শুধু তোমারই জন্য পর্ব-১০

0
866

শুধু তোমারই জন্য -১০

নীলির মামা এসেছেন বাড়িতে।
নীলির বাবা তাকে পছন্দ করছেন না। এই লোকটাকে তিনি শ্রদ্ধা করতেন কিন্তু ইনি নীলির মাকে তাল দিচ্ছে।
নয়তো নীলুর মাথায় এত বুদ্ধি আসতো না।
কিছু মানুষ থাকে ঝামেলা পছন্দ করে, এই লোক মনে হচ্ছে তেমন। এতদিন বাইরে ঝামেলা করেছে এখন বাসায় ঢুকেছে। আব্বার শরীর ভালো না।কথা জড়িয়ে যায়। সেন্স নেই আগের মতো। এর মধ্যে এই ঝামেলা।
নীলির মামা বোনকে বললেন, কয়েকটা ছেলে পেলে ঠিক করেছি, নিচে বসা থাকবে। ঝামেলা হবে না তবু এরা একটা বল ভরসা আর কি! ভয় পাস না। আপতত প্রথম দফা সই হোক, সব কাজ শেষ হতে আরো মাস কয়েক লাগে নাকি। নীলুফার ঘাড় নেড়ে সায় দিলেন।

৩০

রিসোর্টের নাম “ঢেউ”, মেরিন ড্রাইভের পাশে। মেইন কক্সবাজার থেকে বেশ কিছুটা দূরে। পেছনে পাহাড় আর রাস্তার ওপাশে সমুদ্র। পায়ে হেঁটে ইনানি বিচে যাওয়া যায় এখান থেকে।
আবির বলল, আসলে বীচে এত বেশি মানুষ থাকে যে ওই জায়গাটা আমার ভালো লাগে না।এখান থেকে পায়ে হেঁটে রাস্তার পাশে সমুদ্র দেখতে ভালো লাগবে।
আরো একটু সামনে আরো সুন্দর জায়গা আছে।
আমি যত জায়গায় গিয়েছি, টুরিস্ট স্পটগুলো মার্কেটের মতো হয়ে গিয়েছে, তার আশেপাশের নিরিবিলি জায়গাগুলোই সুন্দর।
নীলির অবাক হয়ে সমুদ্র দেখছিলো, এত বিশাল, কল্পনার বাইরে ছিলো। যা ভেবেছে, তার সাথে অনেক পার্থক্য। ওদের রুম তিন তলায়, সামনেটা বড় জানালা, বিছানা থেকেই সমুদ্র দেখা যায়।
আবিরের কথা শুনে নীলির মনে হলো, আর কোথাও যাওয়ার দরকার নেই তো! সামনে সমুদ্র, আর পাশে আবির, পৃথিবীর সব কিছু বোধহয় পাওয়া হয়ে গেল।
আপনি এখানে আগেও এসেছেন?
-হু, কেন!
-না, এমনিই! কার সাথে?
-বন্ধুরা গার্লফ্রেন্ড নিয়ে এসেছে, আমিও এসেছি!
-গার্লফ্রেন্ড নিয়ে! নীলি আবার চোখ গোলগোল করছে!
আবিরের ইচ্ছে হলো ওকে রাগিয়ে দেয়, তাই বলল, নীলি তুমি অদ্ভুতভাবে তাকাচ্ছো কেন! তোমার সাথে বিয়ের আগে আমার কত বড় জীবন ছিলো ভাবছো না!
নীলি রেগে গিয়ে বললো, আগে গার্লফ্রেন্ড নিয়ে এসেছেন, সেখানেই আমাকে নিয়ে এলেন! কি আশ্চর্য!
আবির হাসি ধরে রাখতে পারল না। হো হো করে হেসে ফেলল।
নীলি এবার বুঝতে পারলো আবির মজা করেছে!
দুপুরে রোদ ছিল, তাই রোদটা একটু কমতেই নীলিকে নিয়ে আবির বের হলো! রাস্তা পেরিয়ে নেমে গিয়ে বালুময় সৈকত।
আবির বলেছে নীলি শাড়ি পরো তো!তাই নীলি শাড়ি পড়ে এসেছে, শাড়িটাও অদ্ভুত, ধবধবে সাদা। আবিরই এনেছে!
নিজে ধবধবে সাদা শার্টের হাতা গুটিয়েছে কনুই পর্যন্ত, হালকা নীল জিন্স হাটু পর্যন্ত গোটানো।
নীলির স্বপ্ন স্বপ্ন লাগছে, এমন কি সত্যি হয়!
বের হওয়ার সময় রিসিপশনে কিছু একটা বলে এসেছে আবির। অল্প দূরে গিয়ে রাস্তা থেকে নেমে বড় বড় সিমেন্টের বস্তা পেরিয়ে সৈকতে নেমে পড়েছে আবির, নীলির হাত ধরে।
বেলাভূমিতে হাঁটতে হাঁটতে সমুদ্রের কাছাকাছি চলে এসেছে, ঢেউ এসে পা ভিজিয়ে দিচ্ছে একটু পরপর।
