#সমাপ্তির_ওপাড়ে
#জাবিন_ফোরকান
#পর্বসংখ্যা৫৭ (প্রথমাংশ)
সাবিনের বাড়ি ফিরতে বেশ রাত হলো আজ। পরিশ্রান্ত শরীর সামলে ভেতরে ঢুকতেই ন্যানির সঙ্গে দেখা হলো। মহিলা সময় ব্যয় না করেই জানালো,
“জারিন আজ অনেক কান্নাকাটি করেছে। স্যারের পাশে ঘুমিয়ে গিয়েছে। কিছু খাওয়াতে পারিনি।”
বুকের ভেতরে চাপা হাহাকার হলেও সাবিন ন্যানির সামনে সেটা প্রকাশ করলোনা। বললো,
“ঠিক আছে। আপনাকে ধন্যবাদ। আপনি এখন আসতে পারেন।”
ন্যানি মাথা নেড়ে নিজের ব্যাগ গুছিয়ে চলে গেলো। তার রুটিন অনুযায়ী সে আবার আগামীকাল সকালে আসবে এবং সাবিন ফেরা অবধি জারিনের সঙ্গে থাকবে।
সাবিন প্রথমটায় নিজের রুমে গিয়ে একটা গোসল সেরে পোশাক বদলে কিচেনে এলো। লম্বা চুলগুলো কাটা দিয়ে বাঁধতে বাঁধতে ওভেনে খাবার গরম করতে দিলো। সবকিছু হয়ে গেলে ট্রেতে সাজিয়ে নিয়ে নীরবে হেঁটে গিয়ে পৌঁছালো দুই তলায়। আজ কক্ষটির দরজা আধখোলা। সেখান থেকে অতি মৃদু যান্ত্রিক গুঞ্জরণ ভেসে আসছে। ভেতরে ঢুকতেই অসাধারণ দৃশ্যটি দেখতে পেলো সাবিন।
বিছানায় শুয়ে থাকা জায়দানের বুকের উপর চুপটি করে গুটিশুটি দিয়ে ঘুমের জগতে বিচরণ করছে জারিন। ছোট্ট শরীরটা তার পিতার সঙ্গে যেন মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছে। দৃশ্যটা অসাধারণ ভালো লাগার। এতটাই আবেগী যে সাবিনের চোখে অশ্রু জমলো। সেই দিনটার কথা মনে পড়লো তার….
***
জারিনের বয়স আজ তিনদিন।
মীরা এবং একজন নার্সের সাহায্যে হেঁটে ধীরে ধীরে হাসপাতালের কেবিনে প্রবেশ করলো সাবিন। তার কোলে নবজাত অংশ। নরম কাপড়ে ছোট্ট শরীরটা মোড়ানো আছে।
হাসপাতালের কেবিনজুড়ে ঔষধের ঘ্রাণ। হার্টবিট মনিটর বিপ বিপ করে শব্দ করে যাচ্ছে। বিছানায় শুয়ে আছে জায়দান। মাথায় চুল প্রায় নেই বললেই চলে। যে মাথার চুলে হাত বুলিয়ে সাবিন দিন পার করেছে, তাই আজ হারিয়েছে জটিল চিকিৎসার কারণে। কন্ডিশনাল কেমোথেরাপি দেয়া হয়েছে জায়দানকে। এখনো শরীর ঠিকঠাক সেরে উঠতে পারেনি। ভগ্ন পুরুষটিকে গভীর ঘুমে ঐভাবে পরে থাকতে দেখে বুকের ভেতরটা সহস্রবারের মতন ভাঙলো সাবিনের। গোটা প্রেগন্যান্সি এবং ডেলিভারির সময়েও যে কষ্ট অনুভূত হয়নি, তাই বোধ হয় অনুভূত হচ্ছে এখন।
সাবিন সাবধানে এগিয়ে গেলো বিছানার কাছে। একজন নার্স জায়দানের অবস্থা মনিটরিং করছিল। সাবিনকে দেখে নরম গলায় সে জানালো,
“উনি হয়ত প্রতিক্রিয়া করছেন না, কিন্তু ওনার সেন্স আছে। আপনি চাইলে ওনার সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করতে পারেন।”
সাবিনের সঙ্গে আসা নার্স এগিয়ে এসে সেই নার্সকে বললো,
“উনি ওনার সন্তানকে দেখাতে এসেছেন। আমি স্কিন টু স্কিন রেকমেন্ড করেছি। কিছুক্ষণ থাকলে সমস্যা আছে?”
“না। একদমই সমস্যা নেই।”
বলে নার্স জায়দানের দিকে এগোলো। সাবধানে তার পরনের হাসপাতালের পোশাকের বোতামগুলো খুলে বুক উন্মুক্ত করলো। সাবিন বিছানার একপাশে বসলো। তার কোলে জারিন ততক্ষণে নড়চড় করতে আরম্ভ করেছে। ছোট্ট মুখটা টকটকে লাল হয়ে গিয়েছে। যেকোনো সময় তীক্ষ্ণ কান্না করার ধান্দায় আছে। নার্স সাবিনকে সাহায্য করলো,
“এইযে এভাবে। ওনার বুকে রাখুন। স্কিন টেম্পারেচার বাবুর শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করবে। ত্বকের সংস্পর্শ নবজাতকদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এটা তাদের পিতা মাতাকে চিনতে এবং বন্ডিং তৈরিতে খুব সাহায্য করে।”
সাবিন ধীরে ধীরে জারিনের ছোট্ট শরীরটা জায়দানের বুকের উপর রাখলো। সবেমাত্র কাঁদতে শুরু করা জারিন এবার নড়েচড়ে উঠলো। সাবিন তার পিঠে হাত চেপে ঝুঁকে এসে ফিসফিস করে বললো,
“হুশ, বেবি। এইযে দেখো, কোথায় আছো তুমি বলো তো? তোমার পাপ্পা, হ্যাঁ, ঠিক ধরেছ। এইযে তোমার পাপ্পা, তার ত্বক কত উষ্ণ তাইনা? তার বুক অনেক নিরাপদ। শুধু তোমার, শুধু আমার। তোমার পাপ্পা শুধু আমাদের দুজনের।”
জারিন হঠাৎ করেই নড়াচড়া বন্ধ করে দিলো। জায়দানের বুকের উষ্ণতা তাকে শান্ত করে ফেললো সম্পূর্ণ। পিটপিট করে চোখ মেলল নবজাতক। বাদামী টলটলে দৃষ্টিতে যেন এক অভূতপূর্ব বিস্ময়। চুপটি করে পিতার বুকে লুকিয়ে সে তার হৃদস্পন্দন শুনতে লাগলো যেন। দৃশ্যটি এতটাই আবেগের যে অদূরে দাঁড়ানো মীরা আড়ালে নিজের চোখে জমা অশ্রু মুছে নিলো।
মেয়ে শান্ত হয়ে আসতেই সাবিন একটি হাত বাড়িয়ে জায়দানের কপাল ছুঁয়ে দিলো। অতি যত্নে সে হাত বোলাতে লাগলো স্বামীর শরীরজুড়ে। আবেগ জড়ানো গলায় বলতে লাগলো,
“মাই লাভ? শুনতে পাচ্ছো তুমি আমায়? অনুভব করতে পারছো? বলো তো, তোমার বুকে কে শুয়ে আছে? হুম, ঠিক ধরেছ। আমি জানি, তুমি সব টের পাচ্ছো। আমাদের অংশ এই পৃথিবীতে চলে এসেছে। জানো? ও একদম তোমার মতন দেখতে হয়েছে। ঠিক তোমার মতন নাক, তোমার মতন ঠোঁট, তোমার মতন বাদামী চোখ। একদম তোমার ফটোকপি ভার্সন।”
হালকা হাসলো সাবিন। ধীরলয়ে উঠানামা করছে জায়দানের বুক। সঙ্গে জারিনও। নাজুক শরীরটা গুটিশুটি দিয়ে লেপ্টে আছে জন্মদাতার সঙ্গে। যেন একই সত্তার অংশ সে।
“ওর নাম কি রেখেছি জানো? জারিন। জায়দান আর সাবিনের জারিন। সুন্দর না? দেখো। তোমার বুকে কেমন চুপটি করে পরে আছে ও! তোমার বুকে অনেক শান্তি জায়দান। তোমার আমার সন্তান সেই শান্তিতে মজেছে। ও বুঝে গিয়েছে, কার অংশ ও। কত নিরাপদে আশ্রয় নিয়েছে ও তোমার মাঝে! একবার চোখ খুলে দেখো? একটাবার ওকে ছুঁয়ে দেখো কি ভয়ানক নাড়ির টান!”
কোনো প্রতিক্রিয়া হলোনা। একদম নিথর এক অস্তিত্ব। শুধু নিঃশ্বাস প্রশ্বাসের সঙ্গে বুক ওঠানামা করছে জায়দানের। সাবিন এবার আর সইতে পারলোনা। তার দুচোখ বেয়ে নীরব অশ্রু গড়িয়ে টপটপ করে ঝরতে লাগলো জায়দানের গালের উপর। তার একটি হাত ধরে নিজের ঠোঁটে ছুঁয়ে সাবিন কেঁদে ফেললো,
“আমাদের সন্তানও আমার কাছে চলে এলো, তুমি কবে আসবে প্রিয়তম? তোমায় ছাড়া আজ কতগুলো দিন পেরিয়ে গিয়েছে! আমি সব পেয়েছি শুধু তোমায় ছাড়া! তুমি ছাড়া যে আমার একটুও চলবে না। এসো না তুমি, প্লীজ? আমার কাছে ফিরে এসো? আমি তোমায় আশায় পথ চেয়ে আছি কত দিন! তুমি তো জানো, তুমি ছাড়া আমি কেউ না! আমার সবকিছুই তো তুমি। আমার আশ্রয়, আমার সংসার, আমার পৃথিবী, তোমার আমার জন্য একটুও মায়া হয়না? ওঠো না, একবার? ফিরে এসো না আমার বুকে!”
