মেঘভেলায় প্রেমচিঠি পর্ব-২০+২১

0
616

“মেঘভেলায় প্রেমচিঠি ”

২০.

মোটা দেয়াল আর ব্যারা দিয়ে ঢেকে দেয়া তাঁর ভিতরে
জিরাফ গুলোকে দেখতে বেশ লাগছে। কী সুন্দর করে ছোট জিরাফটা মায়ের দিকে তাকিয়ে খাবার খাচ্ছে! মুগ্ধতা নিয়ে তাকিয়ে থাকে রোদসী আর শহর। শহরের হাত ধরে রোদসী সবগুলো পশু পাখি নিপুণ দৃষ্টিতে পরীক্ষণ করছে। রোদসীর সবচেয়ে বেশি ভালো লেগেছে ময়ূর। আশ্চর্যজনক ভাবে, রোদসী ময়ূরের খাঁচার সামনে যেতেই সেটা একটু কাছে এসে ডানা মেলে ঘুরে ঘুরে দেখালো। খুশিতে হেঁসে ফেললো সে। শহর নিষ্পলক চোখে তাকিয়ে রইলো সেদিকে।
মেয়েটাকে সুন্দর লাগে হাসলে, অথচ মেয়েটা হাসতেই চায়না। যেনো ঘোর আপত্তি হাসিখুশি থাকায়। শহর ঠিক করে, কাজের থেকে বিরতি নিয়ে মাঝে মাঝে মেয়েটাকে ঘুরিয়ে আনবে এদিকে ওদিকে। অল্প খানিকটা দিলেই কেমন চোখ মুখ চকচক করে ওঠে। যদিও মুখ ফুটে অতোটা আনন্দ প্রকাশ করে না। কেনো এতো দ্বিধা? শহর আনমনে ভাবে। ধ্যান ভাঙে রোদসীর হাত টানায়। রোদসী উৎফুল্লতা নিয়ে বলছে,

‘চলুন না, ঐ পার্কটায় যাই। ‘

শহর তাকিয়ে দেখে চিড়িয়াখানার ভিতরের ছোট একটা জায়গা নিয়ে পার্ক করা। এটা বোধ হয় নতুন হয়েছে, কিংবা ওরই চোখে পড়েনি। শহর হাসিমুখে বলে,

‘চলো। ‘

রোদসীকে নিয়ে পার্কটায় ঢোকে শহর। দুইটা দোলনা, একটা স্লিপার আর আরওকিছু বাচ্চাদের খেলার জিনিস রাখা। শহর এসবই দেখছিলো। হঠাৎ খেয়াল করে রোদসী এক ধ্যানে দোলনার দিকে তাকিয়ে আছে। শহর মুখ কাছে এনে বলে,

‘চড়বে? ‘

রোদসী চকিতে তাকায়। চোখের মাঝে কোন স্মৃতি হয়তো ভেসে বেড়াচ্ছিলো। রোদসী তড়িৎ গতিতে মাথা
নাড়িয়ে বলে,

‘না। এখন কী আর বাচ্চা আছি নাকি? ‘

শহর খোঁচা দিয়ে বলে,

‘এখনও বা কী বড় হয়েছো! আমার কাঁধ সমানও তো না তুমি। ‘

রোদসী ভ্রু কুচকে তাকালো। বাই এনি চান্স, ছেলেটা কী তাঁকে অপমান করলো! তাও আবার উচ্চতা নিয়ে?
হ্যা, রোদসী জানে যে শহর একটু বেশিই লম্বা। চিকন শরীরে যেনো আরও বেশি লম্বা লাগে। তাই বলে, রোদসী যে খাটো তা নয়। পাঁচ ফুট ছয়ের মতো হবে।
কিন্তু শহরের পাশে দাঁড়ালে একটা পুতুলের মতো লাগে। নাক ফুলিয়ে রোদসী বলল,

