মিশেছো আলো ছায়াতে পর্ব-১২+১৩

0
486

#মিশেছো_আলো_ছায়াতে
#Writer_Sintiha_Eva
#part : 12

🍁🍁🍁

রুম জুড়ে পিনপিনে নীরবতা। আদি মাথা নিচু করে বসে আছে চোখে অশ্রু টলমল করছে। মেহেররা এক দৃষ্টিতে আদির দিকে তাকিয়ে আছে। নীরবতা ভেঙে শাওন আদির দিকে প্রশ্ন ছুঁড়ে মারে।

শাওন : তুই সত্যি সত্যি সিমথিকে এমন একটা পরিস্থিতি তে ফেলে এসেছিলি।

শাওনের কথায় আদি মাথা নাড়িয়ে সায় দেয়।

আদি : আমি চলে আসার সময় আর পেছন ফিরি নি। কিন্তু বাড়ির সামনে এসে ও আবার ফিরে গিয়েছিলাম। কেনো যেনো মন মানছিলো না। কিন্তু যতক্ষণে সেখানে পৌঁছালাম ততক্ষণে ওদের কাউকেই পাইনি তবে

এতোটুকু বলে আদি থেমে যায়।

ইশান : তবে কি।

আদি : ওখানে সিয়ার ভাঙা চশমা আর র/ক্ত ছিলো অনেকটা।

আদির কথায় সবাই চমকায়।

তুহা : ওখানে কি হয়েছিলো জানিস তুই।

মেহের : সি সিমথির সাথে খারাপ কিছু হয়নি তো।

আদি : আমি চলে আসার পর কি হয়েছিলো আমি সত্যিই কিছু জানি না। আমি সিয়াকে অনেক গুলো ফোন দিয়েছিলাম কিন্তু সিমথি ফোন রিসিভ করেনি।

আয়াশ : তার মানে সেদিন রাতে কি হয়েছিলো এটা সিমথি ব্যতিত কেউ জানে না।

আদি : হয়তো সায়ন বা ওর ফ্রেন্ডরা কেউ জানে।

ইশান : তুই সিমথির সাথে যোগাযোগ করতে চেষ্টা করিস নি।

আদি : করেছিলাম কিন্তু সেদিনের পর থেকেই সিয়া কেমন একটা হয়ে গিয়েছিলো। আমার থেকে দূরে দূরে থাকতো। ওদের বাড়িতে গেলেও সিয়া দরজা বন্ধ করে বসে থাকতো। এককথায় আমাকে টোটালি ইগনোর করতে শুরু করলো। নাম্বার ব্লক থেকে শুরু করে সব জায়গা থেকে আমাকে দূরে সরিয়ে দেয়। তারপর ওর রেজাল্ট বের হলে আমি ওদের বাড়িতে গিয়ে জানতে পারি সিমথি লন্ডন চলে গেছে।

কথাগুলো বলে আদি একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। চোখে থেকে অশ্রু গড়িয়ে পড়ার আগেই নিজেকে সামলে নেয়।

আদিবা : কাজ টা ঠিক করিস নি তুই। একটা মেয়েকে এভাবে বিপদে ফেলে এসেছিলি। ছিহ

তুহা : সেই সিমথিই আমাদের বাঁচালো সেদিন। ওর জায়গায় অন্যকেউ হলে হয়তো রিভেঞ্জ নিতো।

তুহার কথায় আদি স্মিত হেসে উঠে।

আদি : সিয়া তোদের সাথে কিছুই করবে না। ও রিভেঞ্জ নিতে ভালোবাসে। আর সেই রিভেঞ্জ আমার কাছ থেকেই নেবে। ওর চোখে এখন আর আমার জন্য ভালোবাসা নেয়। যা আছে তা শুধুই ঘৃণা।

আদির কথায় সবাই চুপ হয়ে যায়। কি আর বলবে। দোষ টা তো আদিরই। কিন্তু সিমথির সাথে সেদিন রাতে কি হয়েছিলো সেটা জানার জন্য সবার চিন্তা হচ্ছে।

শাওন এসে আদির কাঁধে হাত রাখে।

শাওন : চিন্তা করিস না। সিমথি এখনো তোকেই ভালোবাসে। কারণ যাকে ভালোবাসা যায় তাকে ঘৃণা করা যায় না। ওর মনে তোর জন্য ঘৃণা থাকলে অভিমান টা বেশি।

