“মেঘভেলায় প্রেমচিঠি ”
২৮.
কলিং বেলের তীর্যক আওয়াজ পেতেই সকলের চোখ মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। সবার প্রথমে রোদসীর চোখদুটো ছলছল করে উঠলো। এলোমেলো বেশেই দৌড়ে গেলো যতদ্রুত সম্ভব। টেবিলের সঙ্গে পা লেগে আঘাত পেয়ে রক্তও বের হলো। ব্যাথাটুকু অনুভব হলেও সেটাকে পাত্তা দিলো না রোদসী। উদ্বিগ্নতার সঙ্গে ছুটে গেলো। দরজা খুলে দিতেই এক প্রশান্তির বাতাস তাঁকে রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছুয়ে দিলো। কারণ, সামনেই যে শহর দাঁড়িয়ে। রোদসীর আঁটকে থাকা শ্বাসটুকু অবশেষে রেহাই পেলো। চারপাশের সবকিছুকে তোয়াক্কা না করে রোদসী শহরের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়লো। দুই হাতে শক্ত করে জড়িয়ে ফুপিয়ে উঠলো।
শহর তাল মিলাতে না পেরে দরজার চৌকাঠ ধরে নিলো। অবাক হয়ে গেলো একেবারে। রোদসীর কান্নারত মুখটির দিকে তাকিয়ে রইলো কিয়ৎক্ষণ।
হুঁশ ফিরতেই এক হাত রাখলো রোদসীর মাথায়। আরেক হাতে আলতো করে জড়িয়ে নিলো। ভীষণ আদুরে ভঙ্গিতে বলল,
‘কী হয়েছে রোদচশমা? কাঁদছো কেনো? ‘
রোদসী আহ্লাদী হয়ে শহরের বুকে নাক ঘষলো। প্রতিউত্তর করলো না। শহর বলল,
‘ইশশ,আমার শার্টে নাকের পানি চোখের পানি এক করে দিচ্ছো! ‘
রোদসী বুক থেকে মাথা তুললো। ফোলা ফোলা চোখে একবার অভিমানী দৃষ্টিতে তাকিয়ে চোখ মুছে চলে গেলো ভেতরে। শহর দীর্ঘ শ্বাস ফেলে ভেতরে আসলো। হঠাৎ করেই সন্ধ্যায় আজকে অফিসে থাকাকালীন একটা কল এলো। সেটার পরের ঘটনায় বেশ চিন্তিত শহর। তবে এতোটা লেট হবে জানতো না।
দিলারা এসে প্রচুর বকাবকি করলেন। শহর এটা ওটা বুঝ দিয়ে দিলো। কিন্তু আসল কথাটা বলল না। সবার অগোচরে হাফ ছাড়লো। রুমে ঢুকে দেখলো কাথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে রোদসী। নিজেরও খারাপ লাগলো শহরের। এতোটা দেরি হবে বুঝতে পারেনি৷ আর মোবাইলটাও চার্জ শেষ হয়ে অফ হয়ে গেছিলো। প্রেশারে অন্য কিছুর খেয়াল হয়নি। হাত মুখ ধুয়ে এসে মোবাইলটা চার্জে দিলো শহর৷ রোদসীর পাশে শুয়ে রইলো। কোনো কথাই বলল না। কপালের উপর এক হাত রেখে চোখ বন্ধ করে রাখলো। অথচ রোদসী আশা করেছিলো শহর তাঁকে ডাকবে। কিছু একটা হলেও বলবে। রোদসী রেগে ফুপিয়ে উঠলো। বালিশে মুখ গুঁজে ফুপাতে থাকলো। শহরের কানে সেই শব্দ আসতেই সজাগ হলো সে। উঠে আধশোয়া হলো। পাশ থেকে রোদসীর হাত টান দিলো কয়েক বার। রোদসী জেদ করে শুয়ে রইলো। শহর বুঝতে পেরে হালকা হেঁসে রোদসীকে পেছনে থেকে জড়িয়ে ধরলো। কানের পিঠে ফু দিতেই গা ঝাড়া দিয়ে সরিয়ে দিতে চাইলো রোদসী। তবে, শহর ছাড়লো না। আরও শক্ত করে পেঁচিয়ে নিলো। রোদসী হাল ছেড়ে দিতেই শহর বলল,
