শান্তি সমাবেশ পর্ব-৩৯

0
1641

#শান্তি_সমাবেশ
#সাইয়্যারা_খান
#পর্বঃ৩৯

আজকে আর বাড়ী আনা গেলো না মৃত্তিকা’কে। বাবা’র হাতে গুলি লেগেছে শুনেই যার অবস্থা করুন তাকে আর পূর্ণ ও জোর করে নি। মৃত্তিকা যখন বাবা-স্বামীর মধ্যে কার সাথে যাবে সেই অস্থিরতায় ছিলো তখন পূর্ণ ওর মাথায় হাত রাখে। শান্ত স্বরে জানায়, বাবা’র সাথে থাকতে। পূর্ণ’র কাছে মা-বাবা আছে কিন্তু শশুড় বাবা তার একা।
নিজের ভেতরই অস্থিরতায় ভরপুর মৃত্তিকা কিছুটা সস্তি নিয়ে বাবা’কে নিয়ে বাসায় ফিরে। পূর্ণ’র শান্তি নেই। যেন নিজের জয়ী হওয়ার পর তার চাই তার পূর্ণ্যময়ীর সঙ্গ। একটু গভীর ভাবে চাই। রাত বেড়েছে। পূর্ণ বাসায় ফিরে বাবা-মায়ের সাথে। ওর মা বরাবরই ধৈর্যশীল নারী। ছেলে যখন তার রাজনীতিতে নিজেকে জড়িয়েছে এর ফলাফল সরুপ এরকম কিছু হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। তবুও তার মাতৃহৃদয় কেঁদে উঠে। ছেলের সম্মুখে বরাবরই স্থির তিনি। নিজ হাতে খাবার বেড়ে মুখে তুলে খাওয়াতে নিলেই পূর্ণ আগে মায়ের হাতে চুমু খায়। এতেই যেন মা গলে গেলেন। ছেলেকে খাওয়াতে খাওয়াতে কাঁদলেন বেশ কিছু সময়৷ একটা মাত্র ছেলে এর কিছু হলে বাঁচার কি আদৌ কিছু থাকবে তার?
পূর্ণ’র বাবা সামাল দেন স্ত্রী’কে। খাওয়া দাওয়া শেষ হতেই পূর্ণ রুমে যায়। পাঞ্জাবিটা বাবা’র সাহায্যে গা থেকে খুলেই ফ্রেশ হতে চলে যায়। এক হাতে সবটা করা কষ্টদায়ক। চড়ম মাত্রায় মৃত্তিকা’কে স্মরণ হয় ওর। বউ থাকতে কি না পাঞ্জাবি খুলাতে হয় বাবা’কে দিয়ে? এসব কি সহ্য করার মতো? পূর্ণ ও মোটেই সহ্য করত না যদি না ব্যাপারটা শশুড় বাবা’কে ঘিরে হতো। এতসব ভাবতেই ওয়াসরুমের দরজায় নক হলো। পূর্ণ গায়ে টাওয়াল পেঁচিয়ে নিয়ে বললো,

— কে?

— আমি।

বাবা’র গলা শুনে আস্তে ধীরে দরজা খুলে পূর্ণ। বাবা ওকে দেখেই বেশ সুন্দর ভাবে বললেন,

— আব্বু, দেখি হাত দাও। আমাকে ধরে বের হও। টাওয়াল একা পেঁচাতে গেলা কেন? আমাকে ডাকতা।

পূর্ণ ভ্রু কুচকে তাকালো। বেশ থমথমে সেই চাহনি। ওর বাবা সেই চাহনি দেখে কিছুটা থতমত খান৷ পূর্ণ একাই বের হতে হতে বললো,

— নতুন এমপি দেখেই লোভ সামলাতে পারো নি না? তেল লাগাতে এসেছো? এসবে আমি গলব না আব্বু। যাও নিজের বউয়ের উপর ট্রাই কর এসব।

ওর বাবা বিরক্ত হয়ে মুখে চ উচ্চারণ করলেন৷ ছেলের কথা গায়ে না মেখে আলমারি থেকে একটা বক্সার বের করতেই চাপা স্বরে চেঁচায় পূর্ণ। ওর বাবা ভরকে উঠেন৷ না বুঝতে পেরে তারাতাড়ি এসে জিজ্ঞেস করেন,

— কি হয়েছে? ব্যাথা পেলি?

