোন টা বালিশের পাশে রেখে শুয়ে পড়তে নিলেই তার মনে আরও একটি সুপ্ত বাসনা জেগে উঠল। ইস সেই মধুর, মন-মাতানো কন্ঠটি যদি একবার শুনতে পেতো তাহলে ঘুমটা দীর্ঘস্থায়ী, পাকাপোক্ত হতো। মনের মধ্যে ইচ্ছে ডানা বাঁধতে না বাঁধতেই তা ভেঙে চুরমার হয়ে গেল আরও একটি মেসেজে। এবারে লেখা, “বলেছি না উল্টাপাল্টা চিন্তা বাদ দিয়ে ঘুমতে। একেবারে সকালে কথা হবে এখন ঘুমা।”
অন্তি বিষন্ন, অভিমানী মনে শরীর এলিয়ে দিল বিছানায়। কী হতো একটু কথা বললে!! নিষ্ঠুর, পাষাণ, হৃদয়হীন পুরুষ!! ফোঁপাতে ফোপাঁতে কখন যেনো ঘুমিয়ে পড়ল অন্তি। ফোনটা বুকের সঙ্গে চেপে ধরা৷
————–
একরাশ অভিমান নিয়ে কলেজে পা রাখল অন্তি। অনিক ওকে নিজের ক্লাসে চলে যেতে বলে সেও নিজের ক্লাসে চলে গেল। কিন্তু অন্তির বেহায়া চোখ জোড়া একজনকে খুঁজতে ব্যস্ত। সেই একজন আর কেউ নয় ‘আদ্র’। অন্তি যখন অন্যমনষ্ক হয়ে ক্লাসের দিকে যাচ্ছে ঠিক তখনই কারো সঙ্গে বেশ জোরে ধাক্কা খায় সে। ডান বাহুতে বেশ ব্যথা পায়। চোখ মুখ কুঁচকে সামনে তাকাতেই চমকে ওঠে সে। সামনে নিহাত দাড়িয়ে আছে। চোখে মুখে বিরক্তির ছাপ স্পষ্ট। অন্তি মনে মনে জ্বলে ওঠে ওকে দেখে। এমনিতেই মন ভালো নেই তার ওপর আবার সকাল সকাল এই আপদ সামনে। অন্তি কিছু বলে চলে যেতে চায়। কিন্তু তখনই নিহাত প্রচন্ড বিরক্তির স্বরে বলে,
“এই মেয়ে চোখে দেখতে পাওনা নাকি? এভাবে কেউ হাটে? মুডটাই নষ্ট করে দিলে। অসহ্য!”
অন্তি কিঞ্চিৎ রেগে কিছু বলতে নিচ্ছিল তখনই নিহাত সরু চোখে ওকে আগাগোড়া পর্যবেক্ষণ করে খুব দৃঢ় কন্ঠে বলে,
“এই তুমি সেই মেয়েটা না, আদ্র’র বোন? হুম! মিহু আপু আমাকে আগেই বলেছিল। বাই দি ওয়ে, আমি নিহাত আদ্র’র গার্লফ্রেন্ড কাম ফিউচার ওয়াইফ। তুমি আমাকে ভাবি বলে ডাকতে পারো। এমনিতে তো আমি বয়সেও তোমার থেকে বড়।”
নিহাতের কথায় যেন পুরো শরীর দগ্ধ হয়ে উঠল অন্তির৷ এতক্ষণ নিহাতকে সহ্য করলেও এবারে আর পারল না। চাপা ক্রোধ নিয়ে বলল,
“ফার্স্ট অফ অল, আমি তার কাজিন মায়ের পেটের আপন বোন নই। আর আপনার সঙ্গে তার কী সম্পর্ক সেটা আমার জানার বিষয় নয়। আর রইল বাকি ‘ভাবি’ ডাক সেটা না হয় সময় হলে বলবো। ও হ্যাঁ যদি কখনো সে সময় আসে।”
এটুকু বলেই অন্তি হনহনিয়ে চলে যায়। শেষোক্ত কথাটিতে অন্তির কন্ঠে স্পষ্ট তাচ্ছিল্যতা ফুটে ওঠে যা বুঝতে অসুবিধা হয় না নিহাতের। সে বুঝতে পারছে অন্তি তাকে অপমান করে গেলো। নিহাত কিঞ্চিৎ ক্রোধ নিয়ে মনে মনে ভাবল,”মিহু আপু তবে ঠিকই বলেছে। নিশ্চয়ই কোনো গড়বড় আছে। আমাকে জানতেই হবে সেটা কী। তবে আমার আদ্রকে কিছুতেই আমি ছেড়ে দিব না। আদ্র আমার আমারই থাকবে। প্রয়োজনে বেঁধে রাখবো।”
—————
চলবে,
✍️সাদিয়া আফরিন নিশি