হঠাৎ করে মনিটরের বিপ বিপ শব্দটা জোরে হতে লাগলো। সকলে চমকে উঠলো। নার্স দ্রুত মনিটর পর্যবেক্ষণ করে বললো,
“পেশেন্টের হার্টবিট বেড়ে গিয়েছে।”
ছলছল চোখে মহা বিস্ময় নিয়ে সাবিন দেখলো সেদিন, কীভাবে জারিনকে বুকে নিয়ে দ্রুতভাবে ছন্দিত হচ্ছিল জায়দানের হৃদযন্ত্র।
***
বর্তমানে ফিরে আসতেই সাবিনের বুক চিরে এক দীর্ঘশ্বাস নির্গত হলো। জায়দান এরপরে বেশ কয়েকবারই প্রতিক্রিয়া করেছিল। কখনো তার আঙুল নড়তে দেখা যায়। সাবিন তাকে দুবার চোখ খুলতেও দেখেছে। কিন্তু চোখ খুললেও সেই চোখের মাঝের দৃষ্টি খুবই নিষ্প্রভ। কোনদিকে তাকায় না সে, কারোর উপস্থিতি টের পায়না। একনাগাড়ে নিষ্পলক চেয়ে থাকে সিলিংয়ের দিকে। চোখে কোনো ফোকাস থাকেনা। তারপর আবার আগের মতোই চোখ বুঁজে ফেলে সে। এটাই মিনিমাল কনশাস স্টেট। জায়দান সবার মাঝে থেকেও কোথাও নেই।
সাবিনকে দেখে নার্স একপাশের রকিং চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালো।
“আপনি যান, বিশ্রাম নিন রুমে কিছুক্ষণ। আমি আছি আজ রাতে।”
নার্স সাবিনের কথা শুনে মাথা হেলিয়ে চলে গেলো। ভেতরে ঢুকে জায়দানের বুকে শুয়ে থাকা জারিনকে সামান্য ঠেলে তুললো সাবিন।
“মামণি? ঘুমিয়ে গিয়েছ? এইযে দেখো, মাম্মাম খাবার নিয়ে এসেছে। খাবে না তুমি?”
জারিন সামান্য নড়েচড়ে উঠে অতঃপর চোখ পিটপিট করে তাকালো। মুচকি হেসে মেয়ের দিকে এক বাহু বাড়িয়ে দিতেই জারিন তরতর করে সাবিনের কোলে উঠে গেলো। তার মাথায় চুমু খেয়ে সাবিন ফিসফিস করলো,
“এইতো, আমার ভালো বাচ্চাটা। আসো, তোমার মুখ ধুইয়ে দেই।”
বাথরুমে গিয়ে জারিনের মুখ ধুতে ধুতে সাবিন শুধালো,
“আজ আমার পাখিটা এত্ত কান্না করেছে কেন? কেউ তোমাকে বকেছে?”
জারিন মাথা নাড়লো। তারপর খলখলে গলায় বললো,
“জা-ইন তবাইকে বকেচে! আপ্পা কেলবে জা-ইনের সাতে। আপ্পা জা-ইনকে কুব বালোবাতে, তাইনা মাম্মাম?”
সাবিনের কেমন অনুভূতি হলো সে বোঝাতে পারবেনা। জারিনের মুখটা মুছিয়ে নিয়ে ঘরের ভেতর ফিরে আসতে আসতে সে বললো,
“একদম। আপ্পা জারিনকে খুব ভালোবাসে। জারিন আপ্পার বেবি না?”
জারিনকে পুনরায় বিছানায় বসিয়ে দিলো সাবিন। তারপর খাবারের প্লেট নিয়ে মেয়ের পাশে বসলো।
“এইযে দেখো। আপ্পা কি সুন্দর করে এখানে ঘুমিয়ে আছে। তুমি আপ্পার কাছে এসে ঘুমাও, তাকে জড়িয়ে ধরে থাকো, সারাক্ষণ তার মুখে চুমু দিতে থাকো, আপ্পা কখনো তোমায় বকেছে?”
খাবার খেতে খেতে জোরে শোরে মাথা নাড়ল জারিন।
“এইতো। আপ্পা তোমাকে অনেক ভালোবাসে। দেখবে, একদিন আপ্পা ঘুম ভেঙে জেগে উঠেছে। সেদিন সারাক্ষণ তোমার সাথে খেলবে সে। তোমায় বুকে নিয়ে বসে থাকবে।”
জারিনকে এবার বেশ খুশি দেখালো। যেন মনে মনে ছক সাজাচ্ছে সে, তার পিতা জেগে উঠলে সে তার সঙ্গে কি কি করবে। একনজর জায়দানের বন্ধ চোখের পাতায় দৃষ্টি পড়লো সাবিনের। নতুন করে বিষাদ গ্রাস করলো তাকে। তবে মেয়ের সামনে সে বিষাদটুকু চাপা দিয়ে দিলো।
খাবার প্রায় শেষের দিকে জারিন হঠাৎ করে সাবিনের কাছে একটা অদ্ভূত প্রশ্ন করে বসলো।
“মাম্মাম। তুমি আপ্পাকে নিয়ে দাইলিতে কি লিকতো?”
জমে গেলো সাবিন। ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইলো মেয়ের দিকে।
“ডায়েরী?”
“হু। জা-ইন দেকেতে, তোমাল লুমে, তেবিলের উপল।”
প্রথমটায় সাবিন কোনো প্রতিক্রিয়া করতে পারলোনা। পরমুহুর্তে মৃদু হেসে শুধালো,
“আচ্ছা। আমার সোনাটা দেখে ফেলেছে? কি দেখেছ তুমি? পড়তে পেরেছ কি লিখা আছে তাতে? কিভাবে বুঝলে আমি তোমার আপ্পাকে নিয়ে লিখেছি?”
ঠোঁট ফোলালো জারিন।
“আমি দেকেতি। জা-য়-লা-ন…. অক্কর চিলো!”
সাবিন বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে পড়লো এবার।
“তুমি অক্ষর পড়তে জানো? আমি তো সব শেখাইনি এখনো!”
“তোমাল আল আপ্পালটা দানি!”
“কীভাবে?”
“কিবাবে? তেটা তো দানিনা!”
মাথা চুলকে দ্বিধায় পরে গেলো জারিন। সে কীভাবে নিজের পিতার নাম চিনতে পেরেছে, সেটা তার নিজের কাছেও রহস্য। সাবিন আর সইতে পারলোনা। সহসাই নিজের মেয়েকে কোলে তুলে বুকের মাঝে জাপটে ধরলো। অসংখ্য চুমু তার চেহারায় এঁকে দিতে দিতে বললো,
“মাই জিনিয়াস বেবি! জাস্ট লাইক ফাদার!”
“দিনিয়াত? জা-ইন দিনিয়াত?”
“হ্যাঁ। তোমার আপ্পার মতন। লিটল জিনিয়াস!”
খিলখিল করে হাসলো জারিন। সাবিনের গলা জড়িয়ে ধরে বললো,
“ওই দাইলিতা জা-ইন পলবে। পলে তোনাও না, মাম্মাম?”
সাবিন মেয়ের ছোট্ট শরীরটা আগলে রেখে ভরাট গলায় জানালো,
“ঠিক আছে। কিন্তু আমি তোমাকে পড়ে শোনাবো না। আমি ডায়েরিটা সম্পূর্ণ করে রাখবো। একদিন তুমি নিজে পড়বে নাহয়, পারবে না?”
উত্তেজিত হয়ে উঠলো জারিন।
“ইয়েত! জা-ইন পলবে! একদিন জা-ইন মাম্মামের দাইলি পলবে!”
কিছুক্ষণ বাদে জারিন জায়দানের গা ঘেঁষে শুয়ে পড়লো আবার। সাবিন তার পাশেই উঠে এলো। হাতে তার একটা স্টোরিবুক। প্রায় রাতে সে মেয়েকে গল্প পড়ে শোনায়। এভাবেই, নিজের স্বামীর শিয়রে বসে।
“আপ্পা আমাদেল তব কতা তুনতে পায়, তাইনা মাম্মাম?”
জারিনের প্রশ্নে সাবিন মোলায়েম হেসে মাথা দোলালো।
“হ্যাঁ সোনা। তোমার আপ্পা ঘুমিয়ে আছে ঠিকই, কিন্তু সে আমাদের সব কথা শুনতে পায়। তুমি সারাদিন তার সঙ্গে যত কথা বলো, সে সব শোনে।”
জারিন উল্টো হয়ে শুয়ে বুকে ভর দিয়ে জায়দানের দিকে তাকালো। ছোট্ট একটি হাত বাড়িয়ে পিতার গাল ছুঁয়ে দিতে দিতে বললো,
“আদল আপ্পা, জা-ইন তোমাকে আদল দিচ্চে। আপ্পা লাব ইউ, জা-ইন অলেক লাব ইউ। দানো, আপ্পা? মাম্মাম তোমাল দন্য গাল গাইবে। তুমি তুলবে। মাম্মাম অলেক বালো, কিন্ল্তু মাম্মাম মিশ ইউ! গাওলা, মাম্মাম?”
সাবিন মেয়ের আবদার ফেলতে পারলোনা। জায়দানের একপাশে শুয়ে সে ছোট্ট জারিনকে নিজেদের মাঝখানে শুইয়ে দিলো। রাত গভীর হলো। শুধুমাত্র ল্যাম্পের মৃদু আভা ঘরটাকে যেন ভাসিয়ে নিলো কোনো অনন্য সুন্দর কল্পনার রাজ্যে। জানালা গলে আসলো শীতল বাতাস। রাতের সেই হাজার তারা জ্বলা নীরবতার ভিড়ে সাবিন এক হাতে স্বামীর মাথায় এবং অন্য হাতে মেয়ের বুকে স্নেহ বোলাতে বোলাতে মায়াময়ী কন্ঠে গেয়ে উঠলো,
ওহে কি করিলে বলো, পাইবো তোমারে
রাখিবো আঁখিতে আঁখিতে
ওহে এত প্রেম আমি কোথা পাব নাথ
তোমারে হৃদয়ে রাখিতে
মাঝে মাঝে তব দেখা পাই
চিরদিন কেন পাই না?
***
পরদিন সকাল।
জারিনের ঘুম ভাঙলো সাবিনের ডাকে।
“বেবি? গুড মর্নিং, ওঠো। উঠবে না?”
চোখ কচলে জারিন তাকালো। জায়দান এবং তার উভয়ের শরীরেই কম্বল মুড়িয়ে দেয়া আছে। সাবিন ঝুঁকে প্রথমে নিজের মেয়ের কপালে, পরে জায়দানের কপালে চুমু এঁকে দিয়ে মিষ্টি হাসলো।
“গুড মর্নিং, মাই লাভ।”
পরবর্তীতে সে মেয়ের দিকে তাকালো,
”উঠে পড়ো। আজ কোনদিন মনে আছে? যাবেনা আমার সাথে?”
তড়াক করে উঠে বসে পড়ল জারিন। লাফিয়ে উঠলো হাততালি দিয়ে।
“দাবো দাবো! তাত্তুতে দেকতে দাবো!”
