সমাপ্তিতে সূচনা পর্ব-০৮ এবং শেষ পর্ব

0
755

#সমাপ্তিতে_সূচনা
#পর্ব ৮+শেষ
#নুসরাত_জাহান_মিষ্টি

মিলি, মুনতাহা, নীলি তিনবোন। সবাই তাই জানতো। তবে বাস্তব হলো নীলি মুনতাহার খালাতো বোন। এক দূর্ঘটনায় নীলির বাবা, মা মারা যায়। তখন মুনের মা নীলিকে তার বাড়িতে নিয়ে আসে।

এরপর থেকে নীলি তাদের সাথে বড় হয়। মুনের দশতম বয়সে তাদের মা তাদের ছেড়ে চলে যান। তখন থেকে রাশেদ সাহেব মেয়েদের একা হাতে মানুষ করেন।

খুব ইচ্ছে ছিলো মেয়েদের বড় করবেন। খুব ভালো স্থানে বিয়ে দিবেন। তাদের মেয়েরা খুব সুখী হবে।

বড় হওয়ার সাথে সাথে সেই স্বপ্ন আরো ঘাঢ় হলো। তবে মুনের জীবনের এক কালো অধ্যায় মুনকে চঞ্চল থেকে শান্ত বানিয়ে দেয়। সমাজ তাদের অপরাধীর চোখে দেখা শুরু করে। ঘৃণা, তিরস্কার করে।

এমতাবস্থায় মিলির বিবাহ দেওয়া সম্ভব হয়ে উঠে না রাশেদ সাহেবের। মিলি তার বড় সন্তান। সে হিসাবে তার বিয়ে নিয়ে ভাবাটা জরুরি। তিনি তাই ভাবছিলেন।

অন্যদিকে মিলি তখন প্রেম সাগরে ভাসছিলো শান্তর সাথে। ভালোবাসার গভীরতার প্রমাণ দিতে গিয়ে, মিলি দূর্ভাগ্যবশত গর্ভবতী হয়ে যায়।

মুনের ঘটনার পর তার এই ঘটনা জানাজানি হলে গ্রামে তাদের মুখ দেখানোর আর কোন পথ থাকবে না। তাই মিলি শান্তকে তার পরিবারকে তাদের সম্পর্কের কথা জানানোর জন্য জোর করে। শান্ত বেশ চিন্তায় পড়ে যায়।

শান্ত আসলে এক ফুলে বসে মধু পান করা ছেলে নয়। শান্ত সেই ভোমরা যে শত ফুলে ঘুরে বেড়ায়। ঠিক তেমনভাবে মিলির সাথে সম্পর্ক থাকা-অবস্থায় তার নীলির সাথে প্রনয় ঘটে।

মিলি এবং নীলি জানতো না তাদের ভালোবাসা একজন। অন্যদিকে মুন নিজের পড়াশোনা নিয়ে থাকতো। মিলি, মুন, নীলি তাদের তিনবোনের সম্পর্ক খুব গভীর ছিলো। তারা একে-অপরকে খুব ভালোবাসতো। এত ভালোবাসার পরও তারা একে-অপরের কাছে নিজেদের মনের মানুষের কথা বলে উঠতে পারেনি।

তার প্রথম কারণ ছিলো, গ্রামে বাস করে প্রেমের সম্পর্ক গড়া। লোক জানাজানি হলে তাদের মান থাকবো না। বোনদের কাছে শেয়ার করলে যদি বাবার কানে কথাটা চলে যায়। তাই একে-অপরকে বলে ওঠা হয়নি।

তবে মিলির অস্বাভাবিক আচরণ মুন এবং নীলি দু’জনের চোখে পড়ছিলো। একদিন মিলিকে বমি করতে দেখে মুন এবং নীলি দু’জনে জিজ্ঞেস করলো,“কি হয়েছে তোর? আজকাল এত বমি করছিস?”

মিলি বললো,“কিছু হয়নি।”

নীলি বললো,“তুই কি আমাদের থেকে কিছু লুকাচ্ছিস আপু?”

