#শূন্যেরে_করিব_পূর্ণ (শেষ পর্ব)
নুসরাত জাহান লিজা
“আমি হিমু হতে চাইলেও আমার নিয়তিতে লেখা ছিল শুভ্র।” বিষণ্ণ হেসে বলল মিরান।
শ্রাবণীর আচমকা মন কেমন করে উঠল। পরশু রাতে ওর আচমকা ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। গলা শুকিয়ে কাঠ। কিন্তু রুমে পানি ছিল না। পিপাসা নিবারণের জন্য অগত্যা রুমের বাইরে আসতে হয়। তখনই মিরানকে দেখে বসার ঘরের মূল দরজা খুলে সিঁড়ি বেয়ে উপরে যেতে। ছাদে যাচ্ছে নাকি! চট করে ঘড়ির দিকে দেখল দুইটা তেতাল্লিশ। সময়টা ঠিক স্বাভাবিক মনে হলো না ওর। ভেতরে ভেতরে অদ্ভুত কৌতূহল হলো। তীব্র ইচ্ছেকে দমাতে না পেরে সে-ও পা টিপে টিপে বেরিয়ে এলো।
এই ছেলে নিশ্চয়ই কোনো পরিকল্পনা আঁটছে বিয়ে ভাঙার জন্য। শ্রাবণীর এমনই ধারণা ছিল। ভেবেছিল হাতে নাতে ধরবে। কিন্তু ছাদের দরজার কাছে এসে ওকে থমকে দাঁড়াতে হলো।
মিরান তখন হাত দুটো সামনে বাড়িয়ে চোখ বন্ধ করে হাঁটছিল। এই অদ্ভুত কাজের কোনো যুক্তি সে খুঁজে পেল না। ভাবল ঝগড়া করবে, যেই পা বাড়াবে, আচমকা দেখল ছেলেটা হাঁটু গেঁড়ে বসে ফুঁপিয়ে উঠল। সারাক্ষণ হিমু সাজার চেষ্টায় রত নির্লিপ্ত মিরানকে এভাবে কাঁদতে দেখে শ্রাবণীর পা দুটো থেমে গেল। তুমুল কৌতূহল চেপে সে নেমে এলো।
সারারাত শ্রাবণীর চোখে ঘুম নামল না। মনে হলো সকাল হলে মিরান অফিসে যাবে, তখন একবার ওর ঘরে যাবে। জিজ্ঞেস করলে যে জানতে পারবে না তা সে জানত। কিন্তু যেই ছেলের সাথে ওর বিয়ের কথা চলছে, তার ঘরে একা একা ঢুকতে ভারি অস্বস্তি হলো ওর। সেদিনকার মতো সৌম্য আর সূচির সাথে ভাব জমাল। বড়রা যে অবগত নয় এই ব্যাপারে এটা সে মিরানের বাড়ির সকলের আচরণে উপলব্ধি করেছে। তাই তাদের টানল না এর মধ্যে।
আজ সকাল হতেই শ্রাবণী বাচ্চা দুটোকে সাথে নিয়ে এসে ঢুকল মিরানের ঘরে। ফুপু জিজ্ঞেস করায় বলেছে বাইরে থেকে দেখেছে ঘরটা নোংরা। সে গুছিয়ে দিতে চায়।
ঘর গোছানোর অজুহাতে সে কোনো একটা সূত্র খুঁজছিল। টেবিলের সব বইপত্র আর অফিজের কাগজপত্রের নিচ থেকে পাওয়া গেল ব্রেইল বুক। ছাদে অন্ধের মতো হাঁটা, ব্রেইল বই মিলিয়ে ওর ব্রেইন ওকে একটা যেন বিপদের সংকেতই পাঠাচ্ছিল। আশঙ্কা এসে ভীড় করল মনে।
একটা ছবির এ্যালবাম পেল। তাতে শ্রাবণীর পরিবারের প্রত্যেকের একটা করে ছবি। উল্টাতে উল্টাতে ওর নিজের একটা ছবিতে চোখ আটকে গেল৷ বছর তিনেক আগের পহেলা বৈশাখে এখানে এসেছিল শ্রাবণী। লাল, সাদা শাড়ি পরে। এই ছবিটা কখন তোলা হয়েছিল! সে মনে করতে পারল না। মিরানকে ক্যামেরা হাতে সেদিন ঘুরতে দেখেছিল, ঝগড়াও হয়েছিল সেটা নিয়ে মনে পড়ল। ওর ছবির পরে আর কোনো ছবি নেই। একটা কাগজ সাঁটানো।
তাতে লেখা ‘আমার প্রিয় মানুষেরা, মগজে গাঁথা থাকুক চিরতরে।’
শ্রাবণী একান্ত জেদের বশেই বিয়ে করতে চাইছিল। রিজেকশন মানতে পারেনি বলে। কখনো মিরানের প্রতি কোনো অনুভূতি তৈরি হয়নি বলেই বোধ হতো। কিন্তু এখন একটা চাপা কষ্টে ওর ভেতরটা এফোঁড় ওফোঁড় হয়ে যাচ্ছিল যেন। মিরানের জন্য গভীরভাবে মায়া অনুভূত হচ্ছিল। কেন, সে জানে না!