‘শক্তি শেষ? ‘
রোদসী ফোসফোস করে তাকালো। শহর সশব্দে হাসলো। উঠে বসে রোদসীকে এক টানে কোলে তুলে নিলো। রোদসী হকচকিয়ে বলল,
‘একি! কোলে তুললেন কেনো? ‘
শহর মিষ্টি করে হাসলো। উঠে দাড়িয়ে রোদসীকে কোলে নিয়েই পা দিয়ে দরজা ঠেলে বাহির হলো। রোদসী ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো। বিস্ময়ে কথা বলতে ভুলে গেছে। ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে ছাদে উঠলো। রোদসীকে আগলে ধরে ছাদে বিছানো পাটিতে শুয়ে পড়লো। রোদসী লজ্জায় লাল হয়ে উঠলো। শহর ওকে বুকের উপর নিয়েই শুয়ে আছে।
রোদসী একবার হাত দিয়ে উঠার চেষ্টা করলেও শহর ছাড়লো না। শহর নিঃশব্দে হেঁসে রোদসীর দিকে তাকিয়ে বলল,
‘আকাশে আজ লাল চাঁদ, দেখো। ‘
রোদসী থমকে গেলো আকাশের দিকে চেয়ে। সত্যিই বিরাট একটা লাল রঙের চাঁদ দেখা যাচ্ছে। রোদসী শহরকে বলল,
‘আপনি জানেন আকাশে লাল চাঁদ ওঠে কেনো? ‘
‘হুম,চাঁদ সূর্যের আলোয় আলকিত হয়। পূর্ণিমার সময় সূর্যের আলো পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল ভেদ করে যাবার সময় শুধু লাল বর্ণালীর আলো চাঁদের গায়ে পড়ে, তাই তখন চাঁদ লালচে লাগে। তুমি কী ভেবেছিলে আমি পারবো না? ‘
‘হ্যা,সেটাই কীভাবে পারলেন? ‘
‘বোকা মেয়ে,আমি সাইন্সের স্টুডেন্ট। ‘
‘ওহ, আমি তো ভুলেই গেছিলাম। ‘
রোদসী শহরের দিকে তীর্যক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
‘আপনি কোথায় ছিলেন আজকে? ‘
‘আমার আরেকটা বউয়ের কাছে? ‘
‘মজা বন্ধ করুন। ‘
‘তোমার কেনো মনে হচ্ছে আমি মজা করছি? সত্যিও তো হতে পারে। ‘
‘আমি আপনাকে বিশ্বাস করি। ‘
শহর আরও কিছু বলতে নিয়ে থমকে গেলো। রোদসীর মুখের দিকে তাকিয়ে ধীর কন্ঠে বলল,
‘এতোটা বিশ্বাস করো? ‘
রোদসী মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দিলো। লজ্জায় মাথা তুলতে পারলো না। শহর উঠে বসে ছিলো। এবার রোদসীর দিকে ঝুঁকে ফিসফিস করে বলল,
‘ভালোবাসো? ‘
রোদসী আমতা আমতা করে উঠতেই শহর চলে যেতে নিলো। রোদসী তাঁর হাত আঁকড়ে ধরে বলল,
‘ভালোবাসি। ‘
শহর বিস্মিত হয়ে তাকালো। বিশ্বাস করতে পারলো না। আনন্দে চোখে জলের কণা ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়লো। রোদসীকে এক টানে বুকে এনে নিলো। চোখ বন্ধ করে বলল,
মিষ্টি রাতও থমকে গেছে,
তোমার অপেক্ষায়।
আলোক শিখায় আধার ছেয়ে,
তোমার প্রতীক্ষায়।
রাতের বাতি জ্বলছে না আজ,
তুমি আসবে বলে তাই।
আমার দিবস গেছে রঙিন হয়ে,
তোমার প্রেমের ছোঁয়ায়।
(রোদি)
চলবে-
“মেঘভেলায় প্রেমচিঠি ”
২৯.
