#শেষ_থেকে_শুরু
কলমে: লাবণ্য ইয়াসমিন
পর্ব:৭
থমথমে মুখ করে বসে আছে হৈমন্তী। কিছুক্ষণ আগে আমেনা বেগম অরফে মিনারা বেগমের সঙ্গে কথা হয়েছে। দীর্ঘদিন পর মাকে কাছে পেয়ে আনন্দে পাগল হয়ে গিয়েছিল মেয়েটা কিন্তু এই খুশীটা বেশিক্ষণ টিকেনি। আমেনা বেগম মেয়েকে পেয়ে খুশী হয়েছেন তাতে সন্দেহ নেই কিন্তু মেয়ের মতিগতি বোঝার জন্য উনি ফরহাদের কথাগুলো ওকে মনে করানোর চেষ্টা করেছে। বিষয়টা হৈমন্তীর কাছে ভীষণ তিক্ত লেগেছে। সেদিন শপিংমলের ঘটনাগুলো আর মায়ের বলা কথা মেলানোর চেষ্টা করছে। মোটামুটি ভালো সন্দেহ হয়েছে। এরকম একটা ঘটনা ওর জানা আছে কিন্তু সেই মেয়েটা যে ও নিজেই এটা মনে নেই। হৈমন্তী বুঝলো শপিংমলের ওই লোকটার কথায় আম্মা বলেছে কিন্তু ওর মনে পড়ছে না কেনো বুঝতে পারছে না। মাথায় তীব্র যন্ত্রণা হচ্ছে। হৈমন্তী রাতে দরজা বন্ধ করে বসে থাকলো বের হলো না। পরপর তিন ভাই দরজা থেকে ফিরে গেলো। রাতে কারো খাওয়া হলো না। চয়নিকা শাশুড়ির উপরে বিরক্ত। ভদ্রমহিলা আসতে না আসতেই খেলা দেখানো শুরু করে দিয়েছে। রোহান ফোন করেছিল চয়নিকার সঙ্গে কথা বলার জন্য কিন্তু বাড়ির অশান্তির জন্য কথা বলতে পারেননি। ছেলেটাও গুরুত্বপূর্ণ কিছু বলতে ছেয়েছিল। খলিল সাহেব স্ত্রীকে যথাসম্ভব বোঝানোর চেষ্টা করেছেন। শেষমেশ রেগেমেগে আরাফাতের রুমে গিয়ে ঘুমিয়েছে। আরাফত টেনশনে ডাইনিং রুমের সোফায় বসে রাত পার করে ফেলল। হৈমন্তী ভেতর থেকে সাড়া শব্দ করছে না। মাসুদ আরাফাতকে হুকুম দিলো দরজা ভাঙতে। দরজার মায়া করলে চলবে না। তবুও অপেক্ষা করে শেষমেশ ভোররাতে তিন ভাই মিলে ধাক্কা দিয়ে দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করলো। হৈমন্তী ফ্লোরে পড়ে আছে। আরাফাত দৌড়ে গিয়ে ওকে ধরলো। ফ্লোরে কাচ পানি আর রক্তের ছড়াছড়ি। মেয়েটার পা বেশ কিছুটা কেঁটে গেছে। হয়তো পানি খেতে গিয়েছিল সামলাতে না পেরে জগ নিয়ে পড়ে গেছে। ওরা ভেবেছিল হয়তো মায়ের কথাগুলো শুনে দরজা আটকে বসে আছে। আরাফাত ওকে বিছানায় রেখে শুকনো ওড়না দিয়ে জড়িয়ে নিয়ে বেরিয়ে গেলো। মাসুদ গাড়ি বের করতে চলে গেছে। রাজীব ঘরে গিয়ে কিছু নগদ টাকা নিয়ে বেরিয়ে গেলো। একটা প্রাইভেট হাসপাতালের ডাক্তারের সঙ্গে ওর পরিচয় আছে তাকে ফোন করে বলে নিলো। আমেনা বেগম কান্নাকাটি করছেন। মেয়েটার কপালে সুখ নেই। জন্ম থেকে কপাল পোড়া। এই সেই বলে গুণগুণ করছে। চয়নিকার শাশুড়ির পাশে গিয়ে আস্তে করে বলল,
> আম্মা ভাগ্যের দোষারোপ করবেন না। আমাদের কৃতকর্মকে লুকানোর জন্য আমরা ভাগ্যকে দোষারোপ করি।
চয়নিকার কথাগুলো মনে হলো আমেনা বেগমের কাছে আগুন ঘী ঢালার মতো হলো। উনি কটমট দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন,