আচমকা আদি শাওন কে জড়িয়ে ধরে কেঁদে দেয়।

আদি : সিয়া এখন তন্ময় কে ভালোবাসে। ওরা রিলেশনে আছে। সিয়া আর আমাকে ভালোবাসে না রে ভাইয়া। জানিস আমি ওইদিন শুনেছি সিয়ার মুখে। ও আমাকে ঘৃণা করে ভাইয়া। আমি ওর ঘৃণা, অবহেলা নিতে পারছি না। বুকের বা পাশ টায় ভীষণ কষ্ট হয় রে।

সিমথি আর তন্ময়ের রিলেশনের কথা শুনে সবাই চমকে উঠে। তাহলে কি আদি আর সিমথি ভালোবাসার সমাপ্তি আদি নিজের হাতে করেছে। সবাই একে অপরের দিকে হতাশ দৃষ্টিতে তাকায়। সেদিন রাতের ঘটে যাওয়া সেই নির্মম ঘটনা অজানায় রয়ে গেলো সবার।

_________________

সিমথি ড্রয়িংরুমে পা রাখতেই একজন এসে পেছন থেকে সিমথির চোখ ধরে। সিমথি চমকে লোকটার হাতের উপর হাত রাখে। অতঃপর মুচকি হেসে বলে উঠে

সিমথি : কখন আসলে বড় আব্বু।

সিমথির কথায় নীলয় খান হেসে উঠে। চোখ থেকে হাত সরিয়ে সামনে আসে।

নীলয় খান : দিজ ইজ নট ডান। আজো চিনে ফেললে।

নীলয় খানের কথায় সিমথি হাসে। ওদের কথার মাঝেই ইফাজ ফোড়ন কেটে বলে,,,

ইফাজ : ও আমাদের চিনতে ভুল করলেও তোমাকে চিনতে ভুল করবে না।

ইফাজের কথায় উপস্থিত সবাই হাসে। কেবলমাত্র দুইজন ব্যতিত।

সায়ন : তা আজ আবার কার ব্যান্ড বাজালি বোন।

সায়নের কথায় সিমথি ভ্রু কুঁচকে তাকায়। অতঃপর হাতের দিকে তাকায়। র/ক্ত দেখেই ঠোঁটের কোণায় একটা হাসি ফোটে উঠে। যার পেছনের কারণ সবার অজানা।

সিমথি : একটু বেশিই সাহস দেখাচ্ছিলো তাই বেশি না একটু আর টাইট দিলাম।

সিমথির কথায় সায়ন একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে।

ইফাজ : কেনো করিস এসব মা’রা’মা’রি। হাতটা কতটা কেটে গেছে দেখেছিস।

ইফাজের কথায় সিমথি স্মিত হাসে।

সিমথি : এটা আমার র/ক্ত নহে ভাই এটা ভিকটিমের।

নীলয় খান : আচ্ছা বাদ দাও ইফাজ। চলো সবাই। সিমথি মা ফ্রেশ হয়ে আয়।

সিমথি মাথা নাড়িয়ে চলে যায়। সিমথির ফোন আসায় কথা বলতে বলতে উপরে যায়।

সিমথি : হুম বলো

________

সিমথি : জ্ঞান ফিরলে আবার ডোজ দেবে। যতক্ষণ পর্যন্ত সত্যি টা স্বীকার না আসবে ততক্ষণে একে ডোজ দেবে। আন্ডারস্ট্যান্ড।

___________

ওপাশের উত্তর শুনে সিমথি কল কেটে দেয়। ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠে রহস্যময় হাসি।

প্রতিটা সম্পর্কের মূলভিত্তি হচ্ছে বিশ্বাস। কিন্তু যখন আপণ মানুষ গুলো ভালোবাসার আড়ালে ক্ষতি করে তখন সেটা হয়ে দাঁড়ায় সবচেয়ে বেশি কষ্টদায়ক। বিশ্বাস করে যদি ঠকতে হয় তবে পরবর্তী তে বিশ্বাসী ব্যক্তিকে ও আর বিশ্বাস করা যায় না।

