মেঘ ভাঙ্গা রোদ্দুর পর্ব-৩১+৩২

0
745

#মেঘ_ভাঙ্গা_রোদ্দুর। [৩১]

দু-হাতে মাথা চেপে ধরে বিছানার উপর বসে আছে রাহি। ওর পাশেই বসে আলিহান অধোর কামড়াচ্ছে আর চোখ মিটমিট করছে। ওর ভাবতেই অবাক লাগছে আফিয়া আহমেদ এমন একটা কাজ করেছে। আর সৈয়দ নওশাদ সবটা জেনেও তাকে এ বাড়িতে তাকতে দিয়েছে। তার বিরুদ্ধে লিগালি কোন একশন নিচ্ছে না। আফিয়া আহমেদ যা করেছে তার জন্যে তাকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া উচিৎ। অথচ সৈয়দ নওশাদ সব জেনেও চুপ করে আছে। এই তার পিতৃত্ব। আলিহান কি করে মেহেরের সামনে সত্যিটা তুলে ধরবে। মেহের যদি সবটা জানতে পারে তাহলে কষ্ট পাবে অনেক। তার থেকেও বেশী কষ্ট পাবে তার ছোটমনি। যে অতীত কে ছেড়ে চলে এসেছে সেই অতীত যদি আবার বর্তমান হয়ে আসে তাহলে যেন অতীতের সেই শুকিয়ে যাওয়া ক্ষতটা আবার তাজা হয়ে উঠে। সৈয়দা মাহবুবা অনেক কষ্ট করে এতদূর এসেছে। একা পরিশ্রম করে মেহেরকে বড় করে তুলেছে। অনেক কষ্টে সে তার অতীত ভূলে বর্তমানে একটা সুন্দর জিবন পেয়েছে। মেহের আর মৌ-এর মতো দুটো মেয়ে আছে। তাদের একসাথে দেখলে মনে হয় এটা যেন স্বর্গের দ্বীপ। সেখানে আছে সুখ আনন্দ হাসি। আলিহান চায়না সৈয়দা মাহবুবার এই সুখের স্বর্গে নওশাদের মতো হৃদকালো মানুষের নজর না পরে। মেহের ও তার ছোটমনির উপর যেন সৈয়দ নওশাদের কোন ছায়াও না পরে। তাই সে পারবে না, না আলিহান পরবে না তার ছোটমনিকে আবার কষ্ট দিতে। কাপাকাপা হাতে রাহির মাথায় হাত রাখে আলিহান। রাহি মাথা তুলে সামনের দিকে তাকায়। রাহির চোখ দেখে আতকে উঠে আলিহান। কেমন ভিতী চোখ তার। এই চোখে আছে শুধু অনুতাপের ছোয়া। আলিহান রাহিকে তার বুকে জড়িয়ে নেয়। রাহি আলিহানের শার্টের কলার চেপে ধরে বলে,

– আমাকে তোমার সাথে নিয়ে চল ভাইয়া। আমি এই অমানুষগুলোর সাথে আর থাকতে চাই না।

আলিহান রাহির মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে আর উপরের দিকে তাকিয়ে ঘনঘন শ্বাস ত্যাগ করছে। রাহি আবারও বলে উঠে,

– আমাকে তোমার সাথে নিয়ে চল ভাইয়া।

আলিহানের হাত থেমে যায় এই ভেবে যে আজ প্রথমবার রাহি তার কাছে কিছু চাইছে আর সেটা আলিহান তাকে দিতে পারবে না। আলিহান যতই দূরেই থাকুক, যতই যে তার চাচার সাথে সম্পর্ক ত্যাগ করুক না কেন? এতে তো আর সম্পর্ক শেষ হয়ে যায় না। রাহি যে ওর বোন। আর বোনের আবদার পূরণ করতে না পারার কষ্ট শুধু একজন ব্যার্থ ভাই-ই জানে। আলিহান রাহিকে সোজা করে বসিয়ে দিয়ে ওর এক হাত নিজের হাতের মুষ্ঠিতে আবদ্ধ করে নেয়। তারপর সে রাহির মুখের দিকে তাকায়। রাহির তখনো নিচের দিকে তাকিয়ে ছিলো। আলিহান রাহির হাতটা আরো শক্তকরে চেপে ধরে বলে,