> তুমি আমার দোষ ধরছো?দুদিনের মেয়ে হয়ে শাশুড়ির দোষারোপ করছো তোমার সাহস দেখে আমি হতবাক হচ্ছি। আমার শাশুড়ি ছিলেন না আমি উনাকে দেখে ঠকঠক করে কাঁপতাম। এই জন্যই বলেছিলাম গ্রামের সাদা সরল মেয়েকে বিয়ে কর। শহরের মানুষের মনে শুধু প্যাচ। ছেলেগুলা একটাও আমার কথা শোনেনা।
চয়নিকা শাশুড়ির বকবক শুনে হতাশ। খুব আফসোস করলো কি জন্য যেচে কথা বলতে গিয়েছিল। এই ভদ্রমহিলাকে টাইট দেবার মতো একটা লোক খুব দরকার। চয়নিকা মনে মনে বলল,” আল্লাহ্ তাড়াতাড়ি আমার শাশুড়ি আম্মার হেদায়েতের ব্যবস্থা করে দাও আমিন”। এই ভদ্রমহিলার জন্য একটা লোক চাই।
____________________
টানা তিনঘন্টা হৈমন্তী অচেতন হয়ে পড়ে আছে। জ্ঞান ফেরার নাম নেই। হাতে সেলাইন চলছে। পা মোটামুটি কেটেছে তবুও পাঁচটা সেলাই দিতে হলো। দরজার বাইরে দুভাই চুপচাপ বসে আছে। আরাফাত দৌড়ে দৌড়ে ওষুধপত্রের ব্যস্থা করছে। সাধারণ পড়ে যাওয়ার জন্য এমন হয়নি। মেয়েটার বেশ কিছুদিন মাথায় যন্ত্রণা করছিল। পুরাতন সমস্যাগুলো আবারও দেখা দেওেয়ার সম্ভাবনা আছে এই ভয়ে সকলে কাটা হয়ে আছে। আরাফাত ডাক্তার কে সাহায্য করছে। আগের ঘটনা গুলো বলছে। আমেরিকার এক ডাক্তারের সঙ্গে এই ডাক্তারের ফোনালাপ করিয়ে দিলো। তিন ঘন্টা পেরিয়ে পাঁচ ঘন্টা হতে চললো মেয়েটা তেমনি পড়ে আছে। আবির এসেছে দুঘন্টা আগে। অরিন ফোন করেছি ফোনটা চয়নিকা ধরেছিল সেখান থেকে বিস্তারিত শুনে ভাইয়ের কাছে বলেছে। আবির দেরী করেনি বোনকে নিয়ে বেরিয়ে পড়েছে। যদিও হৈমন্তীদের বাড়ির সঙ্গে ওদের তেমন একটা মাখোমাখো সম্পর্ক নেই। আরিণের সঙ্গে সকলের মোটামুটি ভালো চেনাজানা আছে। দুভাই বোনকে এভাবে হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে আসতে দেখে ফারজানা হক স্বামীকে নিয়ে ওদের পেছনে পেছনে হাসপাতালে এসে হাজির। আপাতত হৈমন্তীর শুভকাঙ্খির অভাব নেই তবুও সব হাতের বাইরে। রাজীব নিজকে দোষারোপ করছে বোনের বিয়েটা দিয়ে তখন কি ভুল টাই না করেছিলেন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন। মায়ের কথা শোনা উচিত ছিল না। উনি শুধু ছেলেদের কথায় ভাবেন মেয়েদের কথা ভাবেনা হয়তো। হৈমন্তীর বড়বোনকে দশম শ্রেণিতে থাকতে বিয়ে দিয়েছিলেন। চেনা জানা ভালো ছেলে ছিল তাই মেয়েটা সুখে আছে। কিন্তু হৈমন্তীর বেলায় ভিন্ন হলো। একবার মনে হচ্ছে কপালে ছিল তাই হয়েছে আবার মনে হচ্ছে বাল্য বিবাহ, সঙ্গে যৌতুকের অভিশাপ লেগে গেছে। যৌতুক দিয়েছিল বোনের সুখের কথা ভেবে। ফরহাদ চরিত্রবান হলে এতো কিছু হতোই না। ভালোমতো চাকরি করতো বোনটা ভালো থাকতো তাছাড়া রাজীব বোনের নামে বেশ কিছু টাকা জমিয়েছে ভেবেছিল ভাইবোনেরা সবাই মোটামুটি প্রতিষ্ঠিত শুধু ছোট বোনটা বাদে। তাই ওর কিছু পাওনা থাকে সেই হিসেবে টাকাগুলো জমিয়ে রাখা। ফরহাদ ভালো হলে এসব নিয়ে