শো শো শব্দ করছে, যেন দূর থেকে ভেসে আসছে, একটু পরে হয়ত সন্ধ্যা হবে, সৈকতে পাশাপাশি তিনটা চেয়ার রাখা, আবির গিয়ে বসলো একটায়।
নীলি বলল, এগুলো কে রেখেছে?
আবির বলল, রিসোর্টেরই রাখা। এই যে দেখো নাম লেখা!
-আর কেউ নেই কেন এখানে?
-এখন এখানে কেউ আসে না, সবাই তো ইনানী বা কলাতলী যেতে চায়। আর ওদের বলেছিলাম, আজকে শুধু আমরা থাকতে চাই!
-এটা বলা যায়? কেউ যদি আসতে চায়?
-সেটা ওদের ইস্যু, আসবে না কেউ।
-দূরে মাছ ধরা ট্রলার গুলো দেখা যাচ্ছে, কি সুন্দর! কি সুন্দর!
নীলি আবিরের পাশেই বসলো। আবির শুয়ে পড়েছিলো, উঠে নীলির ঘাড়ে চুল সরিয়ে চুমু খেলো।
-নীলি চুল বাঁধবে না আমি সাথে থাকলে কখনো, তোমাকে খোলা চুলে অপূর্ব লাগে, সেটা তুমি নিজেও জানো না।
-বাঁধিনি তো!
-সেটা তো আমি বললাম পরে!
নীলি খোঁপা করছিলো, আবির না করলো বলে ছেড়ে এসেছে।
-নীলি, চলো একটু পা ভিজিয়ে আসি!
নীলি আবিরের হাত ধরে আবার সমুদ্রের কাছে চলে গেলো। সমুদ্রের ডাক ছাড়া কিচ্ছু শোনা যাচ্ছে না।
আবির নীলির হাত শক্ত করে ধরে রেখেছে, যদিও জোয়ার আসবে রাতে। এখন অতোটা চাপ নেই পানির। সূর্য ডুবছে, একসময় টুপ করে লাল সূর্যটা সমুদ্রে ডুবে গেলো।
আবির নীলিকে আচমকা দু হাতে কোলে তুলে নিলো,
তারপর হাঁটতে হাঁটতে চলে এলো যেখানে বসে ছিল, সেখানে। নীলিকে বুকের জড়িয়ে বসলো কিছুক্ষণ।
অনেকক্ষণ কোন কথা বলা হয়নি।
নীলি হঠাৎ আবিরের ঘাড় টেনে নিয়ে কাছে এগিয়ে এলো!
আবিরকে ধরে ওর ঠোঁট স্পর্শ করলো নিজের পাতলা নরম ঠোঁটে।
এতো স্নিগ্ধ চুমু, আবির এত চেনা স্পর্শেও আবার শিহরিত হয়ে যায়, প্রতিবার যেন নতুন কোন কাব্য লেখা হয়।
প্রতিটি শব্দ নতুন, নতুন প্রতিটি ছন্দ!
রাত বাড়ছিলো, আবির নীলিকে বুকে জড়িয়ে রইলো অনেকটা সময়। জোয়ার আসছে, ঢেউ এগিয়ে আসছে সামনের দিকে। বাতাসের বেগ বাড়ছে। এখানে আর থাকাটা ঠিক হবে না।
-নীলিবুড়ি, চলো ফিরি এখন।
-আচ্ছা।
পেছনে ফিরে দেখলো একজন আসছে টর্চ নিয়ে, রিসোর্টের লোক মনে হয়। আবির বলে এসেছিলো, সন্ধ্যার কিছুক্ষণ পরে যেন কেউ নিতে চলে আসে। লোকটা কাছে আসতেই ওরা এগিয়ে যেতে লাগলো সামনের দিকে!
-শাড়িটা আজই পড়েছি, কিন্তু বালি লেগে গেল যে!
-যাক, এটা শুধু আজকের জন্যই আনা।
-আপনার সাদা পছন্দ!
-আমার অনেককিছু পছন্দ, বিপরীতমুখী, যেমন সাদা শাড়িটা ভালো লাগে, আবার জংলা ফুলছাপা শাড়িও ভালো লাগে, অদ্ভুত না? তোমার জন্য নিয়ে এসেছি।
-আপনি এগুলি ভাবার সময় পান কখন?
– তুমি বলতে চাও এই পরীক্ষার সময়টা তুমি আমাকে
একবারো মনে করোনি!
-ধূর, তাই বললাম বুঝি!
-চলো, তোমার জন্য আরো সারপ্রাইজ আছে!
আবিরের নীলিকে অসংখ্য স্মৃতি সে দিতে চায় না।
অল্প কিছু স্মৃতি যেন নীলির মনে সারাজীবন গেঁথে থাকে।
নীলি অদ্ভুত মেয়ে, শপিং করতে তেমন আগ্রহ নেই! এখানে আসার জন্য টুকটাক কেনাকাটার দরকার ছিলো, আবিরকে বলেছে, আপনি করে ফেলেন, সমস্যা নেই। আবিরের মনে হচ্ছে আপাতত আবির ছাড়া কোন বিষয়ে নীলির তেমন আগ্রহও নেই।
-নীলি, আমরা একবারে ডিনার করে যাবো?
