#রাখি_আগলে_তোমায়_অনুরাগে💕
#written_by_Liza
#সুচনা_পর্ব
লাইব্রেরির পাশের স্টোর রুমটাতে আসবে কাল , অনেক অপেক্ষা করিয়েছো মামণি আর না, আমি সেখানে অপেক্ষা করবো চলে এসো কিন্তু।
কিন্তু স্যার…
কোনো কিন্তু নয় ইন্সিয়া,হুসসসসসস, আওয়াজ চাই না। তুমি কেনো বুঝতে পারছোনা? এখানে আমাদের দুজনের’ই বেনিফিট আছে। তুমি যদি চাও এই কলেজ থেকে ভালো সার্টিফিকেট সুনাম নিয়ে বের হতে,তবে আমার ডিল টা এক্সেপ্ট করো,কেউ জানতে পারবে না। আর যদি চাও সকলের সামনে মুখে চুনকালি মেখে বের হতে, তাহলে তুমি ভেবে নাও কি করবে,দি চয়েজ ইজ ইউর ইন্সিয়া ডার্লিং।
একনাগারে ফোনে কথাগুলো বলে রেখে দেয় কলেজের ইংলিশ টিচার অভিক রয়। অভিক রয়ের মোটামুটি বয়স ৪০/৪৫ পেরিয়েছে।
ইন্সিয়া কান থেকে ফোন নামিয়ে কিছুক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে আছে ফোনের স্ক্রিনের দিকে, হঠাৎ পাশ থেকে ইন্সিয়ার আম্মু গর্জে বলে ওঠে,
“সারাদিন মোবাইল মোবাইল, এই মোবাইল’ই তোর পরীক্ষা খারাপ হওয়ার কারণ। দাড়া তোর বাবাকে বলে মোবাইলটা এক্ষুনি নেওয়াচ্ছি।লজ্জা করে না! এতবড় মেয়ে এখনো ইংলিশ সাব্জেক্টে খারাপ করিস, বারবার বলেছি ফোন না টিপে একটু পড়। তাতে তোর’ই লাভ। কে শুনে কার কথা,মায়ের কথা তো বিষের মতো লাগে।”
কথাগুলো বলে ইন্সিয়ার আম্মু কোমড়ে শাড়ির আঁচল গুজে পাশের রুমে চলে গেলো। ইন্সিয়ার মনে কোনো ভাবান্তর নেই এসব বিষয়ে। ইন্সিয়া তার মায়ের কথাগুলো গুরত্ব দিলো না কারণ ইন্সিয়া জানে, সে ভালো পড়াশোনা করলেও সে ফেইল করবে।
ইন্সিয়াকে প্রতিটা এক্সাম টেস্টে ইচ্ছে করে ফেইল করানো হয়েছিলো তা ইন্সিয়া ভালো করেই জানে,
ইংলিশ টিচার অভিক রয় ইন্সিয়াকে ক্লাসে সবার সামনে অপমান করতো, বিভিন্ন কৌশলে কায়দা করে ইন্সিয়াকে স্পর্শ করার চেষ্টা করতো। ইন্সিয়া প্রথমে নিজের ভুল ভেবে নিলেও আজকের পর ইন্সিয়ার কাছে সব স্বচ্ছ কাচের মতো পরিষ্কার।
ইন্সিয়া মনে মনে ভাবতে লাগলো সেদিনের ঘটনা, যেখান থেকে ইন্সিয়ার কপালে এই দুর্দশার উৎপত্তি।
ইন্সিয়া আর উষ্মী দুই বান্ধবী, ক্লাস শেষ পিরিয়ডে ইন্সিয়া উষ্মীকে বলে,
“উষ্মী যাবি? আমার পানি তেষ্টা পেয়েছে খুব, বোতলে পানি নেই। চল না দারোয়ান কাকা থেকে জিজ্ঞেস করে আসি, এখন তো স্যার নেই চল”
ইন্সিয়ার কথা শুনে উষ্মী রাজি হলো ইন্সিয়ার সাথে যেতে পানি আনতে।
ইন্সিয়া আর উষ্মী দুই বান্ধবী মিলে দারোয়ানের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলো পানি কোথায় পাওয়া যায়।
ইন্সিয়া উষ্মী সবেমাত্র কলেজে নতুন ভর্তি হয়েছে, তাই কলেজের আনাচে-কানাচে, কোথায় কি, তাদের জানা নেয়। দারোয়ান ইন্সিয়াকে বলতে লাগলো
“পানি খাইবা মা? উই যে অফিস রুম দেখতাছো? এর পাশের রুমডাত খাইবার পানির ফিল্টার আছে। হজ্ঞল স্যার, ম্যাম ঐ খান থেইকা খায়,তুমি ঐখান থেইকা লইয়া আও পানি”
ইন্সিয়া দারোয়ানের কথানুযায়ী উষ্মীকে নিয়ে পানি আনতে চলে গেলো। অফিসরুম পার করেই পাশের রুমটাতে গিয়ে, বোতলে পানি ভরে নিলো। পানি বোতলে নেওয়ার পর ইন্সিয়া উষ্মীকে বললো
“উষ্মী তুই কি কলেজের এখানে আগে এসেছিলি?”