মুন বললো,“আমরা তোর বোন। আমাদের থেকে কোনকিছু লুকিয়ে তোর বিশেষ কোন লাভ হবে কি? আমাদের বল তোর সমস্যা। দেখ আমরা সরাসরি বলছি, আমাদের তোকে দেখে সন্দেহ হচ্ছে।”

মিলি বললো,“মানে?”

নীলি বললো,“তোকে বেশ ক’দিন ধরে দেখছি। আমাদের মনে হচ্ছে তুই গর্ভবতী। দেখ আমরা সরাসরি বললাম। এবার তুই আমাদের সত্যিটা বল।”

মিলি ভয় পেয়ে কান্না করে দিলো। তারপর সব বলে দিলো। মিলি বললো,“এসব কথা বাবাকে বলিস না প্লীজ।”

মুন বললো,“ছেলেটা কে?”

মিলি বললো,“শান্ত।”

“কী?”
নীলি চমকে সেখান থেকে চলে গেল। নীলি সোজা শান্তকে এসে মিলির কথা জিজ্ঞেস করলো। কিন্তু শান্ত তার সামনে সব অস্বীকার করলো৷

মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে নীলিকে ভুলিয়ে দিলো। বোঝালো মিলি হয়তো আসল ছেলেটার নাম বলতে না পেরে যে নাম মনে এসেছে সেটা বলেছে। সেটা কোনভাবে তার নামের সাথে মিলে গেছে। নীলি ভালোবাসায় অন্ধ হয়ে শান্তর কথা মেনে নিলো।

শান্ত মিলির জোর-জবরদস্তি সহ্য করতে পারছিলো না। তার তো মিলিকে আর প্রয়োজন নেই, কারণ মিলির থেকে যা দরকার ছিলো তা তো সে পেয়ে গেছে। এখন তার নীলিকে প্রয়োজন, নীলির সাথে সময় কাটানো প্রয়োজন।নীলি সবকিছু জানার আগে মিলিকে পথ থেকে সরাতে হবে।
*
শান্তকে চিন্তিত দেখে রায়ান জিজ্ঞেস করলো,“কি হলো এত চিন্তা করছিস কেন?”

শান্ত রায়ানকে সব বলে দিলো। রায়ান বললো,“এই ব্যাপার। চাপ নিস না। আমি আর আমার বন্ধুরা সামলে নিবো।”

শান্ত বললো,“মানে কিভাবে?”

“তুই ওকে ভুলিয়ে সন্ধ্যাবেলা পোড়া বাড়িতে দেখা করতে বল।বাকিটা আমরা বুঝে নিবো।”

শান্ত রাজি হলো। পথের কাটা দূর করার সুযোগ পেয়ে হাতছাড়া করার মতো বোকা সে নয়।
*
অন্যদিকে রায়ান তখন রাব্বি এবং রিপনের পাল্লায় পড়ে প*র্ন এবং নিষিদ্ধ জিনিসে আসক্ত হয়ে পড়েছিলো। তাই তার মস্তিষ্ক সারাক্ষণ নারী নিয়া চিন্তা করতো।

এতকিছুর মধ্যে রায়ানের জীবনে একটি সত্য রয়েছে তাহলো সে মুনতাহা নামক মেয়েটিকে ভালোবাসে। অনেকবার মুনতাহাকে বলেছে কিন্তু সে রাজি হয়নি। রাব্বি এবং রিপনের নজর পড়েছে মুনতাহার উপরে।
মুনতাহা নজরকাড়া সুন্দরী হওয়ার সুবাদে যেকোন পুরুষ তাকে প্রথম দেখায় আপন করে চাইবে।
সেখানে রাব্বি এবং রিপনের মতো লম্পটরা তো একটু বেশি করে চাইবে।
রায়ান তাদের মুনতাহার উপর থেকে নজর সরাতে বলেছে। তারা রাজি হয়েছে তবে শর্তের বিনিময়ে। তাদের মুনতাহার পরিবর্তে অন্যকোন নারী চাই।

শান্তর জীবনের কাটা এক মেয়ে। তাই তাকে শান্তর জীবন থেকে সরানো + বন্ধুদের শর্ত রক্ষা করা দুটো একটা কাজে হয়ে যাবে ভেবে রায়ান শান্তকে মেয়েটিকে পোড়া বাড়িতে নিয়ে আসতে বলে।
*
শান্ত রায়ানের কথামতো পরেরদিন মিলিকে দেখা করতে বলে সন্ধ্যাবেলা।
মিলিকে সন্ধ্যাবেলা বেড়াতে দেখে মুন জিজ্ঞেস করে,“তুই কোথায় যাচ্ছিস?”