এখন শুভ্র’র মতো পরিণতি শুনে আশঙ্কা সত্যি হলো। মিরান তখনো বলে চলছে,
“অপটিক নার্ভ শুকিয়ে যাচ্ছে। যা একসময় দৃষ্টিশক্তি কেড়ে নেবে। হয়তো দুই বছর কিংবা পাঁচ বছর, হতে পারে আরও কম বা বেশি সময়। এটাকে বলে গ্লুকোমা। আগে থেকে বুঝতে পারিনি। তেমন কোনো লক্ষ্মণ দেখা যায়নি। মাঝেমধ্যে চোখ ব্যাথা করত। গত বছর ধরা পড়ল।”
“ট্রিটমেন্ট?”
“চলছে।”
“এত বড় একটা কথা, কাউকে জানা..”
“সাহস করে উঠতে পারিনি। বাড়ির সবার আমার প্রতি বাড়তি দুর্বলতা আছে। কেন, সেটা জানি না। তবে আমি ফিল করতে পারি। বিশেষ করে বাবা। আমাকে সামনে বকাঝকা করলেও আমি দেখেছি রাতে ঘুম থেকে উঠে আমার ঘরে গিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে আসেন। মা ভীষণ ভেঙে পড়বে। চাচা-চাচি, ভাইয়া আপুরাও। আমি ওদের হাসিমুখ স্মৃতিতে ধরে রাখতে চেয়েছি। বিষাদে ডুবে যাওয়া অবসন্ন মুখ নয়।”
“আমাকে পছন্দ করো? মিথ্যে বলবে না, আগেই বলেছি।”
“করি। পছন্দের মানুষের করুণা নিতে পারব না বলেই সাহস সঞ্চয় করতে পারিনি। তুমি তো আমাকে ভালোবাসো না। এভাবে একটা সম্পর্ক…”
“মিরান, ভালোবাসা কী আমি খুব একটা বুঝি না। তবে মায়া চিনতে পারি। সেখানে সহানুভূতি হয়তো থাকে, কিন্তু একসাথে পথ চলতে চাওয়ার দৃঢ়তাও থাকে। জানি না কেন, গত দু’দিনে তোমার প্রতি অদ্ভুত এক টান আমাকে প্রতিনিয়ত টানছে। মনে হচ্ছে ওই গভীর চোখের ছেলেটা কেন পৃথিবীর আলো দেখতে পাবে না! এটাকে সহানুভূতি ভাবলে ভাবতেই পারো। তবে আমার আরও একটা আকাঙ্ক্ষা মনে জন্মেছে, এত আলো দিয়ে আমি একা কী করব! আমি তোমার চোখের আলো হয়ে পথ দেখাতে চাই। এমনও তো হতে পারে, হয়তো তোমার চোখ এমনই থাকল, আবার হয়তো থাকল না। তোমার পরিবারের সবার সাথে আমিও তোমার পথে আলো জ্বালতে চাই। এটাকে হয়তো ভালোবাসাই বলে।”
“একটা সময় গিয়ে যদি বোঝা মনে হয়? চোখের আলো ছাড়া একজন মানুষের পৃথিবী শূন্য।”
“মোর পাত্র রিক্ত হয় নাই,
শূন্যেরে করিব পূর্ণ, এই ব্রত বহিব সদাই।’ রবি ঠাকুরের এর পরের লাইনটা জানো, মিরান?”