খুব ভালো জীবন অতিবাহিত করতে পারতো। বাদরের গলাই মুক্তার মালা দিয়েছিল কদর করতে পারেনি। মাসুদ ঝিম ধরে বসে আছে। বোনের বিয়ের সময় ও দেশে ছিল না। মিশনে ছিল বাড়িতে তেমন কথা বলতে পারতো না। সময় কম পেতো সেই সুবাদে ওকে তেমন কিছু জানানো হয়নি। বড় ভাই আর মায়ের উপরে রাগ হচ্ছে কিন্তু প্রকাশ করতে পারছে না। মেয়েটার জীবন নরক বানিয়ে দিয়েছে। আগের স্বামীর বিয়োগ, গাড়ি দুর্ঘটনা, তাছাড়া প্রেগনেন্ট অবস্থায় মেয়েদের শরীর মন এমনিই খারাপ থাকে তারপর আবার ফরহাদের এমন আচরণ সব মিলিয়ে ভয় হৈমন্তীকে পেয়ে বসেছিল। বাচ্চা কিভাবে মানুষ করবে লোকজন কি ভাববে ওসব নিয়ে টেনশন ছিল। পরবর্তীকালে মাথায় সমস্যা দেখা দেয়। ডাক্তার বলেছিল সুস্থ হতে সময় লাগবে। হৈমন্তীর জ্ঞান ফিরছে না এই যন্ত্রণায় সব কাতর তারপর আবার আবির জুটেছে সঙ্গে। পাগলামি করছে। ডাক্তারকে সঙ্গে নিয়ে হৈমন্তীর পাশে বসে আছে। আরাফাত এই ছেলেকে চিনে বহুবার দেখা হয়েছে কিন্তু এই মূহুর্তে কথাবলতে ইচ্ছা করছে না। আবিরের পাগলামি দেখে মোটামুটি সবার ধারণা হয়েছে ছেলেটা হৈমন্তীকে পছন্দ করে। কিন্তু কেউ কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে না। ডাক্তার ঘনঘন হৈমন্তীকে চেকআপ করছে। কয়েকটা টেস্ট করতে দিয়েছিল সেগুলোর রিপোর্ট মোটামুটি ভালো।
**
দুদিন যমে মানুষের টানাটানির পরে হৈমন্তীর জ্ঞান ফিরল। এই দুদিন আবির আরাফাতের সঙ্গে হাসপাতালে আছে। অরিন হৈমন্তীর পাশে থেকেছে। রাজীব আর মাসুদ মাঝেমাঝে বাড়িতে গিয়েছে কিন্তু ওরা তিনজন এখানে ঘাপটি পেতে আছে। চয়নিকা রনির জন্য হৈমন্তীর কাছে থাকতে পারছে না। অরিণের ভরসাতে ও বাড়িতে আছে। তবে মাঝেমাঝে দেখে যাচ্ছে। হৈমন্তীর মা এখনো মেয়েকে দেখতে আসেনি। রাজীব ইচ্ছা করে আনেনি। আবির আছে ওকে দেখলে আমেনা বেগম ক্ষেপে যাবে। হৈমন্তী পিটপিট করে চোখ খুলে আবারও চোখ বন্ধ করে ফেলল। শরীর বেশ ক্লান্ত দুদিন খাওয়া হয়নি। চোখে আলো লাগছে। ওকে নড়াচড়া করতে দেখে সকলেই ওর মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। অরিন হৈমন্তীকে ডাকতে চাইলো কিন্তু ডাক্তার ওকে ইশারায় নিষেধ করলো। হৈমন্তী আশেপাশে তাঁকিয়ে নিজের দিকে তাঁকালো তারপর ডান হাতটা নিয়ে পেটের উপরে রাখলো। বাম হাতে ক্যানোলা করা আছে। হৈমন্তী পেটে হাত রেখে কেঁদে ফেলল। আশেপাশের সকলের মুখে চিন্তার রেখা। হৈমন্তী কান্না থামিয়ে পাশে তাঁকিয়ে অরিনের হাত ধরে আস্তে করে বলল,
> আমি ঠিক আছি। কিন্তু তুমি তো ঠিক নেই। বিয়ে না তোমার? চোখের নিচে কালি পড়ে গেছে। দেখতে পচা লাগলে।
অরিনের ওষ্ঠে হাসি ফুটলো। মেয়েটা ওকে ভূলে যায়নি মানে ওর আগের কিছু মনে পড়েননি ভাবলো। হৈমন্তী পাশে আবিরকে দেখে সামান্য হেসে বলল,
> আপনি চিনতে পেরেছেন আমাকে?