“হ্যাঁ সোনা। খেয়ে তৈরী হয়ে নাও। আমরা তোমার চাচ্চুকে দেখতে যাচ্ছি।”
_________চলবে_________
#সমাপ্তির_ওপাড়ে
#জাবিন_ফোরকান
#পর্বসংখ্যা৫৭ (শেষাংশ)
কেরানীগঞ্জ কারাগার।
সড়কের পাশে এসে থামলো সাবিনের রেঞ্জ রোভার। গাড়ির দরজা খুলে যেতেই ভেতর থেকে জারিনকে আস্তে করে নিচে নামিয়ে দিলো মীরা। সাবিন ড্রাইভিং সিট থেকে বেরিয়ে এলো। নিজের মেয়ের কাছে এসে ভেতরে বসা মীরার দিকে উঁকি দিলো। সময় ক্ষেপন না করে মীরা টিফিন বক্সের ব্যাগ সাবিনের হাতে ধরিয়ে দিলো। সেটা নিয়ে সাবিন প্রশ্ন করলো,
“তুই সত্যিই ভেতরে আসবি না?”
“না। একবার তো বলেছি। বারবার একই প্রশ্ন কেন করিস?”
“তুই প্রতিবার রান্না করে নিয়ে আসিস। গাড়ির ভেতর বসে থাকিস। ভেতরে যাস না। এটা কেমন আচরণ?”
উত্তর দিলোনা মীরা। সাবিন একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে মীরার কাঁধে একটি হাত রেখে বলল,
“আর কত মীরা? ওর কি তোকে দেখতে ইচ্ছা হয়না? আমি জানি। তুইও ভালো নেই। আর কতদিন নিজেকে এভাবে শাস্তি দিবি?”
মীরার ঠোঁটে মলিন এক হাসি ছুঁয়ে গেলো। মাথা ঝাঁকিয়ে সে উত্তর করলো,
“সাবিন, যা ভেতরে যা।”
এরপর আর বলার কিছু থাকেনা। সাবিনও কিছু বলতে পারলোনা। মীরার কাঁধ সামান্য ঝাঁকিয়ে দিয়ে গাড়ির দরজা আটকে সরে এলো। এক হাতে জারিনের হাত ধরে ধীরে ধীরে হেঁটে ভেতরে প্রবেশ করলো।
কম্পাউন্ডের ভেতরে আসতেই জেল সুপারকে চোখে পড়ল। এই বান্দা সাবিনের পরিচিত। তাকে দেখে বিস্তৃত হাসি মেখে ভদ্রলোক এগিয়ে এলেন। করমর্দনের জন্য হাত বাড়িয়ে দিলেন।
“মিসেস হুসেইন আরেফিন, এসে পড়েছেন দেখছি। ভালো আছেন?”
“জি। আপনাদের দোয়ায় দিনকাল ভালো যাচ্ছে।”
“সেই তো। আপনাকে নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় সপ্তাহে একবার চর্চা না হলে তো মনে হয় আপনার জীবনটাই বৃথা।”
সাবিন হালকা হাসলো। কথোপকথনের মাঝে মায়ের হাত থেকে ছাড়া পেয়েই জারিন গুটিগুটি পায়ে কম্পাউন্ডের ভেতরে ঢুকে করিডোর ধরে ছুটতে শুরু করলো। আশেপাশে থাকা পুলিশ সদস্যগণ ফিরে ফিরে দেখলো ছোট্ট একটি ফুটফুটে শিশুকন্যা নিজের ছোট্ট ছোট্ট পায়ে হেলতে দুলতে দৌঁড়ে যাচ্ছে কোনো এক নাড়ির টানে। সাবিন পিছন থেকে ডেকে উঠল তৎক্ষণাৎ,
“মামণি, দাঁড়াও! মাম্মাম আসছি!”
দ্রুত জেল সুপারের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে সাবিনও ছুট দিলো। জারিন ততক্ষণে স্থানমত পৌঁছে গিয়েছে। আগেও বেশ কয়েকবার আসায় এখানকার পথ তার পরিচিত। গুটিকতক কয়েদী রয়েছে, এদিক সেদিক বিভিন্ন কাজে লিপ্ত তারা। কেউ করিডোরে সাজানো টবে পানি দিচ্ছে। কয়েকজন আবার কম্পাউন্ডের ভেতরে করা বাগানে হওয়া আগাছা তুলছে। জারিন ছুটতে ছুটতে দুহাত নেড়ে চেনা মুখগুলোকে চিৎকার করে বললো,
“আততালামু আলাইকুম আংকেললা! জা-ইন তলে এতেতে, বালো আতেন?”
জারিনের মতন ছোট্ট শিশুর কাছ থেকে এমন আদুরে আবেদনে সবার মুখেই কোমলতা নেমে এলো। স্নেহ নিয়ে তাকালো প্রত্যেকে। জারিন ছুটতে ছুটতে নির্দিষ্ট কক্ষের সামনে এসে পড়তেই দুজন পুলিশের মুখোমুখি হলো। তাকে দেখেই একজন ভ্রু কুঁচকে শুধাল,
“এই বাচ্চাটা কে?”
প্রশ্নটি শোনার সঙ্গে সঙ্গে জারিন ঘুরে চেয়ে বলে উঠলো,
“জা-ইন আলেপিন। ডতার অব জায়লান আলেপিন!”
পুলিশ দুজন ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইলো। এমন মুহূর্তেই সাবিন এসে পড়ল। খপাৎ করে মেয়ের হাত ধরে ফেলে সে নরম গলায় শাসালো,
“বারণ করেছি না মাম্মামের হাত ছাড়িয়ে কোথাও যেতে? কথা শোনো না কেনো আমার?”
“তলি মাম্মাম, আমি তাত্তুর কাতে দাততিলাম।”
“হ্যাঁ। নিয়ে যাচ্ছি তো আমি। প্রমিস করো, এভাবে আর কক্ষনো ছুটবে না।”
“পমিশ!”
মেয়ের কপালে চুমু দিয়ে শেষমেষ সাবিন এগোলো। দায়িত্বরত পুলিশ কর্মকর্তা তার নাম, পরিচয়, তারিখ ইত্যাদি নোট করে রাখলো। সঙ্গে আনা খাবার এবং টুকিটাকি জিনিসপত্র ভালোমত পরীক্ষা করে ফেরত দেয়ার পরেই সাবিন ভেতরে প্রবেশের ছাড়পত্র পেলো।
কেরানীগঞ্জ জেলের সাক্ষাৎকার ঘরটা মাঝারি। দুটো ভাগ করা মাঝ বরাবর। দুইদিকেই বসার জন্য মুখোমুখি চেয়ার। মাঝে লোহার গ্রিল দিয়ে পৃথক করে রাখা। সাবিন গিয়ে চেয়ারে বসলো। মেয়েকে তুলে টেবিলের উপর বসিয়ে দিলো। মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই ওপাশ থেকে একজন পুলিশ নিয়ে এলো কাঙ্ক্ষিত মানুষটাকে।
গ্রিলের ওপাশে দেখা মিললো আয়দানের। পরিধানে শুভ্র ফতুয়া এবং পায়জামা। বুকের দিকটায় জেল কর্তৃপক্ষের লোগো। সাবিন গভীর দৃষ্টিতে দেখলো। কতগুলো বছর পেরিয়ে এই ছেলেটা ঠিক কতখানি বদলে গিয়েছে! সেই তেজ, সেই অহংকার, সেই দেমাগের ছিটেফোঁটাও নেই এই পুরুষটির মাঝে। নির্মল এক প্রশান্তি তার অবয়বজুড়ে। ঘন কালো ঝাঁকড়া চুলের পাশাপাশি দাড়ি গজিয়েছে চোয়ালে। জেলখানায় থাকলেও নিজেকে বেশ সুন্দর পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রেখেছে সে। আগের আয়দানের মাঝে তপ্ত এক সৌন্দর্য ছিল, এই আয়দানের মাঝে রয়েছে শান্ত পুরুষত্ব। সৌন্দর্যটাও প্রকাশিত হচ্ছে অন্যভাবে। বাদামী দৃষ্টিতে অদ্ভুতুড়ে এক জ্যোতি।
আয়দান গ্রিলের ওপাশের চেয়ারে এসে বসলো। পুলিশ সদস্য দাঁড়িয়ে রইলো দরজার কাছে। সাবিন কিছুই বলতে পারলোনা। এর আগেই জারিন লাফিয়ে উঠলো,
“তাত্তু!”
আয়দানের সমস্ত চেহারায় দারুণ এক ঔজ্জ্বল্য ফুটে উঠল। গ্রিলের ভেতর থেকে হাত গলিয়ে সে জারিনের ছোট্ট হাত দুখানা ধরে নিজের কপালে ঠেকালো।
“আসসালামু আলাইকুম, মা।”
“ওয়াতালাইকুম তালাম!”
মুচকি হাসলো আয়দান। জারিনের একটি হাত নিজের ঠোঁটে ছুঁয়ে শুধরে দিলো,
“ওয়া আলাইকুমুস সালাম।”
“ওয়া তাতালাইকুম তালাম!”
এবার আর শুধরে দিলোনা আয়দান। বরং জারিনের নরম গাল দুটো সামান্য চেপে দিয়ে বললো,
“আমার মা টা কেমন আছে?”
“কুব বালো। দানো তাত্তু? জা-ইন ইংলেজি লাইম তিকতে।”
“রাইম?”
“হু। তোমাকে তুনাই। তুইংকেল তুইংকেল লিতল স্টাল…”
জারিনের হাজার কথা অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে শুনতে লাগলো আয়দান। এর মাঝেই পকেট থেকে একটা বইয়ের ছিঁড়া কাগজ বের করে নিলো সে। সাবিন নিঃশব্দে দেখলো নিজের সন্তান এবং দেবরের মধ্যকার অবিচ্ছেদ্য বন্ধন। আয়দান জারিনের আধো আধো বুলিতে ছড়া শুনতে শুনতে কাগজ দিয়ে একটা তারা বানালো। সেটা জারিনকে উপহার দিতেই ভীষণ খুশি হয়ে রীতিমত লাফাতে লাফাতে সেই তারাটা নিয়ে ব্যাস্ত হয়ে পড়লো জারিন। বিরাট এক আবিষ্কার পেয়েছে সে।
অবশেষে সাবিনের দিকে ফিরল আয়দান।
“ভাইয়া কেমন আছে?”
একটি নিঃশ্বাস ফেলে সাবিন সোজা হয়ে বসলো।
“আগের মতোই। না উন্নতি, না অবনতি।”
প্রায় চারটা বছর পেরিয়ে গেলেও আয়দানের সঙ্গে পুরোপুরি সহজ হয়ে উঠতে পারেনি সাবিন। কেন, সেটা নিজেও জানেনা। তাদের অতীত সম্পর্কটা এমনি ঝাঁঝালো ছিলো যে একে অপরের সঙ্গে স্বাভাবিক কথা বলতে দুজনেরই যেন বাঁধে। আয়দানও কেমন যেন কথা হারিয়ে ফেলে। সাবিন নিয়মিত দেখা করতে এলেও তাদের মাঝে জায়দানকে ছাড়া অন্য কিছু নিয়ে বিশেষ কথাবার্তা হয়না।
“তুই ভালো আছিস?”