“আমি একটু আসছি মুন। তোরা বাবাকে একটু সামলা।”

নীলি বললো,“কিন্তু যাচ্ছিস কই?”

“আসছি।”
*
অনেকক্ষণ পার হবার পরও যখন মিলি ফিরছিলো না। তখন মুন এবং নীলি তাকে খুঁজতে বের হয়।

মিলির মুখে শুনেছিলো, শান্তর সাথে সে প্রায় পোড়া বাড়ি দেখা করতো। তাই তারা দু’জন পোড়া বাড়ির উদ্দেশ্য বের হয়।

সেখানে গিয়ে কাউকে দেখতে না পেয়ে হতাশ হয়। মুন বলে,“এখানে না আসলে কোথায় গেল? এতরাতে এখানেও বা কেন দেখা করতে আসবে?”

নীলি বললো,“সেটাই তো।”

দু’জনে ফিরে আসছিলো এমন সময় ভিতর থেকে গোঙানির শব্দ আসে।

মুন পিছু ঘুরে তাকায়। কোনকিছু না ভেবে ভিতরে চলে যায়। এতক্ষণ রাতের আধারে ভিতরে প্রবেশ করতে ভয় পাচ্ছিলো তারা। তাছাড়া মিলি বলেছে তারা পোড়া বাড়ির ভিতরে যেতো না, পাশে বসে কথা বলতো। কিন্তু গোঙানির শব্দ মুনের ভয় নিমিষেই শেষ করে দিলো।

মুন ভিতরে চলে এলো, পিছনে পিছনে নীলিও এলো।

ভিতরে এসে মুন এবং নীলি থমকে গেল। সে কি নোংরা দৃশ্য। সামনে র/ক্তা/ক্ত মিলি, তার পাশে তিন যুবক। তারা সবাই সম্পূর্ণ কাপড়বিহীন।

মুন ‘আপু’ বলে চিৎকার দিলো। রায়ান তৎক্ষনাৎ হাফ প্যান্ট পড়ে নিলো। রাব্বি এবং রিপন বললো,“তোরা এখানে?”

রিপন বললো,“এ তো মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি। আজ তবে আরো দু’জন শিকার পাওয়া গেল।”

রায়ান বললো,“না।”

রায়ান রাব্বি এবং রিপনকে মুনদের সামনে যেতে বাধা দিলো। তাদের টানতে টানতে নিয়ে গেল।

মুন এবং নীলি গিয়ে তৎক্ষনাৎ মিলিকে ধরলো। মিলির তখনো জ্ঞান ছিলো। মুন বললো,“তোকে এখানে কে ডেকেছিলো? শান্ত? রায়ানের ভাই শান্ত?”

নীলি বললো,“না। ঐ শান্ত নয়। এটা তো অন্য শান্ত। কিন্তু শান্তর ভাই এতটা জ/গ/ন্য।”

মুন বিষ্ময় নিয়ে নীলির দিকে তাকিয়ে রইলো। তবে এখন তাকানোর সময় নেই। তারা তাড়াতাড়ি করে মিলিকে ধরে নিয়ে বের হলো। মাঝ রাস্তা অব্দি আসতে মিলির দেহটা সব হাল ছেড়ে দেয়। নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যায়। মিলি মারা যায়।

মুন এবং নীলি মিলিকে নিয়ে সেখানেই বসে পড়ে। ধীরে ধীরে রাস্তার লোকজন সেখানে জড়ো হয়।

অন্যদিকে রায়ান ওদের নিয়ে আসার পর রাব্বি বললো,“মাথা খারাপ হয়ে গেছে। আমাদের অপরাধীর সাক্ষী রেখে এসেছিস তুই।”

রিপন বললো,“তোর এত পি/রি/ত আসে কোথা থেকে? ওদেরকেও ওখানে ভো/গ করে ছেড়ে দিতাম।”

রায়ান বললো,“ না। মুন পবিত্র। আমি ওকে ভালোবাসি। একদম ওর গায়ে কলঙ্ক লাগানোর চেষ্টা করবি না।”

রাব্বি বললো,“এখন যে ও আমাদের জেলের গানি টানাবে তখন?”

