#সমাপ্তিতে_সূচনা
#পর্ব ৭
#নুসরাত_জাহান_মিষ্টি
চারদিকে ফুলির ছবি ছড়িয়ে দিয়ে সজল তাকে খুঁজে বের করার নির্দেশ দিলো। খবরে বারবার ফুলিকে দেখানো হচ্ছে, তাকে কেউ ধরিয়ে দিতে পারলে তাকে পুরস্কার দেওয়ার ঘোষনাও দেওয়া হয়েছে।
ফুলি তিন তিনটা খু/ন করে এত সহজে নিজেকে আড়াল করে নিলো, যেটা সত্যি অবাক করা বিষয়। তবে সজল এখন অব্দি তার সন্দেহের কথা কাউকে জানায়নি।
সজলের মনে হয়,“ফুলি চরিত্রটা একটা ছদ্মবেশ।”
যদি তার সন্দেহ সত্যি হয় তবে ফুলির ছবি দিয়ে তাকে খুঁজে বের করা সম্ভব নয়। কারণ সেটা ফুলির আসল মুখশ্রী নয়।
অন্যদিকে নীলি থানায় আসলো। সজল ফুলির কেসটা নিয়ে যথেষ্ট চিন্তায় রয়েছে। তারমধ্যে নতুন কেস নিয়ে হাজির নীলি।
নীলি এবং সজল মুখোমুখি বসে আছে। সজল জিজ্ঞেস করলো,“কি চাই?”
“অভিযোগ লেখাতে এসেছি স্যার।”
“কোন বিষয়ে? অভিযোগটা কি?”
“আমার সন্তানের নিখোঁজ হওয়ার বিষয়ে।”
“নিখোঁজ? কিভাবে হয়েছে? কখন?”
“তার বাবা তাকে নিয়ে গেছে।”
“কী? বাবা নিয়ে গেছে সেটা নিখোঁজ কিভাবে হলো?”
নীলি এক পর্যায়ে কান্না করে দিলো। সজল বললো,“কান্না করবেন না। দয়া করে বলুন কি হয়েছে?”
নীলি তারপর শুরু থেকে সবটা বললো। সব বলার পর কান্নায় ভেঙে পড়লো।
সজল বললো,“আপনার স্বামীর নাম? ছবি থাকলে সেটাও দিন।”
“নাম শান্ত খান। ছবি রয়েছে ফোনে।”
“কি নাম বললেন?”
“শান্ত খান।”
সজল বিষ্ময়িত নয়নে নীলির দিকে তাকিয়ে রইলো। তারপর বললো,“ছবিটা দিন প্লীজ।”
“হ্যাঁ।”
নীলি ছবি বের করে দিলো। সজল ছবি দেখে বেশ অবাক হলো। নাম শুনে যা ভেবেছিলো তাই হলো। সজল বিরবির করে বললো,“শান্ত।”
সজল বললো,“আপনাদের কতদিনের সম্পর্ক?”
নীলি বললো,“জ্বী ছয় বছর।”
“ওহ। আপনি আপনার স্বামীর সাথে একা থাকতেন?”
“হ্যাঁ।”
“কেন তার পরিবার নেই?”
“আছে তবে তারা একসাথে থাকে না।”
“আচ্ছা আপনি আমাকে বলতে পারবেন আপনারা আলাদা কেন থাকেন?”
“সত্যি বলতে শান্ত চাইনি আমরা তার পরিবারের সাথে একসাথে থাকি।”
“কেন?”
নীলি চুপ করে গেল। সজল বললো,“আমাকে সত্যি করে বলুন। দেখুন নয়তো আমি আপনাকে সাহায্য করতে পারবো না।”
নীলি অস্বস্তি নিয়ে বললো,“রায়ান খান। আমার স্বামীর ভাই। তার স্বভাব ভালো নয়। তার কুদৃষ্টির আড়াল করতেই আমার স্বামী আমাকে নিয়ে আলাদা থাকেন।”
“ওহ আচ্ছা।”
সজল এবার চমকালো না। তার শুরু থেকে মনে হয়েছে তিন তিনটা খু/ন অকারণে হয়নি। তাই তার ভাইয়ের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ সে হজম করে নিলো।
সজল বললো,“আপনি আমাদের একটু সময় দিন, আমরা আপনার সন্তানকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করছি।”
নীলি মাথা নাড়ালো। সজল সহকারী অফিসারকে বললো,“এদিকটা দেখো, আমি আসছি।”
সজল থানা থেকে বেরিয়ে একটা নাম্বারে ফোন করলো। ওপর পাশ থেকে শান্ত ফোন তুলে বললো,“হ্যাঁ সজল বল।”
“ভাইয়া তুমি কোথায়? আমরা কি দেখা করতে পারি?”