উষ্মী ইন্সিয়ার কান টেনে ধরে বলে,
“গাধী আমি এখানে নতুন তোর মতো।আগে যদি আসতাম তাহলে কি এতক্ষন দারোয়ান কাকাকে বিরক্ত করতাম পানির জন্য?”
ইন্সিয়া জ্বীভে কামড় বসিয়ে বলে “তাইতো ভুলে গেছি।চল একটু ঘুরি। কখনো এইদিকটাতে তো আসিনি। চল, পাশের রুমে মনে হয় ভাঙ্গাচোরা বেঞ্চ। দেখে আসি আই, যদি ভুত টুতের দেখা পায়”
উষ্মী মাথা নাড়িয়ে না সূচক জবাব দেয়, ইন্সিয়া জোর করে উষ্মীর হাত টেনে ধরে ভেতরে নিয়ে যায়, ভেতরে লাইব্রেরিতে সারি সারি বই সাজানো। ইন্সিয়া পানির বোতল উষ্মীর হাতে দিয়ে বই দেখতে লাগলো। উষ্মী বিরক্তিকর চোখমুখ খিঁচিয়ে বলে ওঠে “কিরে ইন্সু যাবি? ক্লাস মিস হলে তোর দোষ”
ইন্সিয়া আঙ্গুল মুখে দিয়ে ইশারায় চুপ করতে বলে উষ্মীকে। ইন্সিয়া পা টিপে টিপে উষ্মীর কাছে এসে বলে “কিছু শুনতে পাচ্ছিস? লাইব্রেরির ঐ পাশে মনে হয় কিছু একটা আছে”
উষ্মী ভয়ে ইন্সিয়ার হাত ধরে বলে ” বোন চল। আমরা চলে যায়।।সত্যি সত্যি ভুত আছে এখানে। চল পালাই”
ইন্সিয়া হাত ঝাকুনি দিয়ে বলতে শুরু করে
“আরে ভুত টুত কিছু নেই। এখানে অন্যকিছু আছে আমার দেখতে হবে”
উষ্মী রেগেমেগে ইন্সিয়াকে বলে “তুই থাক তোর ইনভেস্টিগেশন নিয়ে আমি গেলাম”
ইন্সিয়াকে ফেলে উষ্মী ক্লাসে চলে যায়।ইন্সিয়ার এতে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেয়, ইন্সিয়া পা টিপে টিপে গিয়ে লাইব্রেরির পাশে রুমটাতে আড়ি পাতে, ভেতর থেকে কিছু একটা পড়ে যাওয়ার শব্দ ইন্সিয়ার কানে ভেসে আসে। ইন্সিয়া ভয়ে নিজেকে আড়াল করে দরজার পাশে। হঠাৎ ইন্সিয়ার চোখ যায় দরজার ভাঙ্গা অংশ গুলোতে, ইন্সিয়া দরজার ভাঙ্গা ফুটক দিয়ে দেখে
তাদের ইংলিশ টিচার অভিক রয় গায়ে শার্ট জড়িয়ে বোতাম লাগাচ্ছে আর কাকে যেনো বলছে
“খবরদার যদি মুখ খুলেছিস তো, এখানেই পুতে দেবো তোকে,ক্লাসে যা আমি আসছি”
ইন্সিয়া থরথর করে কাঁপছে এসব দেখে,সে কখনো ভাবতে পারেনি এই কলেজে এমন কিছুও হয়। ইন্সিয়া দরজার পেছনে দাড়িয়ে ঢোক গিলছে, অমনি ভেতর থেকে একটা মেয়ে গায়ে ক্রস বেল্ট ঠিক করতে করতে বেরিয়ে চলে যায়। ইন্সিয়া মেয়েটার পরনে ইউনিফর্ম দেখে শিউর হয় এটা তাদের কলেজের’ই মেয়ে। কিন্তু মেয়েটার মুখ দেখা ভাগ্য হয়নি ইন্সিয়ার।
ইন্সিয়া দরজার পেছনে লুকিয়ে থাকার কারণে মেয়েটার মুখ দেখতে পারে নি।
তবে ইন্সিয়া বুঝতে পেরেছে অভিক স্যার মেয়েটার সাথে জঘন্য কিছু একটা নিশ্চয় করেছে। ইন্সিয়া চোখমুখ মুছে আস্তে করে দরজার পেছন থেকে বেরিয়ে যেতেই, কে যেনো ইন্সিয়ার কাঁধে হাত দেয়। ইন্সিয়া ভয়ে আৎকে উঠে।
ইন্সিয়া পেছনের ফিরে তাকানোর আগেই ইন্সিয়াকে মুখ চেপে ধরে সেই বদ্ধ নোংরা রুমটাতে নিয়ে আসে অভিক রয়।
রুমের দরজায় খিড়কি লাগিয়ে অভিক রয় বেল্ট ঠিক করছে আর ইন্সিয়াকে বলছে “কি? তোমার ও খুব শখ জেগেছে নাকি অভিক স্যারের আদর খাওয়ার? লুকিয়ে লুকিয়ে কি দেখছিলে? ভেবেছো আমি টের পায়নি? তুমি এসব দেখবে, সবাইকে আমার সম্পর্কে বলবে, আর আমি চুপচাপ কলেজ ছেড়ে দেবো ভাবছিলে? হা হা হা সোনামণি এসব চিন্তা বাদ দাও। তুমি যখন আমার কাছে নিজ থেকে ধরা দিয়েছো,তোমাকে তো খাতিরযত্ন করতে হয় নাকি?”