রিপন বললো,“দেখ এটা নিয়ে যদি বাড়াবাড়ি হয় তবে কিন্তু আমরা মুনতাহাকে ছাড়াবো না।”

“না কিছু হবে না। তোরা জেলে না গেলেই তো হলো তাই না? আমি কথা দিচ্ছি তোরা কেউ জেলে যাবি না।”

রাব্বি এবং রিপন বললো,“সেটা মনে রাখিস।”
ওরা দু’জন চলে গেল।
*
মুনতাহাদের বাড়ির সামনে মানুষের ভিড়। পুলিশ এসে মিলির মৃ/ত/দেহ নিয়ে গেছে। মুন এবং নীলিকে প্রশ্ন করা হয়। তারা রায়ান এবং তার বন্ধুদেের নাম বলে দেয়।

পুলিশ যখন রায়ানের বন্ধুদের ধরে নিয়ে যায় তখন রায়ান কোনমতে পালিয়ে মুনদের বাসার পিছনে আসে।

এক বাচ্চাকে দিয়ে মুনকে ডেকে পাঠায়। তবে তার নাম বলতে বারণ করে।

মুন পিছনে এসে দেখে চাদর মুড়ি দেওয়া এক লোক। মুন বললো,“কে?”

রায়ান ঘুরে দাঁড়ায়। মুন বললো,“তুই?”

মুনের চোখমুখ রাগে ফেটে পড়ে।রায়ান বলে,“দেখো মুন আমি জানতাম না শান্ত যে মেয়েকে ডেকে আনবে সে তোমার বোন ছিলো। শান্ত তোমার বোনের থেকে মুক্তি চেয়েছিলো। তাই আমরা তাকে….। কিন্তু বিশ্বাস করো আমি যদি জানতাম ও তোমার বোন তবে কখনো এমন করতাম। কিন্তু যখন আমি জেনেছি ও তোমার বোন তখন অলরেডি রাব্বি, রিপন তার উপর….। আর আমি ওদের ওভাবে দেখে নিজেকে সামলাতে পারিনি। তাই আমিও।”

মুন সাথে সাথে রায়ানের গালে থাপ্পড় লাগিয়ে দেয়। তারপর বলে,“তোর মতো নোংরা মানুষ আমি জীবনে দু’টো দেখিনি। আমি ঠিক ভেবেছিলাম, তোর ভাই শান্তই আমার বোনের সর্বনাশ করেছে। আমার বোনকে প্রেমের ফাঁদে ফেলে অবৈধ সন্তান গর্ভে দিয়েছে। এখন সেই সন্তানের দ্বায় এড়াতে তোরা আমার বোনকে মে/রে ফেললি। তাও গনধ…. করে। আবার তুই তোর নোংরা মুখ নিয়ে আমার সামনে আসলি। তোর সাহস কিকরে হলো?”

মুনের রাগ দেখে রায়ান ভয় পেল। রায়ান বললো,“আমি তোমাকে ভালোবাসি মুন। তুমি আমার ভালোবাসা গ্রহণ করলে আমি সত্যি বলছি, আমি নিজেকে শুধরে নিবো। আমি ভালো হয়ে যাবো। দয়া করে আমাকে একটা সুযোগ দাও।”

“ভুল করলে শুধরানো যায়। কিন্তু তুই যা করেছিস তা পাপ, অন্যায়৷ যার শাস্তি পেতেই হবে। আমার বোনকে মে/রে তুই বেঁচে থাকতে পারবি না। কখনো না।”

