#শেষ_সূচনা
পর্বঃ১০
লেখকঃ আরিফুর রহমান মিনহাজ
দূর থেকে অনিক সেই দৃশ্য দেখে হাসতে হাসতে লুটোপুটি খেল। আমি সেদিকে একবার অগ্নিদৃষ্টি বর্ষণ করে দ্রুতপদে ব্যারাকে ফিরলাম। পেছনে বিশ্রী শব্দে অনিকের কলকল হাসিটা যেন থামতেই চাইছেনা।
ব্যারাকে ফিরে খাটের উপর ধপ করে বসতেই খাটটা বরাবরের মতো কেঁচকোঁচ শব্দে আর্তনাদ করে উঠলো। মিনিট কয়েক ফ্লোরের উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে কিসব আগডুম-বাগডুম ভাবলাম কে জানে! পরমুহূর্তেই পাশের খাটটার পুনঃ আর্তনাদ শুনে বুঝতে পারলাম,অনিক হাঁদারাম আমাকে জ্বালানোর জন্য হাজির! তাই হলো। শুরু হলো প্রশ্নের বান।
—- বস, বলেছিলাম না? আমি চোখের দিকে তাকালেই মানুষ পড়ে ফেলতে পারি? হেঁ! হা-হা-হা-হা
টানা কয়েক সেকেন্ড হাসতে হাসতে বাচ্চাদের মতো হাততালি দিল অনিক। দেখে মনে হয় সে দিগ্বিজয় করে ফিরেছে কেবল এবং সেই খুশিতে তার আনন্দ উচ্ছ্বাসের অবধি নেই। আমি বিরক্তভরা কণ্ঠে বললাম,
—- এমন তারছেঁড়ার মতো হাসছ কেন? হাসির কিছু হয়েছে নাকি?
অনিক গলায় জোর দিয়ে বলল,
—- অবশ্যই হয়েছে। কতদিন ধরে এসব? হ্যাঁ, চিঠি আদান-প্রদান!
একি তেলেসমাত কাণ্ড! ছেলেটা দেখি মান-সম্মান নিয়ে টানাটানি শুরু করে দিবে। এমন মুখ পাতলা ছেলে যদি পুরো ক্যাম্পজুড়ে এসব বলে বেড়ায় তাহলে বাকী আর থাকবে কী!
অনিক খেঁক করে হেসে ওঠে বলল,
—- বলবনা বলবনা। এতো চিন্তার কিছু নেই।
আমি আশ্চর্য হয়ে বললাম,
—- কী বলবেনা?
অনিক কৃত্রিম বিরক্তি প্রকাশ করে বলল,
—- উহঃ! আর কতবার বলব যে,আমি মানুষের চোখ দেখলেই ভেতরটা পড়তে পারি৷ এতক্ষণ তো তুমি তাই ভাবছিলে যে আমি সবাইকে বলে দিব এ কথা? তাইতো?
এতোদিনে অনিক আপনি থেকে তুমিতে নেমেছে।
এবার আবার ঘোরতর সন্দেহ হলো যে এই ছ্যাঁচড়া অনিক নিশ্চয় মনোবিশারদ। আমি দৃঢ়তার সঙ্গে অস্বীকার করে বললাম,
—— আরে না। তেমন কিছু না।
অনিক আঁতেলের ভঙ্গিতে ঠোঁট বেঁকে বলল,
—– জানি জানি।… তা কি আছে সেই চিঠিতে? পড়ে শোনাও দেখি।
—- অন্যের চিঠি পড়ার এতো ইচ্ছে কেন? যাও ঘুমাও।
বলা উচিত, কোন কারণে আজ সকল ট্রেনিংয়ের কাজকর্ম বন্ধ ছিল। সেই সুযোগেই সবাই এখনো পড়ে পড়ে ঘুমোচ্ছে। মেয়েদের দলটি চলে যাওয়া উপলক্ষেই আমি সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে চোখ ডলতে ডলতে জুহিদেরকে বিদায় দিতে গিয়েছিলাম। কিন্তু আমার সার্বক্ষণিক পার্সোনাল এসিস্ট্যান্টের মতো লেগে থাকা অনিক দত্ত যে সাত-সকালেও আমার পিছু লাগবে বুঝতে পারিনি। অনিক নাছোড়বান্দা। চিঠি পড়ার জন্য সে বদ্ধপরিকর।অনাঘ্রাত চিঠি কেই না পড়তে না চায়? আমি বললাম,
—- পড়ে শোনাতে পারি। তোমার ওয়াইফের সঙ্গে চ্যাট করোনা প্রতি রাতে? ওগুলা দেখাতে হবে। তাহলে হিসাব সিম্পল। রাজী?
অনিক একলাফে দূরে সরে বসলো। মুখটাকে পেঁচিয়ে বলল,
—– যাও, নিজের চিঠি নিজেই পড়ো। আমার লাগবেনা।
—- অ্যাঁঃ গুড।
বলে একটা বিজয়ের হাসি দিয়ে বেরিয়ে এলাম আমি। অল্প কদ্দূর হেঁটে পুকুর ঘাটে এসে বসলাম। বেলা হওয়ার সত্বেও পুরো ক্যাম্পে তখন নিস্তব্ধতার মোটা জালে নিমজ্জিত। মাঝে মধ্যে সেই জাল বিদীর্ণ করার চেষ্টায় গুটি কয়েক পুলিশ সদস্য স্ব স্ব প্রয়োজনে এদিক সেদিক আনাগোনা করছে। অদূরে মহিলা ব্যারাকের দরজার বেশ বড়সড় তালা ঝোলানো। সেদিকে তাকাতেই বুকের ভেতরটা অভূতপূর্ব বেদনায় মুচড়ে উঠলো। হয়তো সেই বেদনার কারণ, ভালো একজন বন্ধুকে হারানোর, সুখ,দুঃখের সংজ্ঞাগুলো নিয়ে মধুর বাগবিতণ্ডা করা মানুষটার চলে যাওয়ার। কিন্তু হলফ করে বলা যায়, জুহির প্রেমে আমি পড়িনি। অদূর ভবিষ্যতে পড়াও হয়তো সম্ভবও না। তার জন্য যা করে তা হলো, মায়া বা হঠাৎ চলে যাওয়ার মতো জবর শূন্যতা। যেমন মায়া সেদিন আমার বাড়ি থেকে বাল্যসখা নাহিদ চলে যাওয়া সময় হয়েছিল৷ এমনি হয়, একটা মানুষ যখন দীর্ঘসময় ধরে আপনার আশেপাশে থাকে,তখন সেই মানুষটা মনের অজান্তেই আপনার মনের সংকীর্ণ জায়গাটা ঠেলেঠুলে কোন অংশে হুট করে ঢুকে পড়ে।
হ্যাঁ, পৃথিবীর সম্পর্কগুলোর সৃষ্টি এভাবেই হয়। যত দিন পেরোবে,যত তার সঙ্গ দেয়া হবে, যতো বোঝাপড়া হবে,তত মনের সেই ঘুপসি জায়গাটা ধীরে ধীরে বিস্তার লাভ করে মহিরুহ আকার ধারণ করে। কিন্তু জুহির জায়গাটা কতটুকু বেড়েছে সেটা অন্তত আমার অবিদিত। নিজের মনের পরিধি মাপা কঠিন কাজ। ধীরে ধীরে চিঠিটা খুললাম। চিকন চিকন অক্ষরে মেয়েলী হাতের স্পষ্ট লেখা।পড়তে শুরু করলাম।
প্রিয়,
মিনহাজ