সাবিন প্রশ্ন করলো। আয়দান মাথা দোলালো,
“সৃষ্টিকর্তা আমাকে যতটা ভালো রাখা সম্ভব ততটাই রেখেছেন। লাইব্রেরিতে কাজ পেয়েছি এবার, সময়টা একদম দারুণ কাটছে।”
ভ্রু কুঁচকে ফেললো সাবিন।
“তোর সঙ্গে যতবারই কথা বলি না কেনো, কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারিনা আমার মুখোমুখি বসে থাকা মানুষটা আসলেই তুই।”
মিষ্টি করে হাসলো আয়দান। সে সাবিনের দিকে চেয়ে নেই। তার গোটা মনোযোগ নিজের ভাতিজির দিকে, যে এখন তার বানিয়ে দেয়া কাগজের তারাটা নিয়ে উৎসাহে মেতে আছে।
“বিশ্বাস করবি কিভাবে? তুই তো একটা মাথামোটা।”
আয়দানের এমন মন্তব্যে কেঁপে উঠলো সাবিন। ঠোঁট ফুলিয়ে পুরাতন ক্রোধ নিয়ে বললো,
“আর তুই তো খুব বোঝদার তাইনা? ওরে আমার বুঝের পাহাড় পর্বত রে!”
“এই খবরদার, খোটা দিবিনা। ক্যারেকটার বদলালেও আমি সেই আয়দানই। বলেছিলাম না, দুনিয়ায় সবকিছু উলোট পালট হয়ে গেলেও তোর সঙ্গে আমি কখনো আপোষ করব না!”
“আমার মেয়েকে ধরছিস কেন তাহলে?”
“ইশ! বললেই হলো? ও আমার মা! তোর একার নাকি? ভাইয়ারও ভাগ আছে। ভাইয়ার ভাগ মানে আমার ভাগ।”
“তোকে দেখলেই মনটা চায় গলা টিপে উপরে পাঠিয়ে দেই।”
“দিতে পারিস। সেক্ষেত্রে আল্লাহ তোর কাছেই হিসাব চাইবে। জাহান্নামে যাওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি।”
“তোকে জেলের মানুষগুলো কিভাবে সহ্য করে? আমি হলে প্রথম দিনই তোকে টয়লেটে বেঁধে রেখে চাবি কমোডে ফ্লাশ করে দিতাম।”
“তোকে দিয়েই সেই চাবি কমোড থেকে আমি তুলিয়ে নিতাম।”
“বস্তাপঁচা জ্ঞানের ভান্ডার কোথাকার!”
“বদমেজাজি বদনা কোথাকার!”
“পোকায় খাওয়া বইয়ের পৃষ্ঠা কোথাকার!”
“নষ্ট ব্লেন্ডার মেশিন কোথাকার!”
আয়দান ভেবেছিল প্রতিবারের মতো সাবিন তর্ক বিতর্ক জারি রাখবে। অথচ পুরাতন নামটায় সম্বোধন করার পরপরই একদম হঠাৎ করে সাবিন চুপ করে গেলো। গ্রিলের ওপাশে টেবিলের উপর রমণীর দুহাত শক্তভাবে মুঠো পাকিয়ে গেলো। ঝুঁকে এলো সে। রীতিমত ফিসফিস করে কাঁপা কাঁপা গলায় বললো,
“আর কতদিন অন্যের অপরাধের ঘানি নিজের কাঁধে চেপে টানবি? আর কত দিন? আর কত মাস? আর কত বছর?”
ক্ষণিকের জন্য জমে গেলো আয়দান। উদ্ভ্রান্ত দৃষ্টিতে দ্রুত আশেপাশে তাকালো। পুলিশ সদস্যরা খানিকটা দূরে দাঁড়িয়ে আছে। ফিসফিস করে বলায় তারা তেমন শুনতে পায়নি, বিশেষ মনোযোগ নেই। ব্যাপারটা নিশ্চিত হয়ে একটি হাত গলিয়ে সাবিনের মুখের একপাশ ছুঁয়ে দিয়ে জোর করে তাকে নিজের দিকে ঘোরালো আয়দান। বরাবর সাবিনের চোখের দিকে তাকালো সে, তীক্ষ্ণ বাদামী নয়নে চেয়ে গুরুগম্ভীর গলায় বললো,
“আমি আমার কর্মফল ভোগ করছি।”
সাবিন জোরে জোরে মাথা নাড়তে চাইলেও আয়দান জোর করে তাকে ধরে রাখলো। দৃঢ়কণ্ঠে উচ্চারণ করলো,
“একদম চোখ সরাবি না। আমার দিকে তাকা। ওদেরকে আমি খু*ন করেছি, সাবিন। বল, কে খু*ন করেছে ওদের?”
ঠোঁটে ঠোঁট চেপে ফেললো সাবিন। দুহাতে শক্তভাবে আঁকড়ে ধরলো মাঝখানের গ্রিল। তাকে ছাড়লোনা আয়দান। ব্যথাদায়ক পর্যায়ে পৌঁছালো তার হাতের আঙুলের বাঁধন, সাবিনের চোয়ালজুড়ে গেঁথে আছে তা। ঝাঁঝালো কর্কশ কণ্ঠে আয়দান আবারো শুধালো,
“বল সাবিন। কে খু*ন করেছে ওদের?”
“আ…”
“সাবিন! কে খু*ন করেছে আহান আর ওর বাপকে?”
“তুই।”
অবশেষে একটি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে জবাব দিলো সাবিন। উঁহু, জবাব দিতে বাধ্য হলো। আয়দানের ঠোঁটে হাসি ফুটলো এবার। হাতের বাঁধন ঢিলে হয়ে এলো,
“গুড গার্ল।”
একজন পুলিশ এগিয়ে আসতেই আয়দান দ্রুত সাবিনকে ছেড়ে দিলো। সাবিন নিজেও মুখে হাত বুলিয়ে অভিব্যক্তি লুকিয়ে ফেললো মুহূর্তেই।
“আর দুই মিনিট সময় আছে।”
পুলিশ সদস্য জানাতেই মাথা নেড়ে উঠে দাঁড়ালো সাবিন। সঙ্গে নিয়ে আসা টিফিন বক্সের ব্যাগটা গ্রিলের ফাঁকা জায়গা দিয়ে ভেতরে ঠেলে দিয়ে বললো,
“তোর জন্য খাবার। আজকের মধ্যেই খেয়ে নিস। কালকে নষ্ট হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে।”
প্রতিবারের মতোই মোলায়েম হেসে বক্সটা গ্রহণ করে নিলো আয়দান। অতঃপর জ্বলজ্বলে দৃষ্টিতে তাকালো সাবিনের দিকে।
“ও গাড়িতে বসে আছে, তাইনা?”
একটি ঢোক গিলে দৃষ্টি লুকিয়ে ফেললো সাবিন। কোনো উত্তর করতে পারলোনা। আয়দানও এর বেশি কিছু বললোনা। জারিনকে আদর করে দিলো। বিদায়ের ঘণ্টা বেজেছে বুঝতে পেরে ততক্ষণে গ্রিল আঁকড়ে ধরেছে জারিন।
“তাত্তু! তাত্তু দাবো না!”
“মা। এইতো, আর কিছুদিন। খুব তাড়াতাড়ি আবার আমার তোমার সাথে দেখা হবে। আমি তোমার জন্য আরও অনেকগুলো স্টার বানিয়ে রাখবো, ঠিক আছে?”
ঠোঁট ফুলিয়ে অভিমানী গলায় জারিন শেষমেষ সম্মতি জানালো,
“আততা। জা-ইনও তাত্তুর দন্য কিতু নিয়ে আতবে।”
“কি আনবে আমার মা?”
“তালপ্লাইদ!”
“ওলে বাবা লে, সারপ্রাইজ? ঠিক আছে। চাচ্চু দিন গোণা শুরু করলো, তোমার সারপ্রাইজের অপেক্ষায়।”
সাবিন মেয়েকে কোলে তুলে নিলো। সময় শেষ হয়ে গিয়েছে। পুলিশ সদস্য এলো আয়দানকে নিয়ে যেতে। মেয়ের হাত তুলে ধরে সাবিন বললো,
“চাচ্চুকে টাটা দাও?”
“তাতা তাত্তু! আলা বিউ! উম্মাহ!”
একটা ফ্লাইং কিস ছুঁড়ে দিলো জারিন। পুলিশের সঙ্গে হেঁটে যেতে যেতে এক হাতে ক্যাচ ধরার ভঙ্গি করে সেটা পাকড়াও করেছে এমন ভাব দেখিয়ে নিজের বুকে চেপে ধরলো আয়দান। বিস্তৃত হাসলো। সাবিন মেয়েকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে দেখে গেলো দৃশ্যটি ঘোলাটে দৃষ্টিতে, যতক্ষণ না আয়দানের অবয়ব তার চোখের আড়ালে চলে যায়।
***
মীরা গাড়ির ভেতর বসে থাকতে থাকতে শেষমেষ বাইরে এসে দাঁড়ালো। হেলান দিয়ে দূরের আকাশের মাঝে দৃষ্টি ফেলে নিজের কল্পনার জগতে বিচরণ করছে সে। কেন যায়নি সে আয়দানের কাছে? আর কত বছর খেলবে সে এই লুকোচুরি খেলা? তার কি অভিমান হয়েছে? ওই মানুষটা এত সহজে সবকিছু ছেড়ে দিলো? একবারও তার কথা ভাবলো না? এই বিরাট পৃথিবীতে এভাবে একা ছেড়ে দিতে পারলো সে মীরাকে? মানুষটা তো বরাবর এমনই করে এসেছে। সে কি আদৌ কারো পরোয়া করে?
মীরা নিজের অন্তরকে বুঝ দিতে চাইলেও সে খুব ভালোমত জানে, তার কারাগারের ভেতরে না যেতে চাওয়ার কারণ সম্পূর্ণ ভিন্ন। মানুষটাকে সে লোহার গরাদের ওপাশে দেখতে পারবেনা। তার শরীরে জড়ানো কয়েদীদের পোশাক দেখার আগে মীরা নাহয় নিজের দূরত্বকেও শ্রেয় মনে করবে।
মীরা কতক্ষণ নিজের ভাবনায় ডুবে ছিলো জানেনা। হঠাৎ করে তার পাশে এসে এখন দাঁড়ানোয় তার চিন্তায় ছেদ পড়ল। ঘুরে তাকিয়ে সে দেখলো মিসিরকে।
“আজ এতটা জ্যাম ছিলো যে মাঝপথে আটকে গেলাম। সাবিন নিশ্চয়ই ভেতরে চলে গিয়েছে?”