‘অতিরিক্ত লম্বা হওয়া কোনো ভালো কথা নয়। এটাও এক ধরনের রোগ। তাই অতো গর্ব করার কিছুই নেই। ‘

শহর মুখ বাঁকিয়ে বলল,

‘হুহ্! লম্বা হওয়া রোগ তোমাকে কে বলেছে? ‘

‘রোগই তো, এটাকে বলা হয় লম্বুটে রোগ। কথায় আছে না, লম্বা মানুষের বুদ্ধি হাঁটুতে থাকে! ‘

শহর রেগে গিয়ে বলল,

‘কীহ! কী বললে তুমি? ‘

‘এক কথা আমি দু’বার বলিনা, বয়রাদের সঙ্গে তো জীবনেও চলিনা।’

শহর ঠোঁট চেপে রাখলো। কীভাবে কথায় কথায় তাঁকে অপমান করলো এই ছোট মেয়েটা! একি মানা যায়!
শহর মুখ ফুলিয়ে পাশের বেঞ্চিতে বসে বলল,

‘আচ্ছা তাহলে, আমি যেহেতু বয়রা আর তুমি বয়রাদের সঙ্গে চলোও না। তবে, একা একাই ঘুরে যাও। ‘

রোদসী শহরকে চেতিয়ে দিয়ে খিলখিল করে হাসছে। শহরের কথা শুনে বলল,

‘ঠিক আছে। ‘

বলে রোদসী পার্ক থেকে বেরিয়ে গেলো। এক মিনিট দুই মিনিট করে আধা ঘণ্টা পার হতেই শহরের টনক নড়লো। এতক্ষণ ভাবছিলো, রোদসী হয়তোবা এখানেই কোথাও ঘুরছে। কিন্তু, যখন শহর দেখলো পার্কের আশেপাশে রোদসী কোথাও নেই তখন কপাল বেয়ে সুক্ষ্ম ঘামের লাইন ফোঁটায় ফোঁটায় গলদেশে পড়ছে। বুকটা ধুকধুক করতে শুরু করলো। রোদসীর কাছে তো ফোনও নেই। নাহলে, কল করা যেতো। একা মেয়ে মানুষ, কোনো বিপদ হলে! আর ভাবতে পারেনা শহর। নিজের উপর ভীষণ রাগ হয়। কেনো বলেছিলো, একা যেতে। পূর্ণ এক ঘন্টা খোঁজা খুঁজির পরও যখন শহর কোথাও পেলো না তখন চোখের কোণে জল জমলো। চোখে হাহাকার ঠেলে বেরিয়ে আসলো। শুঁকনো মরুভূমির মতো খাঁ খাঁ করছে বুকে।
শহর এখানের এক ডিউটিরত কর্মকর্তাকে বিষয়টা জানালে তিনি বললেন, মাইকিং করলে পাওয়া যেতে পারে। শহরও দ্রুত গেলো মাইকিং এর ব্যবস্থা করতে।
সেখানে কর্মরত এক লোক ঘোষণা করলো। শহর পাশের বেঞ্চে বসে আছে মুখ দুই হাতে ঢেকে। কয়েক মিনিটের মধ্যেই মুখ শুকিয়ে ছোট হয়ে গেছে। দরদর করে ঘেমে উঠেছে শরীর। নানান রকম চিন্তা ভাবনা করতে করতে হঠাৎ মনে হলো কে যেন কাঁধে হাত রেখেছে। মুখ তুলে তাকাতেই দেখলো রোদসী মিটিমিটি হেঁসে ওর দিকেই তাকিয়ে আছে। শহর কোনো কিছু না ভেবে উঠে দাঁড়িয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো। উত্তেজিত হয়ে বলল,

‘কোথায় চলে গেছিলে তুমি! আরেকটু হলেই আমার শ্বাস আঁটকে যেতো। তুমি আর কখনো ছেড়ে যেওনা রোদচশমা। ‘