– আমার দিকে তাকা। আমার চোখের দিকে তাকা রাহি।

রাহি মাথা তুলে আলিহানের চোখের দিকে তার দৃষ্টি নিক্ষেপ করে। অতঃপর আলিহান বলে উঠে,

– এ বাড়ি ছেড়ে তুই কোথায় যাবি পাগলী। এ বাড়ি তোর। তুই এই বাড়ির রাজকন্যা। তুই চলে গেলে যে এই বাড়ির প্রাণটাও চলে যাবে রে রাহি।

– কিন্তু আমি ওই মানুষগুলোর সাথে এ বাড়িতে থাকতে পারবো না ভাইয়া। ওরা কেউই মানুষ নয়। ওরা দেখতে মানুষের মতো ঠিক-ই কিন্তু ওরা আসলে জন্তু জানোয়ার। না-হলে মেহের আপুর মতো এমন ফুটফুটে সুন্দর মেয়েকে মেরে ফেলার কথা ভাবতে পারতো না। কান্নামিশ্রত কন্ঠ রাহির।

– আমি তোর কষ্টটা ফিল করতে পারছি রাহি। কারন আমিও একদিন এই পরিস্থিতির স্বীকার হয়েছি। সেদিন আমি এ বাড়ি ছেড়ে চলে গেছি কিন্তু তুই যাবি না। দেখ ছোট চাচা তোকে সবচেয়ে বেশী ভালোবাসে। তোর সব কথাই সে শুনে। একমাত্র তুই-ই পারিস ওদের সঠিক পথে আনতে। ওদের সব ভুল শুধরে দিতে পারিস। দেখ তুই ওদের সন্তান। তোকে ছোট থেকে বড় করেছে তারা। তোর কথা নিশ্চয় শুনবে। একটা সন্তান হিসাবে এটা তোর দায়িত্বের মধ্যে পরে। ইসলাম যেমন পিতামাতার সব কথা মেনে চলার নির্দেশ দিয়েছে তেমনি পিতামাতা যদি কোন পাপ কাজ করতে বলে সেটা অমান্য করার ও নির্দেশ দিয়েছে। তবে সেটা তাদের কষ্ট দিয়ে নয়। বরং তাদের সাথে সদ্যব্যবহার করে। এটাও আল্লার নির্দেশ,

-বাবা এবং মা কাফের-অবিশ্বাসী, গুনাহগার বা পাপাচার যা-ই হোক না কেন কখনো সুসম্পর্ক নষ্ট বা ছিন্ন করা যাবে না। সন্তানের জন্য বাবা-মার সঙ্গে সুসম্পর্ক নষ্ট করা বা ছিন্ন করা বৈধ নয়। তবে তাদের কথায় বা নির্দেশে ইসলামি শরিয়তের বিরোধী কোনো কাজ করা যাবে না। কোনো কাজে আমল করা যাবে না। তাদের গুনাহের কাজের অনুসরণ ও অনুকরণ করা যাবে না।
ইসলামি শরিয়তের বিপরীতে তাদের অনুসরণ এবং অনুকরণ থেকে বিরত থাকার পাশাপাশি তাদের কষ্ট দেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। তাদের সঙ্গে ভালো ও উত্তম আচরণ করতে হবে। তাদের সঠিক পথে ফিরে আসার জন্য আল্লাহর কাছে বেশি বেশি দোয়া করতে হবে। বাবা-মা অন্যায় কাজে জড়িত থাকলেও তাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে হবে। তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে হবে। তাদের সঙ্গে নরম ও কোমল আচরণ অব্যাহত রাখতে হবে। দুটি বিষয়ই খুব সতর্কতার সঙ্গে ম্যানেজ করতে হবে। এবার তুই কি করবি সেটা একান্তই তোর ইচ্ছে তাদের বুঝিয়ে সঠিক পথে পরিচালিত করবি নাকি তুই ও তাদের মতো অন্যায় করবি।