‘প্রেম’ হলো ভীষণ আকর্ষণীয় একটি শব্দ। প্রতিটি মানুষের জীবনে প্রেম আসার সময়টি যেমন সুন্দর । তেমন সেই প্রেমময়ী মানুষটাকে নিজের করে পাওয়ার সময়টাও নেহাৎ কম অনুভূতিপূর্ণ নয়। সদ্য প্রস্ফুটিত
ফুলের ন্যায় স্বচ্ছ মিষ্টি এক ঘ্রাণ তখন সর্বক্ষণ আশেপাশে বিচরণ করে বেরায়। অপর মানুষটার কথা স্মরণ করে কখনো কখনো লজ্জায় নেতিয়ে পড়া বা হুটহাট হেসে ফেলা। অপর প্রান্তের মানুষটাকে দেখার আকুল তৃষ্ণা। সেই আকস্মিক প্রমময় বর্ষণে কাটছে রোদসীর দিনকাল। প্রেম কিংবা ভালোবাসার স্পর্শ এমন নিভৃতে তাকে গভীর ভাবে ছুঁয়ে দেবে তা কল্পনাকেও করেনি রোদসী। বিয়ের আগের জীবন কেটেছে হৈ হুল্লোড়ে। তারপর এক বিষাক্ত থাবায় ভালোবাসার উপর থেকে বিশ্বাস চলে গিয়েছিলো।
শহর সেই ফ্যাকাশে ফুলে সুবাস এনেছে। রোদসীর এখনো মনে পড়ে, এইতো সেই দিন জানলার কাচ ভেঙে ফেলায় রোদসী কত চিল্লাচিল্লিই না করেছে! শহর নামক দূরন্ত দামাল ছেলেটা প্রতিত্তরে শুধুই হাসতো। সেই অসহ্যকর ব্যাক্তিটার প্রেমে রোদসী এমন করে পা পিছলে পড়বে তা ভাবেনি৷
এসব ভেবে ফিক করে হেসে উঠলো রোদসী। পাশ থেকে রুমা চমকে তাকালো ওর দিকে। রোদসীর কপালে হাত দিয়ে বলল,
‘কী হয়েছে মা? শরীর টরীর খারাপ করলো নাকি? ‘
রোদসী লজ্জা পেয়ে মাথা নাড়িয়ে ‘না ‘ জানালো। ধ্যাত! ছোট মা কী মনে করলো! রোদসী রান্নাঘর থেকে বের হয়ে গেলো। সব রান্না মোটামুটি শেষ।
ঘরে গিয়ে সব ঠিকঠাক গুছিয়ে গোসলখানায় গেলো।
আজ রান্না করতে গিয়ে অনেকটাই দেরি হয়ে গেছে।
কাল রাতে ছাঁদে থেকে আসার পর ঘুমাতেও অনেক দেরি হয়ে গেছিলো। রোদসী সকাল বেলা উঠে শহরকে জাগিয়ে দিয়েছিলো ঠিকই। কিন্তু অলস শহর তার ঝুলিতে এতোদিনের জমানো রোম্যান্টিক দুষ্টুমি গুলো একে একে বেচারির উপর প্রয়োগ করা শুরু করলো। অতঃপর রোদসীও সেসময় ঘুমিয়ে গেছিলো। তারপর উঠে দেখলো পাশের জায়গাটা খালি। চোখ কচলে এদিকে ওদিকে তাকিয়ে দেখলো অনেক বেলা হয়েছে। এরপর কাজকর্ম করতে করতে অনেকটা সময় পার হয়েছে। বাসায় বসে বসে হাতের কাজগুলো শেষ করে নিলো। সেগুলোর পর বই পড়ে, তিতুসের সঙ্গে গল্প করতে বসলো। তিতুসটা আজকাল অনেক রকম ডাক শিখেছে। আগে শুধু রোদি ডাকলেও এখন শহরের নামও ডাকে। রাত ঘনিয়ে এসেছে। কথা বলতে বলতে রোদসীর মনে হলো কে যেনো তার কানে ফু দিচ্ছে। পেছনে তাকিয়ে অবাক হয়ে গেলো। এতো তাড়াতাড়ি শহর চলে আসলো! শহর পেছন থেকে রোদসীর গলা জড়িয়ে কাঁধে মাথা রাখলো। গালে অঁধর স্পর্শ করে দিতেই রোদসী বলল,
‘আজ এতো তাড়াতাড়ি এলেন জনাব! ‘
শহর একগাল হেসে বলল,
‘ সুন্দর বউ রেখে এতোক্ষণ অফিসে থাকতে ইচ্ছে করে না। ‘
রোদসী মুখ ভেংচি কেটে বলল,
‘ওহ, তো এতোদিন কী আমি বউ ছিলাম না? নাকি হঠাৎ করেই আমার রূপ গজিয়েছে! কালকেও দেরি করে কাঁদিয়েছেন, ভুলিনি কিন্তু। ‘
শহর রোদসীর কোলে মাথা রেখে শুয়ে পড়লো। রোদসীর হাতটা টেনে বুকে চেপে বলল,
‘আমার লম্বা বউটা আগে থেকেই সুন্দরী। শুধু এতোদিন আমার প্রেমে পড়েনি। তাই ফর্মালিটি মেইনটেইন করছিলাম। ‘
রোদসী আড়চোখে তাকিয়ে বলল,
‘কে বলল আমি প্রেমে পড়েছি?’