রোদসী অবাক হয়ে গেলো। হাত পা শিরশির করে কাঁপছে। শহরকে ভয় দেখানোর জন্য রোদসী একটু দূরে সাপ পরিদর্শন করার জায়গাটায় গিয়েছিলো।
ভেবেছিলো কিছুক্ষণ পরই এসে পড়বে। কিন্তু শহর যে এতো তাড়াতাড়ি হয়রান হয়ে খুঁজে বেরাবে, তা বোধ হয় কল্পনাতেও আসেনি তাঁর। অজান্তেই আবছা ভালো লাগা রন্ধ্রে রন্ধ্রে বেয়ে যেতে লাগলো। কেউ তাঁর জন্য এতোটা চিন্তা করে ভেবে সুখপাখিরা তিরতির করে উড়তে লাগে মনে। আশেপাশে কয়েক জন লোক মুখ চেপে হাসছে। তা দেখে লজ্জা পেলো রোদসী। ইতস্তত করে শহরকে ছাড়ালো। শহরের চোখে মুখে এখনো উৎকন্ঠা। যেনো আশেপাশের কেউই এখন গুরুত্বপূর্ণ নয় রোদসী ছাড়া। শহরকে শান্ত করতে রোদসী মিনমিন করে অপরাধীর মতো বলল,

‘আসলে, আমি পাশেই ছিলাম। কিন্তু বুঝতে পারিনি আপনি এতো তাড়াতাড়ি খুঁজে এনাউন্সমেন্ট করবেন। সরি। ‘

শহর হাফ ছাড়লো। শান্ত হলো কিছুটা। রোদসীর হাতটা আঁকড়ে ধরে পাশের লোকজনকে ধন্যবাদ জানিয়ে বের হলো চিড়িয়াখানা থেকে। রোদসী একবার নিজেদের একসাথে থাকা জোরালো হাতটার
দিকে একবার তাকাচ্ছে আরেক বার শহরের মুখের দিকে। একটু পর বলল,

‘আমি ছোট বাচ্চা না। একা হাঁটতে পারি। ‘

শহর আড়চোখে একবার তাকিয়ে বলল,

‘তুমি একটা বড় বাচ্চা। আবারও হারিয়ে যাবে। ‘

‘আমি তখন হারাইনি। এর আগেও এখানে অনেক বার এসেছি। রাস্তা চিনি তো। ‘

‘ঐ সময় হারাওনি। কিন্তু এবার হারালে! ‘

‘আমি হারালেই বা আপনার কী! আমি তো ঝগড়া করি শুধু, রাগ দেখাই। ‘

রোদসীর খোঁচা দেয়ায় শহর তেমন কিছু মুখে না বললেও মনে মনে বলল,

‘তুমি আরেকবার হারালে আর আমি ধুঁকে ধুঁকে মরবো রৌদ্রানী। ‘

_

গাড়ি থেকে নেমে মাঝরাস্তায় শহর ফুচকা আনতে গেলো। রোদসী বিরক্ত মুখে গাড়ির পাশে হেলান দিয়ে দাঁড়ালো। এই ছেলেটার কিছু ঠিক নেই। মন যখন যা চায় তাই করে। এই দুপুর বেলা কেউ ফুচকা খায়! শহরকে বলেছিলো, বিকেলে খেতে। কিন্তু নাহ, জনাবের না কী ক্রেভিং হয়েছে। রোদসী তখন মনে মনে বেশ কয়েকটা গালি দিয়েছিলো ওকে। আরে বাবা! ছেলে মানুষ, তুই কী প্রেগন্যান্ট! যে আবার ক্রেভিং হবে! জাস্ট অসহ্য, বিরক্তিকর ব্যাপার স্যাপার। ফুঁসতে থাকলো রোদসী। সেই যে গিয়েছে, আসার নাম নেই। রোদসী ভাবলো, একটু এগিয়ে দেখা যাক। গিয়ে দেখে রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে শহর। তাই রোদসী আর এগোলো না৷ চুপচাপ সাইডে দাঁড়াতেই, মনে হলো কেউ ওর দিকে এগিয়ে আসছে। পেছনে তাকিয়ে দেখলো, ঠিকই দুটো মহিলা ওর দিকে আসছে। হালকা চেনা লাগলেও বুঝতে পারলো না এরা কে। তবে মহিলা দুটো ওর কাছাকাছি এসে দাঁড়ালো। চোখে মুখে দারুণ কৌতূহল। যেনো পৃথিবীর অষ্টম আশ্চর্য দেখে ফেলেছে। একজন মহিলা উত্তেজিত কন্ঠে বলল,