শুরুতেই ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি আপনার নাম ধরে চিঠিটা লেখার জন্য। আবারো ক্ষমা চাইছি আপনাকে ‘প্রিয়’ সম্মোধনের কারণে। আমি সত্যিই জানিনা, এই অল্পদিনে আমি আপনার কতোটা আপন হতে পেরেছি। অল্পদিন বলা নিছক ভুল হবে,ছ’মাস কম সময় নয়। সেই শুরুর দিন হতে আজ পর্যন্ত প্রত্যেকটা দিন আমার ভালো কেটেছে। যা আমার অকল্পনীয় ছিল, অভাবনীয় ছিল। আপনার মনে আছে প্রথম দিনটার কথা? আমরা সবাই আপনাদের বোঁচকা নিতে এসেছিলাম। আমি অজানা আকর্ষণে সবাইকে এড়িয়ে আপনার ব্যাগ নিতে গিয়েছিলাম। কিন্তু সেটা আপনি খেয়াল করেন নি। অন্য দশটা ঘটনার মতোই স্বাভাবিক ভাবেই নিয়েছিলেন বিষয়টা। আমার বিবেচনা করার ক্ষমতা নেই আপনি এই চিঠি পড়ে কি ভাববেন বা মনে করবেন। আপনাকে একদিন আমি বলেছিলাম, ইঁদুরের প্রাণ নিয়ে পুলিশ হবেন কেমনে? অথচ আমি তখনো জানতাম না আমার নিজের মধ্যেই একটা ক্ষীণ প্রাণ বসবাস করছে। নিজেকে সাহসী মনে করেও বোকামী করেছিলাম, আসলে আমি তা না। সাহসীই যদি হতাম,তাহলে আজকে আপনাকে এই চিঠি দেবার প্রয়োজন পড়তো না। মুখের সামনে চোখে চোখ রেখে একদৃষ্টে গড়গড় করে বলে আপনার মনের বারোটা বাজিয়ে সেখান থেকে নিষ্ক্রান্ত হতাম। ভাবছেন, মনের বারোটা কেন? এই চিঠি শেষ করেই বুঝতে পারবেন। মূলকথায় আসি। সুদীর্ঘ ছ’টা মাস আপনার সংস্পর্শে থেকে আমি অনেক কিছুই শিখেছি অনেক কিছুই জেনেছি। জীবন নিয়ে বিচিত্র কিছু উপলব্ধি করেছি, যা আমার জীবনে আগে কখনো হয় নি। ভিন্ন কিছু ভাববেন না। আমার সঠিক উপলব্ধিটাই মনের গহিনে প্রবেশ করে উত্তরোত্তর হামলা চালিয়ে, বারবার রোমন্থন করে আপনাকে বলার চেষ্টা করছি মাত্র। মানুষে মানুষে আকর্ষণগুলো নিসর্গ হতে আসে। সৃষ্টিকর্তা না চাইলে এমনটা কখনো হতে পারতনা। কেন জানিনা সেই শুরুর দিন থেকেই আপনার সঙ্গে কথা বলতে গেলে অপ্রস্তুত হয়ে পড়তাম আমি। কেমন যেন অদ্ভুত ভালোলাগায় ঘিরে রাখত আমায় সবসময়। ট্রেনিং বাদে একাকী সময়ে আপনার সঙ্গতে আমি পরিবার ছাড়ার দুঃখ ভুললাম, মায়ের অসুখের কষ্ট ভুললাম,পুলিশে জয়েন করার জন্য আত্মীয়-স্বজনের খোঁটা ভুললাম, ভাইয়ের পড়ার খরচের চিন্তা বিস্মৃত হলাম। সব একমাত্র আপনার কারণেই। পরিদর্শককের বকা শুনতাম অদূরে ট্রেনিংরত আপনাকে দেখার জন্য। বলতো, “আমাকে দ্বারা কিচ্ছু হবেনা, মনোযোগী হতে হবে।” কিন্তু এমন অবস্থায় কি মনোযোগী হওয়া যায় বলুন? আপনার মুখদর্শনেই যে আমি সুখলাভ করতাম! তবে আপনি অতকিছু খেয়াল করতেন না। আপনি থাকতেন আপনার মতো। কথাগুলো আপনাকে বলার পিছনে সত্যই কোন উদ্দেশ্য নেই। কিন্তু নিজের মধ্যে লুকিয়ে রাখারও কোন যুক্তিযুক্ত কারণ নেই। জানি এরপর কখনো দেখা হচ্ছে না আমাদের, তাই বলে দিতেও কোন দোষের কিছু দেখছি না। যদিও এতে আপনার অস্থিরতা বাড়বে। তবে না বললে বোধহয় আমার হৃদপিণ্ড বিস্ফোরণ হয়ে মরে যাব। আমাকে নিয়ে আপনি আর ভাববেন না। শুধু এটা মনে রাখলে চলবে যে, স্বর্ণার পর কোন একটা সময় আপনাকে কেউ খুব করে চাইত। আমি আপনার চোখে স্বর্ণার জন্য সর্বাত্মক ভালোবাসা দেখেছি। আমার পূর্ণ বিশ্বাস আছে যে, আপনি তাকে নতুন করে পথ দেখাবেন। আপনার অকৃত্রিম ভালোবাসায় আবদ্ধ করে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনবেন। আরো অনেক কিছু বলার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু ভোর হয়ে এলো প্রায়। সবকিছু গুছিয়ে ব্যাগে ভরতে হবে। ভালো থাকবেন। সুস্থ থাকবেন। খোদা হাফেজ।
ইতি
——–
জুহি।
ভোর ৪ঃ৩০, কুমিল্লা ক্যাম্প।
চিঠিটা আগাগোড়া দুইবার করে পড়ে শেষ করে ভাঁজ করে নিলাম। দুই ঠোঁট কুঞ্চিত করে একটা নিশ্বাস ফেলে মনে মনে বললাম,” মেয়ে মানুষ বড়োই অদ্ভুত কিসিমের, মনে আগুন জ্বালিয়ে দিয়ে বলে, “ভালো থেকো।” অজান্তেই মুখ ফুটে বেরিয়ে এলো, “আসলেই অদ্ভুত”
সঙ্গে সঙ্গে কানের কাছে পেছন থেকে খসখসে কণ্ঠে আমার কথার অনুরূপভাবে ” আসলেই,আসলেই” কথাটি শুনে এক লাফে উঠে দাঁড়ালাম আমি। তড়িৎ সচকিতে তাকিয়ে দেখলাম, ঘাটে হেলান দেওয়ার স্লাবের পিছনে দাঁড়িয়ে অনিক দাঁত কেলিয়ে হাসছে আর আমার হাতের গুটানো চিঠির পানে বঙ্কিম দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। তার পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে, জহির, জামান, হাবিব আর রনি। সবার ফোলা চোখে ঘুমঘুম ভাব তখনো বিরাজমান। তদ্দণ্ডেই বুঝতে পারলাম এটা অনিকের চাল। দলের বিচ্ছু ছেলেগুলোকে ধরে এনেছে আমাকে হেনস্তা করার জন্য। সবাই আমার দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়তে নাড়তে রোবটের মতো করে একনাগাড়ে বলে যাচ্ছে, আসলেই অদ্ভুত, আসলেই অদ্ভুত, আসলেই অদ্ভুত…..