এরমধ্যে সেখানে পুলিশ চলে আসে। রায়ানকে ধরে নেয়। রায়ানের সাথে কথা বলার ফাঁকে মুন ফোন দিয়ে পুলিশকে মেসেজ করে দেয়। রায়ান বললো,“প্লীজ মুন আমার ভালোবাসা গ্রহণ করো। আমার ভালোবাসায় কোন মিথ্যে নেই। আমার ভালোবাসা গ্রহণ করো। আমি বদলে যাবো। আমি বদলে যাবো।”
____
মিলির কেস আদালতে উঠে। যেটা শহরে হওয়ায় মুন এবং নীলি তাদের বাবাকে নিয়ে শহরে যায়। সেখানে মিলির কেস নিয়ে সওয়াল, জবাব চলে। এক পর্যায়ে মুনকে সাক্ষী দেওয়ার জন্য ডাকা হয়। মুন সেদিন যা হয়েছিলো সব বলে।
শান্তর সাথে মিলির সম্পর্ক থেকে শুরু করে বাচ্চা সবকিছু বলে।
তখন তাদের পক্ষের উকিল জানায়, ময়না তদন্তেও মিলিকে চারমাসের গর্ভবতী অবস্থায় দেখা গেছে।

তারপর নীলিকে সাক্ষী দিতে ডাকা হয়। তখন নীলি বলে,“মুন যা বলছে সব মিথ্যা।”
মুন এবং রাশেদ সাহেব চমকে যায়।

নীলি পুনরায় বলে,“মিলি আপুর সাথে অন্য এক ছেলের সম্পর্ক ছিলো। ব্যক্তিগত শত্রুতার জন্য মুন এবং বাবা শান্তদের দোষ দিচ্ছে। সেদিন ওখানে রায়ান এবং তার বন্ধুরা ছিলো না।
আমি সেখানে তিনজন অপরিচিত ছেলেদের দেখেছি। মুন আমাকেও মিথ্যা বলার জন্য বলেছিলো, কিন্তু আমি বলতে পারিনি। আমি এভাবে নির্দোষদের শাস্তি দিতে পারবো না। আমাকে ক্ষমা করো বাবা। আমি পারলাম না মিথ্যা বলতে।”

রাশেদ সাহেব চিৎকার দিয়ে বললেন,“তুই আমাদের মিথ্যা প্রমাণ করছিস। আমার মেয়েটার খু/নিদের নির্দোষ বলছিস। তুই আমার মেয়ে হয়ে এসব কি বলছিস?”

মুন বিষ্ময় নিয়ে নীলির দিকে তাকিয়ে থাকে। নীলিকে জিজ্ঞেস করা হয়,“মুনের সাথে রায়ানদের ব্যক্তিগত কি শত্রুতা রয়েছে?কিসের জন্য এই মিথ্যা মামলা?”

নীলি বলে,“রায়ানের চাচাতো ভাই সজল মুনকে কলঙ্কিত করার চেষ্টা করে৷ সে নিয়ে আমাদের গ্রামে বিচার হয়। তারপর সজলরা চলে যায়। কিন্তু মুনের গায়ে লাগা সেদিনের কলঙ্ক মুছে যায় না। আমাদের পরিবারকে সবাই হেয় পতিপন্ন করার চেষ্টা করে সবসময়। সেখান থেকে মুনের সজলদের পুরো পরিবারের উপর রাগ। তার রেশ ধরে এই মিথ্যা মামলা সাজানো।”

সজলের সাথে মুনের ঘটনা সত্য হওয়ায় এবং নীলি মিলি বোন হয়ে যখন রায়ানদের পক্ষে সাক্ষী দিলো তখন মুনের পক্ষে তার চোখে দেখা ঘটনা প্রমাণ করা অসম্ভব। তাছাড়া আদালতে প্রশ্ন উঠে মুন যদি তাদের দেখতে পায় তবে তারা মুনদের সাক্ষী হিসাবে সেখানে ছেড়ে যাবে কি উদ্দেশ্য। এখানে রায়ানের ভালোবাসার কথা প্রমাণ করা সম্ভব নয়। তাছাড়া মুন নিজেই সে ভালোবাসা মানে না।

সব মিলিয়ে আদালত রায়ানদের ছেড়ে দেয়।
নীলি আদালতের বাহিরে দাঁড়ানো মুনের কাছে আসে। মুন সাথে সাথে নীলি গালে একটা থাপ্পড় লাগিয়ে দেয়।

#সমাপ্তিতে_সূচনা
#পর্ব ৯ এবং শেষ
#নুসরাত

থাপ্পড় খেয়ে নীলি নিরব চোখে মুনের দিকে তাকায়। মুন বলে,“কিসের জন্য এমন করলি?”