‘আরে! তুমি আমাদের পুরনো পাড়ার রোদ না? ঐ যে, একটা ছেলে যে তোমাকে কিডন্যাপ করে নিয়ে ধর্ষণ করেছিলো! ‘

চলবে-

“মেঘভেলায় প্রেমচিঠি ”

২১.

ভীতু চোখে একবার মহিলাটির দিকে তাকিয়ে কেঁপে থরথর করে উঠলো রোদসী। মহিলাটা ওর হাত ধরে আছে চোখ বড় করে। রোদসী কাঁপতে কাঁপতে বলল,

‘ছাড়ু..ন আমাকে! ‘

মহিলাটি মুখে করুণা ফুটিয়ে বললেন,

‘বুঝেছি। সবার কাছে ব্যাপারটা ধামাচাপা দিতে চাইছো! জানি জানি ধর্ষিতা মেয়েদের বিয়ে দেয়া কঠিন। ‘

রোদসীর দম গলায় কাঁটার মতো আঁটকে আছে। শ্বাসকষ্ট হচ্ছে একরকমের। অনেক দিনের জমানো কান্না গুলো বের হয়ে আসছে। জায়গাসহ নিজেকেও তো কতোটা পরিবর্তন করেছে, শুধু এই কারণে। নিজের ভয়ঙ্কর অতীতটা নিয়ে কেউ যেনো তাঁকে বারবার প্রশ্নবিদ্ধ করে রক্তাক্ত না করে। সেই ঘটনাটা এখনো খোঁচায় বারংবার। রোদসী সহ্য করতে না পেরে বলল,

‘চুপ করুন আপনারা। এমন কিছু হয়নি। ‘

নিজেকে জোর করে ছাড়ানোর চেষ্টা করছে রোদসী। দু’টো মহিলা ওকে জোঁকের মতো ধরে রেখেছে। এতো দিনের পুরনো ঘটনা ভুলেনি তারা। এমন সময় শহর এসে উপস্থিত হলো। প্রথমে কিছু না বুঝলেও যখন দেখলো রোদসী কাঁদছে তখন রেগে গেলো। মহিলার কাছে থেকে টেনে রোদসীকে নিয়ে আসলো। চেঁচিয়ে বলল,

‘সমস্যা কী আপনাদের? আমার বউকে ডিস্টার্ব করছেন কেনো! ‘

মহিলা দু’জন একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইলো অবাক হয়ে। এতোক্ষণ ধর্ষিতাদের বিয়ে হয়না দেখে হা হুতাশ করলেও, এখন তাদের মুখ দেখে মনে হয়
হচ্ছে যে ধর্ষিতা কারোর বিয়ে হওয়া উচিত ছিলো না।
রোদসীর কীভাবে বিয়ে হলো! এটা হওয়া একদমই উচিত হয়নি। শহর রোদসীর দিকে তাকিয়ে দেখে ভয়ে সিটিয়ে গায়ের সাথে শার্ট খামচে দাঁড়িয়ে আছে। এর কারণ বুঝতে পারলো না। রোদসী তো এমন না! ভয় পেতে কখনো দেখেনি সে। মহিলা দুজনের দিকে কড়া চোখে তাকিয়ে রোদসীকে নিয়ে বাসায় ঢুকলো। রোদসী একদৌড়ে বাসায় এসে দরজা লক করে দিলো। দিলারা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন। শহরকে জিজ্ঞেস করতেই শহর বলল,