— তুমি আমার আন্ডার গার্মেন্টস এ হাত দিচ্ছো কেন? রাখো।

কথাটা বলতে বলতে যেই না বাবা’র হাত থেকে বক্সারটা ছিনিয়ে নিলো ওমনি খোঁসে পরে কোনমতে পেঁচিয়ে রাখা পূর্ণ’র কোমড়ের টাওয়াল। আকস্মিক ঘটনায় কিংকর্তব্য বিমূঢ় উভয়ই। বাবা তারাতাড়ি ছেলের টাওয়ালটা কোমড়ে পেঁচিয়ে দিলেন ভালোমতো। লজ্জায় নাক, কান ততক্ষণে পূর্ণ’র লাল হয়ে উঠেছে। এই প্রথম কি পূর্ণ লজ্জা পেলো? হয়তো। সবসময়ের বেলাজা, ঠোঁট কাটা পূর্ণ মিনিট দুই এক চুপ রইলো। বাবা’র সাহায্য বক্সার ও পরলো। বিছানায় যখন বাবা ওকে আধ শুয়া করে বসালেন তখনই মৌনব্রত ভাঙে পূর্ণ,

— কি কপাল আমার দেখো তো আব্বু। বউ থাকতে কি না বাবা আমার পার্সোনাল কাজ করছে। এই দিন ও দেখার ছিলো আমার? দুই দিন পর বাবা হব আমি তখন কি আমার ছানাপোনা’কে এই কাহিনি শুনাব যে ওদের দাদা ওদের বাবা’কে বক্সার পড়িয়ে দেয়?

— চুপ থাকো বেয়াদব ছেলে। ছেলে মেয়েকে মানুষ নীতি নৈতিকতার কাহিনি শুনায় আর তুমি কি না এসব ফালতু কাহিনি শুনাবে তাদের?

পূর্ণ বাকা চোখে তাকালো বাবা’র দিকে। মুখ যথাযথ তার গম্ভীর। ওভাবেই কটুক্তি করে বললো,

— বাহ আব্বু বাহ! নিজেরটাই বুঝলা, ছেলেরটা না? নিজে নাতি নাতনি চাও আর আমার বেলায় যত নীতি বাক্য। আমার ছেলে’কে রোম্যান্টিক ব্যাপার স্যাপার তো আমিই শিক্ষা দিব নাহলে আমার ঘরে নাতি নাতনি কোথা থেকে উদয় হবে? তুমি উদয় করবে?

এবার আর কিছু বলার মতো রইলো না তার। রাগে গজগজ করতে করতে রুম ত্যাগ করলেন। পূর্ণ’র কানে এলো বাবা’র কথা,

— এই ছেলে নাকি এমপি? এমন মুখ, ঠোঁট কাটা এমপি হলে জনগন হবে লুচু। কথার কোন মা বাপ নেই। যখন যা মন চায়…

আর শুনা গেলো না। পূর্ণ পাত্তা দিলো না। বাবা এখন বউ নিয়ে ঘুমাবে। ঠান্ডায় গরম গরম বউ। কিন্তু পূর্ণ? সে কি করবে? গরম বিড়াল বিড়াল বউটা কোথায়? তার বুকে কেন নেই মৃন্ময় হাওলাদারের ছানা?

___________________

বাবা’র বুকে মাথা ঠেকিয়ে কপালে হাত ছুঁয়ায় মৃত্তিকা। অল্প গরম। আস্তে করে মাথাটা তুলে পাশে থাকা বাটি থেকে পুণরায় জল পট্টি বাবা’র কপালে রাখলো৷ গালে হাত ছুঁয়ে দিয়ে নাক টেনে নিলো। মৃন্ময় হাওলাদার অল্প স্বরে ডাকলেন,

— আম্মা?

— হ্যাঁ হ্যাঁ আব্বু। বলো। খারাপ লাগছে?

