#মেঘ_ভাঙ্গা_রোদ্দুর। [৩৭]
রাহনাফ মেহেরকে নিয়ে শহর ছেড়ে একটু দূরে একটা মেলায় চলে যায়। মেলার সামনে বড় করে ব্যানারে সাঁটানো হয়েছে, নবান্ন উৎসব। লেখাটা দেখে মেহের প্রশ্নবোধক দৃষ্টি নিক্ষেপ করে রাহনাফের দিকে। রাহনাফ মৃদু হেসে জবাব দেয়,
– সাত দিনের মেলা, আজই শেষ।
– ওহ আচ্ছা। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আবার বলে, আপনি কি আগেও এখানে এসেছেন?
– গতকাল এসেছিলাম। আচ্ছা চুড়ি নিবে চুড়ি? চল ওদিকে যাই।
এত মানুষের ভীড়ে রাহনাফ মেহেরের হাতটা ধরে চুড়ির দোকানে নিয়ে যায়। তারপর নিজের পছন্দমত কিছু চুড়ি মেহেরের দু-হাতে পরিয়ে দেয়। মেহের চুড়ি পরে নিজেই দু-হাত নাড়িয়ে খিলখিল করে হাসে। রাহনাফ মুগ্ধ হয়ে সেই হাসির দিকে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ। মেহেরের এমন প্রাণ উচ্ছল হাসি দেখলে রাহনাফের মনটা শীতল হয়ে যায়। তারপর ঝিনুকের কানেরদুল পরিয়ে দেয় মেহেরের কানে। মেহের মিররে নিজেকে দেখতে ব্যাস্ত আর রাহনাফ চুড়ি কানের দুলের দাম মিটিয়ে নেয়। ওয়ালেটটা পকেটে পুরে মেহেরের হাত শক্তকরে ধরে মেলার অন্যপান্তে নিয়ে যায়। সেখানে ছিলো অনেক মানুষের ভীড়। এত মানুষের ভীড় দেখে মেহেরের মনে উৎসাহ জাগে ওখানে কি হচ্ছে সেটা জানার জন্যে। মেহের বেশ উৎসাহ নিয়ে সেদিকে তাকিয়ে থাকে। ব্যপারটা রাহনাফ লক্ষ করতেই স্মিত হেসে বলে,
– ম্যাজিক দেখবে?
– কিসের ম্যাজিক!! পাল্লাপ্রশ্ন মেহেরের।
ভ্রুদ্বয় সংকোচিত করে মেহেরের দিকে তাকায় রাহনাফ। অতঃপর বলে,
– প্রশ্নটা আমি আগে করেছি। ম্যাজিক তো ম্যাজিক-ই হয় তাইনা লেখিকা সাহেবা।
– দেখবো। ইনোসেন্ট মুখ করে বলে মেহের।
রাহনাফ সামনের ভীড় ঠেলে দু-হাতে মেহেরকে আগলে সামনে চলে যায়। সামনে যেতেই অবাক হয়ে যায় মেহের। সেখানে দুজন মাধ্যবয়স্ক মহিলা আর কয়েকজন বাচ্চা মিলে সবাইকে ম্যাজিক দেখাচ্ছে। মেহের মনোযোগ দিয়ে দেখছে। বাচ্চাগুলোর ম্যাজিক তার কাছে বেশী ভালো লাগছে। তারা ম্যাজিকের সাহায্যে একে অপরকে ভয় দেখাচ্ছে। মেহের ম্যাজিক দেখছে আর হাত নাড়াচ্ছে। নিজের কৌতুহল দমাতে না পেরে সে বলে উঠলো, আমিও দেখাবো ম্যাজিক। কথাটা জোরে না বললেও একজন ম্যাজিশিয়ান সেটা শুনতে পায়। সে হাতের ইশারায় মেহেরকে তার কাছে ডাকে। মেহের রাহনাফের দিকে করুন চোখে তাকায়। সে ওই মাধ্যবয়স্ক মহিলার কাছে যেতে ভয় পাচ্ছে । রাহনাফ আলতো করে মেহেরের হাত ধরে ওকে চোখের ইশারায় শান্ত হতে বলে ম্যাজিশিয়ানের কাছে নিয়ে যায়। মাধ্যবয়স্ক ম্যাজিশিয়ান মেহেরকে পা থেকে মাথা অব্ধি অবলোকন করে নিয়ে মেহেরকে তার পাশে বসিয়ে দেয়। অতঃপর সুধায়,
– কে হয় এটা তোর! বর??