মিরান আচ্ছন্নের মতো বলল,
“উৎকণ্ঠ আমার লাগি কেহ যদি প্রতীক্ষিয়া থাকে
সেই ধন্য করিবে আমাকে।”
“তবে সম্মতি দাও!”
ওরা হাঁটতে হাঁটতে কতদূর চলে এসেছে সেই খেয়াল নেই৷ মিরান সহসা উত্তর দিতে পারল না। কত মুহূর্ত অতিবাহিত হবার পর অস্ফুটস্বরে বলল,
“দিলাম।”
গলায় কী অসহ্য কম্পন, আবেগের একরাশ ঢেউ যেন প্রবল বেগে উত্থিত হলো মিরানের গলায়। হৃদয়ের লেনাদেনার এই মুহূর্তের সাক্ষী হয়ে রইল দুজন অবোধ শিশু আর বহুদূরের চাঁদ। ভরা পূর্ণিমায় যেন সব ধুয়েমুছে গেল। এমন মুহূর্ত জীবনে ক’জনের ভাগ্যে জুটে, এমন পৃথিবীপ্লাবী ভালোবাসা-ই বা ক’জনে পায়!
***
বাড়িতে সবাইকে বসার ঘরে একসাথে ডেকে জানানো হলো সবটা। একটা শোকাবহ পরিবেশ তৈরি হলো। বাড়ির ছোট ছেলেকে সবাই যে কী ভীষণ ভালোবাসে, তা শ্রাবণী আজ স্পষ্ট ভাবে দেখল।
সবাই কাঁদল, তবে মিরান ভাবেনি বাবা এভাবে কাঁদবেন। মাহমুদ সাহেব অত্যন্ত চাপা স্বভাবের মানুষ। কঠোর থাকেন অনেক সময়। আজ তার আবেগ নিয়ন্ত্রণের বর্ম ভেঙে গেল। ছেলেকে জড়িয়ে ধরে তিনি শিশুর মতো কাঁদলেন।
“চিকিৎসা ব্যবস্থা এখন কত উন্নত হয়েছে। সব ঠিক হয়ে যাবে। তুই ভাবিস না মিরু। একদম ভাবিস না।”
মিরান ভাবে না, সে নিজেকে প্রস্তুত করেই নিয়েছে। আজ সবার ভালোবাসায় সঞ্জিবনী শক্তি পেল হৃদয়ে। তবে আশায় বুক বাঁধল না, যদি হতাশ হতে হয় পাছে!
আশরাফ সাহেব মেয়ের জন্য সুখী হলেও, তিনি এখন পুরোপুরি একলা হয়ে যাবেন। এমন দিন তার জীবনে আসবে, তিনি জানতেন। তবুও শ্রাবণীকে ছাড়া তার কী করে কাটবে! সুখের মাঝেও ওটুকু শোক তার হৃদয়ে ব্যথা হয়ে বাজতে থাকল অনবরত।
পরিশিষ্টঃ
বহুবছর পরের এক পূর্ণিমায় একজোড়া দম্পতি রাস্তায় বেরিয়েছে। ছেলেটার কোলে বছর দুয়েকের একটা ফুটফুটে কন্যা। সে পূর্নিমা চেনে না। তবে বাবার কোল চেনে। পাশে শিশুটির মা তার বাবার হাত শক্ত করে ধরে রেখেছে। প্রতি পূর্নিমাতে তার বের হয়। ভরা জোৎস্নালোকে ওরা ভিজতে থাকে। মনে যদি কখনো কোনো ক্লেদ জমে, এই অভূতপূর্ব আলোর পবিত্রতায় সমস্তই বিলীন হয়ে যায়। কেবল ভালোবাসা থেকে যায়।
ভাগ্যিস হিমু হতে পারেনি, শূন্যতা ধুয়ে পূর্ণতা এই ধরায় কী করে নামত তবে, ওদের জীবনে!
শ্রাবণীর হাতটা আরও শক্ত করে পরম ভরসায় নিজের হাতে জড়াল মিরান। পরম ভালোবাসা আর বিশ্বাসে। প্রগাঢ় প্রশান্তিতে পরিপূর্ণ হয়ে এলো সমস্ত হৃদয়।
…………
সমাপ্ত