#রৌদ্র মেঘের আলাপণ
#পর্ব-১৮(অন্তিম)
#writerঃMousumi Akter
মেঘ-রৌদ্রর জীবনে শুরু হলো নতুন ঝড়।যখন সব টা গুছিয়ে দুজন দুজনের কাছাকাছি এসেছিলো ঠিক তখন ই শুরু হলো মহাপ্রলয়।এই প্রলয় শেষে কি নতুন ভোরের অপেক্ষা করছিলো তাদের জন্য নাকি লন্ডভন্ড হওয়ার জন্য শুরু হয়েছিলো এই ঝড়।মেঘ রৌদ্রের বুকে মাথা দিয়ে হাউমাউ করে কাঁদছিলো।সে রাত কেটে গেলো।সে রাতে প্রথম বার মেঘের আঙুলের ভাজে হাত রেখেছিলো রৌদ্র।মেঘ অনুভব করেছিলো রৌদ্রর প্রতি তার শারীরিক আকর্ষন।ভালবাসার পূর্ণতা শরীর মন উভয় ছুঁয়ে গেছিলো দুজনের মাঝে।
পরের দিন সকালে রৌদ্র দু-কাপ দুধ চা বানিয়ে মেঘের সাথে রুমে বসে খাচ্ছিলো।এমন সময় একটা ছেলে দরজায় কড়া নাড়লো।রৌদ্র দরজা খুলতেই ছেলেটি বললো,’স্যার একজন ভদ্রলোক আপনার ওয়াইফ এর সাথে দেখা করতে চাইছে।’মেঘ কথাটা শুনেই ভয় পেয়ে গেলো।মেঘ অতি ব্যাস্ত হয়ে বললো,
‘এই অচেনা জায়গা আমার সাথে কে দেখা করতে চাইবে রৌদ্র।নিশ্চয়ই মাহিম।আমি যাবোনা।কোথাও যাবোনা রৌদ্র আমার জীবন টা আবার এলোমেলো হয়ে যাবে।’
‘মেঘবালিকা মেঘবালিকা।দুইবার উচ্চারণ করলো রৌদ্র।তোমার মনের কথা জেনে গিয়েছি।এইবার কেউ তোমাকে আমার থেকে আলাদা করতে পারবেনা।তুমি আমার মানে আমার ই।আমি তো আছি ডোন্ট ওরি।’
রৌদ্র ছেলেটিকে বললো,
‘উনাকে ভেতরে পাঠিয়ে দিন।’
ঘরের ভেতর মাহিমের আগমণে যেনো থমকে গেলো সবকিছু।মেঘের আকাশে যেনো ঘন ঘন বজ্রপাত হচ্ছে।সত্যি মাহিমের মতো দেখতে।এটা কি মাহিম ছিলো।হুবহু একই রকম দেখতে।এটা মাহিম ই।মেঘ এর মাথা চক্কর দিলো আবার।মাহিম তাকিয়ে আছে অপলক মেঘের দিকে।কারো মুখে কোনো কথা নেই।
রৌদ্র নিরবতা ভেঙে বললো,
‘হেই ইয়াংম্যান।হাউ আর ইউ?’
‘আপনি?’
‘চিনতে পারলেন না।মালায়েশিয়াতে দেখা হয়েছিলো।এক ই হোটেলে ছিলাম।’
‘ওপস! মিষ্টার রৌদ্রুপ, আপনি এখানে।’
‘আমিতো এখানে বাট আপনি এখানে।মিরাক্কেল এর মতো লাগলো।’
‘মাহিম মেঘের কাছে এগিয়ে গিয়ে বললো,মেঘ একমাত্র মেঘ কে খুজতে খুজতেই আমার এখানে আসা।’
‘আপনি চিনেন তাকে?’
‘মেঘ আমার ওয়াইফ।’
‘মেঘ আপনার ওয়াইফ হলে মালায়েশিয়াতে যে মেয়ের সাথে ছিলেন সে কে।’
‘মিষ্টার রৌদ্রুপ আসলে ওই মেয়েটা আমার কিছুই হয় না একটা জালে আটকে গেছিলাম।আমাকে ফাঁসানো হয়েছিলো।যার জন্য মেঘের থেকে অনেক দূরে ছিলাম আমি এত দূর।’
‘থাক সেসব পরে শুনবো।আপনি মেঘের সাথে কথা বলুন।’
মাহিম মেঘের খানিক টা কাছাকাছি এগিয়ে গিয়ে বললো,
‘মেঘ তাকাও আমার দিকে।জানি তোমার বিশ্বাস হচ্ছেনা।ভালো ভাবে দেখো আমি মাহিম তোমার মাহিম।আমি অনেক কষ্টে পালিয়ে এসছি তোমার কাছে।’
মাহিম মেঘ কে জড়িয়ে ধরতে গেলে মেঘ ধাক্কা দিলো।অন্য কারো শরীরের স্পর্শ মেঘের ভালো লাগছিলো না।
‘মাহিম বললো,কি হয়েছে মেঘ।’
‘আপনি মাহিম?’