ভালো শ্রোতার মতো গভীর মনোযোগ দিয়ে আলিহানের কথা শুনছিলো রাহি। সব শুনে সে নাক টেনে বলে,

– আমি চেষ্টা করবো। কিন্তু তাতেও যদি তারা নিজেকে না শুধরে নেয় তাহলে আমি তাদের শাস্তি দিবো। কঠিন শাস্তুি।

– এই তো লক্ষি বোন আমার। বলেই রাহিকে জড়িয়ে ধরে আলিহান। আর তখনি রুমে প্রবেশ করে আফিয়া আহমেদ। ওদের দুজনকে এক সাথে হাসতে দেখে আফিয়ার মুখ বিষন্নতায় ছেয়ে যায়। সে এখানে এসেছিল আলিহানকে ডাকতে। সৈয়দ নওশাদ তাকে ডেকে পাঠিয়েছে। এখানে এসে দুজনের মাধ্যে এত ভাব দেখবে সেটা ভাবতে পারেনি আফিয়া আহমেদ। আফিয়া আহমেদকে দেখে আলিহান রাহিকে ছেয়ে একটু নড়েচড়ে বসে। আফিয়া আহমেদ আড় চোখে একবার রাহির দিকে তাকিয়ে থেকে আলিহানকে উদ্দেশ্য করে বলে,

– তুমি আবার কোন মন্ত্র দিলে আমার মেয়েটাকে। দেখ আলিহান আমার মেয়েকে আমার বিরুদ্ধে উসকানোর চেষ্টা করবে না। না হলে এর ফল কিন্তু ভালো হবে না। বলে দিলাম।

আফিয়া আহমেদের কথা শুনে স্মিত হাসে আলিহান। সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে হাতের বৃদ্ধা আঙ্গুল দিয়ে নাক চুলকিয়ে বলে উঠে,

– একদম সিরিয়ালের মায়েদের মতো কথা বলছেন আপনি। বলছি যে সিরিয়াল একটু কমকম দেখবেন। আচ্ছা একটা বলুন, ইন্ডিয়ান সিরিয়াল দেখে দেখেই শিখেছেন! কি করে সতিনের সন্তানকে মারতে হয় তাইতো।

আলিহানের কথাশুনে শুকনো ডুকগিলে আফিয়া আহমেদ।

– মানে কি- কি বলতে চাইছো কি তুমি?

– নাথিং। বড় করে শ্বাস ত্যাগ করে আলিহান। রাহির দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলে,

– আমি আসছি বোন। নিজের খেয়াল রাখিস।

রাহির মৃদি হেসে আলিহানকে বিদায় জানায়। অতঃপর প্রস্থান করে আলিহান।

৪১,
বিছানায় হেলান দিয়ে বসে আছে মেহের। ওর পাশেই বসে মৌ গুনগুনিয়ে গান গাইছে। ওর থেকে কিছুটা দূরে টেবিলের কাছে বসে আছে রাহনাফ। রাহনাফ বসে বসে কিছু আঁকছে আর একটু পরপর আড় চোখে মেহেরের দিকে তাকাচ্ছে। মেহের ব্যপারটা লক্ষ করলেও কিছু বলছে। এতে ওর অনেক ভালো লাগছে। মৌ মোবাইল নিয়ে নিচের দিকে তাকিয়ে আছে। এদিক কি হচ্চে না হচ্চে সেটা খেয়াল নেই তার। কিছুক্ষণ পর রাহনাফ হাতে ইয়া বড় একটা ছবি নিয়ে মেহেরের সামনে দাঁড়ায়। ছবিটা দেখেই অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে মেহের। এত বড় একটা ছবি একেছে রাহনাফ তাও সেটা মেহেরের। খুশিতে দু-হাতে মুখ চেপে ধরে মেহের। রাহনাফ এত সুন্দর ছবি আঁকতে পারে এটা জানতো না মেহের। নিচের ঠোঁটে ঝুলান্ত মৃদু হাসি দেওয়া আছে ছবিটায়। গভীর ভাবে না দেখলে কেউ এই হাসিটা দেখতে পারবে না। ছবির নিচে থাকা ক্যাপশন টা দেখে আরো অবাক হয় মেহের। হাতের লেখাগুলো দেখলে মনে হবে যেন কম্পিউটারে টাইপিং করছে। ইতালিয়ান অক্ষরে লেখা আছে,