মেহের শান্ত দৃষ্টিতে রাহনাফের দিকে তাকায়। রাহনাফ ও উৎসুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মেহেরের মুখ পানে। মেহের কি জবাব দেয় সেটা দেখার জন্যে। অধোর চেপে হাসছে রাহনাফ। মেহের তার দৃষ্টি শক্তকরে ফেলে। রাহনাফের হাসি যেন আরো বেড়ে যায়। সামনের দিকে তাকিয়ে জবাব দেয়,
– আমরা বিবাহিত ন,,,
পুরো কথাটা বলার আগেই অর্ধবয়স্ক মহিলা বলে উঠে,
– নতুন বিয়ে হয়েছে মনে হচ্ছে। তাকা আমার চোখের দিকে। মেহের তার কথামতো তার চোখের দিকে ভীতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করে। অর্ধবয়স্ক ম্যাজিশিয়ান ম্যাজিক করে মেহেরকে মিষ্টি কালারের শাড়ি পড়িয়ে দেয়। বিস্মিত হয়ে দু-হাতে মুখ চেপে ধরে মেহের। উপস্থিত সকলে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে মেহেরের দিকে। রাহনাফের চোখ যেন মেহেরের উপর থেকে সরছেই না।
শাড়ি পরে মেলার ঘুরে মেহের। রাহনাফ সব সময় মেহেরের হাত ধরে ওকে আগলে রেখেছে। বাড়ি ফেরার সময় রাহনাফ একটা বেলী ফুলের মালা কিনে নেয় মেলা থেকে আর সেটা মেহেরের চুলে গুজে দেয়। মেহেরকে মেহেরের বাড়ি পৌঁছে দিয়ে সে দুদিনের জন্যে শহরের বাইরে চলে যায়। রাহনাফ তার পৈতৃক বাড়িতে ফিরে যায়। কোন সমস্যার সমাধান করতে হলে আগে গোড়া থেকে জানতে হয়। রাহনাফ তার পৈতৃক বাড়িতে থেকেই সব সমস্যার সমাধান করবে।
৪৭,
রাতের আধার কাটিয়ে পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে।
এক সোনালি সকালের দেখা মিলেছে। যদিও হসপিটালে সকাল দুপুর রাত এটা বুঝা বড় দায়। নিচে কিছু পরার শব্দে ঘুৃম ভাঙে রাহির। চোখ মেলে তাকাতেই দেখতে পায় তার বাবা হাত নাড়াচ্ছে। হাত বাড়িয়ে পাশ থেকে গ্লাস নেওয়ার চেষ্টা করছিলো সে আর তখন গ্লাসটা নিচে পরে যায়। খুশিতে চোখে পানি এসে যায় রাহির। দুদিন ধরে তো এই দৃশ্য দেখার জন্যে সে হসপিটালে পরে আছে। সেদিন রাতে সৈয়দ নওশাদ হার্ট এট্যাক করেন। দুদিন পর আজ চোখ মেলে তাকিয়েছে। রাহি দ্রুত পায়ে সৈয়দ নওশাদের কাছে গিয়ে জিগ্যেস করে,
– বাবা তুমি পানি খাবে?
