মেঘ ভাঙ্গা রোদ্দুর পর্ব-২৯+৩০

0
770

#মেঘ_ভাঙ্গা_রোদ্দুর। [২৯]

– আপনি এসব কি বলছেন রাহনাফ। কেউ কেন আমাকে মারতে যাবে! আমি তো কারো কোন ক্ষতি করিনি। তাহলে কেন আমাকে কেউ মারতে চাইবে। আপনার কোথাও ভুল হচ্চে না তো।

কথাগুলো বলে রাহনাফের দিকে অসহায় চোখে তাকিয়ে রইলো মেহের। ওর বিশ্বাসই হচ্ছে না কেউ সুপারি দিয়ে ওকে খুন করতে চাইছে। বিষয়টা রাহনাফের মাথায় আসতেই রাহনাফ যখন মেহেরকে প্রশ্ন করে, ও এমন কাউকে চিনে কি না যে ওকে প্রাণে মেরে ফেলতে পারে। তখন মেহের খুব অবাক হয়। আর প্রশ্ন করে “আমাকে কেউ কেন মারতে চাইবে? প্রতিউত্তরে রাহনাফ বলে,

– রাস্তায় আপনার সাথে যেটা হয়েছে সেটা প্ল্যান মাফিক সাজিয়ে গুছিয়ে করা হয়েছে। তাছাড়া আপনার পেটের ক্ষত বলে দিচ্ছে কেউ আপনাকে মারতে চায়।

রাহনাফের মুখে এমন কথা শুনে অবাক হয়ে মেহের উপরের কথাগুলো বলে। রাহনাফ মেহেরের এক হাত তার নিজের মুঠিবদ্ধ করে অন্যহাত রাখে মেহেরের গালে। অতঃপর বলে,

– আমি জানি লেখিকা সাহেবা আপনি কারো ক্ষতি করতে পারেন। এটা আপনাকে দ্বারা সম্ভবও নয়। কিন্তু কি বলুন তো! আমাদের দৃষ্টির অগোচরেই অনেক শত্রুর জন্মহয়। না আমারা তাকে চিনি আর না তাকে জানি। তবে তারা আমাদের সামনে আসে শত্রু হয়ে। হতে পারে আপনি অজান্তেই তাদের কোন কিছুতে আঘাত করেছেন। অথবা হতেই পারে আপনার কোন কাজের জন্যে তাদের কাজে ক্ষতি হয়েছে। কিংবা এটাও হতে পারে আপনি তাদের পথের কটা। আপনার কারনে তাদের অসুবিধা হচ্চে। তাদের পথে কটা হয়ে আছেন আপনি। যেটা তারা উপড়ে ফেলতে পারে। দেখুন লেখিকা সাহেবা আপনার পেটের ক্ষতটা দেখুন। পেট বরাবর সোজা নিচের দিকে, কোথাও কিন্তু আচরের দাগ নেই। মানে হলো সে জানতো যে আপনাকে সে আঘাত করবে। আর যদি এটা অনিচ্ছাকৃত ভাবে হত তাহলে ক্ষতটা হত এবড়োখেবড়ো। মানে ছুড়িটা নিচের দিকে না গিয়ে সেটা আপনার পেটের বিভিন্ন অংশে লেগে যেত। যেহেতু সেখানে অনেক ভীড় ছিলো। কিন্তু সেটা হয়নি। ছুড়িটা সোজা আপনার পেটের ভিতরে ডুকে পরেছে। তাছাড়া ছুড়িতে কারো ফিঙ্গারপ্রিন্ট ও পাওয়া যায়নি। তার মানে কি! কেউ প্ল্যান করে করেছে এই কাজ।