— উহু। বুক থেকে সরলেন কেন? আর ঠান্ডা পানিতে হাত দিবেন না আম্মা। শীতের দিন ঠান্ডা লেগে যাবে।

পুণরায় মাথাটা বাবা’র বুকে রাখতেই মৃন্ময় হাওলাদার ভালো হাতটা দিয়ে মেয়েকে বুকে চেপে রাখেন। মৃত্তিকা বাবা’র জখম হওয়া হাতে চুমু খায়। কেঁদে ফেলে পুণরায়। দীর্ঘ শ্বাস টানেন মৃন্ময় হাওলাদার। কিভাবে থামাবেন তার প্রাণভোমরা’কে? আসছে থেকে কেঁদেই যাচ্ছেন। অপরিপক্ক হাতে বাবা’র সেবা করছে। এতটা সৌভাগ্য কিভাবে হলো তার? এতটা সুখ না থাকলেই বা কি হতো? ভালো হাতটা দিয়ে মেয়ের চুলে হাত বুলাচ্ছেন তিনি। এটাই স্বভাব। হয়ে যায় আপনাআপনি ভাবেই।
মৃত্তিকা এই প্রথম বললো,

— লাগবে না বাবা৷ তুমি ভালো হও।

কথাটা বলে আবারও কেঁদে ফেলে সে। মৃন্ময় হাওলাদারের চোখ ভর্তি পানি অথচ বুকে তার প্রশান্তি। বুকের ঠিক ওপর তার প্রশান্তির কারণটার অস্তিত্ব। অসুস্থ বাবা থেকে আদর খেতে খেতে থামলো মৃত্তিকা। ঐ থামাতে অবশ্য লাভ নেই। একটু পরপরই নিজ সুরে কেঁদে উঠে তার মেয়ে। চোখ মুখ মুছিয়ে দিয়ে শান্ত স্বরে মৃন্ময় হাওলাদার বললেন,

— আজ আমার বুকে আছেন আগামী কাল পূর্ণ’র বুকে থাকবেন আম্মা। ছেলেটা অসুস্থ। তার অধিকার বেশি। আমি ততটা আঘাত পাই নি আম্মা। এই যে আমার বুকে আপনি। আমার সকল ব্যাথা কমে গেলো।

বাবা’র বুকে নাক, মুখ ঘঁষ মুছে নিলো মৃত্তিকা। মেয়ের তার দ্বিধায় আটকানো উচিত ছিলো কিন্তু ততটা কিছু দেখা মিলে নি৷ ক্ষণিকের জন্য পূর্ণ’র আঘাতের কথা শুনে হয়তো পাগলের মতো কেঁদেছে কিন্তু বাবা’র আঘাত দেখে সহ্য করতে পারে নি। আসক্তিটা কেন তার প্রতি? মৃন্ময় হাওলাদার চান এই আসক্তিটা পূর্ণ’র প্রতি তৈরী হোক। খুব করে তৈরী হোক। এতটাই হোক যাতে মৃত্তিকা বাবা থেকে স্বামী’কে প্রাধান্য দিক। মিঠি দরজায় নক করতেই মৃত্তিকা মুখ তুলে বললো,

— কিছু বলবি?

— আপা খাবে না?

— না। তুই খেয়ে নে।

— চলো না আপা। আমি রুমে নিয়ে আসি?

মৃত্তিকা সাফসাফ জানালো তার ইচ্ছে করছে না খেতে। মৃন্ময় হাওলাদার মৃদু স্বরে মিঠি’কে বললেন,

— মিঠি যা রুমে নিয়ে আয় খাবার। দেখি আমি কে খাবে না।

মিঠি চলে যেতেই মৃত্তিকা বাবা’র দিকে তাকিয়ে বললো,

— খেতে মন চাইছে না আব্বু।

— খেতে হবে।

— উনি কি খেয়েছে? ডান কাঁধে ব্যাথা পেয়েছে। একা একা কিভাবে সব করছে?

মৃন্ময় হাওলাদার এই প্রথম মেয়ের ছলছল করা চোখ দেখে তৃপ্ত। এই যে পূর্ণ’র চিন্তায় তার চোখ টলমলে। এটাই তিনি চান। তার আম্মার জীবনটা পূর্ণময় হোক।
মিঠি খাবার দিয়ে যেতেই তিনি জিজ্ঞেস করেন,

— তুই খেয়েছিস?

