লীলাবালি পর্ব-১৯+২০+২১

0
469

#লীলাবালি🌺
#পর্ব_১৯
আফনান লারা
.
জুথিদের কদিন ক্লাস হবেনা।অর্ণবদের পরীক্ষার কারণে।
জুথি তার বাসায় অবসর সময় কাটায় আর অর্ণব মেসে বইতে মুখ গুজে।পরীক্ষা এসে গেলে তার আর কোনোদিকে মনযোগ যায়না।শুধু বই আর বই।আর পড়াশুনা।খাওয়ার কথাও ভুলে যায় কখনও কখনও।
ফেসবুকে এক্টিভ ছিল কত ঘন্টা আগে!!!
জুথির মনে ছিল না ওর কথা।ফেসবুকের নিউজফিড স্ক্রল করতে করতে হঠাৎ অর্ণবের পুরনো একট ছবি এসে পড়লো সামনে।কে যেন কমেন্ট করেছে তাই পোস্টটা এসেছে।ছবিটা অর্ণব তার মা বাবাকে সামনে রেখে তাদের পেছনে দাঁড়িয়ে তুলেছিল।প্রায় চার বছর আগের ছবি এটা।ওর মাকে আর বাবাকে দেখে নিলো জুথি।মাকে দেখে ঠাণ্ডা স্বভাবের মনে হলো।আর বাবাকে একটু রাগী।তবে ভাইয়ার কাছে উনার কথা শুনে মনে হলো উনার বাবা অনেক রাগী।
নেট থেকে চলে আসবার ঠিক সময়ে অর্ণবকে এক্টিভ দেখলো সে।তাও কিছু বললোনা না।নিজ থেকে মেসেজ দিলে যদি অন্য কিছু ভাবে?
আজকে ওনার সঙ্গে যে কফি সে খেয়েছিল তার একটা ছবি তুলেছিল।শুধু কফির মগের ছবি।মেসেঞ্জার ডে তে দিয়ে দিলো সেটা।অর্ণব সিন করেছে সবার আগে।
জুথি মিটমিট করে হাসছে তাও মেসেজ করছেনা।শেষে অর্ণবই জুথিকে মেসেজ দিয়ে বললো,’কফি কেমন ছিল বললেন না?’

জুথি উত্তরে লিখলো,’কফিটা কি আপনি বানিয়েছিলেন?’

-“আমি রান্নায় অপটু। কফি বানাতে পারিনা।কফির বিলটা আমি দিয়েছিলাম সে সূত্রে জিজ্ঞেস করা!’

জুথি হাসির ইমুজি দিয়ে বললো,’ভালোই।কফির সঙ্গে স্ন্যাকস্ থাকলে আরও ভাল্লাগতো।তবে আপনি চাইলে সেই ট্রিট আমি দিতে পারি’

অর্ণব লিখলো যা হবার পরীক্ষার পরে হবে।জুথি ও মেনে গেলো।
অর্ণবের পরীক্ষা চলাকালীন সে একদিনের জন্যও আর নেটে আসেনি। জুথি ফ্রেন্ডদের সাথে একটা রেস্টুরেন্টে এসেছিল একদিন। সেখানে আদিলের সঙ্গে দেখা হলো ওর।অনেকদিন ধরে অর্ণবকে এক্টিভ দেখছেনা বলে কন্ট্যাক্ট করার ইচ্ছা হলো।আদিলকে সে জিজ্ঞেস করলো অর্ণব এখন কোথায়।
আদিল বলতে পারলোনা অর্ণবের কথা।শেষে জুথি অর্ণবের নাম্বার চাইলো কিন্তু অর্ণবের নতুন সিমের নাম্বার নাকি আদিলের কাছে নেই।
জুথি মন খারাপ করে চলে আসতে নিতেই আদিল ছুটে এসে জানালো আজ থেকে ২দিনের জন্য মাঠে বইমেলা হবে,অর্ণব সেখানে থাকতে পারে।জুথি থ্যাংকস জানিয়ে চলে আসলো বাসায়।কথা হলো এত মানুষের ভীড়ে সে কি করে খুঁজবে?
বিকালে শাড়ী পরে চুলে খোঁপা করে গায়ের শাল জড়িয়ে চললো সে মেলায়।সাথে দুটো ফ্রেন্ডকেও নিয়েছে।
বইমেলাতে এসে ওদের রেখে সে অর্ণবকে খুঁজতে লাগলো।অর্ণব একটা বইয়ে স্টলের সামনে দাঁড়িয়ে বই দেখছিল।জুথিও ঠিক সেই স্টলের সামনে এসেই কোমড়ে হাত রেখে এদিক ওদিক দেখছে।অর্ণব সাদা শাল পরেছিল।মাথা গুরাতেই জুথির সঙ্গে লেগে গেলো আলতো একটা ধাক্কা।জুথি খেয়ালই করেনি।অর্ণবও খেয়াল করেনি।
তার চোখ পুরো মেলার দিকে।অর্ণব জুথির পারফিউমের সুগন্ধটা চিনে ফেলতেই পাশে তাকালো।জুথিকে শাড়ীতে দেখে সে চোখ কপালে তুলে বললো,’আজ আপনার বিয়ে নাকি?’