রাহনাফের মুখের দিকে তাকিয়ে কথাগুলো শুনছিলো আর অবাক হচ্ছিলো মেহের। রাহনাফের কথা শেষ হতে না হতেই মেহেরের চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে পড়তো। কিন্তু সেটা মাটি অব্ধি পরেনি। গাল বেয়ে অশ্রু পড়তেই রাহনাফ সেটা নিজের হাতে মুছে দেয়। মেহের এখনো বিশ্বাস করতে পারছে না তাকে কেউ মেরে ফেলতে চায়। তার এমনও শত্রু আছে। কথাটা যতবার তার মনে পড়তে ততবারই বুক ভেঙে কান্না আসছে। মনটা তার এমনও বলছে, তাহলে সে বেঁচে উঠলো কেন! কারো গলার কাঁটা হয়ে তাকে বেঁচে থাকতে হবে এটা ভাবলেই কষ্ট হচ্চে তার। মেহের যতবার তার চোখ থেকে জল ফেলছে রাহনাফ ততবারই সেটা মুছে দিচ্চে আর তার হাতের বৃদ্ধা আঙ্গুল দিয়ে মেহেরের গালে স্লাইড করছে। রাহনাফ মেহেরের গালে করতে করতে বলল,

– এই চোখের জলের মূল্য অনেক। এভাবে এটাকে বিসর্জন দিবেন না লেখিকা সাহেবা। কার জন্যে চোখের জল ফেলছেন আপনি! যাকে আপনি চিনেন-ই না। কেন নিজের চোখের জল এভাবে নষ্ট করছেন। আপনি জানেন আপনার চোখের একফোঁটা জলের মূল্য আমার কাছে ঠিল কতটা! আপনার চোখের জল মুছার জন্যে আমি আমার জিবনটাও বাজি রাখতে পারি। প্লিজ লেখিকা সাহেবা এভাবে কাঁদবেন না। আমি সহ্য করতে পারি না। এভাবে পুড়াবেন না আমায়। রাহনাফের জড়ানো কন্ঠ।

মেহের এবার কেঁদেই দিলো। সে ফুফিয়ে কাঁদছে। রাহনাফ কিছু বলতে পারছে না। মেহেরের কান্না দেখে তার চোখেও অশ্রুর ভীড় জমেছে। অশ্রুসিক্ত নয়নে মেহের দিকে তাকিয়ে আছে সে। মেহের রাহনাফের হাত শক্তকরে জড়িয়ে ধরে কান্নামিশ্রত কন্ঠে বলে উঠে,

– আমি কার কি ক্ষতি করেছি। কেন কেউ আমাকে মারতে চায়। আমি কারো প্রাণের শত্রু কথাটা ভাবতেই কষ্ট হচ্চে আমার। মরে যেতে ইচ্ছে করছে আমার।

রাহনাফ আর চুপটি করে থাকতে পারলো না। সে মেহেরকে তার বুকে চেপে ধরলো। দু-হাতে মেহেরকে আগলে ধরে বলতে লাগলো,

– এভাবে কেন ভাবছেন লেখিকা সাহেবা। এমনও তো হতে পারে সে কোন খারাপ কাজ করতে চাইছে আর আপনার কারনে সেটা সে করতে পারছে না। তাই তারা আপনাকে মারতে চায়। আপনি এভাবে ভেঙে না পরে রুখে দাঁড়ান। দেখুন কে সেই লোক। যে আপনাকে মারতে চায়। আপনি তো কোন অন্যায় করেন নি তাহলে এত দুর্বল কেন হচ্চেন আপনি। ঘুরে দাঁড়ান।সত্যিটা জানুন খুজুন। আমরা সবাই আছি তো আপনার পাশে। কথাগুলো বলেই মেহেরের মাথায় আলতো করে চুমু খায় রাহনাফ। অতঃপর বলে,

– আমি আছি তো আপনার পাশে। আর কোন আঘাত আপনাকে হানতে পারবে না। সবসময় ছায়া হয়ে পাশে থাকবো।

মেহের কোন কথা বলে না। দু-হাতে রাহনাফের টিশার্ট খামচে ধরে নিরবে অশ্রু বিসর্জন দিচ্চে।

