#মিথ্যা_অপবাদ
#ফারজানা_আফরোজ
#পর্ব_২২
ট্যুরে যাবে সবাই বাসে করে। আয়ানকে অনেক কষ্টে রাজি করিয়েছে মানহা। সবাইকে বলা হয়েছে ভার্সিটির মাঠে এসে অপেক্ষা করতে। মানহা বাসা থেকে বের হয়ে বাসে উঠে ভার্সিটিতে যাচ্ছে ঠিক তখনই তার ওরনা বাতাসের বেগে পিছনে ছুটতে লাগলো। হাত দিয়ে বার বার ঠিক করতে লাগলো কিন্তু অবাধ্য বাতাস তা হতে দিচ্ছে না……
—” এই যে মিস যদি ওরনা সামলাতে না পারেন তাহলে ওরনা পড়েন কেনো? ”
মানহা না দেখেই বলা শুরু করলো…..
—” সামলাতে না পারলে তো পড়তাম না তাই না?”
—” কোথায় সামলাতে পারছেন? দেখুন ওরনা এখনও আমার মুখ ঢেকে রেখেছে।”
মানহা তার পিছনের সিটে তাকালো। জানালা দিয়ে ওরনা পাশের জানালা দিয়ে একটা ছেলের মাথা মুখ ঢেকে রেখেছে।
—” ওরনা তাহলে আপনি ধরে টানছিলেন তাই না?”
—” কি আজিব তো আপনি? দেখতেই পারছেন ওরনা আমার উপরে এসে বার বার পড়ছে এখন বলছেন আমি আপনার ওরনা ধরে টানছি।”
—” শুনুন মিষ্টার আমার ওরনা যদি সত্যিই উড়তো তাহলে অবশ্যই ওরনা বাহিরে থাকতো আপনার মুখে না ওকে।”
—” বাহ চালাক তো খুব!”
—” কেনো বোকা ভেবেছেন নাকি?”
—-” কি ঝগড়ুতে মেয়ে গো বাবা। বাই দা ওয়ে এত মানুষের ভিড়ে যাতায়াত করতে কষ্ট হয় না আপনার?”
—” উহু। কেনো আপনার কষ্ট হয়?”
—” রাস্তায় গাড়ি খারাপ হওয়ায় এইসব থার্ড ক্লাস বাসে উঠেছি। যদি জানতাম তাহলে জীবনেও বসতাম না।”
—” ইহহহ আসছে আমার বড়লোক্স মানুষ ।”
—” ঝগড়ুতে নাম্বার ওয়ান।”
—” শুনুন একবার ঝগড়ুতে বলেছেন কিছু বলি নাই যদি আরেকবার বলেন তাহলে খুন করে গুম করে ফেলবো।”
—” বাহ কি সাহস।”
ছেলেটি এক টানে মানহার ওরনা ধরে টান দিয়ে হাতে পেঁচিয়ে ফেলে।
—” বাসে বসে একটা মেয়ের ওরনা টান দিতে লজ্জা করে না অসভ্য ছেলে।”
—” লজ্জা কি গো খায় না মাথায় দেয় যদি একটু বুঝিয়ে বলতেন খুবই উপকৃত হতাম।”
—” আজব লোক।”
মানহা রাগে আর পিছনে ফিরলো না। চুল গুলো সামনে এনে ছেড়ে দিলো। বাতাসে এখন তার চুলগুলোও উড়ছে……
—” ওরনার মতো চুলগুলো বড় থাকলে এখন হয়তো চুলগুলোও আমার হাতের মুঠোয় থাকতো।”
মানহা চুপচাপ কথাগুলো হজম করছে। পাবলিক প্লেসে কিছু হোক তা সে চায় না। অনেক কষ্টে নিজেকে কন্ট্রোল করতে লাগলো সে…….
বাস থেকে ভার্সিটির সামনে নামলো। সামনে কিছুটা যেতেই ডাক দিলো সেই ছেলেটা……
—” এই যে মিস…..!”
—” ওই আপনি কি আমায় ফলো করছেন?”
মানহা আঙ্গুল সামনে নিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলো। ছেলেটা মানহার হাতের আঙ্গুল ধরে বললো…..