জুথি কথাটা শুনে পেছনে তাকিয়ে অর্ণবকে দেখে বললো,’বিয়ে হবে কেন?আমার বিয়ে এত জলদি হচ্ছেনা। তা আমাকে চিনলেন তো?আপনার তো আমার চেহারা দেখলে আলাপ করতে ইচ্ছে হয়।নেটে আপনার খবরই থাকেনা।’

অর্ণব স্টলের কোণা থেকে বেরিয়ে জুথির সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে বললো,’আসলে আমার মেসের ওয়াইফাই কাজ করছেনা।তাই অফলাইন ছিলাম।বাসা থেকে বের হইনা।সারাদিন পড়া নিয়ে থাকি তো তাই আর এমবি কিনা হলোনা’

জুথি কপাল কুঁচকে বললো,’এখন তো বের হলেন’

-“হুম।যাবার সময় এমবি কার্ড কিনে নিতাম।তা এমন সাজের কারণ জানতে পারি?’

-“বইমেলাতে বেশিরভাগ মেয়েরা শাড়ী পরে আসে জানেন না??সুন্দর লাগে’

অর্ণব দাঁত কেলিয়ে বললো,’আপনাকে তো পেত্নির নানির মতন লাগে।’

জুথি রেগে অর্ণবের পিঠে কিল বসিয়ে দিয়ে পরে কি মনে করে মুখে হাত দিয়ে বললো,’সরি!’

-‘সমস্যা নেই।আমার সাথে আপনি ফ্রি হতে পেরেছেন এটাই বা কম কিসের?আমাকে যে ট্রিট দিবেন বলেছেন সেটার তারিখ কি আজ?নাকি আরেকদিন?’

-‘আপনার পরীক্ষা শেষ হয়নি তো, আপনি বললেননা শেষ হলে?এখন একা একটা নারী,তাও শাড়ী পরা।তার সঙ্গে রেস্টুরেন্টে সামনা সামনি বসলে আপনার মাথা থেকে পড়া চলে যাবেনা তো আবার?’

অর্ণব হাসলো।টিস্যু দিয়ে নাক মুছে বললো,’আমি এত সহজে প্রেমে পরিনা’

-“সর্দি??’

-“প্রচুর”

-‘গলা শুনে মনে হলোনা একবারও।’

-“আমার সর্দি হলে গলার আওয়াজে কোনো চেঞ্জ হয়না।ভেতরের শরীরের অবস্থা চেঞ্জ হয়।বাহিরে দিয়ে হাঁচি না দিলে টের পাওয়া মুশকিল’

কথা বলতে বলতে মেলার পেছনের রোড দিয়ে তারা একটা রেস্টুরেন্টে আসলো।নিরিবিলি দেখে একটা জায়গাতেও বসলো।দুজন দুপাশে।জুথি মেণুকার্ড দেখে পাস্তা অর্ডার করেছে।সাথে কফি অর্ডার করতে গিয়ে দেখলো চায়ের জায়গায় নানা ধরণের চা আছে।তুলসি চা,আদা চা।
জুথি তুলসি চায়ের অর্ডারটাও দিলো।
অর্ণব নড়ে বসে বললো,’প্লিজ।তুলসি চায়ের মতন জঘন্য চা খেতে আমায় জোর করবেননা।আমাকে এত বড় টর্চার করিয়েননা”

-‘সর্দির জন্য খেতে হয়।এই টুকু কষ্ট করলে রাতে ভাল ঘুমাতে পারবেন।দেখুন না,আপনি খাবেন বলে আমি সুস্থ মানুষ হবার পরেও আমার নিজের জন্যও তুলসি চা অর্ডার করেছি।’

অর্ণব কিছু না বলে গাল ফুলিয়ে বসে রইলো।
জুথি ফোন বের করে রেস্টুরেন্টের ছবি তুলছে।অর্ণব ঘাঁড় ঘুরিয়ে বললো,’আমার তুলবেননা?নাকি আমি সহ পিকচার ডে দিলে আপনার ছেলে বন্ধু কমে যাবে?’

-“উল্টো কথা বললেন।আপনাকে নিয়ে পোস্ট করতে আমার দুবার ভাবতে হয়।ভয় হয়।আপনার যে পরিমাণ মেয়ে ভক্ত আছে।গুনে শেষ করা যাবেনা।আমি যদি একটা পোস্ট করি দিনে দশজন করে কমবে’

-“সেটা জানি।তবে পোস্ট করতে পারেন।আমার আপত্তি নেই।’

পাস্তা খাওয়ার সময় অর্ণবের পাঞ্জাবির বোতামের জায়গায় চিজ পড়েছিল।সে দেখেনি।জুথি টিস্যু দিয়ে মুছে দেবার পর কি ভেবে জিভে কামড় দিয়ে বললো,’সরি।একটু বেশি ফ্রি হয়ে যাচ্ছি।আমি আজ আসি’

জুথি উঠে যাওয়া ধরতেই অর্ণব ওর হাত ধরে ফেললো।ওর দিকে তাকিয়ে থেকে বললো,’এটা অস্বাভাবিক কিছুনা।আমি মাইন্ড করিনি,অথবা আপনাকে খারাপও ভাবছিনা।এরকম হীনমন্যতায় ভুগবেননা’

জুথি পেছনে তাকাতেই অর্ণব হাত ছেড়ে দিলো।
নিচের দিকে তাকিয়ে সে আবার নিজের চেয়ারে বসলো চুপচাপ।নিচের দিকে তাকিয়েই খাবারটা শেষ করেছে।
শেষে আসলো তুলসি চায়ের পর্ব।অর্ণব নাক টিপে এক ঢোক গিলে চেঁচামেচি করলো। এরপর ঠাস করে টেবিলে মাথা রেখে বললো,’এমন চা যেন আর কোনোদিন আমাকে না খেতে হয়’

জুথি হাসছে শুধু।অর্ণব মাথা তুলছেনা টেবিল থেকে।বসে বসে সর্দিকে গালি দিচ্ছে।অনেক কষ্টে সে তুলসি চা শেষ করলো।
জুথি বিল দিতে যেতেই অর্ণব ছোঁ মেরে বিলের কাগজটা ওর থেকে কেড়ে নিয়ে বললো,’আমি বললাম খাওয়াতে তাই বলে খাওয়াইছেন।কিন্তু বিল যে আপনাকে দিতে হবে তা তো বলিনি?’