৩৯,
ড্রয়িংরুমে পা রাখতেই রাহি দেখতে পায় তার মা এখনো তার জন্যে জেগে বসে আছে। ড্রয়িংরুমে সুফায় বসে পায়ের উপর পা রেখে টেলিভিশন দেখছে। একমাত্র মেয়ে এত রাত অব্ধি বাড়ির বাহিরে আছে তবুও চিন্তার লেশ মাত্র নেই আফিয়া আহমেদের মধ্যে। অতি আনন্দের সহিত টেলিভিশনে সাউথ ইন্ডিয়ান মুভি দেখছে। রাহি ধীর পায়ে আহিয়া আহমেদের পাশে এসে দাঁড়ায়। টেলিভিশনের দিকে চোখ পড়তেই সে দেখতে পায়, নায়িকা নায়েকের কলার চেপে ধরে কান্না করছে। নায়ক অন্যদিকে তাকিয়ে নায়িকাকে ছাড়ানোর চেষ্টা করছে। নায়কটা যত তাকে ছাড়ানোর চেষ্টা করছে নায়িকা ততই তাকে আঁকড়ে ধরছে। সুযোগ বুঝে তার কপালে একটা চুমুও খেল নায়িকা। আর এই দৃশ্যপট ঢের মনোযোগ দিয়ে দেখছে আফিয়া আহমেদ। তার চোখ কিছুটা সংকোচি। অধোরে তৃপ্তিকর হাসি। তবে সেটা বুঝা যাচ্চে না। মনোযোগ না দিয়ে দেখলে কেউ এই হাসি দেখতে পারবে না। রাহি বুঝতে পারে না এই মুভিগুলা এত মনোযোগ দিয়ে দেখার কি আছে। সে মায়েট দিকে একপলক তাকিয়ে থেকে তাকে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে যায়। তখনি আফিয়া আহমেদ ওর দিকে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়।

– এত রাত অব্ধি কোথায় ছিলে তুমি?

– হসপিটালে। চলে যেতে নেয় রাহি। কয়েক কদম সামনে এগোতেই আফিয়া আহমেদের আবার প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়,

– তোমাকে দেখে তো মনে হচ্ছে তুমি একেবারে সুস্থ। তাহলে এত রাত অব্ধি হসপিটালে কেন ছিলে?

– মেহের আপু অসুস্থ। তাকে দেখতে গিয়েছিলাম।

রাহির কথা শুনে হাত থেকে রিমোট পরে যায় আফিয়া আহমেদের। চমকে উঠে সে। চক্ষুদ্বয় কিছুটা সংকোচিত রাহির দিকে তাকায় সে। আর বলে,

– কি- কি নাম বললে তুমি?

– মেহের আপু। এত অবাক কেন হচ্ছো। মনে হচ্ছে নামটা প্রথম শুনলে।

রাহির করা প্রশ্নের কোন জবাব না দিয়ে উঠে দাঁড়ায় আফিয়া আহমেদ। সে রাহির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বলে,

– যে মেয়েটা তোমার থেকে তোমার ভলোবাসা কেড়ে নিয়েছি তুমি তাকে দেখতে গিয়েছিলে রাহি! তোমার শরীর ঠিক আছে তো? রাহি, মেহের তোমার থেকে তোমার ভালোবাসাকে কেড়ে নিয়েছে। ও তোমার শত্রু। আর শত্রুর উপর কখনো দুর্বল হতে নেই।

– এসব তুমি কি বলছো মা। মেহের আমার থেকে আমার ভালোবাসাকে কেড়ে নেয়নি। বরং আমি এমন একজনকে ভালোবেছি যে কখনোও আমাকে ভালোবাসে নি। একপক্ষ ভালেবাসা ছিলো আমার। তাহলে মেহের কি করে আমার ভালোবাসা কেড়ে নিয়েছে বল মা! আর হ্যাঁ কি যেন বললে তুমি! ওহ হ্যাঁ মেহের আমার শত্রু নয় মা, সে আমার বোন।