‘তোমার হ্যান্ডসাম বরটা বলল। ‘
‘তার কথায় বিশ্বাস করবেন না, সে এক নাম্বারের ফাঁপরবাজ। ‘
‘এ্যা! এই তুমি কী বললে! ‘
রোদসী ঠোঁট চেপে হাসতে হাসতে পেট চেপে ধরলো।
শহর মুখ ফুলিয়ে নিলো। রোদসী কানে হাত দিয়ে সরি বললো। কিন্তু শহর অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে রাখলো।
রোদসী কাতুকুতু দিতেই শহর হাসতে হাসতে রোদসীকে নিয়ে গড়িয়ে পড়লো। শহর হাসি বন্ধ করে রোদসীর দিকে তাকিয়ে রইলো। রোদসী তখনও খিলখিল করে হাসছে ৷ তবে তা বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। এর মধ্যেই শহরের আক্রমণ হলো তার ওষ্ঠে। রোদসী ছটফট করে ছাড়ানোর চেষ্টা করতেই শহরের পুরুষালি হাত তাঁকে শক্ত করে চেপে রাখলো। শহর মিনিট দুয়েক পর সরে আসতেই, শহরের অস্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে লজ্জায় লাল হয়ে গেলো রোদসী।
দুজনের দৃষ্টিতে যখন প্রেমময় শব্দের বিনিময় হচ্ছে তখন তিতুস চেচিয়ে উঠলো। চমকে উঠলো রোদসী। তৎক্ষনাৎ খেয়াল হলো তারা দু’জনেই বারান্দার মেঝেতে শুয়ে আছে। শহরের থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে শাড়ির আঁচল ঠিক করে নিলো। শহর দুষ্ট হাসি দিয়ে বলল,
‘তিতুসের আমাদের রোম্যান্স দেখে হিংসা হচ্ছে বুঝেছো রোদচশমা! আজ ওর একটা ব্যবস্থা নিয়েই এসেছি। ‘
রোদসী ভ্রু কুচকে বলল,
‘কী ব্যবস্থা? ‘
শহর উঠে ঘর থেকে একটা বড় খাঁচা নিয়ে আসলো। রোদসী হা করে তাকিয়ে রইলো। খাঁচার ভেতরে একটা
লাল সবুজ রঙের টিয়া পাখি। রোদসী খুশিতে আটখানা হয়ে বলল,
‘এতো সুন্দর টিয়া পাখি আপনি কোথায় পেলেন শহর?’
শহর খাঁচার দিক থেকে মুখ তুলে বলল,
‘কিনে এনেছি। ভাবলাম, শীতের মাঝে ব্যাচলর ছেলেরা বউ ছাড়া যেমন কষ্ট করে তেমন বেচারা তিতুসও করে। তিতুসটা আমাকে আর তোমাকে সাথে দেখলে কেমন ডিস্টার্ব করে! তাই ওর জন্য একটা সঙ্গী নিয়ে এসেছি। এটা কথা বলতে পারে না। তবে একসঙ্গে থাকতে থাকতে শিখে যাবে। ‘
রোদসী খুশিমনে হাসলো। শহর পাখিটার দিকে তাকিয়ে বলল,
‘রোদচশমা, এবার ওর একটা সুন্দর নাম দাও তো। ‘
রোদসী ভাবুক গলায় বলল,
‘নাম? ‘
‘হুম। ‘
‘উমম,পেয়েছি তিতুসের সঙ্গে মিলিয়ে নাম রাখবো তিতিয়া। ‘
‘বাহ! বেশ হয়েছে। চলো এবার ওদের বিয়েটা পড়িয়ে দেই। ‘
রোদসী অবাক চোখে তাকিয়ে বলল,
‘ওদের বিয়ে? ‘
‘হ্যা, তো কুমারী একটা পাখিকে বিয়ে ছাড়াই ছেলের সঙ্গে রাখবো নাকি!’