—” আজ পর্যন্ত কেউ এই আরিয়ানের দিকে উচু গলায় কথা বলে নাই আর তুমি কি না আমায় আঙ্গুল দেখিয়ে কথা বলছো। ফাস্ট টাইম বলে ক্ষমা করে দিলাম।”
—” আমি কোনো ভুল করেনি যে আপনি আমায় ক্ষমা করবেন। ভুল তো করেছেন আপনি?”
—” তোমার মতো ঝগড়ুতে মেয়ের সাথে কথা বলার কোনো ইচ্ছা নাই। নেও তোমার ওরনা। আর শুনো দুষ্টুমি করার জন্য সরি। একা একা বসে থাকতে থাকতে বোরিং ফিল করছিলাম তাই একটু মজা করেছি কিন্তু তুমি তো মজার ‘ম’ ই বুঝো না।”
আরিয়ান মানহার হাতে ওরনা দিয়ে ভার্সিটির ভিতরে যেতে লাগলো। মানহা আরিয়ানের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থেকে সেও ভিতরে চলে গেলো……..
।।
।।
।।
—” বাহ আজ বইপোকা ট্যুরে যাচ্ছে । নাহিদ রে সূর্য কোন দিকে আজ উঠেছে?”
তানিয়া আয়ানকে দেখে নাহিদকে সাথে নিয়ে মজা করতে লাগলো। আশে পাশের অনেকেই আয়ানকে বাসে বসে থাকতে দেখে অবাক।
—” তানু ডার্লিং আমি মনে হয় স্বপ্ন দেখছি রে। আগামীকাল দুই বোতল শেষ করেছি তার জন্য হয়তো প্রভাব এখনও কাটে নাই মাথায় পানি ঢাল আমার।”
—” ওই মজা নিবি না একদম। আমি আমার এক ফ্রেন্ডের কথায় এসেছি।”
তানিয়া আয়ানের পাশের সিটে বসে পরলো। কিছুক্ষণ আয়ানকে দেখে পরে বললো…..
—” তোর মতো সন্ন্যাসীর ফ্রেন্ড কে হলো রে? আমরা তিনজন ভালো মানুষ বলে তোকে দলে নিয়েছি। আর কেউ তো নেওয়ার কথা না।”
—” যে নিয়েছে সে অন্য রকম তোমাদের মতো না। ও আমাকে কোনোদিন অপমান করে নাই তোমাদের মত।”
—” দেখ তানু ডার্লিং এই বইপোকা আমাদের যাতা বলছে।”
—” নাহিদ বাদ দে তো এইসব। দেখ এখনও আরু আসে নাই। ওর গাড়ি নষ্ট হয়ে গেছে বেচারা নাকি বাসে করে আসছে। ওয়েট আমি দেখে আসছি।”
তানিয়া বাস থেকে নেমে আরিয়ানকে খুঁজতে লাগলো। আশে পাশে ভালো করে না দেখেই হাঁটতে থাকে তানিয়া।
—” এই কি করছো দেখে তো যাবে।”
মানহা এসে তানিয়ার হাত ধরে। তানিয়া দাঁড়িয়ে যায় । কাদা মাটি সামনে দেখে তানিয়া মানহার দিকে তাকিয়ে বলে…..
—” ভাগ্যিস তুমি আমায় আটকিয়ে দিলে তানাহলে তো আমার আজ ট্যুরে যাওয়া হতো না। থ্যাংক ইউ।”
—” স্বাগতম। আমিও তো যাচ্ছি।”
—” ওয়াও চলো তাহলে পরিচিত হওয়া যাক।”
তানিয়া হাত বাড়িয়ে দিল। মানহাও খুশি হয়ে হাত বাড়িয়ে দিলো। কথা বলে বুঝতে পারলো ওরা একই ব্যাচের শুধু ডিপার্টমেন্ট আলাদা। তানিয়া আরিয়ানকে আর না খুঁজে মানহা কে নিয়ে বাসে উঠে বসে। আয়ান মানহা কে হাত দিয়ে ইশারা করে…..