“হ্যাঁ। কেন নয়?”
“তবে তুমি বলো তুমি কোথায়, আমি আসছি।”
“আচ্ছা আয়।”
*
সজল যে নাম্বারে শান্তর সাথে কথা বলছিলো সেটা দিয়ে শান্ত তার বাড়ির লোকের সাথে যোগাযোগ রাখে। নীলির কাছে তার যে নাম্বার ছিলো সেটা অন্য একটা।
*
সজল শান্তর বলে দেওয়া বাড়ির সামনে চলে এলো। কলিংবেল চাপ দিতে শান্ত দরজা খুলে দিলো। সজল ভিতরে ঢুকে বললো,“এটা তোর বাসা?”
শান্ত বললো,“নিজস্ব নয়। ভাড়ায় থাকি।”
“ওহ। ভাবী কোথায়?”
“ভিতরের ঘরে।”
“তারসাথে আমার পরিচয় করাবি না?”
“হ্যাঁ নিশ্চয়। আমি তো ভাবছিলাম আমরা খুব শীর্ঘ্রই বাবা-মার কাছে চলে যাবো।”
“ওহ তাই?”
“হ্যাঁ।”
“তা কাকা, কাকী মার সাথে তোর কথা হয়নি? রায়ানের ব্যাপারে জানিস তুই?”
শান্ত চমকে বললো,“রায়ানের ব্যপারে জানি মানে? কি জানবো?”
“রায়ান যে মা/রা গেছে তা জানিস না তুই?”
“কী? রায়ান মা/রা গেছে? কিভাবে?”
“তুই যার ভয়ে রায়ানের মৃ/ত্যুর খবর শুনেও যেতে চাসনি, তার হাতেই রায়ানের মৃ/ত্যু হয়েছে।”
“তুই কি বলছিস এসব?”
শান্ত ভয় পেয়ে গেছে। সজল বললো,“ভয় পাস না। আগে তোর নতুন বউকে ডাক, তাকে দেখি। তারপর আমরা এসব বিষয়ে কথা বলবো।”
সজল বেশ শান্তকন্ঠে বাক্যটি বললো। শান্ত ভয় পেয়ে গেল। সজল তার ব্যাপারে ঠিক কতটা জানে? কি জানে? বুঝে উঠতে পারছে না সে।
ভিতর থেকে তাহিয়ে বাবু কোলে নিয়ে বসার ঘরে এলো। তাহিয়াকে দেখে সজল বললো,“ভাবী কেমন আছেন? ভাইয়া তুই বাবা হয়ে গেছিস তাও আমাদের জানালি না?”
শান্ত চুপ। তাহিয়া শান্তর দিকে তাকিয়ে আছে। সজল বললো,“বাবুকে দেখি। আমার কোলে দেন ভাবী।”
তাহিয়া কোলে দেয়। সজল বাবু কোলে নিয়ে বলে,“জন্ম দিতে না পারলে অন্যের মাতৃত্ব কেড়ে নিয়ে মা হওয়া যায় না।”
তাহিয়া বললো,“মানে?”
“দেখুন আমি জানি আপনাদের বিয়ে এখনো হয়নি। শান্ত ভাইয়ার সাথে বিপদে পড়তে না চাইলে নিজের বাড়িতে ফিরে যান। আর হ্যাঁ এই বাবু এখন তার নিজের মার কাছে যাবে।”
“আপনি এসব কি বলছেন?”
শান্ত বললো,“সজল তুই কি বলছিস?”
সজল বললো,“আমি কে সেটা নিশ্চয় জানিস? একজন মহিলাকে মে/রে ফেলার চেষ্টা করা, তার সন্তান কেড়ে নিয়ে আসা, এসবের শাস্তি কি হয় জানিস তো?”