আরাফাত বাইরে ছিল ও ভেতরে এসে দাঁড়িয়েছে। হৈমন্তী আবিরকে আগে থেকে চিনে কিন্তু মাঝখানে কিছু মনে ছিল না। আবির ও আগ বাড়িতে ওকে মনে করানোর চেষ্টা করেনি। বিষয়টা কেমন ঘোলাটে লাগছে। আরাফাত জানে বিষয়টা। রাজীবের কৌতূহল লাগছে কিন্তু প্রকাশ করলো না। ও বোনের পাশে গিয়ে বসলো। হৈমন্তীর উঠে বসতে গেলো কিন্তু হলো না। ভাইয়ের দুহাত জড়িয়ে ধরে ফুপিয়ে উঠলো। রাজীব বহু কষ্টে চোখের পানি আড়ার করে রেখেছে। হৈমন্তী ভাইয়ের মুখের দিকে তাঁকিয়ে কান্না থামিয়ে বলল,
> তোমার কোনো দোষ নেই ভাইয়া। ভেবে নাও আমার নিয়তিতে কষ্ট লেখা ছিল। যা হচ্ছে হতে দাও। প্রমিজ আমি আর তোমাদেরকে কষ্ট দিবো না। নিজেকে সামলে নিব।
হৈমন্তীর মাথার কাছে মাসুদ আর আরাফাত দাঁড়িয়ে আছে। হৈমন্তী ওদের সঙ্গে কথা বলতে পারলো না। শুধু হাসলো। তারপর আবারও চোখ বন্ধ করে ফেলল। রাজীব বোনের মাথায় হাত রেখে কয়েকবার ডাকলো কিন্তু সাড়া পেলো না। ডাক্তার পাশেই আছে। উনি চেক করে বললেন আবারও অচেতন হয়ে গেছে। রাজীব ডাক্তারকে বলল,
> আপনি কিছু বুঝেছেন?
> রোগীর স্মৃতি থেকে যা মুছে গিয়েছিল হয়তো তার কিছু কিছু মনে পড়ছে। হঠাৎ ব্রেনে চাপ পড়ছে তাই এমন হচ্ছে। চিন্তা করবেন না। ও নিজ থেকে যেটুকু বলে সেটুকুই শুনতে হবে। অতিরিক্ত জিঞ্জাসাবাদের দরকার নেই। সময় লাগলে ঠিক হতে।
> আচ্ছা।
আবির বেশ খুশী হলো হৈমন্তী ওকে চিনতে পেরেছে। সেদিনের সেই ঘটনা ওর চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে আছে। আবির পড়াশোনা শেষ করে তিন বছর আগে দেশে ফিরেছে। এই তিন বছরে মেয়েটাকে একটুও ভৃলে যায়নি। রাজীবের কথা শুনে আবিরের ধ্যান ভাঙলো।
> হৈমন্তীর সঙ্গে তোমার পরিচয় কিভাবে?
> সে আনেক কথা। হৈমন্তী সুস্থ হলে ও নিজেই বলবে চিন্তা করবেন না।
> তোমাদের দুভাইবোনকে ধন্যবাদ দিয়ে ছোট করতে চায়না আমাদের বিপদে তোমরা যেভাবে পাশে আছো।
আবির শুধু হাসলো। ধন্যবাদের জন্য ও এখানে আসেনি । শুধু হৈমন্তীর জন্য এখানে পড়ে আছে। মেয়েটা সুস্থ হলে শান্তি। অরিণ নিজের বিয়ের ডেট পযর্ন্ত পিছিয়ে দিয়েছে। হৈমন্তী সুস্থ হলে বিয়ের অনুষ্ঠান হবে নয়তো কোনো অনুষ্ঠান হবে না। এমনি বিয়ে হবে। দুভাইবোনকেই আরাফাতের পাগল বলে মনে হয়। এতো ইমোশন এদের মধ্যে কিভাবে আসে ভেবে পাইনা। তার সঙ্গে জুটেছে এদের মা। আরাফাত শুধু ওদেরকে লক্ষ করছে। ভাবে যেমন মা তেমনি তাদের ছেলেমেয়ে। ওদের জন্য ভদ্রমহিলা সকাল সন্ধ্যায় খাবার নিয়ে হাজির হচ্ছে। দেখাশোনা করছে। মনে হচ্ছে হৈমন্তীর ওদের বাড়ির একজন। এমন একটা পরিবারে যদি তখন মেয়েটার বিয়ে হতো কতো ভালোই না হতো। পৃথিবীর সব ভাইয়েরা বোনের সুখ চাই। ভাই বোনের সম্পর্কের মতো এতো মধুর সম্পর্ক হতেই পারেনা। আরাফাতের চোখ জ্বালাপোড়া করে। ছেলেদের যে কাঁদতে মানা। তাই চিৎকার করে কাঁদতে পারেনা। উচ্চ মাধ্যমিকে পড়াশোনার সময় প্রেম আসে আরাফাতের জীবন। মেয়েটার বিয়ে হয়ে যায়। আমেনা বেগম চাইলে মেয়ের পরিবারের সঙ্গে কথা বলতে পারতেন কিন্তু বলেননি। তাই রাগে ক্ষোভে বড় ভাইয়ের সাহায্যে দেশের বাইরে চলে গিয়েছিল। বিয়ের উপযুক্ত সময় পেরিয়ে যেতে বসেছে অথচ বিয়ের কথা ভাবতে পারেনা। সেসময় হৈমন্তী বেশ ছোট ছিল তবুও ভাইয়ের জন্য সেকি কান্নাকাটি। কথাগুলো ভেবে আরাফাত দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