—” এই যে আমার সেই ফ্রেন্ড মানহা।”
তানিয়া তো অবাক মানহা আয়ানের ফ্রেন্ড। মানহাও খুব অবাক হলো। নাহিদের সাথে পরিচয় হতে নিলে মানহা বড় সরো একটা শক খায় কেননা এই নাহিদ তাকে স্কুল লাইফে জ্বালিয়ে পুড়িয়েছে। প্রতিদিন স্কুলের সামনে কোচিং সেন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতো আর বিরক্ত করতো। নাহিদের জন্যই সে বেশি ভার্সিটিতে আসতো না। আজ সেই নাহিদেই তার বেস্ট ফ্রেন্ড আয়ান আর শুধু ফ্রেন্ড তানিয়ার বেস্ট ফ্রেন্ড। নাহিদ মানহা কে দেখে না চিনার ভাব করলো….
—” হায় আমি নাহিদ।”
—” আসসালামু আলাইকুম ভাইয়া। আমার নাম মানহা।”
মানহার এমন অপমানজনক কথায় লজ্জা পেয়ে আর কথা বললো না নাহিদ। তানিয়া তো হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খাচ্ছে।
আয়ানের সাথে মানহা বসেছে। নাহিদ তানিয়া একসাথে ।সামনের সিট আরিয়ানের জন্য রাখা। বেশ কিছুক্ষণ পর আরিয়ান আসলো। মানহা ও আরিয়ান দুইজন দুইজনকে দেখে অবাক। আয়ান তাদের ফ্রেন্ডশিপের কথা বললো। তানিয়া তার অন্যমনস্ক ঘটনার কথা বললো। আরিয়ান তার ঝগড়া করার কথা বললো। নাহিদ চুপ করেই রইলো। মানহা কে যে ও কি বিরক্ত করেছে তা যদি আরিয়ান জানে এক্ষুনি খুন করবে।
নাহিদ একবার মানহা কে কিডন্যাপ করার কথাও ভেবেছিলো। এই কথা যদি মানহা বলে তাহলে নাহিদ শেষ সেই ভয়ে সে চুপ করেই রইলো…….
।।
।।
।।
আড্ডা মজা করেই তারা পৌঁছালো বাংলার তাজমহলে। বাংলার তাজমহল বলতে ভারতের আগ্রার তাজমহল নয়। বাংলাদেশেই গড়ে তোলা একটি ভ্রমণ প্রেমী মানুষদের জন্য সুন্দর স্থান।ঢাকা থেকে ১০ মাইল পূর্বে সোনারগাঁয়ের জামপুর ইউনিয়নের পেরাব গ্রামে অবস্থিত এটি।এটি তৈরি করতে প্রায় ৫ বছর সময় লাগে এবং এটি ব্যক্তি-মালিকানাধীন। এটি প্রায় ১৮ বিঘা জমির উপর অবস্থিত। আশেপাশে আরও ৫২ বিঘা জমি আছে পর্যটনের জন্য। এখানে দেখা যাবে চারপাশের সুন্দর আর মনোরম পরিবেশ, হাজার হাজার নাম না জানা পাখির কিচিরমিচির করা বিকেল আপনার মন ভালো করে দিবে।তাজমহলের নির্মাণ কাজের জন্য ব্যবহার করা হয়েছে বিদেশী উপকরণ যেমন ১৭২টি কৃত্রিম ডায়মন্ড, ব্যবহার করা হয়েছে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি। নির্মাণ কাজে ৬ জন টেকনিশিয়ানদের নিয়োগ দেওয়া হয়। ভারতের তাজমহলকে অনুসরণ করা হয়েছে বলে নির্মাতাকে ভারতে যেতে হয়েছে অনেকবার।
তাজমহলের আশেপাশে ফুলের বাগান আর নিরিবিলিতে বসার স্থান রয়েছে অনেক। তাজমহলটির ভেতরের মূল মহল দারুণ সব পাথর দিয়ে মোড়ানো আর টাইলস করা। মহলের ভেতরে আহসানউল্লাহ্ মনি ও তার স্ত্রী রাজিয়া দু’জনের কবরের স্থান সংরক্ষিত আছে। “বাংলার তাজমহল” এ আগ্রার তাজমহলের মতোই চার কোণে চারটি বড় মিনার রয়েছে।
তাজমহলের ভেতরে আরও রয়েছে “রাজমনি ফিল্ম সিটি স্টুডিও”। তাজমহলের বাইরে রয়েছে “রাজমনি ফিল্ম সিটি রেস্তোরাঁ”, আরও বিভিন্ন খাবারের দোকান, হোটেল, আবাসিক ভবন, জামদানি শাড়ির দোকান, হস্তশিল্প সামগ্রী, মাটির গহনা সহ আরও অন্যান্য পণ্য সামগ্রীর দোকান। এর আশেপাশে রয়েছে বিভিন্ন পিকনিক স্পট।
আরিয়ানের বেশ পছন্দের একটি স্থান হলো বাংলার তাজমহল।
তানিয়া ছবি তুলতে ব্যাস্ত। নাহিদ সে তো আছে সেই মেয়ে নিয়ে। কত কত গার্লফ্রেন্ড নিয়ে এসেছে সে। আয়ান ও তো তাজমহলের সামনে সিড়িতে বসে পড়ছে। মানহা অনেক্ষণ ধরে ডাকছে কিন্তু সে শুনছে না। আরিয়ান তখন মানহার পিছন থেকে এসে ভয় দেখালো…..