“হুম।”
“আজ তাহলে আর আমার দেখা হলোনা।”
মিসির একটি নিঃশ্বাস ফেললো। তারপর আবার মীরার দিকে ঘুরে তাকালো।
“সোশ্যাল মিডিয়ার খবর রেখেছ?”
মীরা সায় জানালো।
“জি। রাখা হচ্ছে। আরিয়ান হান্নানের মানহানির মামলার কথা বলছেন নিশ্চয়ই?”
“হ্যাঁ। আরও একবার সাবিন হুসেইন আলোচনা সমালোচনার শীর্ষস্থান দখল করে ফেললো।”
“যাদের যা ইচ্ছা করতে দিন। অন্যায়ের সঙ্গে আপোষ চলবে না। মানুষের কাজই হলো বিচার করা।”
“সাবিন পরিস্থিতি আরেকটু বোঝদার হয়ে সামাল দিতে পারতো। অন্তত আমাকে ইন্টারফেয়ার করতে দিলে হতো।”
মীরা এবার ভ্রু কুঁচকে তাকালো মিসিরের দিকে।
“আপনি কি বলতে চাচ্ছেন? সাবিন ভুল?”
“ভুল বলছি না। তবে ও এখন একজন সি ই ও। এই ব্যাপারটা একটু মাথায় রাখা দরকার। আবু কাশিম বলছিল, হুসেইন গ্রুপের লস হয়ে যাচ্ছে বিরাট।”
“স্বামীর মর্যাদার সামনে নিশ্চয়ই লস কোনো বড় বিষয় নয়, তাইনা?”
মিসির এবার চুপ করে গেলো। আর কিছুই বলতে পারলোনা। মীরা পুনরায় দিগন্তের দিকে তাকালো। দীর্ঘ একটা সময় নিশ্চুপ থেকে তারপর বললো,
“আমাদের সমাজে একটি বিশেষ প্রোপাগান্ডা প্রচলিত আছে, জানেন?”
“কেমন প্রোপাগান্ডা?”
মীরার দিকে অবাক হয়ে তাকালো মিসির। জ্বলজ্বলে সূর্যের আভা প্রতিফলিত হয়ে চলেছে রমণীর স্বচ্ছ হরিণী চোখে।
“এটাই যে ছেলেদের মতন করে মেয়েরা কখনো ভালোবাসতে পারেনা। একটি ছেলে ভালোবাসা বুকে আগলে রেখে বছর বছর পার করে দিতে পারে, কিন্তু একটা মেয়ে সেটা পারেনা।”
মিসির ভ্রু তুলে ব্যক্ত করলো,
“ক্ষেত্রবিশেষে বিষয়টি আংশিক সত্যি। ছেলেরা সাধারণত স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং স্বাধীন থাকে, নিজের জীবনের সিদ্ধান্তগুলো নিজে নিতে সক্ষম। মেয়েদের বেলায় অনেকটাই নির্ভর করে তার আশেপাশের পরিবেশ এবং পরিবারের উপর।”
“ঠিক বলেছেন। সেসব ভেবে যখন একটা মেয়ে জীবনে মানিয়ে নিতে চায়, তখন মেয়েটা জগতের কাছে হয়ে যায় বেঈমান। অপরদিকে ছেলেটি হয়ে দাঁড়ায় মহৎ প্রেমিক।”
মীরার ঠোঁটে কোমল এক হাসি ফুটলো। সে বলে গেলো,
“অথচ সবকিছুরই ব্যতিক্রম আছে।”
“ব্যতিক্রম?”
“সাবিন। সমাজের চোখে বেয়াদব, উশৃঙ্খল এবং দেমাগী মেয়েটি। অথচ দেখুন না, এক ভালোবাসার দহনে সে আজও ধিকিধিকি করে জ্বলছে।”
মিসিরের চেহারা কোমল হয়ে উঠলো।
“রাইট। শি ইজ….শি ক্যান নট বি ডিফাইন্ড।”
“অমতে বিয়ে হলো। জাহান্নাম তুল্য সংসারে জীবন ধ্বংস হলো। ডিভোর্স হলো, দূরত্ব এলো। অথচ সাবিন জায়দান নামক মানুষটিকে ছাড়তে পারলোনা। সমাপ্তির ওপাড়ে গিয়েও সে ওই একই মানুষের মায়ায় আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে রইলো। সুখ এলো, বারবার সেই সুখ ছলনা দেখিয়ে ধ্বসে পড়লো। অথচ সে মানুষটার হাত ছাড়লোনা। দিন পেরোলো, মাস পেরোলো, বছর পেরোলো। মানুষটা শয্যাশায়ী হলো। অথচ আজও মেয়েটা তার বিছানার পাশে একটুখানি আশ্রয় খুঁজে বেঁচে আছে। এমন আত্মোৎসর্গকে কি নামে সংজ্ঞায়িত করা যায়?”
মিসির দীর্ঘক্ষণ নীরব থাকলো। অতঃপর মুখ ফুটে বললো,
“হৃদয়ের বন্ধন। সমাপ্তি শুধু একটা নামমাত্র, এর ওপাড়ে বসবাস মুক্ত জীবন প্রান্তরের।”
একটু থেমে সে পুনরায় উচ্চারণ করলো,
“একজন পুরুষের ভালোবাসা আত্মনিবেদন, আর একজন নারীর ভালোবাসা—আত্মত্যাগ।”
_________চলবে_________
#সমাপ্তির_ওপাড়ে
#জাবিন_ফোরকান
#পর্বসংখ্যা৫৮
⭕টক্সিক বিহেভিয়ার অ্যালার্ট‼️
সাবিন অত্যন্ত সাবধানে রেজর দিয়ে জায়দানের মুখ শেভ করে দিচ্ছে। কিছুক্ষণ আগেই নার্সের সহায়তায় তার শরীর মুছে নতুন পোশাক পরিয়ে দিয়েছে সাবিন। নিয়ম করে একদিন বাদে বাদেই কাজটা করে সে। এছাড়া সপ্তাহে দুবার স্পেশালিস্ট আসেন, ফিজিওথেরাপি দিতে। নার্স দুজন ২৪ ঘণ্টা পালা করে জায়দানের সঙ্গে থাকে। হাত পায়ের জয়েন্ট যেন বসে না যায় এজন্য নিয়মিত তার শরীর ম্যাসাজ করতে হয়। সঙ্গে নিয়মমাফিক ডাক্তারের চেকআপ তো আছেই। কখনো এই ট্রিটমেন্ট, কখনো সেই ট্রিটমেন্ট। সব মিলিয়ে বছরের পর বছর ধরে একই রুটিনে সাবিনের হাঁপিয়ে ওঠার কথা। কিন্তু জায়দানের কেয়ারটেকার হিসাবে থাকা নার্স দুজন কোনোদিন তার মুখে সামান্য বিরক্তির ভাঁজ অবধি দেখেনি। অন্য অনেক ঘরেই পেশেন্টের জন্য কাজ করা হয়েছে তাদের। একটা না একটা সময় গিয়ে ক্ষণিকের জন্য হলেও পরিবারের লোকদের ভ্রুকুটি মেলে রোগীদের। কারণ, তারা তখন পরিবারের উপর বোঝা। এই প্রথম তারা একদম বিনা বিরক্তিতে কাউকে এভাবে পরিজনের সেবা করে যেতে দেখছে বছর বছর যাবৎ। বাবা, মা হলে একটা কথা। তারা সন্তানকে কোনো অবস্থাতেই নাকি ফেলতে পারেনা। কিন্তু সাবিন জায়দানের স্ত্রী। সেই হিসাবে নিজের স্বামীর সম্পূর্ণ দায়িত্ব এভাবে কাঁধে তুলে নিয়ে সে কিভাবে নিঃসংকোচে, বিনা ক্লান্তিতে সবকিছু করে যায় সেটা নার্সদের কাছেও এক প্রকার বিস্ময়।
শেভ করা শেষ হয়ে গেলে সাবিন আস্তে করে জায়দানের পাশে বসে ভেজা কাপড় দিয়ে মুখ মুছিয়ে দিতে লাগলো। তার সেবা করার সময় সে হাজার রকম কথা বলতেই থাকে। যেন জায়দান অচেতন কেউ নয়, সবকিছুই শুনতে পায়। আজও সাবিন সারাদিনের গল্প জমিয়ে বসেছে।
“জানো, কি হয়েছে? ঐযে হান্নানের বাচ্চাটা আছে না? একেবারে মারা খেয়ে বসে আছে!”
মুচকি মুচকি হাসলো সাবিন। এবার শুকনো কাপড় দিয়ে জায়দানের ফ্যাকাশে মুখটা মুছতে মুছতে জানালো,
“আমার বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করতে গিয়েছিল। ও জানেনা, কোর্ট কাচারি আমার নিত্যদিনের বিচরণশালা। একেবারে সাক্ষী, সিসিটিভি ফুটেজ সমেত ধরিয়ে দিয়েছি। মামলা দেবে? দিক দেখি। ওকে আমি ভাতে মারবো, পানিতে মারবো। ও ভেবেছে কি? সাবিন হুসেইনের সঙ্গে পাঙ্গা নিয়ে আরামসে ব্যবসা চালিয়ে যেতে পারবে?”
রুমে থাকা নার্স এমন সময় রুম থেকে চলে গেলো। বাকি সময়টা সাবিন নিজেই নিজের স্বামীকে সামলাতে পারবে। জায়দানের ফতুয়ার বোতাম লাগিয়ে দিয়ে সাবিন যুক্ত করলো,
“এদিক দিয়ে লাভটা আমারই হয়েছে। কয়েক মাস যাবৎ কোনো নিউজে ছিলাম না। এখন আবার নিউজে চলে এসেছি। সেল বাড়ছে তরতর করে। এইতো, আগামী মাসে খুলনায় স্যাভেজ সাবিন—পিৎজা স্টেশনের আউটলেট খুলবো। এই নিয়ে একটা ছোট্ট ক্যাফে থেকে মোট ছয়টা আউটলেট হলো আমার।”
কথা বলতে বলতে হঠাৎ থমকে পড়লো সাবিন। গভীর দৃষ্টিতে তাকালো জায়দানের বদ্ধ চোখের পাতায়। কোনো নড়চড় নেই। শুধু স্থিরভাবে বুক ওঠানামা করছে।
“তুমি কবে চোখ খুলবে প্রিয়তম? কবে ফিরে আসবে? কবে প্রাণভরে দেখবে তোমার ওয়াইফের গড়া সাম্রাজ্যটুকু? এভাবে দূরে পরে আছো, তোমার কি একটুও কষ্ট হয়না? মনে পড়েনা আমায়? তুমি জানো? তোমার রাজকন্যা তোমার অপেক্ষায় পথচেয়ে বসে আছে। প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে জেগে সে ছুটে এসে প্রথমে দেখে, তোমার ঘুম ভেঙেছে কিনা। আমাদের রাজকন্যা কি এভাবেই প্রতিদিন আশাহত হতে থাকবে? তুমি কি ফিরে আসবে না? ওকে কোলে নিয়ে চুমু খাবে না?”