কথাগুলো বলেই হনহন করে নিজের রুমে চলে যায় রাহি। আফিয়া আহমেদ অবাক হয়ে তার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকে। রাহির বলা কথাটা এখনো তার কানের কাছে বেজে চলেছে। তাহলে কি রাহিও সত্যিটা জেনে গেছে। আর যদি সে সত্যিটা জেনে থাকে তাহলে সে মেহেরকে বোন হিসাবে মেনে নেয় কি করে। কথাগুলো ভাবতে ভাবতেই রাহি তার দৃষ্টির বাহিরে চলে যায়। আফিয়া আহমেদ সুফায় বসে পরে। তখন শিড়ি দিয়ে নামতে নামাতে সৈয়দ নওশাদ আহমেদ বলে,

– মা যাকে মেরে ফেলার জন্যে কিলারদের সুপারি দেয়, মেয়ে তাকে দেখতে পুরো রাতটাই হসপিটালে কাটিয়ে দেয়। ভারী অদ্ভুত!

সৈয়দ নওশাদের কথা কানে আসতেই শিড়ির দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে আফিয়া আহমেদ। সে গলার স্বর কিছুটা মোটা করে বলে উঠে,

– কি বলতে চাও তুমি?

– এই যে,রাহি মেহেরকে নিজের বোন বলে দাবী করেছে। এখন যদি সে জানতে পারে তার বোনের এই অবস্থার জন্যে দায়ী তার মা। তখন কি রাহি তোমাকে ক্ষমা করবে। কি করে দাঁড়াবে রাহির সামনে! আফিয়া তুমি বুঝতে পারছো কত বড় অন্যয় তুমি করেছো? একটা ভালো মা হতে গিয়ে খুনি হতে যাচ্ছিলে। নিজের মেয়ের কথা ভাবতে গিয়ে তুমি ভুলে গেছো মেহেরে ও কোন মায়ের সন্তান। তুমি শুধু,,,,

সৈয়দ নওশাদ তার বলা কথাগুলো শেষ করতে পারলো না তার আগেই রাহি উপর থেকে চিৎকার করে উঠলো মা বলে। রাহির চিৎকার শুনে তারা দুইজনেই উপরে তাকায়। সেখানে রাহি অগ্নিমূর্তি রুপ ধারন করে তাকিয়ে ছিলো তার মায়ের দিকে। সৈয়দ নওশাদের বলা প্রত্যেকটা কথা সে শুনে নিয়েছে। কি হবে এখন??

চলবে,,,,,,

#মেঘ_ভাঙ্গা_রোদ্দুর। [৩০]

রাহির চিৎকার শুনে সৈয়দ নওশাদ ও আফিয়া আহমেদ দুইজনেই উপরের দিকে তাকায়। উপরের তাকাতেই দুজনে বেশ অবাক হয়ে যায়। কেননা সেখানে রাহি অগ্নিমূর্তি রুপ ধারন করে আফিয়া আহমেদের দিকে তাকিয়ে চোখের জল ফেলছে। সৈয়দ নওশাদ ও আফিয়া আহমেদের কপালে ভাজ পরে যায়। রাহি কি সব শুনে নিয়েছে তাহলে! কি হবে এখন। ভাবছে সৈয়দ নওশাদ। আফিয়া আহমেদের চোখ কিছুটা সংকোচিত হয়ে যায়। সে ভীতু চোখে রাহির দিকে তাকায়। ধীর পায়ে রাহি নীচে নেমে আসে। পায়ের সাথে পা লেগে নিচে পরে যেতে নেয় রাহি। সৈয়দ নওশাদ তাকে ধরতে গেলে সে হাত উঠিয়ে তাকে আটকে দেয়। আর বলে,

– আমি নিজেকে সামলাতে জানি সৈয়দ নওশাদ আহমেদ। রাহির শক্ত কণ্ঠস্বর।

রাহির মুখে এমন কথাশুনে অবাক হয়ে নিঃপলক ওর দিকে তাকিয়ে থাকে সৈয়দ নওশাদ। এর আগে কোন দিনও রাহি তার নাম ধরে ডাকে। সৈয়দ নওশাদ রাহিকে কিছু বলবে তার আগেই সে তাকে পাশ কাটিয়ে আফিয়া আহমেদের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। তার দিকে শক্ত চোখে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ। আফিয়া আহমেদ করুন চোখে তাকিয়ে আছে রাহির মুখ পানে। অতঃপর রাহি বলে উঠে,