অর্ণব বিল পে করে হাঁটা ধরলো।জুথি সাথে আসতে আসতে বললো,’লেকের পাড়ে যাবেন?’

-‘যেতে পারি যদি আপনি শালটাকে মাথায় ঘোমটার মতন করে টেনে নেন’

-“কি জন্য?’

-“ওখানে আমার ফ্রেন্ড সার্কেলের প্রায় সবাই আড্ডা দেয়।আমার সঙ্গে নরমালি কোনো মেয়ে দেখলে তারা এত সিন ক্রিয়েট করবেনা যতটা আপনাকে দেখলে করবে’

জুথি ওর কথামতন শাল দিয়ে মুখ ঢেকে অর্ণবের সঙ্গে চললো।অর্ণব সামনের দিকে তাকিয়ে হাঁটছিল।জুথি ওর অগোচরে ওকেই দেখছে।সে রেস্টুরেন্টে যেভাবে হাত ধরেছিল, জুথির কেমন যে লেগেছিল তা যদি একবার ভাষায় প্রকাশ করতে পারতো।হঠাৎ একটা ছোট্ট ছেলে গোলাপের ঝুড়ি নিয়ে এগিয়ে এসে অর্ণবের পথ আটকে বললো,’আপুকে একটা কিনে দেন ভাইয়া’

জুথি মূর্তির মতন দাঁড়িয়ে অর্ণবের দিকে চেয়ে আছে,সে কি করে তা দেখতে।অর্ণব ছেলেটার কথামতন একটা গোলাপ কিনে নিলো।ছেলেটা চলে যাবার পর গোলাপটা ওর দিকে ধরে বললো,”নিবেন তো নাকি আবার আদিলকে দিয়ে আপনার বইয়ের পাতার মাঝে রেখে আসতে হবে?’

জুথি গোলাপটা নিয়ে বললো,’নাহ।এখন আর রাগ নেই স্যার’

-‘আচ্ছা একটা প্রশ্ন করবো?’

-“জ্বী”

-“আর পাঁচটা মেয়ের মতন আপনিও কি অর্ণব স্যারের প্রেমে পড়ে গেছেন?’

-“আগে আপনি বলুন আপনার কি মনে হয়?’

-‘আমি বুঝতে পারছিনা বলেই তো জিজ্ঞেস করলাম।আর বাকিদের বেলায় বুঝে যেতাম কারণ তারা সরাসরি এসে প্রস্তাব দিতো।কিন্তু আপনার হাবভাবে তেমনটা মনে হয়েও হয়না।গোলমাল মনে হয় পুরোটা।তাই সোজা আপনার থেকেই জানতে চাইছি’

-“সবাই যাকে পছন্দ করে তাকে আমি পছন্দ করিনা, নরমালি এমনটাই হয়ে এসেছে।তবে আপনার বেলায় শুরুতে পছন্দ না করলেও আস্তে আস্তে আপনাকে ভালো মানুষ মনে হলো।আর ফিলিংস এত জলদি হবার জিনিস না আসলে।আর কিছু জানতে চান?’

-“আপনি যথেষ্ট ম্যাচিউর একটা মেয়ে।সেদিন রাগ করে বললাম শিক্ষার অভাব।আসলে এই কথাটা বলা আমার একদমই উচিত হয়নি।আপনি ভুলতে পারলেও আমি ভুলতে পারছিনা’

চলবে♥

#লীলাবালি🌺
#পর্ব_২০
আফনান লারা
.
নিজের উদ্যোগে কুসুম একা একা বিছানা থেকে বাড়ির উঠোনের শেষ প্রান্ত অবধি আসতে পেরেছে।মা বাবা ফলপাকড় সব আশেপাশের মানুষদের দিয়ে এসেছে।ঐ লোকগুলোর দেওয়া কিছুই তারা মুখে তুলবেননা।কলি কমলা খাওয়ার জন্য অনেক জেদ ধরেছিল।শেষে মায়ের ধমকে আর কিছু বলার সাহস পায়নি।
কুসুম মা বাবাকে না জানিয়ে ব্যাথা যুক্ত পা নিয়ে খুড়িয়ে খুড়িয়ে নদীর পারে চলে এসেছিল।এখানে না আসলে ওর শান্তি লাগেনা।
তবে বটতলায় যায়নি পোকাটার ভয়ে।নদীর কিণারায় বসে পানি দেখছিল আর তার সাথে নীল আকাশ।আকাশের দিকে তাকালে মন ভাল হয়।আকাশ হলো মন ভালো করবার ঔষুধ।
কুসুম নদীর পানিতে চোখ রেখে পানিতে আকাশ দেখছিল সেসময়ে তার পাশে প্রতিচ্ছবি দেখলো একটা মেয়ের।চমকে পেছনে তাকালো সে।
মেয়েটার গায়ের পোশাক দেখে কুসুম চমকালো।মেয়েটা যেন কুসুমকেই নকল করতে চেয়েছে।সে কুসুমের ওমন করে তাকিয়ে থাকা দেখে বললো,’হেহে!আমিও তোমার মতন হতে চেয়েছিলাম কিন্তু গায়ের রঙ মিললোনা তবে বাকি সব মিললো’

কুসুম হাসলো।মেয়েটা কুসুমের পাশে বসে বললো,’তোমার পায়ের ব্যাথা ভাল হইছে?’

-“তুমি জানলে কি করে?’