— খাব মামা। মা অপেক্ষা করছে।

— আচ্ছা যা।

মিঠি যেতেই মৃন্ময় হাওলাদার ডাকেন,

— আমার ছানা খেয়ে নিন।

— খেতে মন চায় না হুলো বিড়াল।

ব্যাথার মধ্যে হেসে ফেলেন মৃন্ময় হাওলাদার। ডান হাতে ভর দিয়ে উঠে নিজে প্লেটে হাত দেন। লোকমা তুলে মেয়ের মুখের সামনে ধরতেই দ্বিরুক্তি করে না মৃত্তিকা। চুপচাপ খেয়ে নেয়।
কে বলবে সে এসেছে অসুস্থ বাবা’র সেবা করতে। রীতিমতো অসুস্থ বাবা থেকে আদর নিচ্ছে সে। এই যে আহ্লাদ করে করে তাকে খাওয়াতে হচ্ছে তারমধ্য সে খেতে খেতে একটু একটু কাঁদছেও। মৃন্ময় হাওলাদারের বুক কাঁদে যখন তার সামনে তার রাজকন্যা কাঁদে।
.
খালি রাস্তা দিয়ে কিছুক্ষণ বাদ বাদ গাড়ি যাচ্ছে। সেখানেই ছোট্ট একটা চায়ের দোকান। পূর্ণ ডান হাত দিয়ে কষ্ট করে কাপটা ধরলেও পরে বা হাতে নিয়ে নিলো। কাঁধে চাপ অনুভব হয় তার। কাঁচা ব্যাথা হওয়ার দরুন এমন লাগছে। এই শীতের রাতে বউহীনা বিছানায় ঝটফট করেই বেরিয়ে এসেছে। এসেছে অবশ্য কারো ডাকে। মানুষটা তার জীবনে অনেকটা অবদান রেখেছে।
ঠিক পূর্ণ’র বরাবর বসা সাফারাত। হাতে তারও একটা চায়ের কাপ। পূর্ণ চুমুক বসিয়ে জিজ্ঞেস করলো,

— তোর বাপের খবর কি?

— পাগল কুকুর হয়ে গিয়েছে।

— কি ভাবলি এবার?

— কিছু কি ভাবার আছে?

— না৷

কিছুক্ষণ নীরবতার পর সাফারতই অতীতের কিছু কথা তুললো। পূর্ণ নীরবতাকেই বেছে নিলো।

~না চাইতেও হলুদের অনুষ্ঠানে বসতে হলো সাফারত’কে। মায়ের উপর বিশ্বাস রেখেই সবটা করেছে সে। কষ্ট করে নাম্বার জোগাড় করিয়েছে কোন এক কাজিন থেকে। কিন্তু আফসোস মাশরুহা, পূর্ণ এমনকি ওদের বাবা-মায়ের নাম্বারও অফ। হবেই তো? তারা তো সাফারাতে’র খোঁজে কানাডা ছেড়ে দেশে এসেছে। ওর মা যখন খেয়াল করলো শোয়েব মির্জা কাজে ব্যাস্ত। মেহমান নিয়ে কথাবার্তা বলছে তখনই সারা রুম তন্ন তন্ন করে খুঁজে সাফারাতের ফোন পান তিনি। ছেলেকে এনে দিতেই সাফারাত দেখলো অগণিত কল করা হয়েছে। ম্যাসেজের ইয়াত্তা নেই। চটজলদি সাফারাত লাস্ট ডায়াল করা নাম্বারে কল দিলো। যদিও এটা বাংলাদেশী নাম্বার। চির পরিচিত কন্ঠটা তখনই তার কানে এলো,

— হ্যালো হ্যালো রাত? আর ইউ দেয়্যার? রাত! কথা বলো না।

কান্না পায় সাফারাতের। এই মানবীর কন্ঠ এমন কেন শুনায়? বহু কষ্টে সে ডাকলো,

— বার্ড?