– এটা তুমি কেন করলে মা। আমি- কি তোমাকে একবারও বলেছি রাহনাফ কে আমার চাই। রাহনাফকে এনে দাও। তাহলে এমনটা কেন করলে তুমি মা। আজ যদি আপুর কিছু হয়ে যেত তাহলে! তাহলে কি হতো তার মা আর বোনের সেটা একবারও ভেবে দেখেছো। মাহবুবা আন্টির কথা ভেবেছো ুএকবার। আপু ছাড়া তার আর কে আছে! মা, তুমি কাজটা ঠিক করোনি। তার থেকে তুমি আমায় মেরে ফেলতে। কারন ওদের দুজনের মাঝে আমি এসেছি। তোমাকে মা বলে ডাকতে ঘৃনা হচ্ছে আমার। কান্নামিশ্রত কন্ঠ রাহির।

– রাহি,,, ধমকের সুরে বলে আফিয়া আহমেদ। বড়দের সাথে কিভাবে কথা বলতে হয় ভুলে গেছো তুমি। মুখ সামলে কথা বলো। ভুলে যেওনা আমি তোমার মা।

– আমি ভুলি নি তুমি আমার মা, তাইতো এখনো ভালো ভাবে কথা বলছি। আর যদি ভুলতে পারতাম তাহলে সবচেয়ে বেশী খুশি হতাম আমি। একটা খুনি কখনো আমার মা হতে পারে না।

রাহির মুখে খুনি শব্দটা শুনে কেপে উঠে আফিয়া আহমেদ। প্রতিধ্বনির ন্যায় বারবার শব্দটা তার কানের কাছে বাজতে থাকে। ধপ করে সুফায় বসে পরে সে। দু-হাতে মাথা চেপে ধরে বসে। কানের কাছে তখন শুধু একটা কথাই বাজতে থাকে “একটা খুনি কখনো আমার বোন হতে পারে না ” বেড়িয়ে যা আমার বাড়ি থেকে। নাহ, বিকট শব্দ করে চিৎকার করে উঠে আফিয়া আহমেদ। উঠে দাঁঠিয়ে বিড়বিড় করে বলে,

– আমি খুনি নই। আমি এমনটা করতে চাইনি। খুনি নই আমি। তারপর দৌড়ে সে উপরে চলে যায়। রাহির তার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ। তার চোখ-মুখে ঘৃনা উপচে পড়ছে। বড় করে শ্বাস ত্যাগ করে সে। অতঃপর বলে,

– ঘৃনা করি তোমাদের। তোমাদের সবাইকে ঘৃনা করি আমি। জানো মা আমার এখন খুব আফসোস হয় কেন মাহবুবা আন্টি আমায় পেটে ধরে নি। তাহলে তো তোমার মতো খুনিকে মা বলে ডাকতে হতো না।

রাহির বলা কথাগুলো শুনছিলো সৈয়দ নওশাদ। সে রাহির কথা শুনে অবাক হয়ে যায়। অবাক চোখে তার দিকে তাকিয়ে থাকে সৈয়দ নওশাদ। মাহবুবাকে মা হিসাবে চায় রাহি এটাও তার শুনতে হচ্ছে। রাহি চলে যাওয়ার জন্যে সামনের দিকে এক পা বাড়াতেই পিছন থেকে সৈয়দ নওশাদ তাকে ডেকে উঠে,

– রাহি,,

থমকে দাঁড়ায় রাহি। পিছনের দিকে ঘুরে সৈয়দ নওশাদের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তার চোখে চোখ রেখে বলে,

– কিছু বলবেন আপনি?

– এভাবে কথা বলছিস কেন মা?