‘হাহা, আচ্ছা ঠিকাছে। আমি ছেলেপক্ষ, আপনি মেয়ে পক্ষ। ‘
রোদসী হেসে তিতুসের দিকে তাকিয়ে বলল,
‘এই তিতুস রাজী থাকলে বল, কবুল। ‘
তিতুস কী বুঝলো কে জানে, সে নিজের স্বভাব অনুসারে এক কথা তিনবার বলে। তাই কবুলও তিনবার বলল। রোদসী হেসে বলল,
‘বজ্জাত বেহায়া পাখি,একবার বলতে বললাম তার আগেই তিনবার বলে ফেললো! ‘
শহর প্রতিত্তোরে সশব্দে হাসলো। এবার তিতিয়াকে নিয়ে বিড়ম্বনা সৃষ্টি হলো। তিতিয়া তো কথা বলতে পারেনা৷ তাই শহর ওকে কবুল বলতে বললে ও কবুল না বলে পিটপিট করে তাকিয়ে রইলো। শহর ওকে এবার বলল,
‘তিতিয়া বলো কবুল। ‘
তিতিয়া মাথা নাড়িয়ে কিছু একটা বলল খকখক করে। সেটাকেই ওরা কবুল বলে ধরে নিলো। তিতিয়াকে বের করে তিতুসের খাঁচার ভেতর ছেড়ে দিলো। তিতুস প্রথমে বড়সড় চোখে তাকিয়ে থাকলো৷ মেয়ে পাখিটা অর্থাৎ তিতিয়া পাশে পাখা গুটিয়ে বসে রইলো। রোদসী ওদেরকে দেখে ভীষণ মজা পাচ্ছিলো। শহর ওকে পেছনে থেকে জড়িয়ে ধরে বলল,
‘চলো জান, ওদেরকে একা ছেড়ে দাও। আস্তে আস্তে মিলেমিশে যাবে। ‘
রোদসীকে টেনে তুলে রুমে নিয়ে গেলো। রোদসীর শহরের হাবভাব দেখেই মতলব বুঝতে বাকি রইলো না। শহরের মুখের দুষ্ট হাসি দেখেই বিপদ টের পেয়ে গেলো। তাই বাহানা দিয়ে চলে যেতে নিলো। কিন্তু শহর তার আগেই কায়দা করে টেনে ধরলো। রোদসী মুখ তুলে তাকাতেই শহর এক আঙুল দিয়ে রোদসীর চোখের উপর পড়ে থাকা এলোমেলো চুল গুলো একপাশে কানের পিঠে গুঁজে দিলো। রোদসী চোখ বুজতেই শহর রোদসীর দিকে ঝুঁকে ফিসফিস করে বলল,
‘আমি যদি তোমাকে আজ একটু বেশি বেশি ভালোবাসি, তুমি কী রাগ করবে? ‘
রোদসী লজ্জায় মুখ নত করে রাখলো। শহরের শার্টটা খামচে ধরতেই হাসলো শহর। নিরবতাকে সম্মতি মনে করেই কোলে তুলে নিলো। রোদসী তখন লজ্জাবতী গাছের ন্যায় গুটিয়ে আছে। শহরের চঞ্চলে হাতের স্পর্শে আগুনের ন্যায় জ্বলে উঠলো রোদসী।
প্রেমময়ী স্পর্শের ভয়াবহ তাপে নতুন এক মানুষকে আবিষ্কার করলো ।
ঝলমলে সোনালী সূর্যের মিহি রোদ এসে ঘরের দুয়ারে হাজিরা দিচ্ছে। চোখ মুখ কুঁচকে ঘুম ভেঙে উঠলো রোদসী। তবে, শহর আজকে বিছানায় নেই। সাত সকালেই অফিসের জরুরি ফোন কলে ছুটে গেছে। কিন্তু, যাওয়ার আগে রোদসীর ললাটে গাঢ় ভাবে অঁধর ছুঁয়ে দিতে ভুলেনি। লাজুক হাসি ফুটিয়ে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় রোদসী। আয়নার দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুচকে আসে। সাদা একটা কাগজ আয়নার ঠিক মাঝখানে লাগানো। রোদসীর বুঝতে বাকি থাকে না, কাজটা শহরের। দ্রুত গিয়ে কাগজটা নিয়ে খুলেই দেখে,
‘আমার রোদচশমা,
