#শানুর_সংসার (১)
কাপড় ধোয়ার আগে প্রতিদিন আসিফের পকেট থেকে ভালো লাভ হয় শানুর। আসিফ পকেটে খুচরো টাকা রাখে। মানিব্যাগে ঢোকাতে মনে থাকে না। শানুর উপরি ঐ স্বামীর ফেলে রাখা অল্প স্বল্প টাকা গুলো। সপ্তাহ শেষে নিউমার্কেট গিয়ে টুকটাক মনের মতো জিনিষ কিনে শানু৷ ওটুকু আনন্দ পাবার জন্য এই টাকা সরানো পাপ মনে হয় না৷
বৃহস্পতিবার রাত আসলে শানুর চোখে মুখে আনন্দ ভর করে। মার্কেটে হাঁটতে খুব পছন্দ করে শানু। এ দোকান ও দোকান ঘুরে অনেক দরদাম করে বেশী বেশী জিনিষ পত্র ঘেটে তারপর অল্প কিছু কিনে বাসায় ফেরার মধ্যে শানুর সপ্তাহ জোড়া ক্লান্তিরা পালায়। আসিফ তাকে মানা করে না। শানু পাঁচটা দিন ভুতের খাটুনি খাটে। বাকি দুই দিন ও খাটুনী কম হয় না। শুক্রবারের সাত পদ, শনিবারের মেহমান সামলানো, শানুর কোনটিতে না নেই। আসিফ তাই, শানুকে শুক্রবার বিকেলে ঘুরতে পাঠায়। সন্তানেরা বড় হয়েছে। নিজেদের কাজ নিজেরা এক বিকেল দেখলে এমন আহামরি মহাভারত অশুদ্ধ হবে না। আসিফের মা গাইগুই করেন। ওটা আসিফ দেখে। মাকে ঠান্ডা গলায় সকালের নাস্তার টেবিলে বলে দেয়, শানু বিকেলে মার্কেটে যাবে। সবাই যেন দুপুরের খাবার তাড়াতাড়ি খেয়ে নেয়। স্বামীর সাপোর্ট পেয়ে শানুও নাচতে থাকে। মার্কেটে যাবার উত্তেজনায় রান্নার পাট চুকিয়ে গা ধুয়ে সাজতে বসে। টাকা বের করতে গিয়ে কতশত ভাবছে শানু। টাকাটাই গোণা হলো না।
আসিফ হয়ত ইচ্ছে করে টাকা গুলো রাখে। অথবা রেখে ভুলে যায়। গতকাল লাভ হয়েছে তিরিশ টাকা। আজকে আরো তিরিশ টাকা হলে শানুর এ সপ্তাহের আয় চারশত সত্তর টাকা। সাথে বাজার থেকে বাঁচানো খরচ আছে দুইশ টাকা। রাজুর কলেজের রিকশাভাড়া বেচেছে একশ চল্লিশ টাকা। মিশুর জন্যে দুধ কেনা লাগেনি৷ পাশের বাসার ভাবী দেশে যাবার আগে ফ্রিজের দুধ দিয়ে গিয়েছে। দুধের খাতে আছে তিনশ টাকা। সব মিলিয়ে সপ্তাহে হাজার টাকা জমে গেলে শানু খুশি।
আজকে আসিফের পকেটে বেশী জিনিষ পত্র নেই। স্বামীর যা ভুলো মন। প্রায়ই আসিফ কনডমের প্যাকেট পকেটে রেখে কাপড় ধুতে দেয়। বুয়া একবার প্যাকেট পেয়ে মুখ টিপে হাসতে হাসতে এসে বললো, ‘খালুর কাফড় উফড় আম্নে চ্যাক কইরা দেন গো খালাম্মা। কিতা মিতা জানি ফকেটত ঢুহায় রাহে। ‘ শানুর সেই প্যাকেট হাত পেতে নিতে কি যে অস্বস্তি লেগেছে৷ আসিফের পকেট থেকে মাঝে মাঝে সিগারেট পায় শানু। সেদিন আসিফ বন্ধুদের সাথে বাহির থেকে খেয়ে আড্ডা মেরে ফেরে৷ শানু খেয়েদেয়ে শুয়ে পরে। আসিফ আসে রাত বারোটায়৷ কোন কোন দিন আসিফের শরীর থেকে হালকা মদের গন্ধ আসে। শানু টের পেয়ে কিছু বলে না৷ পুরুষের একটু আধটু দোষ থাকেই। ওটা না থাকলে পুরুষ মানুষ হয় না।