নীলি বললো,“শান্ত কিছু করেনি। শান্ত আমাকে ভালোবেসে। দুই বছর ধরে আমাদের সম্পর্ক। আমি জানি ওর ভাই খারাপ কিন্তু ও না। তবে ও আমাকে বিয়ে করতে পারবে না ওর ভাই শাস্তি পেলে। ওর বাবা মা মানবে না। তাই আমাকে মিথ্যা বলতে হলো।”

নীলি একটু থেমে পুনরায় বলে,“বাবা আমাকে ক্ষমা করে দাও। ভালোবাসার জন্য বলা একটা মিথ্যা দোষের নয়। তাছাড়া মিলি আপা তো চলে গেছে, তাকে আমরা আর ফিরে পাবো না। তাই তার জন্য আমি আমার ভালোবাসাকে কেন হারাবো?”

মুন বলে,“বেঈমানের র/ক্ত কখনো ভালো হয় না নীলি। যে আপাকে ঠকিয়েছে সে তোকেও ঠকাবে। একদিন অনুশোচনা আগুনে তুই জ্বলে-পুড়ে ছাই হয়ে যাবি। মনে রাখিস তুই।”

মুন রায়ানদের দিকে এগিয়ে গিয়ে বলে,“তোরা মুক্তি ঠিকি পেয়ে গেলি তবে বাঁচতে পারবি না। আমি আমার বোনের নামে শপথ করে বলছি, তোদের কাউকে আমি বাঁচতে দেবো না। আমি তোদের শাস্তি দেবোই।”

মুন তার বাবার হাত ধরে চলে যায়। রাস্তার পাশ দিয়ে মুন এবং তার বাবা হেটে যাচ্ছিলো ঠিক তখন একটা ট্রাক এসে তাদের দু’জনকে পিশিয়ে দিয়ে চলে যায়। মুন একটু বেশি রাস্তার পাশে থাকা তার আঘাত কম লাগে কিন্তু তার বাবার উপর দিয়ে ট্রাকটা চলে যায়।

রায়ানরা সেই দৃশ্য দেখে উল্টোদিকে ঘুরে চলে যায়। যেতে পথে রায়ানের কানে বাজে রাব্বিদের বলা কথাটি,“জেল থেকে মুক্তি পেলে মুনতাহা হবে আমাদের প্রথম শিকার৷ এমনিতে রুপ দিয়ে আমাদের আগেই পা/গ/ল করেছে, এখন আমাদের পিছনে লেগে ভুল করেছে। রায়ান যাই বলুক আমরা ওকে ভো/গ করবোই।”

রায়ান চোখের পানি আড়াল করে বলে,“আমার ভালোবাসা মিথ্যা নয়। আমি মানুষটা জ/গ/ন্য হতে পারি, তবে নোংরা মানুষ ভালোবাসতে জানে। আমি জানি মুন কোনদিন আমাকে গ্রহণ করবে না, রাব্বিরা ওকে মা/র/বে। ওর মা/রলে মুনকে কলঙ্কিত হতে হবে কিন্তু ভালোবাসায় কলঙ্ক যে আমি চাই না।
তাই নিজের ভালোবাসাকে নিজেই শেষ করে দিলাম। মুনের অধ্যায় এখানেই সমাপ্ত।”

বর্তমান,
শান্ত বলে,“এরপর আমি নীলিকে বিয়ে করি। তাকে নিয়ে তোদের বাড়ি আসলে কোন না কোনদিন নীলির মুখে মুনের গল্প জানতি তোরা তাই বাধ্য হয়ে আমরা আলদা থাকি।”

সজল বললো,“এতকিছু করে তোরা শান্তিতে এই শহরে ঘুরে বেড়াচ্ছিলি?”