-“জানি জানি।আমি সব জানি’

কুসুম মেয়েটার নাম জিজ্ঞেস করায় সে বলেছিল তার নাম কূর্নি।
এরকম উদ্ভট নাম এর আগে সে শোনেনি।তাই কৌতূহল নিয়ে মেয়েটার বাড়ি কোথায় সেটা জিজ্ঞেস করলো কারণ ওকে দেখে এলাকার মনে হলোনা।মেয়েটা হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ে বললো,’যাবে আমাদের বাড়ি?’

-“তোমাদের বাড়ি কোথায় সেটা তো বললেনা’

-“এই তো সামনেই।জঙ্গল আছেনা?ওখানেই’

কুসুম চোখ বড় করে বললো,’শুনলাম ওখানে দস্যু থাকে।অনেক আগে শুনেছিলাম। আমি একদম ছোট থাকতে’

মেয়েটা নিশ্চয়তা দিয়ে বললো ওখানে এখন আর দস্যু থাকেনা।সুন্দর নিরিবিলি গ্রাম তৈরি হয়েছে।কুসুম মন খারাপ করে বললো,’যদিও ওখানে যাবার আমার অনেক ইচ্ছে ছিল কিন্তু আমার পায়ে অনেক ব্যাথা।হাঁটতে পারবোনা’

-‘আরেহ আমি আছিনা?চলো আমার সাথে।এই তো কাছেই।কতই বা সময় লাগবে?’
—–
অর্ণবের পরীক্ষা শেষ।কেটে গেছে একটা মাস।
ঈদের বাকি ছিল মাত্র একটা দিন।
সেই দিনই ব্যাগ গুছিয়ে সে তৈরি কুমিল্লা যাবে বলে।একসাথে যাওয়া নিয়ে জুথি অনেকবার ফোন করেছে সাথে সেও।
এ কয়েকটা দিন মেয়েটার সাথে ভালোই বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক হয়ে গেছে।ফোন নাম্বার নেওয়া হয়েছে।অফলাইন থাকলেও কল করে তাদের কথা হতো টুকিটাকি ।এখন একজন আরেকজনের বেশ ভাল বন্ধু।
জুথিকে ফোনে না পেয়ে অর্ণব ব্যাগ হাতে ওদের বাসার দিকে চললো।এসে জানতে পারলো ম্যাডাম সেই এক ঘন্টা আগে গোসলে গেছেন এখনও ফেরেননি।ওর সামনে সোফায় ফরহাদ বসে আছে।চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা।হাতে এক বাটি আপেল কাটা।ফরহাদ চশমা ঠিক করে বাটিটা এগিয়ে ধরে বললো,’আপেল খাবে?’

-“নাহ।তুমি খাও’

-‘খাও।কেউ কিছু দিলে সেটা খেতে হয়’

-‘এই কথা তোমায় কে শিখিয়েছে?’

-‘ভাল কথা কেউ শেখাতে হয়না।মন থেকে বানিয়ে বানিয়ে বলতে হয়’

অর্ণব কপালে হাত দিয়ে বললো,’এটা ভাল কথানা।বাহিরের কেউ কিছু দিলে কখনওই সেটা খাবেনা।মনে থাকবে?’

-“আমি তোমাকে খাওয়াতে চাই কারণ তোমায় আমার একটা কাজ করতে হবে’

-“কি কাজ?’

-‘বাবাকে বলবে আমাকেও যেন কুমিল্লা যাবার পারমিশন দেয়’

বাবা ভেতরের রুম থেকে এসে বললেন,’তা হচ্ছেনা।আমি বাহিরে গেলে তুই দাদা দাদিকে দেখে রাখবি।ঘরে একজন সবসময় থাকা জরুরি।বুয়ার উপর নির্ভর করে আমি তাদের রাখতে পারবোনা।জুথি তোর আর কতক্ষণ লাগবে?অর্ণব বসে আছে সেই কখন থেকে।
জুথি আসছি বলে একটা নতুন থ্রি পিস পরে জলদি করে ওয়াশরুম থেকে বের হলো চুলে তোয়ালে পেঁচিয়ে।
জনাব করিম অর্ণবকে বললেন,’চেয়েছিলাম ঈদটা এখানেই করুক।কিন্তু তুমি তো ঈদের আগেই চলে যাবে তাই জুথিকে আজই পাঠাতে হচ্ছে।তোমায় বেশিদূর যেতে হবেনা।ওকে কুমিল্লায় নেমে একটা রিকশা ধরিয়ে দিলেই হবে’

-‘আচ্ছা সমস্যা নেই।আমি পৌঁছে দেবো’

জুথি ব্যাগটা হাতে বেরিয়ে দাদা দাদিকে সালাম করে বাবাকে বিদায় দিয়ে অর্ণবের সাথে বের হয়ে গেছে।দুপুরবেলা তখন।যেতে যেতে দু ঘন্টা লেগে যাবে।
——
-‘কুসুম বোন দাঁড়াও।কোথায় যাচ্ছো তুমি?’

কলির আওয়াজ পেয়ে কুসুম থেমে গেলো।কূর্নি নামের মেয়েটার সঙ্গে জঙ্গলের দিকে যাচ্ছিলো সে।কলি ছুটে এসে কুসুমের হাতটা কূর্নির হাত থেকে ছাড়িয়ে বললো,’কে তুমি?আমার বোনকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছো?’