চলবে
#শেষ_থেকে_শুরু
কলমে: লাবণ্য ইয়াসমিন
#বোনাস_পর্ব
হৈমন্তী পুরোপুরি এক সপ্তাহ হাসপাতালে ভর্তি। মাঝেমাঝে জ্ঞান ফিরছে,এলোমেলো কথাবার্তা বলছে তারপর আবারও অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছে। বর্তমান অবস্থা মোটামুটি ভালো। আমেনা বেগম বাড়িতে অতিষ্ঠ করে ফেলছে সবাইকে। হৈমন্তীকে দেখতে যাবেন। রাজীব শেষমেশ উপাই না পেয়ে মাকে নিয়ে হৈমন্তীকে দেখতে চলল। মায়ের মন সন্তানের জন্য কাঁদে সবাই এটা বুঝে। আমেনা বেগম পুরাতন দিনের মানুষ। নানা রকম কুসংস্কারের প্রতি বিশ্বাস উনাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে। তাছাড়া শাশুড়ির আদর্শ বউমা হিসেবে বেশ খ্যাতি ছিল উনার। সেসব কারণেই উনার মনের এই বেহাল অবস্থা। আবির হৈমন্তীর বেডের পাশে বসে আছে। এমন সময়ে হন্তদন্ত হয়ে ভেতরে প্রবেশ করলেন আমেনা বেগম। এসেই মেয়েকে জড়িয়ে একঘর কাঁদলেন। আবির গোলগোল চোখে তাঁকিয়ে আছে। ভদ্রমহিলাকে চেনার চেষ্টা করছে। তারপর অনুমান হলো ইনি হৈমন্তীর মা হবেন। উনি কালো বোরকা পরে আছেন। উনাকে কাঁদতে দেখে আবির হন্তদন্ত হয়ে আমেনা বেগমকে ধরতে গেলো কিন্তু রাজীব বাধা দিয়ে ফিসফিস করে বলল,
>হাত দিও না আগুন লেগে যাবে।
আবির রাজিবের কথায় অর্থ বুঝতে পারলো না। কিসের আগুনের কথা বলছে জিঞ্জাসা করতে চাইলো কিন্তু ততক্ষণে রাজীব ওর পাশ থেকে সরে গেছে। কেউ আমেনা বেগম কে শান্ত করতে চাইছে না। উনি কান্নাকাটি নিজের ইচ্ছেতে থামাবেন এমন ইচ্ছে। আবিরের বিরক্ত লাগছে। মেয়ের পাশে এভাবে মরাকান্না কেনো করছে আল্লাহ্ ভালো জানেন। এই সময় মেয়েটার আশেপাশে আওয়াজ করা ঠিক না তাই ভেবে একটু শব্দ করে বলল,
> আন্টি একটু থামুন। হৈমন্তী ঠিক আছে এভাবে কান্নাকাটি করবেন না।
আমেনা বেগম হুট করে কান্না থামিয়ে ফেললেন। পাশের ছেলেটা উনার একদম অচেনা লাগলো। উনি আবিরের পা থেকে মাথা পযর্ন্ত খুব ভালো করে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে নিয়ে বললেন,
> তুমি আমার মেয়ের ঘরে কি করছো?তোমাকে আমাদের কোনো আত্মীয় বলে তো মনে হচ্ছে না।
আবিরের মুখটা চুপসে গেলো। কি উত্তর দিবে বুঝে উঠতে পারলো না। অরিন পাশ থেকে বলল,
> আমি হৈমন্তীর বন্ধু। আর এটা হচ্ছে আমার ভাই।
আমেনা বেগম চুপচাপ কিছু কিছুক্ষণ ভেবে বলল,
> তোমরা একটু বাইরে যাও আমার ছেলেদের সঙ্গে কিছু কথা বলবো।
আবির অরিণকে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে গেলো। সঙ্গে সঙ্গে রুমের দরজা বন্ধ করে দেওয়া হলো। আরাফাত বাইরে ছিল ওষুধ কিনতে গিয়েছিল। ও ওষুধ নিয়ে এসে দেখলো আবির আর অরিন বাইরে বসে আছে দরজা বন্ধ। আরাফাত ভ্রু কুচকে আবিরের কাছে জিঞ্জাসা করলো,
> তোমরা বাইরে আছো তাহলে ভেতরে কে?