অতঃপর সব চুপ। ভারী ভারী নিঃশ্বাস ব্যাতিত কিছুই শুনা গেলো না। বেশ সময় পর শুনা গেলো কান্না। কান্না নয় বরং আর্তনাদ। রুহা গলা ফাটিয়ে কেঁদেই চলেছে। এদিকে দরজা লাগিয়ে ওয়াসরুমে কাঁদছে সাফারাত। হয়তো পাশে তখন পূর্ণ ছিলো। ফোনটা কানে ধরে সবটা ক্লিয়ার হলো। গত মাসে তারা বাংলাদেশে এসেছে। মাশরুহা পাগলের মতো রাস্তাঘাটে অলিগলি তাকে খুঁজে চলছে। পুলিশে জানানোর পরও লাভ হয় নি। বাংলাদেশ পুলিশ ততটা তৎপর ছিলো না। সব ভাবেই যখন ব্যার্থ তখনই আশার আলোর মতো সাফারতের কলটা এসেছিলো। চাপা কন্ঠে পূর্ণ’কে একটা ঠিকানা বলে সাফারাত। সেখানেই দেখা করতে বলে মাশরুহা’কে নিয়ে ঐ দিন রাতে।

হলুদের অনুষ্ঠান শেষ করেই শোয়েব মির্জা বসেছিলেন শাজাহান খানের সাথে। এই সময় সে ছেলের খোঁজ নেন নি। মায়ের সাহায্য সাফারাত ছুঁটে যায়। সেই রাতটাও ছিলো এমনি এক শীতের রাত। চারিদিকে কুয়াশায় আচ্ছন্ন। সাফারাত যখন পূর্ণ’র বাহুতে মাশরুহাকে দেখলো। চিৎকার করে ডেকে উঠে সাফারাত,

— জান! রুহা! এদিকে আমি।

বলেই দৌড়ে আসে। এদিক থেকে রুহা দৌড়ে আসে। দুইজন যখন দুইজনকে ঝাপ্টে ধরলো তখন বাঁধ ভাঙা কান্নায় শুনশান রাস্তাটা থমথমে হয়ে গেল। সেই ভাবটা কেটে গেলো যখন মাশরুহা সাফারাতের কানে কানে বললো,

–আ’ম প্রেগন্যান্ট রাত। আমরা প্যারেন্স হব।

কথাটা বলেই সাফারাতের একটা হাত টেনে নিজের পেটে রাখলো৷ পাগল সাফারাত হাটু গেড়ে বসে মুখ গুজে দিলো পেটে। ফেটে পড়লো অবাধ কান্নায়। এত সুখ রেখে কোথায় যাবে সে?
পূর্ণ বেশ খানিক পর এগিয়ে আসতেই সাফারাত মাশরুহা’কে বুকে নিয়ে মাথা নিচু করে রাখে। পূর্ণ শুধু বলে,

— মিথ্যা কেন বলেছিলি রাত?

— আ’ম সরি পূর্ণ। মাফ করে দে।

— শুধু মাত্র মামা হব বলে মাফ করলাম। এতটা ক্লোজ হওয়া উচিত হয় নি।

— হালাল ছিলো সবটা।

পূর্ণ চুপ রইলো। সাফারাত সবটা খুলে বলে তাদের। হাতে পাসপোর্ট আর কিছু জরুরী কাগজ ব্যাতিত ক্যাশ কিছু টাকা আছে। সাফারাত জানায়,

— উই নিড টু গো ব্যাক পূর্ণ। এখানে বাবা কিছুতেই মানবে না।

মাশরুহা তখনও সাফারাতের বুকে। যখন পূর্ণ তাদের গাড়িতে তুললো তখনই কল এসে সাফারাতের ফোনে। মায়ের কল রিসিভ করতেই কানে বাজলো বাবা’র গলা। হুংকার ছেড়ে তিনি বলে উঠলেন,

— এই মুহূর্তে যদি বাসায় না ফিরো খোদার কসম তোমার মা’য়ের লাশ দেখার জন্য চোখ থাকবে না তোমার।

কথাটা কানে যাওয়ার সাথে সাথেই কান্নারত মায়ের গলা ও কানে বাজলো সাফারাতের,

— রাত বাবা তুই ফিরবি না। একদমই না। মা ঠিক আছি রাত। তুই পালিয়ে যা।

ঠিক পরপর এক চড়ের আওয়াজ। অতঃপর? সবটা শান্ত। কল কেটে গিয়েছে। মায়ের ন্যাওটা সাফারাত কি আর পারে এসব সহ্য করতে? সে শুধু অস্থির কন্ঠে বলে,