আজকে আদির জন্য একটা বিশেষ দিন। অনেক টা সাহস সঞ্চার করেই আজ আদি সিমথির সামনে দাঁড়াবে। আজকের এই দিনেই সিমথি আদিকে তার মনের সুপ্ত অনুভূতির কথাগুলো ব্যক্ত করেছিলো। সেই একইদিনে আদিও নিজের অনুভূতি ব্যক্ত করতে চাই। তারজন্যই আদি রেডি হয়ে সিমথির হসপিটালের উদ্দেশ্য রওনা হয়। কিছুটা ভয়, কিছুটা সংশয়, কিছুটা ভালো লাগা সব মিলিয়ে এক অন্যরকম অনুভূতির সম্মুখীন আদি।

আদি : যদি ও জানি তুই আজ আমাকে তোর করা অপমান গুলো ফেরত দিবি। তবে তোকে আমি ছাড়ছি না। তন্ময়ের সাথে রিলেশনে থাকলে ও তুই শুধু আমার আর না থাকলে ও তুই আমারই। তোকে এতো সহজে ছাড়ছি না।

কথাগুলো মনে মনে বলে আদি গান চালু করে দেয়।

– লোকে পাগল বলুক, মাতাল বলুক
আমি তোমার পিছু ছাড়বো না।

বেশ কিছুক্ষণ পর আদির গাড়ি এসে থামে সিমথিদের হসপিটালের সামনে। আদি একটা জোরে শ্বাস ফেলে সিমথির কেবিনের উদ্দেশ্য হাঁটা লাগায়। কেবিনের কাছে পৌঁছে কেবিনে নক করে।

সিমথি : ইয়েস কাম ইন।

আদি এসে ধীর পায়ে সিমথির কাছে দাঁড়ায়। সিমথি একমনে ল্যাপটপে কি যেনো টাইপিং করছে। বেশকিছু ক্ষণ পর সিমথি কারো সাড়াশব্দ না পেয়ে দরজার দিকে তাকায়। কি আজব দরজা তো লাগানো। তাহলে কে নক করলো। প্রশ্ন টা মাথায় আসতেই সিমথির হঠাৎ কেমন একটা অনুভূতি হতে শুরু করে। চেনা কোনো পারফিউমের ঘ্রাণ নাসারন্ধ্র দিয়ে ঢুকতেই সিমথি হতবাক হয়ে পাশ ফিরে তাকায়। আদিকে নিজের অনেক টা নিকটে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সিমথি চমকায়। তবুও মুখভঙ্গি স্বাভাবিক রেখে উঠে দাঁড়ায়।

সিমথি : এনি প্রবলেম।

আদি : হু

সিমথি : কেউ এডিমট হয়েছে হসপিটালে।

আদি : হু

সিমথি : কে এডমিট হলো আবার।

আদি : হু

সিমথি ভ্রু কুঁচকে আদির দিকে তাকায়। তখন থেকে সব কথার উত্তর কেবল হু হা করছে। আদিকে এভাবে হা করে তাকিয়ে থাকতে দেখে সিমথি বিরক্তিতে একটা শ্বাস ফেলে। টেবিল থেকে পানির গ্লাস টা নিয়ে আদির মুখে পানি ছুঁড়ে মারে। মুখে পানি পড়তেই আদির হুশ ফিরে।

আদি : ওয়াট’স ননসেন্সিকেল সিয়া।

সিমথি : এমন হ্যাংলার মতো তাকিয়ে আছেন কেনো। জীবনে মেয়ে দেখেন নি।

আদি থমকায়। কিছু একটা মনে পড়তেই হেসে উঠে। এটা যেনো আগুনে ঘি ঢালার মতো কাজ হলো।

আদি সিমথির দিকে কিছুটা ঝুঁকে পড়ে। সিমথি দূরত্ব বাড়াতে গিয়ে ধপ করে চেয়ারে বসে পড়ে। আদি এবার শব্দ করে হেসে দেয়।

সিমথি : এভাবো হাসছেন কেনো। আর আমার কেবিনে আসলেন কেনো হঠাৎ। আমার পারমিশন নিয়েছেন। ( রেগে)

আদি নিজের হাসি আটকে চেয়ারের দু দিকে হাত দিয়ে সিমথি কে আটকে দেয়। সিমথি দম বন্ধ করে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আদির দিকে তাকায়।