নিদারুণ ক্রোধে, অপমানে,আর দুঃখে দুই পাশের চোয়াল শক্ত হয়ে এলো আমার। কিন্তু স্বভাব বজায় রেখে চুপ করে তাদের নাটক দেখতে লাগলাম। একসময় অনিক দুই হাত উঁচিয়ে রাজনীতিবিদের মতো বলল,
—- হয়েছে হয়েছে,থামো এবার। এখন তোমরা বলো। এই প্রেমিক পুরুষকে কী করা উচিত?
রনি মজা করে বলল,
—- পানিতে চোবানো উচিত।
কেউ কেউ এই সিদ্ধান্তে রাজি হলো। আবার দু একজন, নাকচ করল। কিন্তু এমন চাঞ্চল্যকর আইডিয়া শুনে অনিকের শয়তানী চোখ-মুখ মজা লোপার জন্য ছোঁকছোঁক করে উঠলো। এতক্ষণ পর্যন্ত আমি চুপচাপ ছিলাম। এখন কঠিন গলায় বললাম,
—- দেখো অনিক, মজা সবসময় ভালো লাগেনা। খবরদার এধরণের সস্তা মজা আমার সঙ্গে করতে যেও না।
অনিকসহ সবাই একে একে ঘাটের পেছন থেকে স্লাবে হাত ঠেকিয়ে ঘাটের মধ্যে উঠে এলো। অনিক হাত ঝাড়তে ঝাড়তে বলল,
—- সমবয়সীদের মজা কখনো সস্তা হয়না বুঝলে? আমরা আগেই ভেবে রেখেছিলাম সবাই আজ পুকুরে গোসল করব। চলো তোমাকে দিয়েই শুরু হোক।
বলতে না বলতেই সবাই মিলে আমাকে অসুস্থ রোগীর মতো ধরাধরি করে কোলে নিয়ে পুকুরে ক্লেদাক্ত সবুজাভ পানিতে ছুড়ে মারল। এক সেকেন্ড শূন্যে ভাসলাম আমি। এরপর ঝুপ্ করে পানিতে পড়ে নিমিষেই পুকুরের গভীর কনকনে ঠান্ডা পানিতে চলে গেলাম। পুকুরের স্তব্ধ জলরাশি হঠাৎই তরঙ্গায়িত হয়ে কূলে কূলে আছড়ে পড়ল। ছোট-বড় প্রজাতির মৎস্যগুলো ভীত-সন্ত্রস্ত হলো। পরক্ষণেই আবার শোঁওও করে উপরে ভেসে উঠলাম আমি। সাঁতরে ঘাটের কাছে আসার উদ্যেগ নিতেই একে একে সবাই ঝপঝপ করে লাফিয়ে পড়লো পুকুরে। শুরু হলো জল ঝাপটাঝাপটি,ও হুটোপুটি। মুহূর্তেই মনের সব বিষাদ দূর হয়ে গেল আমার। আমিও যোগ দিলাম তাদের সঙ্গে। যারা শহুরে জীবন কাটিয়েছে, সাঁতার জানেনা;তাদের তুলে নিয়ে এসে সাঁতার শেখানোর বন্দোবস্ত হলো। শেষে যখন, পরিদর্শকের গাড়ির হুঁইসেলের শব্দ হলো তখন সবাই নিরস্ত হলো। সেদিন মনে হয়েছিল, ছোটবেলায় গ্রামের সেই দিনগুলোতে ফিরে গিয়েছি।
দিনকতক পরে আচমকাই দুঃস্বপ্নের মতো বাবা এসে হাজির হলো ক্যাম্পে। একজন এসে খবরটা পৌঁছে দিলে আমি, “যাও আসছি” বলে তাকে বিদায় করলাম। সত্যি অবাক না হয়ে পারলাম না। বড় হবার পর থেকে যে মানুষটি একটু সুন্দর করে কথাই বললো না, সে আবার আমার জন্য সুদূর কুমিল্লা চলে এলো? ‘ইন্টারেস্টিং’ ব্যাপার তো! ফায়ারিং রেঞ্জ এর দিকে ছিলাম। সেখান থেকে বেরিয়ে গিয়ে আমি তাঁর সঙ্গে দেখা করতে গেলাম। মাঠের একপ্রান্তে একমনে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি। পরনে সাদা শার্ট আর কালো প্যান্ট। ডানহাতে স্যুট ভাজ করা। দুপুরের খাড়া রোদে কপাল কুঁচকে আছে লোকটি। তাঁর পাশেই তার স্ত্রী অর্থাৎ আমার মা। আশ্চর্য! মা বলতেও বাঁধছে আমার। তখনো ঘোর কাটেনি আমার। কেনই বা তাঁরা এলো এখানে সেটা জানার জন্য যেমন উৎসুক হয়ে ছিলাম আবার তেমনি তাদের আগমনে আমার ভেতরের ঘৃণার সুদৃঢ় আচ্ছাদনটা আবারো অনিবিড় হতে শুরু করেছে। যেকোন সময় সেই চাঁদোয়া ছিন্নভিন্ন হয়ে, আমার অবহেলিত মন দোদুল্যমান সম্পর্কগুলোর ইতি টানতে বাধ্য হবে। কাছে গিয়ে সালাম দিয়ে বললাম,
—- আপনারা এখানে? কোন দরকারে এসেছেন নাকি?
বাবা বললেন,
—- কুমিল্লাতে আমার একটা কাজ ছিল। কিন্তু তোমার মা তোমার সঙ্গে দেখা করার জন্য উতলা হয়ে আছে। এজন্যই নিয়ে এলাম।
মা নামের মানুষটি নত মুখে চুপ করে রইল। তাঁর ডান হাত দ্বারা বাম হাতে পেশি এবং বাঁ হাত দ্বারা ডানহাতের পেশি জড়ানো। আমি একটু উদ্ধত স্বরে বললাম,
—- বলুন,আমার সঙ্গে আপনার কি কথা আছে। ট্রেনিং চলছে আমার। যা বলার তাড়াতাড়ি বলে ফেলুন।
মা একটু এগিয়ে এসে আমার হাত ধরে কিছু বলতে চাইলেন। আমি দূরে সরে দাঁড়ালাম। তিনি করুণ চোখে তাকালেন আমার দিকে। মনে হলো মাত্র একটা অভিকম্পন তার সর্বাঙ্গে বয়ে গেল। আমি সেই দৃষ্টি উপেক্ষা করে বললাম,
—- এতো বছর যেমন অস্পৃশ্য ছিলাম। আজো তাই থাকি। বলুন, সময় নেই আমার।
মা বলল,
—- কেমন আছো তুমি? শুনেছি এখানে খেতে, থাকতে কষ্ট হয় অনেক। কষ্ট হচ্ছে না?