> আন্টি এসেছেন। ভাইয়াদের সঙ্গে কি একটা গোপন আলাপ করছে।তাই আমাদের বাইরে অপেক্ষা করতে বললেন।
আরাফাত বিষয়টা বেশ ভালোকরে বুঝে ফেলল। ও দরজায় শব্দ করে আঘাত করে বলল,
> দরজা খোলো আমি ভেতরে আসবো।
কিছুক্ষণের মধ্যেই দরজা খুঁলে গেলো। আমেনা বেগমের মুখটা কেমন থমথমে হয়ে আছে। রাজীব ভ্রু কুচকে রেখেছে। মাসুদের মুখেও বিরক্তি। আরাফাত ভেতরে গিয়ে প্রশ্ন করলো,
> আম্মা তুমি এখানে কেনো এসেছো? হৈমন্তীকে দেখি তুমি কবর পযর্ন্ত পৌঁছে না দিয়ে শান্তি পাবে না। বাড়িতে অশান্তি করে হয়নি এখানে চলে এসেছো।
আরাফাতের কথা শুনে আমেনা বেগম রেগে গিয়ে বললেন,
> তুমি ভুলে যাচ্ছ আমি হৈমন্তীর মা। মা হয়ে সন্তানের খারাপ চাইবো ভাবলে কিভাবে? আমি তো শুধু চেয়েছি মেয়েটার একটা সংসার হোক। ভালো থাকুক স্বামী সংসার নিয়ে।
> দয়াকরে বাড়িতে যাও। এখানে ঝামেলা করোনা। তোমার এই অতিরিক্ত চাওয়ার জন্য মেয়েটার এই অবস্থা। ছেলেমেয়েদের জন্য খুব করেছো আর করতে হবে না। তোমার এই ভালো চাওয়ার জন্য আমি কষ্ট পেয়েছি এখন আমার বোন কষ্ট পাচ্ছে। আমার মনে হয় আমরা তোমার সন্তান না।
আরাফাত নিজের জমিয়ে রাখা রাগটা এক নিমিষেই প্রকাশ করে ফেলল। রাজীব ওকে জোরকরে বাইরে নিয়ে গেলো। রাগে ফুলছে আরও কিছু কঠিন কথা বলে ফেলবে তখন আম্মাকে আর সামলাতে পারবে না। তাছাড়া বাক্য দ্বারা মানুষকে জীবন্ত দাফন করা যায়। পরে আফসোস করতে হবে। আবির কিছু বুঝতে পারছে না। আমেনা বেগম কথা বলছে না। চুপচাপ মেয়ের পাশে বসে আছে। কিছুক্ষণ থেকে চলে যাবেন। উনি ছেলেদের এতক্ষণ ধরে বকছিলেন পরের বাড়ির দুজন ছেলেমেয়েকে হৈমন্তীর কেবিনে আসার অনুমতি দিয়েছে এই জন্য। তাছাড়া আবির ছেলেটা যুবক ছোট না সে কিভাবে হৈমন্তীর কেবিনে থাকতে পারে এটা নিয়ে উনি বিরক্ত। লোকজন জানলে কি ভাববে। রাজীব বুঝিয়ে বলেছে অরিন আছে। তাছাড়া হৈমন্তীর জ্ঞান নেই। মরার মতো পড়ে আছে। নীল চাঁদরে পা থেকে গলা পযর্ন্ত ঢেকে রাখা এসব বুঝিয়ে বলল কিন্তু সেই এক কথা ধরেই বসে আছে উনি। আবির মোটামুটি আরাফাতের কাছ থেকে ঘটনার সংক্ষেপে যেনে নিলো। অরিন ভেতরে যেতে ভয় পাচ্ছে। আবির ওকে নিয়ে ভেতরে গিয়ে দাঁড়ালো। কেবিনে আমেনা বেগম ছাড়া কেউ নেই। বাকিরা বাইরে আছে। আবির আমেনা বেগমের দিকে তাঁকিয়ে ফিসফিস করে বলল,
> আন্টি জামাই হিসেবে আমি খারাপ হবো না। কথা দিচ্ছি হৈমন্তী সুস্থ হলে আমি নিজ দ্বায়ীত্বে ওকে একটা সুন্দর সংসার উপহার দিব। আগামী বছর ছোটছোট নাতি নাতনি নিয়ে ঘুরবেন। এতো রাগারাগী শরীরের জন্য ভালো না। পানি খাবেন? মাথা ঠান্ডা থাকবে।
আবির পানির বোতল এগিয়ে দিতে গেলো কিন্তু উনি নিলেন না। আমেনা বেগমের মেজাজ চরম খারাপ হলো। এই ছেলেটা ঠোঁট কাটা স্বভাবের। উনি আগেই সন্দেহ করেছেন। তাহলে এই ছেলের সঙ্গে মেয়ের বিয়ের পায়তারা চলছে। এই জন্য রাজীব উনাকে এখানে আনছে না। আমেনা বেগম আবিরের কথার উত্তর না করে গটগট করে বেরিয়ে গিয়ে রাজীবকে বলল বাড়িতে রেখে আসতে। এখানে থাকবেন না। থাকার ইচ্ছে চলে গেছে। রাজীব আর কথা বাড়ালো না। চলে গেলো। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে সময় লাগলো। অরিন ভাইয়ের দিকে রাগি দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
> এ জীবনে তোমার বিয়ে হচ্ছে না আমি সিউর। কি দরকার ছিল আন্টিকে রাগিয়ে দেওয়ার?