ঝুঁকে এলো সাবিন। চোখ বুঁজে স্বামীর ঠান্ডা কপালে নিজের কপাল ঠেকালো। জায়দানের শরীরজুড়ে ঔষধ এবং সোপ পারফিউমের মিশ্র সুঘ্রাণ। প্রাণভরে সেই সুবাসটুকু গ্রহণ করলো সে। ফিসফিস করে বলল,
“তুমি বলেছিলে নতুনভাবে জীবনটা সাজিয়ে নিতে। একা না থাকতে। একা জীবন চলা নাকি কঠিন। তোমাকে ছাড়া আমি প্রায় চারটা বছর পার করে দিলাম। কিভাবে নতুন কাউকে বরণ করতাম আমি?”
চোখ মেলে তাকালো সাবিন। তার নয়নজুড়ে টলটলে অশ্রু দানা বাঁধলো। জায়দানের স্থির ঠোঁটে নিজের ঠোঁট মিশিয়ে দীর্ঘ এক আদরের চুমু এঁকে সাবিন বললো,
“তুমি নামক সমুদ্রের বুকে আমি এক নোঙর ফেলা মাঝি। অচেনা তরীকে কীভাবে কাছে ভিড়তে দিই?”
জায়দানের গালে গাল মিশিয়ে বালিশে মাথা রেখে চুপটি করে পরে থাকলো সাবিন। কতক্ষণ বলতে পারবেনা।
“মাম্মাম?”
ডাকটা কানে আসতেই সম্বিৎ ফিরে পেলো সাবিন। মুখ তুলে তাকিয়ে দেখলো নিজের পুতুল টুকটুকিকে নিয়ে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছে জারিন। নিদ্রা জড়ানো চোখ। ঘুম থেকে উঠে এসেছে স্পষ্ট।
“আপ্পা আল তোমাল সাতে গুমাই?”
মেয়ের আবদারে হাত বাড়িয়ে তাকে আমন্ত্রণ জানালো সাবিন। জারিন ছুটে এসে বিছানায় উঠলো। তাকে সন্তপর্নে জায়দানের পাশে শুইয়ে দিলো সাবিন। সঙ্গে সঙ্গে পাশ ফিরে পিতার দুই গালে দুটো চুমু খেয়ে জারিন বলে উঠলো,
“আপ্পা আমি গুমাই, তুমিও গুমাও। গুত নাইত, আপ্পা।”
একপাশে শুয়ে মেয়ে এবং স্বামী উভয়ের শরীরে স্নেহের হাত বোলাতে বোলাতে সাবিন একটা ঘুম পাড়ানি গান ধরলো। জারিনের ঘুমাতে সময় লাগলোনা। অথচ সাবিন আজ দুই চোখের পাতা এক করতে পারলোনা। তার একটা অসমাপ্ত কাজ বাকি আছে।
ঘণ্টাখানেক বাদে বিছানা ছেড়ে সাবিন উঠে পড়লো। প্রাণভরে খানিক দেখলো, কি সুন্দর করে জায়দানের গা ঘেঁষে গুটিশুটি দিয়ে ঘুমিয়েছে জারিন। সাবিন জায়দানের একটি হাত তুলে সাবধানে ছোট্ট মেয়ের শরীরে জড়িয়ে দিলো। জগতের সবথেকে নিরাপদ আশ্রয়ে আছে জারিন। পিতা এবং সন্তান একে অপরের মোহনীয় আলিঙ্গনে।
কিছুক্ষণের জন্য বাইরে গেলো সাবিন। পুনরায় ফিরে এলো একটি বড় স্টেইনলেস স্টিলের বোতল ভর্তি জুস এবং ডায়েরী হাতে। নিঃশব্দে হেঁটে বিছানার একপাশের টেবিলে চেয়ার টেনে বসলো সে। টেবিলল্যাম্প জ্বালিয়ে দিলো। পিছনে ঘুমের জগতে বিচরণ করছে বিশাল পৃথিবীর বুকে তার এক টুকরো ছোট্ট পরিবার।
ডায়েরী খুললো সাবিন। অন্তিম কিছু পাতা সম্পূর্ণ করা বাকি আছে তার। আজ সেই বিশেষ দিন। যেদিন সব হিসাবের খাতা খোলা হবে। দীর্ঘ এক চুমুক জুস পান করে বুঝি শক্তি সঞ্চয় করলো সে, তার জীবনের সবথেকে যন্ত্রণাদায়ক দিনগুলোর সম্পর্কে লিখতে। অবশেষে কলম তুলে নিলো সে। মাঝরাতে যখন গোটা শহর এক ঘুমন্তপুরী, তখন সাবিনের ডায়েরীতে একটু একটু করে রচিত হতে লাগলো এক বিরহের আখ্যান।
***
আমার সামনে পৃথিবীর আর কোনো অস্তিত্ব নেই। যেন জীবন্ত কবর দিয়ে দিয়েছে কেউ আমায়। জায়দানের নিথর বুকের মাঝে মাথা গুঁজে পরে আছি। প্রাণপণে শুধু একটিই প্রার্থনা করে যাচ্ছি। খোদা যেন সহায় হয়। আমার স্বামীর সাথে সাথে আমার প্রাণপাখিটাও যেন নিজের কাছে নিয়ে যায়।
পিছনে গাড়ির দরজা খোলার শব্দ হলো। এরপরেই ভারী পদধ্বনি এবং হাসির মিশ্র আওয়াজ কানে গেলো আমার। অথচ একচুল নড়তে পারলাম না। জায়দানের বুক থেকে সরতেই পারছিনা আমি। নীরবে ফুঁপিয়ে চলেছি। হঠাৎ করেই নিজের মাথার পিছন দিকটায় তীক্ষ্ণ ব্যথা অনুভব করলাম। কেউ আমার চুলের গোছা খামচে ধরে একটা হ্যাঁচকা টানে আমাকে জায়দানের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে নিলো। ঝাপসা দৃষ্টিতে স্বামীর রক্তাক্ত শরীরটাকে শুধু দেখেই গেলাম। আমার হাত পা সম্পূর্ণ অসাড়। বিন্দুমাত্র প্রতিহত করার শক্তিটুকুও নেই। আমাকে নিয়ে থামিয়ে রাখা গাড়ির টায়ারের কাছে আছড়ে ফেলা হলো। ওঠার চেষ্টাটুকু অবধি করলাম না। ভারী নিঃশ্বাস প্রশ্বাস ফেলতে ফেলতে সড়কের ধারের আধো আলো ছায়ায় দেখলাম চিরায়ত সেই মুখটা।
দন্ডায়মান আহান হুসেইন।
চেহারায় অনেকখানি বদল এসেছে। আগের চাইতেও অধিকতর হিংস্র অভিব্যক্তি চোখেমুখে। কেমন যেন রক্তপিপাসু এক দৃষ্টি। ঠোঁটে ঝুলছে অশুভ এক তীর্যক হাসি। সে একা নয়। গাড়ির বনেটে হেলান দিয়ে দাঁড়ানো তাকবীর হুসেইন, আমার চাচা স্বয়ং।
দু দুটো দানবের সামনে সম্পূর্ণ অসহায় হয়ে পড়লেও বিন্দুমাত্র অনুভূতি হলোনা ভেতরটায়। শুধু নিষ্পলক তাকিয়ে রইলাম। যেন এক পুতুলমাত্র। যার কোনকিছুতেই আর কিছু যায় আসেনা।
হাতে আয়েশী ভঙ্গিতে একটা সিগারেট ফুঁকতে ফুঁকতে তাকবীর চাচা বিরস দৃষ্টিতে সড়কে পড়ে থাকা জায়দানকে দেখলেন। তারপর গুরুগম্ভীর এক মন্তব্য ছুঁড়লেন,
“সদ্য ডানা গজানো পাখি বেশি উড়তে চাইলে পরিণতি এমনটাই হয়।”
টায়ারের কাছে থাকা আমার দিকে দৃষ্টি ঘুরিয়ে নিজের একটি পা বাড়িয়ে আমার হাতের আঙুলগুলো সড়কের শক্ত পিচের মাঝে চেপে ধরলেন তিনি নিজের বুটজুতো দিয়ে। সমস্ত শরীর ব্যথায় কুঁকড়ে উঠলো আমার।
“এবার কোথায় তোর অহংকার, কোথায় দেমাগ? হুমকি দিবি না? প্রেস কনফারেন্স ডাকবি না? ডাক না। ডেকে বল কিভাবে মশার মতন এক চুটকিতে পিষে শেষ করে দিয়েছি তোদের।”
অসামান্য যন্ত্রণায় থরথর করে শরীর কাঁপতে লাগলেও একটা টু শব্দ বেরোলো না আমার মুখ থেকে। আমার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে আমার ঘাড় খামচে ধরলেন তাকবীর চাচা। তার হাতের নখ গেঁথে গেলো আমার ত্বকে। সিগারেটের তামাটে ধোঁয়া আমার মুখ বরাবর ছুঁড়ে দিয়ে কর্কশ হাসলেন তিনি।
“তোর উপর দয়া করেছিলাম। হাজার হোক, রক্ত তো। কিন্তু তোর জাতটাই বেশ্যার জাত। তোর বাপ, তোর মা, তোর জন্ম সবটাই বেজাত।”
হিসিয়ে উঠলেন তিনি। বছর বছরের জমা ক্ষোভ উপচে দিলেন আমার মাঝে।
“তোর বাপ একটা আস্ত কুলাঙ্গার। একটু পয়সার স্বাদ পেয়েছে কি পায়নি, অমনি ধরাকে সরা জ্ঞান করা শুরু করে দিয়েছিল। ওর বড় ভাই ছিলাম আমি! আমার হক ছিল সবকিছুর উপর! অথচ তাকদীর আমার কাছ থেকে সব কেড়ে নিলো। সব! আমার নাম, আমার পরিচয়, আমার মর্যাদা, আমার পরিবার এমনকি আমার পছন্দের নারীটাকেও। কেনো? কেনো সবকিছু শুধু ওর হবে? আমার কেন হবেনা? আমি কম শ্রম দিয়েছি? রাতের ঘুম হারাম করে, মাথার ঘাম পায়ে ফেলে তাকদীরের পাশে থাকিনি? ওকে সফলতার শিখরে নিয়ে তুলিনি? তাহলে দিনশেষে কেনো ও বস হলো আর আমি চাকর?”