‘তুমি আমাকে আপনি করে বলছো কেনো।আমাকে এভাবে ধাক্কা দিলে কেনো মেঘ।?’
‘তো কি করবো আমি।আপনি দীর্ঘদিন পরে ফিরে এসে মাহিম পরিচয় দিলেই আমি আনন্দে আত্মহারা হয়ে গিয়ে আপনাকে জড়িয়ে ধরবো।আপনি মৃত অনেক রাত ঘুমোয় নি,কেঁদেছি,কষ্ট পেয়েছি আপনার মা বাবার অনেক বাজে কথা শুনেছি।দিনের পর দিন আপনার মৃত্যুর দায় আমার উপর চাপানো হয়েছে।অসহ্য নরকীয় জীবন যাপন করেছি।আপনি ছাড়া কি অসহায় জীবন কাটিয়েছি।অথচ আপনি দিব্বি সুস্থ আছেন।’
‘আমার ফিরে আসায় কি তুমি খুশী হও নি।’
‘না হইনি।কেনো খুশী হবো।’
‘তুমি কি সেই মেঘ।যে আমি বলতে পাগল ছিলো।’
‘হ্যাঁ আমি সেই মেঘ।যে আপনার ভালবাসা পেতে পাগল ছিলাম।একটা সুন্দর জীবন, আর সংসার চেয়েছিলাম।কিন্তু কি পেয়েছি আমি।জীবীত স্বামী মৃত সেজে থেকে আমাকে নরকীয় জীবন দিয়েছে।আমি সেই মেঘ তবে আমার স্বামি,সংসার, ভালবাসা সব বদলে গিয়েছে।’
‘মেঘ তুমি ছাড়া আমিও নরকীয় জীবনে ছিলাম।’
‘আপনার কি মনে হয় আমি কিছুই জানিনা।বিদেশে অন্য মেয়ে নিয়ে থেকেছেন, ঘুরেছেন,খেয়েছেন,জীবন টা উপভোগ করেছেন।কিন্তু কেনো?আমাকে কি পছন্দ ছিলো না।আমার সাথে কি সুখি ছিলেন না।আমাকে রেখে অন্য মেয়ের কাছে থাকতে নিজেকে মৃত বলেছেন।’
‘মেঘ এমন কিছুই না।’
‘এমন কিছুই না তো কেনো ছেড়ে গেছিলেন। হুয়াই মাহিম হুয়াই।’
‘মেঘ আমি জানি তোমার ভুল বোঝাটা স্বাভাবিক।কিন্তু আমার পুরা কথাটা শোনো।মালায়েশিয়া গিয়ে আমি এক বিদেশী মহিলার ফাঁদে পড়েছিলাম।আমার পাসপোর্ট আটকে দিছিলো।আমাকে মেরে ফেলার বিভিন্ন হুঁমকি দিয়ে আটকে রেখেছিলো।আমি অনেক কষ্টে পালিয়ে এসছি।চলো আমার সাথে মেঘ।’
‘সরি মাহিম আজ আর আমি তোমার সাথে যেতে পারবো না।তোমার চলে যাওয়ায় অনেক কিছু বদলে গিয়েছিলো আমার জীবনের।প্লিজ ক্ষমা করো আমায়।আমি এখন বিবাহিত।’
‘আই নো মেঘ, আমি জানি আমি ছিলাম না তাই তুমি রৌদ্রুপ কে বিয়ে করেছো।এখন তো আমি চলেও এসছি।’
‘মাহিম ঢাকা ফিরে কথা হবে তোমার সাথে আমার।সাত দিন পরে দেখা হবে।লোকেশন ঢাকা গিয়ে জানিয়ে দিবো।’
ঢাকা ফিরে সাতদিন পরে দেখা হলো মাহিম আর মেঘের।মাহিম মেঘ কে বললো আমি জানি সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছো তুমি।
তুমি একদম চিন্তা করোনা মেঘ আমি দুইটা ডিভোর্স পেপার নিয়ে এসছি।যেকোনো একটা তুমি বেছে নাও। যে কোনো একটা সাইন করে আমাদের মাঝে যে কোনো একজনকে বেছে নাও।মেঘ মাহিমের দিকে তাকিয়ে বললো,আমার জীবন টা কোথায় নিয়ে গিয়েছো দেখো মাহিম।আজ আমার দুইটা স্বামি,সামনে দুইটা ডিভোর্স পেপার।আমার জীবন টা কোথায় নিয়ে গিয়েছো দেখো মাহিম।তবে আজ আমার জীবনের সব থেকে খুশির দিন।কেনো জানো আজ অনেক বড় অশান্তি কেটে গিয়েছে আমার মন থেকে।তুমি ফিরে এসে অনেক বড় উপকার করেছো মাহিম।অনেক গুলো রহস্য ভেদ করতে পেরেছি।রৌদ্র ভালবাসার জন্য আমাকে আর দুবার ভাবতে হবে না।