আমি মুখ বাঁকিয়ে একটু হাসলাম। বললাম
— এগুলো জিজ্ঞেস করার জন্য হলে আজ আসতে পারেন৷ আপনাদের এসব বলতে আমি বাধ্য নই। আরেকটা বহুল প্রচলিত কথা আছে, ” জন্ম দিলেই মা হওয়া যায়না।” পৃথিবীতে কতজন মা-ছেলের সম্পর্ক আপনার আমার মতো হয়? উত্তর আছে আপনার কাছে? নেই। একটু থেমে বাবার দিকে তাকিয়ে বললাম, আর আপনি! আপনাকে নিয়ে আর কী বলব? ধন্যবাদ আপনাদের, আমাকে দারুন একটা জীবন উপহার দেবার জন্য।…
আরো কিছু বলতে যাচ্ছিলাম, মা’য়ের ভেজা চোখের পল্লব থমকে দিল আমাকে। ঠোঁট চেপে যথোচিত রাগ সংবরণ করে লম্বা পা ফেলে প্রস্থান করলাম আমি। পেছন থেকে মা’য়ের অশ্রুবিকৃত কণ্ঠে আমার নাম শোনা গেল। আচ্ছা, আমার নামটা কি মা দিয়েছিল?জটিল প্রশ্ন!
সোজা ব্যারাকে চলে গেলাম সেখান থেকে। কয়েকজন ডাকতে এলে অসুস্থতার দোহাই দিয়ে শুয়ে রইলাম। না চাইতেও ভাবতে লাগলাম, এতোদিন পেটে-ভাতে থাকায় মা কোন খোঁজ খবর নেয় নি। তবে আজ কেন? শক্ত খাটে ঘুমোতে হচ্ছে বলে? নাকি বিস্বাদ খাবার খেতে হচ্ছে বলে?
দুপুরের খাবার বিরতিতে অনিক এসে বসলো পাশে। গদগদকণ্ঠে বলল,
—- বস খবর কী? অসময়ে মাঠ থেকে চলে এলে যে? প্রেমের দুঃখ বেড়েছে নাকি হে?
আমি মুখের উপর হাতটা রেখে চুপচাপ শুয়ে ছিলাম। হাত সরাতেই আমার দিকে তাকিয়ে সে একটু নিভলো। হাসি হাসি মুখটা তার পলকেই মলিন হলো। ঈষৎ ঝুঁকে উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলল,
—- কী হয়েছে মিনহাজ ভাই? কোন সমস্যা? শুনলাম তোমার বাবা এসেছে।
—– কিছু হয়নি, প্লিজ লিভ মি এলন!
—– নো নো, একা থাকলে ডিপ্রেশন বাড়ে বৈ কমেনা। আমাকে বলার মতো না হোক,কিন্তু এমন মুখ গুম করে রাখা চলবেনা।
আমি হেসে উঠে বসলাম। এসব আমার কাছে তুচ্ছ কারণ। আর তুচ্ছ কারণে মনের উপর প্রভাব ফেলানো অন্যায়। বললাম,
—- ঠিকাছে রাখলাম না মুখ গুম করে।
—- এইতো গুড। চলো, খেতে চলো। আজ একসঙ্গে খাই।
আমি দিরুক্তি না করে তার পিছন পিছন গেলাম। ঠিক আজই মনে হলো, অনিক ছেলেটা অত্যন্ত সরলমনা।পরিস্থিতি অনুযায়ী কাজ সে করতে পারে।
সেদিন আমি আর ট্রেনিংয়ে যোগ দিলাম না। অসুস্থের দোহাইটা বজায় থাকল। খেয়েই একঘুমে বিকেল। স্বর্ণা ফোন দিল বিকেলে। আমি তখন একাকী বনের খড়খড়ে শুকনো পাতা মাড়িয়ে বনের গভীরে যাচ্ছিলাম। মেয়ে ট্রেইনাররা চলে যাবার পর থেকে আড্ডার আসরে ভাটা পড়ে চর জমে উঠেছে। একাই সময় কাটাতে হয়। দিন গুনে রেখেছিলাম আমি। আজ স্বর্ণা ফোন দেওয়ার কোন সম্ভাবনাই ছিলনা। তবু হঠাৎ ফোনের রিংটোনের শব্দট একাকিত্বের মাঝে শ্রান্ত পথিকের পিপাসায় আর্ত গলায় একটু জল ঢালার সামিল মনে হলো। ফোন কানে দিয়েই আমার মুখে হাসি ফুটল। সহজ কণ্ঠে বললাম,
—– কেমন আছো?
স্বর্ণাও বোধহয় একটু হাসল।বলল,
—- ভালো। তুমি কেমন আছো?
—– ভালো।
—- তুমি বলেছিলে বিকেলে ফোন দিতে।তাই বিকালেই দিয়েছি।
বলে মৃদু হাসির শব্দসমেত কোনকিছু কামড়ানোর কচকচ্ শব্দ হলো।
—- ভালো করেছ। কী খাচ্ছ তুমি?
—- আপেল। একটু থেমে বলল স্বর্ণা।
আমি বললাম,
—– ওহহ, জানো আজকে কী কী হল?
—- না বললে জানব কেমনে? একটু বিরক্ত শোনালো তার কণ্ঠ। আবার কামড়ের শব্দ শোনা গেল।
—- বাবা-মা এসেছিল ক্যাম্পে। দেখা করতে…
চিবোনোর মচমচ শব্দ থেমে গেল হঠাৎ। বিস্ময়যুক্ত কণ্ঠে স্বর্ণা বলল,
—- বলো কী! কেন?
—- দরদ উতলে উঠেছে।
—- তুমি কী বলেছ? কী কথা হলো?
আমি কোনরূপ ভূমিকা ছাড়াই যা যা কথা হলো সব বললাম স্বর্ণাকে। স্বর্ণা ব্যথিত কণ্ঠে বলল,
—- এভাবে না বললেও পারতে। শুনতে কী বলতে চেয়েছিল ওনি!
আমি একটু অন্যরকম হেসে বললাম,
—- শোনার কিছু নেই স্বর্ণা। এতোবছর যখন তাদের ছাড়া থাকতে পেরেছি। বাকীটা জীবনটাও তাদের ছাড়া অনায়াসে কাটিয়ে দিতে পারব। কাউকে লাগবেনা।
স্বর্ণা হেসে নিরুক্তি করল,
—- কাউকে না? জুহিকেও না?
—- নাহ্। জুহিকেও না। একটু সময় দুজনেই চুপ করে রইলাম। আবার বললাম,
—- অন্যকে দেখিয়ে দাও, নিজের কথা বলোনা কেন স্বর্ণা?