আদি : এতো রাগ ভালো না মেয়ে মানুষের।

সিমথি : ফাউল কথা বাদ দেন। আর সরুন। আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে।

আদি : এমন কিছুই তো করলাম না। তবু দম বন্ধ হয়ে আসার কি হলো।

সিমথি অগ্নি দৃষ্টিতে আদির দিকে তাকায়৷

সিমথি : আপনার উদ্দেশ্য টা কি বলবেন।

আদি : আমি তোকে ভালোবাসি সিয়াজান।

আদির কথায় সিমথি থমকায়। আচমকা কেবিন কাঁপিয়ে হেসে উঠে।

সিমথি : আর ইউ জোকিং উইথ মি।

সিমথির কথায় আদি অসহায় দৃষ্টিতে সিমথির দিকে তাকায়। সিমথি হাসি থামিয়ে রক্তবর্ণ দৃষ্টিতে আদির দিকে তাকায়। আচমকা আদিকে জোরে একটা ধাক্কা দেয়। আদি ঠাল সামলাতে না পেরে মেঝেতে পরে যায়। সিমথি উঠে দাঁড়ায়।

সিমথি : এটা কোনো যাত্রা পালার স্টেজ না। আপনি এসে যাত্রা দেখাবেন আর দর্শক হাত তালি দেবে।

আদি উঠে দাঁড়ায়। সিমথি দিকে এগুতে নিলে সিমথি হাত দিয়ে থামিয়ে দেয়।

সিমথি : লিভ।

আদি : সিয়া।

সিমথি : আই সে লিভ।

আচমকা আদি এসে সিমথি বাহু ধরে চেঁচিয়ে উঠে।

আদি : সমস্যা কি তোর। এমন করছিস কেনো। আমি তো বলছি আমি ভুল করেছি। ভুলে গিয়ে সব কিছু নতুন করে শুরু করতে চাইছি। তাহলে তুই কেনো এমন করছিস।

সিমথির কাচের ফাক দিয়ে কেবিনের বাইরে তাকায়। অনেকেই এগিয়ে তাকিয়ে আছে। সিমথি আদিকে পুনরায় সরিয়ে দেয়। কেবিনের বাইরে বেরিয়ে রাগী দৃষ্টিতে তাকাতেই সবাই জায়গা ত্যাগ করে। মুহুর্তের মধ্যে জায়গার মধ্যে নীরবতা নেমে আসে। সিমথি কেবিনে এসে জুরে দরজা লাগায়। অতঃপর আদির দিকে রাগান্বিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে ঝাঁঝালো কণ্ঠে বলে উঠে,,,

সিমথি : চেঁচাবেন না। এটা আপনার বেডরুম নয়।

আদি : আম সরি। বাট তুই

সিমথি : বেরিয়ে যান প্লিজ। সহ্য হচ্ছে আপনাকে আমার। আর কি যেনো বললেন নতুন করে সব শুরু করার কথা। আমি সব ভুলে গেছি। আর সব ভুলেই নতুন করে সব শুরু করেছি। তবে সেই শুরুর কাছে আপনি নামক বিষাক্ত অধ্যায় নেই।

সিমথির কথায় আদি রেগে যায়। পা দিয়ে চেয়ারটা স্বজোরে লাথি মারে।

আদি : এখন আর আমাকে ভালো লাগবে কেনো। নতুন কাউকে পেয়েছিস তো তাই আমাকে ভালো লাগে না। তুই আসলে সবসময় এমনই ছিলি। আমারই বুঝতে ভুল হয়েছে। তবে শুনে রাখ তোকে আমি এতো সহজে ছাড়ছি। তুই আমার মানে শুধু আমার। যদি ভালোই ভালো আমার না হোস। আমি ও খারাপ সাজতে জানি। মাইন্ড ইট।

সিমথি : খারাপের আরো নমুনা বাকি রেখেছেন নাকি। ফর গড সেক প্লিজ আমাকে আপনার বাকি খারাপ লুক গুলো ও দেখাবেন। আফটার অল আপনার মধ্যে ভালো কিছুই নেই। যা আছে সবই খারাপ। আই জাস্ট হেইট ইউ। আই হেইট ইউ।