মাহিম সন্দিহান ভাবে বললো মানে।
মেঘ বললো তৃধা এদিকে এসোতো।দেখো তো মাহিম ওরফে রেজওয়ান চিনো কিনা।কি ভেবেছিলে মাহিম খুব চালাকির সাথে পালিয়ে বেড়াবে কেউ বুঝতেও পারবে না।উপরওয়ালার মার এমন ই মাহিম।তৃধা কে ঠকিয়ে পালিয়েছিলে বিদেশ।বিদেশ এ একটা মেয়েকে ঠকিয়ে আমার কাছে এসে ধরা পড়লে তৃধার সামনে।খুব অবাক হচ্ছো তাইনা?ভাবছো তৃধা এখানে কিভাবে।তৃধা ই রৌদ্রর বোন মানে আমার ননদ।আসলে ভাগ্যর চাকা এভাবেই ঘোরে মাহিম।আজ কত সহজেই তৃধার সামনে এসে পড়লে।এটা আসলে উপরওয়ালার ই ইশারা।
–তৃধা মাহিমের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো।রাগে টগবগ করছে তৃধার শরীর।বাঘিনীর মতো জ্বলে উঠলো তৃধা।পায়ের জুতা খুলে মাহিমের গালে কয়েকটা বাড়ি মেরে বললো,তুই কি ভেবেছিস আমি কোনদিন তোকে চিনবো না।মাহিম ঘাবড়ে গিয়ে পালাতে গেলেই রৌদ্র মাহিমের কলার ধরে।রৌদ্র, মেঘ আর রাজনের বুঝতে বাকি নেই এই সেই রেপিস্ট।রৌদ্র নিজের সর্বশক্তি দিয়ে মাহিম কে আঘাত করলো।রাজন পুলিশে ফোন করলো।
–মেঘ মাহিমের গালে থুথু দিয়ে বললো তুই আমাকে বিয়ে করেছিলি কেনো তাহলে অমানুষ। আমকে বউ বানিয়ে ধ*র্ষন করেছিস তুই।আমাকে নামে মাত্র বিয়ে করেছিলি তুই।আমি তৃধা বিদেশে একটা মেয়ে সবার জীবন তুই একাই নষ্ট করেছিস।
–রৌদ্র বললো,অভিনয় টা দারুণ ছিলো মাহিম।কিন্তু স্ক্রিপ্ট টা সস্তা ছিলো।বিদেশে কেউ জোর করে তোকে আটকে রেখেছিলো খুব ই সস্তা স্ক্রিপ্ট ছিলো।বিদেশী কোনো মেয়ের এমন ঠেকা পড়েনি।তুই যে মেয়ের সাথে থাকতি তার সাথে যোগাযোগ ছিলো আমার।আমি সব ই জেনেছি তোর থেকে।মেয়েটার সাথে ফেসবুকে যোগাযোগ তোর।তার টাকা পয়সা নিয়ে পালিয়েছিস।তৃধা তোকে দেখেই চিনে ফেলেছিলো যখন তুই আমাদের রুমে এসেছিলি তৃধা তখন বাইরে ছিলো।একমাত্র তোকে ঘিরেই সব অশান্তি ছিলো মেঘ তৃধা রাজন আর আমার জীবনে।এখন সবার জীবনে শান্তি আসবে।
–পুলিশ মাহিক কে গ্রেফতার করলে মাহিম সব স্বীকার করে।তৃধাকে ধর্ষন করার পর পালানোর জন্য বিদেশ গেছিলো।নিজের শরীরের লাল রং মেখে ছবি পাঠিয়েছিলো। তৃধার কেস থেকে বাঁচতেই ভয়ে পালিয়েছিলো।রাজন মাহিমের কেস টার দায়িত্ব নিয়েছিলো।তৃধা আর রাজনের বিয়ে হলো।মেঘ রৌদ্রের জীবনে শুরু হলো নতুন অধ্যায়।মেঘের বাবা রৌদ্রের কাছে তার ভুলের জন্য ক্ষমা চাইলো।
রৌদ্রের ভালবাসায় মেঘ -রৌদ্রের জীবনে নতুন সূর্যদ্বয় উঠলো।ছন্দে আনন্দে পূর্ণতা পেলো ভালোবাসা।রৌদ্র আর মেঘের আলাপণ চলুক দীর্ঘদিন, দীর্ঘকাল।
সমাপ্ত।