—- এক কথা বারবার বলা আমি পছন্দ করিনা মিনহাজ। তোমার সঙ্গে কথা বলছি মানে এই না যে, তুমি আমার থেকে কিছু আশা করো।
—- আচ্ছা স্যরি, রাগ করোনা। কুল ডাওন। ক্ষতগুলো কি শুকিয়েছে পুরোপুরি? মেডিসিন চলছে?
—- হ্যাঁ শুকিয়েছে। শুধু দাগ…
কথা শেষ হলোনা। বয়োজ্যেষ্ঠ পুরুষালী কোন কণ্ঠ শোনা গেল ফোনের অপরপ্রান্ত থেকে। সিলেটি বা ঢাকার কোন ভাষা না। হালকা নোয়াখালীর টান আছে কথায়। আমার কেমন সংশয় লাগল। স্বর্ণা লোকটার সঙ্গে কথা শেষ করে আমাকে বলল,
—- হ্যাঁ বল। স্যরি লোক এসেছিল একটা।
আমি রাখঢাক পছন্দ করিনা। সোজাসাপটা প্রশ্ন করলাম,
—- তুমি কোথায় এখন?
—- কোথায় আবার বাসায়?
—- তা তো বুঝলাম। কিন্তু বাসাটা কোন জায়গায়?
স্বর্ণা একটুখানি নিশ্চুপ থেকে বলে উঠল,
—- কেন? সিলেট আরকি। অন্যকোথাও গেলে তো জানতেই পারতে৷
—- না, তুমি মিথ্যে বলছো, ঠিক করে বলো তুমি কোথায়?
আমার সহজ কণ্ঠে বিশ্বাসের প্রখরতায় বোধহয় সে একটু ভড়কালো। একটু আমতা আমতা করে আড়ষ্ট কণ্ঠে বলল,
—- আরেহ্ সত্যিই আমি সিলেটে। বিশ্বাস না হলে আসো ভিডিও কল দিই।
—- স্বর্ণা তুমি ভালো করেই জানো, বনের মধ্যে নেটওয়ার্ক কাজ করেনা। এজন্যই তুমি এতো বিশ্বাসের সঙ্গে মিথ্যাগুলো বলছো।
স্বর্ণা ধরাশায়ী হয়ে দমে গেল। সন্ধ্যা নেমেছে বহু আগে। চাঁদের মৃদু আলোতে বন থেকে ফেরার পথ ধরেছি আমি। এদিকে ঝিঁঝি পোকার একঘেয়ে নিরন্তর ঝিঁঝিঝিঁ শব্দে কানে তালা লাগার জোগাড়। ফোনের ওপাশের পিনপতন নীরবতা। কী ভাবছে সে? মনের কথাটা মুখ ফুটে বের করার আগেই স্বর্ণা বলল,
—- চট্টগ্রাম গিয়েছিলাম। দলবল কিছুই আনিনি। শুধু লিডার কে বলে পাঁচজনকে নিয়ে এসেছি। ওদের কাউকে কাজে লাগেনি, একাই কাজ সেরেছি। ফেরার সময় মাঝপথেই অবরোধ হওয়ায় নেমে পড়েছি। খবর নিশ্চয় শুনেছ, “চট্টগ্রামে দুইজন লিঙ্গবিহীন পুরুষের লাশ উদ্ধার।”
বলেই অট্টহাসিতে ঘরদোর কাঁপিয়ে তুলল স্বর্ণা। আমার গা টা কেমন ছমছম করে উঠলো। মনে হলো চাঁদের টিমটিমে আলোটাও দপ করে নিভে গেল। স্বর্ণা তাহলে তার কথাই রাখছে? প্রতিশোধের নেশায় এখনো উন্মত্ত হয়ে আছে সে?
হাসি থামিয়ে স্বর্ণা বলল,
—- বাকী চারজনকে পাইনি৷ দুইজন বিদেশে। আর দুইজন ঢাকায়।
—- হুমমম খুশি হলাম।
—- সত্যি খুশি হলে?
—– সেভেনটি ফাইভ পার্সেন্ট খুশি।… পুলিশ জানলে?
—– জানবেনা। কোন প্রমাণ রাখিনি। আর জানলেও ভয় নেই আমার। বাকী চারজনের মেরে আগুনে ঝলসে কুকুরকে খাইয়ে তবেই শূলে চড়বো৷
আমি কিছু বললাম না এটা নিয়ে। প্রসঙ্গ পাল্টে বললাম,
—– তাহলে কোথায় নেমেছ এখন? ফেনী? না নোয়াখালী!
—– কুমিল্লাতেই আছি। বলেই স্বর্ণা একটা বড় দীর্ঘশ্বাস মুখ দিয়ে নিঃসৃত করতে গিয়েও চেপে গেল।
মনের অগোচরেই আমার দু’ঠোঁটের কোণে খটমটে একটা হাসির রেখা ফুটল। দীর্ঘসময় পরে তার দেবোপম সুশ্রী মুখদর্শনের আনন্দোচ্ছ্বাস আমার বুকের একুল ওকূল ভরিয়ে দিল। গড়গড় করে বলে ওঠলাম,
—- ঠিকানাটা বলো, এক্ষুনি আসছি আমি।
স্বর্ণা ঠিক তার বিপরীত গলায় বলল,
—- নাহ,কোন দরকার নেই।
আমি হোঁচট খাওয়া গলায় মিনমিন করে বললাম,
—- কেন? একটু দেখা করেই চলে আসব।
ফোনের অপরপ্রান্ত হতে দৃপ্তকণ্ঠে কঠোর নিষেধাজ্ঞা এলো,
—– তুমি চাইলেই তো দেখা করবনা আমি। আমার পিছনে সময় নষ্ট না করে নিজের ট্রেনিং এর কাজে মন দাও। কেরিয়ার গড়ো।
চলবে….
#শেষ_সূচনা
পর্বঃ ১১
লেখকঃ আরিফুর রহমান মিনহাজ
আমি হোঁচট খাওয়া গলায় বললাম,
—- কেন? একটু দেখা করেই চলে আসব।
ফোনের অপরপ্রান্ত হতে দৃপ্তকণ্ঠে কঠোর নিষেধাজ্ঞা এলো,
—– তুমি চাইলেই তো দেখা করবনা আমি। আমার পিছনে সময় নষ্ট না করে নিজের ট্রেনিং এর কাজে মন দাও। কেরিয়ার গড়ো।
আমি বললাম,
— আমার কেরিয়ার গড়ার জন্য তোমার দুশ্চিন্তার কোন কারণ নেই। আর সময়টাও আমার, নষ্ট হলেও আমার হবে।… তোমার দেখা করার ইচ্ছে নেই তাই বলো।
— হ্যাঁ নেই! রাখি এখন।- স্বর্ণার কণ্ঠে রাগ এবং বিরক্তি।
আমি তাড়াতাড়ি করে বললাম,
— আরে শুন শুন, নেই কেন? লিডারের সঙ্গে লাইন টাইন আছে নাকি? গুণ্ডা প্লাস গুণ্ডি! ভালোই মানাবে কিন্তু।
স্বর্ণা চুপ করে রইল। বেশ বড়সড় একটা শ্বাস নিজের ফুসফুসে টেনে নিয়ে খুব ধীরে ধীরে ছাড়লো সেটা। এ সাধারণ শ্বাস-প্রশ্বাস নয়; বরং আনুপূর্বিক জীবনে ঘটে যাওয়া সকল ছোট-বড় গ্লানির বিষয়াদির অবাধ সিঞ্চনের চেষ্টা মাত্র। আমি বললাম,
— চুপ করে রইলে কেন?