রাহি তার ডান হাতটা উচু করে বলে,,

– চুপ করুন আপনি। আপনি কারো বাবা হতে পারেন না। যে নিজের সন্তানকে আগলে রাখতে পারে না। তাকে নিজের পরিচয়ে বড় করতে পারে না। সে আবার বাবা হয় কি করে। কি ভুল ছিলো মেহের আপুর। কান্নামিশ্রত কন্ঠে প্রশ্ন করে রাহি। সৈয়দ নওশাদ অবলার মতো তাকিয়ে থাকে রাহির দিকে। রাহি তো কিছু ভুল বলছে না। সত্যিই তো মেহেরের তো কোন ভুল ছিলো না। তবুও তাকে কেন আমি পিতৃস্নেহ থেকে বঞ্চিত হতে হলো। সৈয়দ নওশাদের ভাবনার মাঝেই রাহি বলে উঠে,

– আজ আপুর সাথে সেটা হয়েছে সেটার জন্যে আপনি দায়ী। প্রত্যক্ষ না হলেও পরোক্ষ ভাবে আপনিই দায়ী।সুন্দরী বউয়ের মোহে পরে অন্ধ হয়ে গেছেন আপনি সৈয়দ নওশাদ আহমেদ। আপনি জানেন আপনার বউ আমার আপুকে মেরে ফেলতে চেয়েছে তবুও আপনি তাকে বিরুদ্ধে কোন একশন নেন নি। একজন বাবা হয়ে এমনটা কি করে করতে পারেন আপনি। আসলে আপনি কারো বাবা হতে পারেন না। কারো বাবা হওয়ার যোগ্যতা নেই আপনার সৈয়দ নওশাদ আহমেদ। না ভালো বাবা হতে পরেছেন আর না হতে পরেছেন ভালো সন্তান। বউয়ের কথা শুনে নিজের মা-কে পর্যন্ত বৃদ্ধাশ্রমে রেখে এসেছেন। এমনটা করবেন না। এখনো সময় আছে নিজের ভুলগুলো শুধরে নিন। কথাগুলো বলা শেষে রাহির চোখের কোটর গড়িয়ে অশ্রু বের হয়। তবুও সে অশ্রুসিক্ত নয়নে তাকিয়ে থাকে সৈয়দ নওশাদের দিকে। একদিন এই মানুষটাকে সে সবচেয়ে বেশী ভালোবাসতো। আর আজ তাকে শুধু ঘৃনা করতে ইচ্ছে করছে। বাবা হিসাবে মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছে রাহির।

সৈয়দ নওশাদ নির্বিকায় রাহির মুখ পানে তাকিয়ে আছেন। রাহির বলা প্রতিটা কথাই ঠিক। সে ভালো বাবা হতে পারেনি। বাবা না থাকার কারনে আজও মেহেরকে নানা কথা শুনতে হয়। মেহেরের কোন দায়িত্বই সে নেয়নি। মেহের যে তার সন্তান সেটা সমাজ সমাজের মানুষ তারা কেউও জানেনা বললেই চলে। কিন্তু সে তো মেহেরকে জন্ম দিয়েছে। তাহলে সে কোথায় বাবা হতে পেরেছে। রাহুর দিকে শীতল দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে সে।

৪০,
মেহের ঘুমাচ্ছে আর ওর মাথায় বিলি কেটে দিতে দিতে ঝিমুচ্ছে রাহনাফ। মেহের কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পরে তখন রাহনাফ ওকে ঠিক করে শুইয়ে দিয়ে ওর মাথায় জাত বুলিয়ে দিতে থাকে। তারপর সে ঘুমন্ত মেহেরের মুখপানে কিছুক্ষণ অবলোকন করে কপালে নিয়ে ওষ্ঠদ্বয়ের শীতল স্পর্শ দিয়ে দেয়। রাহনাফ মেহেরের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলে উঠে,