— গাড়ি থামা পূর্ণ। গাড়ি থামা। মা’কে মে’রে ফেলবে। আমার মা পূর্ণ। গাড়ি থামা।

মাশরুহা’কে বুক থেকে তুলে পূর্ণ’র হাতে দিয়ে সাফারাত শুধু বললো,

— আগামী কাল এখানেই থাকবি ওকে নিয়ে। আমি আসব।

মাশরুহা’র মাথায় একটা চুমু খেয়ে সাফারাত অন্ধকারে হারিয়ে যায়। পূর্ণ রুহা’কে নিয়ে হোটেলে ফিরে যায়। অন্তত ভরসাটা আছে সাফারাত তো আছে।
.
বাসায় ফিরতেই দেখা মিলে আহত মা’কে। সাফারাত দুই হাতে মা’কে জড়িয়ে ধরে। চিৎকার করে বাবা’কে ডেকে ওই প্রথম গালি দিয়ে ফেলে। কেন তার মা’কে আঘাত করা হলো জানতে চায়। মায়ের মুখে চুমু খেয়ে বুকে জড়িয়ে বসেই কাঁদতে থাকে সাফারাত। কিভাবে মা সহ দেশ ছাড়বে এটাই ছিলো চিন্তায়।
কপালে কাটা অংশে ব্যান্ডেজ করে মায়ে ঘুম পারিয়ে রুম থেকে বের হয় সাফারাত৷ তখনই বাবা’র মুখোমুখি হয়। শোয়েব মির্জা গম্ভীর কণ্ঠে জানান,

— ঐ মেয়ে ছাড়ো। বাবা সব দিব৷ শাজাহান খানের বড় মেয়ে। রুপসি সে৷ একবার বিয়ে করলেই দেখবে রুহা টুহা সব ভুলে যাবে। পালাতে চেষ্টা করো না রাত।

— মরে গেলেও আমার রুহাকেই চাই।

কথাটা বলেই নিজের রুমে চলে যায় সাফারাত। খুশিতে তার কান্না পায় অথচ সুচিন্তায় মাথা ফাটার জোগাড়।
শোয়েব মির্জা রুমে ঢুকে নজর দেন ভালেবাসার মানুষটার দিকে। জোয়ান কালে এই নারীর রুপে ঝলসে গিয়েছিলেন আজও তাই হয়৷ এই যে এক সন্তান হওয়ার পরও যখন আর হচ্ছিলো না তখন তিনি কত বললেন আরেকটা বিবাহ করতে। শোয়েব মির্জা করেন নি৷ কেন করবেন? ভালোবাসার মানুষ কিভাবে ছাড়বেন তিনি?
এগিয়ে এসে স্ত্রী’র পাশে বসে মাথায় হাত বুলান। ফর্সা গালে দানবীয় হাতের চড়টা ফুটে আছে। কিভাবে যে আঘাত গুলো করলেন? কেন রাগটাকে সামাল দিতে পারলেন না? কলিজাটা কার পুড়ছে? শাড়ীর আঁচলটা সরিয়ে স্ত্রী’র বুকে মাথা রাখেন তিনি। নরম গলায় বলেন,

— আর কখনো এই ভুল হবে না সোনাপাখি। মাফ করে দাও। রাগটা সামাল দিতে পারি নি। উঠো। উঠো না। আমি রাতে খাই নি তো। সোনাপাখি আমার প্লিজ চোখটা খুলো।

গভীর ঘুমে মত্ত তার স্ত্রী চোখ খুলতে পারলেন না। জীবন দশায় এহেন বয়সে এসে হয়তো ভালোবাসার মানুষটার থেকে আঘাতটাও সহ্য করতে পারেন নি। সেই রাগে জ্বরে পুড়লেন। সারাটা রাত স্ত্রী’র সেবা করেছেন শোয়েব মির্জা। অপরাধবোধ তার জেগেছিলো সারাটা মস্তিষ্কে।

#চলবে…..