সৈয়দ নওশাদ কোন জবাব দেয়না শুধু ফ্যালফ্যাল নয়নে তাকিয়ে থাকে রাহির দিকে। রাহি কিছু বুঝে উঠতে পারছে না। তাই সে বোতল থেকে অন্য একটা গ্লাসে পানি দিয়ে সৈয়দ নওশাদকে খাওয়ানোর চেষ্টা করে কিন্তু সৈয়দ নওশাদ খেতে পারে না। কিন্তু মেয়ের মন রাহির। বাবা পানি খেতে চেয়েছে এমতাবস্থায় কোন মেয়েকি পারে তার বাবাকে পানি না দিয়ে থাকতে। রাহি নিজের হাতে পানি ঢেলে একটু একটু করে সৈয়দ নওশাদের মুখে পানি ঢেলে দেয়। তারপর সে সৈয়দ নওশাদের দিকে তাকিয়ে এক গাল হাসে। চোখের পানি মুছে বলে,
– আমি ডক্টরকে ডেকে নিয়ে আসছি।
লম্বা পা ফেলে বেরিয়ে যায় রাহি। সৈয়দ নওশাদ রাহির চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকে। কিছুক্ষণ পর ডক্টর এসে সৈয়দ নওশাদকে কিছু টেষ্ট করিয়ে নেয়। টেষ্টের রিপোর্ট সরুপ রাহি জানতে চাইলে ডক্টর চুপ করে থাকে কিছুক্ষণ। ততক্ষণে রাহির দাদিও হসপিটালে পৌছে যায়। ছেলের জ্ঞান ফিরার কথা জানতে পেরে তিনি আর বাড়িতে বসে থাকতে পারেন নি।
মুখোমুখি বসে আছে ডক্টর আর রাহি, ওর পাশেই বসে আছে আলিহান । রাহির চোখ অশ্রুতে ভরে গেছে। ঠোঁট কাপছে। বুক ফেটে কান্না আসছে তার। আলিহান রাহির এক হাত শক্ত করে ধরে রেখেছে। তারও কস্ট হচ্চে খুব। ডক্টর তাকিয়ে আছে রাহির মুখের দিকে। মেয়েটাকে দেখে তার মায়া লাগছে খুব। দুদিন ধরে একা একা তার বাবার জন্যে কত কষ্ট করেছে তাইতো ডক্টর রাহিকে এমন একটা খবর দিতে চাইছিলেন না। কিন্তু কি আর কারার! সত্যিটা তো সবাইকে জানাতে হবে। রাহি কান্নামিশ্রত সূরে বলে উঠলো,
– আমার বাবাকি আর কখনো হাটতে পারবে না ডক্টর।
সৈয়দ নওশাদের প্যারালাইজড হয়ে গেছে। তার বা পাশটা প্যারালাইজড হয়েছে। এমন একটা খবর যে কোন সন্তানের কাছেই দুঃখজনক। রাহির কাছেও তাই। ডক্টর রাহির দিকে তাকিয়ে বলে উঠল,
– হয়তো। বড় করে শ্বাত ত্যাগ করে অধোর কামড়ে নিয়ে তিনি আবার বলতে লাগলেন, পক্ষাঘাতগ্রস্থ মানুষের দেহের অভ্যন্তরের স্নায়ুগুলোকে ‘পুনর্বহাল’ করে বা বলা যায় ‘জোড়া লাগিয়ে’ আবারো তাদের হাত ও বাহু নাড়ানোর ব্যবস্থা করা গেছে, এমনটা বলছেন একজন অস্ট্রেলিয়ান শল্য চিকিৎসক।
ব্রিসবেনের ৩৬ বছর বয়সী পল রবিনসন বলছেন যে, এই উদ্ভাবনী অস্ত্রোপচার তাকে এমন এক ধরনের স্বাধীনতা এনে দিয়েছে যেটি তিনি কখনো কল্পনাও করেননি।
সম্পূর্ণ স্বাভাবিক কাজকর্ম করার ক্ষমতা হয়তো এর মাধ্যমে আনা সম্ভব নয়, তবে ডাক্তাররা বলছেন এতে করে জীবনের পরিবর্তন আনা সম্ভব।
মেরুদণ্ডে কোন আঘাত প্রাপ্তির ফলে মস্তিষ্ক থেকে কোন সংকেত শরীরের অন্য কোন অংশে আর যেতে পারে না। আর এই অবস্থার ফলেই পক্ষাঘাত বা প্যারালাইসিস হয়।