কূর্নি কিছু বলছেনা।মা বাবা ও চলে এসেছেন ততক্ষণে।কূর্নিকে তারা জেরা করলো কেন সে কুসুমকে জঙ্গলের দিকে নিয়ে যাচ্ছিলো।
কুসুম তাদের থামিয়ে বললো,’আরে ওখানে তো নাকি দস্যু থাকেনা এখন আর।আমার খুব ইচ্ছে ওদিকে একবার যাবার।’

বাবা কুসুমকে ধমক দিলেন।কূর্ণি মুখটা ফ্যাকাসে করে চলে গেছে এক ছুটে।মা বাবা কুসুমকে ধরে ঘরে নিয়ে আসলেন।ওকে তারা এখনও বললেন না সত্যিটা।
কুসুমকে বিছানায় বসিয়ে হাঁপ ছেড়ে বাঁচলেও পরে মাথায় চাপলো মেয়েটাকে নিশ্চয় আমির তিয়াজির লোকেরা পাঠিয়েছিল কুসুমকে নিতে।এত বড় স্পর্ধা দেখিয়েছে।না জানি এরপরে তারা কি করে বসবে!
মা, বাবার দিকে তাকিয়ে বললেন,’কুসুমের পা তো ভালো হয়নি।ভারত আজকে যাবার কথা ছিল।কি করবে এখন?’

-“আমি কিছু জানিনা।আজকে মেয়েটাকে পাঠিয়ে দিতে পারলে এই দিন দেখতে হতোনা।না জানি সামনে কোন বিপদ আছে’

-“ওর পায়ের বিষটাই এত জঘন্য দিয়েছে যে মেয়েটা আমার এখন পর্যন্ত সুস্থ হয়নি’
——
বাসে দুটো সিট নিয়ে তারা দুজন বসেছে।জুথি জানালা খুলে দিয়েছে চুলটা শুকাতে।অর্ণব সরে বসে বললো,’এমন বাতাসে কেউ বাসের জানালা খোলে?গা কাঁপছে আমার।বন্ধ করেন’

-“না করবোনা।আমার চুল শুকাতে হবে’

-‘ঠাণ্ডা লেগে যাবে আমার’

-“জানালার পাশে আমি বসেছি।আমার ঠাণ্ডা লাগার কথা’

অর্ণব মুখ ঘুরিয়ে বসে থাকলো রাগ করে।জুথি জানালা বন্ধ করে মুচকি হেসে বললো,”বন্ধ করলাম।এবার তাকান আমার দিকে।’
অর্ণব মনে হলো ঘুমে।জুথি অবাক হয়ে গেলো।এত কম সময়ে কেউ ঘুমিয়ে পড়তে পারে?মাথা উঁচু করে দেখতে চাইলো সত্যি ঘুমে নাকি নাটক করছে।ঠিক তখনই বাস ব্রেক কষতেই জুথি পড়ে যাওয়া ধরলো পিছলে।অর্ণব শক্ত করে ধরে বললো,’করছেন টা কি?’

-“আপনি ঘুমাননি?’

-“এখন কি ঘুমানোর সময়?বিকাল হতে চললো।আমি পাশ ফিরে গান শুনছিলাম।বাংলা পুরোনো গান।আপনি কি করছিলেন?’

-‘কিছুনা।ধন্যবাদ আমাকে পড়ে যাওয়া থেকে বাঁচানোর জন্য’

-“বাস বলে পেরেছি।খালি রাস্তায় হলে পারতাম না।আপনার যে বডি।মুটকি একটা!🙄’

জুথি রেগে গিয়ে বললো,’আমি মুটকি?এটাকে বলে পারফেক্ট বডি।’

অর্ণব হাসতে হাসতে দেখলো মায়ের ফোন এসেছে।রিসিভ করে হ্যালো বলতেই মায়ের গলা শুনে অন্যরকম লাগলো আজ।

-‘মা?কাঁদছো তুমি?কি হয়েছে?আমি তো আসতেছি বাড়িতে।বাসে এখন।কুমিল্লার কাছাকাছিও এসে গেছি’

-“কাঁদছি অন্য কারণে।কুসুম তো আজ চলে যাবে রে বাবা!!আমরা মেয়েটাকে হারিয়ে ফেললাম!’

অর্ণব জুথির দিকে তাকালো।জুথি জানালার সাথে লেগে ছবি তুলছে বাইরের।
অর্ণব জিজ্ঞেস করলো কই যাবে সে।মা জানালেন আজ কুসুমের ভারতে চলে যাবার দিন।
এর উত্তরে কিছুই বললোনা।শুধু বললো,’ভাগ্যে যে নেই সে তো যাবেই।যদি আমি তার ভাগ্যে থেকে থাকতাম তবে আজ সে ভারত চলে যেতো না।বুঝেছো তো?ওর সাথে আমার জোড়া লাগেইনি।লেগেছে আরেকজনের সঙ্গে।’