শান্ত বললো,“দেখ ভাই আমরা ভুল করেছি। ওরা তো ম/রে গেছে, তুই আমায় বাঁচা।”

“মুনের অধ্যায়ের সমাপ্তি টেনে তুই নিজের অধ্যায় সারাজীবন টেনে নিয়ে যেতে চাচ্ছিস?”

“ভাই তুই এভাবে কথা বলছিস কেন?”

“না এমনি। আচ্ছা পরী(মুন) আমাকে দোষারোপ করেছিলো কেন সেদিন? তুই কিছু জানিস?”

শান্ত বলে,“হ্যাঁ। এই সত্যিটা মুন জানতে পারলো না। আসলে রায়ান তোদের সম্পর্ক এগিয়ে যাচ্ছে সেটা মানতে পারিনি, তাই তোর জীবন থেকে মুনকে সরাতে সেদিন রাব্বিদের দিয়ে মুনকে আক্রমন করায়। রাব্বিরা রায়ানের কথামতো মুনকে আক্রমন করার সময় বলে, সজল আসা অব্দি আমার দেড়ি সয় না। আমরা বরং একবার করি তারপর সজল এলে আর একবার হবে। তাই মুনের মনে হয় ওখানে যা হয়েছে সব তুই করেছিস।”

সজল বলে,“তারমানে রায়ান আগে থেকেই বিপথে চলে গিয়েছিলো। তুইও ন/ষ্ট, তাহলে তোদের ভাই হয়ে আমি ভালো থাকলাম কিভাবে? আমার ভালো হওয়াটা ঠিক হলো না তাই না?”

শান্ত সজলের মতিগতি বুঝতে পারলো না। হঠাৎ শান্ত দেখলো মুনতাহা এগিয়ে আসছে সজলের পিছন থেকে। শান্ত ভয় পেয়ে বলে,“ভাই পিছনে মুন, আমাকে বাঁচা ভাই। আমাকে বাঁচা।”

সজল পিছনে ঘুরে বলে,“কই পরী? এখানে তো কেউ নেই? তুই আমার পরীকে দেখতে পাচ্ছিস? কই আমি দেখছি না তো?”

শান্ত বুঝতে পারে মুনের আত্মাকে শুধু সে দেখছে। শান্তর ভয় দ্বিগুন বেড়ে যায়।

শান্ত বারবার বলছে,“আমাকে বাঁচা ভাই। মুন ছু/রি হাতে আমার দিকে এগিয়ে আসছে।আমাকে বাঁচা ভাই।”

সজল বলে,“কই? পরী তুমি কোথায়? এখানে আছো?”

শান্তর ভয়ে হাত পা অবশ হয়ে যাচ্ছে। সজল চারদিকে মুনকে খুঁজছে। মুন আস্তে আস্তে শান্তর দিকে এগিয়ে আসে। তারপর ছু/রিটা শান্তর বুকে মা/রে।

মুন বলে,“তুই আমার দুই বোনকে ধোকা দিয়েছিস। পাপ করেছিস। তারপরও শান্তিতে বাঁচার স্বপ্ন দেখছিস? তোর এই স্বপ্ন দেখাটাই তো পাপ। সাহস পাচ্ছিস কিভাবে স্বপ্ন দেখার? হ্যাঁ।”

মুন একের পর এক আঘাত করলো শান্তর বুকে।

পরিশেষে,
সজল নীলির বাচ্চাকে তার কোলে তুলে দিলো। সারাদেশে খবর ছড়িয়ে গেল শান্তসহ মোট চারজনকে ফুলি নামে এক মেয়ে খু/ন করে পালিয়ে গেছে। সবাই ফুলিকে খুঁজছে।

রায়ানের বাবা-মা দুই ছেলে হারানোর শোক নিয়ে গ্রামে চলে গেল।

বেশ কিছুদিন পর,
বাসর ঘরে বসে আছে মুন। সজল ঘরে প্রবেশ করে দরজা বন্ধ করে দিলো। ধীর পায়ে এগিয়ে এসে মুনের পাশে বসলো।