আদি পুনরায় সিমথির বাহু চেপে নিজের কাছে টেনে আনে। কাটা চুলগুলো কানের পেছনে গুঁজে দেয়। রাগে লাল হয়ে যাওয়া মুখটার দিকে তাকিয়ে স্মিত হাসে। লাল হয়ে যাওয়া নাকে আলতো করে ঠোঁট ছুঁইয়ে দেয়।

আদি : বাট আই লাভ ইউ।

( আপনাদের কি মনে হয় সিমথি আদিকে এতো সহজে মাফ করবে)

চলবে,,,,,,

#মিশেছো_আলো_ছায়াতে
#Writer_Sintiha_Eva
#part : 13

🍁🍁🍁

সেদিনের পর কেটে গেছে আরো অনেক গুলো দিন। প্রতিদিন ই আদি নতুন নতুন কান্ড ঘটিয়েছে। তবে আজ একবারো আদি সিমথির হসপিটালে আসেনি। ফলস্বরূপ আজ সারাদিনই সিমথি ভালোভাবে কাটিয়েছে। এসব ভাবার মাঝেই হঠাৎ গাড়ির সামনে এসে দুইটা বাইক বাইক থামে। আচমকা এমন হওয়ায় সিমথি চমকে গাড়ি অফ করে। এখনই একটা বড়সড় এক্সিডেন্ট হতে পারতো। সিমথি রাগান্বিত দৃষ্টিতে বাইক দুটোর দিকে তাকায়। অতঃপর দরজা খুলে বেরিয়ে যায়।

সিমথি : ওয়াট রাবিস হা। এখনই একটা এক্সিডেন্ট হতে পারতো। সামান্য তম সেন্স টুকু নেই। আশ্চর্য

সিমথির কথায় বাইক থেকে তিনজন ছেলে নেমে এসে সিমথির সামনে দাঁড়ায়। সিমথি দু পা পিছিয়ে দাঁড়ায়। কড়া গলায় কিছু বলার জন্য মুখ খুলতে নেবে তখনই ছেলেগুলো নিজেদের হেলমেট খুলে। ছেলেগুলোকে দেখে সিমথি ভ্রু কুঁচকায়। ঘাড় বা দিকে নিয়ে একটা শ্বাস ছাড়ে।

আয়াশ : বাপ রে এতো রাগ নিয়ে কথা বলিস কিভাবে।

সিমথি : শাট আপ আয়াশ ভাইয়া। এভাবে কেউ বাইক ব্রেক করে।

রিক : আহা বন্টি রাগ করিস কেনো। আমরা ও বুঝতে পারিনি হুট করে সামনে গাড়ি এসে পড়বে।

সিমথি : হাইওয়ে রোডে বুঝতে পারোনি। আজব।

আয়াশ : আসলে আমরা কথা বলতে বলতে আসছিলাম তো তাই খেয়াল করিনি। বাই দ্য ওয়ে রাত বাজে পৌনে একটা। তুই এতো রাতে কোথায় যাস।

সিমথি : বাড়িতে।

আয়াশ : ওহহ। সায়ন এতোক্ষণ আমাদের সাথেই ছিলো।

সিমথি : জানি আমি। বাড়িতে যাও না এখন তেমন একটা।

রিক : ব্যস্ততায় সময় হয়ে উঠে না রে বইন।

সিমথি : ওহহহ।

আদি : সেই তখন থেকে এদের সাথে কথা বলছো। আমার দিকে একবার ফিরে ও তাকাচ্ছো না। বাট ওয়াই?

আদির কথায় আয়াশ আর রিক মুখ চেপে হাসে। সিমথি একপলক আদির দিকে তাকিয়ে রিকের দিকে তাকায়।

সিমথি : রিক ভাইয়া বাইক গুলো সাইড করো। আমি যাবো। প্রচন্ড টায়ার্ড লাগছে।

আদি : সিয়া আমি তোর সাথে কথা বলছি। এন্সার দে।

সিমথি : আগ্রহ নেই।

আদি : আগে তো ঠিকই আগ্রহ থাকতো।

আদির কথায় সিমথি বিরক্তি নিয়ে আদি দিকে তাকায়।

সিমথি : আগে তো আপনি ও এমন গায়ে পড়া ছিলেন না।

আদি : ওয়াট ডু ইউ মিন? আমি তোর গায়ে পড়লাম কখন?