যাদের বিশেষ করে কোয়াড্রিপ্লেজিয়া এফেক্ট ঘটে প্যারালাইসিসের ক্ষেত্রে তাদের বেশিরভাগ অঙ্গই সাড়া দেয় না।তবে কিছু ক্ষেত্রে তাদের উপরের বাহুর পেশী নাড়াচাড়া করার মতো অবস্থা থাকে।তখন মেরুদণ্ডের সাথে সেইসব সচল স্নায়ুগুলোর সংযোগ ঘটানো হয়। ফলে পেশীগুলো আবারো সাড়া দিতে পারে।মেলবোর্নের অস্টিন হেলথ এর ডা. নাতাশা ভ্যান জিল বলছেন, “আমার বিশ্বাস করি নার্ভ ট্রান্সফার সার্জারি প্যারালাইসিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্যে একটি দূর্দান্ত বিকল্প। প্রতিদিনের কাজগুলো করতে হাতের কর্মক্ষমতা ফিরিয়ে দেবার সম্ভাবনা তাদের জীবনে আরো স্বাধীনতা ফিরিয়ে আনে। তবে পেশেন্টের সুস্থতা নির্ভর করে সময়ের উপর। আপনি কত দিনে রোগীর চিকিৎসা করাচ্ছেন। ছয় থেকে এক বছরের মধ্যে চিকিৎসা করালে রোগীর ভালো হওয়ার সম্ভবনা বেশী।
– তাহলে কি বলতে চাইছেন আপনি, আমার বাবা ভালো হয়ে যাবে! উৎফুল্ল হয়ে বলল রাহি।
– উনার ভাগ্যের উপর নির্ভর করে সেটা।
রাহি মনে মনে প্রতিঞ্জা করে এই অশ্রপ্রচার সে তার বাবাকে করাবে। যে করেই হোক তার বাবাকে সুস্থ করে তুলবে সে। আলিহান আর রাহি দুজনেই ডক্টরের কেবিন থেকে বেড়িয়ে সৈয়দ নওশাদের কাছে চলো আসে। আফিয়া আহমেদ এখনো বাড়ি ফিরে নি। সে কোথায় আছে সেটা এখনো সবার অজানা। তবে আফিয়া আর ফিরবে না?
চলবে,,,,,,
#মেঘ_ভাঙ্গা_রোদ্দুর। [৩৮]
৪৮,
কলেজের সামনে থাকা বিশাল দিঘীর পাড়ে বসে আছে মেহের আর মৌ। মৌ-কে জোর করে আজ কলেজে নিয়ে আসছে মেহের। আগামি কাল কলেজের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, আজ মেহেরের উপর অনেক দায়িত্ব। আর মেহের মৌ-কে ছাড়া কোন কাজ ঠিক মত করতে পারছে নাকি! সব কাজেই দু-বোন একে অপরের উপর নির্ভরশীল। তাইতো আজও মৌ-কে জোর করে কলেজে নিয়ে আসে মেহের। দীঘির পাড়ে বসে মোবাইলে স্কলিং করছে মৌ। আর মেহের অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে দিঘীর দিকে। মৌ মোবাইলের দিকে তাকিয়ে জিগ্যেস করলো,
– তুই কোন গানে নৃত্য করবি সেটা সিলেক্ট করেছিস?
মৌ-য়ের কথা মনে হয় মেহেরের কর্ণপাত হয়নি।সে কোন রিসপন্স না দিয়ে আগের মতই তাকিয়ে আছে। এটা লক্ষ করতেই মৌ মেহেরে কাঁধে হাত রাখে। নিজের কাঁধে শীতল হাতের স্পর্শ পেতেই চমকে উঠে মেহের। পাশ ফিরে মৌ-য়ের দিকে জিগ্যেসু দৃষ্টিতে তাকায়। মৌ ভ্রুযুগলে কিৎচিত ভাজ ফেলে সুধায়,
– এত মনোযোগ দিয়ে কার কথা ভাবছিস মেহু! মেহের কপাল কুঁচকে ফেলে। মৌ স্মিত হাসে অতঃপর বলে,
– রাহনাফের কথা ভাবছিস তো! চলে আসবে, চলে আসবে! এখন রাহনাফের কথা না ভেবে নিজের পারফরমেন্সের কথা ভাব। সবাইকে শিখাতে শিখাতে নিজের কথা ভুলে গেছিস।
– নারে। আমি ভাবছি অন্যকিছু। সামনের দিকে তাকিয়ে জবাব দেয় মেহের।
– কি ভাবছিস তুই!