ইন্সিয়া ফুফিয়ে ফুফিয়ে কাঁদছে আর বলছে “আমি কিছু দেখিনি স্যার,আমায় যেতে দিন।আমি কেউকে কিছু বলবো না”
অভিক রয় হেসে বলে “তুমি এখনো ছোট।তোমার কথা কে শুনবে কে বিশ্বাস করবে? হাহাহা।”
ইন্সিয়া কান্নারত অবস্তায় হাতজোড় করে অভিক রয়কে বলে
“স্যার আমি হাতজোড় করছি আমায় যেতে দিন। আপনি আমার বাবার মতো,আমার সাথে এমন টা করবেন না স্যার”
অভিক রয় কিছু বলতে যাবে ঠিক তখন’ই ঘন্টা বেজে উঠে, অভিক রয় ইন্সিয়ার দিকে তাকিয়ে বলে
“তাই? বাবার মতো কিন্তু বাবা না।বুঝলে মামণি? আজ ছেড়ে দিচ্ছি কিন্তু কাল ঠিকই তোমাকে আমি দেখে নিবো,আর হে এই কথা যদি কোথাও লিগ হয়। বুঝতে পারছো তো? ভবিষ্যৎ জীবনের জন্য ঘুচিয়ে দেবো”
অভিক রয় কথাগুলো বলে কাঁপড়ে ঠিক করে বাহিরে বেরিয়ে গেলো। ইন্সিয়া চোখ মুছে ক্লাসরুমে চলে গেলো। উষ্মী ইন্সিয়াকে দেখে জিজ্ঞেস করে
“কিরে ভুত পেলি? চোখ মুখের এই অবস্তা কেন তোর? কি হয়েছে? ভয়ে কেঁদে দিলি মনে হয়?”
উষ্মী ইন্সিয়াকে কথাগুলো বলে হো হো করে হেসে উঠে। ইন্সিয়া উষ্মীর দিকে তাকিয়ে বেঞ্চে মাথা গুজে
বসে থাকে। উষ্মীর এবার খটকা লাগলো। উষ্মী ইন্সিয়ার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলতে থাকে
“রাগ করেছিস? ফেলে চলে এসেছি তাই? সরি রে।আমি আসলে ভুত ভয় পায়। সরি আর ফেলে যাবো না।মাফ করে দে ইয়ার”
ইন্সিয়া কোনো কথা না বলে মাথা গুজে আছে।
ইন্সিয়া সেই কথাগুলো আনমনে ভাবছে অমন সময় ইন্সিয়ার বাবা ইন্সিয়ার মাথায় হাত দিয়ে বলে “কিরে বুড়ি কি ভাবছিস? রেজাল্টের চিন্তা?কিছু হবে না পাশ করবি বুড়ি”
ইন্সিয়ার বাবার কথায় ইন্সিয়ার ভাবনার ঘোর ভাঙ্গে, ইন্সিয়া তার বাবার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে চুপ করে আছে, ইন্সিয়া ভাবছে কাল কি হবে তাঁর। কিভাবে এই নরক থেকে মুক্তি পাবে।
রাতের খাবার সেরে বিছানায় গা এলিয়ে দেয় ইন্সিয়া ঠিক তখন’ই আননোন নাম্বার থেকে ম্যাসেজ আসে
“কাল ইউনিফর্ম পড়ে আসবে না। কাল নরমাল কাঁপড় পড়ে আসবে, সাথে কোনো বাবা-মা গার্জিয়ান আনবে না।”
ইন্সিয়া ম্যাসেজটুকু পড়ে বুঝতে বাকি রইলো না এটা অভিক রয়ের ম্যাসেজ, ইন্সিয়ার চোখ বেয়ে অঝোরে পানি ঝড়ছে। কালকের কথা ভাবতেই ইন্সিয়ার ভয়ে বুক মুচড়ে উঠছে।
চলবে..