সিমথি উত্তর না দিয়ে মুখ ঘুরিয়ে নেয়। কথা বলতে ইচ্ছে করছে না। ফোন হাতে নিয়ে কারো নাম্বারে ফোন দেয়। আদি তৎক্ষণাত সিমথির ফোন টা ছিনিয়ে নেয়। স্কিনে তন্ময়ের নাম দেখে চোখ-মুখ শক্ত করে সিমথির দিকে তাকায়। সিমথি ও চোখ-মুখ শক্ত করে আদির দিকে তাকায়। দুজনের ভয়াবহ দৃষ্টি দেখে আয়াশ আর রিক ঢোক গিলে। ছোট খাটো একটা তুফান উঠবে বলেই মনে হচ্ছে।

আদি : আয়াশ, রিক সাইডে যা। ( শক্ত গলায়)

আদির কথায় আয়াশ আর রিক সাইডে চলে যায়।

আদি : এতো রাতে তন্ময়কে কি দরকার তোর।

সিমথি : সেটা কি আপনাকে বলতে হবে।

আদি : হ্যাঁ হবে।

সিমথি : আমি বাধ্য নয়। কে হোন আপনি?

আদি : আলবাত তুই বাধ্য। আমি তোর কি হয় সেটা তুই ভালো করেই জানিড।

সিমথি : আপনি জাস্ট আমার ভাইয়ের বন্ধু হোন অর নাথিং। অযথা জোর কাটাবেন না। আমি কারো কন্ট্রোলে চলি না গট ইট। ফোন দেন।

আদি রেগে সিমথির দুই বাহু চেপে ধরে। দাঁতে দাঁত চেপে ধরে বলে,,,

আদি : তোর উপর যদি কারো জোর থাকে তবে সেটা কেবল এই আদিত্য চৌধুরী আদির। গট ইট।

আদির কথায় সিমথি আদিকে এক ধাক্কা দেয়। আদি কয়েক পা পিছিয়ে যায়।

সিমথি : আায়াশ ভাইয়া, রিক ভাইয়া এদিকে আসুন ( হালকা চেঁচিয়ে)

সিমথির চেঁচানো তে আয়াশ আর রিক ওদের সামনে এসে দাঁড়ায়। সিমথি ওদের দিকে এক পলক তাকিয়ে আদির দিকে তাকায়।

সিমথি : আমার উপর জোর কাটাতে আসবেন না। লাস্ট ওয়ার্নিং দিচ্ছি। সেকেন্ড টাইম মুখ চলবে না। মাইন্ড ইট। আর আপনারা আপনার বন্ধু কে বুঝান। ডিস্টেন্স মেইনটেইন করতে বলুন।

কথাগুলো বলে সিমথি গাড়িতে উঠে বসে। ওদের সামনে দিয়ে গাড়ি চালিয়ে চলে যায়।

আদি সিমথির যাওয়ার দিকে একনজরে তাকিয়ে থাকে। আয়াশরা আদির দিকে তাকায়।

আয়াশ : রাগ কমাতে এসে রাগ বাড়িয়ে দিয়ে কি লাভ৷ এভাবে মনের দূরত্ব আরো বাড়বে বৈকি কমবে না।

আয়াশের কথায় রিক সায় দেয়। হুট করেই মাথায় জেদ চেপে বসে।

আদি : আমি ও কথা দিচ্ছি সিয়া কে আমি আমার করেই ছাড়বো। দূরত্ব বাড়াতে চাইছে না। এবার দূরত্ব কমানোর পালা এসেছে। অনেক রাগ-জেদ দেখেছি ওর। আর না এবার আমার পালা।

আদি বাইকে উঠে শো করে চলে যায়। আয়াশ আর রিক একে অপরের দিকে চাওয়াচাওয়ি করে।

রিক : এই দূরত্ব কমবার নয়।

আয়াশ : দুজনই জেদী। কেউ কাউকে একচুল ছাড় দিতে চাইছে না। আদি চাইছে দূরত্ব কমাতে কিন্তু সিমথি দূরত্ব বাড়াচ্ছে।