কথাটা বলে অর্ণব জুথির সাদা ওড়নাটার সুতো নিজের ঘড়ি থেকে ছুটিয়ে নিলো।
চলবে♥

#লীলাবালি🌺
#পর্ব_২১
আফনান লারা
.
কুমিল্লায় এসে যেখানে বাস থামার কথা তার দুই মাইল আগে বাসের ইঞ্জিন নষ্ট হয়ে গেলো।অনেকক্ষণ বসেও কোনো কিছুর উন্নতি হচ্ছেনা দেখে যাত্রীরা কেউ কেউ নেমে চলে যেতে লাগলো।কেউবা বসে অপেক্ষা করছে স্টেশন পৌঁছার।বিকালের শেষ সময় এখন। ধীরে ধীরে অন্ধকার নামছে।
জুথি জানালার কাঁচে মাথা ঠেকে ঘুমাচ্ছিল। অর্ণব ফোন বের করে একটা মজার ভিডিও দেখছিল।একটা শব্দে জুথির ঘুম ভেঙ্গে গেছে। ঝাপসা চোখে জানালা দিয়ে বাহিরে তাকিয়ে পথে কিছু বন্যফুল নজরে আসলো।সাদা রঙের।তবে সেটা অনেকদূরে।এই রোড পেরিয়ে আরেকটা রোড ও পের হতে হবে।গাড়ী ঠিক হতে আধ ঘন্টা লাগবে শুনে জুথি অর্ণবকে বললো উঠে দাঁড়াতে সে নামবে।অর্ণব ওকে যেতে মানা করার সত্ত্বেও সে ঘাউরামি করে ওকে উঠিয়ে নিজেই চললো ফুল আনতে।
সবাই বাস থেকে ব্যাগ নিয়ে চলে যাচ্ছে।অর্ণবের বাসা দূরে তবে এরকম আর কতক্ষণ বসে থাকা হবে?যেখানে সিএনজি নিলেই প্রবলেম সলভড্।
তাই সে নিজের ব্যাগ আর জুথির ব্যাগ নিয়ে বের হয়ে গেলো বাস থেকে।দরকার হলে স্টেশন পৌঁছাতে একটা রিকশা নিবে তারা।জুথি রোড একের পর একটা পেরিয়ে ফুলগুলোর কাছে এসে দুটো ছিঁড়ে মাথায় লাগালো।অর্ণব রোড দেখতে দেখতে পার হয়ে এদিকে আসছিল।রোড পেরিয়ে কাছাকাছি এসে জুথিকে সাদা ফুল মাথায় পরতে দেখে অবাক হয়ে চেয়ে রইলো।সাদা থ্রি পিসের সাথে মাথার সাদা ফুলটা যেন একটা সৌন্দর্য্যটাকে পরিপূর্ণ রুপ নাম দিয়েছে।জুথি হাত নাড়িয়ে বললো’কোথায় হারিয়ে গেলেন?ব্যাগ এনেছেন কি জন্যে?’

-“মনে হয় আরও বসে থাকতে হতো।তাই ব্যাগ নিয়ে চলে আসলাম।রিকশা একটা নেবো এখন।আপনার চাচার বাসা কোন জায়গায়?’

-“ওসব পরে।আগে আমার একটা ইচ্ছা পূরণ করবেন?’

-“কি ইচ্ছা?’

-“এটা নদী না??আমাকে প্লিজ এই সেতু দিয়ে ঐ যে নিচে নামার জায়গা আছে ওখান থেকে একটু ঘুরিয়ে আনবেন?’

-‘অসম্ভম।সন্ধ্যা হয়ে এসেছে।এটা সম্ভব না।আপনার কি ডর-ভয় নাই?ওখানে কত খারাপ লোক থাকে!’

-“একজন পুরুষ আপনি।একটা মেয়েকে বাঁচাতে পারবেননা?’

-‘অবশ্যই পারবো।কিন্তু আমার মতন ১০জন পুরুষ একত্রিত হলে আমার দ্বারা সম্ভব হবেনা আপনাকে বাঁচানো।তাই বলছি বিপদের দিকে ঝুঁকবেননা।আমার সাথে আসুন।
রিকশা নিয়ে স্টেশন অবধি গিয়ে আমি আপনাকে সিএনজি ধরিয়ে দেবো’

-“না না না।আমি কিছু শুনতে চাইনা।দেখুন লঞ্চ স্টিমারের আলো কি সুন্দর লাগছে ভিউটা।আমি কাছ থেকে দেখবো।প্লিজ!’

জুথি অর্ণবের সামনে হাতজোড় করতে লাগলো।অর্ণব বাধ্য হলো রাজি হতে।নিজের ট্র্যাভেল ব্যাগটা আর জুথির ব্যাগটা এক হাতে নিয়ে চললো ওর পিছু পিছু।বেশি ভারী না।পালকা বেশ ব্যাগগুলো।
জুথি সেতু থেকে উঁচু নিচু পথ ধরে নিচে নেমে গিয়ে সেকি লাফালাফি তার।অর্ণব একটা শুকনো জায়গায় বসে পড়েছে ঘাসের উপর।তার জানা আছে জুথি এই লাফালাফি অনেক সময় ধরে করবে।এখানে কোনো মাটি নেই।সব বালু!সাদা বালু।
লাল বালু।ট্রাক কতগুলো আশেপাশে থেমে আছে।আবার দূরে বন দেখা যায়।
ফোন বের করে দেখলো মায়ের মিসড্ কল।ব্যস্ত হয়ে সে কল ব্যাক করেছে।মাকে জানালো তার আসতে আরও কিছু সময় লাগবে।রাত হতে পারে।
জুথি ছবি তুলতে তুলতে কেথায় যন চলে গেছে।সামনে ওকে না দেখতে পেয়ে অর্ণব চিন্তিত হয়ে বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে গেলো।ওর নাম ধরে ডাকতে ডাকতে সামনের জঙ্গলের দিকে ছুটলো সে।অনেকটা পথ ছুটে এসে জুথিকে কোথাও পেলোনা ।বুকের ভেতর হাজারটা ভয়ানক সংকেত আড়ি পাতছে।ওর যদি কিছু হয়ে যায়?
দু মিনিটের ব্যবধানে কই চলে গেলো মেয়েটা!! অন্ধকার নেমে আসছে।অর্ণবের কপাল ঘেমে একাকার।জুথির চিন্তায় মনে হয় পাগল হয়ে যাবে সে।হঠাৎ করে পেছন থেকে জুথি লাফ দিয়ে এসে বললো,’ভীতুর ডিম!’