– আমার দিনের উজ্জ্বলতা রোদের উপর নির্ভর করে না বরং তোমার হাসির উপর নির্ভর করে, লেখিকা সাহেবা।

চলবে,,,,

#মেঘ_ভাঙ্গা_রোদ্দুর। [৩২]

ছবিটার দিকে নিঃপলক তাকিয়ে আছে মেহের। রাহনাফ এত নিখুঁত ছবি আঁকতে পারে এটা তার ধারণার অতীত ছিলো। ছবিটা দেখে মনে হচ্ছে এটা বাস্তব। চোখের সামনে মেহের তার অধোরে সিগ্ধ হাসি ঝুলিয়ে বসে আছে। মেহের ছবিটার উপর হাত বুলাতে বুলাতে বলে উঠলো,

– আপনি এত ভালো ছবি আঁকতে পারেন। আগে বলেন নি কেন?

– আগে বললে কি করতেন আপনি? মৃদু হেসে প্রশ্ন করে রাহনাফ।

– আপনাকে দিয়ে রোজ একটা করে নিজের ছবি আঁকিয়ে নিতাম। আর সেগুলো আমি আমার রুমের দেয়ালে সাটিয়ে নিতাম। রাহনাফের দিকে তাকিয়ে অধোর প্রসারিত করে হাসি দেয় মেহের। রাহনাফ ও মাথা চুলকিয়ে নিচের দিকে তাকিয়ে হাসে। অতঃপর বলে,

– আচ্ছা বেশ, আরো কিছু বলতে যাবে তার আগে পাশ থেকে মৌ বলে উঠে,

– আমারও একটা ছবি এঁকে দাওনা রাহনাফ ভাইয়া। ওহ সরি শুধু আমার না, আমার আর আলিহানের একটা ছবি এঁকে দিবে আর আমি সেটা বেধে দেয়ালে ঝুলিয়ে রাখবো।

– ঠিক আছে। আচ্ছা আলিহান কোথায়? আসার পরে ওকে একবারও দেখি নি।

রাহনাফের কথার কোন জবাব দিলো না মৌ। মুখ গোমড়া করে বসে রইলো সে। মেহের ও উৎসুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মৌ-য়ের মুখের দিকে। আলিহানকে আজ সকাল থেকেই দেখতে পাচ্ছে না সে। বাসা থেকে বের হওয়ার আগে সে বলেও যায়নি কোথায় যাচ্ছে। মৌ তো আলিহানের স্ত্রী ও নিশ্চয় জানবে আলিহান কোথায় আছে। কিন্তু মৌ-য়ের মুখ দেখে বুঝা যাচ্ছে না যে আলিহান কোথায় সেটা সে জানে। কপাল কুচকে ফেলে মেহের। কারন মৌ-য়ের চোখ মুখে বিষন্নতার ছাপ স্পষ্ট। মেহের মৌ-য়ের কাঁধে হাত রেখে বলে,

– কি হয়েছে মৌ? আলিহান ভাইয়ের কথা জিগ্যেস করতে তোর মুখটা অমন কালো হয়ে গেল কেন?