রিক : কিছু একটা হতে চলেছে। তবে সেটা ভালো না খারাপ বয়ে আনবে এটাই দেখার পালা।

তন্ময় : কি ব্যাপার মেডাম। মাথা হট নাকি।

তন্ময়ের কথায় সিমথি ভ্রু কুঁচকে তন্ময়ের দিকে তাকায়।

তন্ময় : ওকেহ সরি। নে খাওয়া স্টার্ট কর। আর কত রাত করবি।

সিমথি : তুই খা আমার ইচ্ছে করছে না।

তন্ময় : এটা বললে তো হচ্ছে না। নে হা কর।

সিমথি হতাশ দৃষ্টিতে তাকায়। প্রতিত্তোরে তন্ময় একটা স্মাইল দেয়। সিমথি না চাইতে ও হেসে উঠে। মুখ বাড়িয়ে তন্ময়ের বাড়িয়ে রাখা চামচ থেকে খাবার মুখে নেয়।

সিমথি : তুই খেয়েছিস।

তন্ময় : ইউ নো না আমি হলাম বাঙালির উজ্জ্বল নক্ষত্র। সো আমি বাঙালি হয়েও এতো রাত অবধি না খেয়ে থাকবো এটা কি একজন বাঙালি হয়ে আমার করা সাজে।

সিমথি : হুম আমি তো ভুলেই গিয়েছিলাম তুই হলি এক নাম্বার পে/টু/ক।

সিমথির কথায় তন্ময় সিমথির মাথায় চাটি মারে।

তন্ময় : খা শ/য়/তা/ন। সিমথি দিন দিন বড্ড ফাজিল হচ্ছে জানিস সেটা।

সিমথি : আমার জেনে কি লাভ। তুই জানিস। তোর বউ কেমন সেটা তুই জানবি। বিকজ সামলাবি তো তুই।

তন্ময় : হা সব দায় তো আমার।

তন্ময়ের কথায় সিমথি হাসে।

তন্ময় : একা যাবি। নাকি ড্রাইভিং করে দিয়েও আসতে হবে।

সিমথি : আমার হাত-পা সবই আছে। বাই।

________________

কিছুদিন পরের কথা,,,

হসপিটালের পরিস্থিতি ভয়াবহ। সব ডাক্তাররা একজোট হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ইতোমধ্যে হসপিটালের সামনে প্রেস-মিডিয়া ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। তাদের উদ্দেশ্য একটাই হসপিটালের ভেতরের পরিস্থিতি জানা।

সিমথি : তোর সাহস হলো কি করে বাচ্চা মেয়েটাকে জেনেও ভুল মেডিসিন দেওয়ার। তোর ঝামেলা আমার সাথে। আর তুই প্যাশেন্টের উপর সেই ঝামেলার তেজ ঢালবি। একজন ডক্টর হিসেবে এটাই তোর ডিউটি।

তরী : দেখ সিমথি আমার ডিউটি তোকপ শিখাতে হবে না। আমি দেখে মেডিসিন টা দেয়নি।

সিমথি : তুই আমাকে বলছিস তোকে নতুন করে চিনতে। তুই কেমন সেটা কি আমি জানি না।

তরী : তের যা খুশি মনে হতে পারে তাতে আমার কি।

তুহিন : দেখ তরী অযথা ঝামেলা করিস না।

মেঘা : অন্যায় করেছিস সেটা স্বীকার কেনো করছিস না।

সিমথি : সামান্য মানবিকতা নেই তোর মধ্যে। যদি থাকতো তাহলে বাচ্চা মেয়ে টাকে এভাবে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিতি না।

তরী : হ্যাঁ আমি ইচ্ছে করেই এমন করেছি। এটাই শুনতে চাইছি তাই তো। যা সত্যি বলছি আমি ইচ্ছে করে এমন করেছি। শুধুমাত্র তোকে ফাঁসাবো তাই। সহ্য হয় না তোকে। তোকে দেখলেই আমার মাথায় রাগ চেপে বসে। তাই এমন টা করেছি। কি করবি তুই আমায়।

তরীর কথায় সিমথি অগ্নি দৃষ্টিতে তরীর দিকে তাকায়। শুধুমাত্র প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে একটা মানুষ কিভাবে ফুলের মতো নিষ্পাপ একটা শিশুকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে পারে৷

সিমথি : আজ যদি বাচ্চা মেয়েটার কিছু হয়। সত্যি বলছি খোদার কসম তোর দাদি মা তোকে আজ আমার হাত থেকে বাঁচাতে পারবে না।