অর্ণব ভয় পেয়ে কেঁপে উঠলো।জুথি হাসতে হাসতে বললো,’কি ভাবলেন আমায় দস্যু ধরে নিয়ে গেলো?হিহিহিহি!!’

অর্ণব জুথির কান টেনে ধরে বললো,,’এরকম শয়তানি আর করবেননা বলে দিলাম।’

জুথি হাসতে হাসতে নিচে মাটিতে বসে পড়েছে।অর্ণব কপাল মুছে এদিক ওদিক তাকিয়ে বুঝতে পারলো তারা জঙ্গলের ভেতরে চলে এসেছে।
জুথি হাসি থামিয়ে অর্ণবের দিকে চেয়েছিল।অর্ণব মাথা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে পথ খুঁজছিল।
জুথি এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে বললো,’একটা কথা শুনবেন ভাইয়া?’

-“কি??আর কি শোনাবেন?’

-“আপনাকে আমার লাগবে!’

অর্ণব চমকে গেলো কথাটা শুনে।নিচে তাকিয়ে বললো,’মানেহ?’

-“মানেটা পানির মতন স্বচ্ছ।আপনাকে আমার চাই’

-“কি করবেন?’

-‘বিয়ে করবো’

অর্ণব তাচ্ছিল্য করে হেসে জুথির হাতের কব্জি ধরে ওকে নিচ থেকে তুলে দাঁড় করালো তারপর বললো,’পথ খুঁজতে হবে।ফান করার সময় না এটা’

জুথি অর্ণবের হাত ধরে ওকে আটকে সামনে এসে বললো,’আই এম সিরিয়াস’

অর্ণব জুথির চোখে চোখ রেখেছে।সন্ধ্যার অন্ধকারে ওর চোখ স্পষ্ট দেখা গেলো না।কানের সাদা ফুলটা উজ্জ্বলিত হয়ে আছে।অর্ণব দম ফেলে বললো,’দেখা যাক কি হয়’

কথাটা বলে সে হাঁটা ধরেছে।
জুথি আবারও হাত ধরে ওকে আটকে বললো,’আমি অপেক্ষায় থাকবো আপনার।ঢাকায় আমার সঙ্গে ফিরবেন না?’

অর্ণব পেছনে তাকিয়ে বললো,’সাজিয়ে নেবো’

জুথি আর কিছু বললোনা।মুচকি হেসে ওর সঙ্গে চললো।তাদের সামনে দিয়ে পাঁচ ছয়জনের মতন বয়স্ক লোক হেঁটে যাচ্ছিলো জঙ্গলের ভেতর দিয়ে।অর্ণব নদীতে থাকা স্টিমার আর লঞ্চের আলো খুঁজতেছিল।ডাক শোনা গেলেও দিশ করতে পারছিল না কোন পাশ থেকে আওয়াজ আসছে।
মুরব্বীর সে দল ওদের সামনে দিয়ে যাচ্ছিল সেসময়ে। দু পক্ষ থেমে গেলো।জুথি কোণার একজনকে দেখে চিনতে পারলো।ছুটে গিয়ে সালাম দিয়ে বললো,’চাচ্চু আমি জুথি।’

লোকটা জুথিকে দেখে খুশিতে আত্নহারা হয়ে গেছেন।ওর সালাম নিয়ে কেমন আছো আম্মু এটা বলে অর্ণবের দিকে একবার তাকিয়ে দেখলো।জিজ্ঞেস করলো ও কে।

-“আব্বু অর্ণব ভাইয়ার সঙ্গে আমাকে এখানে পাঠিয়েছিল’

-“ওহ হ্যাঁ!বলেছিল আমায়।এই সেই অর্ণব??ভালো হলো তোমাদের সঙ্গে এখানে দেখা হয়ে গেলো।চলো আমার সঙ্গে। আমার বাড়ি এই তো সামনেই।’

জুথি জিভে কামড় দিয়ে বললো,’অনেক ছোট বয়সে এসেছিলাম বলে কিছুই মনে নেই’

-‘তোমরা মেইন রোড ছেড়ে এই জঙ্গলের মধ্যে কেন আসলে?আমাদের বাড়ির দিকেও তো মেইন রোড নেই।উল্টে ফেরত যেতে হতো তোমাদের’

জুথি চোরের মতন দাঁড়িয়ে আছে।চাচ্চু ওর এমন লুকিয়ে পরা দেখে বললেন,’বুঝলাম।তোমার সেই দুষ্টুমি এখনও গেলোনা?আচ্ছা চলো তোমরা দুজন।বাড়িতে ইলিশ ভাজা খাবাে একসাথে।আমি এদিকে আসলাম টাটকা মাছ নিতে।ভাগ্যক্রমে পেয়েও গেলাম।চলো দেরি করা যাবেনা’

-‘আঙ্কেল আমি যেতে পারবোনা।আমার বাড়ি উল্টো দিকে।জুথিকে খু্ঁজতেই এদিকে আসলাম।ও হারিয়ে গিয়েছিল কিছুক্ষণ আগে ‘

-“তুমি একা যেতে পারবে?’

-‘পারবো সমস্যা নেই’

-“সাবধানে যেও।আমার এই টর্চটা রাখো।অন্ধকারে তোমার যেতে অসুবিধা হবে।এই জায়গা সুবিধার না।আর শোনো আমি হাতের ডান পাশ দেখাচ্ছি এইদিকে ভুলেও যাবেনা’

অর্ণব মাথা নাড়ালো।জুথি যেতে যেতে অন্ধকারে অর্ণবের হাত একবার ধরলো।অর্ণব মুচকি হেসে ওর চলে যাওয়া দেখছে।
টর্চটা সামনে ধরে অর্ণব হাঁটা শুরু করলো।এখানে নেটওয়ার্ক থাকলে জিপিএসের হেল্প নেওয়া যেতো।
অনেকক্ষণ হাঁটার পর একটা সুপারি গাছ দেখতে দেখতে যাওয়া ধরতেই থেমে গেলো সে।লাল রঙের ফিতা ঝুলানো এই সুপারি গাছটা সে ঐ জায়গায় দেখেছিল যেখানে জুথিকে বিদায় দিয়েছিল।কেমন লাগে এখন?ঘুরেফিরে একই জায়গায় কি করে এলাম আমি!!ধুর!কত দেরি হয়ে গেলো!’