শান্ত এবং তাহিয়া উভয়ই ভয় পেলো। সজল বললো,“তাহিয়া ম্যাম আপনি নিজের বাড়ি ফিরে যান, শান্ত ভাইয়া এখন আমার সাথে তার স্ত্রীর কাছে যাবে। আর হ্যাঁ আপনারা আমার এই কথাটা না মানতে চাইলে, আমার সাথে থানায় চলুন। সেখানে আপনাদের বাচ্চা চু/রির শাস্তি দেওয়া হবে।”
তাহিয়া বললো,“কী?”
সজল বললো,“জেনেশুনে যে অন্যের স্বামীর সাথে প্রেম করতে পারে, আমার মনে হয় না সে থানায় গিয়ে রাত কাটাতে চাইবে। আপনি কি ব্যতিক্রম উদাহরণ হয়ে শাস্তি নিতে চান?”
তাহিয়া বললো,“না। একদম না।”
সজল বললো,“তাহলে চুপচাপ চলে যান। এখান থেকে চলে যাওয়ার সময় নিশ্চয় শান্ত এবং আপনার স্মৃতি, সম্পর্ক সব মুছে ফেলে রেখে যাবেন।”
শান্ত চুপ। কারণ সে জানে সজল অনেককিছু জেনে এখানে এসেছে। তাই তার চুপ থাকাটা ভালো। নয়তো হিতে বিপরীত হবে। এখন তাকে যদি কেউ সত্যি বাঁচাতে পারে তবে সেটা সজল। সজল তার ভাই, সে নিশ্চয় তার অপরাধ ক্ষমা করে দেবে।
তাহিয়া শাস্তির ভয়ে চলে যায়। সজল বাচ্চাটি তার পরিচিত এক মহিলার হাতে তুলে দেয়। তারপর শান্তকে নিয়ে অন্যত্র চলে যায়।
একটা ঘরে এসে শান্ত এবং সজল বসে। তারপর সজল বললো,“ছয় বছর একই শহরে থেকে তুমি এবং তোমার স্ত্রী ভিন্ন জায়গায় থাকছো। এর কারণ কি? কোন অপরাধ লুকাতে তোমরা লুকোচুরি খেলা খেলছো?”
শান্ত বললো,“তুই ঠিক কতটা জানিস?”
সজল শান্তর সামনে মোবাইলে একটা রেকর্ডিং চালু করলো। তাতে শোনা গেল শান্তর বাবা শান্তকে বলছে,“শোন রায়ান মা/রা গেছে। তোর এখানে আসার কোন দরকার নেই। আমার যতদূর মনে হয় কেউ মুনতাহার হয়ে প্রতিশোধ নিচ্ছে। রায়ানের বন্ধুরাও মা/রা গেছে। এখন বাকি আছিস তুই। আমাদের মনে হয় তার শেষ নিশানা তুই৷ আমরা চাই না তোকে হারাতে। তোদের হারাতে চাই না বলেই বাবা হয়ে তোদের সব অপরাধ ক্ষমা করে দিয়েছি। তোদের অপরাধ লুকিয়ে নিজেরা হয়েছে অপরাধী।
ব্যর্থতা আমাদেরই। আমরা বাবা-মা হয়ে তোদের ভালো শিক্ষা দিতে পারিনি।
তাই তো তোরা একের পর এক জ/গ/ন্য অপরাধ করে গেছিস। তুই বেঁচে থাক, এতটুকুই চাই। ভালো থাকিস।”
সজল বললো,“এবার আমি তোমার থেকে তোমাদের সেই অপরাধের গল্প শুনতে চাই। আর হ্যাঁ কোন মিথ্যে নয়। মনে রেখো খু/নির পরবর্তী নিশানা তুমি। তাই তোমার মিথ্যা তোমাকে ডোবাবে।”
শান্ত কালরাতের ঘটনা মনে করে ভয় পেয়ে গেল। তারপর বললো,“মুনতাহার হয়ে কেউ প্রতিশোধ নিচ্ছে না সজল। মুনতাহার অতৃপ্ত আত্মা ফিরে এসেছে, প্রতিশোধ নিতে। আমাকে তুই বাঁচা সজল। আমি ম/র/তে চাই না। আমাকে তুই বাঁচা।”
সজল বললো,“সবকিছু খুলে বল।”
“হ্যাঁ।”
অতীত,
*
চলবে,