> তোর আন্টি এমনিতেই রাগে। কথাগুলো না বললে উনি এখানেই বসে থাকতো। উনাকে কদর করলে উনার হজম হতো না। হজম শক্তি কম আমি উনার হজম শক্তি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করবো। বিয়ে উনি না দেবার কে। হৈমন্তী ঠিক থাকলে পৃথিবী উল্টে গেলেও বিয়ে হবে। ও একবার আমাকে বলুক দেখবি সব বদলে দিব।। মেয়েটা বিছানা নিয়েছে উঠার নাম নিচ্ছে না। আমাকে মারতে চাইছে।
অরিন কিছু বলতে চাইলো কিন্তু পারলো না ডাক্তার চলে আসলো।
____________________
এভাবে দীর্ঘ এক মাস পার হলো। হৈমন্তী মোটামুটি সুস্থ। বাড়িতে নেওয়া হয়েছে। অতীত বর্তমান নিয়ে ও কাউকে কিছুই বলছে না। সব কিছু স্বাভাবিক। ওর ইচ্ছা হলে কথা বলছে, না হলে বলছে না।কেউ কিছু জিঞ্জাসা করছে না। তবে হাসপাতাল থেকে এসে ও রনির আশেপাশের ঘেঁষছে না। রনিকে দেখলে এড়িয়ে যাচ্ছে। আমেনা বেগম ফরহাদকে নিয়ে তেমন কিছু বলতে পারেনি। সামনে অরিণের বিয়ে। এতোদিন বিয়েটা পিছিয়ে ছিল হৈমন্তীর জন্য। তাছাড়া ওরা বাড়ি আর হাসপাতাল করে ক্লান্ত ছিল। ছেলে বাড়ির লোকজন আর অপেক্ষা করতে চাইছে না। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিয়েটা দিতে চাইছে। হৈমন্তী ব্যাগ গুছিয়ে নিচ্ছে অরিনের বিয়েতে যাবার জন্য। বিয়ের পাঁচ দিন বাকি আছে। হৈমন্তীর লাগেজ গোছাতে ব্যস্ত এমন সময় আরাফাত ভেতরে আসলো। ও এসে হৈমন্তীর সঙ্গে কাপড় ভাজ করতে শুরু করলো। নিরবতা কাটিয়ে আরাফাত মুখ খুলল,
> পা ঠিক হয়নি ওখানে গিয়ে অসুবিধা হবে না?
> অসুবিধা কেনো হবে অরিন আর আন্টি আছে আমাকে সাহায্য করবে। আন্টিকে দেখেছো দারুন একজন মানুষ। সব সময় হাসিখুশি থাকে।
> হুম। উনার জন্যই হয়তো ছেলেমেয়েগুলো এমন ভালো। যাইহোক আম্মা কিন্তু মুখ ভার করে রেখেছে। তুই বাড়ি ছেড়ে বন্ধুর বাড়িতে যাচ্ছিস। বিষয়টা উনি ভালো চোখে দেখছে না।
> উনার কথা আপাতত পাত্তা দিচ্ছি না। অরিন আমার খুব ভালো বন্ধু। আমার কোনো বন্ধু ছিল না। ওই একমাত্র মেয়ে যে আমাকে নিজের বোনের মতো ভালোবাসে তাঁর জীবনের এমন একটা গুরুত্বপূর্ণ দিনে আমি থাকবো না ভাবতে পারবো না ভাইয়া। তাছাড়া আমি একা না তুমিও যাচ্ছ। আমি তোমার লাগেজ গুছিয়ে রেখেছি। তুমি দেখে নিও আরও কিছু যদি লাগে।
আরাফাত বোনের কথা শুনে ভ্রু কুচকে বলল,
> আমি কেনো? বিয়ে বাড়িতে যায়না আমি তুই ভালো করে জানিস। তাছাড়া আমি গিয়ে কি করবো?