কথাটা আমার মুখ দিয়ে বের হবার দেরি, তৎক্ষনাৎ স্বর্ণা সহজ গলায় বলল,
— আমাকে তোমার কী মনে হয়? জায়গায় জায়গায় গিয়ে খানকিপনা করে বেড়াই আমি? ওরকম মনে হয় আমাকে?
ঘটনার অপ্রত্যাশিত প্রবাহে আমি হতবুদ্ধি হয়ে গেলাম। থেমে থেমে বললাম,
— কী…কী ব-ল-ছো। তোমাকে এমন মনে হবে কেন? আমি জাস্ট ফান করলাম।
— সবসময় মজা করা মানায় না।
আমার একহাতে ফোন। অন্যহাত নেড়ে মাথা দুলাতে দুলাতে বললাম,
— আচ্ছা আচ্ছা, ঠিক আছে। এখন বলো ঠিকানাটা কি বলবে?
— বলছি। এতক্ষণ চাইনি আসো। কিন্তু এখন চাই তুমি আস। একটা চড় পাওনা আছে তোমার। -এতক্ষণ পর আবার আপেলে কামড় বসানোর শব্দ পাওয়া গেল। কচ্-কচ্-কচ্ সহজেই বোঝা যায় এতক্ষণ একমন-একধ্যানে কথা বলছিল সে। এবার একটু গা এলিয়ে দিয়েছে। আমি নিজের নিরস গলায় এবার এক শিসি উৎসাহ ঢেলে বললাম,
— চড় পাই আর যাই পাই। তোমার দেখা পাবো এতেই খুশি। তাড়াতাড়ি বলো ঠিকানাটা।
— রাজবাড়ী ১নং গলির ভিতরের দিকে এসো। দশটা বাড়ি পেরিয়ে একটা পুরাতন বাড়ি পাবে। ওখানে আছি আমি। (লেখকের কল্পিত,)
— ঠিকাছে। রাখছি আমি। এখুনি রওনা দিচ্ছি। বেশি দূর না।
বলে উত্তরের অপেক্ষা না করে ফোন কেটে দিলাম। তখন হাঁটতে হাঁটতে প্রায় ব্যারাকের কাছাকাছি চলে এসেছি। আশেপাশে চঞ্চল চোখ বুলিয়ে গেট ভিন্ন ক্যাম্প থেকে বের হবার রাস্তাটা খুঁজছি। এই মাঝ সন্ধ্যায় যে ক্যাম্প থেকে বাইরে বের হবার সুযোগ মিলবেনা সেটা খুব ভালো জানা আছে। অন্তত ছয় সাত মাসের অভিজ্ঞতা তাই বলে। ব্যারাকের অল্প দূরেই সারি সারি খাড়া সুপারি গাছ। কয়েকটার পুরুত্ব ও আছে বেশ। এর এক ফিট দূরেই সাদা রঙে আবৃত পাঁচিলের একাংশ এখান থেকেই দৃশ্যমান। ছোটবেলায় কত গাছে চড়েছি তার আদি-অন্ত নেই। সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগবে আজ। এজন্য, কোনকিছু শিখে রাখা ভালো, জীবনের শেষ সময়ে হলেও কাজে দেয়। ওদিক দিয়েই লাফিয়ে ক্যাম্প পার হওয়া যাবে। তারপর দুই মিনিট হেঁটে স্টেশন। সেখান থেকেই সিএনজি নিয়ে সোজা গন্তব্যে…। মুহূর্তে চমকপ্রদ বুদ্ধিটা খেলে গেল মাথায়। এটাই কাজে লাগাতে হবে।
আশেপাশে জনমনুষ্যের উপস্থিতি পরখ করলাম পা আলগা করে উঁকি-ঝুৃঁকি দিয়ে। এরপর পা টিপে টিপে একটা গাছের কাছে এসে একলাফে চড়লাম। ব্যাঙ কখনো গাছে চড়েছে কিনা জানিনা,কিন্তু আমি ব্যাঙের মতোই লাফিয়ে লাফিয়ে গাছের একভাগ উঠে গেলাম। বড়ো দুঃসাধ্য কাজ। মাঝ গাছেই হঠাৎ পশ্চাদদেশের নিচের দিকে প্যাটপ্যাট শব্দ হলো। কী হলো! কী হলো! এটা কোন প্রাণীর শব্দ? ভাবতে লাগলাম। ভাবনার জাল ছিঁড়ল নিম্নস্থ পশ্চাত্-দেশে তিরতির করে গাছের পাতা নড়া শিরশির ঠাণ্ডা বাতাসে। কি নিদারুণ লজ্জার কথা। তবু দমে গেলাম না। নিজের সমস্ত শক্তি দিয়ে অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে অবশেষে আমি পাঁচিল টপকে একলাফে ভূলুণ্ঠিত হলাম। ফুঁস ফুঁস করে দম নিতে লাগলাম। মিনিট কয়েক বসে রইলাম মাটির উপর। সুমুখে দিয়ে ঢাকা-চট্রগ্রাম মহাশড়কের ব্যস্ততা। দুরন্ত বেগে একেকটা গাড়ি ছুটে যাচ্ছে আর আমার পেন্টের সেই ছেঁড়া জায়গায় একটা অভূতপূর্ব দমকা হওয়া লাগিয়ে দিচ্ছে। আমি দুইহাতের তালু দিয়ে ঠসঠস করে নিতম্বের ধুলো ঝেড়ে উঠে দাঁড়ালাম। হাঁটা শুরু করলাম। পাঁচ মিনিট হাঁটার পর ছোটখাটো জমজম করা একটা বাজারে এসে পৌছালাম। আমার অসহায় প্যান্টের অভাবনীয় ক্ষতটা নিজে উপলব্ধি করতে পারলেও লোকে যাতে না দেখে সেই নিমিত্তে দুই উরু একটু গুটিয়ে হাঁটছিলাম। একজন সিএনজি ড্রাইভার ডাকলাম। লোকটি কাছে এসে বলল,
— যাইবেন কোনায় বাইয়া ?
আমি বললাম,
— রাজবাড়ী ১নং রোড যাবো। যাবে?