মুনের মায়াবী মুখের দিকে তাকিয়ে স্মৃতির পাতায় চলে গেল।
আজ থেকে ঠিক ছয় বছর আগে মুন এবং তার বাবাকে হাসপাতালে আনা হয়। সেই হাসপাতালে এক কেস সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করতে যায় সজল। কাকাতালীয় ভাবে সেদিন মুনকে র/ক্ত/ক্ত অবস্থায় পায়।

সেদিন অনেক চেষ্টা করেও মুনের বাবাকে বাঁচানো যায়নি। তবে মুনকে বাঁচানো গিয়েছিলো। মুন জ্ঞান ফিরে প্রথমে সব ভুলে যায়। তখন সজল তাকে নিয়ে আলাদা এক ফ্লাটে থাকা শুরু করে। সেখান থেকে মুন সজলকে নতুন করে চিনে, ভালোবাসে।

একটা সময় শেষে মুনের সব মনে পড়ে যায়। সেদিন মুন সজলকে অবিশ্বাস করেছিলো। তার ধারণা ছিলো মুন রায়ানদের মতোই খা/রা/প। তবে দীর্ঘ কয়েক বছর একসাথে থাকার ফলে সজলকে নতুনভাবে যে চিনেছে, সেখান থেকে মনে হয়েছিলো সজল এ কাজ করতে পারে না।

তারপর সজলকে সব বলা। এটাও বলা সেদিন তার উপর যারা আক্রমণ করেছিলো তারা রায়ানের সেই বন্ধুরা ছিলো। সজল বলেছিলো,“সে তাদের চেনে না।”

প্রথমে না মানলেও পরে মুন মানে। যখন সজল তাকে তার প্রতিশোধ পূরণ করতে সাহায্য করবে বলে জানায়।

এরপর শুরু হয় সূচনা। নতুন করে ভাবনা। রায়ানরা যেখান দিয়ে মুনের গল্প সমাপ্ত করেছিলো, সজল ঠিক সেখান দিয়ে ফুলি নামক এক চরিত্রের সূচনা করেছে।

যে সূচনায় মুনের প্রতিশোধ পূরণ হয়েছে। যার হাত ধরে মুনও নিরাপদ। কেউ কোনদিন জানতেই পারবে না, ফুলি নামক মেয়েটি মুন।

মুন নামক মেয়েটি নিজের জীবনের সমাপ্তি দিয়ে ফুলি নামক এক মেয়ের সূচনা করেছে। যেটা কেউ জানতে পারবে না। কেউ না।

সজলকে ভাবনায় দেখে মুন জিজ্ঞেস করলো,“কি ভাবছো?”

সজল স্মৃতি থেকে বেরিয়ে আসলো। বললো,“ভাবছি আজ থেকে আমাদের নতুন এক গল্পের সূচনা হলো। সজল-পরীর গল্প।”

মুন বললো,“ফুলি চরিত্রের সাথে সাথে আমি পুরনো সবকিছুর সমাপ্তি দিয়েছি। তাই আজ থেকে যা হবে তা শুধু সূচনা। হ্যাঁ আজ থেকে আমাদের গল্পের সূচনা হলো৷ একটা সমাপ্তির সূচনা।”

“হু।”

সজল মুচকি হেসে বললো,“তোমার পা দু’টো একটু সামনে বের করো তো?”

“কেন?”

“করোই না।”

মুন তার পা সামনে বের করে। সজল তার মানিব্যাগ থেকে নুপুর জোড়া বের করে খুব যত্ন করে মুনের পায়ে পড়িয়ে দেয়।

তারপর বলে,“সেদিন যা পারেনি, আজ তা করছি।”

হাটুঘেরে বসে একটা লাল টকটকে গোলাপ বের করে বললো,“ভালোবাসি পরী। আমার সমাপ্তির সূচনা হয়ে সারাজীবন থাকবে পরী? বলো না বাসবে ভালো সারাজীবন?”

মুন গোলাপটি হাতে নিয়ে বলো,“হুম থাকবো৷ সারাজীবন ভালোবাসবো। সারাজীবন থেকে যাবো তোমার #সমাপ্তিতে_সূচনা হয়ে।

দু’জন একে-অপরকে গভীরভাবে আলিঙ্গন করলো।

(সমাপ্ত)