শানুর স্বামীর পকেট থেকে বেরুলো একশ টাকার কড়কড়ে তাজা চারটে নোট। সাথে পাঁচ টাকার নোট দশটা, বিশ টাকার তিনটা, দশ টাকার দুটো। খুচরো পয়সারা নিশ্চয়ই প্যান্টের পকেটে ছিলো। প্যান্ট তো আসিফের সাথে অফিসে চলে গেছে। ইশ, কি ক্ষতি হয়ে গেলো আজকে।
টুকরো কাগজ বেছে রাখা শানুর পুরনো অভ্যাস। অদরকারী ভেবে অনেক প্রয়োজনীয় কাগজ ফেলে দেয়া হয়৷ আসিফের পকেটের কাগজ বাছা দেয় শানু৷ স্বপ্ন থেকে আপেল কেনার রসিদ, লাজফার্মার ঔষধের বিল। একি! স্টার সিনেপ্লেক্সের দুটো সিনেমার টিকেট। আসন বিন্যাসে একদম পেছনের সারির কোনার দুটো সিট। টিকিট হাতে নিয়ে শানু ভেবে পায় না, আসিফ কবে থেকে সিনেমা দেখা শুরু করলো। বিয়ের পর শানুর খুব হলে গিয়ে সিনেমা দেখার শখ ছিলো। আসিফ বলতো, ‘ছোটলোকি খাসলত।’ এই ছোটলোক শানুকে আসিফ বাহিরে পলিশ করেছে। ভেতরে শানু সেই ছোটলোক রয়ে গেছে। সিনেমার টিকিট দেখে শানুর তাই প্রথমে বুক ফেঁটে কান্না এলো। আসিফ পশ্চিম বাংলার সিনেমা দেখতে গেছে। ছবির নাম ‘ হাতিয়ার’। আসিফ তার রুচি নষ্ট করে সিনেমা দেখলো! শানু চোখ মুছে আবার টিকিট দুটো দেখে। বসেছে, কোনায়। কার সাথে, ছেলেবন্ধু হলে সামনের সিটে বসবে। কোনায় বসার কি দরকার। শানু কলেজ পড়তে পালিয়ে বাবুর সাথে সিনেমা দেখতে গিয়ে এমন কোনার সিটে বসে ছিলো। নায়ক নায়িকা কাছাকাছি এলেই বাবু শানুর কোমরে পেটে হাত দিয়েছে। সেই সব কত আগের কথা। তবু, শানুর কেমন কেমন লাগে। বাবুর নাম মনে হলে শরীরে শিহরণ লাগে। প্রথম প্রেম, প্রথম ছোঁয়া। ছিঃ, ছিঃ, আসিফের মতো স্বামী থাকতে শানু এসব কি ভাবছে৷ সিনেমার টিকেট হাতে নিয়ে শানুর আবার মন খারাপ হয়ে যায়।
সারাদিন ঘরের কাজের ফাঁকেফাঁকে শানুর সিনেমার টিকিটের কথা মনে পরে। আসিফ বাড়ি ফিরে খেতে বসলে, মাছের মাথা প্লেটে তুলে দেয় শানু। এমনকি, কাঁচা পেঁয়াজ সিরকায় ভিজিয়ে রাখতে ভোলে না। খাওয়া শেষে আসিফকে সাদা বাটিতে সোনালী চামুচ মিলিয়ে দই পর্যন্ত দেয়। ঘুমোতে যাবার সময় আসিফ বাচ্চাদের কথা জানতে চাইলে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সবার রুটিন রিপিট করে শানু। ঘুমোবার আগে আসিফ খেলা দেখে। শানু শুকনো কাপড় ভাঁজ করতে করতে বারবার আসিফের দিকে তাকায়। আসিফ জিজ্ঞেস করে, শানু কিছু বলবে কি না। শানু দ্রুতগতিতে মাথা নাড়ে। কি বলবে সে আসিফকে। ‘কই কিছু না’, শানু আবার কাপড় ভাঁজ করতে গিয়ে আস্তে করে আসিফকে দেখে। সেই খেলা দেখতে গিয়ে ঘুমিয়ে পরেছে। স্বামীর হাত থেকে রিমোট নিয়ে টিভি অফ করে শানুও পাশে শুয়ে পরে। এক হাত মাথার নিচে রেখে অন্য হাতে আসিফের কাঁধ ছুঁয়ে ভাবতে থাকে, ‘ আসিফ কার সাথে সিনেমা দেখতে গেলো’। স্বামীকে জড়িয়ে একসময় ঘুম নেমে আসলেও শানুর মনে খচখচানিটা রয়ে যায়।
(চলবে)