“বস হতে মেরুদন্ড আর যোগ্যতা লাগে। যেটা আপনার নেই, তাকবীর হুসেইন!”
আমি খেঁকিয়ে উঠতেই আমার মাথাটা ধরে গাড়ির বনেটের সঙ্গে বাড়ি দিলেন তাকবীর চাচা। সঙ্গে সঙ্গে মুখের ভেতর র*ক্তের নোনতা স্বাদ পেলাম।
“হুসেইন সাম্রাজ্য শুধু আমার! এই সাম্রাজ্যের প্রত্যেকটা ইট আমার নিদারুণ শ্রমে গড়া! হুসেইনদের দৌলত, মর্যাদা, সম্মান সবকিছুর হক শুধুমাত্র এবং একমাত্র তাকবীর হুসেইনের। শুনে রাখ বেশ্যার মেয়ে, ওই পতিতার কুঠিই তোর শেষ ঠিকানা! ঠিক যেমন করে তোর কুলাঙ্গার বাপের কাছ থেকে তার জীবন আর সম্পদ কেড়ে নিয়েছি, ঠিক তেমন করেই আজ তোর সবকিছু কেড়ে নেবো। তাকবীর হুসেইন জানে কিভাবে নিজের হক কেড়ে নিতে হয়!”
আমাকে ধাক্কা দিয়ে সড়কে ফেলে উঠে গেলেন তাকবীর। দুই হাতের আঙুল তুলে এতক্ষণ যাবৎ রীতিমত ফুঁসতে থাকা ছেলের দিকে ইশারা করলেন। অস্বচ্ছ দৃষ্টিতে দেখলাম আহান এগিয়ে এলো, বিস্তৃত হেসে। হাতের মাঝে নিজের প্যান্টের বেল্ট খুলে নিয়েছে সে। সেটা পাকাতে পাকাতে জন্তুর ভঙ্গিতে এগোলো বান্দা।
“বংশের বাতি নিভিয়ে দিলেই ভেবেছিস তোর আর আমার হিসাব মিটে যাবে? আমাদের অনেক পুরাতন হিসাব বাকি আছে, বেবিগার্ল। আমার ওটা নেই তো কি হয়েছে? তোর মতন বেশ্যাকে ভোগ করতে আহানের কোনো বংশ দণ্ডের দরকার পড়েনা।”
আমার কাছাকাছি এসে হাতের বেল্ট দিয়ে সহসাই গায়ে আ*ঘাত করে বসলো আহান। সমস্ত শরীরে বেদনা খেলে গেলো। দাঁতে ঠোঁট কামড়ে ধরলাম। গুঙিয়ে উঠলাম তীব্র যন্ত্রণায়।
“স্ক্রিম বেবিগার্ল, স্ক্রিম লাউডার! লেম্মি হেয়ার হাউ মাচ আই মেইক ইউ ফিল গুউউড!”
একের পর এক বেল্টের আঘাতে জর্জরিত হতে লাগলো আমার শরীর। একটা সময় আর চিৎকার করার সামর্থ্যও রইলোনা। নেতিয়ে গিয়েছি সম্পূর্ণ। কোনকিছুতেই আর কিছু আসে যায়না এখন আমার। চোখ দুটো বুঁজতে পারলেই যেন শান্তি। গাড়ির দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়ানো তাকবীর ছেলেকে তাড়া দিলেন হঠাৎ।
“ব্যাটা, জলদি কর। তোর জন্য সারা রাত রাস্তা খালি পড়ে থাকবে নাকি?”
বাঁকা হাসলো আহান। নিজের শার্টের বোতাম খুলতে খুলতে জন্মদাতাকে সে জানালো,
“রাস্তা ভর্তি হয়ে গেলেও সমস্যা নেই। বাঙ্গুদের হ্যাডম কোথায়? আস্তাগফিরুল্লাহ জপতে জপতে সবাই ভিডিও করবে ঠিকই, এগিয়ে আর আসবে না। ভালোই হবে, দর্শক পেলে আমার ভালো ফিল আসে।”
আমার একটা পা ধরে রাস্তায় টেনে হিঁচড়ে নিয়ে গেলো আহান। খিলখিল করে হাসতে হাসতে বললো,
“এবার তোকে কে বাঁচাবে, বেবিগার্ল? তোর ব্যক্তিগত খাম্বাটাকে তো স্বর্গে পাঠিয়ে দিয়েছি। ওখান থেকে কি হাত বাড়ানো যায়?”
আমাকে নিয়ে একদম জায়দানের নিথর শরীরের পাশে ফেললো আহান। হাঁপাচ্ছি ভীষণ। পরনের শুভ্র জামা র*ক্তে রঞ্জিত হয়ে উঠেছে আমার। পিঠের নিচে জায়দানের শরীর থেকে গড়ানো জমাট বাঁধা থকথকে র*ক্তের অস্তিত্ব টের পাচ্ছি স্পষ্ট। আহানকে দেখলাম, সম্পূর্ণ শার্ট খুলে ফেলেছে সে। প্যান্টের জিপার টেনে নামিয়ে ঠোঁট চেটে অশালীন এক ভঙ্গি করলো সে। তারপর নিথর জায়দানের দিকে তাকিয়ে জিভ দাঁতে ঠেকিয়ে চুক চুক শব্দ করলো।
“আহারে। খুব শখ ছিলো এটাকে বেঁধে রেখে দর্শক বানিয়ে এটার সামনেই তোকে খাবো। তা আর হলো কই? কবুতরের কলিজা ওর। এক বাড়িতেই শেষ। ব্যাপার না। লা*শের পাশে শরীর ভোগের একটা আলাদাই মজা আছে। তাও যদি হয় স্বামীর লা*শ, তাহলে তো কথাই নেই। সত্যি করে বল তো, এই বান্দরটা তোকে কতবার খেয়েছে? ধলা মুরগির শরীরে ওর কি শক্তি আছে? তোকে সুখ দিতে পেরেছে? শালা!”
জায়দানের পেট বরাবর লাথি হাকালো আহান। আমার স্বামীর নিস্তেজ শরীরটা সামান্য কেঁপে উঠেই আবারো স্থির হয়ে গেলো। এতক্ষণ যাবৎ নিজের মাঝে শুধু শূন্যতা টের পেয়েছি। এতকিছু শুনেছি, এত বিশ্রী ব্যবহার দেখেছি, অথচ একটুও রাগ হয়নি, না তো লেগেছে দুঃখ। নিঃশব্দে প্রাণপাখিটা বেরিয়ে যাক এটাই কামনা করেছি। কিন্তু যে মুহূর্তে আহানকে অত্যন্ত অবহেলায় জায়দানকে লাথি মারতে দেখলাম, ঠিক সেই মুহূর্তেই আমার মাথার ভেতরের একটা তার শক্ত ক্রোধের টানে ছিঁড়ে গেলো, আজীবনের জন্য!
আহান আমার কাছে এলো। হাঁটু ভেঙে ঝুঁকে পড়ল আমার উপর সম্পূর্ণ। তাকবীর চাচা দূরে দাঁড়িয়ে যেন আকাশের তারা গুনছেন আর ঘড়ির দিকে চেয়ে ছেলেকে তাড়া দিচ্ছেন। আমার পরনের র*ক্ত আর ঘামে ভেজা জামাটা টেনে খুলতে খুলতে আমার গলায় মুখ ডুবিয়ে দিলো আহান।
“বেবিগার্ল, আই ফাইনালি হ্যাভ ইউ! তুই যদি প্রথমবারেই আমার কাছে চলে আসতি, তাহলে এতকিছু হতো না। আমার অন্ধকার মহলের রাজরানী করে রাখতাম তোকে। রাতের পর রাত শুধু সুখ দিতাম, জ্বালাময়ী সুখ। গয়না গাটি, টাকায় মুড়িয়ে রাখতাম তোকে। কিন্তু তোর আমাকে সহ্য হলনা। তোর সহ্য হলো একটা নাখাস্তা শিক্ষিত পণ্ডিতকে!”
মুখ তুলে আমার থুতনি চেপে ধরে আমার কান কামড়ে ধরে আহান জড়ানো গলায় বললো,
“আমি চ্যালেঞ্জ জিতে গেলাম আজ। কি বলেছিলি যেন তুই? পৃথিবীর সব নারীকে ভোগ করতে পারলেও আমি কোনোদিন তোর শরীর পাবো না? ওয়েল, আহান নেভার লুজেজ, বেবিগার্ল!”
আহানের একটি হাত আমার গলা ঠেসে ধরে রাখলো, অন্য হাতটি আমার পেট বেয়ে নেমে গেলো আরও নিচের দিকে। উরুর মাঝে স্পর্শ ছুঁয়ে দিলো গভীরভাবে। ঘৃণায় সমস্ত শরীর শিরশির করে উঠলো আমার। ছলছলে চোখে তাকালাম ঠিক পাশেই নিথর হয়ে পড়ে থাকা জায়দানের দিকে। আমার স্বামী, আমার ভালোবাসা, আমার জীবন, আমার গোটা জগৎ! সবকিছুকে ধ্বংস করে দিয়েছে এই জাত! এই কুলাঙ্গারের জাত! আমার এখন কিচ্ছু আসে যায়না, সত্যিই আর কিচ্ছু যায় আসেনা!
আমার অসহায়ত্ব দারুণ উপভোগ করতে করতে নিজের প্যান্টের পকেট থেকে একটা লম্বা নলের পি*স্তল বের করলো আহান। তীর্যক হেসে জানালো,
“অটোমেটেড পি*স্তল, এক ট্রি*গারে আঠারোটা বু*লেট বেরোয়। তোর বান্দরটাকে শেষ করতে শুধু তিনটা লেগেছে। বাকিটা তোকে শেষ করবে।”
পি*স্তলটা আমার উরুর মাঝখানে নিয়ে গেলো সে। উন্মাদের ন্যায় হাসতে হাসতে বললো,
“চিন্তা করিস না বেবিগার্ল, আমার ওটা নেই তো কি হয়েছে? আমার অ*স্ত্র তো আছে! এই অ*স্ত্র তোকে এমন সুখ দেবে যা তুই জীবনেও কল্পনা করিসনি বেবিগার্ল, জীবনেও না। উফ্ফ! তোকে ছুঁয়ে দেয়ায় যে কি শান্তি, কি আরাম, আহহ!”