– রাহির কথা। আগামি কাল কলেজের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অথচ রাহি আজ চারদিন যাবৎ কলেজে আসছে না। আবার আমাদের বাসায়ও আসে নি। আচ্ছা রাহি কি কাল অনুষ্ঠানে আসবে না।
মেহেরের মুখে রাহির নাম শুনে মৌ অবাক হয়ে যায়। যে মেহের রাহিকে সহ্য করতে পারে না তার মুখে রাহির নাম। রাহিকে দেখতে পাচ্ছে না বলে তার জন্যে চিন্তা হচ্ছে। মৌ-য়ের অধোরে মৃদু হাসি ঝুলিয়ে কাধ নাড়িয়ে বলল,
– রাহিকে মিছ করছিস তো। করবি না কেন! বোন হয় না তোর। মিছ করাটাই স্বাভাবি তাইনা।
মৌ-য়ের দিকে শক্ত চোখে তাকায় মেহের। মেহেরের এমন চাহনি দেখে শুকনো ডুকগিলে মৌ। অতঃপর বলে,
– না তুই রাহির কথা জিগ্যেস করবি তাই বললাম। মৌ-য়ের কথা শেষ হলেই চক্ষুদ্বয় কিছুটা সংকোচিত করে ফেলে মেহের। সামনের দিকে তাকিয়ে জবাব দেয়,
– কলেজে আসছে না তাই জিগ্যেস করছি। কলেজে আসলে তো সারাক্ষণ আমার পিছু পিছু ঘুরঘুর করতো। আলিহান ভাই তো রাহির সব খরব রাখে তাই তোর কাছে জিগ্যেস করলাম। আর তুই! ভালোই হয়েছে কলেজে আসছে না। অসহ্য নেকা মেয়ে একটা। বিরক্তিকর,,, বিরক্তি সহিত বলে মেহের।
– রাহি কয়দিন কলেজে আসবে না। শীতল কন্ঠে জবাব দেয় মৌ।
– ওহ। ছোট্ট একটা শব্দ বলেই উঠে দাঁড়ায় মেহের। চলে আসার জন্যে সামনের দিকে এক পা বাড়াতেই পিছন থেকে মৌ বলে উঠে,
– রাহি কেন কলেজে আসবে না সেটা জানতে চাইবি না।
পিছনের দিকে ঘুরে তাকায় মেহের অতঃপর বলে,
– জিগ্যেস করার কি আছে। হয়তো তার বাবা মায়ের সাথে কোথাও বেড়াতে গেছে তাই। এসব আমার জানার কোন ইচ্চেই নেই। মৌ-কে টেনে তুলে বলে, হলরুমে চল। সেখানে অনেক কাজ আছে। মৌ-য়ের হাত ধরে সেখান চলে আসতে নেয়ে মেহের। কয়েকপা এগোতেই থমকে দাঁড়িয়ে যায় মৌ। মেহের ভ্রুযুগলে কিঞ্চিৎ ভাজ ফেলে মৌ-য়ের দিকে তাকিয়ে বিরক্তি কন্ঠে বলে উঠলো,
– দাঁড়িয়ে পরলি কেন? চল আমার সাথে।
– আমার তোকে কিছু বলার আছে মেহু। মৌ মেহেরের থেকে নিজের হাত ছাড়িয়ে নেয়। তারপর মেহেরের দিকে তাকিয়ে শীতল কন্ঠে বলে,