কথাগুলো বলে সিমথি অপারেশন থিয়েটারের উদ্দেশ্য পা বাড়ায়। পেছন পেছন তুহিন আর মেঘা ও আসে। তরী হাতের মুঠো শক্ত করে ধরে।

তরী : যা করেছি বেশ করেছি। তুই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় একটা অভিশা/প সিমথি। তোর জন্য শুধুমাত্র তোর জন্য আজ আমি অনাথ।

কথাগুলো বলে তরী হসপিটাল থেকে বেরিয়ে যায়। ইতোমধ্যে খবর টিভির নিউজ চ্যানেলে ছড়িয়ে পড়েছে। জার্নালিস্টরা আরও তেল মশলা লাগাচ্ছে। সায়নরা সিমথিদের একের পর এক কল করছে কিন্তু কাউকেই পাচ্ছে না।

রাগে সায়ন মাথার চুল টেনে ধরে। জোরে জোরে শ্বাস নিতে শুরু করে।

তখনই তরী হনহনিয়ে বাড়ি প্রবেশ করে। তরীকে দেখে সীমা বেগম রেগে তরীর সামনে দাড়ায়।

সীমা বেগম : এসবের মানে কি তরী৷ তুই এতোটা নিচে কিভাবে নামতে পারিস।

ইফাজ : আমি জাস্ট ভাবতে পারছি না।

তরী : উফফস প্লিজ জ্ঞান দিও না। যা হবার হয়েছে। এখনো বেঁচে আছে ম/রে/নি বুঝলে।

সায়ন : তরী ( চেচিয়ে)

সায়নের চেঁচানো তো তরী কেঁপে ওঠে। কারণ সায়ন প্রচন্ড রেগে আছে এটা বুঝতে কারো বাকি নেই।

তরী কথা না বাড়িয়ে উপরে চলে যায়।

বেশ কয়েক ঘন্টা পর সিমথি সহ আরো কয়েকজন অপারেশ থিয়েটার থেকে বের হয়। বাচ্চা মেয়েটার ফ্যামিলির লোকজন সিমথিদের ঘিরে ধরে। সিমথিরা একে অপরের দিকে তাকিয়ে হালকা হাসে।

সিমথি : অপারেশন সাকসেসফুল। ওকে কিছুদিন ওভজারভ এ রাখতে হবে। তারপর নিয়ে যেতে পারবেন।

কথাগুলো বলে সিমথি চলে যায়। আজ বাড়িতে গিয়ে তরীর সাথে অনেক কথা আছে। তরীর নাম টা মাথায় আসতেই সিমথির চোখ মুখ লাল হয়ে যায় রাগে।

বাড়িতে ফিরে ড্রয়িংরুমের থমথমে অবস্থা দেখে ও না দেখার ভান করে সিমথি চেঁচিয়ে তরীর নাম ধরে ডেকে উঠে। সিমথির পেছন পেছন তন্ময়রা ও বাড়িতে ডুকে। সিমথির চেঁচানো তে উপস্থিত সবাই ভড়কে যায়। আজ বাড়িতে সুনামি বয়ে যাবে এটা বুঝতে কারোর সমস্যা হলো না। সিমথি প্রচন্ড রেগে আছে মুখ দেখেই বুঝা যাচ্ছে।

নীলয় খান : সিমথি মা তুই আগে ফ্রেশ হয়ে নে। অনেক রাত হয়েছে কিছু খাসনি এখনো।

সিমথি : তরীকে ডাক দাও বড় আব্বু। আমি ওর রুমে গেলে ওর জন্য সেটা শুভনীয় হবে না।

সায়নের দাদি : কি করবে তুমি তরীকে। ভয় দেখাচ্ছো।

সিমথি রাগী দৃষ্টিতে রহিমা বেগমের দিকে তাকায়।

সিমথি : আপনার সাথে আমি কথা বলছি না। আমার সাথে একদম চেচাবেন না। সো চুপ থাকুন। এটাই বেটার।

সিমথি শান্ত গলার হুমকি রহিমা বেগম দমে যায়। সিমথির এই রূপ দেখে মনে মনে তিনি ও সংশয়ে আছেন। আজ তরীর কি হবে এটা নিয়ে।

চলবে,,,,