> তোমাকে রেখে যাবো কেনো ভাইয়া এটা আগে বলো? আমি তো চেয়েছিলাম বাড়ির সবাইকে নিয়ে যাবো। কিন্তু ওরা কি ভাববে। দরকার নেই বিয়ের দিন বাকিরা যাবে। তুমি যাও লেট করোনা।
হৈমন্তীর পা কেটে গিয়েছিল এক মাসে কিছুটা ঠিক হয়েছে তবে পুরোপুরি ঠিক হয়নি। হাটতে চলতে একটু সমস্যা হচ্ছে। হৈমন্তী ঝটপট লাগেজ গুছিয়ে বেরিয়ে গেলো। আরাফাত নিজের রুমে গিয়ে চেঞ্জ করছে। তাছাড়া পরে ভেবে দেখলো হৈমনকে একা ছাড়া ঠিক হবে না। সব সময় মেয়েটার আশেপাশে থাকা দরকার। হৈমন্তী ছোট ভাইকে নিয়ে সবাইকে বলে বেরিয়ে আসলো। মাসুদ পুরোদমে ডিউটি করছে বাড়িতে থাকতে পারছে না।
***
হৈমন্তী অরিনদের বাড়ির সামনে লাগেজ হাতে দাঁড়িয়ে আছে। আবির দোতলার বেলকনিতে বসে গেটের দিকে তাঁকিয়ে আছে।আর মাঝেমধ্যে কফির মগে ঠোঁট ঢুবিয়ে দিচ্ছে। কফিটা আজ হয়তো একটু বেশিই টেস্ট হয়েছে। ফারজানা হক অরিণকে সঙ্গে নিয়ে হৈচৈ করে হৈমন্তীকে রিসিভ করে বাড়ির ভেতরে নিয়ে আসলো। আরাফাত পেছনে আছে। হৈমন্তী খুঁড়িয়ে হাঁটছে। তাছাড়া আগের থেকে শরীর অনেকটাই দুর্বল। হয়তো ঠিক হয়ে যাবে। হৈমন্তীর এমন শান্ত থাকাটা নিয়ে সবাই চিন্তা করছে। বিয়ে বাড়িতে আত্মীয়স্বজনে ভরপুর হয়ে আছে। আরাফাতের বেশ অসুবিধা হচ্ছে। ওর জন্য আলাদা রুমের ব্যবস্থা করা হয়েছে। হৈমন্তী অরিণের সঙ্গে থাকবে। ওকে একা রাখার সাহসও কারো নেই। রুমে ঢুকেই অরিন হৈমন্তীকে জড়িয়ে ধরে বলল,
> খুব ভালোবাসি তোমাকে। তুমি ছাড়া আমাকে কেউ এতো ভালো বুঝেনা। তোমার জন্যই আমি এতো সুন্দর একটা জীবন পেয়েছি।
হৈমন্তী ওর পিঠে হাত রেখে বলল,
>তুমি এমনিতেই এতো এতো ভালো। খারাপ বন্ধুদের সঙ্গে মেলামেশা করে মাথাটা একটু বিগড়ে গিয়েছিল এখন তো ঠিক আছে।
অরিন ওকে ছেড়ে দিয়ে বলল,
> সৎ সঙ্গে সত্যি স্বর্গ বাস করে। তুমি বিশ্রাম করো
আমি আসছি।
অরিণ চলে গেলো। হৈমন্তী ওর যাওয়ার দিকে তাঁকিয়ে ভাবছে সেই পুরাতন দিনগুলোর কথা। বিদেশের মাটিতে প্রথম পথচলা এতোটা সহজ ছিল না। গ্রামের স্কুল,কলেজ থেকে পড়াশোনা করা একটা মেয়ে হঠাৎ আমেরিকা গিয়ে সবার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে গিয়ে হাজার বার হারতে হয়েছে। হৈমন্তীর সঙ্গে অরিনের দেখা হয়েছিল তখন অরিন এমন ছিল না। ওর চাল চলন চলাফেরা ছিল অন্যরকম।
চলবে
ভুলত্রুটি মার্জনা করবেন।