– আসলে আলিহান যাওয়ার আগে আমাকে বলে যায়নি। কোথায় গেছে কার সাথে গেছে সেটাও জানি না। কল করেছি কয়েকবার কিন্তু রিসিভ করে নি।করুন চোখে মেহেরের দিকে তাকিয়ে বলে মৌ।

মৌ-য়ের মুখের রিয়্যাকশন দেখে হাসে রাহনাফ। অতঃপর বলে,

– আরে ভাবি চিল। আলিহান হয়তো কোন কাজেই বের হয়েছে চলে আসবে। এত অস্থির হওয়ার কারন নেই। চলে আসবে। আচ্ছা দাঁড়াও কল করছি আমি বলেই বুক পকেট থেকে মোবাইল বের করে আলিহানের নাম্বারে ডায়াল করে। রিং হওয়ার সাথে সাথে কল রিসিভ করে আলিহান।

– দোস্ত কোথায় তুই? তাড়াতাড়ি বাসায় চলে আয়। মৌ চিন্তা করছে। ওকে না বলে বেড়িয়েছিস কেন?

– এইতো আমি বাসার সামনেই আছি। আর দুই মিনিট লাগবে।

– ওও আচ্ছা আয় তাহলে। কল কেটে দেয় রাহনাফ। মেহেরের দিকে একপলক তাকিয়ে মৌ-দিকে তাকায় সে। অতঃপর বলে,

– আলিহান কে শায়েস্তা করতে পারবে না তুমি মৌ। রাহনাফের কথা শুনে মৌ আর মেহের দুইজনেই ওর দিকে তাকায়। মৌ-য়ের কপালে যেমন কয়েকটা ভাজ পরেছে তেমনি মেহেরর ও। মৌ আলিহানকে শায়েস্তা করবে কিন্তু কেন? ওদের দুজনের মুখের রিয়্যাকশন দেখে রাহনাফ অধোর চেপে হাসে। আর বলে,

– না মানে বলছিলাম এই সকাল থেকে বিকাল অব্ধি কাউকে কিছু না বলে কোথায় গিয়েছিল সে। কার সাথে দেখা করতে গিয়েছে সে বউকেও বলে যায়নি। আচ্ছা আলিহানের গোপন কোন গালফ্রেন্ড নেই তো। গালে হাত রেখে বলে রাহনাফ। রাহনাফের কথা শুনে চক্ষুদ্বয় বড় বড় হয়ে যায় মৌ আর মেহেরের। মৌ কিছু বলতে না পারলেও মেহের বলে,

– কি সব আবোল তাবোল বলছেন রাহনাফ। এমন কিছুই নয়। ভাইয়ার হয়তো কোন দরকার পরেছে তাই বেড়িয়েছে। তাছাড়া আমরা সবাই জানি আলিহান ভাই মৌকে কতটা ভালোবাসে।

– সেটা তো আমিও জানি। কিন্তু কি এমন মহান কাজে বেড়িয়েছে যে নিজের বউকে পর্যন্ত বলে যায় নি। আচ্ছা মৌ-প্লাস ভাবি তুমিই বলো কি এমন কাজে বেড়িয়েছে সে। শুনো আলিহান কিন্তু এতটাও ভালো মানুষ না। কলেজে থাকা কালীন অনেক মেয়েই ওর পিছুপিছু ঘুড়তো। আর হ্যাঁ, ডিপ্লোমা ২য় বর্ষে থাকাকালীন ওর একটা গোপন গার্লফেন্ড ছিলো। সারাক্ষণ তার সাথে চ্যাটিং করতো, আর হাসতো। আমি যতবার তার কথা জিগ্যেস করেছি আলিহান ততবারই আমাকে এড়িয়ে চলেছে। সেই মেয়েটা কে আজ অব্ধি আমরা কেউ জানিনা। মৌ-য়ের দিকে তাকিয়ে বলল রাহনাফ। রাহনাফের কথা শুনে বিষন্নতায় ছেয়ে যায় মৌ-য়ের মুখ। এক রাশ কালো মেঘেরা এসে ভীড় করেছে মৌ-য়ের মুখে। আকাশে মেঘ করলে যেমন বৃষ্টি হয় তেমনি মৌ-য়ের মনে মেঘ জমে চোখের কোটরে এসে অশ্রুর ভীড় জমিয়েছে। আলিহান কি সত্যিই ওর গার্লফেন্ডের সাথে দেখা করতে গেছে। আচ্ছা কোথায় আলিহান! ও যাওয়ার আগে আমাকে কিছু বলে যায়নি কেন? আজ সারাদিন কোথায় ছিলো সে! মনে মনে ভাবছে মেহের। তখনি ওর ভাবনার ছেদ ঘটিয়ে দরজার পাশ থেকে আলিহান বলে উঠে,