‘ঐ আমি বকেছিলাম তো তাই। ‘

দিলারা বেশ বকাঝকা করলেন। তবুও শহরের কোনো হেলদোল হলো না। ওর মন পড়ে আছে একটু আগের ঘটনায়। অগত্য দিলারা চলে গেলে শহর ক্লান্ত হয়ে সোফায় বসে পড়লো। তারপর বাহিরে গেলো। সন্ধ্যার দিকে ঘরে ফিরে দেখলো দরজার লক খোলা কিন্তু চাপানো। ঢুকে রোদসীকে ঘরে না পেয়ে বারান্দায় চেক করলো। ও ঢুকতেই তিতুস চেঁচিয়ে ডাকলো। যেনো ওরই অপেক্ষায় ছিলো। বারান্দাটা ঘুটঘুটে আঁধারে ঢেকে আছে। কিছু দেখতে পেলো না। হঠাৎ পায়ে কিছু বাঝলে নিচে তাকিয়ে দেখে রোদসী বারান্দার ফ্লোরে জুবুথুবু হয়ে হাঁটু মুড়ে বসেছে। থুতনি হাঁটুতে ঠেকানো।
শহর চমকে দ্রুত রোদসীকে ধরলো। রোদসী একটুও চমকালো না। মলিন চোখে শহরকে দেখলো। শহর রোদসীর দিকে তাকিয়ে বলল,

‘এই রোদচশমা,কী হয়েছে তোমার? এখানে বসে আছো কেনো? ‘

রোদসী চুপ করে আছে। গালের পাশে চোখের পানি শুকিয়ে যাওয়া দাগ। শহর আলতো হাতে রোদসীর মুখ উঠিয়ে বলল,

‘আমাকে বলবে না? ‘

রোদসীর কী হলো বোঝা গেলো না। শহরকে অবাক করে রোদসী হুট করে জড়িয়ে ধরলো শহরকে। শহর নিজের বুকের পাশে ভেজা অনুভব করতেই বুঝতে পারলো মেয়েটা নিঃশব্দে কাঁদছে। শহর রোদসীর মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো আর কোনো কিছু বলল না।
নিরবতা কাটিয়ে রোদসী একাই বলল,

‘বলবো বলবো, অনে..ক কিছু বল.বো। ‘

শহর রোদসীর কপাল ছুঁয়ে দেখে গা অনেক গরম। তাই কথা জড়িয়ে যাচ্ছে। শহর রোদসীকে টেনে তুলে রুমে নিয়ে শুইয়ে দিলো। গায়ে কাঁথা দিয়ে বলল,

‘এখন না, কালকে বলো। অসুস্থ তুমি। ‘

রোদসী জোড় করে শোয়া থেকে উঠে বসলো। শহরের হাতটা আঁকড়ে ধরে আছে দুই হাতে। চোখ মুখ লাল হয়ে গেছে। শহরের দিকে তাকিয়ে বলল,

‘নাহ! আমি এখনি বলবো। সব বলবো। কি.ন্তু আপনি চলে যাবেন না ঠিক আছে? সবাই চলে যায় আমাকে ছেড়ে শহর। কেউ থাকে না আমার সাথে! ‘

শহর বুঝতে পারলো না কী বলবে। এতোদিনে কতোবার রোদসীর সঙ্গে কথায় কথায় ঝগড়া
করেছে। এখন কীসের একটা টান অনুভব হচ্ছে। অদ্ভুত মায়ায় জড়িয়ে যাচ্ছে। শহরের বুকের পাশে কেমন কষ্ট লাগলো। রোদসীর পাশে বসে ওর মাথাটা নিজের বুকে চেপে ধরে বলল,