— ইয়ানু তো রাস্তা ভালা না। দেড়স টিঁয়া দন লাইগবো।
— ঠিকাছে দিব। চলেন।
সিএনজিতে উঠে এক কোণে জবুথবু হয়ে বসে রইলাম,পাছে কেও টের পেয়ে যায়! মিনিট-পঁয়তাল্লিশ পর রাজবাড়ির ১নং রাস্তার মুখে গাড়ি থামল। ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে গুনে গুনে দশটা বাড়ি পেরিয়ে সেই পুরোনো বাড়িটার সামনে এসে দাঁড়ালাম। রাজকীয় দ্বিতল ভবন। ভারী লোহার গেটে লালচে মরিচা ধরে ক্ষয়ে গেছে অনেকটা। ঘন-গাছপালার নিবিড় ছায়াতলের ভেতর বাড়িটা টকটকে লাল জবা ফুলের কেশরের মতো দেখাচ্ছে। কালের বিবর্তনে দালানের প্রাকারের গায়ে সবুজ শ্যাওলা পড়েছে। দালানের সামনেই কম শক্তিসম্পন্ন একটি আলো জ্বলছে। আর কোনকিছু চোখে পড়লনা। দুতলার বেলকনিতে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা মানবীটি আচমকা নজর কাড়ল আমার। গাছের ফাঁকফোঁকর গলে অনিমেষ চোখে তাকিয়ে আছে সে আমার দিকে। তার হাতে জলন্ত সিগারেট। জড়বস্তুর মতো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে একটু পর পর ছাঁচে গড়া নিটোল ঠোঁট দুটোর মাঝখান বরাবর সিগারেটের পশ্চাদ্ অংশ পুরে দিচ্ছে এবং পরক্ষণেই ফুসফুসে প্রবাহিত বিষযুক্ত ধোঁয়া নাক,ঠোঁট দিয়ে ফুউউ করে বাতাসে ঠেলে দিচ্ছে। দেখে নির্ধূম দীর্ঘশ্বাস পড়লো আমার।
গেট ঠেলে ভেতরে ঢুকতেও ঠাঁ ঠাঁ করে দু’টো গুলি এসে লাগল আমার গা ঘেঁষে লোহার গেটে। আমার বিবেচক মন বললো, এরা সেই পাঁচ জন। যারা স্বর্ণার সঙ্গে এসেছিল। আমাকে ঘাতক ভেবে গুলি চালাচ্ছে। আমি বাড়ির ভিতরে দৌড় দেয়ার চেষ্টা করলাম। স্বর্ণা নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। মনে হচ্ছে ধরাধামে সে নেই। আরো কয়েকবার গুলি করা সহ লোকগুলো পিছু পিছু এলো আমার। ভবন থেকে গেটের দূরত্ব যথেষ্ট। একটা গাছের গুঁড়ি সামনে পেয়ে সেটা হাতে নিয়ে ছুঁড়ে মারলাম। একসঙ্গে তিনজন কাবু হলো সেই গাছের গুড়ির ধাক্কায়। ঠিক তখনি যেন স্বর্ণা সংবিৎশক্তি ফিরে পেল। তড়িৎ দৌড়ে গিয়ে বেলকনি থেকেই রিভলবার উঁচিয়ে পরপর শূন্যে তিনটা গুলি ছুঁড়লো। পলকেই পরিবেশটা থমথমে হলো। স্বর্ণা গম্ভীর গলায় বলল,
— উপরে উঠে এসো।
আমি ক্রুর দৃষ্টিতে লোকগুলোর দিকে তাকিয়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে এলাম। ইশশ্ আমার পেন্ট ছেঁড়ার সময় পেলনা আর। এই অসময়েই?
আমি উপরে উঠে এলে স্বর্ণা রুমের লাইট জ্বালাল। পুরো ঘরটায় সিগারেটের ধোঁয়া ঝুলন্ত ফিনফিনে জালের মতো ছেয়ে আছে। স্বর্ণার হাতে তখনো সিগারেট।
আমি ঘরে ঢুকেই সৌজন্যতা বাদ দিয়ে বললাম,
— আচ্ছা, কোন ছেলেদের পেন্ট পাওয়া যাবে?
স্বর্ণা কোন কথা বলল না। আমি আবার একটু এগিয়ে এসে ছেঁড়াটা দেখিয়ে বললাম,
— দেখোনা, দেয়াল টপকে আসতে গিয়ে প্যান্টের তলা ছিঁড়ে গেল।
স্বর্ণা কপাল-ঠোঁট একসঙ্গে কুঁচকে দুইহাত দিয়ে ঠেকানোর ভঙ্গিতে অন্যদিকে তাকিয়ে বলল,
— উহহঃ লাজ-লজ্জা বলতে কিছু নেই নাকি?
আমি সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে টেনে টেনে বললাম,
— ওরে লজ্জাবতী! ওদেরগুলা কর্তন করতে গিয়ে বুঝি আপনার লজ্জা লাগেনি?
স্বর্ণা অ্যাশট্রেতে সিগারেট গুঁজে একবার আড়চোখে তাকিয়ে বলল,
— ছেঁচড়ামি করোনা বুঝলে। ভিন্নতা আছে। ওদের মেরে-কেটে ভাসিয়ে দিয়েছি মানে এই না যে, আমি গিয়ে গিয়ে পুরুষ মানুষের ইয়ে দেখব।
— ইয়ে কী?
স্বর্ণা অত্যন্ত বিরক্ত হয়ে বলল,
— তোমার কথাবার্তায় ইদানীং আমি বিরক্ত হচ্ছি মিমহাজ। এসব থার্ডক্লাশ কথাবার্তা ছাড়ো। আমি বলতে পারি,কিন্তু তুমি না। খারাপ আমি, তুমি না। ওয়েট করো… কাপড় নিয়ে আসছি।
বলে “আবদুল চাচা ,আবদুল চাচা” বলে হাঁকতে হাঁকতে রুম ছাড়ল সে।
আমি পিছন থেকে কিছু না জানার ভঙ্গি করে ঠোঁটসমেত হাতদুটো হালকাভাবে উল্টালাম। একটু পর স্বর্ণা এসে একটা সাদা পায়জামা দিয়ে গেল। আমি বললাম, – পায়জামা দিলে পাঞ্জাবি কই?
স্বর্ণা ছোট্ট করে অনুচ্চস্বরে ‘নেই’ বলে বেরিয়ে গেল।
আমি চেঞ্জ করে অনেক্ক্ষণ ধরে চেপে রাখা স্বস্তির নিশ্বাসটা ছাড়লাম। সদ্য ধুলো ঝেড়ে নেওয়া আঁশটে গন্ধযুক্ত সোফায় বসে পড়লাম, গলা বাড়িয়ে চেঁচিয়ে বললাম,
— হয়েছে,আসতে পার।
স্বর্ণা ধীরে ধীরে ঘরে ঢুকল। আমার সুমুখের সোফায় বসতে বসতে বলল,
—- তা খেয়ে এসেছ কিছু?
—- নাহ সেই দুপুরে খেয়েছি। তুমি অতদূরে গিয়ে বসেছ কেন? পাশে এসে বস। -চোখের ইশারায় পাশের সোফাটা দেখিয়ে দিয়ে বললাম আমি।
স্বর্ণা মৃদু হেসে বলল,
— আমি তোমার সেই লুকোচুরি খেলা প্রেমিকা নেই বুঝলে?