– মেহু, আংকেল অসুস্থ। হার্ট এট্যাক করে প্যারালাইজড হয়েছে। আংকেলের স্ত্রীও তাকে ছেড়ে চলে গেছে। এ জন্যেই রাহি কলেজে আসছে না।
থমকে যায় মেহের। কানের কাছে প্রতিধ্বনির ন্যায় মৌ-য়ের বলা দুটো শব্দ বাজতে থাকে “আংকেল অসুস্থ। হোক না সে অসুস্থ তাতে মেহেরি কি? কে হয় লোকটা তার। হয় তো বায়োলজিক্যাল বাবা সে মেহেরের। এটাই তো সৈয়দ নওশাদের সাথে মেহেরের সম্পর্ক। তাছাড়া আর কি!! মেহের তার তার হাতের মুঠি শক্ত করে নেয়। মনের ভিতরে কোথাও চাপা কষ্ট অনুভব করে সে। কি এই ব্যাথার কারন সেটা জানা নেই মেহেরের। তবে কি, নাম মাত্র বাবার অসুস্থতার কথা শুনে কষ্ট হচ্চে মেহেরের! না এটা কি করে হতে পারে। মেহের তো তাকে বাবা হিসাবে মানেই না।
হলরুমে এসে নিজের ডান্সের স্টেপগুলো দেখছিলো মেহের। মৌ বাকি সবার ডান্সের স্টেপ দেখে নিচ্ছে। এমনি সময় আহসান আসে হল রুমে। মেহেরকে ডান্স করতে দেখে সে দাঁড়িয়ে যায়। ওদের থেকে কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে বুকের উপর হাত গুজে দিয়ে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে মেহেরের দিকে। মেহের তখনো মনোযোগ দিয়ে নিজের ডান্স পারফরমেন্স করছে। আহসানকে দেখে মৌ তার কপাল কুঁচকে ফেলে। তার সামনে গিয়ে তুড়ি বাজিয়ে বলে,
– এই মিস্টার হ্যান্ডসাম, ওদিকে হা করে কি দেখছেন আপনি? আর আপনি কে বলুন তো? গালে হাত রেখে ভাবনার ভঙ্গিমায় বলে কথাটা। আহসান ভ্রুযুগলে কিঞ্চিৎ ভাজ ফেলে মৌ-য়ের দিকে তাকাতেই মৌ আবার বলে উঠে, আপনাকে হলরুমে ডুকতে দিয়েছে কে?
কথা বলছেন না কেন? স্যারকে ডাকবো! কোথা থেকে যে আসে এসব উদ্ভট ছেলেপুলে। আর দারোয়ানের কথাও বলি, কেন যে সে যাকে তাকে কলেজে প্রবেশের অনুমিত দেন। মুখচোকে বিরক্তি ছাপ এসে পরে মৌ-য়ের।
আহসান হলরুমের প্রতিটা কোনে অবলোকন করে নিয়ে শান্ত দৃষ্টি নিক্ষেপ করে মৌ-য়ের দিকে। হাত দিয়ে নিজের চাপ দাঁড়িয়ে হাত বুলিয়ে অধোরে হাসির রেখা টেনে বলে উঠে,
– আপনি এই কলেজের স্টুডেন্ট তো!