– এমন কিছুই হয়নি মৌ। আমার একটা ইম্পরট্যান্ট কাজ পরে গেছিলো তাই তাড়াতাড়ি চলে গেছিলাম। রুমের ভেতরে প্রবেশ করে আলিহান। সে মৌ-য়ের দিকে তার দৃষ্টি নিক্ষেপ করতেই মৌ মুখ ভেঙচি কেটে অন্যদিকে ঘুরে তাকায়। এই দৃশ্য দেখে হাসে আলিহান ও রাহনাফ। রাহনাফ আলিহানের দিকে তাকিয়ে চোখ টিপ দিয়ে বলে,

– বউকে কিছু না জানিয়ে সারাদিন বাড়ির বাহিরে কাটানো তাইনা। এবার যাও বউয়ের মান ভাঙাও। মৌ-য়ের দিকে তাকায় রাহনাফ। মৌ তখনো অন্যদিকে ঘুরে চোখের জল ফেলছে। আলিহানের গোপন গার্লফেন্ড আছে হয়তো এটা সত্যিই ভেবে বসে আছে সে। রাহনাফ মৌ-য়ের দিকে তাকিয়ে বলে,

– মেয়ে মানুষগুলা এমনি হয় তাইনা। দেখনা একটুতেই কেমন কেঁদে ফেলছে। অথচ ও ভুলেই গেছে তুই কলেজ লাইফের শুরু থেকে ওর সাথে প্রেম করিস।

– শালা দিলি তো আমার বউটাকে কাঁদিয়ে । এবার আমি কি করে সামলাবো। মৌ-য়ের দিকে তাকিয়ে বলে আলিহান।

– তুই তোর বউ সামলা আমি বরং মেহেরকে নিয়ে একটি গুরে আসি। ও আচ্ছা সারাদিন কোথায় ছিলি বললি না তো।

রাহনাফের করা শেষ প্রশ্নে থমকে যায় আলিহান। নির্বিকায় দাঁড়িয়ে থাকে সে কিছুক্ষণ। আলিহান কোথায় গেছিলো কার সাথে দেখা করতে গেছিলো এটা জানতে পারলো তো সব শেষ হয়ে যাবে। ব্যাপারটা বেশীদূর গড়াতে দেওয়া যাবে না। টপিক চেঞ্জ করার জন্যে আলিহান বলে উঠে,

– মৌ কাঁদছিে। এবার রুম থেকে বের হো। পরে তোকে সবটা বলবো।

আলিহানের কথা মতো রাহনাফ রুম থেকে বেড়িয়ে যায়। মেহেরও একবার মৌ-য়ের মুখ পানে তাকিয়ে প্রস্থান করে। সবার চলে যাওয়ার পর আলিহান গিয়ে মৌ-কে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে। মৌ ছাড়ানোর চেষ্টা করলে সে আরো জোরে ওকে চেপে ধরে কাঁধে নিজের অধোর ছুঁইয়ে দিয়ে বলল,

– রাগ হয়েছে আমার মৌ-পাখিটার!