— তাই? আমাদের কি ব্রেকআপ হয়েছে? কৌতুক করে বললাম আমি।
স্বর্ণার হাতে সিগারেটের প্যাকেট ছিল। বিমনস্ক হয়ে সেটা দুই আঙুলে ঘুরাতে ঘুরাতে জবাব দিল,
— হ্যা হয়েছে। কোন কথাবার্তা বা মিউচুয়ালি না হলেও প্রকৃতি আমাদের আলাদা করে দিয়েছে।
— আবার এক হলেও তো পারি।
আমার এই কথাটি বলতে খুব একটা ইচ্ছে হলোনা। কারণ এই কথাটি বলতে বলতে আজ আমি ক্লান্ত-শ্রান্ত, অবসন্ন,নিজের মনের আয়নায় নিজেই কলুষিত। বারবার আঘাতে অনুভূতির তেজটাও ঢিমে। একটু পরই হয়তো তর্জন উঠবে আমার উপর। কিন্তু হলো তার উল্টো। স্বর্ণা মুখ বাঁকিয়ে ফিক করে হেসে ওঠল। হাসিতে শ্লেষ জড়ানো। বলল,
— চুম্বক চিনো? তুমি আর আমি চুম্বকের বিপরীত মেরুগুলো মতো। কখনো এক হবার নই। দূরে থাকাই আমাদের সাজে। যখনি কাছে আসতে চাইবে সেই চুম্বকের বিপরীত মেরুর মতোই আকর্ষণের বদলে বিকর্ষণ হবে; ততোই দূরে সরে যাবে।
প্রতুত্ত্যরে আমি একটু মৌন থেকে বললাম,
— হ্যাঁ ঠিক বলেছ। কিন্তু একটি কথা বলতে বলতে আমি ক্লান্ত। দেখো, চুম্বকের দিক পরিবর্তন করলেই কিন্তু তারা পরস্পর আবার আকর্ষণ করে। যে করেই হোক করে! কিন্তু তোমার বাঁধা হলো, যেসবে তুমি রাতদিন পড়ে আছ। নানান সন্ত্রাসী কাজকর্মে।সেসব তুমি ছেড়ে দিলেই চুম্বকের উপমা দেওয়ার প্রয়োজন পড়বেনা।
স্বর্ণা কিছু না বলে মেঝের ‘পরে দৃষ্টি নত করে চুপ করে রইল। ঝট করে কারেন্ট চলে গেল। নিমেষে ঘরময় নেমে এলো নিশ্ছিদ্র নিকষ কালো আঁধারের জাল। এসব মফস্বলের একটাই গুরুতর সমস্যা। লোডশেডিং। সহসা ঝক্ করে ম্যাচের ঘর্ষণের শব্দ হলো। পরক্ষণেই জ্যালজেলে কমলা আলোই স্বর্ণার ধারালো সুশ্রী মুখখানা পলকের জন্য উদ্ভাসিত হলো। সিগারেটে আগুন জ্বলল। অন্ধকারে স্বর্ণা ধীরে হেঁটে রুমের বাইরে গেল। সিগারেটের জ্বাজ্জল্যমান আলোর অনুসরণ করেই তা বুঝতে পারলাম। একটু পর একটা মোমবাতি হাতে স্বর্ণা ফিরে এলো। মোমবাতিটি সোফার সামনে টেবিলের উপর রেখে সরাসরি আমার পাশে এসে বসল সে। একটু দূরত্ব রেখে। তার গা থেকে পারফিউম এবং দামী সিগারেটের সংমিশ্রণে কিম্ভুত একটা সুঘ্রাণ আসছে। সে প্রহসনের গলায় বলল,
— এখন পাশে এসে বসেছি মানে এই না যে আমি পবিত্র হয়ে গেছি। বিকর্ষণের কথা মাথায় রেখে জোর করে কাছে আসার আলাদা একটা মজা আছে বুঝলে?
বলে সিগারেটে আরেকটা টান দিলো স্বর্ণা। আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল,
— খাবে?
— দাও।- বলে সিগারেট হাতে নিলাম আমি।
দুই ঠোঁটে সিগারেট পুরে টান দিয়ে বললাম,
— তোমার সিগারেট কি না খেলেই নয়? স্বর্ণার দিকে তাকিয়ে বললাম আমি।
স্বর্ণার চোখ সামনে। না তাকিয়েই বলল,
— কেন?
— ঠোঁট যে কালো হয়ে যাবে।
— হোক। তোমার কি?
— আমারই তো সব।
স্বর্ণা ঘাড় ঘুরিয়ে অন্যরকম চোখে তাকালো এক পলক। আবার চোখ ফিরিয়ে নিয়ে খানিক পর আমার একদম গা ঘেঁষে এসে বসল এবং আমার বাঁ হাত শক্ত করে আঁকড়ে ধরল। কয়েক সেকেন্ড কাটল স্থবিরতায়। আমার সন্দিগ্ধ চোখে অপার বিস্ময়। স্বর্ণার উপরের কাঠিন্যের খোলসটা যেন ধীরে ধীরে আমার সম্মুখে অনাবৃত হতে লাগল। আমি আবিষ্কার করছি সেই আট বছর আগেই অবিমিশ্রিত সেই স্বর্ণাকে। আমম্বিতেই আমার ধোঁয়াযুক্ত ঠোঁটে স্বর্ণার ঠোঁটের অনির্বচনীয় পেলব স্পর্শে আপাদমস্তক শিহরণের হিল্লোল বয়ে গেল। অদ্ভুত সুখের সাগরের কল্লোলে যেন চড়াই উৎরাই করতে লাগলাম আমি। মনে মনে আওড়ালাম, “চড় দিবে বলে ডেকে এনে এ কি দিলে? মনে যে দক্ষযজ্ঞ বেঁধে গেল।” দুই ঠোঁট যখন বন্ধ তখন কি আর কথা বলা যায়? উপায়ন্তর না পেয়ে চুপ করে রইলাম। মিনিট-আধ পরে আচমকাই ছেড়ে দিয়ে আমার চোখের উপর গভীর দৃষ্টি রেখে ব্যাকুল কণ্ঠে বলল,
—- তুমি এমন কেন মিনহাজ? তোমার সংস্পর্শে এলেই আমি মোমের মতো গলে যাই। পারিনা নিজের সবসময়ের কাঠিন্য বজায় রাখতে সত্যি আর পারছি না আমি। আমাকে প্রতিশোধ নিতে দাও। প্লিজ…
বলতে বলতে আমার বুকে আছড়ে পড়ল স্বর্ণা। তার চোখের দেয়াল গড়িয়ে ঈষদুষ্ণ জল টপটপ করে গড়িয়ে পড়তে লাগল আমার জামায়। জামা চুইয়ে বুকে। আমি স্তিমিত চোখে মোমবাতির হেলেদুলে জ্বলার পানে তাকিয়ে স্বর্ণার মসৃণ চুলে আঙুল চালাতে লাগলাম।…
চলবে…