– হ্যাঁ।
– তাহলে আমাকে না চেনার কোন কারন তো দেখতে পাচ্ছি না। মনেহয় ঠিকমত ক্লাসে আসেন না।
আহসানের কথা শুনে অধোর কামড়িয়ে চোখ মিটমিট করে নেয় মৌ। অতঃপর বলে,
– আপনি কোন মহামানব যে আপনাকে চিনতে হবে। এক কাজ করুন আপনার পিঠে বড় করে একটা সাইনবোর্ড টানিয়ে সেখানে আপনার পরিচয় দিয়ে রাখবেন ওকে। তাহলে সবাই আপনাকে চিনবে। কেউ আর আপনার কাছে আপনার সম্পর্কে জানতে চাইবে না।
মৌ-য়ের কথা শুনে বেশ বিরক্ত বোধ করে আহসান। উপরের দিকে তাকিয়ে বড় করে শ্বাস ফেলে। ততক্ষণে আশপাশের কয়েকজন মেয়ে এসে দাঁড়ায় ওদের পাশে। আহসানকে এরকম করতে দেখে পাশ থেকে এক যুবতি বলে উঠে,
– স্যার, কোন প্রবলেম হয়েছে কি? আমাকে বলতে পারেন।
যুবতীর কথা শুনে আহসান মৃদু হাসলেও হাসতে পারে না মৌ। মৌ-য়ের চোখ বড় বড় রসোগোল্লার মত হয়ে যায়। সে অবাকের সূরে বলে,
-স্যা-স্যার।
তখন পাশ থেকে আরেক মেয়ে বলে উঠে, হ্যাঁ মৌ এনি আমাদের নতুন টিচার। মৌ মাথা দুইদিকে নাড়িয়ে স্যারকে সরি বলে। বিনিময়ে আহসান ও মৃদু হাসে।
আজ মেহেরের মনটা বিষন্নতায় ঘেরা। কোন কাজে মন বসাতে পারছে না সে। সকালে মৌ-য়ের মুখে সৈয়দ নওশাদের কথা শুনে তার খারাপ লাগলেও পরে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছে সে। ওই লোকটার যা খুশি হোক তাতে তার কি আসে যায়। তাকে নিয়ে ভেবে নিজের সময় নষ্ট করার কোন মানেই হয়না। আমাদের দেশে প্রতিদিন কত শত লোক মারা যায় কই তাদের নিয়ে তো আমরা কেউ মাথা ঘামাই না। তাদের মধ্যে তো সৈয়দ নওশাদ আহমেদ ও পরে। তাহলে তাকে নিয়ে কেন এত ভাবছি আমি। বাংলাদেশে প্রতিদিন গড়ে ২৫০০ মানুষের মৃত্যু হয় বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. আবুল কালাম আজাদ। করনা ভাইরাস নিয়ে এক সম্মেলনে তিনি এ তথ্য জানান। তিনি বলেন যে, এর মধ্যে ৬৫ ভাগ বিভিন্ন অসংক্রামক ব্যধিতে মারা যান। ২৪ ভাগ মানুষ মারা যান বার্ধক্যজনিত কারণে। এই মৃত্যু স্বাভাবিক মৃত্যু।
তিনি বলেন যে, করোনার কারণে এই মৃত্যুর হার বাড়েনি বরং বাংলাদেশে যে স্বাভাবিক মৃত্যু আছে সেটাই বজায় রয়েছে। প্রতিদিন গড়ে ২৫০০ মানুষ মারা যাচ্ছে। যে কোন মৃত্যুই করোনাজনিত মৃত্যু এই ভ্রান্ত ধারণা ঠিক নয়। এটি একটি ভ্রান্ত ধারণা।
সন্ধার আকাশে যে চঞ্চলা সন্ধা তারা উঠেছিল সেটা চঞ্চল পায়েই চলে গিয়েছে। এখান চারিদিকে ঘন কাল অন্ধকার। আকাশের দিকে তাকালেই দেখা যেয় সেখানে কেমন একটা চাদকে ঘিরে হাজার তারার মেলা। বিষন্নমনে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে মেহের। আজ সারাদিন রাহনাফ এক বারও তাকে কল করে নি। আচ্ছা রাহনাফ কি জানে না তার সাথে কথা না হলে মেহেরের অস্বস্তি হয় তাহলে কেন সে আজ কল করলো না। দু-চোখ বন্ধ করে বিড়বিড় করে বলে উঠে, প্লিজ রাহনাফ ফিরে এসো। আর তখনি তার মোবাইলে রিংটোন বেজে উঠে। মোবাইলের দিকে তাকাতেই দেখতে পায়, স্কিনে রাহনাফের নামটা জ্বলজ্বল করছে। অধোরে হাসির রেখা ফুটে উঠে মেহেরের। কলটা রিসিভ করে কানের কাছে ধরে সে।
চলবে,,,,,
#মাহফুজা_আফরিন_শিখা।