প্রিয় বললাম না রাগ করোনা কিন্তু বউ। তুমি আমার জন্য প্রিয়র চেয়েও উর্ধ্বে। তুমি আমার আর জন্য কী তা আমি মুখে বলে হয়তো কখনোই বুঝাতে পারবো না। তবে বলি, তুমি আমার জীবনের প্রথম রমনী যাকে আমি আমার হৃদয় সমর্পণ করেছি। কিন্তু আমি কোনো গম্ভীর, রাগী মেয়ের প্রেমে পড়িনি। পড়েছিলাম, এক দুই বেণী করে লাফাতে লাফাতে স্কুল যাতায়াত করা হাসিভর্তি মেয়েটার। মেয়েটা যখন বাচ্চাদের মতো লাফিয়ে স্কুলে যেতো তখন রোদের তীব্র বর্ষণে মেয়েটাকে দেখলে একটা নামই মাথায় আসতো ‘রৌদ্রানী’। হুম, আমার রৌদ্রানী। প্রতি দিন আমি লুকিয়ে লুকিয়ে সেই মেয়েটার বাড়ির পাশে আড্ডা দিতাম। কখনো সামনে গিয়ে বলিনি আমার মনের কথা। কতটা ভালোবেসে ফেলেছি আমি তাঁকে। দীর্ঘ দুইটি বছর তার আড়ালেই দেখে গিয়েছি। বাচ্চা মেয়েটা কী করে বুঝবে সে আমার হৃদয়ে কতটা আগুন লাগিয়েছে! এক অলিখিত অভ্যাস গড়ে উঠলো আমার তাকে দেখা। হুট করেই একদিনের পর মেয়েটা নিখোঁজ হয়ে গেলো। আশেপাশের মানুষদের কাছে পুরো ঘটনা জানলাম। থমকে গেলাম আমি, আমার ফুলের মতো রৌদ্রানীকে কেউ এতোটা আঘাত করেছে শুনে দুনিয়াই অন্ধকার হয়ে গেলো। মেয়েটা দীর্ঘ সময় মামার বাড়িতে চলে গেলো। আমি সেই ঠিকানা না পেয়ে মেয়েটার বাড়ির দরজার সামনে দাঁড়িয়ে রইলাম। দিন কাটলো, কেটে গেলো এক বছর। আমি তখনও পথচেয়ে রই। আমার রৌদ্রানী আসবে, আমার বিশ্বাস। আসলো, তবে তখন সে আর চঞ্চলে আদুরিনী নেই। চোখে চশমা এঁটে রাখা এক গম্ভীর রমনী। যাকে পায় চোখের সামনে তাঁকেই নাকি ঝেড়ে দেয়। কী সাংঘাতিক! এই রৌদ্রানীকে আমি কী করে সামলাবো! একে তো আর কোনো কিশোরীর মতো করে প্রেমিকা হওয়ার প্রস্তাব দিতে পারিনা। সেই চেনা সরল রৌদ্রানী তো আর এটা নয়। একে দেখলে যে আমার নিজেরই গলা শুকিয়ে আসে। ভাগ্য সুপ্রসন্ন ছিলো, আমার রাগী রৌদ্রানী রোদচশমা রূপে আমারই বাড়িতে চলে আসলো। বিয়েও হলো। বিশ্বাস করো রৌদ্রানী, আমি এখনো বিশ্বাস করতে পারিনা তুমি এখন আমার। তুমি যখন সেদিন কেঁদে বললে, আমি ঠকেছি তোমাকে বিয়ে করে। তাহলে আমি বলি, তুমি ধর্ষণ হয়েছো জেনেই আমি তোমাকে বিয়ে করেছি। এই খবরই আমি পেয়ে ছিলাম। তুমি যখন বললে, তুমি ধর্ষণ হওনি তখনও কিন্তু আমার মনোভাব পরিবর্তন হয়নি। আমি তোমাকে আগে যেভাবে ভালোবেসে গিয়েছি এখনও তেমন করেই ভালোবাসি।
তুমি যখন কোমরে আঁচল গুঁজে চোখের সামনে ঘুরঘুর করো, তখনও আমি বিশ্বাস করতে পারিনা সেই দুই বিনুনি করা মেয়েটা এখন আমার ঘরে, আমার চোখের সামনে। আমার চোখে আমি যে কল্পনার রাজ্য সাজিয়েছিলাম, সেটা যে এভাবে বাস্তবায়ণ হবে আমি ভাবিনি।
তুমি যেমন তুমি তেমনই ভীষণ সুন্দর। তোমাকে আমি সব ভাবেই ভালোবাসি। তোমার সবরূপেই আমি মুগ্ধ হই। তুমি যেমনই হও, শুধু আমার হয়ে থেকো। আমি তোমাকে রোজ লিখবো মেঘভেলায় প্রেমচিঠি। ‘
চলবে-