-যত দেখি তোমায় তত লাগে ভালো,কি এমন মায়া তোমার মাঝে বল? আমিতো চাইনি প্রেমের জালে জড়াবো কভু,তোমার ভালোবাসায় মজনু হলাম তবু।মন আমার নিজের ঠিকই, কিন্তু নিয়ন্ত্রণ আর আমার হাতে নেই,তোমার সৌন্দর্যের সম্মোহনী শক্তির বলে,
আষ্টেপৃষ্টে আমায় জড়ালে!দু চোখ শুধু তোমায় খুঁজে, মন চায় তোমায় পেতে, শুধু এ জীবনে নয়, মরণের পরেও চাই তোমায়।

ঝিমুতে ঝিমুতে পরে যেতে নেয় রাহনাফ তখনি সে চমকে উঠে। আশপাশ একপলক তাকিয়ে আবারও সামনে তাকায় সে। মেহের এখনো গভীর ঘুমে নিমজ্জিত। রাহনাফের এক হাত জড়িয়ে আরাম করে ঘুমিয়ে আছে মেয়েটা। নাকটা হালকা ফুলিয়ে কি সুন্দর করে শ্বাস নিচ্ছে মেহের। ঘুমন্ত মেহেরকে আজ একটু বেশীই আকর্ষণীয় লাগছে। ইচ্ছে করছে মেহেরের অধোরের নিচে থাকা ওই বাদামি তিলটাতে অধোর ছুঁইয়ে দিতে। কিন্তু ইচ্ছে থাকলেও তো সে সম্ভব নয়। সে নিজের চোখটা নামিয়ে নিচের দিকে নিক্ষেপ করলো।

সেদিনের পর আজ প্রায় সপ্তাহ খনেক কেটে গেছে। রাহি নিজেকে তার ঘরে বন্ধি করে রেখেছে। বাসা থেকে বের হচ্ছে না সে। এমনকি মেহেরকে দেখতেও পর্যন্ত আসেনি। দুদিন আগে মেহেরকে হসপিটাল থেকে বাসায় নিয়ে আসা হয়েছে। রাহনাফ রোজ বিকালে মেহেরকে দেখতে আসে। সৈয়দা মাহবুবার রাহনাফকে খুব পছন্দ হয়েছে। তিনি মনে মনে এমন একটা ছেলেকেই তো চেয়েছেন মেহেরের জন্যে।যে মেহেরকে ভালোবাসবে যত্ন নিবে ভরসা হয়ে ওর পাশে থাকবে। রাহনাফকে দেখে তার মনে হয়ে এটাই যেন মেহেরের জন্যে যোগ্য পাত্র। তিনি মনেমনে ঠিক করে ফেলেছেন মেহেরের বিয়েটা রাহনাফের সাথেই দিবেন।

রাহির মেহেরদের বাড়িতে আসছে না দেখে বেশ অবাক হচ্ছে মেহের সহ পরিবারের বাকি সবাই। সৈয়দা মাহবুবা তো আজ সকালে বলেই ফেলছেন, রাহি কেন আসছে না তার খোজ নিতে। মেয়েটার শরীর ঠিক আছে। মায়ের কথা শুনে মৃদু হাসে মেহের। মনে মনে বলে,

– তুমিও না মা পারোও বটে। রাহিকি আর রোজ আমাদের এখানে আসবে। অট্টোলিকার মানুষ ও। বিলাসিতায় বড় হয়েছে। ওর মন যখন যা বলে তাই করে।ও কি আর আমাদের সাথে এই চিলেকোঠায় মিশতে পারে। আবেগের বসে দুদিন এসেছে এটাই অনেক।

রাহিকে কয়েকবার কল করে আলিহান। প্রতিবারই ওর মোবাইল বন্ধ দেখাচ্ছে তাই বাধ্যে হয়ে নিজের জেদ ভেঙে ওদের বাড়িতে পা রাখে সে। নিজের জন্যে না হলেও রাহির জন্যে আবার সৈয়দ আহমেদ বাড়ির দরজায় পা রাখে আলিহান।

চলবে,,,,,

#মাহফুজা_আফরিন_শিখা।