—” ভাওউউউ।”
—” মোটেও ভয় পায় নি আমি।”
—” তোমার মত ঝগড়ুতে মেয়েরা ভয় কমেই পায়।”
—” খবরদার আমাকে মোটেও ঝগড়ুতে বলবেন না।”
—” স্টপ আর শুনতে চাচ্ছি না। চলো আমরা ঘুরাঘুরি করি।”
—” হুম চলেন এইভাবে থাকতে থাকতে মনে হচ্ছে ঘুরতে আসাটা ভুল হয়েছে।”
—” যার সাথে এসেছো সে তো একটা এলিয়েন । ওর সাথে মানুষ যায় কোথাও?”
–” আমারও তাই মনে হচ্ছে। চলুন এখন।”
পাশাপাশি হাঁটছে দুইজন। মাঝে মাঝে মানহা সেলফি নিচ্ছে। হাঁটতে হাঁটতে তাদের মাঝে বেশ কথা হয়। অনেকটা ফ্রী হয়ে যায় তারা। আরিয়ান ফুল গাছ থেকে একটা ফুল এনে মানহার চুলে লাগিয়ে দিয়ে বললো……
—” এইবার ঠিক হয়েছে। বড় চুল খুলা রাখলে ভালো লাগে সাথে যদি বেলী ফুল থাকে না অফ কি জোস। এখন যেহেতু বেলী ফুলের মালা পাবো না তাই এইসব ফুল দিয়েই কাজ সারতে হয় বুঝেছ মায়াবতী।”
—” বাহ আপনি তো দেখছি খুব সুন্দর করে গুছিয়ে কথা বলতে পারেন। এখন দেখছি ভালো নিকনেমও দিতে পারেন। তাহলে তানিয়া যে বললো আপনি আনরোমান্টিক আমি তো আপনার মাঝে আনরোমান্টিকতার কোনো স্পর্শ পাচ্ছি না সব রোমান্টিকতার ছোঁয়া পাচ্ছি।”
—” এতদিন তো তোমার সাথে পরিচয় হয় নি তাই রোমান্টিকতার ভাব আমার মাঝে আসে নাই। আজ দেখা হলো আজ চলে এসেছে।”
—” বাহ বাহ।”
আরিয়ানের মনে মানহার প্রতি অন্য অনুভূতি সৃষ্টি হলো যা এতদিন কারো প্রতি হয়নী। মানহারও যে খারাপ লেগেছে তা কিন্তু না। ওরো আরিয়ানের সাথে কথা বলে বেশ লাগলো…….
ধীরে ধীরে তাদের সম্পর্ক বন্ধুত্ব থেকে অন্য কিছুতে পরিণত হলো। একদিন তানিয়া নাহিদ ও আয়ানের সামনে আরিয়ান মানহা কে প্রপোজ করে। মানহাও অ্যাকসেপ্ট করে সেই প্রপোজ। সেইদিন থেকে মানহা হলো তানিয়ার চোখের বালি। মানহা কে সেইদিন থেকেই ঘৃনা করতে শুরু করে। তাই একদিন নাহিদের বাসায় গিয়ে তানিয়া…….
চলবে……
বানান ভুল হলে ক্ষমা করবেন।