মৌ কোন জবাব দেয়না। আলিহান এবার মৌ-কে নিজের দিকে ঘুড়িয়ে নিয়ে মৌ-য়ের দু-গালে নিজের হাত রেখে বলে,

– রাহনাফের কথায় অভিমান হয়েছে। মৃদু হাসে আলিহান। অতঃপর বলে, রাহনাফ তোমার সাথে ফান করেছে মৌ-পাখি। আমি তো কলেজ লাইফ থেকে একজনকেই ভালোবাসি মৌ পাখি। সে আমাকে ভালোবাসতে শিখিয়েছে। রাতের পর রাত জেগে যার সাথে চ্যাটিং এ ব্যাস্ত থাকতাম। না দেখে শুধু কথা বলেই প্রেমে পড়েছি তার। পরে একপলক দেখায় সেই ভালোবাসাটা যেন তৃষ্ণার্ত হয়ে উঠেছিলো। ভালোবেসেছি তাকে খুব।

আলিহানের কথা শুনে মৌ অভীমানে কন্ঠে বলে উঠে,

– এ এটাতো আমি। আমিই তোমাকে ট্যাক্স করতাম।

– হুম। আমি শুধু আমার মৌ পাখিটাকেই ভালোবাসি।

৪২,
শীত চলে আসার পর থেকেই সকালগুলো ইদানীং কী অসহ্য অলসতা নিয়ে হাজির হয়, যা বলে বোঝাতে পারবে না আফিয়া আহমেদ। ইচ্চে করে দু-চোখ বন্ধ করে রাখতে। কিন্তু সেটা আর হবে না। ঘড়িতে এলাম ভাজছে। সে জানান দিচ্ছে এখন আর ঘুমিয়ে থাকলে চলবে না। উঠতে হবে। ব্রেকফাস্টের সময় হয়েছে। যদিও এ বাড়িতে সময়টাই তার হাতে নিয়ন্ত্রণ। অলসতাকে পাশ কাটিয়ে উঠে বসে আফিয়া আহমেদ। ফ্রেশ হয়ে নিচে চলে যায়।

ড্রাইনিং টেবিলে বসে সৈয়দ নওশাদ আর আফিয়া আহমেদ রাহির জন্যে অপেক্ষা করতে থাকে। এতদিন বুয়া রাহির খাবারটা তার রুমে দিয়ে এসেছে। কিন্তু কাল রাতেই রাহি আবার আগের মতো সবার সাথে বসে ডিনার করে তাই সকলে ভাবছে ব্রেকফাস্ট ও সকলের সাথে করবে। অনেকটা সময় অপেক্ষা করার পরেও যখব রাহি আসে না তখন আফিয়া আহমেদ একটা সার্ভেন্টকে ডেকে বলেন, রাহিকে ডেকে দিতে। সার্ভেন্ট আফিয়া আহমেদের কথা মতো রাহির রুমে যায় রাহিকে ডাকতে কিন্তু সে সেখানে গিয়ে রাহিকে খুজে পায়না। কথাটা সৈয়দ নওশাদ আর আফিয়া আহমেদের কানে আসতেই তারা পুরো বাড়ি তন্নতন্ন করে রাহিকে খুঁজতে থাকে। কিন্তু কোথাও রাহিকে খুজে পাওয়া যায়না। বাড়ির আশে পাশে, আত্নীয় স্বজন, ও রাহির সকল বন্ধুদের বাড়িতে কল করে সৈয়দ নওশাদ কিন্তু কেউই রাহির সন্ধান দিতে পারে না। ধপ করে সুপায় বসে মাথায় হাত রাখে সৈয়দ নওশাদ। রাহি বাড়িতে নেই। কোন আত্নীয়দের বাড়িতে ও যায়নি। ওর বন্ধুরাও ওর খবর জানে না। তাহলে রাহি এখন কোথায়???

চলবে,,,,,

#মাহফুজা_আফরিন_শিখা।