আহান ক্ষণিকের জন্য নিজের চোখ বুঁজে ফেললো। ওটুকুই সময় পেলাম আমি। নির্দিষ্ট কোনো পরিকল্পনা নেই আমার। জানিও না কি করছি আমি। হাতড়ে কাছে পেলাম জায়দানের ভাঙা হেলমেটটা। ওটাই তুলে আহানের মাথা বরাবর আছড়ে ফেললাম আমি। ভয়ংকর পুরুষালী চিৎকারে কেঁপে উঠলো চারপাশ। আমার মাঝে ন্যায়, অন্যায়, মানবিকতা কিছুই আর অবশিষ্ট নেই। জানোয়ারে পরিণত হয়ে গিয়েছি গোটা।
আহান সামান্য একটু অপ্রস্তুত হয়ে পড়তেই দুই উরুর মাঝে থাকা পি*স্তলটা চেপে ধরে গড়িয়ে গেলাম।
অবস্থা হাত থেকে বেরিয়ে গিয়েছে টের পেয়েই তাকবীর সিগারেট ফেলে সহসাই ছুটে এলেন। তার কাছেও একটা পি*স্তল আছে। সেটা বের করতে করতে চিৎকার করে উঠলেন তিনি,
“খানকি মা….!”
এটুকুই করতে পারলেন তিনি। আমার মাঝে কি ভর করল নিজেও জানিনা আমি। পি*স্তলটা তা*ক করে ট্রিগার টেনে দিলাম। এক চাপে পরপর কয়েকটি বু*লেট ছুটে গেলো তাকবীরের দিকে। নিয়ন্ত্রণ করতে না পারায় পশ্চাৎ বেগের কারণে তখনি পি*স্তলসহ মাটির একপাশে ছিটকে পড়ে গেলাম আমি। তবে বু*লেটের নিশানাভেদ হয়েছে। তাকবীরের বুক এফোঁড় ওফোঁড় করে দিয়ে বেরিয়ে গিয়েছে সেসব। ছিটকে উঠলো র*ক্ত। কয়েক সেকেন্ড বি*স্ফারিত চোখ নিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন তাকবীর চাচা। যেন বিশ্বাস করে উঠতে পারলেন না, আমি সত্যিই এত বড় কাজটা করতে পেরেছি! কয়েক সেকেন্ড বাদেই তার শরীরটা ধপাস করে উল্টে পরে গেলো রাস্তার মাঝে। তাজা র*ক্তে সিক্ত হয়ে উঠলো চারপাশ।
“না! ড্যাড!”
হুংকার দিয়ে লাফিয়ে উঠলো আহান। ছুটে গেলো নিজের পিতার কাছে। আঁকড়ে ধরলো নিস্তেজ শরীরটাকে।
“ড্যাড! ড্যাড, কথা বলো! সাবিনের বাচ্চা! কি করেছিস তুই? বেশ্যা মাগী!”
টলতে টলতে উঠে দাঁড়ালাম আমি। আমার চোখে এখনো ভাসছে দৃশ্যটি। জায়দানকে অতি ঘৃণা এবং অবহেলায় লাথি মারছে আহান। ওই একটা দৃশ্যই যথেষ্ট। চোখের সামনে ভেসে উঠল আমার ড্যাডের মুখটা। যার ভালোবাসা হয়ত জটিল ছিলো, তবে ছিলোনা কোনো খাদ। বলি হতে হয়েছে তাকে নিজের পরিবারের কাছেই। কারণ—সম্পদ। ক্ষমা? রক্ষা? উঁহু, আমার চাই হুসেইনদের ধ্বংস! শুধুমাত্র ধ্বংস!
ঘড়ঘড় করে উঠলো আমার কন্ঠস্বর, সমস্ত নিস্তব্ধ জগৎজুড়ে প্রতিধ্বনিত হলো,
“র*ক্তের বিনিময়ে র*ক্ত, কলিজার বিনিময়ে কলিজা আর জানের বদলে জান! তোর জান চাই, আমার!”
আহান আমার হঠাৎ পরিবর্তনে বেশ ভরকে গেলো। বিশেষ করে পিতার লা*শ তার ভেতরের সমস্ত অহংবোধকে গুঁড়িয়ে দিয়েছে সহসাই। হাতের ভরে পেছাতে পেছাতে একেবারে গাড়ির টায়ারে গিয়ে ঘেঁষেছে সে। সমস্ত শরীর থরথর করে কাঁপছে তার। সামনে দন্ডায়মান এক অশরীরী। অশুভ ছায়ামূর্তি যেন স্বয়ং মৃত্যুদূত। তার কুচকুচে কালো চোখ দুটো যেন আলো আঁধারির মাঝে টকটকে হয়ে জ্বলছে। ওই জ্বলনে শুধুই র*ক্তের নেশা! চিনতে বেশ বেগ পোহাতে হলো বুঝি আহানের। এটাই তার সেই বেয়াদব চাচাতো বোনটি? যে এককালে তার ভালোবাসায় রীতিমত উন্মাদ ছিল? আজ সে তার প্রাণটা কেড়ে নিতেও এক দন্ড দ্বিধা করবেনা?
“সা…সাবিন…আমার কথা শোন…”
তীর্যক এক হাসি ফুটলো আমার ঠোঁটজুড়ে। র*ক্তে রঞ্জিত হাতে পি*স্তলখানি তুলে তাক করলাম,
“আমি শোকের মাতম তুলে বিচারহীনতার দেশে ন্যায়বিচার ভিক্ষা করা অসহায় নারী নই।”
নিশানা করলাম কপাল বরাবর, একটুও এদিক সেদিক হবেনা, আমার হাসি ছাপিয়ে গেলো সমস্ত ধরিত্রীকে,
“আমি জানোয়ার! আমি চাইনা বিচার, আমি চাই কুলাঙ্গারের হাহাকার!”
“সাবিন এখনো সময় আছে আমরা পালিয়ে…”
“শুয়ারের বাচ্চা! আমার স্বামীর গায়ে একটা টোকার দাম আমি তুলবো তোর জীবন দিয়ে, মাদারফাকার!”
“সা…আহহহহহহ!”
একইসঙ্গে ঘটলো তিনটি ঘটনা। অদূর থেকে একটি গাড়ি ছুটে আসার আওয়াজ, তীব্র হর্ন। আহানের ভয়ংকর চিৎকার। আমার হাতের পি*স্তল থেকে বেরোনো মুহুর্মুহু বু*লেটধ্বনি।
পাগল হয়ে গিয়েছি আমি। মাথায় কিছুই নেই। শুধুই ক্রোধ, আগ্নেয়গিরি, উন্মাদ আত্মা। আহানের র*ক্তা*ক্ত শরীরের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে খেয়ালই করলাম না কখন একটি গাড়ি এসে থামলো ঠিক পাশেই। ভেতর থেকে লাফিয়ে নামলো অপ্রত্যাশিত এক পুরুষ।
আয়দান আরেফিন। অস্বচ্ছ দৃষ্টিতে হাঁপাতে হাঁপাতে তাকালাম তার দিকে। নির্বাক চেয়ে আছে বান্দা। প্রসারিত দৃষ্টি মেলে ধ্বংসযজ্ঞ দেখছে।
“কি করেছিস তুই, সাবিন?”
ফিসফিস করে করা প্রশ্নটা আহাম্মকি শোনালো আমার কাছে। অট্টহাসি হেসে উঠলাম। হাতের পি*স্তল নামিয়ে নিলাম, হাসতে হাসতে আমার মাথা পিছনে ঝুলে পড়লো, শরীর টলে উঠলো। দুহাত দুদিকে ছড়িয়ে হাসতে হাসতে চিৎকার করতে লাগলাম,
“আমি মুক্ত! ড্যাড, জায়দান, আমি আজ মুক্ত! আমি আসছি, আমি তোমাদের কাছে আসছি! আমায় স্বাগতম জানানোর ব্যবস্থা করো তোমরা!”
আমার কন্ঠস্বর ছাপিয়ে গেলো পুলিশের গাড়ির সাইরেনের আওয়াজ। আয়দান একা আসেনি। তার খানিকটা পিছনেই পুলিশের ইউনিটের বেশ কয়েকটা গাড়ি এগিয়ে আসছিল। বান্দা দ্রুত একবার সড়কের প্রান্তে উপস্থিত হওয়া গাড়িগুলো দেখলো। পরক্ষণেই আমার দিকে তাকালো। বুঝতেও পারলাম না, এরপর ঠিক কি হলো।
আয়দান দৌঁড়ে এলো আমার কাছে। আমার হাত থেকে পি*স্তলটা ছিনিয়ে নিয়ে নিজের হাতের মাঝে চেপে ফেললো। জোর করে হাতের মাঝে নাড়াচাড়া করতে লাগলো জিনিসটা, প্রথমে হাসতে হাসতেই উন্মাদের মতন চেয়ে রইলাম। বুঝলাম না, এই ছেলে কি করতে চাইছে। যতক্ষণে বুঝলাম সে আমার ফিঙ্গারপ্রিন্টের উপর নিজের ফিঙ্গারপ্রিন্ট বসাচ্ছে, ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে। পুলিশের গাড়ি সামনে আসার সাথে সাথে পি*স্তল তুলে ইতোমধ্যে লা*শে পরিণত হওয়া আহান এবং তাকবীরের শরীরে অন্তিম কয়েকটি বু*লেট ছুঁড়লো সে।
“আয়দান!”
তীক্ষ্ণ একটা পরিচিত কণ্ঠের চিৎকার ভেসে এলো। পুলিশের গাড়ি পুরোপুরি থামার আগেই ভেতর থেকে লাফিয়ে নেমে আসতে দেখলাম মিসিরকে। ছুটে এলো সে। পিছনে নেওয়াজ। গাড়ির সাইরেনের লাল নীল বাতির মাঝে আমি হতভম্ব হয়ে শুধু দেখে গেলাম। নেওয়াজের করে ওঠা গ্রেফতারি গর্জন। পুলিশ সদস্যরা এগিয়ে এলো, আয়দানকে দুইপাশ থেকে আঁকড়ে ধরে গাড়ির বনেটের উপর আছড়ে ফেলে তার হাত দুটো পিছমোড়া করে বেঁধে ফেললো। আয়দান একটুও বাঁধা দিলোনা। তার গভীর বাদামী দৃষ্টি তখনো আপতিত সড়কে নিথর হয়ে পড়ে থাকা বড় ভাইয়ের র*ক্তা*ক্ত শরীরের দিকে।
_________চলবে_________