আঙ্কেল কোন দিকে যেতে মানা করেছিলেন যেন?হাতের ডান দিকে?
কিন্তু আমি যেখানে দাড়িয়ে আছি তার থেকে ডান দিকে কোন পথ?
ধুর!একটা হলেই হলো!’

অর্ণব সোজা হাঁটা ধরলো আবার। অনেকটা পথ আসার ওর একটা লঞ্চের আলো দেখে হাঁপ ছেড়ে বাঁচলো সে।হাঁপাতে হাঁপাতে লাইট অফ করলো কারণ আলোতে ভরে আছে ওদিকটায়।কোনোমতে একটা মেইন রোড পেলেই বাড়িতে যেতে পারবে।বাড়িতে যেতেও আবার সময় লাগবে।যা মনে হচ্ছে অনেক দূরে চলে এসেছে সে।কপাল মুছতে মুছতে নদীর কিণারায় এসে দাঁড়ালো সে।এখন হাঁপাচ্ছে।
এতক্ষণ ছুটে ছুটে আসছিল এদিকে।
দূরে আলো আরও বেশি মনে হলো।অনেক বেশি আলো দেখা যাচ্ছে।যেন মেলা বসেছে।ঝিকমিক করছে আলোয়।
অর্ণব সেদিকেই চললো।হয়ত ওখানের আশেপাশে মেইন রোড পাবে।এর আগে কখনও সে এই জায়গায় আসেনি।কিছুই চিনছেনা।সে আলো মাখা ঝিকমিক করা জায়গাটা থেকে একটা গান শোনা যাচ্ছিল।কান খাড়া করে চেষ্টা করলো সে শুনার জন্য।মানুষ মুখে মুখে গাইছে।
কি দিয়া সাজাইমু তোরে
নাক চাইয়া নাকফুল দিমু
পান্না লাগাইয়া সই গো
পান্না লাগাইয়া সই গো
কি দিয়া সাজাইমু তোরে
মাথা চাইয়া টিকা দিমু
জড়োয়া লাগাইয়া সই গো
জড়োয়া লাগাইয়া সই গো
কি দিয়া সাজাইমু তোরে
লীলাবালি…. লীলাবালি….

গানটা বুঝতে পেরে অর্ণব হেসে ভাবলো ওখানে বুঝি বিয়ে হচ্ছে।সাজগোজ দেখে মেলা ভাবলো।
সেসময়ে ওকে ধাক্কা দিয়ে কতগুলো মেয়ে ছুট লাগলো ওদিকে।সবার মুখে হাসি।সবার পরনে হলুদ লালের মিশ্রনের শাড়ী।চুলে খোঁপা সবার।অর্ণব কৌতূহল নিয়ে সেখানে উপস্থিত হয়েছে।সামনের দিকে স্টেজ সাজিয়ে অনেকজন বসে আছে সেখানে।লীলাবালি গাইছে স্টেজের পেছনে টিনের ঘরের সামনে থাকা সমাবেশের নারীরা।তাদের দেখা না গেলেও কণ্ঠ শুনে বুঝে নিলো গানটা নারীরাই গাইছেন।
সবার গায়ের পোশাক দেখে অর্ণব ঢোক গিলে পিছিয়ে যেতে লাগলো।এখানে যারা আছে সবাই দস্যু না তো!!
কি বিপদ!কোথায় এলো সে।!!হাতিয়ার দেখেই যা বোঝার তা বোঝা হয়ে গেছে ওর।মুখে হাত দিয়ে ঘুরে কমলা রঙের বেড়া দেওয়া জায়গার ওপারে দিয়ে পালালো সে।
আর জীবনে এদিকে আসবেনা ভাবতে ভাবতে পেছনে তাকিয়ে ছুটছিল।হঠাৎ সামনে একটা বাঁশের খাম্বার সঙ্গে ধাক্কা লেগে পাঞ্জাবি আটকে গেলো বাঁশে থাকা পেরেকের সঙ্গে।পাঞ্জাবি ছুটাতে ছুটাতে অর্ণব কানে শুনতে পেলো ‘কনে তৈরি!!!’

কিছুতেই পাঞ্জাবি ছাড়াতে পারছেনা অর্ণব।তখন একটা বয়স্ক লোক এসে অর্ণবের পাঞ্জাবিটা পেরেক থেকে ছাড়িয়ে বললো,’শহরের মানুষ নাকি?আমাদের মতন গরীবদের বিয়ে দেখতে আইলেন?আবার না দেখেই পালান?তা হবেনা’

লোকটার পরনে লুঙ্গি ছিল।উদম গা তার।হাতে আবার কাঠের লাঠি।
লোকটা অর্ণবের হাত শক্ত করে ধরে টেনে নিয়ে গেলো স্টেজের দিকে।
যেতে যেতে বললো,’দেখো!!শহরের এক ব্যাটা আইছে আমাদের দস্যুদের আস্তানায়।’

সবার চোখ গেলো অর্ণবের দিকে।অর্ণব মনে মনে ভাবছে আজ তার রেহায় নেই।
চলবে♥