‘তোমাকে আমি চাইলেও ছেড়ে যেতে পারবো না রোদি। ‘

রোদসী নেতিয়ে পড়েছে। ফুপিয়ে কেঁদে উঠছে মাঝে মধ্যে। রোদসী জ্বরের ঘোরে আশেপাশের কিছু দেখতে পাচ্ছে না। ওর চোখে ভাসছে একটা রঙিন মাঠ। যেখানে দুটো মেয়ে কানামাছি খেলছে। আবার কখনো
ক্লাসরুমের বাহিরে কান ধরে দাঁড়িয়ে আছে। তো আবার কারোর বাড়ির গাছের আম চুরি করায় লোকজন এসে বাবার কাছে বিচার দিচ্ছে। অসংখ্য ধোঁয়াটে স্মৃতির পাতায় ফিরে গেলো রোদসী। শহরকে বলতে শুরু করলো স্মৃতির একাংশ –

কেয়া হোসেন চিৎকার করে রাগারাগি করছেন,

‘এবারও ফেল! হে আল্লাহ । পাশ কবে করবি তুই! ‘

‘মা, মনের পাশই বড় পাশ। ‘

‘থাপ্পড় খেলে তোর মনের পাশ বের হবে। ‘

মায়ের কথায় কান দিলো না রোদসী। হাতের আপেলটায় আরেক কামড় দিয়ে হেলেদুলে গুনগুন করে বাসা থেকে বের হলো। সারাজীবন মায়ের এই ফেল কেনো? ফেল কেনো? শুনেই গেলো। লম্বা একটা হাই তুলে মোবাইলে রিম্মিকে কল করলো। রিম্মি রিসিভ করে চিৎকার দিয়ে বলল,

‘দোস্ত! ‘

‘আস্তে আস্তে! কানটা তো নষ্ট করে দিলি। ‘

‘দোস্ত আমি ফেল করেছি! ‘

‘ওহ, তাই তো বলছিলাম, রিমু ভালো মতো পড়, পড়’

‘তুই কী চাপা মারিস! নিজেও তো ফেল, ভুলে গেছিস?’

‘ওও তাইতো! এবার?’

রিম্মি ওপাশ থেকে কপাল চাপড়ে বলল,

‘এবার আর কী? সবাই যা করে তাই! স্যারের কোচিং এ ভর্তি হবো চল।’

‘কোন স্যার? ‘

‘উফ, সূর্য স্যার! ‘

রোদসী বিরবির করে বলল,

‘স্যারের কাছে পড়লেই পাশ! এটা করা ঠিক হবে নারে। ‘

রিম্মি ধমক দিয়ে বলল,

‘আমার সামনে বলদামি করবি না তুই! শোন রোদ, দুনিয়াতে বেশি ভালো মানুষ টিকতে পারেনা। কাল থেকেই আমরা স্যারের কোচিং-এ ভর্তি হবো। এটা ক্লাস টেনের প্রথম টেস্ট। পরের টেস্টে খারাপ করলে
গার্ডিয়ান ডাকাবে। আমি সোহাকেও বলবোনে। তুই কল করে নে একবার, নাম্বার সেন্ড করছি। ‘

‘আচ্ছা ঠিক আছে। ‘

রোদসী ফোনের দিকে তাকিয়ে রইলো। রিম্মি আর সোহা ওর বেস্ট ফ্রেন্ড। ক্লাস ফাইভ থেকেই তিনজন সুপার গ্লুর মতো একসাথে চিপকে থাকে। যেকোনো বাঁদরামোতে স্কুলে সবার আগে ওদের নামই পাওয়া যায়। রোদসী মোবাইলের নাম্বারটায় কল করলো। চার বার রিং হওয়ার পর ওপাশ থেকে পুরুষালী কন্ঠ ভেসে এলো,

‘হেলো, সূর্য মাহতাব স্পিকিং। ‘

চলবে-
লেখিকা -নাঈমা হোসেন রোদসী।