-না, চেঞ্জ করে আসি!
রুমে পাঠাতে বলবো?
-নাহ, দরকার নেই।
নীলি আর আবির ডিনার শেষ করে রুমে ফিরলো।
আবির হাতে একটা প্যাকেট নিলো রিসিপশন থেকে।
-স্যার অনেক কষ্ট হইছে, আগে অর্ডার না করলে তো পাওয়া যায় না!
নীলি আবিরের মুখের দিকে তাকালো, আবির নীলিকে পাত্তা দিলো না। লোকটিকে বখশিশ দিয়ে রুমে ফিরলো!
নীলি আর জিজ্ঞেস করলো না, তবে কাঁচা ফুল হতে পারে! পরিচিত সুবাস ভেসে আসছে, নীলি আলাদা করতে পারলো না।
নীলিকে রুমে নিয়ে গিয়ে আবির প্যাকেটটা দিলো! আর বের করে দিলো সেই জংলা ছাপা শাড়ি! নীলি প্যাকেট খুলে অবাক হয়ে গেলো! কাঁচা ফুলের গয়না। টিকলি মালা আর হাতের বাজু দুইটা সম্ভবত।
কমলা রঙের জারবেরার পাশে টকটকে লাল গোলাপ, লম্বা করা হয়েছে বাসন্তী হলুদ গাদা ফুল দিয়ে! একই রকম, মালাটা বেশ লম্বা!
-নীলি আজ আমার জন্য সাজবে? আমি তোমাকে কাঁচা ফুলের সাজে দেখতে চাই!
আবিরের জন্য সাজবে না নীলি? তাহলে আর কার জন্য সাজবে!
নীলি ঘাড় নেড়ে হ্যা বলল। তারপর মনে মনে ভেবে ফেলল অনেক কিছু, এর আগে কখনো ভাবেনি কারো জন্য সাজবে, আবির এতো ইমোশনাল আর রোম্যান্টিক মনের সেটাও ভাবেনি! আচ্ছা আবির নীলিকে চমকে দিয়েছে, নীলি চমকে দিতে পারে না? এমন না যে নীলি সাজতে পারে না। কিন্তু সাজতে নীলির আগ্রহ খুব কম! নীলি কী যেভাবে ভাবছে সেভাবে সাজবে?
আবির দাঁড়িয়ে ছিলো বারান্দায়, আধাঘন্টা পরে নীলি ভেতরে ডাকলো আবিরকে। ও তখনো ওয়াশরুমে, বড় আয়নায় শেষ করে নিচ্ছে নিজের সাজ। রুমে শুধু একটা ডিম লাইট জ্বলছে, আবির বিছানায় বসে মাথার কাছের ল্যাম্পশেডটা জ্বাললো।
নীলি বের হতেই আবির চমকে গেলো, কল্পনায় নীলি এমনই ছিলো, কিন্তু আবির তো বলে দেয়নি কিছুই! নীলি কী তবে ওর মনের কথা শুনতে পায়! নীলি শাড়ির প্যাকেট থেকে শুধু শাড়িটাই নিয়েছে, শুধু শাড়িটাই, ব্লাউজ ছাড়া একপ্যাচে পড়ে চোখ ভরে কাজল দিয়েছে, সাথে ফুলের গয়না। গোলাপী ঠোঁট দুটো গ্লসি হয়ে আছে।
নীলিকে কোন অচেনা মেয়ে মনে হচ্ছে, খোলা চুলে টিকলি আর মালা চোখে পড়ছে, কানটা ফাঁকা!ঠিক এমনটাই আবির দেখতে চেয়েছিলো। হাতের বাজু চুড়ির মতো পড়েছে, একা পড়তে পারেনি বলে।
আবির নীলির কাছে আসে। হাতের চুড়ির মতো বাজুটা খুলে অনাবৃত বাহুতে আঁটকে দেয়। তারপর বলে, একটু বাকি আছে, ঢাকা থেকে নিয়ে আসা আলতা বের করে লাগিয়ে দেয় নীলির পায়ে।
নীলির ভীষন সুঁড়সুড়ি লাগে, কিন্তু ও কিছু প্রকাশ করেনি!
আলতা দেওয়া শেষ হলে আবির নীলিকে কাছে টেনে নেয়। নীলির নিরাভরণ কানে মুখ রেখে ফিসফিস করে বলে,
পড়েছে তোমার ‘ পরে প্রদীপ্ত বাসনা
অর্ধেক মানবী তুমি অর্ধেক কল্পনা…..
এরপরের গল্পটা শুধুই আবির আর নীলির! রহস্যময় আলোয় সমুদ্রের গর্জন ভেসে আসছে।
বাইরে কোথাও অচিন পাখি ডাকে, আবির বা নীলি চমকায় না আজ। মাঝে মাঝে মানুষের পৃথিবীটা দেবতাদের স্বর্গে রূপ নেয়। এই স্বর্গে দেবপুরুষ আবির আর দেবী নীলি! সমুদ্রের গভীরতা ছাপিয়ে আবির ডুবে যায় নীলির গভীরে।

শানজানা আলম